তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৮

🟢

“আরমান!”

ক্যান্টিনে বসে দলের কয়েকজন ছেলের সাথে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছে আরমান। এমন সময় পরিচিত একটা কন্ঠ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। হিয়া কে দেখতেই আরমানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আন্তরিকতার গলায় বলল,

“কেমন আছিস হিয়া? অনেকদিন পর দেখলাম। কোথায় ছিলি এতদিন?”

হিয়া মুচকি হেসে বলল,

“অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম, আপুর বাসায়।”

“ও আচ্ছা। আমি তো ভেবেছিলাম তোর বোধহয় বিয়েটিয়ে হয়ে গেল আর দাওয়াতও দিলি না।”

“এত কিছু ভেবে নিয়েছিস আমার ব্যাপারে অথচ একটা বার ফোন করে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলি না? একটা মেসেজও তো দিতে পারতি?”

আরমান বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“আসলে একটু নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম রে। তাই সেভাবে তোর খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠেনি।”

হিয়া হাসলো। মেয়েটা জানে আরমানের খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটা মিথ্যে অজুহাত দাঁড় করালো। তাই বলে নিশ্চয়ই এতটাও ব্যস্ত ছিল না যে একবার একটা মেসেজ দেওয়ার সময় পায়নি। জীবনের বাকি কাজগুলো তো ঠিকই চলেছে, কোন কিছুর জন্যই তো সময়ের অভাব পড়েনি শুধু সময়ের সংকট ঘটেছিল হিয়াকে একটা মেসেজ করে একবার খোঁজ নেওয়াতে।

যাক গে সেসব কথা। হিয়া কোন কিছু নিয়েই অভিযোগ করলো না আরমানের কাছে। অভিযোগ করার স্বভাবটা হিয়ার নেই। আর আরমানের কাছে তো অভিযোগ করার কোন মানেই হয় না। যে অনুভূতিগুলো বুঝেও অবহেলা করে তার কাছে অন্তত অভিযোগ করা যায় না।

হিয়াকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরমান নিজ থেকে বলে উঠলো,

“বস, এক কাপ চা খাওয়াই।”

“আমি চা খাই না, কফি খাওয়ার অভ্যাস।”

“ও ভুলে গেছি। তুই তো আবার বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এসব ক্যান্টিনের চা খাবি না এটাই স্বাভাবিক। তবে এখানে কফিও পাওয়া যায়, যদিও তোর বাড়ির কফির মতন হবে না তবে চলে যাবে। খাবি?”

“তুই যখন বলছিস তাহলে খাওয়াই যায়।”

আরমান নিজে গিয়ে এক কাপ কফি এনে ধরিয়ে দিল হিয়ার হাতে। ততক্ষণে দলের ছেলেগুলো কে ইশারায় চলে যেতে বলেছে সেখান থেকে। হিয়ার অপর পাশের বেঞ্চে আরমান এসে বসলো। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে হিয়া কে বলল,

“তুই নিশ্চয়ই জানিস হিয়া তোর ভাই আমার প্রতিপক্ষ?”

“জানি। তবে এসব শুনে আমি কি করবো?”

“আমার সাথে তোর এত ভালোভাবে মেশাটা বোধহয় তোর ভাই পছন্দ করবে না। একবার আশে পাশে তাকিয়ে দেখ অনেকে বাঁকা চোখে দেখছে আমাদের দুজনকে।”

হিয়া গরম কফির কাপটা পাশে বেঞ্চের উপর রেখে আলতো হেসে বলল,

“কোন নিয়মে কি লেখা আছে আমার ভাইয়া তোর প্রতিপক্ষ জন্য তোর সাথে আমি কথা বলতে পারব না? তুই তো বলিস অন্যায় কিছু না করলে কে বাঁকা চোখে তাকালো, কে সোজা চোখে তাকালো সেসব দিকে কান দিতে নেই। তবে আমায় কেন বলছিস?”

“তোর ভাইকে চিনি আমি। বাড়িতে অশান্তি করতে পারে তোর সাথে।”

“সেসব তো করেই। এই কয়দিন বাড়ি ছিলাম না জন্য শান্তিতে ছিলাম। দুদিন ধরে আবার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে।”

“ঘ্যানঘ্যান করার মতন মানুষ তো তোর ভাই না। বল চিল্লাচিল্লি করছে, হয়তো হুমকিও দিচ্ছে তোকে।”

হিয়া শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“সৎ ভাইয়ের থেকে এর বেশি আর কি আশা করব আমি বল?”

আরমানের মুখের ভিতরে থাকা চা টুকু বের হয়ে গেল। হালকা কয়েক ফোঁটা যেটুকু গলার ভেতরে গিয়েছে তাতে কাশি উঠে গেল। হিয়া তাড়াহুড়ো করে ব্যাগের ভেতর থেকে পানির বোতলটা বের করে আরমানের দিকে এগিয়ে দিল। কিছুক্ষণের প্রচেষ্টার পর আরমানের কাশি থামতেই হতভম্ব গলায় বলল,

“হামিদ তোর সৎ ভাই?”

“বাবা একজনই, মা আলাদা।”

“আর তোর আপু?”

“নিজের বোন। তবে ভাই সৎ।”

“কখনো বলিস নি তো আমায়?”

“আরে বাবা তুই হলি ব্যস্ত মানুষ তোর কাছে কি আর আমার এত গল্প শোনার সময় আছে নাকি। কি যে বলিস না আরমান?”

