তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ১৪

🟢

“কি পাচ্ছো এই রাজনীতি করে? এখানে জীবনের ঝুঁকি ছাড়া আর আছেটা কি? আপন মানুষদেরকে ভয় দেখানো ছাড়া আর কি আছে এই রাজনীতির মাঝে?”

ইরফান আহমেদ এর প্রশ্নের কোন উত্তর মুনতাসির দিলো না। চুপচাপ থাকলো। কেননা সে জানে এখন ওর কোন যুক্তিই এখানে খাটবে না। তার চাচা ওরফে শ্বশুর কোন কিছুতেই মানতে চাইবেন না যে রাজনীতি করে মুনতাসিরের কোনো লাভ হচ্ছে। অবশ্য আদৌ কিছু পেয়েছে কিনা কিংবা ভবিষ্যতে কিছু পাবে কিনা এ বিষয়ে মুনতাসিরও জানে না। তবে ওর রাজনীতি করতে ভালো লাগে তাই করে।

মুনতাসির কে চুপ করে থাকতে দেখে ইরফান আহমেদ পুনরায় বললেন,

“কি হলো উত্তর দাও? তুমি কি ভুলে গেছো তোমার জীবনের সাথে এখন আমার মেয়ের জীবনও যুক্ত? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার মেয়ের কি হবে বলো? আজই যদি তোমার একটা কিছু হতো তবে তোমার স্ত্রীর কি হতো সে কথা ভেবেছো একবারও?”

মুনতাসির এবারেও চুপ থাকলো। তবে ইরা কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“বাবা থাক না এখন এসব কথা। হয়নি তো কিছু ওর। দেখছো শরীর খারাপ তার ভিতরে এসব বলার কি দরকার?”

ইরফান সাহেব মেয়েকে ধমকের সুরে বললেন,

“তুমি চুপ থাকো। তুমি কি বোঝো এসবের? তোমাদের দুজনের বয়স কতো? জীবন সম্পর্কে কি জানো তোমরা?”

মুনতাসির এবারে শান্ত গলায় বলে উঠলো,

“দেখুন বাবা জীবনের আমাদের কারোরই নিশ্চয়তা নেই। আয়ু শেষ হয়ে গেলে আমাদের সবাইকেই যেতে হবে। এমনটা তো না যে আমি রাজনীতি করার জন্য আমার আয়ু শেষ হয়ে যাচ্ছে।”

ইরফান সাহেব এবারে মুনতাসির কে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,

“চুপ করো। তোমার মাঝে বাঁচার কোন ইচ্ছে আছে? জোর করে নিজের আয়ু কমানোর জন্য উঠে পড়ে লেগে পড়েছে যেন। তোমাকে আমি পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি মুনতাসির এরপরেও যদি তুমি রাজনীতি না ছাড়ো তবে আমার মেয়েকে আমি তোমার বাড়িতে পাঠাবো না।”

ওদের আলোচনার একদম শুরু থেকেই আরজু আর আরমান ঘরে উপস্থিত আছে। তবে যেহেতু এটা মুনতাসিরদের পারিবারিক ব্যাপার তাই এর মাঝে কোন কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। যদিও আরমান বিরক্ত হচ্ছিল কিন্তু তারপরও কথা বলতে চায়নি। বিরক্ত হচ্ছে আরজুও আর সেটা ওর মুখ ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এবারে যেন আরজু আরো বেশি বিরক্ত হলো। বিরক্তিকর গলায় ইরফান সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওনার স্ত্রী কে আপনি ওনার কাছে পাঠাবেন না কেন? যদি ইরা আপু এখনো শুধুমাত্র আপনার মেয়ে থাকতো তবে ওর উপর আপনার অধিকার সব থেকে বেশি থাকতো। কিন্তু ভুলে যাবেন না ইরা আপু এখন ওনার স্ত্রী, তার মানে ওনার অধিকার সব থেকে বেশি।”

কন্ঠের উৎসটা খোঁজার জন্য ইরফান আহমেদ একবার রুমের আশেপাশে চোখ বোলালেন। ঠিক দরজার কাছে দেখতে পেলেন আরজু কে। মেয়েটাকে উনি চেনেন না। আদৌ মুনতাসিরের পরিচিত কিনা সেটাও জানেন না। কেননা আসার পরে সেই রাত থেকেই ওকে এখানে দেখছে। ইরারও কোন আত্মীয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। হলে তো উনি নিশ্চয়ই চিনবেন। তবে কে এই মেয়েটা?

