সকাল সকাল কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে হাতের কাজটুকু ফেলে আগে তাড়াহুড়ো করে দরজাটা খুলে দিল হিমি। সম্মুখে আরমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো। আরমান আলতো হেসে সালাম দিয়ে বলল,
“কেমন আছেন ভাবি?”
“ভালো আছি। এতদিন পর এলে কেন? মাঝেমধ্যে তো একটু আসতে পারো। ভিতরে এসো।”
আরমান ভেতরে আসতে আসতে বলল,
“আমি মাঝেমধ্যে এলে যে কিছু মানুষের মাথা গরম হয়ে যায় ভাবি। সেজন্যই তো আসতে পারি না।”
“সবার কথা অত ধরতে নেই। টেবিলে বসো আমি খাবার দিচ্ছি।”
“সবার খাওয়া শেষ?”
“না। কেউ তো এখনো ঘুম থেকেই ওঠেনি। তোমার বড় ভাই কাল অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছে। আর তানভীরের তো এত সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই। বাবা অবশ্য ঘুম থেকে উঠেছে। ঘরে আছে।”
“আচ্ছা আমি আগে বড় আব্বুর সাথে দেখা করে আসি।”
কথাটা বলে আরমান দোতলায় চলে গেল।
যাওয়ার পথে আগে তানভীরের ঘরটাই সামনে পড়লো। দরজাটা খোলা দেখে একবার ঘরের ভেতরে উঁকি দিল। তানভীর বোধহয় সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। বিছানার ওপর বসে দুহাতে নিজেই নিজের চুল খামচে ধরে আছে। এর কারণটাও অবশ্য আরমান ঠিকই বুঝলো। ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“মা'ল খাওয়া মনে হয় তোর কম হয়েছে। আর একটু খেলে একেবারে চুলগুলো ছিঁ'ড়ে ফেলার শক্তি পেতি।”
খুব অপছন্দের একটা কণ্ঠস্বর তানভীরের কানে যেতেই চমকে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকালো। প্রথমে একটু অস্পষ্টই দেখল তারপর ধীরে ধীরে আরমানের মুখটা স্পষ্ট হলো। তবে তানভীরের বিশ্বাস হলো না যে আরমান এত সকালে ওর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝেই তো এমন হয় তানভীর এর সাথে। সে আরমান কে সামনে দেখতে পেয়ে গালিও দিয়ে দিয়েছে অনেকবার। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
“শা'লা সর সামনে থেকে। মা'ল খেলেও তোকে দেখি না খেলেও তোকে দেখি। শা'লা পেয়েছিসটা কি? আমার ঘাড় থেকে কবে নামবি তুই?"
আরমান পুনরায় ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“আমি আর ওঠার সময় পেলাম কোথায়? ওখানে তো সারাদিন শ'য়'তা'ন'ই উঠে বসে থাকে। শা'লা থাক তুই বিছানায় উপুড় হয়ে।”
কথাটা বলে আরমান ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল। এতক্ষণে তানভীরের টনক নড়লো। তার মানে আরমান সত্যি এসেছিল! কিন্তু কেন এসেছে ওর বাড়িতে আরমান? তানভীরের বাড়িতে তানভীর এর অনুমতি ব্যতীত কেন আরমান আসবে? এ বাড়িতে তানভীরের কথার কোন মূল্যই নেই। কত বার করে নিজের বাবা ভাইকে বলল আরমান যেন এই বাড়িতে না আসে কিন্তু কেউ ওর কথা শুনবে না। বরং মানা করলে আরো বেশি বেশি করে আসতে বলবে।তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। নিজের বাবা-ভাইয়ের সামনে গিয়ে যদি এমন ঢুলতে থাকে তাহলে সমস্যা আছে।
_______
ঘরের জানালার পাশে রাখা আরাম কেদারায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন মুহিব হোসেন। তবে এর মাঝে বেশ কয়েকবার ঘড়িতে সময় দেখে নিয়েছেন তিনি। বরাবরই তিনি সময় সচেতন মানুষ। তার দৈনন্দিন জীবনটা বেশ নিয়ম মাফিক চলে। প্রয়োজনীয় জায়গায় এক মিনিটও দেরি করে পৌঁছাতে তিনি পছন্দ করেন না। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটাটা সাড়ে আটটার ঘরে গিয়ে ঠেকলো। খবরের কাগজটা তিনি এক পাশে রেখে দিলেন, সেই সাথে চোখের চশমাটাও। ওঠার জন্য উদ্যত হতেই একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তার কানে। কন্ঠের ডাকটা শুনতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন আরমান দাঁড়িয়ে আছে। সালামের জবাব নিয়ে ইশারায় ভেতরে আসতে বললেন। রুমে তখন তার স্ত্রী কল্পনাও উপস্থিত। এই সকাল সকাল আরমান কে বোধ হয় তার খুব একটা ভালো লাগলো না। অবশ্য আরমান কে তার সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত কোন সময়ই পছন্দ হয় না। একদম ছোট ছেলের মতন তিনিও দুচোখে আরমানকে সহ্য করতে পারেন না। সহ্য করতে না পারার কারণটাও তার ছোট ছেলেই।
আরমান ভিতরে এসে তাকেও সালাম দিল। তিনি গম্ভীর গলায় কোনমতে সালামের উত্তরটা দিলেন। একপ্রকার বাধ্য হয়েই উত্তরটা দিলেন না হলে আরমানের সামনেই স্বামীর চোখ রাঙানো সহ্য করতে হবে সেসব তিনি খুব ভালো করেই জানেন। আর এই ছেলের সামনে নিজের স্বামীর কাছে কোনমতেই অপমানিত হতে তিনি প্রস্তুত না। ছোট ছেলের তো মান সম্মান শেষ করেই দিয়েছে অন্তত তার নিজের সম্মানটা ঠিক রাখতে হবে। শ্বশুরবাড়িতে গেলে এই ছেলের মায়ের অশান্তিতে বাঁচা যায় না আর এখানে এই ছেলের অশান্তিতে বাঁচা যায় না। আরমান ভেতরে আসতেই তিনি বাইরে চলে গেলেন।
মুহিব হোসেন হাত বাড়াতেই আরমান তার দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মেলালো। আরমানের মাথায় তিনি স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“কেমন আছো তাওসিফ?”
