ভোরের দিকে আরজুর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙার সাথে সাথে খুব চটপট করে উঠে বসলো। বিছানা থেকে নেমে গিয়ে হাত মুখ ধুঁয়ে এসে বই নিয়ে বসে পড়লো। তবে পড়া শুরু করতে পারলো না। কিছুক্ষণ ওভাবেই ঝিম ধরে বসে থাকলো। কিছুক্ষণ পর কানে ফজরের আযান এলো। ততক্ষণে বুঝতে পারলো এখন সবেমাত্র ভোর হচ্ছে। আরজু মনে মনে ভাবলো তবে কি ও মাঝ রাতেই উঠে পড়েছিল? তাহলে ঘুমিয়েছে কতক্ষণ? পড়াশোনা শেষ করে রাতে ঘুমোতে ঘুমোতেই তো একটা পার হয়ে গিয়েছিল। আবার এত তাড়াতাড়ি উঠেও গেল!
আরজু এসব ভাবতে ভাবতে দেখলো ইরা উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওযুও করে এসেছে। হিজাবটা পড়তে পড়তে হাসি হাসি মুখে আরজু কে বলল,
“নামাজ পড়বেনা আরজু? যাও ওযু করে এসো। নামাজ পড়লে ভালো লাগবে।”
আরজু বাধ্য মেয়ের মতন মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ নেমে গেল বিছানা থেকে। ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নিলো। আরজুর নামাজ শেষ হওয়ার আগেই ইরার নামাজ শেষ হলো। ইরা দুজনের জন্য দু কাপ চা বানিয়ে আনলো। আরজু নামাজ শেষে উঠে বিছানায় গিয়ে বসলো। ইরা ওর দিকে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিতেই আরজু ইতস্তত গলায় বলল,
“আমার জন্য বানিয়েছো কেন? আমি তো চা, চিনি কিছুই কিনিনি।”
"কেনোনি জন্য কি আমিও দিতে পারবো না?”
“কিন্তু এমনিতে কেন দেবে? তোমারও কি আমার থেকে কিছু চাওয়ার আছে? তুমি কিছু নেবে আমার থেকে ইরা আপু?”
ইরার খুব অদ্ভুত লাগলো আরজুর কথা। প্রশ্ন করল,
“তোমার কেন মনে হলো আমি এমনিতে দেব না? আর আমি তোমার থেকে যে কিছু চাইবো সেটাই তোমার কেন মনে হলো?”
আরজু বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল,
“কেউ কিছু দিলে তার পরিবর্তে অবশ্যই কিছু না কিছু নেয়। আর কিছু না নিলে কিছু দেয় না কেউ। তাহলে তুমিও দেবে কেন? কোন কিছুর বিনিময় ছাড়া তো কেউ আমাকে কখনো কিছু দেয়নি।”
এবার ইরা আরজুর কথার মানেটা বুঝলো।নিঃস্বার্থভাবে আরজুর উপকার করবে এমন কাউকে হয়তো আরজু কখনো পায়নি জীবনে। সেজন্য এই বিষয়গুলো ভাবতেও পারে না যে নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিংবা কোন কিছু পাওয়ার লোভ ছাড়াও কেউ সাহায্য করতে পারে বা কোন কিছু দিতে পারে। ইরা আরজুর গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“তুমি তো আমার ছোট বোনের মত। আমি তোমায় ভালোবেসে সবকিছু দিতে চাই। এখন চা খাওয়াচ্ছি এটাও ভালোবেসে। আর ভালোবাসার বদলে শুধু ভালোবাসা দিলেই হবে, আমি আর কিচ্ছু চাই না।”
আরজু মুখে আর কিছু বলল না। চুপচাপ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে মনে মনে ভাবল,
“এইতো ভালোবাসা চাইলেই ইরা আপু। তুমি এটা বলতে পারলে না যে আমি ভালো না বাসলেও তুমি আমায় ভালোবাসবে, আগলে রাখবে। আমি ভালোবাসলে তবেই তুমি আমায় ভালোবাসবে।”
ইরা জানালার ধারে গিয়ে বসে মুনতাসির এর নাম্বারে কল করল। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোনটা রেখে দিতেই আরজু বলে উঠলো,
“তুমি খারাপ মনে না করলে একটা কথা বলি আপু?”
ইরা হেসে সায় জানালো। আরজু নিজের ভেতরে কথাগুলো সাজালো। শব্দগুলো এলোমেলো হলে কথাটা শুনতে ভালো লাগবে না। সাজানো শেষে ইরা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি এত ভালো একটা মেয়ে, নামাজ পড়ো, পর্দা করো তাহলে প্রেম করো কেন?”
আরজুর প্রশ্ন শুনে ইরা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“এই প্রেম করাটা আমার জন্য হালাল।”
আরজু কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের সাথে বলল,
“প্রেম বুঝি হালালও হয়?”
“সবার জন্য হয় কিনা জানিনা তবে আমার ক্ষেত্রে হালাল। তোমায় অন্য কোনদিন বলব হালালের কারণ, কেমন?”
আরজু আর কিছু প্রশ্ন করলো না। যেহেতু ইরা বলেছে যে অন্য কোনদিন বলবে তার মানে নিশ্চয়ই কথাটা আজ বলার মতন না। সেজন্য আরজুও আর জোর করবে না। চা টা খেয়ে কাপটা ধুঁয়ে রেখে এসে বিছানায় উঠে পড়তে বসলো। বিরবির করে পড়তে থাকলো তো পড়তেই থাকলো। ইরা কিছুক্ষণ ফোন দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
________
“পাপা! পাপা ওঠো। স্কুলে যেতে হবে। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে তো। পাপা ওঠো। আমার স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে দেবে না?”
সাত বছরের মেয়ে তাহির ডাকাডাকিতে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো তাওকির। চোখ খুলতেই তাহির মিষ্টি মুখটা দেখে তাওকিরের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কাছে টেনে নিল। তাহিও বিছানায় উঠে বাবার পাশে শুয়ে পড়ল।তাওকির মেয়ে কে জড়িয়ে ধরে কম্বল দিয়ে ঢেকে নিল। কিছুক্ষণের মাঝে হিমি এসে রাগান্বিত স্বরে দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দুজনের একজনেরও কি কাজ নেই? তাওকির তোমায় অফিস যেতে হবে না? আর এই যে তাহি তোমায় স্কুলে যেতে হবে না? তোমায় আমি পাঠালাম তোমার পাপাকে ঘুম থেকে তোলার জন্য আর তুমিও ঘুমিয়ে পড়েছো?”
তাহি নিজের ফোকলা দাঁতগুলো বের করে হেসে বলল,
“পাপাকে উঠতে বলেছিলাম পাপা ওঠেনি। উল্টাে আমাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।”
হিমির সব রাগ গিয়ে এবারে পড়লো তাওকিরের উপর যে এখনো নির্বিকার ভঙ্গিতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। বেড সাইডের উপরে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি তাওকিরের মুখে ছিটিয়ে দিতেই তাওকির লাফ দিয়ে উঠে বসলো। উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
“পানি কি করে এলো? কি হয়েছে?”