আর এভাবে কথাই বা বলছে কেন ওনাদের মাঝখানে?

চোখে মুখে একরাশ প্রশ্ন ফুটিয়ে দিলে তিনি আরজু কে বললেন,

“তুমি কে?”

আরজু স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমি কে সেটা বড় কথা নয়। তার আগে আপনি আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন আপনার মেয়ের যদি অন্য কারো সাথে বিয়ে দিতেন তবে আপনি নিশ্চয়তা দিতে পারতেন যে আপনার সেই জামাই সারা জীবন বেঁচে থাকবে?”

ইরফান আহমেদ একটু থতমত খেলেন। মনে মনে নিজে উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করে উত্তরে পেলেন না। তাই তিনি কোন উত্তর দিলেন না।

ওনার নীরবতা আরজু সম্মতি ধরে নিয়ে বলল,

“বুঝতে পেরেছি আপনার উত্তর আমার অনুকূলে এসেছে। তবে আপনি আমায় একটা কথা বলুন যেহেতু যার সাথেই বিয়ে দিন না কেন তার জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না তবে এখন যার সাথে বিয়ে দিয়েছেন অযথা তাকে ছোট করছেন কেন? মানুষ মাত্রই ম'রণশীল। কেউ আগে ম'রবে, কেউ পড়ে ম'রবে। বুঝতে হবে এটা আপনাকে।”

ইরফান আহমেদ চোখমুখে এবার কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুললেন। আরজুর কথাবার্তা ওনার একদমই পছন্দ হচ্ছে না। গুরুজনের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেই আদব-কায়দা মনে হয় মেয়েটা শেখেনি। সেজন্যই তো এভাবে মুখের উপর সমানে কথা বলেই যাচ্ছে। মৃদু গম্ভীর গলায় বললেন,

“আমাদের মাঝে তুমি কথা না বললেই খুশি হবো।”

আরজু এবারও স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আপনাকে খুশি করার কোন দায় আমার নেই। যুক্তি দিয়ে কথা বলুন না আমার সাথে। আপনার মেয়ের যেখানে তার স্বামীর পেশা নিয়ে সমস্যা নেই তবে আপনার এতো সমস্যা হচ্ছে কেন? মেয়ের খুশি কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না?”

ইরফান আহমেদ আবারও গম্ভীর গলায় বললেন,

“অবশ্যই। আমার মেয়ে আমার প্রাণ।”

“ইরা আপু যেমন আপনার প্রাণ তেমনি ইরা আপুর স্বামী ইরা আপুর প্রাণ। এমন কোন মানুষ আছে এই পৃথিবীতে যার জীবনের ঝুঁকি নেই? মৃ'ত্যু কখন এসে আপনার দরজায় কড়া নাড়বে আপনি বুঝতেও পারবেন না। প্রত্যেকটা জায়গায়তেই, প্রত্যেকটা পেশাতেই মৃ'ত্যু হানা দিতে পারে।”

ইরফান আহমেদ এবার একটু শান্ত হলেন। তিনি জানেন এই কথাগুলো সত্য কিন্তু তারপরেও মনকে তো রাজি করাতে পারেন না। বারবার শুধু একটা কথাই মনে হয় যে যদি মুনতাসির রাজনীতিতে না জড়াতো তবে ওর জীবনের এত অনিশ্চয়তা থাকতো না। নিজের ভাইকে দেখেছেন এই রাজনীতির জন্য জীবন দিতে, সেখানে নিজের ভাইয়ের ছেলে তার উপরে আবার তার সাথে তার মেয়ের জীবনটাও জড়িত। সেজন্যই তো তিনি বেশি ভয় করেন। কন্ঠে এবার একটু নমনীয় ফুটিয়ে তুলে বললেন,