আরমান আশেপাশে বসার মতন কোন জায়গা পেল না। তাই মুহিব হোসেনের পায়ের কাছেই মেঝের ওপরে বসে পড়লো। মুহিব হোসেনও তাকে বাঁধা দিল না। আরমান প্রায়ই এমন করে। আলতো হেসে আরমান জবাবে বলল,
“ভালো আছি বড় আব্বু। আপনি কেমন আছেন?”
“এইতো বাবা ভালো আছি। প্রচারণার কাজ কেমন চলছে? কোন ঝামেলা হয়েছে কি?”
“এখন অব্দি তো হয়নি। আশা রাখছি সামনেও হবে না। কেননা আমি আমার দলের ছেলেদের বলে দিয়েছি যদি ওরা উস্কানি দেয় তারপরও যেন ঠান্ডা থাকে।”
“সব সময় ঠান্ডা থাকাটাও ঠিক না। মাঝে মাঝে বিপরীত পাশের মানুষটাকেও ঠান্ডা করতে হয় আশা করছি এই নীতিটা জানো?”
আরমান মুচকি হেসে বলল,
“চিন্তা করবেন না। রাজনীতিটা আপনার থেকেই শেখা। বরাবরই আমি আপনার নীতি অনুসরণ করি। এখন বলুন এত সকাল সকাল আমায় তলব করে পাঠিয়েছেন কেন?”
“তানভীরের মুখে শুনলাম তোমার নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছিল? আমায় তো কিছু জানাওনি।”
আরমান বুঝলো যে তানভীর শুধু এক্সিডেন্ট হওয়ার কথাটাই জানিয়েছে কিন্তু ওর গাড়ির সাথেই যে এক্সিডেন্টটা হয়েছে সেসব বলেনি। আরমানও আর সেই কথাগুলো তুলতে চাইলো না। তুললে এখন একটা অশান্তি হবে। আবার মুহিব হোসেন তানভীর কে ডেকে বকাবকি করবে, তানভীর আবার রেগে যাবে, আরমানের প্রতি ওর থাকা ঘৃণা আরো বেড়ে যাবে যেসব আরমান চায় না।
“সে তো গত পরশু হয়েছে। আর তেমন বড় কোন এক্সিডেন্ট না। শুধু বাইক থেকে একটু পড়ে গিয়েছিলাম। হালকা পাতলা হাত পা কে'টে গিয়েছিল এই আর কি।”
“এটা কি কাকতালীয় নাকি কেউ ইচ্ছে করে করেছে খবর পেয়েছো এই ব্যাপারে কিছু?”
