তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ১০

🟢

মলি মেয়েটা আজকাল একটু বেশিই জোর জুলুম চালাচ্ছে আরজুর উপর। খুব করে যেন চাইছে বন্ধুত্বটা আবারও পাকাপোক্ত হয় ঠিক যেমন প্রথমদিকে ছিল।তবে আরজু কি আর এক ভুল দ্বিতীয় বার করার মতন মানুষ? অবশ্যই না। একবার যে ভুল সিদ্ধান্তটা নিয়ে কষ্ট পেয়েছে, বন্ধুত্বের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে আর দ্বিতীয়বার সেই ভুল করবে না কখনো। একবার কষ্ট পেয়েছে মলির থেকে আর কষ্ট সহ্য করার মতন ক্ষমতা আরজুর নেই। এমনিতেই তো জীবনে কষ্টের অভাব নেই যে যেচে পড়ে আবার কষ্ট ডেকে আনবে। একবার যখন মলি বদলে যেতে পেরেছে তবে আবারও বদলে যেতে পারবে।

তবে সম্পর্কটা একেবারে শেষ করার ইচ্ছে আরজুরও নেই, আবার খুব ভালোভাবে টিকিয়ে রাখার ইচ্ছেও নেই। বছরে দু একবার দেখা করা যেতেই পারে, মাসে এক দুবার কথা বলা যেতেই পারে এর থেকে বেশি কিছু না। হয়ত কোনো মায়া এখনো রয়ে গেছে যা আরজু কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

আরজু এমনিতেই যে স্বভাবের মানুষ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কখনোই মলিকে ফোন করে দেখা করতে বলবে না। অবশ্য ইচ্ছে হয়ও না দেখা করার। একা থাকতেই আরজুর ভালো লাগে। তবে আজ মলি নিজ থেকে কল করে বলেছে বিকেলে দেখা করবে। অন্য কোন জায়গায় না, আরজুর পছন্দের সেই পার্কেই দেখা করবে। আরজু ঠিক সময় মত চলে এলো, মলিও এলো তবে একটু দেরিতে।

বেশ অনেকক্ষণ মলি একা একাই কথা বলে গেল। প্রতিউত্তরে আরজু খুব বেশি হলে হ্যাঁ অথবা না বলেছে।

এক পর্যায়ে গিয়ে মলি নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল। এভাবে একা একা আর কত কথা বলা যায়? মেয়েটা কি একটু কিছু বলতে পারে না? শুধু চুপচাপ শুনে যাচ্ছে মলির কথাগুলো। মলি যে জিজ্ঞেস করল কেমন আছে তার পরিবর্তে শুধু উত্তরটুকুই দিল। পাল্টা আবার জিজ্ঞাসাও করলো না যে মলি কেমন আছে।

মলির নিরবতা দেখে আরজুও বোধহয় সেসব আন্দাজ করতে পারলো। বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমি বুঝতে পারছি তুমি বিরক্ত হচ্ছো। চাইলে চলে যেতে পারো। আমার থেকে এটা আশা করোনা যে আমি তোমার সাথে গল্প করবো। আমি ওসব পারিনা।”

মলি অসহায় গলায় বলল,

“কেন পারিস না? একটু চেষ্টা করে দেখ। আগে তো আমরা অনেক গল্প করতাম তাই না? তুই যদিও খুব গল্প করতি না তাও টুকটাক কথাতো বলতি, আমাকে জিজ্ঞেস করতি আমি কেমন আছি।”

“আমি জানি তুমি ভালোই থাকবে। তোমার জীবনে খারাপ থাকার কোন কারণ নেই। তুমি যে ভালো আছো সেটা সব সময় তোমার মুখের হাসিটা দেখলেই বোঝা যায়। তবে আলাদা করে জিজ্ঞেস করার কি দরকার?সময় নষ্ট না কি? আর আমার সাথে এত সময় কাটানো যায় না। তার থেকে ভালো তুমি কিছু বলতে চাইলে বলে ফেলো। আমার কথা শোনা মানে অযথা সময় নষ্ট করা। কেউ শোনে না সেজন্য আমার কথা।”

মলি এবার আরজুর হাতটা নিজের দু হাতের মুঠোয় নিয়ে অপরাধী গলায় বলল,

“সরি আরজু। আমি জানি আমি আমাদের দুজনের বন্ধুত্বটা নষ্টের জন্য দায়ী। আমি জানি আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি কিন্তু বিশ্বাস কর এবার আমি ভালো হয়ে গেছি। আমি আর তোকে কোন কষ্ট দেবো না প্রমিস করছি।”

আরজু মলির হাতের বাধন থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে এনে সম্মুখে দৃষ্টি রেখে স্বাভাবিক গলায় বলল,

“প্রমিস তো তুমি এর আগেও করেছিলে। যে একবার কথা রাখে না সে আবারও যে রাখবে না সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। তোমার কাছে একবার যখন আমি বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিলাম তখন আবারও ঠিক তাই হবো। কেননা না আমি বদলেছি, না আমার স্বভাবগুলো বদলেছে, না আমার জীবনের অশান্তি গুলো বদলেছে। তবে তুমি বদলাচ্ছো কেন অযথা নিজেকে আমার জন্য? তুমি যেমন আছো তেমনি থাকো।”

“বললাম তো আর হবে না। তুই বিশ্বাস করতে পারিস আমাকে। আমি আর যাব না তোকে ছেড়ে।”

আরজু এবারে অল্প একটু হেসে বলল,

“তুমি তো কখনো আমার সাথে ছিলেই না তবে ছেড়ে যাবে কি করে? আমি ভেবে নিয়েছিলাম তুমি বোধহয় আমার বন্ধু তবে তুমি সেসব ছিলে না। তুমি শুধুমাত্র হোস্টেলে আমার রুমমেট ছিলে। তুমি আমার সাথে তখন ভালো ব্যবহার করতে তারও অনেক কারণ ছিল।”