“ভয়তো ওকে নিয়ে আমারও হয়। ভাইয়ের ছেলে হিসেবে কখনো দেখিনি, নিজের ছেলে হিসেবে দেখেছি। ভরসা করি, ভালোবাসি জন্যই মেয়ে কে ওর হাতে তুলে দিয়েছে।”

আরজু কাটকাট গলায় বলল,

“তাহলে চুপ করে থাকুন। উনি অনেক ভালো মানুষ, ওনার কিচ্ছু হবে না। অন্তত রাজনীতির জন্য ওনার কোন ক্ষতি হবে না এই ব্যাপারে আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি।”

ইরফান আহমেদ ভ্রুঁ কুঁচকে আরজুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তোমার কথায় আমি ভরসা করবো কেন?”

প্রশ্নটা আরজুর কাছে সত্যিই যৌক্তিক বলে মনে হলো। সত্যিই তো তিনি আরজুকে চেনেন না, জানেন না তাহলে কেন আরজুর উপরে ভরসা করবে? আর তার থেকেও বড় কথা আরজুর তো কোন ক্ষমতাই নেই মুনতাসির কে বাঁচানোর। তবে ও কিভাবে নিশ্চয়তা দিচ্ছে?

তৎক্ষণাত আরজুর দৃষ্টি পড়লো পাশে দাঁড়ানো আরমানের দিকে যে দিন দুনিয়া ভুলে ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তবে আরজু এখন সেসব দৃষ্টির মানে বুঝলো না। কিংবা বোঝার প্রয়োজন মনে করলো না। কেননা এখন এত কিছু বোঝার মতন পর্যাপ্ত সময় আরজুর হাতে নেই। সবে মাত্র ইরার বাবা ওর কথা বুঝতে শুরু করেছে, ওর যুক্তির কাছে হার মানতে শুরু করেছে এখন আরজু থেমে গেলে চলবে না। চটপট ওনার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

পাশে দাঁড়ানো আরমানকে দেখিয়ে বলল,

“ওনাকে দেখুন। ওনার সাথে আপনার জামাইয়ের খুব ভালো সম্পর্ক। আপনার জামাইয়ের কিছু হলে উনি ঠিক বাঁচিয়ে নেবেন। আর যদি বলেন আমার কথায় ভরসা করার কথা তবে বলবো আমাকে আপনার ভরসা করতে হবে কেননা উনি আমায় ভরসা করেন।”

ইরফান আহমেদ আবারও গম্ভীর গলায় বললেন,

“আমি তো ওকেও চিনি না তবে ওকে ভরসা করব কেন?”

আরজু অল্প কিছুক্ষণ ভেবে ইশারায় মুনতাসির কে দেখিয়ে বলল,

“কারণ ওনাকে আপনার জামাই ভরসা করে।”

ইরফান আহমেদ এবার ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললেন,

‘আমি তো এই বিষয়ে আমার জামাইকেই ভরসা করি না তবে আমার জামাই যাকে ভরসা করে তাকে ভরসা করব কেন?”

আরজুর বুক চিড়ে এবার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইলো তবে আরজু বের হতে দিল না। লোক সম্মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা আরজুর মানায় না। তবে তো দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে গেল তাই না? আবারো কাটকাট গলায় বলল,

“আপনার জামাইকে বিশ্বাস করবেন তার কারণ ওনাকে আপনার মেয়ে বিশ্বাস করে। এখন এটা বলবেন না যে আপনি আপনার মেয়েকে বিশ্বাস করেন না। তাহলে আপনি একজন খারাপ বাবা হয়ে যাবেন। কেননা একজন ভালো বাবা কখনোই তার মেয়েকে অবিশ্বাস করতে পারে না।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমন একটা পরিবেশে আরমান শব্দ করে হেসে ফেলল। আরমানের দেখা দেখি ইরাও হেসে ফেলল। হাসলো মুনতাসিরও। তবে মুনতাসিরের হাসির শব্দ হলো না। খুব অল্প একটু হাসলো। কোনমতে ঠোঁটটা একটু প্রসারিত হলো এই আর কি।

তবে ইরফান আহামেদ মনে হয় এবার বেশ অনেকটা বিরক্ত হলেন। এত যুক্তি, এত কথা ওনার মাথায় যাচ্ছে না। বিরক্তকর গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“মুনতাসির, কে এই মেয়েটা?”

