তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ১১

🟢

ভার্সিটির মাঠে দাঁড়িয়ে আছে আরজু। একদম ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। কেন দাঁড়িয়ে আছে জানেনা। কারো অপেক্ষা করছে কিনা সেসবও জানে না। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে আরমানের অপেক্ষা করছে। আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে যে না ও কারো অপেক্ষা করছে না। মন চাইছে তাই দাঁড়িয়ে আছে।

তবে সত্যি বলতে গেলে আরজু তো আরমানকেই খুঁজছে। আরজুর মনে যে একটা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর আগের দিন আরমান বলেছিল আরজুর ভালোবাসায় না কি জান কুরবান কিন্তু এই কথাটা কেন বলেছিল? আরমান কি তবে আরজুকে ভালোবাসে? এই উত্তরটাই আরজুর জানা দরকার। যখন কথাটা বলেছিল তখন অত কিছু বুঝতে পারেনি। তখন শুধু মনে হয়েছিল বিরক্তিকর কিছু একটা বলেছে তাই চলে গিয়েছিল সেখান থেকে। তবে বাড়ি ফেরার পর খুব গভীরভাবে যখন আরমানের কথাগুলো আরেকবার ভেবেছিল তখন মনে হয়েছিল এই কথাটা।

তবে আজ আরমানের দেখাই পাচ্ছে না। কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারছে না। আরমানের নাম শুনলেই সবাই ভূত দেখার মতন চমকে ওঠে। এমন ভাব দেখায় যেন খুব বড় নেতার কথা জিজ্ঞেস করেছে।

তবে খুব বেশিক্ষণ আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে মন চাইলো না আরজুর। ভাবলো আজ আর ভার্সিটিতে আরমানের সাথে দেখা হওয়ার সম্ভবনা নেই। এমনিতেই রোজ তো ছেলেটা পার্কে আসেই, আজও নিশ্চয় আসবে। তখনই না হয় প্রশ্ন করা যাবে।

আরজু আনমনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে গেটের দিকে হাঁটা ধরল। গেটের কাছাকাছি যেতেই একজন ওর পথ রোধ করে দাঁড়ালো। আরজু সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চেনার চেষ্টা করল তবে চিনতে পারলো না। প্রশ্নাত্নক গলায় কলেজে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কে?”

হামিদ বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আরে চিনতে পারলে না আমায়?”

“চেনার কথা ছিল?”

“এত ঝামেলা হলো তোমায় নিয়ে, তোমার সাথে আরো অনেকের সাথে আর এখন আমাকেই ভুলে গেলে? নাকি আবার ভয়ে এমন বলছো? আরে ভয় নেই, ভয় নেই কিছু করবো না আমি।”

“আপনাকে তো চিনিইনি তবে ভয় পাওয়ার কথা আসলো কোথা থেকে? কে আপনি যে আপনাকে দেখে ভয় পেতে হবে আমার?”

হামিদ এবারে হেসে উঠলো। হামিদের সেই হাসি আরজু কে যেন কোনো আগাম ঝড়ের পূর্বাভাস দিল। তবে আরজু তা বুঝলো না। হামিদ হাসতেই হাসতেই বলল,

“ভয় পাবে, নিশ্চয়ই ভয় পাবে তবে সময় এলে। আপাতত আমি এমন কিছু করবোনা যেন তুমি আমায় ভয় পাও। তবে একটা বিষয়ে সত্যিই অবাক হচ্ছি, তুমি আমায় সত্যি চিনতে পারোনি?”

আরজু সহজ সাবলীল গলায় বলল,

“আপনাকে মিথ্যে বলে আমার কোন লাভ নেই। কোন কারণও নেই আপনাকে মিথ্যে বলার।”

হামিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হেসে বলল,

“তোমার সাথে খেলতে দারুণ লাগবে। তুমি খুব ভালো খেলোয়াড়। এতদিন যাদের সাথে খেলেছি তাদের সবার চোখে আমার জন্য একটা ভয় ছিল কিন্তু তোমার চোখে আমার জন্য সেই ভয়টা আমি কখনোই দেখিনি। প্রতিপক্ষ শক্ত পোক্ত না হলে মজা আছে নাকি খেলে? যাইহোক একবার এই নির্বাচনের খেলাটা শেষ করি তারপর তোমার সাথে নতুন করে একটা খেলা শুরু করব।”

কথাটা বলে হামিদ সেখান থেকে চলে গেল। আরজু ঠায় সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবলো লোকটা কে ছিল? এত কিছু বলে গেল আরজু কে অথচ আরজু চিনতেই পারলো না লোকটাকে। কি এমন সম্পর্ক ওই লোকের সাথে আরজুর? লোকটার কথা শুনে মনে হলো শত্রুতারই সম্পর্ক। কিন্তু শত্রুতাটা তৈরি হলো কোথা থেকে?

আপাতত ভাবনাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে আরজু যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দেখলো সামনে আরমান দাঁড়িয়ে। আরজুর বোধহয় একটু ভালোই লাগলো, খুশিও হলো তবে হাসলো না। আরজুর গম্ভীর স্বভাবের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে হাসতে পারল না।আরমানকে দেখে যে একটু ভালো লেগেছে সেসবও বলতে পারল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।

এদিকে আরজুর সাথে হামিদ কে কথা বলতে দেখে আরমান চিন্তার মাঝে পড়ে গেছে। কি কথা বলছিল ওরা দুজন সেসব জানতে ইচ্ছে করলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ওই লোকটা কে আপনি চেনেন? আপনার সাথে যে এখনি কথা বলে গেল। কি কথা বলল? কি নিয়ে কথা হলো আপনাদের মাঝে?”

“উনি ওনার মতনই কথা বলে গেলেন। আমি ওনাকে চিনতে পারিনি। তবে ওনার কথা শুনে মনে হলো উনি আমাকে চেনেন এবং আমিও ওনাকে চিনি। তবে সত্যি বলতে আমার মনে পড়লো না উনি কে?”

আরমান বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“এমনও হয়? আপনি এত তাড়াতাড়ি মানুষকে ভুলে যান?”

“মানুষকে মনে রেখে লাভ কি?”

“আবার সেই লাভ ক্ষতির হিসেবে চলে এলেন?”

“অবশ্যই। না আপনি আমাকে বলুন মানুষকে মনে রেখে লাভ কি আমার? কেউ তো আমার কোন উপকারে আসবেই না তবে আমি তাদেরকে মনে রেখে কি করব?”

“বুঝেছি। ওনাকে চিনতে পারেননি ভালো কথা তবে কি বলে গেল সেটা বলুন?”

“কি সব খেলার কথা বলে গেলেন আমার সাথে। আমি যখন বললাম ওনাকে দেখে ভয় পাওয়ার কি আছে তখন উনি বললেন ভয় পাবো আমি একসময়। আগে নির্বাচনের খেলা শেষ হলে তারপর নাকি উনি আমার সাথে খেলবেন। ওনার প্রতিপক্ষ হিসেবে আমাকে খুব পছন্দ হয়েছে।”

আরমান এবার আরো চিন্তায় পড়ে গেল। আজ আকাশে কুয়াশা নেই। একটু রোদ উঠেছে। তবে আবহাওয়া খুব বেশি গরম না। তবে এর মাঝেই আরমানের কপালে ঘামের দেখা পাওয়া গেল। চিন্তিত গলায় বলল,

‘আরো একটু ভালো করে মনে করুন ওনার সাথে আপনার কোন ঝামেলা হয়েছিল নাকি?”

আরজু এবারে কিঞ্চিত বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,

“আমি তো ওনাকে চিনতেই পারিনি তাহলে ঝামেলা হয়েছিল কি হয়নি বলবো কি করে? আচ্ছা ওনার নাম কি?”

“হামিদ।”

আরজু এবারে মস্তিষ্কের উপর জোর প্রয়োগ করলো। নিজেকে নিজেই জোর দিয়ে বলল ওকে মনে করতেই হবে যে লোকটাকে চেনে কিনা। আরমানও আরজু কে ভাবার সময় দিল। আরজুর ভাবনার মাঝে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর আরজুর একটা ঝামেলার কথা মনে পড়ল। হ্যাঁ ওই লোকটার নামই তো হামিদ ছিল। তবে আরজু এই কয় মাসের ব্যবধানে চেহারাটা ভুলে গেছে।

“একটা ঝামেলার কথা মনে পড়ছে। ওই মানুষটার নামও হামিদ ছিল তবে চেহারাটা ভুলে গেছি।”

আরমান ব্যস্ত গলায় বলল,

“কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল?”

“একটা ছেলে আমায় খুব বিরক্ত করতো। আমি ওর নামে অথরিটির কাছে কমপ্লেন করেছিলাম। তারপরে ছেলেটাকে ওয়ার্ন করা হয়। তারপরেও বিরক্ত করতো। যে ছেলেটা আমাকে বিরক্ত করতো সে হামিদ নামে একটা লোকের দলের ছেলে ছিল। পরে উনি এসে আমার সাথে খারাপ আচরণ করেন। আমাকে ভয় দেখান। তখন ওই লোকটা এসে আমায় সাহায্য করে।”

আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“ওই লোক মানে কোন লোক?”

“ওই যে ওই লোকটা যিনি আমায় সাহায্য করেছিলেন।”

“কে সাহায্য করেছিলেন আপনাকে?”

