তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ১৩

🟢

হিমির সাথে কথা বলা শেষে আরমান আবারও উপরে যেতে ধরলো। তবে হঠাৎ করে স্টাফ রুমের ভেতরে আরজু কে যেতে দেখল। আরমান তো ভেবেছিল আরজু বোধহয় চলে গেছে তবে এখনো আরজু কে এখানে দেখে অবাক হলো। লেডিস স্টাফ রুমে এভাবে তো হঠাৎ করে যেতেও পারবে না। একজন নার্সকে সেদিকে যেতে দেখে আরমান তাকে ডাকলো।

“আপনাদের স্টাফ রুমে আরজু নামে একজন স্টাফ আছে। ওনাকে প্লীজ একটু ডেকে দিতে পারবেন!”

নার্স মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে ভিতরে গেল। কিছুক্ষণ পর আরজু বেরিয়ে এলো। আরমানকে দেখে অবাক হলো না বরং ভেবেছিল আরমান হয়তো আসবে কিংবা হয়তো এতক্ষণ আরমানের আশাতেই বসে ছিল।

তবে সেসব আশা আকাঙ্ক্ষার কোন কিছুর প্রতিফলনই আরজুর কন্ঠে কিংবা অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেল না। আরমান কে প্রশ্ন করলো,

“ডেকেছেন কেন আমায়?”

“আপনি এখনো বাড়ি ফেরেননি কেন?”

“বাড়ি নেই আমার, হোস্টেলে যাব।”

“ওই একই হলো। হোস্টেলে যখন থাকেন তবে ওটাই বাড়ি।”

আরজু আরমানের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“বাড়ি আর হোস্টেল কখনো এক হয় না। বাড়ি তো আলাদা। বাড়ি হয় নিজের, বাড়ি হয় আপন মানুষদের নিয়ে, হোস্টেল তো নিজের হয় না। যদিও আমি কখনো বাড়ির গুরুত্ব তেমন ভালোভাবে উপলব্ধি করিনি। আমি জানতামও না এতকিছু। বাড়ি আর হোস্টেলের মাঝে যে এত পার্থক্য আছে সেসব জেনেছি যারা হোস্টেলে থাকে তাদের থেকে। শুনেছি, বাড়ি আর হোস্টেলের মাঝে কত পার্থক্য হয়।”

কেন যেন আরমানের খারাপ লাগলো আরজুর কথা শুনে। কথা বলার সময় আরজু হঠাৎ করেই কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি আর হোস্টেলের মাঝে পার্থক্যটা যেন আরজু কে খুব করে পো'ড়ায়। তার উপরে আবার মেয়েটা বলল বাড়ির গুরুত্ব কখনো ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। অথচ কন্ঠে সে বাড়ি নিয়ে কত আফসোস যেন প্রকাশ পেল। এমন কি কারণ বাড়ির গুরুত্ব বুঝতে না পারার? এই মেয়েটাকে বুঝতে চায় আরমান তবে বুঝেও যেন বুঝে উঠতে পারে না। কন্ঠটা একটু নরম করে আরজুকে বলল,

“আপনার বাড়ি কোথায় আরু? এতই যখন বাড়ির কথা মনে পড়ে তবে ঘুরে আসলেই তো পারেন। মনটাও ভালো হবে।”

আরজু আরমানের দিকে তাকালো। আরমানের সেই দৃষ্টিটা ভীষণ অদ্ভুত লাগলো। আরজু যেমন তীক্ষ্ম চোখে তাকায় কিংবা হাজারো প্রশ্ন থাকে তার দৃষ্টিতে আবার মাঝে মাঝে সন্দেহও থাকে তেমন দৃষ্টি না। অদ্ভুত দৃষ্টি। যে দৃষ্টির মানেটা আরমান বুঝলো না।

“বাড়ি তো ফিরতে পারবো না। বাড়ি ফেরার রাস্তা বন্ধ। আর একবার বাড়ি ফিরে গেলে কখনও আর এখানে আসতে পারবো না।”

আরমানের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো। আবার নতুন একটা রহস্যের গন্ধ যেন পাচ্ছে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“বাড়ি ফিরলে আর এখানে ফিরতে পারবেন না কেন?”

“সব কেনর উত্তর থাকলেও দিতে নেই। অন্তত অপরিচিত কাউকে তো কখনোই না।”

“এখনও আমি আপনার অপরিচিত?”

“হ্যাঁ অপরিচিত, আপনি এখনো আমার পর। আপনি এখনো আমার কাছের মানুষ না।”

আরমান আহত গলায় বলল,

“এত কিছুর পরেও আপনি এটা বলতে পারলেন আরু যে আমি আপনার কাছের মানুষ না? ভালোবাসি তো আপনাকে। বোঝেন না আমার ভালোবাসা? আমার স্বীকারক্তি গুলো কি আপনার কাছে মিথ্যে মনে হয়?”

আরজু অল্প একটু হেসে বলল,

“আমি যে ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না।”

আরমান অসহায় গলা বলল,

“কি করে আপনাকে বিশ্বাস করাই আমি বলুন তো?”