“কোন কারণ ছিল না। তোকে ভালোবাসতাম জন্য ভালো ব্যবহার করতাম।”

আরজু তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“ভালোবাসাই তো মিথ্যে, ভালোবাসা শব্দটাই তো মিথ্যে তবে তোমার ভালোবেসে করা ব্যবহারটাও মিথ্যে।”

“আরজু এমন কিছুই না।”

“তুমি পড়াশোনা তেমন করতে না, আমার তৈরি করা নোটস গুলো তুমি ব্যবহার করতে। তুমি রান্নাবান্না কিছু পারতে না, যদিও আমিও পারতাম না। তবুও চেষ্টা করেছি। তোমার এসাইনমেন্টও করে দিতাম। নিজের জামা-কাপড়ের সাথে তোমার জামা-কাপড়ও ধুঁয়ে দিয়েছি। তুমি একটু নিজে ইনকাম করতে চেয়েছিলে সেজন্য আমি তোমাকে আমার কয়েকটা টিউশন দিয়ে দিয়েছিলাম। তোমার এইসব কিছু প্রয়োজন ছিল জন্যই তুমি আমার সাথে ভালো ব্যবহার করতে মলি।”

“আরজু প্লিজ আর বলিস না।”

“আর একটু বলি। যেদিন থেকে তুমি অন্য হোস্টেলে চলে গেলে সেদিন থেকে তোমার আমার করা এই প্রয়োজনগুলোও শেষ হলো। পড়াশোনায় গ্যাপ দেওয়ার জন্য তোমার আর আমার নোটসগুলো দরকার হলো না। তুমি বাড়িতে চলে গেলে জন্য তোমার আর ইনকাম করার প্রয়োজন হলো না, রান্নাবান্না করারও আর দরকার হলো না, জামা-কাপড় ধোঁয়ারও না। সেদিন থেকেই তুমি আমায় অবহেলা করতে শুরু করলে।”

মলি মাথা নিচু করে ফেলল। আরজুর বলা কথাগুলো ভুল না। মলি এতদিন ভেবেছিল আরজু হয়তো কিছু বুঝতে পারেনি তবে না, আরজু বুঝতে পেরেছে। আরজু সবই বুঝতে পেরেছিল শুধু মুখ ফুটে কিছু বলেনি। ভেতরে যে কত অভিমান জমে রেখেছিল বন্ধুত্বকে নিয়ে সেসব মলি যেন আজ বুঝতে পারছে।

সত্যি মেয়েটা মলিকে ভালোবেসেছিলো। বন্ধু হিসেবে না বোন হিসেবে। খুব বিশ্বাস করতো আরজু মলিকে।আর মলি সব সময় আরজু কে ব্যবহার করেছে নিজের স্বার্থে। আর যখন সেই স্বার্থ ফুরিয়েছে তখনই আরজুর থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছে, বিরক্ত হয়েছে আরজুর প্রতি।

আর আজ আরজু নিজেই যখন দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে তখন আবার এসেছে ওর সাথে মিল ফেলতে। মলির নিজের কাছে নিজেকে ভীষণ ছোট লাগলো। আর একটা কথাও বলার সাহস হলো না। চুপচাপ উঠে চলে গেল।

আরজুও আর পিছন থেকে ডাকলো না মলি কে। বরং একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এখন ভালো লাগছে। এখন আর অতীতের কোন খারাপ স্মৃতি তাড়া করছে না আরজু কে। আশেপাশে এখন এমন কোন মানুষ নেই যাকে দেখে আরজুর অস্বস্তি হয়। আরজু যেমন একা থাকতে চায় এখন ঠিক তেমনি একা, ভীষণ একা। কেউ নেই। তবে খুব বেশিক্ষণ আরজু একা থাকতে পারলো না। আরজুর স্বস্তি কেড়ে নিতে কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে আরমানের উদয় ঘটলো।

হঠাৎ করে কেউ এসে বসায় আরজু চমকালো। পাশ ফিরে তাকাতেই আরমানকে দেখল। আরমান কে দেখে অবাক হলো কিনা সেটা আরজুর অভিব্যক্তি তে বোঝা গেল না। আরমান বোঝার চেষ্টা করলো তবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। আরজুকে বোঝা এত সহজ নাকি!

এদিকে আরমান একটা বিস্তর হাসি ফুটিয়ে আরজুর দিকে তাকিয়ে আছে। আরজুর নির্লিপ্ত আর গম্ভীর ভঙ্গি দেখে আরমানের সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল।

আরমান আসাতেও আরজুর মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে গেল না। চুপচাপ আবার নিজের দৃষ্টির সামনে ঘুরিয়ে নিল। আরমান আবারও একটু অপমানিত হলো। অপরিচিত মানুষ হলে না হয় এভাবে অবহেলা করাটা সাজতো কিন্তু পরিচিত একজন মানুষকে কি এভাবে অবহেলা করাটা ঠিক হচ্ছে আরজুর? আরমানের মনটা যে বারবার ভেঙে যায় আরজু কি বুঝতে পারে না?

“কেমন আছেন আরু?”

ডাকটা আরজুর কানে যেতেই রক্তিম চোখে আরমানের দিকে তাকালো। আরমানের গলাটা শুকিয়ে এলো। আরমানের অভিব্যক্তি দেখে আরজু বুঝতে পারলো যে ওর আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। আরমানের যদি লজ্জা থেকে থাকে তবে এই নামে আর ডাকবে না।

আরজু কে কিছু বলতে না দেখে আরমানও বোধহয় সেটা বুঝে গেলে। তবে আরমান তো দমবার পাত্র নয়। একজন রাজনীতিবিদকে এত দুর্বল হলে চলবে না। চুপ করে থাকাটাই বরং আরমানের জন্য লজ্জার বিষয় হবে।

আরমান সাহস বজায় রেখে আবারো বলল,

“উত্তর দিলেন না আরু?”