“আরে সেদিন অডিটরিয়ামে আপনার সাথে যিনি ছিলেন উনি।”

আরমান নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“মুনতাসির?”

“হ্যাঁ।”

“সেটা তো নাম বললেই পারতেন। নাহলে ভাইয়া বলে ডাকলেও তো হয়।”

আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“নাম বলার কথাটা খেয়াল আসেনি। আর আমি কাউকে ভাই বলে ডাকি না। ভাই শব্দটা খুবই জঘন্য আর উনি খুব ভালো মানুষ।”

“এটাই তো কারণ ওকে ভাইয়া না বলে ডাকার তাই না? অন্য তো কোন কারণ নেই?”

“আর কি কারণ থাকবে?”

“না মানে বলতে চাইছিলাম আবার পছন্দ করেন কিনা মুনতাসির কে।”

“করি তো পছন্দ। আপনাকে অপছন্দ করার অনেক কারণ থাকলেও ওনাকে অপছন্দ করার একটা কারণও নেই।”

“আমার সাথে ওর তুলনা দিচ্ছেন কেন?”

“ভালোর সঙ্গে তো খারাপেরই তুলনা দিতে হবে তাই না, না হলে বোঝাবো কি করে পার্থক্য?”

আরমান ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,

“কবে যে আপনাকে বোঝাতে পারবো যে আমি খারাপ না, আমি ভালো মানুষ! আচ্ছা সে যাই হোক আপনাকে যদি হামিদ আর বিরক্ত করে আমায় বলবেন। আর বাকি সব আমি মুনতাসিরের থেকে জেনে নেব।”

আরজু কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরমান কে বলল,

“আপনাকে বলব কেন?”

“সাহায্য করবো আপনাকে তাই।”

“তো আপনাকেই কেন বলব? আপনিই বা আমায় সাহায্য কেন করবেন? ভোট নেওয়ার জন্য?”

আরমান জোর পূর্বক হেসে বলল,

“নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আপনার সাহায্য করবো কেমন? তখন তো আর ভোট দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটা থাকবে না।”

আরজু আর কিছু বলল না। আরমান বুঝলো মেয়েটা আর কিছুই বলবে না। এদিকে আরমানের তাড়া আছে। ব্যস্ত গলায় আরজু কে বলল,

“আচ্ছা আমি এখন যাই, একটু কাজ আছে। পরে দেখা হবে।”

আরমান চলে গেল। বেশ কিছুটা দূর যাওয়ার পর আরজুর মনে পড়ল প্রশ্ন করার ছিল আরমানকে। একটু চেঁচিয়েই ডেকে উঠলো।

“এই পলিটিশিয়ান!”

আরমান থামলো। মাঠের আশেপাশে থাকা আরো অনেকের দৃষ্টি ওদের ওপরে পড়ল। বেশ জোরেই ডেকেছে আরজু। অনেকে যে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে সেসবে আরজুর খেয়াল নেই। ওর দরকার আরমানের সাথে বাকি সবাই কে কি ভাবলো তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা।

আরমান আবারও ঘুরে আরজুর কাছে এলো। আরজু যে ডেকেছে আরমান এতেই খুশি হয়েছে। থাকুক দরকারি কাজ তাতে কি? আরজু ডেকেছে এটাই অনেক।

“হ্যাঁ বলুন। আরো কিছু বলবেন?”

“একটা প্রশ্ন করার ছিল। সত্যি উত্তর দেবেন। মিথ্যে বললে আপনাকে খারাপ ভাববো।”

“কথা দিলাম মিথ্যে বলবো না।”

“আপনি সেদিন পার্কে কেন বলেছিলেন আমার ভালোবাসায় আপনার জান কুরবান?”

এইতো কাজ হয়েছে। আরজুর মাথায় এটাও ঢোকানো গেছে যে আরমান ওকে ভালোবাসে। তার মানে মেয়েটা আজকাল আরমানকে নিয়ে ভাবছে। তবে আরমান নিজের খুশি বেশি প্রকাশ করলো না। বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আপনাকে ভালোবাসি তাই।”

“ভালো কিভাবে বাসলেন? এত সহজ নাকি ভালোবাসা? বললেই হলো।”

“আপনি একবার ভালোবেসে দেখুন আপনি যতটা কঠিন ভাবছেন ততটাও কঠিন না। খুব সহজ ভালোবাসা। যাকে ভালো লাগে শুধু একবার তার চোখের দিকে তাকাবেন দেখবেন ভালোবেসে ফেলবেন। যখন খারাপ লাগবে তখন একবার তার কথাটা মনে করবেন দেখবেন আবার তাকে ভালোবেসে ফেলবেন।”

আরজু তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“ভালোবাসা তো হয়ই না তবে ভালোবাসলেন কি করে? আপনি জানেন ভালোবাসা শব্দটাই মিথ্যে?”

আরমান আবারও আলতো হেসে বলল,

“আপনার কাছে হয়তো মিথ্যে কিন্তু আমার কাছে সত্যি। চিন্তা করবেন না আপনার কাছেও খুব তাড়াতাড়ি প্রমাণ করে দেবো যে ভালোবাসা শব্দটা সত্যি, মিথ্যে না।”

“আমি কিন্তু আপনাকে কখনোই ভালোবাসবো না আগেই বলে দিচ্ছি।”

“ঠিক আছে ভালোবাসতে হবে না। আপনি শুধু আমার ভালোবাসা নিয়ে ভাবুন দেখবেন তাহলেই নিজের মাঝে কিছু পরিবর্তন খেয়াল করবেন।”

নিজেদের মাঝে আলোচনার কোন সমাপ্তি না ঘটিয়ে আরজু চলে গেল। আরমান আবারও অবাক হলো। আরমান বুঝতে পারলো আরজু ভাবনায় পড়ে গেছে। আরমানের বলা কথাগুলো আরজু কে বিরক্ত করছে। আরমানও আর কিছু ভাবল না, চলে গেল।

________

“এই যে মেজর সাহেব, ছুটিতে যে এসেছেন একবারও আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি? আজকাল তো দেখছি একটা ফোনও করেন না।”

ঘুমুঘুমু চোখটা খুলে বিছানার ওপরে পায়ের কাছে বসা আরমানকে দেখেই মহিন হোসেন চমকে উঠলেন। মুহূর্তের মাঝে তার দুচোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল। উঠে বসে দু হাতে জড়িয়ে ধরলো আরমানকে। আরমানও পাল্টা জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরেই আরমান অভিমান মাখানো কন্ঠে বলল,

“এখন খুব ভালোবাসা দেখাচ্ছো। অথচ দুদিন হলো ছুটিতে এসেছো কিন্তু তুমি একটা বারের জন্যও আমাকে একটা কল করোনি কাকা।”

মহিন একটু অপরাধী গলাতেই বলল,

“বুঝতে পেরেছি বাবা ভুল হয়েছে। কিন্তু কি করবো বল তো? তুই এলেই তো তোর সাথে হয় সারাদিন রাত জেগে গল্প করবো নয়তো ঘুরতে বেরিয়ে পড়বো। কিন্তু আমার যে দুর্বল শরীর তাই ভাবলাম একটু দু তিন দিন রেস্ট নিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠি আগে।”

“আরে মেজর সাহেবের শরীর দুর্বল হলে চলবে নাকি? দেশের সুরক্ষার কাজ করবে কে?”

“আমার অবর্তমানে দেশের সেবা করার জন্য আরো অনেক মেজর আছে। আর তাছাড়া তোদের মতন রাজনীতিবিদরাও তো আছে। তা বল কি খবর তোর?”

আরমান মহিনের শোয়ার জায়গাটায় গিয়ে নিজেই শুয়ে পড়ল। আলস্যভরা কণ্ঠে বলল,

“এখন খবর টবর দিতে পারব না। একটু ঘুমোবো।”

মহিন ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কেন? সারারাত ঘুমোসনি?”

“না গো কাকা। রাতের বেলা আজকাল ঘুম হচ্ছে না। একজন খুব বিরক্ত করছে। চিন্তায় আর ঘুম আসে না চোখে।”

হঠাৎ করে মহিনের চোখ মুখের অভিব্যক্তি কেমন বদলে গেল। হাস্যজ্জ্বল মুখটাতে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“কে বিরক্ত করছে? একবার আমাকে বল তো দেখি তার নামটা?”

ওদের কথার মাঝেই ঘরে নাস্তার ট্রে হাতে নিয়ে প্রবেশ করল মহিন হোসেনের স্ত্রী জেবা। স্বামীকে উদ্দেশ্য করে একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন,

“এমনি কি আর বলি যে তুমি বুড়ো হয়ে গেছো। তোমার ভাতিজার যে বিয়ের বয়স হয়ে গেছে সেদিকে কি খেয়াল আছে? নিশ্চয়ই কোন মেয়েই বিরক্ত করছে।”

জেবার কথা শুনে আরমান হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“এই জন্য তোমাকে আমার এত ভালো লাগে কাকি। তুমি আমার মনের কথা খুব ভালো করে বোঝো।”

মহিন হোসেন বিস্ময় ভরা কণ্ঠে আরমানকে বললেন,

“সত্যিই কোন মেয়ের চিন্তায় তোর রাতের ঘুম উড়ে গেছে তাওসিফ? এটাও আমায় শুনতে হলো?”