আরজু বিজ্ঞের মতন কিছু একটা ভেবে বলল,

“একটা বিষয় কি খেয়াল করেছেন আজ এক সপ্তাহ পর আমার আপনার সাথে দেখা হলো?”

“হ্যাঁ জানি তো।”

“একটা সপ্তাহ কিন্তু আমরা দুজন দুজনের ব্যাপারে কিছু জানতাম না। আমি কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম, কি করছিলাম এই সম্বন্ধে আপনি কিছু জানতেন না। ঠিক তেমনি আপনি কোথায় ছিলেন, কেমন ছিলেন আমিও কিচ্ছু জানতাম না। কাছের মানুষদের সাথে এতটা দূরত্ব হয় না।”

আরমানের কেন যেন মনে হলো আরজু এই কথাগুলো অভিমান থেকে বলল। যদিও মেয়েটা অভিমান করলে প্রকাশ করবে না কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হলো সত্যি কি আরজু অভিমান করতে পারে ওর উপর? যে মুখের উপর বলে দিচ্ছে যে আরমান ওর আপন না সেই মানুষটার উপরে কি অভিমান করবে আরজু?

সন্দেহটা রয়ে গেল আরমানের মধ্যে। দাবিয়ে রাখতে চাইলো না তাই প্রশ্ন করেই ফেলল।

“আপনি কি অভিমান থেকে এই কথাগুলো বললেন আরু? আমি কিন্তু ভার্সিটিতে আপনার খোঁজ নিয়েছিলাম একদিন কিন্তু সেদিন আপনি ছিলেন না। পার্কেও দুদিন গিয়েছিলাম কিন্তু আপনি আসেননি।”

আরজু কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। কিছু একটা গণনা করলো যেন। গণনা শেষে আরমান কে বলল,

“সাত দিনে একটা সপ্তাহ হয়। সেই সাত দিনের মাঝে আপনি তিনদিন আমার খোঁজ করেছেন বাকি চার দিন করেননি। যে তিন দিন খোঁজ করেছেন সেই তিন দিনও আমার খোঁজ না পাওয়ার পরে আমাকে খুঁজে বের করার কোন তাড়া আপনার মাঝে ছিল না। আর আমি অভিমান করি না। অভিমান তারাই করে যারা অন্যের উপর কোন কিছু আশা করে বসে থাকে। আর না আমি কারো ওপরে কিছু আশা করি, না আমার মনে অভিমান জমে।”

আরমানের কেন জানি এবারে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। মাত্র তিনদিন খোঁজ নিয়েছে বাকি চারদিন তো আরমান খোঁজ নেয়নি। তিন দিন যখন খুঁজে পায়নি তারপরও আরমানের মাঝে কোন তাড়া ছিলো না আরজু কে খুঁজে বের করার। তবে এই কথাটা আরমান অস্বীকার করবে না যে চিন্তা হয়েছিল আরজুর জন্য। অনেক চিন্তা হয়েছে কিন্তু আরজু কে খুঁজে বের করার কোন তাড়া ছিল না। চাইলেই তো মুনতাসির কে জিজ্ঞেস করতে পারতো কিন্তু করেনি। জিজ্ঞেস না করার কারণ আরমানের ভাবনাতেই আসেনি এই বিষয়টা। আরমান যতদূর জানে হোস্টেলে আরজুর সাথে একই রুমে মুনতাসিরের কাজিন থাকে। সেই হিসেবেও তো আরমানের খোঁজ করা উচিত ছিল। কিন্তু আরমান করেনি। রাজনীতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে একবার মাত্র আরজুর খোঁজ নিয়েই দায় সারা হয়ে গিয়েছিল।

মেয়েটা আদৌ ঠিক আছে কিনা সেসব জানার প্রয়োজন বোধ করেনি। নিজের অপরাধটা মেনে নিল আরমান। মাথা নিচু করে অপরাধী গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার ভুল হয়ে গেছে আরু। আমি বুঝতে পেরেছি আমি ভুল করেছি। আসলে এই কটা দিন না নির্বাচনের জন্য ভীষণ ব্যস্ততার মাঝে ছিলাম।”

আরজু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“যদিও আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করিনা তারপরও বলছি আপনাকে, যাকে ভালোবাসবেন গুরুত্বের তালিকায় তাকে প্রথমে রাখতে হয়। এসব ব্যস্ততা নিছক একটা অজুহাত। আপনি চাইলেই আমার খোঁজ নিতে পারতেন।”

“হ্যাঁ আমি জানি আমি অপরাধ করেছি। ব্যস্ততা হয়তো একটা অজুহাত। তবে আরু একটা কথাই বলবো আমার অপরাধটা কি ক্ষমা করা যায় না?”