“এখনো কিছুই হয়নি কিন্তু এবার যদি তুমি ঘুম থেকে না উঠেছো তবে অনেক কিছু হবে কিন্তু। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে নিজে ফ্রেশ হয়ে মেয়েকে ফ্রেশ করো। বানিয়েছো তো একটা বাঁদর, আমার একটা কথা শোনে না। এখন ওকে খাবার খাইয়ে, স্কুল ড্রেস পরিয়ে, ব্যাগ গুছিয়ে স্কুলে রেখে আসবে। তারপর আমার সাথে তোমার বাদ বাকি কথা হবে।”
কথাটা বলে হিমি চলে যেতে নিলে তাওকির ওর হাত ধরে এক টানে বিছানায় বসালো। দুহাতে পিছন থেকে হিমিকে জড়িয়ে ধরে কাঁধের উপর থুতনি রেখে ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলল,
“সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আগে যেমন মেয়ের মিষ্টি মুখটা দেখতে ভালো লাগে ঠিক তেমনি তোমার মিষ্টি কন্ঠটা শুনলেও ভালো লাগে হিমি। এত রাগ দেখাও কেন আমায়? ভয় লাগে না আমায় দেখে?”
হিমি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“ভয় পাওয়ার কি আছে তোমায় দেখে? তোমার সাহস আছে নাকি আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলার?”
“তাই? বলবো নাকি উঁচু গলায় কথা?”
হিমি গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“বলতেই পারো। তারপরে আমি যখন কথা বলা বন্ধ করে দেবো তখন কেউ যেন এসে আমার হাত পা ধরা শুরু না করে।”
ওদের কথাবার্তায় তাহি ভীষণ বিরক্ত হলো। পাশে তো ও বসে আছে ওকে কেউ গুরুত্বই দিচ্ছে না।
অভিমান জড়ানো গলায় তাওকির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“পাপা এখানে তো আমিও আছি। তুমি শুধু মাম্মামের সাথে কথা বলছ কেন?”
তাওকির যেন অল্প কিছু সময়ের জন্য ভুলেই গিয়েছিলো যে পাশে মেয়েও বসে আছে। তাহির কন্ঠ কানে যেতেই হিমি কে ছেড়ে দিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“সরি আম্মু ভুলে গিয়েছিলাম।”
“ঠিক আছে এখন চলো না হলে স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।”
তাওকির একবার ঘড়িতে সময় দেখে নিল। এখনো তো অনেকটা সময় হাতে আছে অথচ মা, মেয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে দিয়েছে। তাওকির কাউকে কিছু বলল না। নিজে আগে বিছানায় শুয়ে একটানে হিমি কেও শোয়ালো। তারপর কম্বল দিকে ওকে পেঁচিয়ে ধরে তাহিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মু তুমি তোমার মাম্মাম কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ো। এখন না কোন স্কুল, না কোন অফিস।”
হিমি ব্যস্ত গলায় তাওকিরের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে বলল,
“কি করছো ছাড়ো। দরজা খোলা আছে।”
“কেউ আসবে না। আর এলেও সমস্যা নেই। আমি তোমায় নিয়ে একা ঘুমিয়ে নেই, তাহিও আছে। আর দিনের বেলায় কিছুই করবো না তোমার সাথে চিন্তা নেই। চুপচাপ আমাকে ঘুমোতে দাও।”
“আচ্ছা ঠিক আছে তুমি ঘুমোও কিন্তু আমাকে উঠতে দাও। অনেক কাজ আছে।”
তাওকির ছাড়লো না হিমি কে। হিমির লম্বা সিল্কি চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে নেশালো গলায় হিমির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে জড়িয়ে না ধরলে তো আমার ভালো ঘুমই হয় না। তোমার চুলের গন্ধে আমি অভ্যস্ত। আমার বদ অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা। একটু থাকো আমার কাছে, একটু পরে ছেড়ে দেব।”
হিমিও আর কিছু বলল না। চুপচাপ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলো। এইতো হিমির শান্তির সংসার যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বাস কোন কিছুর অভাব নেই। কোন শান্তির অভাব নেই, কোন স্বস্তির অভাব নেই, কোন আনন্দের অভাব নেই। হিমির নিজের হাতে গোছানো ভালোবাসার সংসার।
______
টুকটাক বাজার শেষে বস্তির ধারে নিজের ছোট্ট বাড়িটাতে ফিরছে ফারহানা। একদম কাছাকাছি আসতেই মোড়ের একটা ছোট্ট দোকানে দেখল বেশ কিছু অপরিচিত ছেলেপেলে দাঁড়িয়ে। ফারহানা জানে এরা এখানকার স্থানীয় না তবে বেশ কিছুদিন হলো এদের আনাগোনা বেড়েছে। ছেলেগুলো কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে বখাটে। কিন্তু কেন এদের এত আনাগোনা হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে না। ফারহানার এসব ভাবনার মাঝে ছেলেগুলো সেই দোকান থেকে চলে গেল। ফারহানা দোকানি কে চেনে। টুকটাক জিনিস এই দোকান থেকেই কেনাকাটা করে, দোকানির সাথেও বেশ ভালোই পরিচয় আছে। তাই ভাবলো আজ একটু গিয়ে শোনা যাক যে ওরা কি জিজ্ঞেসা করে? কে ওরা উনি জানেন কিনা কিছু।
দোকানে গিয়ে দোকানি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাই এক প্যাকেট লবণ আর হলুদের গুঁড়ো দেবেন।”
দোকানি সেগুলো ফারহানার হাতে দিতেই ফারহানা টাকা দিল। তারপরে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“একটু আগে যে ছেলেগুলো এসেছিল ওরা কারা? এর আগে তো কখনো দেখিনি। এলাকার বলে তো মনে হয় না।”
“হ। এলাকার না। আইছিলো একজনের খোঁজ করবার লাইগা। কইতেছিল চিনি কিনা ওই নামের কাউরে।”
ফারহানার মনের সন্দেহ তীব্র হলো। উৎকন্ঠিত গলায় বলল,
“কাকে খুঁজছিল?”
“এক মাইয়ারে খুঁজতেছে। নাম কি জানি কইলো ভুইলা গেছি আপা।”
“একটু মনে করার চেষ্টা করুন না ভাই কাকে খুঁজছিল ওরা।”
ফারহানার এত উৎসাহ দেখে দোকানি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“আপনের এতো উৎসাহ ক্যান আপা? চেনেন নাকি ছ্যাড়াগুলোর কাউরে?”
ফারহানা খুব তাড়াতাড়ি নিজের উৎসাহটাকে দমিয়ে ফেলে স্বাভাবিক হওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“না। আমি ওদেরকে চিনতে যাব কেন? আসলে আপনি নামটা বললে যদি আমি তাকে চিনে থাকতাম তাহলে বলতাম। আশেপাশের কেউ হয়ত।”
“ও আইচ্ছা। কিন্তু আশপাশে থাকে বইলা মনে হইল না। এইখানে যারা থাকে তাগো তো আমি চিনি। কি যেন নাম কইলো.....”
ভদ্রলোক নিজের মস্তিষ্কে যে বেশ চাপ প্রয়োগ করলেন সেটা ওনার মুখ ভঙ্গি দেখেই বোঝা গেল। ফারহানা অপেক্ষা করতে লাগলো নামটা শোনার জন্য। অবশেষে ভদ্রলোকের মনে পড়তেই বলল,
“হ হ মনে পড়ছে আপা। পুতুল নাম কইছিলো।”
নামটা শুনতেই ফারহানার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। তারমানে মনে মনে যা সন্দেহ করেছিল তাই সত্যি। এরা তবে সেই জানোয়ারেরই লোক। গলায় ঝুলিয়ে রাখা মাস্কটা ফারহানা মুখে জড়িয়ে নিল। হিজাবের কিনারার একটু অংশের সাহায্যে কপালের ঘামটুকু মুছে নিয়ে তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,
“আমি আসি ভাই পরে কথা হবে।”
“আরে আপা কইলেন না তো চেনেন নাকি এই নামের কাউরে?”