আরমান কপাল কুঁচকে মহিন হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি ছেলে হয়ে ছেলের চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যাওয়া উচিত ছিল। আমাকে কি কখনো বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নেই নাকি তোমাদের? না থাকলে আমাকে আগেই বলে দাও আমি নিজেই নিজের বিয়ের ব্যবস্থা করে নেব।”

“পছন্দ করেছিস কাউকে না আমাদের পছন্দ করতে হবে?”

আরমান এবারে চট করে উঠে বসলো। জেবাকেও ইশারায় বসতে বলে বলল,

“কাকি তুমিও বসো। গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা আছে তোমাদের দুজনের সাথে।”

আরমানের কথায় উৎসাহ খুঁজে পেয়ে জেবাও বসলো। দুজনেই আরমানের দিকে উৎসাহিত দৃষ্টিতে তাকালো। আরমান নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে বলল,

“একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছে আমার। বিয়ে করলে ওকেই করবো নয়তো... না করার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? বিয়ে তো করবোই আর ওকেই করবো।”

জেবা কন্ঠে তীব্র উৎসাহ সমেত বলল,

“তাই? মেয়েটার ছবি দেখাও তো? একটু দেখি কেমন দেখতে?”

আরমানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মেয়েটার সাথে কথা বলাই তো বিরাট ব্যাপার তার উপরে আবার থাকবে কিনা ওর ছবি। আরমান ছবি চাইলে যে আরজু জীবনেও দেবে না সেটা আরমান খুব ভালো করেই জানে। আর লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে যদি ধরা পড়ে তবে নিশ্চিত আরজু ওকে মে'রেই ফেলবে।

“ছবি নেই কাকি। আমার দুঃখের কথা কি আর বলি তোমাদের। এমন একটা মেয়েকে ভালোবাসলাম যার মনে মায়া, দয়া কিছুই নেই। অবশ্য মায়া দয়া আছে তবে সেটা ওনার জীবনের কঠিন বাস্তবতার কাছে চাপা পড়ে গেছে।”

এবারে মহিন হোসেনও আরমানের কথায় উৎসাহ খুঁজে পেল।

“কোথায় থাকে মেয়েটা? বড় ভাই, মেজ ভাইয়ের সাথে কথা বলে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর ব্যবস্থা করি?”

আরমান তড়িঘড়ি করে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“ভুলেও এই কাজ করো না। ও মে'রে ফেলবে আমায়।”

জেবা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“তুমি তো দেখছি তোমার কাকার একটা অংশও ছাড়োনি তাওসিফ। আমাদের মেজর সাহেব নিজের কাজে খুব কঠোরতা দেখায় কিন্তু আমার সামনে এসে তার এসব কঠোরতার কিচ্ছু চলে না। আমি একবার চোখ রাঙালে না তোমার কাকা স্ট্যাচু হয়ে যায়। খুবই বাধ্য স্বামী আমার। উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে।”

মহিন হোসেন একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন বোধহয়। ইতস্তত গলায় বলল,

“এসব আবার কি কথা জেবা? ভাতিজার সামনে মান সম্মান রাখবে না নাকি আমার?”

“মান সম্মান না রাখার কি আছে হ্যাঁ? বউয়ের কথায় উঠলে বসলেই কি সে খারাপ হয়ে গেল? কেন আমি তোমার কথা শুনি না?”

“তা তো অবশ্যই শোনো। তুমি ভালো স্ত্রী জন্যই আমি ভালো স্বামী হতে পেরেছি।”

ওনাদের দুজনের এমন ভালোবাসার আলাপচারিতায় আরমান একটু বিরক্ত হলো। আরমান ম'রছে নিজের জ্বা'লায়। ওদের কাছে এসেছে একটু সাহায্যের জন্য আর ওনারা নিজেদের ভালোবাসার গল্প শোনাতে ব্যস্ত। মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আপাতত তোমরা একটু নিজেদের ভালোবাসাগুলো একপাশে রেখে আমার কথা শুনবে? একটু সাহায্য করতে পারবে আমায়?”

দুজনের মনোযোগ এবার আরমানের উপর পড়লো। মহিন হোসেন তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললেন,

“হ্যাঁ হ্যাঁ বল কি সাহায্য করতে হবে তোকে?”

“কাকা তুমি বলোতো তুমি কাকি কে কিভাবে ইমপ্রেস করেছিলে? আর কাকি তুমিও বলো তুমি কাকার কোন গুণ দেখে ইমপ্রেস হয়েছিলে? মানে তুমি তো একটা মেয়ে তো সেই হিসেবে বলো একটা মেয়ের একটা ছেলের কি কি গুন দেখে ভালো লাগতে পারে?”

আরমানের প্রশ্নের কাছে মহিন হোসেন আত্মসমর্পণ করে ইশারায় জেবাকে দেখিয়ে বলল,

“আমি এসব কিছুর উত্তর দিতে পারবো না। এইসবে তোর কাকি খুবই এক্সপার্ট। জেবা তুমি বলো।”

এতটা সম্মান পেয়ে জেবাও ভীষণ খুশি হলো। কিছুটা সময় বিজ্ঞের ন্যয় কিছু ভাবলো। তারপর আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেখো তাওসিফ, আমরা মেয়েরা সব সময় একটা বিশ্বস্ত হাত খুঁজি। আমাদের বিয়ে হয়ে যাওয়া মানে আমাদের পরিবার, আমাদের শৈশব যৌবনে যে জায়গাটায় আমরা কাটিয়েছি সে সবকিছু ছেড়ে আসা। আমাদের স্বস্তির জায়গা ছেড়ে আসা। সর্বপ্রথম আমরা একটা ছেলের মধ্যে যে গুণটা খুঁজি সেটা হচ্ছে বিশ্বস্ততা।”

“তোমার ভরসা আছে তো আমার উপর কাকি তাই না যে আমি একজন বিশ্বস্ত মানুষ?”

জেবা আলতো হেসে বলল,

“অবশ্যই। তুমি তোমার কাকার গুণ পেয়েছো। আর তোমার কাকা কে আমি যতটা বিশ্বাস করি তোমাকেও ততটাই বিশ্বাস করি।”

আরমান খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

“ঠিক আছে। তাহলে তার পরের গুণটা বলো?”

“আচ্ছা বলছি। আমি যদি তোমাকে আমার হিসেবে বলি তবে আমি কথা বলতে ভীষণ পছন্দ করি এবং আমি চাই কেউ একজন আমার কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনুক। মেয়েরা অনেক অতিরিক্ত বিষয় ভাবে, একটা বিষয় ঘটার আগেই তারা অনেক কিছু ভেবে নেয় আর তারা চায় তাদের সেই অতিরিক্ত ভাবনাগুলো কেউ মনোযোগ সহকারে শুনুক বিরক্ত না হয়ে।”

আরমান এবার ভাবনার জগতে নিমগ্ন হলো। মিল পেলো আরজুর সাথে এই কথাগুলোর। আরজু বলেছিল কেউ কখনো ওকে জিজ্ঞাসা করেনি যে ওর মনের মাঝে কষ্ট লুকিয়ে আছে কিনা। আরজু এটাও বলেছিলো যে আরমান ওর উপরে বিরক্ত হলে একসময় আরজু এই সামান্য টুকু কথা বলার রুচিও হারিয়ে ফেলবে। তার মানে জেবার কথাগুলো একদমই ঠিক।

“আরো বলো কাকি।”

“আর ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে। যাকে একবার বলবে ভালোবাসি সেই নারী ছাড়া অন্য কোন নারীর দিকে কখনো তাকাবে না তাওসিফ। এটা মেয়েদেরকে ভীষণ কষ্ট দেয়। তার পাশে দাঁড়াবে সব সময়। সে যদি কোন ভুল করে তাহলে তাকে বুঝিয়ে বলবে, বকবে না। আর তাকে একটু বোঝার চেষ্টা করবে।”

এ পর্যায়ে আরমানের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। কি করে বুঝবে? মেয়েটা তো কিছুই বলে না। বিশ্বাস তো একদমই করে না আরমানকে। আরমান যে বিশ্বাস অর্জন করবে মেয়েটা ওকে সেই সুযোগটাও দিতে চায় না। প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বাড়তি একটা কথা বলে না। আরমান কেমন আছে সেটাও জিজ্ঞেস করে না। আরমান জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবে কিনা সেই নিয়েও আরমানের সন্দেহ আছে। মুখ ভার করে বলল,

“জানো কাকি ও না কাউকে বিশ্বাস করে না। ভীষণ অদ্ভুত! ওর নিজের বাবা মা কে বিশ্বাস করে না। ও এই পৃথিবীতে নাকি শুধুমাত্র ওর আপাকে বিশ্বাস করে। ওর আরো একটা সমস্যা হচ্ছে ভালোবাসাকে একদমই বিশ্বাস করে না, ঘৃণা করে। আমি জানিনা ওর ভালোবাসার প্রতি এত ঘৃণার কারণটা কি কিন্তু তুমি ওর কথা শুনলে বুঝবে ওর মনে ঠিক কতটা ঘৃণা জমা হয়ে আছে ভালোবাসা কে নিয়ে।”

“তাই নাকি? তা বলোতো একটু তোমার সেই ভালোবাসার নারীর বিষয়ে? কেমন সে? তার বিষয়ে জানলে হয়তো আরেকটু সাহায্য করতে পারব তোমায়।”

আরমান আলতো হাসলো। মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিন যখন আরজুকে দেখেছিল। বৃষ্টিতে ভেজা মুখ, কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুল, মুখে ব্রণের দাগ আর সেই মিষ্টি গানের গলা। একদম অন্যরকম লাগছিল আরজু কে সেদিন। মনে হয়েছিল সেই আরজু প্রাণ খুলে বাঁচতে চায়, মনে হয়েছিল সেই আরজু নিজেকে ভালোবাসতে জানে কিন্তু এখন আরমানের সেসব মনে হয় না। এখন মনে হয় আরজু এই জীবনে ভীষণ বিরক্ত। আরজু মুক্তি পেতে চায় এই জীবন থেকে। আরজু নিজেকে ভালোবাসে না, ভালোবাসতে পারে না।

আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে মহিন হোসেন বলে উঠলো,

“কি হলো তাওসিফ বল কিছু?”