নিজের ভাবনার উপরে আরজু হতাশ হলো। ভেবেছিল আরমান বোধহয় ভয় পেয়েছে তবে তেমন তো কিছুই দেখা গেল না।

আরজু স্বভাব সুলভ গম্ভীর গলায় বলল,

“এই নামে শুধুমাত্র আমায় আমার আপা ডাকে।”

“আজ থেকে না হয় আমিও ডাকবো!”

“আমি আমার কাছের মানুষ ব্যতীত আর কাউকে এই নামে ডাকার অনুমতি দেই না।”

আরমান খুব মিষ্টি করে হেসে বলল,

“আপনিও তো আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি থাকেন। তারমানে আপনি আমার কাছের মানুষ। তবে আমি তো ডাকতেই পারি।”

আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“হৃদয়ের কাছাকাছি আবার মানুষ কি করে থাকে?”

আরমান আবারও মিষ্টি করে হেসে বলল,

“আপনি যেভাবে থাকেন আমার হৃদয়ের কাছাকাছি সেভাবেই থাকে।”

আরজু প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“সবাই আপনার হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে?”

আরমানের ভালো মেজাজটা বিগড়ে গেল। তবুও নিজের রাগটুকু কে আড়ালে রেখে মুখে সেই হাসিটা বজায় রেখে বলল,

“মোটেই না। সবাই তো আর আরু না যে আমার হৃদয়ের কাছাকাছি থাকবে।”

“আপনি আমার সাথে এমন অদ্ভুতভাবে কথা বলছেন কেন? আর হাসছেন কেন কথায় কথায় এভাবে? আমাদের মাঝে তেমন কোন সম্পর্ক নেই যে আপনি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারেন।”

“আপনি চাইলেই কিন্তু তেমন একটা সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।”

আরজু বিরক্ত হলো। আরমানের দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। আরমান ভাবলো আরজু বোধহয় এবার উঠে চলে যাবে। তাড়াহুড়ো কণ্ঠে বলল,

“প্লিজ আরু যাবেন না। আপনার জন্যই এসেছি।”

আরজু বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আপনার জন্য আমি উঠে যাব কেন? আমার জীবনে আপনার এতটাও গুরুত্ব নেই। আর এমনিতেও আমার জন্য আপনার কোন অসুবিধা হচ্ছে না বরং আপনার জন্য আমার অসুবিধা হচ্ছে। তাই আপনার চলে যাওয়া উচিত, আমার না।”

“এমন রুক্ষ ব্যবহার করেন কেন সব সময় সবার সাথে?জানেন আমার আম্মু একটা কথা বলে, যার ব্যবহার যত রুক্ষ তার মনটা নাকি ঠিক ততটাই নরম হয়। আর আমি জানি আপনার মনটাও ভীষণ নরম। আপনার এই রুক্ষ ব্যবহারের নিশ্চয় অনেক গভীর কারণ আছে।”

আরজু অবাক হলো। ওর সাথে খুব বেশি না মিশেও, খুব বেশি কথা না বলেও, কিছু না জেনেও অনেক কিছু জেনে গেছে আরমান। আরজুর মনটা বুঝে গেছে। কি করে বুঝলো আরমান এতকিছু? কারো সম্বন্ধে কিছু না জেনেও তার আচরণের সম্বন্ধে এতটা আন্দাজ করা সম্ভব?

আরমান কে নিয়ে আরো অনেক ভাবনাই এলো আরজুর মনে। তবে খুব তাড়াতাড়ি আরজু সে ভাবনা গুলোকে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“আমার হৃদয় মোটেও নরম না। পাথর চেনেন তো? আমার হৃদয় পাথরের থেকেও কঠিন। সেখানে কারো জন্য কোন মায়া-দয়া, ভালোবাসা কিচ্ছু নেই। আর আমার ব্যবহার এমন রুক্ষই।”

আরমানের কোথাও গিয়ে একটা মনে হয় আরজুর এমন ব্যবহারের পেছনে নিশ্চয় অনেক বড় কোন কারণ আছে। মেয়েটার বোকা বোকা কিছু প্রশ্ন শুনলেই বোঝা যায় যে তার মনে ঠিক কত প্রশ্ন। কিন্তু মেয়েটা সেগুলোর উত্তর কোথাও পায় না। তাছাড়া আরমান আরজুর সাথে যতটুকু কথা বলেছে, মুনতাসিরের থেকে যে টুকটাক বিষয়গুলো শুনেছে তাতে আন্দাজ করা যায় যে আরজুর ব্যক্তিগত জীবন সমস্যায় জর্জরিত।

সেসবই কি তবে মেয়েটারে রুক্ষ ব্যবহারের কারণ? অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর আরমান ডাকলো একবার আরজু কে।

“আরু!”

“হু।”

খুশিতে আরমানের চোখ দুটো চিক চিক করে উঠলো। আরজু সাড়া দিয়েছে ওর ডাকে। তাও আবার কি সুন্দর নরম কন্ঠে। একদম আরমান যেমন ভাবে চায় ঠিক তেমনি নম্র কন্ঠে।

তবে আরজু ভীষণ অবাক হলো সেই সাথে নিজের উপর প্রচন্ড বিরক্তও হলো। এইভাবে ওর ডাকে সাড়া দেওয়ার কি ছিল? আরজু সাড়া দিলই বা কেন?