“না ভাই আমি কাউকে চিনি না এই নামে। আর ওদেরকে বলবেন না যে আমি আপনার কাছে এই বিষয়গুলো নিয়ে খোঁজ করেছি কেমন। আসলে বুঝতেই পারছেন হয়তো পরে সন্দেহ করে আবার আমাকে বিরক্ত করা শুরু করবে। আসছি।”
দোকানি আর এই নিয়ে বেশি মাথা ঘামালো না। ফারহানা ঠিকই বলেছে যদি একবার ওদের কানে যায় যে ফারহানা উৎসাহ নিয়ে শুনতে চেয়েছে পরিচয় তবে হয়তো ভাববে ফারহানা চেনে ওদের কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে। দেখেই তো বোঝা যায় বখাটে ছেলে পেলে। শেষ আবার বিরক্ত করা শুরু করে দেবে।
বাড়ির মোড়ে আসতেই দেখল একটা ঘরের সামনে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ করছে। ফারহানা নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। হাঁটার গতিও খুব স্বাভাবিক রাখলো। বেশি আস্তে হাঁটলেও যেমন সন্দেহ করতে পারে ঠিক তেমনি বেশি জোরে হাঁটলেও সন্দেহ করতে পারে। খুব স্বাভাবিকভাবে ওদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ছেলেগুলো অন্যদের সাথে কথা বলছিল বিধায় ফারহানাকে ঠিক দেখলো না। আর কেউ দেখলেও তেমনভাবে গুরুত্ব দিলো না। রাস্তা দিয়ে মানুষ হাঁটবে এটাই স্বাভাবিক।
বাড়ির তালা খুলে স্বাভাবিকভাবে ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। দরজার কাছে বসে পড়লো ফারহানা। মনে হচ্ছিল এই বুঝি ওরা ধরে ফেলল, এই বুঝি প্রাণটা বেরিয়ে গেল, এই বুঝি ফারহানার সংসার, স্বামী, সন্তান সবাইকে শেষ করে দিল ওর ভুলের জন্য।
এদিকে দরজার কাছে বসে ফারহানা কে এমন হাঁপাতে দেখে হুইল চেয়ারে বসা ওর স্বামী শফিক এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে তোমার? হাঁপাচ্ছো কেন?”
ফারহানা হিজাবটা খুলে ভয়ার্ত গলায় বলল,
“পুতুলের খোঁজ করতে করতে ওরা এসে গেছে এখান অব্দি।”
এক ভয়ংকর আতঙ্ক প্রকাশ পেল ফারহানার কন্ঠে। চোখ দুটো তে অদ্ভুত রকমের ভীতি প্রকাশ পাচ্ছে। কন্ঠ তার কাঁপছে ভয়ে।
“কারা এসেছে?”
“যাদের ভয়ে আজ এতগুলো বছর ধরে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি তারা এসে গেছে শফিক।”
শফিকও ভয় পেল তবে এখন যদি সে নিজেও নিজের ভীতিটা প্রকাশ করে তবে ফারহানা আরো ভয় পেয়ে যাবে। ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না, কিচ্ছু হবে না। ওরা চিনতে পারবে না আমাদের।”
ফারহানা এবারে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আর যদি চিনে ফেলে? ওরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করছে পুতুল নামের কাউকে চেনে কিনা।”
“চিনবে না তো এই নামে কাউকে খুঁজলেও।”
“যদি ওরা আমাদের বাড়িতেও খোঁজ করতে আসে?”
“সেসব তখন দেখা যাবে।”
“আমার ভয় করছে শফিক।”
“বললাম তো কিছু হবে না। আর এমনিতেও আমার মনে হয় ওরা আসবে না। এলে এতক্ষনে চলে আসতো।”
ফারহানা নিজের ভয় কমাতে পারেনা। মনের মাঝে একটা চাপা ভীতি কাজ করতেই লাগলো। শুধু বারবার মনে হচ্ছে কখন না জানি ওরা এসে দরজায় করাঘাত করবে। কখন না জানি জিজ্ঞেস করবে পুতুল নামে কাউকে চেনেন?
_______
ভার্সিটিতে এসে আরমানের খোঁজ করলো আরজু। সেই প্রথম দিন ভার্সিটিতে যখন আরমানের সাথে দেখা হয় তখন ওর সাথে একটা ছেলেকে দেখেছিল তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল আরমান কোথায় আছে। অন্য কাউকে আর জিজ্ঞেস করেনি। এই একটা পরিচিত মুখ দেখেছিল জন্য জিজ্ঞেস করেছে। ছেলেটা বলল অডিটোরিয়ামে আছে।
আরজু প্রশ্ন করল,
“সেখানে কি আরো অনেক মানুষ আছে?”
ছেলেটা একটু ভাবনা চিন্তা করে উত্তরে বলল,
“না এখন মনে হয় আর কেউ নেই। একটু আগে ছিল। তবে ভাষণ তো শেষ আপনি যান ফাঁকাই আছে। থাকলেও দু-চার জন ছেলেপেলে থাকতে পারে। তবে আপনি যদি ভাইয়ের সাথে একান্তে কথা বলতে চান তবে ভাই ওদেরকে বের করে দেবে। চিন্তা করবেন না আমাদের ভাই মহান মানুষ। তার বিচার বিবেচনাই আলাদা।”
আরজু চুপচাপ চলে যেতে নিলে ছেলেটা পিছন থেকে একবার আপু বলে ডাকল। আরজু ঘুরে তাকাতেই ছেলেটা হাসি হাসি মুখ করে বলল,
“দেখুন আপু আপনি ভাইয়ের কাছে যাচ্ছেন তার নিশ্চয়ই কোন সাহায্য পাওয়ার জন্য। নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পেরেছেন আমাদের ভাই অনেক ভালো মানুষ। তাই বলছি ভাইকে আপনাদের জন্য কাজ করতে সহযোগিতা করুন। ভোটটা কিন্তু আমাদের ভাইকেই দেবেন। একদম আপনাদের জীবন বদলে দেবে ভাই। কি চান আপনারা সব এনে দেবে ভাই আপনাদেরকে।”
“শান্তি এনে দিতে পারবেন আপনার ভাই?”
বেশ স্বাভাবিক গলায় আরজু প্রশ্নটা করল। তবে ছেলেটা একটু থতমতো খেয়ে বলল,
“ইয়ে মানে হ্যাঁ পারবে।”
“আপনার ভাইও মিথ্যে কথা বলে, আপনিও মিথ্যে কথা বলেন। আপনারা সবাই মিথ্যেবাদী। জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বস্তুটাই হচ্ছে শান্তি যেটা কেউ কখনো কাউকে এনে দিতে পারে না বুঝতে পেরেছেন? আর নিজের ভাইয়ের নামে যে এত প্রশংসা করছেন, ওনাকে এত ভালোবাসেন তবে একটা ভোট ভিক্ষা চাইছেন কেন বারবার? ভরসা নেই ওনার উপর? এতই যদি উনি যোগ্য হয়ে থাকেন তবে ভোট ভিক্ষে কেন চাইতে হচ্ছে আপনাকে?”