“তাকে নিয়ে বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হবে। সে কোন এক পৃষ্ঠার কবিতা না, সে কোন দু চার পাতার ছোট গল্প না, সে কোন চার-পাঁচ লাইনের ছোট্ট ছন্দ না, সে হলো আস্ত একটা উপন্যাস। তার করা পাল্টা প্রশ্নের তীক্ষ্মতায় তোমার নিজের করা প্রশ্ন তোমায় গুলিয়ে দেবে। তার দৃষ্টির গভীরতা এতটা রহস্যময় যে সেখানে তুমি কোন রহস্য খুঁজতে নেমে পড়বে কিন্তু কোন রহস্যকের সন্ধান পাবে না। সে নিজেকে রহস্যের জালে মুড়িয়ে রাখে। প্রত্যেকটা কথা বলার সময় ভীষণ আত্মবিশ্বাসী থাকে। আমি মাঝে মাঝেই গুলিয়ে যাই ওনার সামনে।”

জেবা প্রশ্ন করলো,

“আর সে দেখতে কেমন?”

“সবার চোখে হয়ত ওনাকে খুব বেশি রূপবতী বলে মনে হবে না, তবে আমি ওনার রুপের বর্ণনা দিয়ে শেষ করতে পারবো না। আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। ওনার চুলগুলো ভীষণ ঘন, সিল্কি না তবে লম্বা। আমি বুঝি যত্নের অভাবে এমনটা হয়ে গেছে। ওনার মুখে ব্রনের দাগ আছে, হয়তো অতিরিক্ত খাটাখাটনি আর চিন্তায় মুখের যত্ন নেওয়ার সময় পায় না। গায়ের রংটা একদমই ফর্সা না শ্যামলা। হয়ত রোদে পুড়ে এমনটা হয়েছে। ওনার চোখগুলো কোনো কবির বর্ণনার মতন অতিরিক্ত সুন্দর না তবে ভীষণ গভীর আর রহস্যময়। চোখের পাপড়িগুলো যেন সেই রহস্য কে ঢেকে রাখার জন্য পর্দার কাজ করে। নাকটা সরু না তবে ওনার মুখের সাথে একদমই মানানসই। ঠোঁটটা খুবই ছোট আর সবসময় শুষ্ক থাকে। প্রতিদিন আলাদা রঙের, আলাদা ডিজাইনের জামা পরে না বরং একটা সালোয়ার তিন চারদিন পরে। খুব সুন্দর লাগে দেখতে ওকে সালোয়ার কামিজে। হাঁটার সময় চোখ থাকে একদম নিচের দিকে। কথা বলার সময় ওর কন্ঠে থাকে তীক্ষ্ণতা। নিজের দৃষ্টির দ্বারা সামনের মানুষটাকে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেয় যে ও কাউকে ভয় করে না।”

কথাগুলো বলতে বলতে আরমান যেন ঘোরের মাঝে চলে গেল। আনমনেই নিজে হাসছে। জেবা আর মহিন দুজনেই ঠোঁট টিপে হাসলেন। আরমানের অবস্থা দেখে ওনাদের এখন হাসিই পাচ্ছে।

মহিন হোসেন ঠোঁট টিপে হেসে একটু ধীর কণ্ঠে আরমানের নাম ধরে ডাকলো,

“তাওসিফ!”

আরমান ঘোরের মাঝেই বলল,

“হ্যাঁ আরু!”

মহিন হোসেন তব্দা খেয়ে গেলেন। জেবা এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“তাওসিফ তুমি তো দেখছি শেষ। পা'গল হয়ে গেলে নাকি? তোমার কাকা কে শেষে মেয়ে বানিয়ে ছাড়লে?”

আরমানের ধ্যান ভাঙল। তবে লজ্জা পেল কি না বোঝা গেল না। যদিও বা লজ্জা পেয়ে থাকে তাও সেটা প্রকাশ করল না বরং জেবা আর মহিন হোসেনকে হাসতে দেখে বিরক্তি নিয়ে বলল,

“অদ্ভূত তো! হাসছো কেন তোমরা? তোমরাও তো ভালোবেসে বিয়ে করছো তবে বুঝতে পারো না প্রেমে পড়লে কি হয়?”

মহিন আবারো ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“ভালো তো আমরাও বেসেছি, প্রেমে আমরাও পড়েছি তবে তোকে দেখে মনে হচ্ছে তোর মতন করে পড়িনি। তুই তো এই কয়দিনে একদম নিজের হুঁশ জ্ঞান সব হারিয়ে ফেলছিস তাওসিফ।”

ওদের সাথে তাল মিলিয়ে আরমানও এবারে হেসে ফেলল। হঠাৎ হাসির মাঝে জেবা একটু ভাবনার মাঝে নিমগ্ন হলো। আনমনে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জানো তাওসিফ তুমি তোমার আরুর যে বর্ণনাটা বললে না এমন আরো একজনের কথা আমি শুনেছিলাম।”

আরমান বিস্ময় ভরা কণ্ঠ বলল,

“তাই নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম আমার আরু এই পৃথিবীতে এক পিসই আছে। এমন আরো মানুষ আছে শুনে অবাক হলাম।”

“হ্যাঁ ছিল। আমার একটা কাজিনের বান্ধবীও এমন ছিল। খুব তেজ, যুক্তি ছাড়া কোন কথা বলতো না, চোখে মুখে সবসময় একটা কাঠিন্যতা থাকতো, নিজের আত্মবিশ্বাস দিয়ে সামনের মানুষটাকে গুলিয়ে ফেলতে পারত।”

“আরে কে সে? আমার তো দেখা করতে ইচ্ছে করছে সেই মানুষটার সাথে। দেখা করাতে পারবে?”

জেবা উদাস গলায় বলল,

“না গো তা পারবো না। মেয়েটা মা'রা গেছে।”

“ওহ্ আচ্ছা।”

বিজ্ঞাপন

“জানো তো মেয়েটা খুব ভালো ছিল। মানে আমি যা শুনেছি ওর সম্বন্ধে তাই বলছি। খুব কষ্ট করতো নিজের পরিবারকে চালানোর জন্য। তারপর কাউকে ভালোবেসে ফেলে হঠাৎ। সেই ছেলেটা ওকে ঠকায়। সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা আ'ত্ম'হ'ত্যা করেছিল।”

আরমান এবার হালকা রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

“অদ্ভুত তো! যে ভালোবাসে না তার জন্য আ'ত্ম'হ'ত্যা করতে হবে কেন? পা'গল নাকি?”

জেবা মলিন হেসে বলল,

“ভালোবাসায় যে মানুষ পা'গলই হয়ে যায় তাওসিফ। ভালোবাসাই তো সেই বি'ষ যা মানুষকে পা'গল করে দেয়, মানুষের ভালো থাকা, তার সুখ, স্বস্তি সবকিছু কেড়ে নেয়। আবার সেই ভালোবাসাই অনেক সময় আমাদের সুখ স্বস্তি ফিরিয়ে দেয়। কি অদ্ভুত! এক ভালোবাসার কত ভিন্ন রূপ।”

________

দরজায় তালা ঝুলতে দেখে আরমানের চোখ কপালে উঠে গেল। এটা কি করে সম্ভব? দুদিন আগেই তো খোঁজ পেল যে ফারহানা এখানেই থাকে তবে আজ কোথায় গেল হঠাৎ করে?

আশেপাশে সে অনেক মানুষকে দেখতে পেল তবে কাউকে গিয়ে ফারহানার কথা জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না। ফিরোজ বলেছিলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গোপনে করতে। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও কোন কিছু জানতে না পারে। আরমান যেন ফারহানার পরিচয় কাউকে না বলে। আরমানও সেই হিসেবেই কাজটা করেছে। যতটা সম্ভব ততটা পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করেছে।

একটু ভাবনা চিন্তার পর ঠিক করল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে এখানে। পাশে একটা ছোট্ট টঙ দোকান দেখল। ভাবলো কিছুক্ষণ ওখানে গিয়ে বসা যাক। কয়েক কাপ চা শেষ করতে করতে হয়তো ফারহানারা চলে আসবে।

প্রায় এক ঘন্টারও বেশি সময় আরমান ওখানে বসে থাকলো। চার-পাঁচ কাপেরও বেশি চা শেষ করল তবে এখন আর ধৈর্য কুলাচ্ছে না। বারবার ফোন আসছে ক্লাব থেকে। একেই তো সামনে নির্বাচনের ব্যস্ততা তার মাঝে আবার কাঁধে পড়া এই দায়িত্বটা। এখন যেন এই দায়িত্বটা আরমানের কাছে একটু বোঝাই মনে হচ্ছে। তবে কিছু করার নেই যেহেতু কেউ একজন ভরসা করে ওকে দায়িত্বটা দিয়েছে তাহলে তার ভরসাটা রাখবে আরমান।

চায়ের বিল পরিশোধ করে দিয়ে দেখতে গেল যে এসেছে কিনা। কিন্তু না এবারও সে একই অবস্থা দরজায় তালায় ঝুলছে। এবারে আরমান ভাবলো কাউকে জিজ্ঞেস করতেই হবে। ফারহানা আবার কোন কিছুর আঁচ পেয়ে চলে গেল না তো এখান থেকে?