আরমান এবারে সরাসরি প্রশ্ন করলো আরজু কে।

“আপনার জীবনে অনেক কষ্ট তাই না? অনেক আফসোস আছে আপনার জীবনে? অনেক না পাওয়ার যন্ত্রনা আছে তাই না? আপনি কাঁদতে পারেন না। কষ্টে আপনার বুক ফেটে গেলেও আপনি কাঁদতে পারেন না। কারণ কাউকে কেঁদে নিজের কষ্টগুলো বোঝাতে পারবেন এমন কোন মানুষ আপনার জীবনে নেই। ঠিক ধরেছি না?”

আরজু জীবনে এতটা অবাক বোধহয় কখনো হয়নি যতটা আরমানের এই কথাগুলো শুনে হয়েছে সেটা ওর চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বিস্ফোরিত নয়নে আরমানের দিকে তাকালো। খুব ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছে কি করে আরমান এতগুলো কথা বুঝে গেল।

আরজু তো কখনো কিছু বলেনি ওকে। অন্য কারো থেকে শুনে যে বুঝেছে তাও সম্ভব না। কেননা আরজু কাউকেই নিজের মনের কথা বলে না। তবে আরমান কি করে বুঝা গেল?

আরমানের কণ্ঠ এবারে আরো নরম হলো। কন্ঠের মাধ্যমে আরজু কে ভরসা দেওয়ার চেষ্টা করলো। চেষ্টা করলো আরজুর মনের কথা একটু হলেও বের করে আনার জন্য। আবারো বলল,

“দেখুন আরু কষ্ট সবার জীবনেই থাকে। হয়তো আপনার জীবনে একটু বেশি আছে অন্যদের থেকে। তবে আপনি যদি সেই কষ্টগুলোকে সারা জীবন মনের ভিতর ধারণ করে রাখেন আপনি ভেতর থেকে অসুস্থ হয়ে যাবেন। একটু প্রকাশ করা দরকার মনের কষ্টগুলো।”

আরজু একটা ঘোরের মাঝে থেকে বলে উঠলো,

“কখনো কেউ এভাবে শুনতে চায়নি আমার মনের কষ্ট। কখনো কেউ জিজ্ঞেস করেনি যে আমার মনে কষ্ট জমা আছে কিনা তাই আর প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি।”

“আমি শুনবো। আমায় বলুন। আমি খুবই মনোযোগী শ্রোতা। আমি কথা দিচ্ছি আপনি যতক্ষণ আমার সাথে কথা বলতে চাইবেন আমি ততক্ষণই আপনার কথা শুনবো।”

আরজু বেশ কিছুক্ষণ ভাবলো, সেই সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরমানকে পর্যবেক্ষণ করলো। আরমান ভাবছে আরজু নিশ্চয় মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করছে বলবে কি বলবে না। আরমান এই বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করলো না আরজু কে। বলতে চাইলে বলবে না বলতে চাইলে বলবে না। পরে না হয় সম্পর্কটা আরো ঘনিষ্ঠ হলে আরমান শুনে জেনে নেবে।

অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর আরজু বলে উঠলো,

“আমি খেয়াল করেছি এর আগে বেশ কয়েকবার আপনি আমার ওপরে বিরক্ত হয়েছেন। তবে আজ কি করে আপনি মনোযোগী শ্রোতা হবেন? হয়তো একদিনের জন্য মনোযোগী শ্রোতা হবেন কিন্তু পরের দিন আর আসবেন না শুনতে আমার কথাগুলো। আমার জীবনের গল্প একদিনে বলে শেষ করাও সম্ভব না। তবে আমি কেন একদিনের জন্য আপনার কাছে আমার দুর্বলতা গুলো প্রকাশ করব?”

আরমান সোজা হয়ে বসে আরজুর দিকে তাকিয়ে দ্রুত বেশ কয়েকবার পলক ঝাপটে বলল,

“আমি কখন আপনার উপর বিরক্ত হলাম?”

“হয়েছেন। আমার অতিরিক্ত প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছেন, আমার যুক্তি গুলোর কাছে বিরক্ত হয়েছেন। আপনি খেয়াল না করলেও আমি সেসব খুব সূক্ষ্ম ভাবে খেয়াল করেছি।”

“আচ্ছা আর বিরক্ত হব না। আমি আপনার উপরে কখনো বিরক্ত হইনি। আসলে আপনি আমার সাথে কথা বলতে চান না সেজন্য আমার খুব খারাপ লাগে।”

আরজু নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

“খারাপ লাগা থেকে কখনো বিরক্তি প্রকাশ হতে পারে না। খারাপ লাগা থেকে বড়জোর অভিমান হতে পারে।”

“অভিমান করলে তো আপনি আর সেটা ভাঙ্গাবেন না। তবে অভিমান করে লাভটা কি বলুন।”

“আর বিরক্ত প্রকাশ করলে আপনার সাথে এই টুকটাক কথা বলার রুচি টুকুও আমার ম'রে যাবে তখন কি করবেন?”

আরমান বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“তবে নিজের ভুলটা শুধরে নেব। একবার যদি বিন্দু পরিমাণ আন্দাজ পেয়ে যাই যে আপনার কোনো বিষয় পছন্দ না সেসব আমি আর কক্ষনো করবো না কথা দিচ্ছি। আজকের পর থেকে যদি কখনো আপনি টের পেয়েছেন যে আপনার উপর আমি বিরক্ত হয়েছি তবে কথা দিচ্ছি আর আপনাকে বিরক্ত করব না।”

আরজু আর কোনো কথা বলল না। ও জানে এসব কথা দিয়ে কথা কেউ রাখে না। সেজন্যই তো আরজু কাউকে বিশ্বাস করে না। চুপচাপ উঠে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে আরমান আবার আরু বলে একবার ডাকলো।আরজু থামল। পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,

“পলিটিশিয়ানরা যে আসলেও নির্লজ্জ হয় সেটা আপনাকে দেখে বুঝলাম। কোন ব্যক্তিত্বই নেই আপনার।”

আরমান হেসে উঠে বলল,

“আপনার ভালোবাসায় যেখানে জান কুরবান সেখানে এই ব্যক্তিত্ব দিয়ে কি করব?”