হিয়ার ব্যাঙ্গাত্মক কথাটা আরমান ঠিকই বুঝতে পারল। বুঝলো যে খোঁচা দিলো ওকে তবে এসব খোঁচাতে বেশি কান দিলে চলবে না। কান দিলেই সমস্যা হবে। তখন সত্যি সত্যি আরমানকে হিয়ার গল্পগুলো শুনতে হবে। ধীরে ধীরে হিয়া নিজের দুর্বলতা গুলো আরমানকে বলতে শুরু করবে। আর এক সময় আরমান হয়ে উঠবে হিয়ার শক্তি, হিয়ার দুর্বলতা সবকিছুই।

কিছু একটা ভেবে আবার হিয়াকে প্রশ্ন করল,

“ও কি খুব বাজে ব্যবহার করে তোর সাথে?”

“খুব একটা কথাই হতো না আমাদের মাঝে। তবে ইদানিং তোর ব্যাপার নিয়ে বেশ ভালোই ঝামেলা লেগে যায়। ও একটা বিষয় কোনমতেই মানতে পারে না যে আমি কেন ওর বোন হয়ে ওকে ভোট না দিয়ে তোকে ভোট দেব। আমি কেন তোর সাথে এত মিশি যেখানে পুরো ভার্সিটি জানে তুই আর ও শত্রু। একদিন চ’ড় মে’রেছিল তার জন্য অবশ্য বাবা অনেক রাগারাগি করেছিল। বাবা না থাকলে হয়তো আরো কয়েকদিন মা’রার চেষ্টা করত।”

আরমান কিছু একটা ভেবে বলল,

“তোর আমার সাথে এত কথা বলার কোন দরকার নেই। আমাকে ভোট দিতেও হবে না। এমন তো না যে তোর একটা ভোট দিয়ে আমি জিতে যাব। তার থেকে ভালো তুই বাড়িতে শান্তিতে থাক, অশান্তি করার দরকার নেই।”

“চুপ কর তো তুই। আমার জীবনে এমনি তেও হারানোর মতন কিছুই নেই, কিসের ভয় পাব? এক আছিসই তুই......”

আরো কিছু বলতে চেয়েছিল হিয়া তবে থেমে গেল। আড়চোখে একবার আরমানের দিকে তাকিয়ে দেখল আরমানকে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। চুপচাপ চায়ে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। অপমানিত বোধ করলো হিয়া। ভুল জায়গায় আবারও ভুল কথা বলে ফেলেছে। যদিও ইচ্ছাকৃতভাবে বলতে চায়নি বেরিয়ে গেছে মুখ থেকে। নিজের ভুলটা সংশোধন করে নিয়ে বলল,

“চিন্তা করিস না কিছু করতে পারবে না, বাবা আছে। আমি তো বাবারই মেয়ে, বাবা আমাকেও ভালোবাসে। আজ আসি।”

কথাটা বলে হিয়া চলে গেল সেখান থেকে। আরমান কখনোই আটকায় না হিয়া কে। কখনো একটু বলে না যে আর কিছু সময় বসে যা গল্প করি একটু দুজনে মিলে। মোটকথা আরমান পিছু ডাকতে চায় না হিয়া কে। একবার পিছু ডাকলে তো হিয়ার অভ্যাস হয়ে যেতে পারে। পরে যখন আর ডাকবে না তখন কষ্ট পাবে মেয়েটা।

ইতোমধ্যে দুই কাপ চা আরমান শেষ করে ফেলেছে। আরেক কাপ অর্ডার দিল। মাথাটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে। চারিদিকের এত চাপ আর নিতে পারছে না। মাঝে মাঝে ভাবে কেন এই রাজনীতিতে আসতে গিয়েছিল? কার মুখ দেখে রাজনীতির ভূত মাথায় চেপেছিল? পরক্ষণেই মনে হলো সাধারণ জীবন তো আরমানের কখনোই পছন্দ ছিল না। রাজনীতিতে না আসলে জীবনে কত কিছু মিস করে যেত। জীবনের আসল থ্রিলটাই তো পেত না।

“এই পলিটিশিয়ান!”

হঠাৎ করে এমন একটা অদ্ভুত ডাক কানে যেতেই আরমানের ভালো মেজাজ বিগড়ে গেল। রাগান্বিত গলায় বলল,

“কে রে?”

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আরজুর মুখটা দেখতেই আরমানের মুখটা চুপসে গেল। কিসের রাগ, কিসের বিরক্তি সব অনুভূতি হাওয়া হয়ে গেল। লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে হালকা তোতলানো গলায় বলল,

“ও আপনি! জি বলুন। আমি আসলে বুঝতে পারিনি সেজন্য ওভাবে বলে ফেলেছি।”

এত কথা শুনে আরজুর কাজ নেই। সরাসরি কাজের কথায় এসে বলল,

“আপনার টাকা ফেরত দিতে এসেছি। এই নিন আপনার বাকি টাকা।”

আরমান হাত বাড়িয়ে টাকা গুলো নিলো। আজকে আর কোন খুচরো নোট না, একদম চকচকে নোট। কিন্তু কথা হলো আরমান বুঝতে পারছে না এর পরে কথা কি করে এগোবে। আরজু যে এখনই চলে যাবে সেটা জানে আরমান। আর আরমানের সেই ভাবনাকে ঠিক প্রমাণ করে দিয়ে আরজু বলে উঠলো,

“আমার আপনার থেকে যা পাওনা ছিল আর আপনার আমার থেকে যা পাওনা ছিল সেসব মিটে গেছে। আশা করছি এরপর থেকে আমার পথে আর আপনি আসবেন না। আর আমায় বিরক্ত করা ছেড়ে দিন। পার্কটা আমার শান্তির জায়গা। এমনিতে আমার জীবনে শান্তির ভীষণ অভাব। যেটুকু আছে সেটুকু কেড়ে নেবেন না।”

আরমান হেসে উঠে বলল,

“আরে মিস কি যে বলেন না। আমি আপনার জীবন থেকে শান্তি কেড়ে নিতে যাব কেন? আমার তো অন্য কিছুই উদ্দেশ্য আছে।”