“আপু আসলে আমি ভিক্ষে চাইনি তো। সবাইকে যেভাবে বলি সেভাবেই বলছি আপনাকে।”
“কাউকে এভাবে বলবেন না। আপনি ওনার সম্মান নষ্ট করছেন। আমি এখনই গিয়ে ওনাকে বলব যে আপনি আমাকে কি কি বলেছেন।”
কথাটা বলে আরজু চলে যেতে নিলে ছেলেটা তাড়াহুড়ো করে সামনে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু মুখ করে বলল,
“এই আপু দাঁড়ান। আমি আপনাকে কি বলেছি? কিছুই তো বলিনি শুধু বলেছি ভোটটা ভাইকে দেবেন।”
“যা বলার সোজা ওনাকে গিয়ে বলবো। যখন একবার বলেছি ওনাকে বলব তার মানে ওনাকেই বলবো আর কাউকে বলবো না। সামনে থেকে সরে দাঁড়ান, না হলে এটাও গিয়ে বলে দেব।”
ছেলেটা সত্যি আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না, সরে দাঁড়ালো। তবে মনে মনে ভীষণ ভয় পেল। কে জানে মেয়েটা গিয়ে কি উল্টোপাল্টা বলবে আরমানকে। এখন যদি ছেলেটা আগে আগে গিয়ে কিছু বলে তাহলে আরমানের কাছেও উল্টো আরো বেশি ঝাড়ি খাবে। তাই সবকিছু নিজের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
______
অডিটোরিয়াম এর ভেতরে একবার উঁকি দিল আরজু। তবে কোথাও আরমানকে দেখতে পেল না। অবশ্য এক জায়গায় দেখল বেশ অনেক জন ছেলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে বোধহয় কেউ বসে আছে। আরজু বুঝতে পারছে না এতগুলো ছেলের মাঝে ভেতরে যাওয়া উচিত হবে কি হবে না। কিন্তু আরমানের সাথে কথা বলাটা তো জরুরী। আজ যদি এই কথাগুলো না বলে তবে সারারাত ঘুম হবে না, পড়াশোনাতেও মনোযোগ আসবে না। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেষে গুটি গুটি পায়ে ভেতরে এলো। অবশ্য ছেলেগুলো আরমানকেই ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারলো না। চুপচাপ পুতুলের ন্যয় দাঁড়িয়ে থাকলো। ছেলেগুলোর মাঝে একজনের নজর পড়লো আরজুর উপরে। ছেলেটা একটু গম্ভীর গলাতেই আরজু কে প্রশ্ন করলো,
“কি চাই?”
হঠাৎ প্রশ্ন করাতে আরজু একটু কেঁপে উঠলো। তৎক্ষণাত জবাবে বলল,
“আপনাদের ভাইকে।”
ছেলেটা গম্ভীর গলায় বলল,
“ভাইকে চাই মানে কি? সে তো সবাই ভাইকে চায় তার মানে কি ভাইকে দিয়ে দেব নাকি? যান তো এখান থেকে।”
ব্যাপারটা আরজুর আত্মসম্মানে লাগলো। এভাবে চলে যেতে বলল কেন? জায়গাটা কি ওর একার? এই জায়গাটা তো সবার তবে ও কোন সাহসে যেতে বলল? কিঞ্চিত রাগী গলায় বলল,
“জায়গাটা আপনার নামে লেখা নেই। আপনি আমাকে এখান থেকে চলে যেতে বলতে পারেন না। তার থেকেও বড় কথা আমি আপনাদের ভাইকে চাই বলতে বুঝিয়েছি আমি ওনার সাথে কথা বলতে চাই। আপনাদের মাঝখানে কি আপনাদের ভাই বসে আছে?”
কন্ঠটা শুনেই আরমান বুঝতে পেরেছিল যে আরজু এসেছে। ইচ্ছে করে কিছু বলেনি। শুধু আরজুর কথাগুলো শুনছিল আর মিটিমিটি হাসছিলো। তবে এবারে আর চুপ থাকতে পারলো না। একটু ভাব নিয়ে গম্ভীর গলায় ছেলেদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সামনে থেকে সর তো তোরা। কে আমাকে চাইছে সরি কে আমার সাথে কথা বলতে চাইছে আমিও একটু দেখি।”
ছেলেগুলো সরে গেল আরমানের সামনে থেকে।
ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর গায়ে জড়ানো কালো রংয়ের শাল। পায়ের ওপর পা তুলে চেয়ারে বসে আছে। বেশ রাজকীয় ভঙ্গিতেই বসে আছে আরমান। অন্যান্য দিন পাঞ্জাবির সাথে একটা সানগ্লাসও ঝুলিয়ে রাখে তবে আজ সেটা দেখা যাচ্ছে না। ভুলে গেছে বোধহয়।সচরাচর হাতে যে সিলভার ডায়ালের ঘড়িটা পড়ে তার বদলে আজ কালো বেল্টের একটা ঘড়ি পরেছে। বোধহয় গায়ের শালটার সাথে মিলিয়ে পরেছে। চুলগুলো অনেকদিন হলো কাটা হয় না। কয়েকটা লম্বা চুল কপালের উপরে পড়ে আছে আলগোছে।
আরজু কে দেখে আরমানের ঠোঁটের হাসিটা আরো প্রশস্ত হলো।
আরজু কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরমান ভাবলো নিশ্চয়ই মুগ্ধ হয়েছে ওকে দেখে। হওয়ারই কথা। সামনে এমন সুদর্শন একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকলে কোনো নারীই মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারবেনা। সবাই তো মুগ্ধ হয় আরমানকে দেখে। ছেলেরাও হা করে তাকিয়ে থাকে সেখানে আরজু তো মেয়ে। নিশ্চয়ই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
আরমান চেয়ার থেকে উঠে কয়েক কদম এগিয়ে গেল আরজুর দিকে। একটু গর্বের সাথেই বলল,
“এভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন মিস? ক্রাশ খেলেন নাকি?”
আরজু আরমানের মাথার চুলের ওপর আঙুল তাক করে বলল,
“আপনার চুলের মাঝে গাছের শুকনো পাতা। ওটাই দেখছিলাম।”
আরমান তড়িঘড়ি করে চুলের মাঝে থেকে পাতাটা বের করে ফেলে দিল। আরজু কে আগেই কিছু বলল না। অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো নিজের দলের ছেলেগুলোর দিকে। কটমট করে বলল,
“চোখ কি বাড়িতে রেখে এসেছিস সবগুলো? এতক্ষণ ধরে আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছিস অথচ কেউ দেখলি না?”
ছেলেগুলো অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে নিল। আরমান আবারও রাগান্বিত গলায় বলল,
“বের হ সবগুলো। চোখের সামনে আসবি না কেউ। আমার মান ইজ্জত কিছু রাখলি না তোরা।”
ছেলেগুলো বেরিয়ে গেল চুপচাপ। এদিকে আরমান আরজুর দিকে তাকাতে পারছে না। কি দরকার ছিল ওভাবে বলার যে ক্রাশ খেলো নাকি? এত ভাব নেওয়ারই বা কি দরকার ছিল? কি দরকার ছিল নিজেকে নিয়ে এত গর্ব করার? দিলো তো ভেঙে আরজু সব গর্ব। বুঝিয়ে দিল তো যে ওর দিকে তাকিয়ে থাকার মতন বিশেষ কিছু নেই। আরজুর মতন মেয়েরা খুব সুন্দর ভাবে আরমানের মতন সুদর্শন পুরুষদেরকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
তবে ঘুরে না দাঁড়িয়ে কোন উপায় নেই। যেহেতু আরজু নিজ থেকে কথা বলতে এসেছে তাকে অপমান করাটা মোটেও ঠিক হবে না। ফিরিয়ে তো কোনমতেই দেওয়া যাবে না। একহাতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে আরজুর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,
“কিছু বলবেন আপনি?”