আরজু একরাশ বিরক্তি আর বিস্ময় সমেত সেখান থেকে চলে গেল। আরমান বেঞ্চের সাথে গা এলিয়ে দিল। হুট করে মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে উঠলো। আরজু কে ভালোবাসার কথা বলল অথচ রাগী মেয়েটি একটুও রাগ করল না। তবে এটা কি আরমানের জন্য গ্রিন সিগনাল ছিল?

বিজ্ঞাপন

নিজের ভাবনার উপরে নিজেরই হাসি পেল আরমানের। আরজু দেবে সিগনাল, অসম্ভব।

আরমানের এসব ভাবনার মাঝে ফোনটা বেজে উঠলো। যখনই আরজুর সম্বন্ধে কিছু ভাবতে যায় তখনই তার মধ্যে বাধা পড়বে। কখনো মেয়েটা নিজেই বাধা দেয় নয়তো কখনো বা অন্যান্য মানুষজনেরা বাধা দেয়।

প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে নাম না দেখেই রিসিভ করে কানে ধরলো। গম্ভীর গলায় বলল,

“হ্যালো।”

অপর পাশ থেকে ভীষণ পরিচিত আর বেশ প্রিয় একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো আরমানের কানে। ফুরফুরে মেজাজটা আরেকটু ফুরফুরে হয়ে উঠলো। হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,

“আরে ফিরোজ যে। এতদিন পর হঠাৎ এই নগণ্য মানুষকে মনে পড়ার কারণ?”

ফোনের অপর পাশে থাকা ফিরোজ হেসে বলল,

“তুমি নগণ্য মানুষ হলে এই প্রয়োজনের সময় তোমায় মনে পড়তো না। মেসেজ দিয়েছিলে আমায়। সত্যি কি খোঁজ পেয়ে গেছো?”

“তাওসিফ আরমান করতে পারেনা এমন কোন কাজ নেই। সামান্য বেওয়ারিশ একটা মেয়ের খোঁজ নিতে বলেছিলে। তার পুরো পরিবারের খোঁজ নিয়ে ফেলেছি।”

ফিরোজ উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“মেয়েটা বেঁচে আছে তো?”

“বেঁচে আছে মানে সংসার করছে দিব্যি। তবে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বস্তির পাশে একটা ছোট্ট বাড়িতে উঠেছে। পুতুল নাম বদলে রেখেছে ফারহানা। একটা ছেলে আছে, আর স্বামী হুইল চেয়ারে বসা। বেশি দিন হলো এখানে আসেনি। এই ছয় মাসের মতন হবে।”

“আর একটা সাহায্য করতে পারবে আমায়?”

“বল চেষ্টা করব।”

“আমি এখন ঢাকা যেতে পারছি না। খুব ঝামেলার মাঝে ফেঁসে আছি। একটু ওনার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারবে একজনের ব্যাপারে।”

আরমান একটু ভেবে বলল,

“সেদিন যার কথা বলেছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“আচ্ছা চিন্তা করো না। আমি কাল পরশু যাব ওনাদের ওখানে।”

ফিরোজ কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি আন্দাজও করতে পারবে না যে আমার কত বড় উপকার করছো। আমি তোমাকে যতই ধন্যবাদ দেই না কেন সেটা কম হবে। তবে এই ফিরোজ তোমায় একটা কথা দিচ্ছে যদি কখনো, কোনদিন সুযোগ পাই তোমার এই ধার শোধ করার তবে ফিরোজ নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও তোমার সেই ধার শোধ করবে। এটা ফিরোজের ওয়াদা।”

_________

মদ খাওয়ার অভ্যাসটা তানভীর এর নতুন নতুনই হয়েছে বলা চলে। আগে নিজের বাবা আর ভাইয়ের ভয়ে এসবের দিকে তাকানোর সাহস অব্দি পেত না। তবে এখন ধীরে ধীরে ভয় সব কেটে যাচ্ছে। কাউকে আর সহ্য করতে পারে না তানভীর। কেউ ওর পাশে দাঁড়ায় না, ওকে ভালোবাসে না তবে ওদেরকে ভয় পেয়ে কি হবে।

এদের কথা এতো ভেবেই বা লাভ কি। কেউ তো তানভীরের কথা ভাবেনা। সবার ভাবনায় শুধু আরমান, আরমান আর আরমান। আরমান ছাড়া আর কেউ চোখে কিছু দেখেই না।

আরমানই সবকিছুর যোগ্য আর তানভীর যেন সবার চোখে গাধা। কোন যোগ্যতাই নেই আরমানের সামনে দাঁড়ানোর সেটা প্রতিনিয়ত প্রতিটা মানুষ ওর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আর এই বিষয়টাই তানভীরের অসহ্যকর লাগে।

প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা তবে কেন একজনকে আরেকজনের সাথে তুলনা দিয়ে ছোট করতে হবে? এটা তো স্বাভাবিক বিষয় যে একজন কোন বিষয়ে বেশি পারদর্শী হবে, অন্যজন একটু কম পারদর্শী হবে। একটু খুঁজলে এমন অনেক কিছু পাওয়া যাবে যেখানে আরমানের থেকে তানভীর বেশি পারদর্শী। কিন্তু না, কেউ তো সেসব কিছু করবে না। সবাই শুধু খুঁজেখুঁজে তানভীরের খুঁত গুলো আগে বের করবো।

দলের ছেলেদের সাথে ক্লাব ঘরে বসে থেকে একসাথে মদ খাচ্ছে তানভীর। প্রতিদিনের তুলনায় আজ একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে। অন্যান্য দিন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে তবে আজ পারছে না। উঠে দাঁড়ানোর মতন অবস্থাও নেই। ড্রাইভ করে যে বাড়ি ফিরবে তাও সম্ভব না। গাড়ি চালাতে গেলে হয় নিজে ম'রবে নয়তো কাউকে মে'রে দেবে। টেবিলের উপর থেকে মাথাটা তুলে সম্মুখে বসা ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুই গাড়ি চালাতে পারিস?”