ফারহানার ঠিক পাশের বাড়িটায় গেল আরমান। তবে গিয়ে যে দৃশ্যটা দেখলো সেটা আরমান মোটেও আশা করেনি। কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি যে এইখানে এখন এই মুহূর্তে আরজুকে দেখতে পাবে। হ্যাঁ, একদমই ভুল দেখছে না আরমান। এইতো সামনে আরজু দাঁড়িয়ে আছে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যে বাড়িতে ফারহানার সন্ধান করার উদ্দেশ্যে আরমান এসেছিল সেই বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা নিয়ে বোধহয় ভাবনার মাঝে আছে। আরমান বুঝতে পারছে না কি ভাবছে তবে নিজের বিস্ময় ভাব কে দমিয়ে রাখতে না পেরে বলেই উঠলো,

“আরু, আপনি এখানে কি করছেন?”

হঠাৎ করে কারো কণ্ঠস্বর কানে যেতেই আরজু একটু চমকে উঠল। কোন গভীর ভাবনার মাঝে নিমগ্ন থাকার কারণে বোধহয় এমনটা হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে আরমানকে দেখতেই আরজু নিজেও যেন একটু চমকালো। তবে ঘাবড়ে গেল এমনটা না। বেশ স্বাভাবিক গলায় পাল্টা আরমান কে প্রশ্ন করল,

“আপনি এখানে কি করছেন?”

“আমি তো একটা কাজে এসেছি এখানে কিন্তু আপনি কেন এসেছেন? আর এই বাড়িতে কি কাজ আপনার?”

আরজু আরমানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে সন্দেহী গলায় অন্য একটা প্রশ্ন করল,

“সত্যি করে বলুন কোন কাজে এসেছেন নাকি আমার পিছু করতে করতে এখান অব্দি চলে এসেছেন?”

“পিছু করে যদি চলে আসতাম তবে কি এখন আপনার সামনে আসতাম বলুন? যদি লুকিয়ে লুকিয়ে আপনার সব গতিবিধি লক্ষ্য করার হতো তবে লুকিয়েই থাকতাম তাই না? যুক্তি আছে কিন্তু আমার কথায়।”

আরজু সত্যিই যুক্তি খুঁজে পেল। তাই আপাতত আর সন্দেহ করল না।

আরজু কে চুপ করে যেতে দেখে আরমান সন্দেহী গলায় বলল,

“বললেন না তো আপনি এখানে কি করছেন? এই বাড়িতে কি কাজ?”

আরজু সহজ সাবলীল গলায় জবাবে বলল,

“টিউশনের জন্য এসেছি। আজকেই প্রথম সেজন্য বাড়িটা ঠিক চিনতে পারছি না। এখন এই বাড়িটা কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না সেজন্য কলিং বেলও বাজাতে পারছি না। যদি এই বাড়িটা না হয় তবে তো ভিতরে যারা আছেন তারা বিরক্ত হবেন।”

আরমান হতবিহ্বল গলায় বলল,

“তাই বলে নিশ্চিত হবেন না? ধরুন যদি এটাই সেই বাড়ি হয়? “

“আর যদি এটা সেই বাড়ি না হয়?”

“আচ্ছা ধরে নিলাম এটা সেই বাড়ি না। কিন্তু কথা হলো দরজা খুলে দিতে তারা কতটুকুই বা বিরক্ত হবে?”

“আমি আমার জন্য কাউকে সামান্য টুকু বিরক্তবোধ করাতে চাই না। আমি জানি আমি এমনিতেই মানুষটা খুবই বিরক্তিকর। আলাদাভাবে আর কাউকে বিরক্ত করতে চাই না।”

আরমান কপাল কুঁচকে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“কে বলেছে আপনি বিরক্তকর? আপনি এমন একজন মানুষ যে বারবার প্রতিনিয়ত আপনার ব্যবহারের দ্বারা বিপরীত পাশের মানুষটাকে আপনার প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। আপনি বিরক্তিকর হতেই পারেন না।”

“তবে আপনি বিরক্ত হতেন কেন?”

“বলেছি তো আপনার উপরে বিরক্ত হতাম না। আমার খারাপ লাগতো আপনি আমার সাথে কথা বলতে চাইতেন না তাই। যাই হোক কলিং বেল বাজান। দেখুন এটা আপনার স্টুডেন্ট এর বাড়ি কিনা।”

আরজু দ্বিধান্বিত গলায় বলল,

“বাজাবো?”

“হ্যাঁ।”

“যদি ওরা বিরক্ত হয়ে কিছু বলে?”

আরমান ভরসা দিয়ে বলল,

“আমি আছি তো। দেখি কে আপনাকে কি বলে। কার এত বড় সাহস যে আমার সামনে আপনাকে কিছু বলবে। শহর ছাড়া করবো তাকে।”

আরজু কিছু একটা ভেবে প্রশ্ন করলো,

“সামনে কিছু বললে শহর ছাড়া করবেন আর যদি আড়ালে কেউ কিছু বলে তাহলে কিছু করবেন না?”

আরমানের বেশ ভালো লাগলো ব্যাপারটা। আরমান বুঝতে পারল যে আরজুর আরমানের ভালোবাসার কথা ভাবতে ভাবতে সত্যি মনের পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। দু কদম এগিয়ে গেল আরজুর দিকে। প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,

“আপনি চান আমি কিছু করি?”

“তেমন তো কিছু বলিনি। আপনি একটা কথা বললেন তার প্রেক্ষিতে শুধু আমি একটা প্রশ্ন করেছি। উত্তর দিন।”

আরমান মুচকি হাসলো। আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বলল,

“আমার আড়ালে কিংবা আমার সামনে কেউ আমার আরু কে কিছু বলার দুঃসাহস তো দেখাক। শহর কেন একদম দুনিয়া ছাড়া করবো তাকে।”

আরমান আশা করেছিল আরজু বোধহয় খুশি হবে তবে তেমন কিছু আরজুর অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট বোঝা গেল না। আরজুর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। একদম সুঁচালো সেই দৃষ্টিটা আরমানের অন্তর ভেদ করে বেরিয়ে গেল। বাজপাখির দৃষ্টি বলা যায় যাকে। কপালে সৃষ্টি হওয়া ভাঁজটা আরমানকে বেশ ভালোভাবে জানান দিল যে আরজু ওর কথাটা ঠিক ভালোভাবে নেয়নি। পছন্দ করেনি হয়তো। আরমানের সেই সন্দেহটা সত্যি হলো। আরজু গমগমে কণ্ঠস্বরে বলল,

“খু'ন করার স্বভাব আছে আপনার? আপনি কি খু'নি?”

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল আরমান। মেয়েটাকে বলল কি আর মেয়েটা বুঝলো কি। মেয়েটা কি প্রেমের ভাষা বোঝে না? এই মেয়েটা কি প্রেমিকের ভাষা বোঝে না নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করে? অবুঝের ন্যয় সবটা জানার পরেও কি চুপচাপ থাকে?

আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু পুনরায় বলে উঠল,

“উত্তর দিলেন না তো?”

আরমান নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। ঘাবড়ালো না। ঘাবড়াবেই বা কেন? আরমান তো আর খু'নি না, তবে কথা হচ্ছে আরজুকে দেখলেই আরমান কেমন যেন একটা হয়ে যায়। আরজুর ধারালো সেই দৃষ্টিটাই আরমানকে কেমন যেন এলোমেলো করে ফেলে। আরমান বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ওটা খু'নির ভাষা ছিল না আরু। ওটা প্রেমিকের ভাষা ছিল তার প্রেমিকার প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশের জন্য।”

আরমানের এত সুন্দর বাক্যগুলোকে আরজু অবজ্ঞা করলো। এতটাই অবজ্ঞা করলো যে তৎক্ষণাত স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলল আরমানের কথাগুলো। এমন কাব্যিক কথা আরজুর ভালো লাগে না। কেননা প্রেম ভালোবাসা গল্পে মানায়। বাস্তব জীবনে শুধু মানুষ ধোকা দিতে জানে।

আরমানের সাথে আর কিছু না বলে আরজু কলিং বেল বাজালো। কিছুক্ষণের ব্যবধানে ভেতর থেকে একজন ভদ্র মহিলা এসে দরজা খুলে দিলেন। দরজার সামনে দুজন অপরিচিত মানুষকে দেখে তিনি নিজেই একটু থতমত খেলেন। না তার পরিচিত আর না এর আগে কখনো এই এলাকায় দেখেছে। চোখ মুখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

“কে আপনারা? কাকে খুঁজছেন?”

আরজু বলল,

“এটা কি সুমাইয়ার বাড়ি?”