আরজু কপাল কোঁচকালো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকিয়ে সন্দেহী গলায় বলল,

“কি উদ্দেশ্য? কি চান আপনি? কার লোক আপনি? কে পাঠিয়েছে আপনাকে আমার পিছনে? আপনি কেন আমার পেছনে পড়ে আছেন? সত্যি করে বলুন না হলে আমি আপনার নামে হ্যারাসমেন্টের কেস করে দেব, ভার্সিটির অথরিটির কাছে কমপ্লেন করবো আপনার নামে।”

হঠাৎ করা আরজু কেমন উত্তেজিত হয়ে উঠলো। চোখে মুখে তার তীব্র উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তা। আরজুর হঠাৎ এমন ব্যবহারে আরমান নিজেও ভরকালো ঠিকই তবে পরক্ষণে তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। আরজু কে দেখতে মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না। হঠাৎ করেই তীব্র উৎকন্ঠা দেখা দিল আরজুর মাঝে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোন একটা বিষয় নিয়ে ভয় পেয়ে আছে। আর সবথেকে বড় কথা হলো কেন বলল যে আরমানকে কেউ ওর পিছনে পাঠিয়েছে? কেউ কি এমন আছে আরজুর জীবনে যে ওর পেছনে লোক লাগাতে পারে? কিন্তু কে সে?

আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজুর সন্দেহ আরো বাড়লো। পুনরায় উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“উত্তর দিন। কোন স্বার্থে আমার পেছনে পড়ে আছেন আপনি?”

“স্বার্থ তো অনেক বড় কিছুই। তবে এতোটুকু ভরসা রাখতে পারেন যে তাতে আপনার কোন ক্ষতি হবে না।”

“কোন ভরসায় আমি আপনাকে ভরসা করবো? আপনাকে ভরসা করবো এই প্রশ্নটা আসছেই বা কোথা থেকে?”

“আচ্ছা একটা কথা বলুন তো আমায়, আপনার কাছে ভরসার সংজ্ঞাটা কি?”

আরজু খুব চটজলদি উত্তরে বলল,

“আমার কাছে ভরসার কোন সংজ্ঞা নেই তার কারণ আমি কাউকে ভরসাই করিনা। এই পৃথিবীতে কাউকে ভরসাই করা যায় না।”

আরজুর কথায় আরমান তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কথাটা কিন্তু আপনি ভুল বললেন মিস। হ্যাঁ এটা ঠিক সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না। আপনিও হয়তো করতে পারেন না কিন্তু সবাই এমন না। এমন কিছু মানুষ আপনার জীবনেও অবশ্যই আছে যাদের উপর আপনি ভরসা করতে পারেন। কি ঠিক বললাম তো?”

“আমি শুধুমাত্র আমার আপাকে ভরসা করি। আপা ব্যতীত আর কাউকে ভরসা করি না। আর কেউ আমার ভরসার যোগ্য না।”

“আপনার কি মনে হয় না আপনি ভীষণ বোকা?”

আরমানের কথাটা আরজুর ঠিক পছন্দ হলো না। ছেলেটা কি বোঝাতে চাইছে আরজু ভীষণ বোকা? ও নিজে কি এমন করে? করে তো ওই রাজনীতি যেখানে চালাকি দিয়ে কোন কাজ নেই শুধু মনের মাঝে প্যাঁচ থাকা দরকার।

কাটকাট গলায় বলল,

“কি বলতে চাইছেন সোজাসুজি বলুন?”

“আপনি কেমন মানুষ জানেন? যে পরীক্ষা না নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে দেন। আগে একজনের পরীক্ষা নিন, তাকে পরীক্ষা দিতে দিন, তারপর সে উত্তীর্ণ হলো কি হলো না সেটা বিবেচনা করে ফলাফল ঘোষণা করুন। কিন্তু আপনি এটা করেন না। আমি বুঝতে পারছি আপনার জীবনে হয়ত বেশিরভাগ মানুষ আপনার বিশ্বাস রাখতে পারেনি তার মানে এটা না যে সবাই তেমন। আচ্ছা আপনি একটা কথা ভেবে দেখুন তো এটা কি সত্যি যে পৃথিবীতে কেউ ভরসার যোগ্য না?”

আরজু কোন উত্তর দিল না। আরমানের প্রশ্নের ওর কাছে কোন উত্তর নেই। তবে আরজু তো এই ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে ওর আপাকে ছাড়া আর কাউকে ভরসা করা যায় না তবে এখন আরমানের প্রশ্নের উত্তরটা কেন দিয়ে দিতে পারছে না যে পৃথিবীতে কেউ ভরসার যোগ্য কি না?

আরজু কে চুপ করে থাকতে দেখে আরমান নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল। এই নিয়ে আর বেশি কথা বাড়াতে চাইলো না। বুঝতে পারছে এই নিয়ে বেশি কথা বললে আরজু অতিরিক্ত চিন্তা করতে পারে। ভিন্ন প্রসঙ্গে গিয়ে বলল,

“চলুন চা খাই, মাথাটা ঠান্ডা হবে।”

আরজু কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আরমানের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল,

“আপনি কি সবাইকে এই কথাটা বলেন? সব মেয়ের সাথেই কি চা খান? একটু আগেও দেখলাম একজনের সাথে চা খাচ্ছেন আর হাসতে হাসতে কথা বলছেন। এখন আবার আমাকেও সেই একই কথা বলছেন। আমি জানতাম আপনি মানুষটা ভালো না। আপনি সুযোগ নিতে চাইছেন আমার?”