আরজু অন্য কোন কথায় না গিয়ে সরাসরি বলল,
“দুটো প্রশ্ন আছে আপনার কাছে। ভাববেন না আমি নিজ থেকে এই প্রশ্নগুলো আপনাকে করতে এসেছি। আপনি আমার মনে প্রশ্নগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাহলে এগুলো সমাধান করার দায়িত্ব আপনারই। সেজন্য এসেছি।”
“এত অজুহাত দিতে হবে না। কি জানতে চান বলুন।”
আরজু একটু নড়ে চড়ে উঠে বলল,
“প্রথমত, সত্যি কি পৃথিবীতে অনেক কে বিশ্বাস করা যায়? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন, সত্যি কি সবাই অপেক্ষা করে থাকে যে কোন নির্দিষ্ট একটা মানুষ এসে তার জীবন গুছিয়ে দেবে?”
মুখে হালকা হাসলেও ভেতরে ভেতরে আরমান ভীষণ খুশি হলো। আরজুর বিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার আরমান ধরে ফেলেছে। আর সেটা হলো মেয়েটার মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দিতে হবে। যত প্রশ্ন জাগাতে পারবে মেয়েটা ঠিক ততই উত্তর খোঁজার জন্য বারবার আরমান এর কাছে ছুটে আসবে। আর এই সুযোগই কাজে লাগাতে হবে আরমানকে। আরমানকে চুপচাপ হাসতে দেখে আরজু বলে উঠলো,
“আমি আপনাকে উত্তর দিতে বলেছি, হাসতে বলিনি। উত্তর দিন।”
আরমান আবারো অপমানিত হলো। কেমন যেন মেয়েটা। একটু হাসতেও দেবে না? ও কি আর জানে নাকি যে আরমান কেন হাসছে।
তবে নিজের অপমান নিয়ে এখন আর বেশি মাথা ঘামালো না। আরজুর প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ঠিকঠাক উত্তর দিতে হবে সেই সাথে আবার নতুন করে ওর মনে প্রশ্ন জাগাতে হবে।
“আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেই। অবশ্যই পৃথিবীতে অনেক কে বিশ্বাস করা যায়। আপনি একবার ভেবে দেখুন তো আপনি কি আপনার বাবা মাকে বিশ্বাস করেন না?”
“না করি না।”
আরমান ভীষণ ভরকালো, ভীষণ চমকালো, ভীষণ অবাক হলো। এ আবার কেমন মেয়ে যে নিজের বাবা মাকে বিশ্বাস করে না? না এর মাথার অবশ্যই সমস্যা আছে। এই মেয়ে সুস্থ হতেই পারে না। এই পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ আছে নাকি যে নিজের বাবা মাকে বিশ্বাস করতে পারে না?
“অদ্ভুত কথা বললেন। বাবা মাকে কেন বিশ্বাস করতে পারবেন না? ওনারা জন্ম দিয়েছে আপনাকে।”
“জন্ম দিয়েছে জন্যই যে বিশ্বাস করতে পারবো এমন কি কোনো কথা কোথাও লেখা আছে? ওনারা আমায় বিশ্বাস করে না তাই আমিও ওনাদেরকে বিশ্বাস করি না। আপনি করেন আপনার বাবা মাকে বিশ্বাস?”
“অবশ্যই। আমার বাবা-মা আমার জীবন। নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি ওনাদের। ওনারাও আমাকে নিজেদের থেকে বেশি বিশ্বাস করে। বাবা মার সাথে কারো তুলনা হয় নাকি?”
আরজু আনমনে কিছু একটা ভেবে বলল,
“মা কে একটু একটু বিশ্বাস করি কিন্তু বাবাকে একদমই না। আপনার বাবা মা মনে হয় অনেক ভালো তাই না? আপনাকে অনেক ভালোবাসে? খোঁজখবর নেয় আপনার?”
“অবশ্যই। কেন আপনার নেয় না?”
আরজু অনেকক্ষণ ভাবলো বলবে কি বলবে না। সব শেষে ঠিক করলো বলবে না। কেন বলবে? আরমান কে হয় আরজুর? কেউ না। কথাটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“সম্পূর্ণ উত্তর পেলাম না। আপনি আমাকে যেটা জিজ্ঞেস করেছেন সেটার নেগেটিভ উত্তর পেয়েছেন তাহলে আবার ভালোভাবে বোঝান।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“দেখুন আমার জীবনে যেই সম্পর্ক গুলোর গুরুত্ব আমার কাছে খুব বেশি মানে যারা আমার কাছে বিশ্বস্ত তারা যে আপনার কাছেও বিশ্বস্ত হবে তেমন না। যেমন ধরুন আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে যাদেরকে আমি বিশ্বাস করতে পারি কিন্তু আপনার তেমন কেউ নেই হয়ত। আবার আপনি বলেছিলেন আপনার আপা কে বিশ্বাস করেন কিন্তু আমার একটা ভাই আছে যাকে আমি বিশ্বাস করিনা। আবার এই যেমন আমি আমার বাবা মাকে বিশ্বাস করতে পারি কিন্তু আপনি পারেন না। আমি কি বোঝাতে পারলাম?”
“আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“সেটা তো আপনার নিজেকেই বের করতে হবে।”
আরজু এবারে হালকা রাগান্বিত গলায় বলল,
“অদ্ভুত তো! আপনি প্রশ্নটা আমার মনের মধ্যে জাগিয়েছেন মানে আপনিই উত্তর দেবেন।”
“বেশ তবে আমাকে সুযোগ দিন বোঝার।”
“মানে?”
“মানেটা হলো আমাকে আপনাকে বোঝার সুযোগ দিন। আপনি আদৌ এটা চান কিনা যে কেউ একজন এসে আপনার জীবনটা গুছিয়ে দিক এটা আমায় বুঝতে গেলে তো আপনাকে বুঝতে হবে তাই না? তাহলে আমায় আপনার সাথে নিয়মিত দেখা করতে হবে, কথা বলতে হবে, আপনার নিজের মনের কথাগুলো আমাকে বলতে হবে তারপর আমি ধীরে ধীরে আপনাকে বুঝতে পারব, জানতে পারব। তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তরটা দিতে পারব তাই না? তাহলে বিকেলে পার্কে দেখা করি?”