“আমি নির্দয়। আমার হৃদয়টা বড্ড কঠিন সেখানে কারো জন্য মায়া, দয়া, ক্ষমা কিছু নেই।”

আরমান আলতাে হেসে বলল,

“আমি জানি আপনার হৃদয় এতটাও কঠিন না। দেখুন আরু আমি এর আগে কখনো কোন মেয়ের পেছনে এভাবে ঘুরিনি। আমি জানিনা মেয়েরা কিসে রাগ করে? কি করে তাদের রাগ ভাঙাতে হয় আমি তাও জানি না। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি যদি আমি ভুল করি তার জন্য আপনার কাছে হাজার বার ক্ষমা চাইতে পারি। আপনি ক্ষমা না করলে সারাদিন রাত আপনার পিছু পিছু ঘুরে ক্ষমা চাইতে পারি। এতে আমার কোন আপত্তি নেই। যদি ভুলটা আমার হয় তবে আমি হাজার বার আপনার কাছে ক্ষমা চাইবো। আর কখনো যদি ভুলটা আমার না হয়ে থাকে তবুও যদি আমার ক্ষমা চাওয়াতে আপনি খুশি হন তবে আমি তাও করতে রাজি।”

আরজু এবারে সন্দেহী গলায় বললো,

“সত্যি ভালোবাসেন আমায়?”

আরমান আরজুর দিকে কিছুটা ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“বড্ড ভালোবাসি আরু। আমায় একটু ভালোবাসা দিন না! আপনার একটু ভালোবাসার বদলে আমি আপনাকে অসীম ভালোবাসা উপহার দেব।”

“ভালোবাসা না দিলে ভালোবাসবেন না?”

“ভালোবাসবো না যে এমনটা নয়। এখনও আপনি আমায় ভালোবাসেন না তারপরও আমি আপনাকে ভালোবাসি। তবে কি বলুন তো আমিও একটু আপনার ভালোবাসা অনুভব করতে চাই আরু। আমার আরুর এই ধারালো কন্ঠস্বরে ভালোবাসার কথা শুনতে কেমন লাগে সেসব জানতে চাই।”

আরজু বিশ্বাস করতে চাইলো আরমানের কথাটা। ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দেওয়ার সময় আরমানের কন্ঠটা একটুও কাঁপেনি, ভালোবাসে সেই কথাটা বলেছে একদম আরজুর চোখে চোখ রেখে, চোখের পাতা একটাবারের জন্যও কাঁপেনি। আরজু বুঝতে পেরেছে আরমানের সেই দৃষ্টিতে ছিল কেবলই আরজুর জন্য মুগ্ধতা। আরজুর মনে হলো না এই মানুষটা মিথ্যে বলতে পারে।

তবে এত কিছু ভাবনার পরেও আরজু পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারল না। আরজুর যে ভালোবাসার প্রতি বড্ড অবিশ্বাস, মানুষ কে নিয়ে বড্ড অবিশ্বাস। এই সমাজের পুরুষদের নিয়ে যে বড্ড অবিশ্বাস জমে আছে আরজুর মনে। প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনে তাদের বাবা হয় তাদের আদর্শ। বাবার পরে আদর্শ হয় তাদের বড় ভাই। মেয়েরা আর কাউকে বিশ্বাস করুক বা না করুক এই দুজন পুরুষকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারে অথচ আরজু সবথেকে বেশি অবিশ্বাস করে এই দুটো মানুষকে। ওরা কখনো আরজুর আদর্শ হতে পারেনি। বরং সব সময় আরজুর চোখে ঘৃণিত হয়ে এসেছে।

বেশ অনেকক্ষণ আরমান আরজু কে ভাবার সময় দিল। তবে আর অপেক্ষা করতে পারলো না।

“কি হলে আরু বলুন একটু ভালোবাসবেন আমায়?”

আরজু ধ্যান থেকে বেরিয়ে এলো। কোন কিছু ভাবনা ছাড়াই গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,

“হাজার বার করে বলেছি আপনাকে আমার হৃদয়ে কারো জন্য মায়া, মমতা কিংবা ভালোবাসা কিচ্ছু নেই। আশা ছেড়ে দিলে ভালো হয়।”

আরমানের বুক চিরে এটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। খারাপ লাগলো না বরং অসহায় লাগলো নিজেকে। কে জানে কবে বোঝাতে পারবে মেয়েটাকে নিজের মনের কথা? আদৌও বুঝবে তো কখনো এই মেয়েটা? আরমান জানে আরজু বুঝেও বোঝেনা যে আরমানের অনুভূতির স্বীকারোক্তিগুলো মিথ্যে না কিন্তু তবুও সেটা মানতে নারাজ।

আরজুর চোখে চোখ রেখে আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন নিজের গভীর চোখ দুটোর মাঝে? আপনার চোখ দুটো দেখে মনে হয় কত অব্যক্ত অনুভূতি লুকিয়ে রেখেছেন সেখানে। একবার যদি সেই রহস্যের দেয়ালগুলো সরান তবে না জানি আমি কত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব। এত রহস্য কেন আপনার মাঝে? ধীরে ধীরে কেন আপনি আমার কাছে এক জটিল রহস্যময় মানবী হয় উঠছেন আরু?”