একেই বলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মা’রা। আর কোন কিছু খাওয়ার মতন কি ছিল না? ছিল তো কিন্তু আরমান সেই চায়ের কথাটাই বলল। একেই তো এই মেয়েটা দেখে এক লাইন ভাবে চার লাইন। মানুষ অন্তত দু'লাইন বেশি বোঝে কিন্তু ইনি চার লাইন বেশি বোঝে। তবে আরমান মেয়েটার উপর রাগ দেখাতে পারবে না। রাগ দেখালে মেয়েটা কষ্ট পাবে আর মেয়েটা কষ্ট পেলে আরমানও একটু একটু কষ্ট পাবে।

নিজেই নিজেকে বোঝালো। রাগটাকে দমিয়ে ফেলল। শান্ত গলায় বলল,

“অবশ্যই সবাইকে খাওয়াই না। যারা বিশেষ শুধুমাত্র তাদেরকে খাওয়াই।”

আরজু আবারো প্রশ্ন করলো,

“একজন মানুষের জীবনে কতজন মেয়ে বিশেষ হয়? নাকি আপনাদের ছেলেদের স্বভাবই এমন হাজারটা মেয়েকে বলে বেড়ান যে তারা আপনাদের জন্য বিশেষ? দেখেছেন আমি বলেছিলাম কাউকে ভরসা করা যায় না। আপনারা কেউ ভরসার যোগ্য না।”

আরমান এবারে মৃদু ধমক দিয়ে বলে উঠলো,

“একদম চুপ। একটা কথা শোনে না, বোঝে না অযথা চেঁচামেচি করে। এতদিন বলছিলেন আমি মানুষ ভালো না এখন আবার বলা শুরু করেছেন আমি ভরসার যোগ্য না সমস্যাটা কি আপনার? ওই মেয়েটা আমার বান্ধবী ছিল সেজন্য চা খাইয়েছি। আর বিশেষ বলতে আপনি কি বোঝেন? বন্ধুরাও আমাদের জীবনে বিশেষ হয় বুঝতে পেরেছেন?”

আরমানের ধমক দেওয়াটা আরজুর একদমই অপছন্দ হলো। আরমানের সাহস হয় কি করে আরজুর সাথে এত উঁচু গলায় কথা বলে? কি ভেবেছে ছেলেটা আরজু কিছু বলতে পারবে না? ও রাজনীতিবিদ, ওর কাছে ক্ষমতা আছে বলে আরজু চুপ করে থাকবে? বোকা ছেলে। প্রাণের ভয় থাকার পরেও যেখানে নিজের বাবা-ভাই এমনকি ফিরোজের সাথেও তর্ক করতে ছাড়ে না সেখানে এই ছেলে তো আরজুর সামনে চুনোপুটি। ধরবে আর আছাড় মা’রবে।

নিজের ভাবনার উপর হঠাৎ করে আরজু নিজেই বিরক্ত হলো। ও কেন এই ছেলেটার কথা এত ধরছে? এই ছেলেটার এত আজেবাজে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারই কি আছে? আরজু তো নিজেই সুযোগ করে দিয়েছে ওর সাথে এই ব্যবহার করার।

বিজ্ঞাপন

আরজুর কি মনে হলো কে জানে। চুপচাপ ঘুরে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে আরমান ডেকে উঠলো,

“আরু শুনুন!”

ডাকটা কানে যেতেই আরজুর পা থেমে গেল। মনের মাঝে যে সন্দেহ গুলো তৈরি হয়েছিল সেগুলো আরো প্রখর হলো। আরমান কেন এই নামে ডাকলো? এই নামে তো বাড়ির কয়েকজন, বিশেষ করে প্রার্থনা ডাকে তবে আরমান কি করে জানলো এই নামটা?

আরজু যেন এবারে নিশ্চিত হয়ে গেল যে ফিরোজই আরমান কে ওর পেছানো লাগিয়েছে। এদিকে আরজুকে ঠাঁয় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে এগিয়ে গিয়ে আরজুর সামনে দাঁড়িয়ে অপরাধী গলায় বলল,

“দুঃখিত এভাবে কথা বলার জন্য। আসলে আমার শুনতে খুব খারাপ লাগে বারবার যে আপনি আমায় ভরসা করতে পারেন না, আমায় খারাপ ভাবেন। ট্রাস্ট মি আরু আপনি আমায় যেমন ভাবেন আমি তেমন না।”

“আরু বলে ডাকলেন কেন আমায়?”

আরমান একটু থতমতো খেল। কেন ডেকেছে নিজেও জানে না। গতকাল রাতে আরজু কে নিয়ে ভাবার সময় মনে হয়েছিল ওর নামটা ছোট করে আরু ডাকলে বেশ মিষ্টি শোনাবে। যদিও এখন ডাকার ইচ্ছে ছিল না তবে হঠাৎ করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।

“এমনি ডাকলাম। ডাকটা মিষ্টি।”

“আপনি আমার এই নামটা কি করে জানলেন? কে বলেছে আপনাকে?”

“কেউ বলেনি। আরজু থেকে আরু যে কেউ ডাকতে পারে।”

আরজুর চিন্তা বাড়লো। কোনমতেই ভরসা করতে পারছে না আরমানের উপর। কন্ঠটা আর কঠিন করলো না, নরম হলো। হালকা একটু মিনতিও প্রকাশ পেল সেখানে।

“দেখুন আমি আপনাকে অনুরোধ করছি আমার জীবনটা নষ্ট করবেন না। যদি কেউ আপনাকে আমার খোঁজ রাখার জন্য পাঠিয়ে থাকে তবে অনুরোধ করছি তার কথা শুনবেন না। আমাকে একটু বাঁচতে দিন। বাঁচার জন্য পালিয়ে এসেছি। নিজের বাড়ি, ঘর, বাবা, মা, ভাই, বোন সবাইকে ছেড়ে এসেছি। একটু বাঁচতে দিন আমায়। যার কথায় আমার পিছনে লেগেছেন দয়া করে তাকে আমার সম্বন্ধে কোনো খোঁজ দেবেন না। আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি বলুন? যদি আমার দ্বারা কোন ভুল হয়ে থাকে তবে ক্ষমা করে দেবেন কিন্তু তাও আমার জীবনটা নষ্ট করবেন না।”