আরজু কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আরমানের দিকে। আরজুর দৃষ্টিতে আরমানের ভেতরে থাকা সবকিছু ওলোটপালোট হচ্ছিল ঠিকই তবে নিজেকে খুব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। ভয় পেল আরজুর দৃষ্টিতে তবুও সেটা প্রকাশ করতে চাইলো না। মুখে ফুটিয়ে রাখলো হাসি। বেশ অনেকক্ষণ আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকার পর আরজু কাট কাট গলায় বলল,
“বুঝতে পেরেছি আমি, আপনি ইচ্ছে করে এমনটা করছেন। আপনি আমাকে এমন জটিল সব প্রশ্নের প্যাঁচে ফেলেছেন যেগুলোর কোন সত্যতা নেই, যেগুলোর উত্তর আপনার কাছেও নেই। আপনি আমাকে বিভ্রান্ত করে আমার সাথে কথা বলতে চাইছেন, আমার সময় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মোট কথা আপনি ষড়যন্ত্র করছেন। রাজনীতিতে যেমন নোংরা ষড়যন্ত্র করেন ঠিক তেমনি আমার সাথেও সেই নোংরা কোন ষড়যন্ত্রই করার চেষ্টা করছেন।”
ধরা পড়ে গিয়ে আরমানের মুখটা চুপসে গেল। হ্যাঁ এটা ঠিক যে আরমান ষড়যন্ত্রই করেছে কিন্তু তাই বলে নোংরা ষড়যন্ত্রণা না। কোথায় রাজনীতির ষড়যন্ত্র আর কোথায় ভালোবাসার ষড়যন্ত্র। মেয়েটা কার সাথে কিসের তুলনা করছে।
অসহায় মুখে আরমান বলল,
“কি বলছেন আপনি? আপনার সাথে রাজনীতি করতে যাব কেন?”
“জানিনা। তবে আমার ভুল হয়েছে আপনার কাছে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আসায়। আমি আগে বুঝতে পারিনি আপনার ষড়যন্ত্রটা।”
আরমান আরো কিছু বলতে নেবে তার আগেই একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো দুজনের কানে। কন্ঠটা দুজনেরই পরিচিত আর দুজনকে উদ্দেশ্য করেই আগন্তুক সম্বোধন করলো।
“আরে আরজু তুমি এখানে? আরমান ভাই আপনিও?”
দুজনে একযোগে পিছন ফিরে তাকালো। মুনতাসির দাঁড়িয়ে আছে। সেও ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরেছে। মাথায় সাদা টুপি আর মুখে বরাবরের ন্যয় সেই স্নিগ্ধ হাসি। পাঞ্জাবির উপরে কোন শীত বস্ত্র পরেনি। হয়তো পাঞ্জাবির নিচে পরেছে সেজন্য একটু মোটা মোটা লাগছে। মুনতাসির এগিয়ে এসে সবিনয়ের সাথে দুজনকে উদ্দেশ্য করেই সালাম দিল। করমর্দনের উদ্দেশ্যে আরমানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাঁধে কাঁধ মেলালো।
এবারে দুজন কে উদ্দেশ্য করেই বলল,
“আপনারা দুজনে এখানে? চেনেন নাকি একে অপরকে আপনারা? আরজু কে হয় আপনার আরমান ভাই?”
আরমানকে কষ্ট করে কিছুই বলতে হলো না। আরজু নিজ থেকেই বলল,
“কেউ না।”
আরমান একটুও অবাক হলো না। আরজুর থেকে এই উত্তরটাই প্রত্যাশিত। অবশ্য কিইবা পরিচয় দেবে? সত্যিই তো আরমান কেউ হয় না আরজুর। তবে সেটা এমন সরাসরি না বললেও পারতো। বললেই তো হতো পরিচিত কিংবা বন্ধু কিংবা সিনিয়র। যদি বলতো ওর পিছনে পড়ে আছে তাও হয়তো আরমান শান্তি পেত কিন্তু এভাবে 'কেউ না' বলে কেউ? কষ্ট হয় না নাকি আরমানের?
মুনতাসির আবারো কিছু প্রশ্ন করার আগে আরমান নিজে থেকেই বলে উঠলো,
“কেউ না বলতে পরিচিত। তা তুমি কি করে চেন ওনাকে মুনতাসির?”
“আরজু কে তো অনেক আগে থেকেই চিনি আমি ভাই। বেশ ভালো সম্পর্ক ওর সাথে।”
আরমান সন্দেহী দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওর সাথে আপনার ভালো সম্পর্ক? আপনি না বললেন আপনি কাউকে বিশ্বাস করেন না তবে মুনতাসির এর সাথে ভালো সম্পর্ক হলো কি করে?”
আরজু সহজ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“উনি ভালো মানুষ। আপনার মতন ষড়যন্ত্র করে না, আপনার মতন প্যাঁচালো না, মিথ্যেও বলে না। আপনার মতন আমার পেছনেও ঘোরে না, আপনার মতন আমাকে বিরক্তও করে না।”
লজ্জায়, অপমানে আরমান নিজেই দু হাতে নিজের মুখ ঢেকে নিল। মুনতাসির কত সম্মান করে আরমান কে আর সেই মুনতাসির এর সামনে আরজু আরমানের সম্মানের একদম বারোটা বাজিয়ে ছাড়লো।
এদিকে আরমানের উপর আরজুর এতো ক্ষোভের কারণটা মুনতাসিরের অজানা। যে কথাগুলো আরমানের নামে বলল সেগুলো একটাও তো ঠিক না। আরমান তো অনেক ভালো মানুষ সেটা আর কেউ জানুক বা না জানুক মুনতাসির জানে। আরজুর ভুলটা ভাঙানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“তুমি ভুল ভাবছো আরজু। আরমান ভাই অনেক ভালো মানুষ। উনি মিথ্যে বলবেন কেন? আর মেয়েদেরকে বিরক্ত করার স্বভাব তো ওনার থাকতেই পারে না।”
“তবে কি বলতে চাইছেন আমি মিথ্যে বলছি?”
মুনতাসির থতমত খেয়ে বলল,
“না তেমনটা বলিনি।”
“হয় ওনাকে মিথ্যেবাদী বলতে হবে নয়তো আমাকে মিথ্যেবাদী বলতে হবে। বলুন কাকে আপনি মিথ্যেবাদী বলবেন?”
মুনতাসির এবারে পড়ে গেলে ঘোর বিপদে। মনে মনে কয়েকবার আল্লাহকে স্মরণ করলো ওকে এই বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য। আড়চোখে একবার আরমানের দিকে তাকাতেই আরমান ওকে কিছু একটা ইশারা করলো। হয়তো বলল যে আরমান কেই মিথ্যেবাদী বলতে।
তবে মুনতাসির তো এমনটা করতে পারবে না। সজ্ঞানে কিংবা নিজের অজান্তে কখনোই আরমানকে অসম্মান করবে না। আর মিথ্যেবাদী বলা তো দূরের কথা।
“আসলে আরজু ব্যাপারটা তো আমার সম্পূর্ণ অবগত নয় তাই আমি এখনই কাউকেই মিথ্যেবাদী বলে দাবি করছি না।”
“অন্যায় কে সাপোর্ট করাও কিন্তু এক প্রকারের অন্যায়। আরেকটা কথা আপনাকে বলি, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। আমার মতে জীবনে সফলতা অর্জনের সর্ব প্রথম একটা ধাপ হচ্ছে অসৎ সঙ্গ পরিত্যাগ করা। আসছি।”
কথাটা বলে আরজু চলে যেতে নিয়েও থেমে গেল। আরমান ভয় পেল। এই মেয়েটাকে দেখেই ভয় হয়, না জানি আবার কি সব বলার জন্য থামল।
আরজু মুনতাসিরের দিকে আর তাকালো না, সরাসরি আরমানের উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গম্ভীর গলায় বলল,
“ক্রাশ শব্দটা খুবই বাজে একটা শব্দ লাগে আমার কাছে। একটা কথা মনে রাখবেন কাউকে ভালোলাগার হলে কখনো তার সৌন্দর্য দেখে ভালো লাগে না। যাকে আপনার ভালো লাগবে সেই আপনার কাছে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যের অধিকারী মানুষ হয়ে দাঁড়াবে। নিজেকে নিয়ে এত গর্ব করতে নেই। মনে রাখবেন সবার চোখে সৌন্দর্যের সঙ্গা আলাদা। অনেকে যেমন আপনার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে ঠিক তেমনি অনেকে খুব অনায়াসেই আপনার উপর থেকে এক সেকেন্ডের মাঝে দৃষ্টি সরিয়ে আপনার সেই সৌন্দর্যের অহংকার কে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।”
কথাগুলো বলে আরজু এবারে চলে গেল। আরমান ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো। আজ আবারো আরজু নামক একটা ঝড় বয়ে গেছে আরমানের উপর দিয়ে যে ঝড়টা তান্ডব চালিয়ে ছেড়েছে। তবে আরমান একটা বিষয় উপলব্ধি করলো আরজুর বলা প্রত্যেকটা কথা সত্য। অন্তত শেষের কথাগুলো। সত্যিই তো সবার চোখে সৌন্দর্যের সঙ্গা আলাদা। ঠিক যেমন আরজু আরমানের সৌন্দর্যের অহংকারকে ধূলিসাৎ করে দিল।
মুনতাসির চেয়ার টেনে আরমানের পাশে বসলো। চোখে মুখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই আসলে ব্যাপারটা কি বলা যাবে আমায়?”