ভদ্রমহিলার একটুও ভাবার প্রয়োজন হলো না। বেশ চটপট উত্তর দিলেন।

“না তো। এখানে তো সুমাইয়া নামে কেউ থাকে না।”

“আশেপাশে থাকে কি কেউ এই নামে? আপনি কি বলতে পারবেন?”

ভদ্রমহিলা একটু ভেবে বললেন,

“না। আমার যতদূর মনে পড়ছে আশেপাশে তো সুমাইয়া নামে কেউ থাকে না।”

আরজু এবারে কিঞ্চিৎ অপরাধী গলায় বলল,

“দুঃখিত আপনাকে বিরক্ত করার জন্য। আসলে আমি মনে হয় ভুল ঠিকানায় চলে এসেছি। বাড়ি চিনতে পারছিনা।”

ভদ্র মহিলা আন্তরিকতার গলায় বললেন,

“আরে কোন ব্যাপার না। আমি বিরক্ত হইনি।”

আরজু কোনোমতে একটু হাসলো। তিনি দরজা বন্ধ করে ভিতরে চলে গেলেন। আরজু এবার বাড়ির পথে হাঁটা দিতে ধরলো তবে থেমে গেল। আরমানকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করল,

“আমার থেকে তো শুনলেন আমি এখানে কেন এসেছিলাম কিন্তু আপনি তো বললেন না আপনি কেন এসেছেন এখানে?”

“একজনের খোঁজে এসেছিলাম কিন্তু তাকে পেলাম না।”

“ওহ্।”

কথাটা বলে নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো। আরমান বুঝলো না যে ওর পেছন পেছন যাওয়া ঠিক হবে কিনা। ঠিক সাহস করে উঠতে পারছে না। তবে হঠাৎ করে একটা কথা মনে পড়ল। আরজু যদি টিউশনের জন্যই আসে তবে আবার বাড়ির পথে হাঁটা ধরল কেন? যার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছিল সেই বাড়িটা খোঁজার কোন তৎপরতা দেখা গেল না কেন আরজুর মাঝে?

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো আরজু ইতোমধ্যে বেশ অনেকটা দূরে এগিয়ে গেছে। আরমান দৌড়ে গিয়ে আরজুর সামনে দাঁড়ালো। আরজু থেমে গেল। চোখ মুখে বেশ অনেকটা বিরক্তিকর ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“সমস্যা কি?”

এবারে আরমানের দৃষ্টি তীক্ষ্ম হলো। ঠিক আরজুর দৃষ্টি যতটা তীক্ষ্ণ হয়েছিল ততটাই আরমানের দৃষ্টিও হলো।

“আপনি যে বললেন টিউশনের জন্য এখানে এসেছিলেন তা আবার বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন কেন?”

“বাড়ি ফিরে যাচ্ছি তার কারণ এখন পথহারা পথিকের মতন আমি পুরো এলাকাটা ঘুরতে পারি না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তো আর কলিংবেল বাজিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে পারিনা যে এটা সুমাইয়ার বাড়ি কিনা। বাড়ি গিয়ে ফোনে কথা বলে আগে ভালো করে ঠিকানাটা শুনবো তারপর আসবো আগামীকাল।”

আরমানের সন্দেহ গেল না। তবে আরজুর চোখে মুখে যে আত্মবিশ্বাসটা ফুটে উঠেছে সেটা আরমানের সন্দেহ বেশিক্ষণ টিকতে দিল না। যদি মিথ্যে বলতো তবে এতটা আত্মবিশ্বাস থাকতো না। আরমান তো মিথ্যে বলতে ধরলে থতমত খায়, আমতা আমতা করে। অন্যদের সামনে না হলেও আরজুর সামনে এমনটাই হয়। মেয়েটা এমন ভাবে তাকায় যে আরমানের মিথ্যে বলার ক্ষমতাই থাকে না। আরজুও নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছে না।

আর তাছাড়া পাল্টা আবার প্রশ্ন করাও ঠিক হবে না। মেয়েটা আবার খারাপ ভেবে নেবে।

আরমানকে ভাবনার জগতে ডুবে থাকতে দেখে আরজু ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আরমানের ধ্যান ভাঙলো। আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল এবারেও আরজু বেশ অনেকটাই দূরে চলে গেছে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আরমানের। মেয়েটা একটু যাওয়ার সময় বলেও যেতে পারে না! একটু তো বলতেও পারত যে আমার সাথে আসুন! আচ্ছা তা না হয় নাই বলল এটাও তো বলতে পারতো আমার পেছনে আসবেন না। তাও বলে না। অদ্ভুত!

_________

মারুফ নামের একটা ছেলে বেশ কিছুদিন হলো আরজু কে বিরক্ত করছে। মাঝে মাঝে পথ আটকে দাঁড়ায়, আরজু কে দেখলে অশোভন ইঙ্গিত করে, গান গায়, শিস বাজায়। আরজু অযথা কারো সাথে ঝামেলায় জড়াতে চায় না তাই দেখেও ব্যাপারগুলো না দেখার ভান করে। পথ আটকে দাঁড়ালে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার পথ আটকে দাঁড়ালে চোখ গরম করে তাকায়, কখনো আবার দু চারটে কথা শুনিয়ে দেয় কিন্তু ওই যে ওরা নির্লজ্জ। কোন লাভ হয় না। আরজুর বলা কথাগুলো এক কান দিয়ে শোনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়।

তবে আরজু অবাক হয় একটা বিষয়ে ভার্সিটির অথরিটি ছেলেটাকে ওয়ার্ন করেছে তারপরও ছেলেটার শরীরে একটুও ভয় নেই। কোন সাহসে ছেলেটা এখনও আরজু কে বিরক্ত করে সেটাই আরজু বুঝে উঠতে পারে না।

প্রতিদিনের মতন আজকেও ভার্সিটিতে আরজু এলো। তবে অবাক করার বিষয় হলো আজকে মারুফ নামের সেই ছেলেটা কিংবা ওর দলবলকে দেখতে পেল না। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ভাবলো হয়তো ভুল বুঝতে পেরেছে। তবে আরজুর সেই ধারণা খুব তাড়াতাড়ি ভুল বলে প্রমাণিত হলো। কয়েক কদম বাড়াতেই হুট করে সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা।

আরজু চমকালো না, কয়েক কদম পিছিয়েও গেল না, ঠাঁয় সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। চোখ মুখে তার কাঠিন্য ভাব আর অপরদিকে মারুফের ঠোঁটে ফুটে আছে এক বিশ্রী হাসি। চোখের চাহনি তার অত্যন্ত জঘন্য। একবার খুব ভালোভাবে আরজু কে মাথা থেকে পা অব্দি পরখ করে নিল। আরজুর গা ঘিনঘিন করে উঠলো। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল কিন্তু পারলো না। বারবার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলো আরজু কিন্তু ব্যর্থ হলো। একপর্যায়ে নিজের রাগ আর কোনমতেই সংবরণ করতে পারল না। বজ্রের ন্যয় হুংকার ছেড়ে মারুফকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সামনে থেকে সর। কিছু বলছি না জন্য তোর সাহস বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। এবার সোজা পুলিশ কমপ্লেন করবো। তারপর দেখব তোর কোন বাপের ক্ষমতা আছে তোকে জেল থেকে ছাড়ায়।”

মারুফ শব্দ করো হেসে উঠলো। যাকে বলে গগন কাঁপানো হাসি। আরজুর ঘৃণা বাড়ল, রাগও আরও বাড়লো। রাগের তোপে চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করলো।

মারুফ এবারে অত্যাধিক সাহস দেখালো। খপ করে আরজুর হাত চেপে ধরল। তবে খুব বেশি দূর এগোতে পারলো না। আরজুর মুক্ত থাকা অন্য হাতটা দিয়ে ঠাস করে একটা চ'ড় বসিয়ে দিল মারুফের গালে।

ছেলেটা তব্দা খেয়ে গেল। আরজুর থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মুনতাসির। মেয়েটাকে চেনেনা, ছেলেগুলো কেও তেমন ভাবে চেনে না। তবে হঠাৎ করে এভাবে একটা মেয়ের হাত ধরা, ওকে ঘিরে ধরে বেশ অনেকগুলো ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পেরেছিল যে ব্যাপারটা সুবিধার না। নিশ্চয় এখানে কিছু ঘটছে। তার মাঝে আরজুর রাগান্বিত মুখাবয়ব দেখে বুঝতে পেরেছিল যে মেয়েটা একদমই স্বস্তি অনুভব করছে না। ছেলে গুলো যে ওকে বিরক্ত করছে সেটা মুনতাসিরের আর বুঝতে বাকি রইল না। হাত ধরার সাথে সাথে মুনতাসির এগিয়ে যেতে ধরেছিল তবে পথিমধ্যেই পা জোড়া থেমে গেল যখন দেখলো আরজু নিজেই ছেলেটার গালে ঠা'স করে একটা চ'ড় বসিয়েছে।

মুনতাসির কিঞ্চিত চমকালো। এতগুলো ছেলে মেয়েটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অথচ মেয়েটার চোখে মুখে কোন ভয় নেই, কোন লজ্জা নেই, কোন জড়তা নেই। বরং মারুফের চোখে চোখ রেখে হিংস্র গলায় বলল,