ছেলেটার অবস্থা যে তানভীরের থেকে খুব একটা বেশি ভালো তা বলা যায় না। তবে হ্যাঁ তানভীরের থেকে একটু কম নেশা হয়েছে। তানভীরের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,

“না ভাই। গাড়ি চালান ক্যামনে জানমু? আমার বাপের কি আর গাড়ি আছে নাকি।”

“ধ্যাৎ! শা'লা তোকে দিয়ে তাহলে কি হবে? সর আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে যাবো।”

তানভীর উঠে দাঁড়াতে নিয়ে আবারো বসে পড়লো।চোখ দুটো খুলে রাখতে পারছে না ঠিকঠাক ভাবে কে জানে কি করে গাড়ি চালাবে। তবে তানভীর এখানে হারবে না। অন্তত এতগুলো ছেলের সামনে হে'রে গেলে চলবে না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন রাখতে জানে তানভীর।

আবার উঠে দাঁড়ালো অনেক কষ্টে। পিছন ঘুরে দাঁড়াতেই একটা বেশ শক্ত-পোক্ত হাতের থাবা এসে পড়ল তানভীরের গালে। তানভীর ছিটকে গিয়ে আবারো টেবিলের উপরে পড়লো।

আরমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সবগুলো ছেলের যেন নেশা উড়ে গেল। হাতের বোতলটা সাইডে রেখে সবাই দাঁড়িয়ে পড়লো। আরমান কারো দিকে নজর দিলো না। ওর নজর শুধুমাত্র তানভীর এর উপর।

এদিকে আরমানই যে তানভীকে চ'ড়টা মে'রেছে সেটা তানভীর এখনো বুঝতে পারেনি। তবে ভীষণ রাগ হচ্ছে। কার এত বড় সাহস হলো যে তানভীরের গায়ে হাত দেয়।

মা'রের ধাক্কাটা সামলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত স্বরে আগন্তুক কে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে নিল। তবে তার আগেই আরমান কে দেখে থেমে গেল। রাগের চোটে আরমানের চোখ দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।আরমানকে দেখে তানভীরের রাগ আরো বাড়লো। দাঁত পিষে বলল,

“তোর সাহস কি করে হলো আমার গায়ে হাত তোলার?”

আরমান আর একটা শব্দ ব্যয় করার প্রয়োজন মনে করল না। তানভীরের কলার ধরে টেনে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। তানভীর অনেক চেষ্টা করলো আরমানের থেকে ছাড়া পাওয়ার তবে কোনো লাভ হলো না। গাড়ির দরজা খুলে আরমান ওকে একপ্রকার ছুঁড়ে মা'রলো ভিতরে। তানভীর এর পকেট হাতরে গাড়ির চাবিটা বের করল। তানভীরকে সিট বেল্ট পরিয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো।এদিকে তানভীর এখনো একা একা আরমানকে গালাগালি করেই যাচ্ছে। আরমান অবশ্য কান দিচ্ছে না সেসবে। পাগলরা তো কত কিছুই বলে তাই বলে কি তাদের কথায় কান দিতে আছে নাকি?

আর তাছাড়া তানভীর আরমানের ছোট ভাই। আরমান স্নেহ করতে জানে, স্নেহ করতে চায় তবে তানভীর এর জন্য সেসব সম্ভব হয় না।

গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে। আরমান চুপচাপ স্টিয়ারিং এ হাত ঘোরাচ্ছে। একটাবারের জন্য তানভীরের দিকে তাকায়নি, কিছু বলেওনি। একটা সময়ে গিয়ে তানভীর নিজেও থেমে গেল। গালাগালি করাও বন্ধ হয়ে গেল। আরমান আড় চোখে তাকিয়ে দেখলো সিটের সাথে হেলান দিয়ে আছে। ভাবলো হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর আবারো আরমান তানভীরের কণ্ঠস্বর পেল। তবে এবারে আরমানকে গালাগালি করছে না। বরং তানভীরের গলাটা একটু অসহায় লাগলো আরমানের কাছে। আরমান একটু মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল তানভীরের কথাগুলো। তানভীর ঘোরের মাঝে বিড়বিড় করে বলছে,

“তুই সব সময় সব বিষয়ে আমার থেকে এগিয়ে যাস। সবাই তোকে ভালো ভাবে আর আমায় ভাবে খারাপ। তুইও আমায় খারাপ ভাবিস। আমি তোর ভাই কিন্তু তুই আমার থেকে বেশি মুনতাসির কে ভালোবাসিস। সেদিন আমার গাড়ির সাথে তোর এক্সিডেন্ট আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি তো জানতামই না তুই ওখানে থাকবি। কিন্তু ওই যে তোর কপাল, আমার সামনে এসেই পড়লি।”

তানভীরের শেষের কথাটা শুনে আরমান চমকালো। সেদিন তবে তানভীর ইচ্ছে করে ওকে আঘাত করেনি? ঘটনাটা কাকতালীয় ছিল।