আরমান চেয়ারের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে অসহায় কণ্ঠে বলল,
“মুনতাসির রে, জীবনে কখনো যেই জায়গায় ফাঁসিনি এই প্রথম সেই জায়গায় এমনভাবে ফেঁসে গেলাম যে আর বেরোতেই পারছিনা। মেয়ে মানুষ এত ভয়ঙ্কর! আমার বাড়িতেও তো আমার মা আছে, আমার বোন আছে কই ওরা তো এমন না। ভাই এ মেয়ে না কোন ঝড়? এ যখনি আসে একটা তাণ্ডব চালিয়ে যায়। যাদের দেখে ভয় পাওয়ার কথা এই আরমান তাদেরকে দেখে ভয় পায় না অথচ এই মেয়ের সামনে কাঁপতে থাকে থরথর করে।”
“হ্যাঁ এটা ঠিকই বলেছেন আরজু একটু আলাদা। একটু না অনেকটাই আলাদা। ওর মতন মেয়ে আমি কখনো দেখিনি। অবশ্য এই আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্যই ওকে আমার ভালো লাগে।”
আরমান তৎক্ষনাত মাথা তুলে বসলো। গুরুতর ভঙ্গিতে মুনতাসিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভালো লাগে মানে? কেমন ভালো লাগে, কোন দিক থেকে ভালো লাগে, কি হিসেবে ভালো লাগে, কবে থেকে ভালো লাগে?”
শব্দ করে হাসার অভ্যাস মুনতাসিরের নেই। হাসলে কিঞ্চিৎ পরিমাণ তার দাঁতের অংশটুকু দেখা যায় না। হালকা একটু ঠোঁট প্রসারিত হয় কেবল। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
“ভালো তো লাগে বোন হিসেবে তবে ওকে বলা যায় না যে আমি ওকে বোন হিসেবে পছন্দ করি, রেগে যায়।”
“রেগে যায় কেন? তবে কি ও তোমায় পছন্দ করে?”
“আরে না না ভাই। ও কাউকে পছন্দ করতেই পারে না। আমি নিশ্চিত ওকে গিয়ে আপনি আমার ছবি দেখান ও চিনতেই পারবেনা আমায়। ও কখনো মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না আমার।”
“তাহলে বোন বললে রেগে যায় কেন?”
“আমার মনে হয় এটা ওর পারিবারিক কোন সমস্যা। আমি যখন প্রথম ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে বোন কেন বলতে পারবোনা ও বলেছিল ভাই বোনের সম্পর্ক সত্যি হয় না। ভাই বলতে কিছু হয় না।”
আরমান এবার বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বলল,
“এই মেয়ে বাবা-মাকেও বিশ্বাস করে না, ভাই কে নিয়েও সমস্যা আসলে সমস্যাটা কোথায়? অথচ নিজের বোনকে বিশ্বাস করে। ও নাকি পৃথিবীতে একমাত্র পর আপাকেই বিশ্বাস করে। ওর কি মানসিক সমস্যা আছে বলে তোমার মনে হয়?”
“আমি এমনটা সন্দেহ করি ভাই। তবে ওর মতন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কে কি করে মানসিক রোগী বলি? এডমিশন পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল। প্রত্যেকটা সেমিস্টারে ও প্রথম হয়। প্রত্যেকটা সাবজেক্টে ওর নাম্বার দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠে যাবে। এত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কি মানসিক রোগী হতে পারে?”
“আচ্ছা সেসব কথা বাদ দাও। তোমার কি মনে হয় ওকে আমার ওপরে দুর্বল করা সম্ভব? কোন উপায় কি তোমার জানা আছে?”
প্রশ্নটা করল ঠিকই তবে মুনতাসিরকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে আরমান নিজেই বলে উঠলো,
“আরে ধুর! তুমি কি করে জানবে? তুমি তো হলে ভদ্র সভ্য ছেলে। এসব প্রেম ভালোবাসার তুমি কিছু বুঝবে নাকি? তোমাকে প্রশ্ন করাটাই বৃথা।”
মুনতাসির মেঝের দিকে তাকিয়ে হাসলো, কিছু বলল না। আরমান আবারও প্রশ্ন করলো,
“আচ্ছা ও কি আমার থেকেও ভালো স্টুডেন্ট? মানে আমিও তো আমার ডিপার্টমেন্টে টপ করি তাহলে কি ও আমাকে চেনে না?”
“আমি যতটুকু বুঝেছি আরজু দিন দুনিয়া বিমুখ মেয়ে। ও হোস্টেলে যে রুমে থাকে আমার কাজিন সেই রুমেই থাকে। আমি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। ওর বিভিন্ন অদ্ভুত কাজকর্ম সম্পর্কে খোঁজ পেয়েছি। তবে সেগুলো আর আপনাকে বললাম না। যেহেতু ভালোবেসে ফেলেছেন তবে মনে কোনরকম সন্দেহ সংশয় রাখার দরকার নেই। ওগুলো শুনলে সত্যি আপনি মানসিক রোগী ভাবতে পারেন ওকে।”
“ওর কি কারো সাথে সম্পর্ক আছে?”
“অসম্ভব।”
“ওর ফেসবুক আইডি আছে?”
“ঠিক বলতে পারছি না ভাই। থাকলেও আমার জানা নেই।”
“মোবাইল নাম্বার আছে?”
এ পর্যায়ে মুনতাসির একটু ইতস্তত গলায় বলল,
“হ্যাঁ আছে কিন্তু আপনাকে দিতে পারবো না। আরজু অনেক ভরসা করে আমায় ওর নাম্বারটা দিয়েছে। সেই ক্ষেত্রে একজন পুরুষ মানুষকে আমি ওর অনুমতি ব্যতীত ওর নাম্বারটা দিতে পারি না।”
আরমান একটা হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,
“বুঝতে পেরেছি তোমরা কেউ আমায় সাহায্য করবে না। ঠিক আছে মুনতাসির মনে রাখবো আমি সবকিছু। একবার শুধু খবর পাই তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, ভেঙ্গে দেব। তোমার বিয়ে হতে দেবো না আমি।”
মুনতাসির আবার আলতো হেসে বলল,
“দাওয়াত খেয়ে যাবেন ভাই। আপনি আর যাই করুন বিয়েতে বাঁধা দিতে পারবেন না।”
“তুমি দেখো আমি তোমার বিয়ে কোনমতেই হতে দেব না.........”