আরমান চেয়েও বলতে পারল না যে ব্যাপারটা তানভীর ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটিয়েছে, এটা কাকতালীয় ব্যাপার না। আরমান মুহিব হোসেনকে মিথ্যে বলে না শুধুমাত্র তানভীর এর ব্যাপারগুলা ব্যতীত। তানভীর কে এত বার বাঁচিয়েছে, ওর জন্য আরমান মুহিব হোসেন কে এত মিথ্যে বলেছে তবুও তানভীর ওকে সারা জীবন ভুলই বুঝে গেল। আজ আরো একবার ওকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যেটা বলতেই হলো আরমানকে।
“না বড় আব্বু তেমন কোন ব্যাপার না। সাধারণ এক্সিডেন্ট।”
মুহিব হোসেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করলেন। আরমান খুব তাড়াতাড়ি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। মুহিব হোসেন হাসলেন। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আরমান কে বললেন,
“চলো খেতে যাই।”
আরমানও আর কোন কথা না বাড়িয়ে মুহিব হোসেনের পিছু পিছু নিচে চলে গেল।
নিচে আসতেই ডাইনিং টেবিলে মুহিব হোসেনের বড় ছেলে তাওকীর কেও দেখতে পেল। সেই সাথে তানভীরও বসে আছে। হিমি আর কল্পনা মিলে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। তাওকীর জানতো না যে আরমান এসেছে। আরমান কে দেখতেই চেয়ার থেকে উঠে এসে আন্তরিকতার সাথে ওকে জড়িয়ে ধরল। টুকটাক কিছু কথাবার্তার পর আরমান কে নিয়ে গিয়ে নিজের পাশের চেয়ারে বসালো।
মুহিব হোসেন আর তাওকীর বেশ হেসে হেসেই আরমানের সাথে টুকটাক গল্প করছেন, রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন যেগুলো তানভীরের মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। কই ওর সাথে তো কেউ কখনো এসব নিয়ে কথা বলে না। সবাই আরমানের প্রশংসা করে। কই কখনো তানভীরের একটু প্রশংসা তো কেউ করে না। মুহিব হোসেন কত ভরসা দেখায় আরমানের প্রতি, তানভীরের প্রতি তো কখন এতটা ভরসা দেখায় না।
খাবারের প্রতি থেকে রুচিই উঠে গেল তানভীরের। প্লেটটা সামনের দিকে একটু ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কাঁচের প্লেটটা কাঁচের জগের সাথে ধাক্কা খাওয়ায় বেশ জোরেই শব্দ হলো। কিছুটা পানি টেবিলের উপরেও পড়ল। এতে বেশ ক্ষেপে গেলেন মুহিব হোসেন। রাগান্বিত গলায় তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“এসব কোন ধরনের বেয়াদবি?”
তানভীর পাল্টা রাগ দেখিয়ে বলল,
“আমি তো বেয়াদবই। তোমাদের চোখে শুধুমাত্র আমার বেয়াদবিগুলোই ধরা পড়ে আর তো কিছু ধরা পড়ে না।”
কথাটা বলে তানভীর চলে যেতে চাইলে তাওকীর গম্ভীর গলায় ওর নাম ধরে ডেকে উঠলো। তানভীরের সাহস নেই ওর বাবা কিংবা ভাইয়ের ডাক উপেক্ষা করে যাওয়ার। বাধ্য হলো থামতে। তাওকীর চেয়ার থেকে উঠলো না। শুধু খাবার হাতটা থামিয়ে গম্ভীর গলাতে তানভীরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সমস্যা কি তোর?”
“আমার কি সমস্যা হতে যাবে ভাই? তোমাদের কি সমস্যা সেটা বরং তোমরা আমায় বলো?”
“স্পষ্ট ভাষায় কথা বল। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমাদের সাথে কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই।”
“আমি স্পষ্ট ভাষায় কথা বললেই বা তোমরা কোথায় বোঝো ভাই? তোমাদের কি আমায় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা আছে? সারাদিনরাত তুমি আর বাবা শুধু তাওসিফ তাওসিফ তাওসিফ বলতেই থাকো। আমার কোন মূল্য আছে তোমাদের কাছে? ওই তাওসিফের জন্য আজ আমি সহ-সভাপতি পদে দাঁড়াতে পারলাম না এর জন্য তোমরা আমায় সান্ত্বনা দিয়েছিলে? একবারও ওকে গিয়ে বকেছিল? ওর থেকে কৈফিয়ত চেয়েছিলে যে কেন আমার সাথে এমনটা করলো?”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তোকে আর কতবার বলবো তানভীর এসব আমার হাতে নেই।”
“একদম বাজে কথা বলবি না। আমি জানি তুই আমার নামে দলে খারাপ কথা বলেছিস। তুই বলেছিস আমি এসবের যোগ্য না।”
আরমান কিছু বলতে গেলে তাওকীর হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিল। এবারে নিজে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে দুহাত বুকে গুঁজে তানভীরের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলল,
“কে বলেছে তোকে এসব কথা? কোন প্রমাণ আছে, কোন সাক্ষী আছে?”
তানভীর আমতা আমতা করে বলল,
“প্রমাণ সাক্ষীর প্রয়োজন হবে কেন? আমার মুখের কথা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?”