“চোখ উপড়ে ফেলে রেখে দেবো যদি আর কোনদিন আমার দিকে তাকিয়েছিস। বিশ্বাস কর তোদের মত নরপশুদের খু'ন করতে আমার একটুও হাত কাঁপবে না।”

আরজুর বলা কথাগুলো মুনতাসিরের কান অব্দি পৌঁছালো। আরো অবাক হলো। মেয়েটার এত তেজ, এত সাহস। আশেপাশে অনেকে দাঁড়িয়ে দেখছে তামাশা অথচ কেউ সাহস করে এগিয়ে আসছে না একটু মেয়েটাকে সাহায্য করতে। কিছু মেয়ের আরজুর জন্য চিন্তা হলো, কিছু মেয়ে আবার আরজুর এত প্রতিবাদ কে বাড়াবাড়ি বলল। কিছু ছেলে কাপুরুষের মতো ঘটনাটা দেখে এড়িয়ে গেল, আবার কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল। বলতে গেলে সবাই দেখল ঘটনাটা অথচ কেউ আরজুর সাহায্যে এগিয়ে এলোনা।

এদিকে মাঠের মধ্যেখানে এত মানুষের সামনে একটা মেয়ে মারুফকে এভাবে অপমান করল, চ'ড় মারলো, যেটা মারুফের মোটেও সহ্য হলো না।

মুনতাসির বুঝলো এবারে ওর দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। মেয়েটা এবারে একা পেরে উঠবে না। যতই হোক এতগুলো ছেলের সাথে একটা মেয়ের একার পক্ষে পেরে ওঠা অসম্ভব।

মারুফ নিজের পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাবে তার আগেই মুনতাসির সেখানে গিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে মারুফকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ঝামেলা করছো কেন মেয়েটার সাথে?”

মারুফ মুনতাসির কে চিনলো কিনা কে জানে। আবার এমনও হতে পারে চিনেছে ঠিকই তবে হয়তো অপমানটা এতটাই বেশি আত্মসম্মানে লেগে গেছে যে সম্মুখে কে দাঁড়িয়ে আছে সেই পরিচয়টা মারুফের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো না। দাঁত চিবিয়ে বলল,

“সেটা আমার ব্যাপার। তোকে মাতব্বরি করতে কে বলেছে?”

মুনতাসির মারুফের সাথে আগেই আর কোন কথা বলল না। সরাসরি আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি চেনো ছেলেটাকে? বিরক্ত করছিল তোমায়?”

“অসভ্যতামো করছিলো। বিরক্ত করছিল জন্যই নিশ্চয়ই চ'ড়টা মে'রেছি। তারপরেও আপনাদের সবাইকে বলে বোঝাতে হবে তাই না? নাটকটা দেখতে এসেছেন নাকি সাহায্য করতে এসেছেন? নাকি ঝামেল আরো বাড়াতে এসেছেন সেটা আগে বলুন?”

মুনতাসির ভীষণ শান্ত কণ্ঠে বলল,

“সাহায্য করতে এসেছি তোমায়। তুমি যাও, আমি ব্যাপারটা দেখে নিচ্ছি।”

আরজু সত্যি যেতে ধরল তবে মারুফ আবারও দুঃসাহ দেখিয়ে আরজুর হাতটা টেনে ধরলো। অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সাহস খুব বেড়ে গেছে তোর? কে রে তুই? আমার মুখের সামনে থেকে আমার শিকার কে বলিস চলে যেতে।”

আরজু ভীষণ চেষ্টা করল মারুফের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর তবে পেরে উঠল না। নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মারুফ হাতটা চেপে ধরেছে।

মুনতাসির একবার আরজুর হাতের দিকে তাকালো। চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো। চোখ খুলে বেশ শান্ত কণ্ঠে মারুফকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“হাত ছাড়।”

মারুফ ঔদ্ধত্যের সাথে বলল,

“ছাড়বো না।”

মুনতাসির এবারে আর কোনমতেই নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। নিজের ভদ্র স্বভাবটাও আর বজায় রাখতে পারলো না। আসলে সবার সামনে ভদ্রতা বজায় রাখতে নেই। যে যেমন তাকে ঠিক তার ভাষাতেই বোঝাতে হয়।

একদম ছেলেটার নাক বরাবরই একটা ঘুষি মা'রলো। এক আঘাতেই মাঠের সবুজ ঘাসগুলোর উপরে উপুড় হয়ে পড়ল মারুফ। সাথে থাকা তিন চার জন ছেলে ওকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসতে চাইলো তবে মুনতাসিরের সাথে থাকা ছেলেপেলের জন্য তারা আর ঠিক সাহস করে উঠতে পারল না।

মুনতাসির মাটিতে ফেলে মারুফকে এলোপাথাড়ি মা'র'লো। আরজুর মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না। একবারের জন্যও মুনতাসিরকে আটকাতে মন চাইলো না। আরজুর মাঝে কোন মায়া দয়াই দেখা গেল না মারুফের জন্য। বরং মনে মনে যেন চাইলো মা'রতে মা'রতে জা'নো'য়ার'টার অস্তিত্ব ধ্বংস করে দিক পৃথিবী থেকে। এরকম জা'নো'য়ার'দের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন যোগ্যতা নেই, অধিকার নেই বেঁচে থাকার।

এক পর্যায়ে গিয়ে দলের ছেলেরাই ওকে থামালো নাহলে ঘটনা জটিল হতে পারে। মারুফের নাক মুখ ফে'টে র'ক্ত বের হওয়া শুরু করেছে।

আরেকটু হলে হয়তো প্রাণটাই বেরিয়ে যেত। মারুফের বন্ধুরা ওকে ধরে ওঠালো। মুনতাসির হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল,

“আর যদি কখনো এই মেয়ে বা অন্য কোন মেয়ের সাথে অসভ্যতা করতে দেখেছি প্রাণে বাঁচতে পারবি না।”

এত মা'র খাওয়ার পরেও মারুফের তেজ কমলো না। হাঁপানো গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি হামিদ ভাইয়ের লোক। হামিদ ভাই আমাকে নিজের ডান হাত বলে। তুই বুঝতেও পারলি না তুই কার গায়ে হাত দিলি।”

মুনতাসির আবারও হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,

“তোর হামিদ ভাইকে আমার সামনে নিয়ে আসিস। আমিও দেখতে চাই তোর কোন হামিদ ভাই তোকে আমার হাত থেকে বাঁচায়। তার ডান হাতটাই আগে কা'টবো। এই মুনতাসির চোখের সামনে কখনো কোন মেয়ের অপমান সহ্য করবে না। তোর হামিদ ভাই কে বলে দিস যদি সৎ সাহস থাকে তবে যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে।”

মারুফের বন্ধুরা ওকে নিয়ে চলে গেল। মুনতাসির আগে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করল। তারপর আরজুর দিকে ঘুরে তাকালো। মুহূর্তের মাঝে মুনতাসিরের অভিব্যক্তি বদলে গেল। ভীষণ শান্ত গলায় বলল,

“ভয় পেয়ো না। ওরা আর কিছু করবে না।”

আরজু ভীষণ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ভয় আমি পাইনি। তবে একটা প্রশ্ন আপনি কেন আমায় সাহায্য করলেন? কোন স্বার্থ ছাড়া করলেন নাকি এতে আপনারও কোন স্বার্থ জড়িয়ে আছে?”

“স্বার্থ তো একটা অবশ্যই জড়িয়ে আছে আর সেটা হলো কোন মেয়ের অসম্মান আমি সহ্য করতে পারিনা। বাড়িতে আমার নিজের একটা বোন আছে সেখানে অন্যের বোন কে আমার চোখের সামনে কেউ অসম্মান করবে সেটা আমার ঠিক সহ্য হয় না।”

মুনতাসিরের কথাটা আরজুর উপর বেশ ভালো প্রভাব ফেলতে পারলো। এই প্রথম বোধহয় কারো কথায় আরজুর দ্বিতীয়বার আর কোন সন্দেহ হলো না। মুনতাসিরের চোখের দিকে তাকিয়ে যেন বুঝতে পারলো যে ওর বলা কথাটা একদমই মিথ্যে না। একদম মন থেকে কথাটা বলেছে। কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“ধন্যবাদ আপনাকে। আশেপাশে যখন এতগুলো পুরুষ মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটক দেখছিল তখন আপনি এসে সাহায্য করেছেন আমায়। আপনার মা খুব ভালো শিক্ষা দিয়েছে আপনাকে। আর আপনার বোনও ভীষণ সৌভাগ্যবতী যে এমন একজন ভাই পেয়েছে যে ভাই শুধু তার না বাকি সব মেয়েদের সম্মানও রক্ষা করতে চায়।”

কথাটা বলে আরজু চলে যেতে নিলে মুনতাসির থামালো। ইতস্তত গলাতে বলল,

“তোমার নামটা কি?”