“এই পলিটিশিয়ান!”
আরমান আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরজুর রাগান্বিত কণ্ঠস্বরটা ভেসে আসায় কেঁপে উঠলো। দুজনেই চমকে অডিটোরিয়ামের গেটের দিকে তাকালো।
আরমান ধীর গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি কি করলাম মুনতাসির?”
“কিছু না করে থাকলে ভয় পাওয়ার কোন দরকার নেই। যান শুনে আসুন কি বলছে।”
“আমি ভয় পাচ্ছি কেন?”
“মেয়েরা ভয় পাওয়ারই জিনিস ভাই।”
মুনতাসির আর আরমানের ফিসফিসের মাঝে আরজু আবারও ডেকে উঠলো। এবারে আরমান আর বসে থাকতে পারলো না। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল আরজুর দিকে। আরজু প্রথমেই সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি কি কোন অপরাধী? জেল পালানো আসামি? আপনার ব্যাপারে সবাই এত প্রশ্ন করে কেন? আপনার সাথে কথা বলেছি জন্য সবাই আমায় এসে ধরছে কেন?”
আরজু আরো কিছু বলার আগেই আরমান অনুরোধের সাথে বলল,
“প্লিজ যাই বলার বলুন কিন্তু এটা বলবেন না যে আমি লোক লাগিয়েছে আপনার পিছনে। আমি কিন্তু এখানেই বসে ছিলাম।”
“সেটা বলছি না। কিন্তু এখন প্লিজ বাইরে চলুন। একজন আমাকে বিরক্ত করছে, যেতে দিচ্ছে না। সমানে আপনার সম্বন্ধে প্রশ্ন করছে। আমি বলছি আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই কিন্তু আমার মনে হচ্ছে উনি জোর করে সম্পর্ক বানিয়েই ছাড়বেন।”
আরমানের রাগ হলো ভীষণ। কার এত বড় সাহস যে আরজুকে বিরক্ত করে তাও আবার আরমানের নাম টেনে।
“চলুন তো দেখি কার এত বড় সাহস হলো যে আপনাকে বিরক্ত করছে আমার নাম নিয়ে।”
আরমান পা বাড়ানোর আগেই তানভীর এসে হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“তোকে আর যেতে হবে না কষ্ট করে, আমিই এসে গেছি।”
তানভীরকে দেখেই আরমানের রাগটা তরতর করে বাড়লো। বুঝতে পারলো এই ছেলেই বিরক্ত করছে আরজু কে। রাগান্বিত গলায় বলল,
“সমস্যা কি তোর? আমার পিছনে কেন পড়ে আছিস?”
তানভীর দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বলল,
“তার আগে তুই বল এই মেয়েটার সাথে তোর কি সম্পর্ক? কে হয় মেয়েটা তোর? এত কিসের একা একা সময় কাটাস? কি চলছে তাওসিফ আরমান?”
আরজু শেষবারের মতন তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনাকে দেখেই আমি বুঝতে পারছি আপনার ওনার সাথে ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা আছে কিন্তু এর মাঝে ভুলেও আমাকে টানার চেষ্টা করবেন না। ফল ভালো হবে না। আসছি। যা করার আপনারা দুজনেই করুন। আর পলিটিশিয়ান, আপনাকেও বলছি আপনার নামের সাথে আমার নাম জড়ানোর চেষ্টাও করবেন না।”
একরাশ বিরক্তি আর রাগ সমেত আরজু চলে গেল। আরমানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। দুহাত বুকে গুঁজে গম্ভীর গলায় বলল,
“কি চাই?”
তানভীর শুধু হাসলো, কিছু বলল না। ভিতরে তাকিয়ে দেখল মুনতাসির বসে আছে। তবে ওদের দিকে তাকিয়ে নেই। হয়তো ওদের কথা মুনতাসির শুনতে চায় না।
আরমানকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে এসে মুনতাসিরের মুখোমুখি চেয়ারে বসলো। আরমান আর মুনতাসির দুজনেই বুঝলো আবার ঝামেলা পাকাতে এসেছে। আরমানও এসে নিজের চেয়ারে বসে পড়লো।
তানভীর ব্যাঙ্গাত্মক গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিরে আমার ভাইয়ের সাথে তোর কি দরকার? সারাদিন আমার ভাইয়ের পেছনে ঘুরঘুর করিস কেন?”
মুনতাসির যথাসম্ভব ভদ্রভাবে বলল,
“আমিও ওনাকে ভাই বলেই সম্বোধন করি। আর তোমার ভাই জন্যই যে ওনার সাথে আমার কোন দরকার হবে না এমনটা না তানভীর।”
তানভীর ব্যঙ্গাত্মক হাসলো। এবারে তার দৃষ্টি পড়লো আরমানের উপরে। তবে আরমান কে ব্যঙ্গাত্মক গলায় কিছু বলল না। রাগী গলায় বলল,
“কখনো তো আমায় ডেকে এভাবে পাশে বসিয়ে গল্প করিস না তুই। কখনো তা আমার সাথে এত হেসে হেসে কথা বলিস না। তবে ওর সাথে এত কিসের পিরীতের আলাপ তোর?”
আরমান গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি ডাকলেও কি তুই আসিস? হাজার বার ডেকে নিরাশ হয়েছি তবে কেন আবার তোকেই ডাকবো? নিরাশ হতে? আর এমনিতেও মুনতাসির কে আমার কখনো ডাকতে হয় না। ও নিজ থেকে এসে প্রতিদিন আমার খোঁজ খবর নিয়ে যায়।”
“আমি তোর ভাই, ও তোর ভাই না।”
“সেটা তো বারবার তুই ভুলে যাস তানভীর। আমি তো কখনো ভুলতে চাইনি যে তুই আমার ভাই, তুই আমার র'ক্ত। তবে হাসির কথা কি জানিস? তুই আমার র'ক্ত হয়েও আমার র'ক্ত ঝরাতে চেয়েছিস, ঝরিয়েছিসও। আর এদিকে মুনতাসির আমার র'ক্ত না হয়েও আমাকে বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়ে দিতে পারে। পার্থক্যটা এখানেই বিশাল হয়ে উঠেছে। আমার নিজের ভাই আমার জীবন কেড়ে নিতে চায় আর যাকে ভাই বলে ডেকেছি সে আমার জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনও দিতে রাজি।”
তানভীর আরমানের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“আবার ঝরাবো তোর র'ক্ত। শুধু তোর না তোর এই তথাকথিত ভাইয়ের র'ক্তও ঝরাবো। তোকে তো শুধু এবারে বাইকের উপর থেকে ফেলেছিলাম এবার দুটো কে একদম দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেব।”
কথাটা বলে তানভীর চলে গেল। আরমান আর মুনতাসির দুজনেই হতাশার শ্বাস ফেলল। ছেলেটা বড্ড বোকা। ওর প্রতি আরমানের স্নেহ কখনো বুঝতেই পারল না।