“অবশ্যই না। অন্য কারো সম্বন্ধে বললে তাও বিশ্বাস করতাম কিন্তু তুই অপবাদ তুলছিস তাওসিফের নামে যে তোর মতনই আমার র'ক্ত। তোর এসব বাচ্চামো অনেক সহ্য করেছি কিন্তু সবকিছুরই একটা সীমা থাকে। আগে নিজেকে ভালো করে তৈরি কর। তোকে বারবার করে বলেছি রাজনীতিতে আসিস না। তুই রাজনীতির জন্য তৈরি হোসনি কিন্তু শুনলি না তো আমার কথা। এর থেকে যদি পড়াশোনায় মন দিয়ে ব্যবসা দেখাশোনা করতি তাহলে তোর উপকার হতো।”
“নাও অমনি আমার খুঁত ধরা শুরু হয়ে গেল তোমাদের তাইনা? তোমরা কেউ কখনো চাওইনি আমি রাজনীতিতে উন্নতি করি। তোমরা সবাই আমার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছো। তাওসিফকে বাদ দিলাম, তোমরা আমার নিজের বাবা ভাই হয়েও আমার বিরুদ্ধে গিয়েছো। কাউকে প্রয়োজন নেই তোমাদের আমার। আমি নিজ থেকেই নিজের উন্নতি করব। দেখিয়ে দেবো তোমাদেরকে একদিন যে রাজনীতি আমার জন্যও।”
কথাগুলো বলে হনহন করে হেঁটে তানভীর উপরে চলে গেল। তাওকীরও আর খেতে বসলো না, চুপচাপ ঘরে চলে গেল। ওনার পিছন পিছন মুহিব হোসেনও চলে গেল। এবারে তেঁতে উঠলেন কল্পনা। সরাসরি আরমানকে উদ্দেশ্য করে তিনি কিছু বলতে পারলেন না। একা একা রাগ দেখিয়ে হা হুতাশ করে বলতে লাগলেন,
“কে জানে কার নজর লেগে যায় মাঝে মাঝে আমার সংসারে? কার কালো ছায়া পড়লে আমার সংসারটায় এমন অশান্তি শুরু হয়? ছেলে স্বামী কেউ সকালে খেলো না। খোদা তুমিই বলো কে নজর লাগাচ্ছে আমার সুখের সংসারের ওপর?”
আরমান ফিক করে হেসে ফেলল। আরমান জানে কল্পনা ওকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে। মানুষটা যে দুচোখে আরমানকে সহ্য করতে পারে না সেটাও আরমান খুব ভালো করেই জানে। আরমান খাওয়া ছেড়ে মোটেও ওঠেনি। বরং প্লেটের খাবারটুকু শেষ করে কল্পনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার সুখের সংসারে অশান্তি লেগে যায় আপনার জন্যই বড় আম্মু। ছোট ছেলেকে একটু মানুষ করুন। খোঁজখবর কি রাখেন যে ছেলেটা আজকাল মদের নেশায় ডুবে থাকে? এমন চলতে থাকলে রিহ্যাবে পাঠাতে হবে আপনার আদরের ছেলেকে।”
কল্পনা মনে মনে আরমানকে কড়া কিছু কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুতি নিলেন তবে সেই সুযোগ ঠিক হয়ে উঠলো না। তার আগেই মুহিব হোসেন আর তাওকীর কে আসতে দেখে তিনি চুপ করে গেলেন। সেখানে দাঁড়ালেনই না, নিজের ঘরে চলে গেলেন।আরমান বেসিন থেকে হাত ধুঁয়ে পিছন ফিরতেই দেখল হিমি তোয়ালে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরমান সেটায় হাত মুছে হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে হিমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আজ আসি ভাবি। রান্না গুলো খুব সুন্দর হয়েছিল।”
আরমান যেতে ধরলে হিমি ওকে পিছন থেকে ডাকলো। আরমান পিছন ফিরে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ ব্যস্ত গলাতেই বলল,
“কিছু বলবেন ভাবি?”
হিমি ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
“একটা কথা বলার ছিল তোমায়।”
“হ্যাঁ বলুন?”
“তুমি একটু সাবধানে থেকো কেমন।”
আরমান কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“হঠাৎ এই কথা?”
“এমনি বললাম। তোমার বড় ভাই বলে যেকোনো নির্বাচনের আগে নাকি ঝামেলা বেশি হয়। তোমার ভাই আর একটা কথাও বলে রাজনীতিতে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। নিজের কাছের মানুষদের কেও না, নিজের বন্ধু বান্ধব কাউকে না। তুমি নিজের খেয়াল রেখো। তানভীর কেও একটু দেখে রেখো ও যেন খারাপ পথে চলে না যায়। ছেলেটাকে নিয়ে আমরা সবাই খুব চিন্তায় থাকি। জানি ওর মাথা একটু গরম তবে খারাপ না।”
আরমান আনমনে হেসে বলল,
“যে মানুষ মা'রতে চায় তাকে ভালো কি করে বলি ভাবি?”
“কিছু বললে?”