ইরফান আহমেদের প্রশ্নটা ভীষণ পছন্দ হলো আরজুর। ও দেখতে চায় মুনতাসির ওকে কি বলে পরিচয় করিয়ে দেয়।

আচ্ছা মুনতাসির কি বলবে আরজু বাইরের মানুষ? বলতেই পারে। হ্যাঁ এমনটাই তো বলা স্বাভাবিক। তবে আরজু যে মনে মনে ভীষণ শ্রদ্ধা করে ফেলেছে মুনতাসির কে, আপন ভাবতেও শুরু করেছে। এখন মুনতাসির যদি বলে যে আরজু ওর কেউ না তবে যে আরজু কষ্ট পাবে।

তবে আরজুর সে ভাবনা ঠিক প্রমাণিত হলো না। মুনতাসির বেশ শান্ত কন্ঠে বলল,

“আমার বোন বাবা।”

আরজু চমকে মুনতাসিরের দিকে তাকালো। বিশ্বাস হচ্ছে না যেন মুনতাসিরের বলা কথাটা। সত্যি কি মুনতাসির আরজু কে নিজের মানুষ বলল? হ্যাঁ ভুল শোনেনি আরজু। আরজু কেন যেন আর সেখানে দাঁড়াতে পারলো না। রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরজুর হঠাৎ প্রস্থান মুনতাসির কে চিন্তায় ফেলে দিল। ভাবলো বোন বলায় রেগে গেল কিনা। আরজু হঠাৎ করে এভাবে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে আরমানও একই ভয় পেল। মুনতাসির উদ্বিগ্ন গলায় আরমান কে বলল,

“ভাই, কি হলো আরজুর?”

আরমান মুনতাসির কে আশ্বস্ত করে বলল,

“আমি দেখছি।"

আরমান হন্তদন্ত পায়ে কেবিনের বাইরে গিয়ে দেখলো আরজু বসে আছে। মুখে যেন তার অমানিশার কালো ছায়া নেমে এসেছে। মনের গভীরে চলছে কাল বৈশাখের তুমুল ঝড়। কি এক দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়েছে আরজু। নিজের মাঝে তৈরি হওয়া অস্থিরতা গুলো কাটাতে পারছে না। এখন উদ্বিগ্নতা কেন কাজ করছে মনের ভেতরে বুঝতে পারছে না। কেন এমনটা হচ্ছে?

'ভাই' শব্দটা আরজুর কাছে ভীষণ ঘৃণিত অথচ আজ একজন আরজুকে নিজের বোন বলল আর অদ্ভুত ভাবে আরজুর ভালোও লাগলো। আরজু আবার সেই মানুষটাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করতে শুরু করেছে, ভরসা করতে শুরু করেছে। সব ভাইয়েরা যে একরকম হয় না, সব ভাইয়েরা যে প্রিথুলের মতন হয় না সেটাও যেন একটু একটু বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

আরমানের আরজুর থমথমে মুখ দেখে একটু চিন্তা হলো। অবশ্য মুখ ভঙ্গি থমথমে হলেও আরমানের কেন যেন মনে হলো আরজু কোন বিষয় নিয়ে ভীষণ টানাপোড়েনে পড়েছে। আরমান সরাসরি গিয়ে আরজুর সামনে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। চিন্তিত গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরু, কোন কথায় খারাপ লেগেছে আপনার?”