“মানুষের গোটা জীবনটাই রহস্যময়। রহস্য আমার ভীষণ পছন্দ। আমার জীবনে যে ঠিক কত রহস্য লুকিয়ে আছে সেটা আপনি আন্দাজও করতে পারবেন না।”

“কে আপনি? কেন এত রহস্য আপনার মাঝে?”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“রহস্যের রহস্যতায় রহস্যময়ী এক নারী আমি। যার প্রত্যেক পরতে পরতে পাবেন এক জটিল রহস্যের ছোঁয়া।”

__________

রাত একটার পর মুনতাসিরের জ্ঞান ফিরলো। শরীরটা এখনো বেশ দুর্বল তাই ঠিকঠাক কথা বলতে পারছে না। রুবিনা খাতুন বেশ অনেকক্ষণ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন সেই সাথে মৃন্ময়ীও।

আরমান নিজেও ওনাদেরকে সান্ত্বনা দিতে চাইলো তবে তখনই মনে পড়ে গেল আরজুর বলা কথাটা,

“সব কিছুর সান্ত্বনা হয় না।”

কিন্তু তাই বলে এভাবে কাঁদতে দেবে? যদি রুবিনা খাতুনের শরীর খারাপ করে? আরমান আর চুপ করে থাকতে পারলো না। সত্যি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে নিলে আরজু থামতে বলল। আরমান অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“একটু সান্ত্বনা দেব না? জানি সান্ত্বনা দিয়ে লাভ হবে না কিন্তু তারপরও দেওয়া উচিত তো।”

আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“কাঁদতে দিন ওনাদেরকে। না কাঁদলে ভেতরের কষ্টগুলো বের হতে পারবে না। আর সেই কষ্টগুলো জমতে জমতে এক সময় আমার মতন নির্দয় হয়ে যাবে ওনারা যা ঠিক হবে না।”

আরমান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো আরজুর দিকে। ধ্যান ভাঙ্গলো হঠাৎ করে মৃন্ময়ীর চিৎকারে। তাকিয়ে দেখল মৃন্ময়ীর উপর রুবিনা খাতুন ঢলে পড়েছেন। আরমান তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে রুবিনা খাতুন কে আঁকড়ে ধরল। মুনতাসির অস্থির হয়ে উঠলো। উঠে বসতে চাইলো তবে শরীর সায় দিল না।

আরজু তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,

“চুপচাপ শুয়ে থাকুন। উনি শুধু সেন্সলেস হয়ে গিয়েছেন। হয়তো প্রেসারের সমস্যা হয়েছে। এ ছাড়া আর কিছু হয়নি কিন্তু আপনি বেশি অসুস্থ।”

মুনতাসির সত্যি থেমে গেল। এমনিতেও মুনতাসিরের শরীরের এখন যে অবস্থা উঠে বসার শক্তিটুকু নেই। এদিকে আরমান তখন রুবিনা খাতুনকে ধরে আছে। ওনাকে রেখে যেতেও পারছে না, মৃন্ময়ী কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। আরমান কে এমন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে দেখে আরজু নিজেই ডাক্তারকে ডাকতে গেল। ডাক্তারকে পেল না একজন নার্স কে সাথে করে নিয়ে এলো। নার্স এসে দেখে বলল তেমন কোন সমস্যা নেই জ্ঞান হারিয়েছে মাত্র। আরমান আর মৃন্ময়ী মিলে ওনাকে ওয়ার্ডে নিয়ে গেল।

খুব অল্প সময়ের মাঝে ওনার জ্ঞান ফিরে এলো। তেমন গুরুতর সমস্যা হয়নি জন্য আর ভর্তি করাতে হলো না হাসপাতালে। আরমান ভাবলো ওনাকে আর এখানে রাখা ঠিক হবে না। হাসপাতলে থাকলে মুনতাসিরের এই অবস্থা দেখে উনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তবে এত রাতে তো আর একাও ছাড়তে পারবে না। যে ছেলেটা ওদেরকে নিয়ে এসেছিল ও চলে গেছে। এত রাত অবধি না থাকাই স্বাভাবিক। আরমান তাই ভাবল নিজেই গিয়ে রেখে আসবে। মৃন্ময়ী কে রুবিনা খাতুন এর কাছে রেখে আরমান আবার মুনতাসিরের কেবিনে এলো। মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি আন্টি আর মৃন্ময়ী কে বাসায় রেখে আসছি। আন্টির শরীর ঠিক নেই, একটু রেস্ট দরকার। আমি ওদেরকে বাসায় রেখে আবার চলে আসবো।”

মুনতাসির দুর্বল কণ্ঠে বলল,

“না ভাই আপনাকেও আর আসতে হবে না। অযথা এত কষ্ট করার দরকার নেই। আপনি বাড়ি চলে যান আমি ঠিক আছি এখন।”

আরমান কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“এত কথা বলতে বলিনি তোমায়। অসুস্থ তারপরও মুখ বন্ধ থাকে না তাই না? চুপচাপ থাকো।”

আরমান এবারে কেবিনের এক পাশে দাঁড়ানো আরজুর কাছে এগিয়ে গিয়ে ওকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরু আমি আন্টি আর মৃন্ময়ী কে বাসায় রেখে আসছি কেমন? আপনি কি হোস্টেলে যাবেন না এখানেই থাকবেন?”

কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়াই আরজু উত্তরে বলল,

“এখানেই থাকি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমিও ওনাদের কে রেখেই আবার চলে আসবো।”

“আমি একা থাকবো এতক্ষণ? যদি কিছু করার দরকার হয় কি করে করবো?”

“কিছু করার দরকার হবে না। চিন্তা করবেন না আমার বেশিক্ষণ লাগবে না। আমি বাইক নিয়ে এসেছি। বাইকেই রেখে আসবো।”

আরজুর পরবর্তী উত্তরের জন্য আরমান অপেক্ষা করলো। কিছু একটা ভেবে আরজু বলে উঠল,

“না আপনি এখানে থাকুন। যদি ওনার আপনাকে কোন দরকার হয়! কোন ইমারজেন্সি সিচুয়েশন হলে আমি হয়তো সামলাতে পারবো না। এসব ইমারজেন্সি সিচুয়েশন সামলানোর অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি গিয়ে আপনার আন্টি আর মৃন্ময়ী কে বাসায় রেখে আসছি।”

“আপনি কি করে যাবেন এত রাতে?”

“কেন? কি হবে গেলে?”

“কি হবে গেলে মানে এত রাতে একা একা তিনজন মেয়েকে আমি ছাড়বো নাকি? পা'গল পেয়েছেন আমায়? এটা সেফ হবে না।”

আরজু বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“চিন্তা করবেন না আমি ওদের সাথে থাকলে ওদের কিছু হতে দেব না।”

“কিন্তু আপনার যদি কিছু হয়?”

বিজ্ঞাপন

“হলে হবে সমস্যা কি?”

আরমান ধমক দিয়ে বলল,

“চুপ। অনেক সমস্যা আছে। এখানে থাকুন। আমি ওনাদেরকে বাড়ি ছেড়ে আসছি। বেশি সময় লাগবে না আমার।”

আরমানের ধমকে আরজু থেমে গেল। আরমান চলে গেল। মৃন্ময়ীদেরকে নিয়ে নিচে নামলো। আরমান বাইক আনতে যেতে ধরলে হঠাৎ করে কোত্থেকে একটা কম বয়সী মেয়ে রুবিনা খাতুন এর কাছে এলো। মেয়েটা এসেই কেমন কান্নাকাটি শুরু করে দিল যাকে বলে একদম ম'রা কান্না।

আরমান ভরকালো। চেনে না এই মেয়েটাকে সে। হঠাৎ করে কান্নার কারণটাও বুঝতে পারল না। মুনতাসিরের মা আর বোন ছাড়া যে আরো কোন কাছের আত্মীয় আছে ওর সেই বিষয়ে আরমানের ধারণা নেই।

ইরা ক্রন্দনরত কন্ঠে রুবিনা খাতুন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা মুনতাসির কোথায়? ও কেমন আছে?”

ইরার মুখ থেকে মা ডাক শুনে আরমান বেশ চমকালো। মুনতাসিরের যে আরো একটা বোন আছে কই আরমান তো জানতো না। আগে তো কখনো মুনতাসির বলেনি। সেদিনই তো বলল ওরা এক ভাই, এক বোন। আবার এই মেয়েটা নাম ধরে ডাকছে মুনতাসির কে। তার মানে কি এটা মুনতাসিরের বড় বোন? তবে এতদিন কোথায় ছিল? মুনতাসির বলেনি কেন ওর কথা? কোন কি ঝামেলা হয়েছিল নাকি? হ্যাঁ হতেই পারে।

ততক্ষণে সেখানে ইরার বাবাও চলে এসেছেন। তিনিই মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। রুবিনা খাতুন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ভাবি মুনতাসির কেমন আছে?”

“এখন ভালো আছে। উপরে আছে। ইরা মা যাও তুমি দেখে এসো ওকে।”

ইরা ব্যস্ত গলায় বলল,

“কোন ফ্লোরে মা?”

মৃন্ময়ী আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরমান ভাইয়া আপনি একটু ইরা আপুকে নিয়ে যাবেন ভাইয়ের কাছে?”

এবারে আরমান নিশ্চিত হলো যে এটা মুনতাসিরের বড় বোনই হবে। যেহেতু মৃন্ময়ীও আপু বলে ডাকল। তবে কথা হলো আরমান যদি ইরাকে নিয়ে যায় তবে ওদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেবে কে। সেই কথাটাই আরমান বলল,

“আমি গেলে তোমাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেবে কে? অনেকটা দেরি হয়ে যাবে তো। আন্টির শরীরও ভালো না, দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না বেশিক্ষণ।”

পাশ থেকে ইরার বাবা বলে উঠলো,

“তুমি ইরাকে নিয়ে যাও আমি ভাবি আর মৃন্ময়ী কে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। ওদের সাথে কিছু কথাও আছে আমার। ইরা তুমি যাও মুনতাসির কে দেখে এসো। আর আমি ভাবিকে পৌঁছে দিয়ে আবার এসে তোমাকে নিয়ে যাব দরকার হলে।।”

ইরা সরাসরি আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তাড়াতাড়ি চলুন প্লিজ!”