আরমান নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“না ভাবি কিছু না। চিন্তা করবেন না আপনি। আমি নিজেরও খেয়াল রাখব সেই সাথে তানভীরেরও। আজ আসি।”
_________
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গোসল করে একটা নতুন সুতি শাড়ি পরল প্রার্থনা। ভেজা চুল গুলো শুকনো গামছা দিয়ে মুছে গামছাটা বারান্দায় গ্রিলের সাথে রেখে দিলো। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার খুব ভালোভাবে দেখে নিল। ঠোঁটের কোণাটা কালচে হয়ে গেছে। গলার কিছু জায়গাতেও নখের দাগ বসে গেছে। কিছু কিছু জায়গা লাল হয়ে উঠেছে। সেসব দিকে খেয়াল দিল না প্রার্থনা। চুলটা আঁচড়ানোর জন্য চিরুনিটা হাতে নিতে ধরে খেয়াল করল হাতে বল পাচ্ছে না। পরে হাতের দিকে নজর দিতেই মনে পড়লো একটা আঙুলে বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে। ফাহাদ মুচড়ে ধরেছিল। সেই আঙুলটা ফুলেও উঠেছে।
প্রার্থনা অন্য হাতে সেখানে হাত বলাতে ধরেও ব্যথায় ককিয়ে উঠলো। তবে প্রার্থনার সেই ব্যথা গুলো এই বাড়িতে দেখার মতন কেউ নেই। সেই কোন সকালে ফাহাদ বেরিয়ে গেছে। রাতে যে নিজের নববিবাহিত স্ত্রীর প্রতি কি অমানুষের মতন অত্যাচার চালিয়েছে সেসবে তার না কোন খেয়াল আছে, না কোন অপরাধবোধ। সকালে একবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেনি তুমি ঠিক আছো কিনা। বরং দ্বিতীয়বারের মতন নিজের অমানুষি অত্যাচার চালিয়ে চলে গেছে। আর প্রার্থনাকে সেই সব কিছু চুপচাপ সহ্য করে যেতে হয়েছে। যদি দু'একবার মুখ ফুটে নিজেকে বাঁচানোর জন্য অনুরোধ করেছে তার বিনিময়ে ফাহাদের হাতের কিছু থাপ্পড় হজম করতে হয়েছে। আর প্রার্থনার কাছে তো সেসব হজম করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। উদগীরণ করতেও পারবে না, গলায় আটকে রাখলেও নিজেরই কষ্ট হবে। তাই বাধ্য হয়ে হজমই করে নিয়েছে।
প্রার্থনা ভাবলো গতকাল যদি ফাহাদের জায়গার সাহিত্য থাকতো তবে কেমন কাটতো ওর বিয়ের প্রথম রাতটা? অবশ্যই অন্য রকম কাটতো। সাহিত্য তো ফাহাদের মতন এমন নির্দয় না। সাহিত্য প্রার্থনা কে ভালোবাসত। ওর প্রতিটা ছোঁয়া হতো ভালোবাসাময়, ভীষণ কোমল। মাঝে মাঝে কি সুন্দর প্রার্থনার জন্য কবিতা লিখত, রোজ নিজের ভালোবাসার গল্প শোনাতো প্রার্থনাকে। সেই মানুষটা কি ফাহাদের মতন এমন নির্দয় হতে পারে? কখনোই না। হ্যাঁ, যদি ফাহাদের জায়গায় সাহিত্য থাকতো তবে প্রার্থনার বিয়ের প্রথম রাতটা অন্যরকম কাটতো। জীবনটাই অন্যরকম হতে পারত।
প্রার্থনার এসব ভাবনার মাঝেই ঘরে ফারিহা এলো। মেয়েটাকে দেখতে বেশ হাসি খুশি লাগছে। এসেই পিছন থেকে দুহাতে প্রার্থনা কে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কেমন আছো ফুপি?”
ফারিহা কে আসতে দেখে প্রার্থনা তাড়াহুড়ো করে নিজের চোখের জলটা মুছে নিয়ে মুখে একটা মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“ভালো আছি আম্মু। তুমি কেমন আছো?”
“সকাল সকাল তোমায় দেখে খুব ভালো লাগছে। জানো আগে তো সকাল হতে না হতেই বাবা আর চাচ্চু বেরিয়ে যেত। আমিও সকালে একা একাই তৈরি হয়ে স্কুলে যেতাম, স্কুল থেকে ফেরার পরও বাসায় একাই থাকতাম। কিন্তু এখন তুমি আছো, তোমাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে।”
প্রার্থনা হাসলো। ফারিহা প্রার্থনা কে ছেড়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমায় কিন্তু খুব সুন্দর লাগছে ফুপি।”
কথাটা বলতেই ফারিহার নজর গেলো প্রার্থনার ঠোঁটের কোনার কালচে দাগটায়। আলতো করে সেখানে হাত বুলিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলো,
“এখানে কি হয়েছে?”
“কিছু হয়নি।”
“আরে বললেই হলো নাকি? আমি দেখতে পাচ্ছি জায়গাটা কেমন কালো হয়ে আছে, জখম হয়ে গেছে।”
“ও এমনি। আমার কথা বাদ দাও তুমি বলো সকালে খেয়েছো?”