ধীরে ধীরে যেন আরমানের কাছে আরজুর জীবনের কিছু কিছু রহস্যের খোলাসা হচ্ছে। মেয়েটার সব সময় এত গুরুগম্ভীর ভাব, হঠাৎ হঠাৎ এত উতলা হয়ে ওঠা, হঠাৎ ভয় পাওয়া সবকিছুই যেন আরমানের কাছে একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে। সেইসাথে এটাও বুঝতে পারছে আরমান মেয়েটার জীবনে খুব ভয়ানক কোন অতীত আছে। আর সেই অতীত এখনো মেয়েটাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে যার ভয়ে সবসময় থাকে।

আরমানের ইচ্ছে করলো আরজুর কাঁধে হাত রেখে একটু ভরসা দিতে তবে সেসব সম্ভব না। এমনিতেই মেয়েটা আরমানকে খারাপ ভাবে এখন আবার ছুঁতে গেলে আরো খারাপ ভেবে নেবে। তার থেকে বরং আপাতত দূরত্ব বজায় রেখেই ভরসা দেওয়া যাক। পরে না হয় কাছাকাছি গিয়ে ভরসা দেবে।

“দেখুন আমি জানিনা আপনার জীবনের কি সমস্যা তবে বিশ্বাস করুন আমাকে কেউ পাঠায়নি আপনার খবর রাখার জন্য। আমি কারো লোক না। আমি আপনাকে প্রথম ঐ পার্কেই দেখেছিলাম তারপরে দীর্ঘদিন আপনাকে খোঁজার চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি। তারপর সেদিন আবার ভার্সিটিতে দেখা হলো এর বাইরে আমি আপনার সম্বন্ধে কিছু জানিনা। আর আমি আপনার জীবন নষ্ট করতে যাব কেন? আমি তো সেটা গুছিয়ে দিতে চাই।”

“দরকার নেই আমার এত কিছুর। আমি কোনদিনই এই আশাতে ছিলাম না যে কেউ আমার জীবন গুছিয়ে দেবে।”

আরমান আলতো হেসে উঠে বলল,

“সবাই চায় আরু কেউ না কেউ কখনো না কখনো এসে তার জীবনটা গুছিয়ে দিক। আমার বিশ্বাস আপনিও চান তবে কখনো সেটা উপলব্ধি করার মতন পরিস্থিতি পাননি। আপনার চোখ দুটো দেখে আমি বুঝতে পারছি সেখানে কত যন্ত্রনা লুকিয়ে আছে। আপনি বাঁচতে চান এই যন্ত্রণা গুলো থেকে। কোন একটা ভরসাযোগ্য হাত খোঁজেন আপনিও শুধু বলতে পারেন না বলার লোক নেই জন্য, তাই না?”

আরজু আবারো নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আরমানের দিকে। আরমান যেসব কথা বলল আরজুর সম্বন্ধে সেই কথাগুলো আরজু হয়তো নিজেও জানে না। আরজু মানেও না এই কথাটা যে আরজু এটা আশা করে আছে যে কেউ এসে ওর জীবনটা গুছিয়ে দেবে। তবে সরাসরি না বলতেও পারলো না। কিন্তু কেন? আরজুর সব কি তবে গুলিয়ে যাচ্ছে? নিজের প্রতি যে বিশ্বাসগুলো ছিল সেগুলো তে কি আরমান সন্দেহ ভরিয়ে দিচ্ছে?

আরমান বুঝতে পারলো আরজু ঘোর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে আছে। মনে হলো আজকের জন্য এতোটুকু কথাই যথেষ্ট। বেশি বললে মেয়েটা ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ করে ফেলবে। অন্তত যে প্রশ্নটা আরজুর মনের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছে এর জন্য হলেও আরমানকে মনে করবেই।

“আর ভাবতে হবে না, এখন যান। একদম ঠান্ডা মাথায় বাড়ি ফিরবেন। আর চিন্তা করবেন না, আপনি না চাইলেও কেউ এসে আপনার জীবন ঠিক গুছিয়ে দেবে।”

আরজু কিছু বলল না, চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল। আরমান খেয়াল করলো আরজু চলে যাওয়ার পর তার আর ভালো লাগছে না। মেয়েটা আজেবাজে কথা বলুক তবুও কেমন যেন ধীরে ধীরে আরমানের সেসব আজেবাজে কথারই অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। আরমানের সেসব আজেবাজে প্রশ্নের উত্তর দিতেই এখন যেন ভালো লাগছে। সেই সাথে মেয়েটার মনে হাজারো প্রশ্ন তৈরি করতে ইচ্ছে করছে। কে জানে কি লুকিয়ে আছে ওই ক্লান্ত চোখ দুটোর মাঝে? আরমান আদৌ তার হদিশ পাবে কিনা কে জানে?

_______

ভর দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন মোমেন সাহেব। হঠাৎ করে নাসিমা হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এসে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“তাড়াতাড়ি বাইরে চলুন। ফিরোজ প্রিথুল কে মা’রছে।”

কথাটা শুনে মোমেন সাহেব লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। বিস্ময় ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,

“মা’রবে কেন? কি আবোল তাবোল বলছো?”