আরমানও আর কোন কথা বলল না। ইরার অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা প্রচন্ড ভয়ে আছে মুনতাসির কে নিয়ে। আর ওকে না দেখা পর্যন্ত এই অস্থিরতা কিংবা কান্না কোনটাই থামবে না। এর মধ্যে আরমানের কিছু বলা খারাপ হয়ে যেতে পারে। হয়তো মেয়েটা রেগে যাবে উল্টোপাল্টা আবার কিছু বলে দেবে।

আরমান আগে আগে গেলে ইরা ওর পিছনে পিছনে এলো। মুনতাসিরের কেবিনের সামনে গিয়ে আরমান ইরাকে দেখিয়ে বলল,

“এটা মুনতাসিরের কেবিন।”

ইরা আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে দৌড়ে কেবিনের ভেতরে চলে গেল। কেবিনে তখনো আরজু উপস্থিত আছে। এখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এক কোণায়। মাঝে মাঝে দু একটা কথা বলছে মুনতাসিরের সাথে। শান্ত পরিবেশের মাঝে ইরা হঠাৎ করে একটা ঝড় হয়ে ঢুকলো যেন। সোজা গিয়ে মুনতাসির কে জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ করে এসে এভাবে জড়িয়ে ধরায় মুনতাসির নিজেও একটু চমকে উঠলো। ভাবেনি যে এখন ইরা আসবে। তার মধ্যে অনেক রাত হয়ে গেছে।

এদিকে ইরা এসে হঠাৎ করে মুনতাসিরকে এভাবে জড়িয়ে ধরাতে আরজু চমকালো। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকালো। এদিকে রুমে ঢুকে একই দৃশ্য দেখে আরমানও থমকালো।

ইরা মুনতাসির কে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,

“ঠিক আছে তুমি? এভাবে কেউ ভয় দেখায়? তুমি জানো আমি কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম? আমি ভেবেছিলাম আমি বোধহয় তোমায় হারিয়ে ফেললাম। বিকেল থেকে তোমার একটা ফোনের অপেক্ষা করছিলাম। কতবার তোমার নাম্বারে ডায়াল করেছি কিন্তু বন্ধ পেয়েছি। কত ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি জানো? তারপর যখন তোমার অ্যাক্সিডেন্টের কথাটা শুনলাম আমার প্রাণটাই যেন বেরিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম হয়তো আমার মনু কে আমি হারিয়ে ফেললাম।”

মুনতাসির ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“চুপ করো ইরাবতী। আমি ঠিক আছি, কিছু হয়নি আমার। তোমায় ছেড়ে আমি কোথায় হারিয়ে যাব?”

এদের কথাবার্তার ধরন তো মোটেও স্বাভাবিক না। আরমানের কাছে অন্তত স্বাভাবিক লাগলো না। ভাই-বোনের কথাবার্তা এমন হতেই পারে না।

আরমানকে আসতে দেখে আরজু বেশ খুশি হলো। যাক আরমান সত্যিই বেশিক্ষণ অপেক্ষা করায়নি।

আরজু গুটিগুটি পায়ে আরমান এর কাছে এসে প্রশ্ন করল,

“এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন যে?”

আরমান মুনতাসির আর ইরার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। আচ্ছা আরু একটা কথা বলুন তো, ওই মেয়েটা মুনতাসির কে জড়িয়ে ধরে এভাবে কাঁদছে কেন? কথাবার্তাও কেমন অন্যরকম লাগছে না? কে হতে পারে ওই মেয়েটা?”

আরজু একবার ইরাকে দেখে নিয়ে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“উনি তো ইরা আপু।”

আরমান চমকে আরজুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

“আপনি চেনেন ওনাকে?”

আরজু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। আরমান ফের প্রশ্ন করলো,

“কে হয় উনি মুনতাসিরের?”

“ইরা আপু কাজিন হয় ওনার।”

“মানে বোন?”

“হ্যাঁ। যেহেতু মেয়ে বোনই হবে, ভাই তো আর হবে না।”

“না সেটা বলছিলাম না। শুধুই বোন? ওদের কথাবার্তা শুনে কি আপনার একটুও অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছে না? মানে ধরুন আমি আপনার সাথে যেভাবে কথা বলি তেমন ভাবে কথাবার্তা বলছে না?”