আরজু যেন আরমানেরই অপেক্ষা করছিল। কেননা আরমান আজকাল আরজুর সব প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে দেয়, সব দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে দেয়। তাই আরজু কে কোন দেরি করতে হলো না। চটপট অস্থির গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“উনি আমাকে বোন বললেন কেন? বোন মানে তো নিজের মানুষ, আপন মানুষ। তার মানে আমি ওনার আপন মানুষ?”

আরমান ঠিক কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। আরজু কে বোঝা ভীষণ কঠিন। যার ব্যবহার, আচরণ দূর থেকে দেখলে কেউ খুব অনায়াসে বলে দেবে যে মেয়েটা ভীষণ অসভ্য, বেয়াদব। তবে কেউ যদি একটু কাছে থেকে এসে বোঝার চেষ্টা করে তবে তখন সে বুঝতে পারবে মেয়েটা আসলে বেয়াদব না। মেয়েটা কিছু বোঝাতে চায় সবাইকে কিন্তু বুঝে উঠতে পারে না কেউ। হয়তো বোঝাতে পারে না মেয়েটা কাউকে কিছু সেই জন্যই মেয়েটাকে ভীষণ কঠিন মনে হয় বাইরে থেকে দেখতে। তবে আরমান এই বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরেছে যে আরজুর মনটা ভীষণ নরম। শুধু বাইরে নিজেকে একটা কঠিন আবরণে আবৃত্ত করে রাখে।

তবে আরমান জানে, একবার যদি ওই শক্ত খোলসটাকে ভাঙতে পারে তবে ভেতরের কোমল আরজুর খোঁজ পাবে। খোঁজ পাবে এক অন্যরকম আরজুর।

আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু আবারো তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

“কি হলো বলুন?”

আরমানের ধ্যান ভাঙলো। শান্ত গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

বিজ্ঞাপন

“হ্যাঁ আরু। মুনতাসির আপনাকে বোন হিসেবে ভীষণ স্নেহ করে।”

আরমান পরবর্তীতে কিছু বলার আগেই আরজু আবারও বলল,

“কিন্তু কেন? আমি কি বোন হিসেবে খুব ভালো যে আমাকে স্নেহ করেন?”

“আপনি একজন মানুষ হিসেবেই ভীষণ ভালো আরু। আপনাকে যে কেউ ভালোবাসবে।”

“কিন্তু আমার ভাই তো আমায় ভালোবাসে না। আমার ভাই সব সময় আমার ঘৃণা করেছে, অপছন্দ করেছে, আমাকে মে'রেছে, আমার সম্বন্ধে জঘন্য জঘন্য কথা বলেছে, আমার চরিত্রের উপর আঙুল তুলেছে। আমার নিজের ভাই যেখানে আমায় ভালোবাসতে পারেনি সেখানে উনি কি করে ভালোবাসলেন?”

আরমানের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো। কি বলল এখনই আরজু? আরজুকে মে'রেছে, চরিত্রে আঙ্গুল তুলেছে ওর ভাই কিন্তু কেন? কেন এমনটা করেছে আরজুর সাথে উত্তরটা জানার জন্য ভীষণ কৌতুহল দেখা গেল আরমানের মাঝে। প্রশ্নাত্মক গলায় আরজু কে বলল,

“কিন্তু আপনার ভাই কেন এসব করেছে আপনার সাথে? গায়ে হাত তুলেছে কেন?”

“আসলে……”

কথাটা বলতে নিয়েও থেমে গেল আরজু। আরমানের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে কি যেন ভাবল। নিজেই যেন নিজেকে কি সব বোঝালো। তারপরে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালো। আরজু কে উঠে দাঁড়াতে দেখে আরমানও উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“কি হলো আরু বলুন।”

আরজু থমথমে গলায় বলল,

“কিছু না। আমি এখন আসছি।”

কথাটা বলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। এদিকে আরমান নিজের কাঙ্খিত উত্তর না পেয়ে আরও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। আরজুর পিছনে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। আরজু সেটা বুঝতে পেরে নিজেই থেমে গেল। পিছন ফিরে তাকিয়ে অনুরোধের স্বরে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার পেছনে আসবেন না। এখন আমাকে একা যেতে দিন। আমি একা চলতে অভ্যস্ত, আমি একা ভাবতে অভ্যস্ত, আমি একা থাকতে অভ্যস্ত। তাই আমাকে একা থাকতে দিন। আমাকে আমার স্বস্তির মাঝে থাকতে দিন।”

থেমে গেল আরমান। যেখানে আরজু নিজের স্বস্তি এভাবে ভিক্ষে চেয়ে গেল আরমানের কাছে সেখানে আরমান কি করে যাবে? আরমান কি করে ওর আরুর স্বস্তি কেড়ে নিতে পারে নাকি!