“নীরাঞ্জনা আরজু।”

“আচ্ছা আর আমি মুনতাসির। শোনো ওরা যদি আবার বিরক্ত করে তবে আমায় জানাবে কেমন? আর ভয় পাবে না। ভয় পেলে ওরা কিন্তু আরও সাহস পেয়ে যাবে। তুমি একটা কাজ করো তুমি আমার নাম্বারটা রাখো, কোন সমস্যা হলে আমাকে জানিও। খারাপ ভেবো না আমায়। আমাকে তোমার নাম্বার দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। বড় ভাই হিসেবে শুধু আমার নাম্বারটা তোমার কাছে রাখো।”

মুনতাসিরের শেষের কথাটা বোধহয় আরজুর পছন্দ হলো না। গম্ভীর গলায় বলল,

“আমার কোন ভাই নেই। আমি ভাই শব্দটাই পছন্দ করি না।”

এবারে মুনতাসির একটু থতমত খেল। নিজের ভুলটাকে শুধরে নিয়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমাকে ভাই ভাবতে হবে না তবুও বলছি আমার নাম্বারটা তুমি রেখে দাও। কোন সমস্যা হলে জানিও। “

আরজু ফোনটা বের করে মুনতাসিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নাম্বার বলুন।”

মুনতাসির নাম্বারটা বলল। আরজু সেই নাম্বারে কল দিয়ে মুনতাসির কে বলল,

“আমার নাম্বারও আপনার কাছে থাকলো। বিশ্বাস করে দিলাম জানিনা কেন। তবে বিরক্ত করলে নাম্বার ব্লক করে দেব।”

কথাটা বলে আরজু চলে গেল। মুনতাসির বিস্ময় ভরা নয়নে আরজুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার কিংবা ভাবার মতন খুঁজে পেল না। শেষে কিনা মুনতাসিরকে বলে গেল বিরক্ত করলে ব্লক দেবে? মানে মুনতাসির কোন মেয়েকে বিরক্ত করবে এটাও সম্ভব?

এতক্ষণে মুনতাসিরের বলা পুরো ঘটনাটা বেশ মনোযোগ দিয়ে আরমান শুনলো। বিস্ময়ে আরমানের মুখ হা হয়ে গেছে। এই মেয়ে এতটা সাংঘাতিক। এভাবে ঠুসঠাস করে যে কাউকে চ'ড় মে'রে দেয়। আবার খু'ন করার হুমকিও দেয়। এই মেয়েটা তো আরমানকে ধরবে আর আছাড় মা'রবে। একটুও খারাপ লাগবে না। আর আরমান মেয়েটাকে একটু ধমক দেওয়ার কথাও এখন ভাবতে পারেনা। আরজুর গায়ে একটু টোকা লাগলেও যেন আরমান কষ্ট পাবে এখন।

আরমান কে ভাবনার জগতে ডুবে থাকতে দেখে মুনতাসির বলে উঠলো,

“ভাই আপনি বলুন আপনার কি আমাকে এমন মনে হয় যে আমি একটা মেয়েকে বিরক্ত করব?”

আরমান হাসলো। তবে সেই হাসির মাঝে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো।

“তোমাকে তো শুধু এই একটা কথা বলেছে। আমাকে যে আরো ও কি কি বলেছে আমি বলে বোঝাতে পারবো না। আমাকে খু'নি বলে, জেল পালানো আসামী বলে, আমাকে মিথ্যেবাদী বলে, যা নয় তাই বলে অপমান করে, আমি নাকি ওর পিছু নেই, আমাকে নাকি বিশ্বাস করা যায় না আরো কত কি যে বলেছে। তোমাকে তো প্রথম দেখাতেই নাম্বারটা অব্দি দিয়েছে আর আমাকে ওই মেয়ে নিজ থেকে ওর নামটা অব্দি বলেনি।”

“হ্যাঁ এটা ঠিক বলেছেন। আরজুর থেকে আসলেই এটা আশা করা যায় না। “

আরমান বিজ্ঞের ন্যয় কিছু একটা ভেবে বলল,

“এই মুনতাসির সত্যি করে বলোতো, আরজু তোমায় পছন্দ করে না তো?”

মুনতাসির লজ্জা পেয়ে গেল। মাথা নিচু করে ইতস্তত গলায় বলল,

“কি যে বলেন না ভাই। পছন্দ করে না আমায়, শুধু একটু বিশ্বাস করে আপনার থেকে বেশি এই যা পার্থক্য।”

“বিশ্বাস থেকেই তো ভালোবাসার সূচনা হয়। আচ্ছা মুনতাসির শোনো তোমায় একটা কথা বলি, আরজু যদি কখনো তোমায় প্রপোজ করেও দেয় তুমি কিন্তু একসেপ্ট করবে না। ওকে বলে দেবে যে ও তোমার ভাবি। তুমি ওকে একদম বোনের নজরে দেখো কেমন?”

মুনতাসির আশ্বস্ত করে বলল,

“চিন্তা করবেন না ভাই একসেপ্ট করবো না। চাইলেও করতে পারবো না সে সুযোগ আর আমার কাছে নেই।”

“আচ্ছা সে যাই হোক। আজেবাজে কথা এখন বাদ দাও কিন্তু হামিদের কি হলো সেটা বলো?”

মুনতাসির সোজা হয়ে বসে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

“কি আর হবে পরের দিন হামিদ এলো আমার কাছে একদম হাসতে হাসতে নিজের চ্যালাদের সহ। সেই সাথে মারুফও এসেছিল। খুব শান্ত মাথায় আমায় হুমকি দিয়ে গেল। আমি ওনার সামনে চুনোপুটি, আমাকে ওনার রাস্তা থেকে সরাতে দু মিনিটও সময় লাগবে না সেসব বলে গেল।”

“আর আরজুর কথা কিছু বলেনি?”

“সেভাবে আমায় কিছু বলেনি তবে ওনার কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলাম আরজুর উপরেও ওনার অনেক রাগ জমা হয়ে আছে। কেননা আমার সাথে দেখা করার আগে উনি আরজুর সাথে দেখা করেছিলেন। তবে আমি জানিনা আরজু তখন ওনাকে কি বলেছেন।”

আরমানের চিন্তা বাড়লো। হঠাৎ করেই বিরক্তিকর গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি দরকার ছিল তোমাদের দুজনের এত ঝামেলা করার? একজনের চ'ড় দিয়ে হচ্ছিল না তুমি আবার গিয়ে সোজা মা'রা'মা'রি শুরু করলে। এই তুমি আমায় অনুসরণ করো মুনতাসির? আমাকে কখনো দেখেছো এমন জনসম্মুখে মা'রা'মা'রি'তে লিপ্ত হতে?”

মুনতাসির মুচকি হেসে বলল,

“আপনি বোধহয় আড়ালে সবটা করেন তাই না ভাই?”

“আস্তে কথা বলো। এসব কথা এত জোরে বলে নাকি। গাধা কোথাকার! শোনো যত রাগ সব মনের মাঝে জমা করে রাখবে রাতের জন্য। রাতের অন্ধকারে সেই রাগ আর ক্ষোভ গুলো বের করে দেবে। রাজনীতি তে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে হয়। আর যাই করো না কেন কখনো কোন প্রমাণ কিংবা সাক্ষী রাখবে না। আর যদি কাউকে দিয়ে কাজ করানোর হয় তবে খুব বিশ্বস্ত কাউকে বেছে নেবে। এমন কাউকে বেছে নেবে যে তোমার জন্য নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকবে।”

“এমন কেউ তো নেই আমার কাছে।”

“তবে তোমার এসব কিছু করারও দরকার নেই। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে মুনতাসির। তোমার কাঁধে অনেক দায়িত্ব। তোমার কিছু হয়ে গেলে তোমার সাথে আরো দুটো জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। আর আমি আগেই বলে দিচ্ছি আমি ওসব দায়িত্ব নিতে পারব না। তোমার দায়িত্ব তুমি সামলাও। এক আরজুকে নিয়েই আমি পারছি না।”

মুনতাসির আলতো হেসে বলল,

“মৃত্যু এত সহজ না ভাই। আর যদি আমার আয়ু শেষ হয়ে থাকে তবে সেই মৃত্যুতে আমি রাজি আছি। আমার আল্লাহ যা করবেন আমার ভালের জন্যই করবেন।”

“এ্যহহ। ম'রার জন্য তৈরি একেবারে। কি করেছো পরকালের জন্য? এই যে সারাদিন মাথায় টুপি দিয়ে রাখো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো?”

মুনতাসির আবারও আলতো হেসে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ, আমি হাফেজ ভাই। অনেক ছোট থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার অভ্যাস আছে। মসজিদেও নামাজ পড়াই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়াতে পারি না তবে জুমার নামাজটা নিয়ম করে পড়াই।”

আরো এক দফা বিস্ময়ে আরমানের মুখ হা হয়ে গেল। হতবিহ্বল গলায় বলল,

“তুমি এতো ভালো মানুষ আর তোমার কাছে আমি এসব প্রেমের আলাপ করছি। আস্তাগফিরুল্লাহ। কিছু মনে করো না মুনতাসির। আমিও নামাজ পড়ি কিন্তু হাফেজ না।”

“ঠিক আছে ভাই সমস্যা নেই। তবে একটা কথা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের ভালোবাসাকে হালাল করে নিন। হারাম সম্পর্কে আল্লাহর রহমত থাকে না।”

আরমান এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“সেটা আরজুকে গিয়ে বল। ওর কাছে বিয়ে মানেই হয়ত হা'রাম । কে জানে মনে মনে হয়ত আমাকে শয়'তান ভাবে। ওর জীবনের ব্যক্তিগত ইবলিস।”

কথাটা বলে আরমান হেসে উঠলো। মুনতাসিরও হাসলে তবে ওই যে খুবই অল্প। মুচকি হাসলো, যেমন সবসময় হাসে।

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প