“আমি আবোল তাবোল বলছি না। আপনি নিজে গিয়ে দেখবেন উঠুন। মা’রা’মা’রি করছে ওরা দুজন। তাড়াতাড়ি চলুম না হলে প্রিথুল কে মে’রে ফেলবে ও।”

মোমেন সাহেব আর কোন কথা বাড়ালো না। একপ্রকার ছুটে তাড়াতাড়ি সদর দরজা দিয়ে উঠোনে পা রাখতেই দেখলেন প্রিথুল কে মাটিতে ফেলে ওর বুকের উপরে উঠে বসে ফিরোজ ক্রমাগত ঘু’ষি মা’রছে। ইতোমধ্যে প্রিথুলের নাক মুখ ফেটে গলগল করে র’ক্ত বের হওয়া শুরু করেছে। তবে ফিরোজের সেদিকে খেয়াল নেই। মোমেন সাহেব তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে ফিরোজকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন তবে লাভ হলো না। রাগান্বিত গলায় ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কি করছিস ফিরোজ? ছাড় আমার ছেলেকে।”

ফিরোজ মোমেন সাহেবের পানে র’ক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে বলল,

“সামনে থেকে সরে যা চাচা। তুই ভাবিস না আমার চাচা হস জন্য এখানে তোকে সম্মান দেখাতে আসবো। বাধা দিতে এলে ছেলের পরে তোর এই একই অবস্থা করব বুড়ো।”

“ফিরোজ ভুলে যাস না সম্পর্কে তোর চাচা হই আমি।”

“আরে রাখ তোর সম্পর্ক। সব ঠেকা এই ফিরোজের না? তুই যে কত চাচার দায়িত্ব পালন করেছিস সেসব আমি ভুলিনি। এখন সম্পর্কের বড়াই করছিস? সেই সময় তোর এই চাচা ভাতিজার সম্পর্ক কোথায় ছিল যখন আমি এসে তোর পা ধরেছিলাম? সামনে থেকে সর।”

কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে ফিরোজ আবারো মা’রতে শুরু করলো। প্রিথুলের অবস্থা বেগতিক দেখে মোমেন সাহেব আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফিরোজের লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমরা আটকাও ওকে। এভাবে মা’রতে থাকলে ছেলেটা ম’রে গেলে কিন্তু তোমাদের ভাইয়েরই অসুবিধা হবে।”

ছেলেগুলো হয়তো মোমেন সাহেবের কথার গুরুত্ব বুঝতে পারলো তবে ফিরোজ এই মুহূর্তে যা রেগে আছে তাতে ওকে আটকাতে যাওয়া মানে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করা। তবে ফাহাদ ইশারা করতেই তারা এগিয়ে গেল। তিন-চার জন মিলেও ফিরোজ কে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। ফিরোজ ওকে ধরে ছেলে গুলোকে শাসিয়ে বলল,

“একবার ছাড়া পেলে তোদের অবস্থা খারাপ করবো কিন্তু। ছাড়।”

তবে ফাহাদ ইশারায় ওদেরকে আশ্বস্ত করলো বলে ফিরোজকে ছাড়লো না।

এদিকে প্রিথুলের অবস্থা বেগতিক। সারা শরীর র’ক্তে মেখে গেছে। মোমেন সাহেব তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে ছেলে কে তুললেন। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে প্রার্থনা। খুশি যে হয়েছে তেমনটা না তবে কষ্ট পেয়েছে এমনটাও না। এসব তো জানা কথা যে একদিন ওদের মাঝেই ঝামেলা লাগবে। মোমেন সাহেব তাড়াহুড়ো করে ছেলেকে তুলে আরো কয়েকজন লোকজনের সাহায্যে হাসপাতালে দিকে দৌড় দিলেন। ফাহাদ এবারে ফিরোজের দিকে এগিয়ে এসে হালকা একটু রাগ দেখিয়ে বলল,

“এভাবে দিন দুপুরে মা’রা’মা’রি করছিস কেন? কি করেছে ও?”

ফিরোজ কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“টুম্পাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছিল। ওই শু’য়ো’রের বাচ্চার জিভ এতই বড় হয়ে গিয়েছিল যে ও আমার টুম্পার দিকে হাত বাড়ায়। এখন না হয় ওকে বাঁচিয়ে নিলে কিন্তু কতক্ষণ বাঁচবে? হাতের কাছে পেলে এবার গলা কা'ট'বো আমি ওর। ওর র'ক্ত গায়ে না মাখলে আমার কলিজা ঠান্ডা হবে না।”

“চুপ কর। এই একটা সাধারণ কথা নিয়ে ওর সাথে এত ঝামেলা না করলেও পারতি। যেমনই হোক আমাদের কথায় উঠতো বসতো। একটা ভালো কাজের লোক ছিল। তোর মনে হয় এরপরও ও আমাদের কথা শুনবে বলে?”

"কেন শুনবে না? ওর বোন কে দিয়ে কি এমনি তোমায় বিয়ে দিয়েছি বুড়ো বয়সে? কাজ করানোর জন্যই তো। কি করে কাজ করাতে হবে সেটা তোমার ব্যাপার।"

“কিন্তু যাই বলিস, একটা ছোট কথায় এত বড় তামাশা না করলেও পারতি। চাচা যদি এখন ক্ষেপে যায়?”