_______

ভর দুপুরবেলা আরজু এক বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শীত কমার তুলনায় আরো বেড়েছে। তবে তীব্র শীতের মাঝেও আরজুর গায়ে কোন শীত বস্ত্র নেই। এর জন্য বিশেষ কোনো ভাবান্তরও দেখা যাচ্ছে না আরজুর মাঝে। থেকে থেকে গা শিউরে উঠছে ঠিকই তবে আরজু সেদিকে খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছে না। শীতের হিমেল হাওয়ায় হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তবে একটা তীব্র উত্তেজনায় নিজের মাঝে কিছুটা উষ্ণতাও অনুভব করছে আরজু ।

অনেক ভাবনা চিন্তা করে কলিং বেলটা বাজালো। আরজুর মাঝে উত্তেজনা এবার আরো বাড়লো। অল্প কিছুক্ষণের ব্যবধানে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এক ভদ্রমহিলা। সেদিন আরমানের সাথে যে বস্তি তে, যেই বাড়ির দরজার সামনে আরজুর দেখা হয়েছিল আজ আরজু আবারও সেই বাড়িতে এসেছে।

ভদ্রমহিলা আরজু কে দেখেই অবাক হয়ে গেলেন। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললেন,

“আপনি আবার এসেছেন! বলেছিলাম তো এই বাড়িতে সুমাইয়া নামে কেউ থাকে না।”

আরজু জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। মনে মনে এতক্ষন সব প্রশ্ন, সব উত্তর সাজিয়ে রেখেছিল তবে এখন কেন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। এমন গোয়েন্দাগিরির স্বভাব আরজুর নেই। কখনো এমন গোয়েন্দাগিরি করেনি তবে এবার প্রথম করছে। আর সেই জন্যই এত নার্ভাস ফিল করছে।

“হ্যাঁ আপু আমি জানি এখানে সুমাইয়া নামে কেউ থাকে না। তবে আমি অন্য একটা দরকার এসেছি।”

ভদ্র মহিলা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

“হ্যাঁ বলো।”

"সেদিন আমার সাথে একজন ছেলে ছিল মনে আছে আপনার ওনার কথা?”

ভদ্র মহিলা একটু মনে করার চেষ্টা করে বললেন,

“হ্যাঁ মনে আছে কিন্তু কেন?”

“উনি কি এখানে কারো খোঁজ করতে এসেছিলেন? কিংবা সেই দিন আমি আসার আগে অন্য কারো খোঁজ করেছিলেন বা আমি যাওয়ার পর?"

ভদ্রমহিলা বেশ স্বাভাবিক গলায় বললেন,

“না তো।”

আরজুর সন্দেহ হলো। ঠিক পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে উঠতে পারলে না। আবারও বলল,

“একটু ঠিক করে মনে করে বলুন উনি কি আর এসেছিলেন এখানে? কিংবা কখনো কারো বিষয়ে আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন?”