তানভীরের কাঁধ ঝাকিয়ে ওকে হুঁশে ফেরানোর চেষ্টা করে প্রশ্নাত্মক গলায় আরমান জিজ্ঞেস করলো,

“কি বললি তুই তানভীর? আরেকবার বল।”

তানভীর একা একা কি যেন বলে গেল। আরমান একটা কথাও বুঝতে পারল না। এখনকার জন্য হাল ছেড়ে দিল। বুঝলো এখন তানভীরের মুখ থেকে কিছুই বের করা সম্ভব হবে না।

_________

কলিং বেল বাজাতেই আজও হিমি এসে দরজা খুলে দিল। আরমানের সাথে তানভীর কে দেখে অবাক হলো। আরো বেশি অবাক হলো যখন বুঝলো তানভীরের অচেতন প্রায় অবস্থা। ভয় পেয়ে গেল। আঁৎকে উঠে বলল,

“কি হয়েছে তানভীরের?”

“কিছু হয়নি ভাবি। অতিরিক্ত খেয়ে এখন জ্ঞান হারানোর মতন অবস্থা হয়েছে।”

হিমি বিস্মিত কন্ঠে বলল,

“তানভীর মদ খেয়েছে?”

“রোজ ই খায়। কিন্তু রোজ অল্প খায় বলে আপনারা কেউ ধরতে পারেন না। আজকের ডোজটা একটু বেশি পড়ে গেছে। আপনার শাশুড়িকে একটু ডাকতে পারবেন ভাবি? বড় আব্বু আর ভাইয়াকেও ডাকুন।”

হিমি তাড়াহুড়ো করে গেল সবাইকে ডাকতে। আরমান তানভীর কে সোফায় বসালো। কিছুক্ষণের মাঝে কল্পনা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। সেই সাথে তাওকীর আর মুহিব হোসেনও এলো।

কল্পনা এসে সোফায় ছেলের পাশে বসে হা হুতাশ করে বলে উঠলেন,

“কি হয়েছে আমার ছেলের? তানভীর, বাবা কি হয়েছে তোর?”

আরমান হালকা বিরক্তির সাথেই বলল,

“কিছু হয়নি আপনার ছেলের। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে আছে এখন।”

আরমানের কথার প্রেক্ষিতে কল্পনা রাগান্বিত গলায় বলল,

“একদম আজেবাজে কথা বলবে না আমার ছেলের নামে তুমি। আমার ছেলেকে এত অপমান করো তাও তোমার শান্তি হয়নি তাই না? এখন আবার ওকে নেশাখোর বানাতে চাইছো।”

“দেখুন আমার কোন সখ নেই আপনার ছেলেকে নেশাখোর প্রমাণ করার। আপনার বিশ্বাস করার হলে করুন না করার হলে না করুন। চোখের সামনে সত্যিটা দেখেও যদি আপনি অন্ধ হয়ে থাকতে চান তবে আমার কিছু বলার নেই এখানে।”

“কি হয়েছে তাওসিফ?”

মুহিব হোসেনের কন্ঠ পেয়ে আরমান ওনার দিকে তাকিয়ে বলল,

“দেখো বড় আব্বু আমার ঝামেলা করার কোন ইচ্ছে নেই। তানভীর কে তোমাদের চোখে খারাপ করারও কোন উদ্দেশ্য নেই। আমি আজ তোমাদেরকে এই কথাটা বলতে বাধ্য হচ্ছি। তোমরা এবারে প্লিজ একটু নজর দাও ওর দিকে। ও অত্যন্ত খারাপ পথে চলে গেছে। ওর অবস্থা দেখেছো? ক্লাবে ছেলেদের সাথে বসে মদ খাচ্ছিলো। সেখান থেকে তুলে এনেছি ওকে।”

তাওকীর তানভীর কে মা'রার উদ্দেশ্যে তেড়ে যেতে নিলে হিমি আটকালো। কল্পনাও ছোট ছেলেকে আড়াল করে বসে রইলেন। মুহিব হোসেন রাগান্বিত গলায় বলল,

“বাড়িতে এনেছো কেন ওকে? রাস্তায় ফেলে রেখে আসতে পারোনি? হুঁশ ফিরে এলে তারপর পা রাখতো বাড়িতে।”

“দেখো বড় আব্বু রাগের মাথায় কোন সিদ্ধান্ত নিলেই যে এই সমস্যার সমাধান হবে তেমনটা না। ও একটা খারাপ পথে গেছে আমাদের সবার দায়িত্ব ওকে ভালো পথে আনার। এখন যদি আমরা আরো সবাই রাগারাগি করি তবে পরিস্থিতি বিগড়ে যাবে। ওকে বোঝাতে হবে।”

তাওকীর বলে উঠলো,

“ওকে কি এখনো বোঝানোর মতন বয়স আছে? ও কি নিজে বড় হয়নি? আর কবে নিজের ভালো-মন্দ নিজে বুঝতে শিখবে?”

“বাদ দাও না এসব কথা ভাই। দরকার পড়লে আরো শেখাবে ওকে। আর একটা কথা ওকে ক্লাবে ওভাবে মাতাল অবস্থায় দেখে রাগের মাথায় একটা চ'ড় লাগিয়েছে। যদি তোমাদের খারাপ লেগে থাকে তবে ক্ষমা চাইছি।”

কল্পনা আবার হা হুতাশ করে বলে উঠলেন,

“কি বললে তুমি আমার ছেলের গায়ে হাত তুলেছো? সাহস হলো কি করে তোমার? আমি নিজে কখনো আমার ছেলের গায়ে হাত তুলিনি।”

“সেই জন্যই আজ ওর এই অবস্থা। ঠিক সময় যদি দু চারটে চ'ড় লাগাতেন তবে আজ এই দিন দেখতে হতো না। নিজের মাতাল ছেলেকে নিয়ে গর্ব করা ছাড়ুন। যে কোনদিন ও আপনার স্বামীর সম্মান নষ্ট করবে। আপনার এই ছেলের জন্য আপনার স্বামী আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।”

“সেসব আমরা বুঝে নেব। তাই বলে তুমি আমার ছেলের গায়ে হাত তুলবে কেন?”