ফিরোজ চটে গিয়ে বলল,

“ক্ষেপলে ক্ষেপবো। ও কি করতে পারে আমিও সেটাই দেখবো। ফিরোজ রাজ করে এই এলাকায়। আমার এলাকায় ও আমার কি করতে পারে সেটা আমিও দেখতে চাই। আর আমার চাচা বেশি চেঁচালে না আগে ওটাকে ক'বরে শোয়ানোর ব্যবস্থা করব।”

ফিরােজ ওকে ধরে রাখা ছেলেগুলোকে বলল,

“ছাড় কু'ত্তার বাচ্চারা।”

ছাড়া পেতেই ফিরোজ একা একাই কোথায় যেন চলে গেল। ফাহাদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ফাহাদ যতটা ঠান্ডা মস্তিষ্কের খেলোয়াড়, ফিরোজ ঠিক তার বিপরীত। ছেলেটাকে বোঝাতে পারেনা যে সবসময় মাথা গরম করলে চলে না।

_____

বেশ কয়েকটা দিন পর আজ আবারও নিষিদ্ধ পল্লীতে ফিরোজের পা পড়লো। তবে আজ কোন আমোদ করার উদ্দেশ্যে আসেনি, আজ এসেছে তাণ্ডব চালাতে।সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে একটা বিশাল ঘরে ঢুকলো। ঘরের ভেতরে এখন কে কে আছে, কি কাজ করছে সে সব কিছু জানার প্রয়োজন মনে করলো না। কোন অনুমতি নেয়ারও প্রয়োজন বোধ করল না। এদিকে ফিরোজের হঠাৎ আগমন বোধ হয় লায়লির একদমই পছন্দ হলো না। আরো বেশ কিছু খদ্দেরের সাথে তার মেয়েদের কেনাবেচা নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে ফিরোজ ব্যাঘাত ঘটানোয় রেগে গেলেন। ক্ষিপ্ত গলায় কিছু বলতে চাইলেন তবে ফিরোজ সেই সুযোগ দিলো না। ঘরে ঢুকে সোজা কাঁচের টেবিলটা এক লাথি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলল। মুহূর্তের মাঝে শান্ত পরিবেশটা কেঁপে উঠল।

গাঢ় লাল রংয়ের চুমকি পাথরের কাজ করা সিল্কের শাড়ি পরা, সেই সাথে ভারী সাজগোজ করা লায়লিও কেঁপে উঠলো। ফিরোজের চোখ মুখের অবস্থা দেখে ভয় পেল। ফিরোজ একটা কিছু বলারও সুযোগ দিল না তাকে। সোজা লাইলির দিকে তেড়ে দিয়ে এক পা সোফার উপরে তুলে এক হাতে লাইলির গলা টিপে ধরলো। এত জোরে গলা টিপে ধরলো লাইলির মনে হলো যে পাঁচটা সেকেন্ডও বোধহয় টিকতে পারবেনা। ফিরোজ দাঁতে দাঁত পিছে বলল,

“খা******কি মা****** তোর বুক চি'ড়া ফালাইয়া তোর কইলজা বাইর কইরা কু'ত্তারে খাওয়ামু। তোর চোখের মধ্যে গরম রড ঢুকাইয়া তোর চু'ল'কা'নি থামামু। ধান্দা করতে পারতাছোস আমার জন্যে আর আমার কথাই শোনোস না।”

উপস্থিত লোকগুলো ফিরোজকে আটকানোর জন্য এগিয়ে এলো। এই যাত্রায় লাইলি বেঁচে গেল। তবে আর কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার ছিল তাহলেই খেল খতম হয়ে যেত। ফিরোজের থেকে ছাড়া পাওয়ার সাথে সাথে যে লোকগুলো ফিরোজকে ধরেছে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে হাঁপানো গলায় বলল,

“ছাইড়া দে। আরে ছাইড়া দে কইতাছি এইডা আমাগো ব্যাপার আমরা বুঝমু।”

লোকগুলো সত্যি ফিরোজকে ছেড়ে দিল। লাইলির ইশারা বুঝতে পেরে ঘর ফাঁকা করে চলে গেল তারা।

লাইলি ফিরোজকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“দেখ সাহেব আমার কথা বোঝার চেষ্টা কর। তুই আগে বস। ঠান্ডা শরবত খাইয়া ঠান্ডা কর মাথা। তাও ঠান্ডা না হইলে নতুন মাইয়া আইছে বাজারে ঘরে পাঠাইয়া দেই?”

লায়লির কোন কথাই ফিরোজের কানে গেল না। মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের টুকরো গুলোর মধ্যে থেকে একটা টুকরো হাতে নিয়ে লায়লির গলা বরাবর ধরে কটমট করে বলল,

“তোরে মাসে মাসে এত গুলান করে টাকা দেই, ধান্দা করার ব্যবস্থা কইরা দিছি তারপরেও তুই আমার পাখিরে অন্য কারো কাছে বেইচা দেওনের সাহস পাস কই থেকা? আমার পাখিরে অন্যের খাঁচায় বন্দী করার সাহস দিল কে তোরে? একবারও মনে হইল না আমার কথা, যে আমি খবর পাইলে তোর কি হাল করমু?”

লাইলি ভয় পেয়েছে ভীষণ। জানে ফিরোজ যে কোন সময় মে'রে দিতে পারে, একটুও হাত কাঁপবে না। খু'ন করা ওর স্বভাব। যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,

“দেখ সাহেব আমি নিরুপায় ছিলাম। ওই পিথুল তোর দলের লোক। আমারে কইছে তুই নাকি অরে অনুমতি দিছোস। আমি কি করতাম ক?”

“তুই আমারে ফোন দিলি না ক্যান? আমার সাথে চালাকি করিস না লাইলি। তুই কি ভাবিস আমি কিছু বুঝিনা? আমার এত ট্যাকা দিয়াও তোর গলা ভরে নাই জন্যেই তুই আবার প্রিথুলের থেইকা ট্যাকা নিছোস। এই যাত্রায় বাঁইচা গেলি যদি আর কোনদিন আমার পাখির ঘরে অন্য কেউ গেছে সেদিন তোর শেষ দিন হইবো মনে রাখিস।”

লাইলি আশ্বস্ত করে বলল,

“ভুল হইয়া গেছে সাহেব। আর কোনদিন হইব না।”

“আমার পাখি কই? দুই মিনিটের মধ্যে ওরে ঘরে পাঠাবি। আর দোয়া কর যাতে ওই আমার কাছে কোন অভিযোগ না করে। যদি ওর চোখে পানি দেখছি তোর জন্য তাইলে তুই শেষ।”