আরজু আবারো মুনতাসির আর ইরার দিকে তাকালো। প্রথমেই তো আরজুর কিছু একটা সন্দেহ হয়েছিল তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার সেটা ভুলেও গিয়েছিল। ভেবেছিলো হয়তো ও নিজেই উল্টোপাল্টা কিছু ভাবছে। কিন্তু এখন আরমানেরও সন্দেহ জেগেছে শুনে আরজুর সন্দেহটাও বাড়লো। আরমানের কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,

“হ্যাঁ সন্দেহ হচ্ছে।”

“আমারও সন্দেহ হচ্ছে। কিন্তু কি করে কি জিজ্ঞেস করি বলুন তো?”

আরজু এবারে অল্প বিরক্তিকর গলায় বলল,

“জিজ্ঞেস করার দরকার কি? অন্যের জীবনে হস্তক্ষেপ করার তো কোন প্রয়োজন নেই তাই না?”

আরজুর কন্ঠ শুনেই আরমান দমে গেল। বুঝলো এখন অতিরিক্ত কোন প্রশ্ন করলে আরোও রেগে যেতে পারে। আর আরজু কে রাগানো মোটেও ঠিক হবে না।

এদিকে মুনতাসিরকে জড়িয়ে ধরে সেই যে কান্না শুরু করেছে না করেছে মেয়েটা আর থামার নামই নিচ্ছে না। মুনতাসির নিজের দুর্বল শরীর নিয়েও ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলো। তবে মেয়েটার কান্না বেগ থামতেই চাইছে না বরং মুনতাসির এর থেকে প্রশ্রয় পেয়ে যেন কান্না আরো ধীরে ধীরে বাড়ছে।

এতক্ষণে মুনতাসিরের নজর পড়লো সামনে দাঁড়ানো আরমান আর আরজুর উপরে। মুনতাসির তো ভুলেই গিয়েছিল যে কেবিনে আরো দুজন মানুষ আছে। ছেলেটা লজ্জা পেয়ে গেল। তার মধ্যে আরমানের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল যে আরমান খুব করে বুঝতে চাইছে ওদের সম্পর্কটা কি। ইরা কেন ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

মুনতাসির ধীর গলায় ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইরাবতী ওঠো, কেবিনে আরো মানুষ আছে। ওরা দেখছে তো।"

ইরার কানে মুনতাসিরের কথাটা গেল কি গেল না কে জানে। আরো শক্ত করে যেন জড়িয়ে ধরল। ক্রন্দনরত গলায় বলে উঠলো,

“চুপ থাকো। আমার তো একটা কথাও শোনো না। কতবার করে বলেছি একটু সাবধানে থাকবে। রাজনীতি করছো করো আমি তো কিছু বলিনি। কিন্তু এত শত্রু তৈরি করো কেন যে ওরা তোমাকে মা'রতে আসে? আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যেত তাহলে আমার কি হতো একবার ভেবে দেখেছো? আমার স্বপ্ন গুলোর কি হতো? তোমায় ছাড়া বাঁচতাম কি করে আমি?”

আরমানের চোখ আরো বড় বড় হয়ে গেল। ওরে বাবা! এখানে তো একে অপরকে ছাড়া বেঁচে না থাকার প্রসঙ্গও চলে এসেছে। আবার স্বপ্নও আছে অনেক। আরমানের মনে হলো যে মুনতাসির বোধহয় প্রেম করে এই মেয়েটার সাথে। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হলো কথাটা। মুনতাসির কে দেখে যা মনে হয় প্রেম করার মতন ছেলে ও না, তবুও ওর গার্লফ্রেন্ড আছে। আর এখানে আরমান প্রেম করার জন্য একেবারে প্রস্তুত তবে যার সাথে করতে চাইছে তার কোন হেলদোলই নেই।

মুনতাসির আবারো ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

“আর কেঁদোনা। দেখো আমি ঠিক আছি। এখন ওঠো, দেখো কেবিনে আরো অনেক মানুষ আছে। ওরা দেখছে, পরে কিন্তু তুমিই লজ্জা পাবে বেশি।”

ইরা এবার ছেড়ে দিল মুনতাসির কে। উঠে বসে একবার তাকিয়ে দেখল যে কে কে আছে। আরজু কে দেখতেই ইরার চোখ কপালে উঠে গেল। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আরজু তুমি এখানে কি করছো?”

আরজু বেশ চটপট স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“আমি এখানে চাকরি করি আপু।”

“তার মানে তুমি জানতে যে মুনতাসিরের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?”

“হ্যাঁ। যখন ওনাকে হাসপাতালে ভর্তি করায় তখন থেকেই জানি। সেজন্যই তোমায় টেক্সট করে বলেছিলাম যে আজ রাতে ফিরবো না।”

“আমায় আগে জানাওনি কেন? তাহলে তো আমি আরো আগে আসতে পারতাম?”

আরজু কিছু একটা ভেবে বলল,

“অত কিছু মাথায় আসেনি। আর ওনার অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা যে তোমার জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটাও বুঝতে পারিনি। আসলে এখানে এসে মৃন্ময়ীর কান্না না দেখলে বুঝতাম না যে ভাইয়ের জন্য বোনদের এত কষ্ট হয়। সেজন্য হয়তো ভেবেছিলাম যে তোমারও তোমার ভাইয়ের জন্য তেমন কষ্ট হবে না তাই জানায়নি।”

আরজুর শেষের বাক্যটা শুনে ইরা তড়িৎ গতিতে আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কিসের ভাই? কেমন ভাই? ও আমার ভাই হতে যাবে কেন?”