ফারিহা হয়তোবা বুঝতে পারলো যে প্রার্থনা কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাই নিজেও আর কোন কথা বাড়ালো না। টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে প্রার্থনার হাত ধরে নিয়ে যেতে চাইলে প্রার্থনা ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো। ফারিহা তৎক্ষণাৎ হাতটা ছেড়ে দিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
“কি হলো? আমি তো খুব জোরে ধরিনি হাতটা।”
প্রার্থনা ব্যাথায় কুঁচকানো মুখ নিয়ে বলল,
“হাতে ব্যথা পেয়েছি।”
“কেন কি হয়েছে হাতে দেখি?”
“একটা আঙুল ব্যথা করছে। বুঝতে পারছি না মচকে গেছে না ভেঙে গেছে।”
ফারিহা আলতো করে প্রার্থনার হাতটা ধরে দেখলো একটা আঙ্গুল ফুলে গেছে। এবারে যেন ফারিহার কাছে ব্যাপারটা বেশ পরিষ্কার লাগলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“বাবা তোমায় মে'রেছে তাই না?”
মেয়ের কাছে তার বাবার এমন কুকীর্তির কথা বলতে প্রার্থনার নিজেরই বিবেকে বাধল। মিথ্যে কোন অজুহাত দিতে নেবে তার আগেই ফারিহা বলে উঠল,
“মিথ্যে বলো না। বাবা আম্মুকেও মা'রতো আমি জানি। তোমাকেও নিশ্চয়ই মে'রেছে?”
প্রার্থনা আর কিছু বলল না। এই ছোট মেয়েটাকে আর কিইবা নালিশ করবে? বড় বড় মানুষগুলোই তো কষ্ট বোঝে না সেখানে এই ছোট মেয়েটা ওর কষ্টগুলো শুনেই কি বা করবে? ফারিহা দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রার্থনাকে। মেয়েটাই কেঁদে ফেলেছে। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“তুমি আরজু ফুপির মত কেন হতে পারলে না? আজ যদি তুমি আরজু ফুপির মত হতে কিংবা আরজু ফুপি এখানে থাকতো তাহলে তোমার সাথে এসব হতে দিত না।”
প্রার্থনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফারিহা ভুল কিছু বলেনি। আরজু এখানে থাকলে আজ প্রতিশোধ নিতো। ওর আপার গায়ে হাত তোলার প্রতিশোধ নিতো।
________
পার্কে বেঞ্চের উপর বসে আছে আরজু। আজ সময়ের একটু আগেই এসেছে। তার কারণ আজ ওর এক বান্ধবী ওকে আসতে বলেছে। অনেকদিন হলো দেখা করতে চাইছে মেয়েটা। আরজুর যদিও খুব একটা ইচ্ছে ছিল না দেখা করার, অন্য কোন জায়গায় ডাকলে হয়তো দেখা করতে যেতও না। তবে যেহেতু এই পার্কেই আসতে বলেছে তাই রাজি হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর অবশেষে আরজুর বান্ধবী এলো।
আরজু কে দেখে মেয়েটা উচ্ছ্বসিত হয়ে এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। তবে আরজুর মাঝে বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। কোনরকমে শুধু পাল্টা একটু জড়িয়ে ধরলো। আরজুর নজর তখন ওর বান্ধবীর সাথে আসা ছেলেটার উপর। এর আগে কখনো ছেলেটাকে দেখেনি। আরজুর জন্য একদমই নতুন মুখ। মলি আরজু কে ছেড়ে দিয়ে কিঞ্চিত অভিমানি গলায় বলল,
“কতদিন হলো তুই আমার সাথে দেখা করিস না? আমার কথা কি একটুও মনে পড়ে না তোর?”
আরজু বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“সত্যি বলতে তুমি ফোন না করলে তেমন একটা মনে পড়ে না। মনে পড়া কি দরকার ছিল?”
মলি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আসলে আমরা তো বন্ধু। দেখা না হলে মনে পড়বে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না?”
“তুমি আমার বন্ধু? বন্ধুরা তো সব সময় পাশে থাকে, তুমি তো আমার পাশে নেই। বন্ধুরা তো কখনো তাদের বন্ধুকে ছেড়ে চলে যায় না, তুমি তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছো। বন্ধু মানে তো যে প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায়, আমি তো তোমায় কল করেছিলাম আমার প্রয়োজনে কিন্তু তুমি তো রিসিভ করো নি।তাহলে তুমি আমার বন্ধু হলে কি করে?"