ভদ্রমহিলা আবারও মস্তিষ্কে একটু জোর দিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো এবং মনেও পড়লো।

“না তো। উনি আর কখনো আসেনি।”

আরজুর আর পাল্টা কোন কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো না। ওনার তো মিথ্যে বলে কোন লাভ নেই। হয়তো সত্যি আরমান আসেনি আর। আরজুই হয়ত বেশি ভাবছে।

এবারে কৃতজ্ঞতার গলায় বলল,

“ধন্যবাদ আপনাকে সাহায্য করার জন্য। আর বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি।”

ভদ্রমহিলা আজকেও আন্তরিকতার গলায় বললেন,

“কোন ব্যাপার না।”

আরজু মাথা নাড়াতেই তিনি দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আরজু ফেরার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। ফেরার পথে ফারহানার বাড়িটা পড়লো। আরজু একবার ফারহানার বাড়ির দরজার দিকে তাকালো। খুব আফসোস হলো এই বাড়িতে যারা থাকতো তাদের না পাওয়ার জন্য। পেলে যে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর মিলে যেত।

__________

সারারাত না ঘুমোনোর ফলে আরমানের দুচোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে। বাসায় ফিরে গোসল করে কোন কিছু খাওয়া হলো না আর। খাওয়ার ইচ্ছেটাই নেই। সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিল। দু চোখ বন্ধ করলো ঘুমোনোর জন্য আর ওমনি ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো। আরমানের সর্বাঙ্গ বিরক্তিতে ছেঁয়ে গেল। ইচ্ছেতো করছে ফোনটা ছুঁড়ে মা'রতে তবে তেমনটা করল না। বন্ধ চোখেই ফোনটা হাতরে খুঁজে বের করে রিসিভ করে কানে ধরে বলল,

“কে বলছেন?”

অপর পাশ থেকে ভেসে এলে ফিরোজের কণ্ঠস্বর। ফিরোজ উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“খোঁজ পেয়েছো আরমান ওদের?”

ফিরোজের কন্ঠটা কানে যেতেই আরমানের ঘুম ছুটে গেল। সেই সাথে বাড়লো আফসোস। কেন যে দেরি করেছিলো ফারহানার বাড়ি যেতে!

অপরাধী গলায় বলল,

“না ফিরোজ খোঁজ পাইনি। আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। আমারই এতটা দেরি করা উচিত হয়নি। আমি নির্বাচন নিয়ে এতটা ব্যস্ত ছিলাম যে দেরি করে ফেলেছি।”

ফিরোজের বুক চিরে আরো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। রহস্যের এত কাছাকাছি পৌঁছানোর পরও তার সমাধান করতে পারল না। আজ এতগুলো বছর ধরে চেষ্টা করছে তবুও সে কাঙ্খিত মানুষটাকে খুঁজে পাচ্ছে না। কোথায় যে হারিয়ে গেছে, আদৌও বেঁচে আছে কিনা তাও জানেনা ফিরোজ।

ফিরোজকে চুপ করে থাকতে দেখে আরমানের অপরাধবোধ আরো বাড়লো। আশ্বস্ত করে বলল,

“তুমি চিন্তা করো না একবার যখন খুঁজে পেয়েছি আবারো পাব। তুমিতো বলেছিলে যে জায়গাগুলোতে ওনার যাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেখানে গেলে তুমি খোঁজ পাবে। আর আমার মনে হয় উনি এমন জায়গায় যাবেই না। তারমানে খুব বেশি দূর পালাতেও পারবে না। চিন্তা করো না খুঁজে বের করবো আমি ওনাকে।”

“তাই করো। তোমাকে আমি বলে বোঝাতে পারবো না ওই পুতুলকে খুঁজে বের করা আমার জন্য ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ও খুব মূল্যবান কিছুর তথ্য জানে। প্লিজ ওকে খুঁজে বের কর। এই ফিরোজ কাউকে অনুরোধ করে না তোমাকে করছে তাহলে বোঝো কতটা গুরুত্বপূর্ণ ওকে খুঁজে বের করা আমার জন্য।”

ফিরোজের কন্ঠটা এবার ভীষণ কাতর শোনালো। সেই সাথে নরমও হলো। আরমান আবারো ভরসা দিয়ে বলল,

“কথা দিচ্ছি তোমাকে ওদের কে খুঁজে বের করবোই আমি। যেখানেই থাকুক না কেন সেখান থেকে ওদেরকে আমি খুঁজে বের করবো। আর তুমি ঢাকায় এলে একবার দেখা করে যেও আমার সাথে। সামনাসামনি কথা বললে ভালো হয়।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। এখন তো যেতে পারবো না। চট্টগ্রাম যাব আজ। ওখান থেকে ফিরে এসে ঢাকায় যাবো তোমার সাথে দেখা করতে।”

“চট্টগ্রাম কেন যাবে?”