তাওকীর এবারে নিজের মা কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,

“ওর অধিকার আছে মা। তুমি ওর সাথে এমন ব্যবহার করছো যেন ও বাইরের মানুষ। ও এই বাড়ির ছেলে। ওর সম্পূর্ণ অধিকার আছে তানভীরকে শাসন করার। আমি বড় ভাই হয়ে যেমন ওকে শাসন করি ঠিক তেমনি তাওসিফ ও করতে পারে।”

কল্পনা এবার আর কিছু বলার মতন মুখ পেলেন না।আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে আরমান চলে এলো। সাথে তাওকীরও এলো গেট পর্যন্ত।

বেশ রাত হয়ে গেছে। আরমান নিজের সাথে নিজের বাইকটা আনেনি তাই তাওকীর বলল ওর গাড়িটাই নিয়ে যেতে। আরমান রাজি হলো। তবে যাওয়ার আগে তাওকীর আরমানকে একটা প্রশ্ন করলো। প্রশ্নটা অনেকদিন থেকেই করবে বলে ভাবছিল। আজ করেই ফেলল।

“তানভীর মনোনয়ন পেল না কেন?”

তাওকীরের প্রশ্ন শুনে আরমান ভ্রুঁ কোঁচকালো। একটু বিস্ময়ের সাথেই বলল,

“আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো ভাই?”

“জিজ্ঞেস করছি তার কারণ আছে তাওসিফ। একটা খবর কানে এলো আমার।”

“কি খবর?”

“বিরোধী দলের একটা ছেলে মুনতাসিরের সাথে নাকি তোর বেশ খাতির। খুব ভালো সম্পর্ক। তুই নাকি মনেপ্রাণে চাস যেন ওই ছেলেটা নির্বাচনে যেতে?”

“তার সাথে তানভীরের মনোনয়ন না পাওয়ার কি সম্পর্ক?”

“কোনভাবে কি তুই সন্দেহ করেছিলি যে তানভীর যদি দাঁড়াতো তবে হয়তো ওই ছেলেটা হেরে যেত?”

আরমান এবার একটু ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে হেসে উঠে বলল,

“এত কিছু যখন খোঁজ নিয়েছো তবে মুনতাসিরের জনপ্রিয়তার সম্বন্ধে খোঁজ নাওনি? মুনতাসিরের জনপ্রিয়তা তানভীরের থেকে দশ গুণ বেশি। আর সব থেকে বড় কথা তুমিও এই বিষয়টা খুব ভালো করেই জানো কে মনোনয়ন পাবে না পাবে সেটা দলের সিদ্ধান্ত, আমার না। আমার এখনো এতটাও ক্ষমতা নেই।”

“সবাই জানে তুই মুহিব হোসেনের খুব আদরের।”

“রাজনীতিতে আদর দিয়ে কিছু চলে না ভাই। আমি মুহিব হোসেনের আদরের জন্য যে দল আমার কথায় উঠবে বসবে তেমনটা না। যদি আমার এতটাই ক্ষমতা থাকতো তবে এবারে এমপি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যেতাম। এসব ছাত্র সংসদের সভাপতির পিছনে পড়ে থাকতাম না।”

তাওকীর হঠাৎ করে হেসে উঠলো। অভিব্যক্তিটা বদলে গেল। আরমানের পিঠ চাপড়ে বলল,

“তোর থেকে এটাই আশা করা যায়। তোর চোখে এই আত্মবিশ্বাসটাই আমি দেখতে চাইছিলাম। আমি শুধু দেখতে চাইছিলাম যে আমার প্রশ্নে তুই ঘাবড়ে যাস কিনা। এই বিষয়টায় আমি নিশ্চিত ছিলামই যে তুই কখনো এমন কোন ষড়যন্ত্র করবি না তোর ভাইয়ের বিরুদ্ধে।”

আরমান একটু ভরকালো। একটু দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়লো তাওকীর কে নিয়ে। যদিও এতদিন কোন সন্দেহ তৈরি হয়নি তবে একটু আগে তাওকীর কে নিয়ে যে সন্দেহটা তৈরি হয়েছিল মুহূর্তের মাঝে আবার সেটার সমাপ্তি ঘটালো। সন্দেহী গলায় বলল,

“তোমার অভিব্যক্তি বুঝতে পারছি না। আমায় নিয়ে তোমার ভাবনা কেমন এখন যেটা দেখাচ্ছো সেটা না একটু আগে যেসব দেখালে সেটা?”

তাওকীর এবার জড়িয়ে ধরলো আরমানকে। স্নেহ পূর্ণ গলায় বলল,

“তুই আমার ছোট ভাই, আমার র'ক্ত। তোকে ভালোবাসি আমি, স্নেহ করি। ভরসা আছে তোর উপরে আমার। তুইও তোর বড় ভাইয়ের উপরে ভরসা রাখ।”

চেয়েও আরমান আর সন্দেহ করতে পারল না। ওই যে তাওকীর বলল র'ক্ত। ওই একটা জায়গাতে গিয়েই আরমান দুর্বল হয়ে পড়ে, সব সন্দেহ গুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজেও পাল্টা জড়িয়ে ধরলো তাওকীর কে।

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প