কথাটা বলে ফিরোজ ছেড়ে দিল লাইলিকে। তবে লাইলি বুঝতে পারল গলার কাছে কিছুটা অংশ কে'টেছে। জ্বা'লা করছে। ফিরোজ চলে যেতে নিয়ে থেমে গেল। হুট করে পিছন ফিরে তাকিয়ে হাতে থাকা কাঁচের টুকরোটা দিয়ে লাইলির কনুইয়ের একটু নিচে জোরে আঘাত করলো।

ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো লাইলি। কিছুটা রক্ত ছিঁটকে হাতের অন্যান্য জায়গায় পড়ল। ফিরোজ যেন তাতে পৈশাচিক আনন্দ পেল। লাইলির চোখে মুখে জল দেখে ভীষণ আনন্দ পেল। বারবার শুধু একটা কথাই মনে পড়ছে নিশ্চয়ই ওর পাখিও কেঁদেছে যখন প্রিথুল ওর ঘরে গিয়েছিল।

_______

“পাখি ঠিক আছো তুমি? ওই শু'য়ো'রে'র বা'চ্চা কোথাও ছুঁয়েছে তোমায়?”

টুম্পা বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“যদি ছুঁয়েও থাকে তবে তাতে তোমার কি? তুমি কি ভুলে গেছো আমার পরিচয়? মনে নেই এর আগের দিন কি বলে গিয়েছিলে? আমি হলাম বে'শ্যা। প্রতিদিন নতুন নতুন খদ্দেরকে খুশি করাই আমার কাজ। ঠিক যেমন ভাবে তোমাকে খুশি করি।”

ফিরোজ টুম্পার চোয়াল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“আমি তোর কোন খদ্দের না। তুই শুধু আমার আর কাউকে খুশি করা তোর কাজ না।”

টুম্পার চোয়াল চেপে ধরা ফিরোজের হাতটা টুম্পা ছাড়িয়ে নিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“তুমি আমার খদ্দেরই। টাকার বিনিময়েই তো রোজ আমার ঘরে আসতে হয় তোমায়। এর থেকে বেশি সম্মান আমি তো তোমার থেকে পাবো না। তুমি আমার একটা কথাও শোনো? আমার কোন মূল্য আছে তোমার কাছে? নেই। তাই আমিও ঠিক করেছি আজ থেকে আমার যা ইচ্ছে হবে আমি তাই করবো। অন্য পুরুষরাও আজ থেকে টুম্পার ঘরে প্রবেশ করবে। আর সেটাও টুম্পার ইচ্ছেয়।”

টুম্পা কথাটা বলার সাথে সাথে ফিরোজ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে টুম্পার গালে একটা চ'ড় বসালো। টুম্পা মেঝের উপরে উপুড় হয়ে পড়লো। ফিরোজ এক হাঁটু গেড়ে করে বসে পিছন থেকে টুম্পার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরলো। টুম্পা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো তবে এই মূহুর্তে টুম্পার সেসব আর্তনাদ ফিরোজের মন গলাতে পারলো না। টুম্পার দিকে ঝুঁকে গিয়ে কটমট করে বলল,

“আমার মাথা গরম করিস না। এমনিতেই যথেষ্ট মাথা গরম করে তোর ঘরে ঢুকেছি। শুনে রাখ পাখি তোকে মা'রতে আমার হাত কাঁপবে না কিন্তু। যদি আমার অবহেলার কারণে তোকে কেউ ছোঁয় তবে তোকে ক্ষমা করে দেবো। কিন্তু যদি তুই স্বেচ্ছায় কাউকে তোকে ছুঁতে দিস তবে মনে রাখিস তোকে টুকরো টুকরো করে কে'টে পানিতে ভাসিয়ে দেবো।”

কথাটা বলে ফিরোজ টুম্পাকে এক প্রকার ছুঁড়ে মা'রলো। উঠে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে টুম্পা একবার কাতর গলায় ডেকে উঠলো,

“সাহেব!”

ফিরোজ থামলো। মেঝে থেকে উঠে গিয়ে ফিরোজের সামনাসামনি দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর দুহাতে ফিরোজের গলা জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“আজ আমার পরিচয় বে'শ্যা জন্য তুমি আমায় ভালোবাসো ঠিকই তবে স্বীকৃতি দিতে চাও না স্ত্রী হিসেবে। অথচ কখনো কি নিজেকে এই প্রশ্নটা করেছো আমি এই পরিচয়টা পেলাম কি করে? জন্মগতভাবে তো আমি বে'শ্যা না। একজন আমায় বলল আমার এখানে আসার পেছনে নাকি তুমি দায়ী। তাহলে আমার দোষটা কোথায় বলো? প্রথমে আমার থেকে আমার স্বাভাবিক জীবনটা ছিনিয়ে নিলে, আমাকে বে'শ্যার পরিচয় দিলে, তারপর আমাকে ভালোবাসলে আর এখন আমি তোমার থেকে একটা বৈধ সম্পর্কের দাবি করছি অথচ তুমি তা অস্বীকার করছো।”

“আমি ছেড়ে দিয়েছি ওসব কাজ।”

“কিন্তু আমার জীবনটা তো নষ্ট করে দিয়েছো। তুমি ওসব কাজ ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছো ঠিকই কিন্তু আমি তো আর পারছি না ফিরতে। নিয়ে যাবে আমায় তোমার বাড়ি?”

ফিরোজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“সম্ভব না।”

টুম্পা এবারে ছেড়ে দিলো ফিরোজকে। ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“তবে মনে রেখো আজ থেকে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা ফুরোলো। আজ থেকে তোমার পরিচয় তুমি শুধুমাত্র আমার খদ্দের। এর বেশি আর কিচ্ছু না।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প