ফিরোজের বুক চিরে আরো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। হতাশ গলায় বলল,

“আরো একজনকে খুঁজতে যাব।”

আরমানের এবার ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগলো। এই ফিরোজের জীবন থেকে কি সবাই নিরুদ্দেশ হয়ে যায় নাকি? যেকোনো দিন একেও খুঁজে বের করতে হবে।

“সবাই এত হারিয়ে যায় কেন তোমার জীবন থেকে?”

আরমানের প্রশ্নটা ফিরোজ এর কাছে হাস্যকর লাগলো। উত্তরটা তো নিজেই জানে না। আলতো একটু হেসে বলল,

“আমি আগলে রাখতে পারি না তাই। মানুষটা তো আমি খুব একটা ভালো না।”

আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কেন? কি কর তুমি?”

ফিরোজ কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,

“তেমন কিছু না। ওই যে নিজের মানুষদেরকে আগলে রাখতে পারি না এতটুকুই। আচ্ছা ঠিক আছে এখন রাখছি ফোনটা।”

ফিরোজ ফোনটা রেখে দিতেই আরমান আবারোও ঘুমোনোর জন্য প্রস্তুতি নিল। তবে ভাগ্য আজ আরমানের সহায় হচ্ছে না। আবারও ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অপরিচিত একটা নাম্বার। বেশ উৎসাহ দেখা গেল আরমানের মাঝে। ভাবল আরজু ফোন দিয়েছে নাকি? হ্যাঁ হতেই পারে। আরজুর মনে তো অনেক প্রশ্নের তৈরি হয়েছিল সেগুলোর উত্তর নিশ্চয় খুঁজছে।

তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো। তবে আশাহত হলো। অপর পাশ থেকে আরজুর কণ্ঠ ভেসে এলো না। আরমান পরিচয় চাইতেই ভদ্রমহিলা নিজের পরিচয় দিলেন। আরমান ভ্রুঁ কোঁচকালো। শোয়া থেকে চটপট উঠে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কেউ এসেছিল আমার খোঁজ করতে?”

অপর পাশ থেকে বেশ অনেক কিছুই বলল আরমানকে। ধীরে ধীরে আরমানের কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় হলো। বিস্ময় ভাব আরো বাড়লো। বিষয়গুলোকে যেন মেলাতে পারছে না।

রেখে দিলে ভদ্র মহিলা ফোনটা। এই শীতের দিনেও আরমান খেয়াল করল যে ও ঘামছে। বিছানা থেকে নেমে গিয়ে ফ্যানটা ছেড়ে দিল। আবারো বিছানয় এসে হাত-পা বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। মনে পড়ে গেল আরজুর বলা সেদিনের কথা।

সত্যি আরজু ধীরে ধীরে আরমানের কাছে রহস্যময়ী হয়ে উঠছে। কেন গিয়েছিল ওখানে আরজু আর কেনই বা আরমানের খোঁজ করছিলো? তবে কি আরমান যা সন্দেহ করছিল তাই ঠিক? সেদিন ওই বস্তিতে আরজু গিয়েছিল অন্য কোন দরকারে, কোন প্রাইভেট পড়াতে না। তবে কি করে আরমানের চোখে চোখ রেখে নিঃসংকোচে ওভাবে মিথ্যে বলে গেল? একটুও ভয় করলো না, একটুও দৃষ্টি কাঁপলো না? আরমান তো পারত না বলতে তবে আরজু কি করে বলল?

নিজেই দু হাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো আরমান। ফ্যানের বাতাসে গা শিউরে উঠলো। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরছে। কার থেকে এর উত্তর চাইবে জানে না।

“কোন রহস্যে নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছেন আপনি আরু? এই রহস্যের জটলা আমি খুলবো কি করে?”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প