মলি ভ্যাবাচ্যাকা খেলো না অবাক হলো নিজেই ঠিক বুঝতে পারল না। যুক্তি দিয়ে বিচার করতে গেলে আরজুর কোন কথাই ভুল না। তবে সবসময় সত্যি কথা মুখের উপর বলে দিতে হবে এরও তো কোন মানে নেই তাই না? মলির কাছে অন্তত মনে হলো এখন আরজু এই সত্যি কথাগুলো না বললেও পারতো। অন্তত ওর নিজের কাছে একটু হলেও কম অপরাধবোধ অনুভুত হতো।
সে যাই হোক। মলি আরজুর এসব কথা খুব বেশি মনে নিল না। জানে মেয়েটা সবসময় সত্যি কথাই বলে। একদম ঠাস ঠাস করে মুখের উপর বলে দেয় সবকিছু।
নিজের সাথে আনা ছেলেটাকে দেখিয়ে আরজু কে বলল,
“আচ্ছা বাদ দে সেসব কথা। এইটা তোর দুলাভাই।”
আরজু একবার ছেলেটার দিকে তাকালো। আরজু কে তাকাতে দেখে জুবায়ের হালকা হেসে একটু আন্তরিকতা জানানোর চেষ্টা করলো তবে আরজুর মুখ দেখে তার নিজের মুখের হাসিটাও হাওয়া হয়ে গেল। আরজু মলির দিকে তাকিয়ে বেশ সহজ স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করল,
“এর আগেও যে একজনকে এনে পরিচয় করে দিয়েছিলে দুলাভাই বলে উনি কোথায় তাহলে? তুমি এক মেয়ে হয়ে কয়জনকে বিয়ে করবে?”
আরজু কথা শেষ করার সাথে সাথে মলি ওর মুখ চেপে ধরল। মলি টেনে আরজু কে একটু সাইডে নিয়ে এসে বলল,
“এসব কি বলছিস তুই? কার সামনে কি বলতে হয় জানিস না?”
“কেন তুমি ওনাকে বলোনি যে এর আগেও তোমার কারো সাথে সম্পর্ক ছিল? সম্পর্কের শুরুতেই যদি মিথ্যে বলো তাহলে সম্পর্ক টিকবে কি করে? পরে উনি জানলে তো কষ্ট পাবেন।”
“আরে ভাই আমি বলেছি ওকে কিন্তু বারবার ওর সামনে কথাগুলো তোলার কি দরকার। তুই চুপ থাক। আর কি তখন থেকে তুমি তুমি লাগিয়েছিস? আমি তোকে তুই-তুকারি করছি আর তুই তুমি তুমি করছিস কেন?”
"তুই বলে ডাকার সম্পর্ক এখন আর নেই। তুমিই ঠিক আছে। যাই হোক তোমার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে তুমি ওনাকে ঠকাতে চাইছো। একটা কথা মনে রেখো, রিভেঞ্জ অফ ন্যাচার নামে একটা কথা আছে। আজ তুমি ওনাকে ঠকালে কাল কিন্তু উনিও তোমায় ঠকাতে পারে। একবার ওনার বিশ্বাস ভাঙলে উনি আর কখনোই তোমায় বিশ্বাস করতে পারবে না। আর দুইদিন পর পর ভালোবাসা বদলানো ছেড়ে দাও। এগুলো কে ভালোবাসা বলেনা এগুলোকে বলে টাইম পাস। অবশ্য ভালোবাসবেই বা কি করে? ভালোবাসা বলতে কিছু হয় নাকি?”
“আপনাকে বোধহয় কখনো কেউ ভালোবাসেনি তাই না মিস? সেজন্য আপনি ভালোবাসাতে বিশ্বাসই করতে পারেন না।”
আবার সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর। আরজুর ভালো লাগে না এক মানুষের সাথে বারবার একই জায়গায় দেখা হলে। কেন ঘুরে ফিরে লোকটা ওর সাথে কথা বলতে আসে? বুঝতে পারে না কি যে আরজু বিরক্ত হয়?
তবে আরমান আসাতে মলি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এখন নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেন জুবায়ের কে নিয়ে আরজুর সাথে দেখা করতে এসেছিল? ওর তো বোঝা উচিত ছিল যে মেয়েটা এমনই সটান। মুখের ওপরই সব বলে দেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাগ্যিস আপনি ঠিক সময়ে এসে আরজু কে থামালেন ভাইয়া। না হলে এই মেয়েটা আমার অবস্থা খারাপ করে দিচ্ছিলো।”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“ওনার কথা শুনে আমার মত মানুষের পর্যন্ত ঘাম ছুটে যায় আর সেখানে আপনার অবস্থা যে খারাপ হবে এটাই স্বাভাবিক। তো মিস আরজু ভালোবাসার প্রতি আপনার ঘৃণার কারণটা জানতে পারি?”
“জেনে কি আপনার কোন উপকার হবে?”
আরমানের মনে হলো যদি বলে উপকার হবে না তাহলে হয়তো আরজু বলবেও না। তাই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। যেহেতু আরজু বুঝতে পারল যে উত্তরটা জানলে আরমানের উপকার হবে তাই ভাবলো বলা যেতেই পারে। উপকার হবে তার মানে প্রয়োজনীয় কথা। আর প্রয়োজনীয় কথা বলা যেতেই পারে।
“ভালোবাসার প্রতি আমার আলাদা করে কোন ঘৃণা নেই, ভালোবাসা জিনিসটাই ঘৃণিত। ভালোবাসা মানে কেউ না কেউ কষ্ট পাবে, কেউ না কেউ কাউকে ঠিক ঠকাবে। ভালোবাসা মানে কোন একজনের প্রতি আমাদের ঘৃনা ঠিক তৈরি হবে, তার মানে ভালোবাসা ঘৃণিত।”
“কোথায় লেখা আছে এরকম কথা যে ভালোবাসলে কেউ না কেউ কষ্ট পাবেই?”