আরজু চুপ করে গেল। আগে মনে মনে কিছুক্ষণ সম্পর্ক মেলানোর চেষ্টা করলো। মনে করার চেষ্টা করলো যে ইরা কি পরিচয় দিয়েছিল মুনতাসিরের। হ্যাঁ কাজিনই বলেছিল, তাহলে তো ভাইই। তবে ইরা রিঅ্যাক্ট করছে কেন?

“উনি ভাই না তোমার?”

“আরে না। ভাই ছিল এখন আর নেই। ভাই থেকে জামাই বানিয়ে নিয়েছি।”

ইরা কথাটা বলার সাথে সাথে দু জোড়া বিস্ফোরিত দৃষ্টি মুনতাসিরের উপরে পড়লো। মুনতাসিরের এবার অস্বস্তি আরো বাড়লো। এই লজ্জার কারণেই তো এতদিনেও আরমানকে কিছু বলেনি এ ব্যাপারে। আরমান গুটি গুটি পায়ে মুনতাসিরের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“মুনতাসির জামাই মানে কি? মানে আমি যা ভাবছি সেটাই ঠিক?’

কেন যেন আরমানের কথাটা শুনে মুনতাসিরের হাসি পেল। ঠোঁট টিপে হাসিটা সংবরণ করে ইরাকে দেখিয়ে বলল,

“হ্যাঁ ভাই। ও ইরা, আমার স্ত্রী।”

আরমান ধপ করে বেডের উপরে বসে পড়লো। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এই ছোট ছেলেটাও বিয়ে করে নিয়েছে আর আরমান এতদিনেও কিছু করতে পারলো না। সন্দেহী গলায় নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুনরায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই মুনতাসির মজা করছো না তো? তুমি তো ছোট। আমার আগে তুমি বিয়ে করতে পারো কি করে?”

“না ভাই মজা করছি না। এক বছর হলো আমরা বিয়ে করেছি।”

আরমান আর বলার মতন কিছু খুঁজে পেল না। অসহায় দৃষ্টিতে আরজুর দিকে একবার তাকালো। বিয়ে করার শখ তো আরমানের বহু পুরনো কিন্তু এই মেয়ে কি আদৌ কখনো পূরণ হতে দেবে সেই শখ?

এদিকে আরজুর মনে তখনও হাজারো প্রশ্নের আনাগোনা চলছে। মুনতাসির আর ইরা বিয়ে করে নিয়েছে কিন্তু ইরা যে একজনের সাথে ফোনে কথা বলতো তাহলে ওই লোকটা কে ছিল? ইরা তো কখনো বলেনি যে ওটা মুনতাসির ছিল। তাহলে কি ওটা মুনতাসির ছিল না, অন্য কেউ ছিল? আরজু কোনমতেই নিজের প্রশ্নটা দমিয়ে রাখতে পারলো না। ইরাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করেই ফেলল।

“ইরা আপু, তবে যে তুমি ফোনে একজনের সাথে কথা বলতে তুমি তো কখনো বলনি যে উনি তোমার স্বামী। তবে কি উনি অন্য কেউ ছিল?”

ইরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,

“আরে না। পা'গল নাকি? কি যে বলোনা তুমি আরজু। ওটা মুনতাসিরই ছিল। আসলে এই ছেলে আমাকে নিষেধ করেছিল যেন আমি কাউকে না বলি যে আমি ওর স্ত্রী। দেখছো না ওর শত্রুদের অবস্থা। ওকেই ছাড়ছে না তাই ও ভয় করে আমায় নিয়ে। সেজন্য কাউকে বলি না।”

আরজু আর কোন প্রশ্ন করল না। আরমান আরো বেশ কিছুক্ষণ মুনতাসিরকে একই কথা জিজ্ঞেস করলো। কি করে বিয়ে করল, কবে বিয়ে করল, কেন বিয়ে করলো? ইরা কি করে রাজি হলো এটা হচ্ছে আরমানের সবথেকে বড় প্রশ্ন।

এক পর্যায়ে মুনতাসির উত্তর দিতে হাঁপিয়ে গেল। তখন আরমান নিজ থেকেই ওকে ছেড়ে দিল। আরজুর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অসহায় গলায় বলল,

“দেখেছেন আরু সবাই বিয়ে করে নিল শুধু আপনি আর আমি করলাম না।”

আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনি করে নিন বিয়ে। আমি কখনো বিয়ে করব না।’

আরমান পুনরায় অসহায় গলায় বলল,

“এভাবে বলে না আরু।”

আরজু কোন উত্তর দিল না। আরমানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মনে হলো যেন সত্যি আরমানের আর বিয়ে করা হবে না। এই মেয়ে কোনদিন আরমানকে বিয়ে করতে রাজিই হবে না।

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প