“লেখা না থাকলে নতুন করে লিখে নিন। প্রত্যেকটা বিষয়ই কোনো না কোনো সময় কেউ না কেউ কোথাও লিপিবদ্ধ করেছে। এই কথাটা হয়তো আজ অবধি কোথাও লেখা নেই। এবার থেকে না হয় আপনি আপনার মনে এটা লিপিবদ্ধ করে নিন। কাজে লাগবে।”
“আপনার কি মনে হয় না আপনি মানুষটা একটু অদ্ভুত?”
“আমি অদ্ভুত হলেই বা আপনার কি স্বাভাবিক হলেই বা আপনার কি? যেখানে আমি ম'রে গেলেও কারো কিছু যায় আসবে না সেখানে আমি মানুষটা অদ্ভুত তাতে কি আসে যায়? আপনাকে একটা কথা বলছি, আমার পিছু নেবেন না। আমি নিষেধ করে দিচ্ছি।”
আরমান একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“আরে আমি তো আপনার পিছু নেইনি। ওই যে দেখছেন জুবায়ের, ও আমার বন্ধু। ও আমাকে এখানে আসতে বলেছিল জন্য এসেছি।”
আরমানের কথার প্রেক্ষিতে আরজু আর কিছু বলল না। যেহেতু আরমান প্রমাণ করেই দিল যে ও আরজুর পিছু পিছু এখানে আসেনি তাহলে তো আরজুর কিছু বলা মানায় না। আরমান যেখানেই যাক তাতে আরজুর কি? সরাসরি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মলির ওপর। হালকা গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি আসছি।”
আরজুর কণ্ঠ শুনে মলির আর আটকানোর সাহসই হলো না। আরজু চলে যেতে নিলে আরমান ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আরজুর মুখ ভঙ্গি দেখে বোঝা গেল না বিরক্ত হলো নাকি রেগে গেল। আরমান ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজ থেকে বলে উঠলো,
“আমার পাওনা টাকাটা দেবেন না?”
আরজুর অভিব্যক্তি বদলে গেল। একটু চিন্তিত লাগলো আরজু কে কিংবা লজ্জিতও বলা চলে। টাকার কথাটা ভুলে গিয়েছিল। ব্যস্ত গলায় আরমান কে বলল,
“দুঃখিত! আমি আসলে ভুলে গিয়েছিলাম বিষয়টা অন্যান্য চাপে।”
আরজুর কন্ঠের অপরাধবোধ দেখে আরমানের নিজেরই কেন যেন খারাপ লাগলো। মনে হলো কথা বলার জন্য ভুল বিষয়টা কাজে লাগিয়েছে।
“আরে ক্ষমা চাইতে হবে না। ঠিক আছে আপনার যখন সময় সুযোগ হবে দিয়ে দেবেন।”
“আমার কাছে আছে টাকা আমি আপনাকে দিচ্ছি।”
আরজু ব্যাগের পকেট থেকে একটা এক হাজার টাকার নোট আরমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আপনার পাওনা টাকাটা নিয়ে বাকিটা আমায় ফেরত দিন।”
আরমানের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই একটা অজুহাতই তো ছিল আরমানের কাছে বারবার আরজুর সাথে কথা বলার জন্য। সেই দিন আরজু যেভাবে গুনে গুনে কয়েকটা খুচরো টাকা দিয়েছিল তাতে আরমান ভেবেছিল বাকি টাকাটা দিতে হয়ত ওর একটু সময় লাগতে পারে। হোক টাকার পরিমাণটা অল্প কিন্তু সেটুকুও আরজুর জন্য বিশাল। টাকাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো কি করা যায়। বেশ তাড়াতাড়ি একটা উপায়ও পেয়ে গেল।
“আমার কাছে তো এত খুচরো নেই। আপনি খুচরো দিন।”
“আমার কাছে তো খুচরো হবে না। আচ্ছা একটু দাঁড়ান আমি ব্যবস্থা করছি।”
আরজু নোটটা হাতে নিয়ে মলিকে দিয়ে বলল খুচরো আছে কিনা। মলির কাছে খুচরো নোট আছে। যেই সায় জানাতে যাবে ওমনি দেখলো আরমান ইশারায় না বলতে বলছে। মলি বেশ তাড়াতাড়ি আরমানের ইশারাটা বুঝতে পেরে বলল নেই।
আরজু এবার একটু বিপদেই পড়লো। আগবাড়িয়ে গিয়ে কাউকে বলবে খুচরো আছে কিনা সেসব আরজুর দ্বারা সম্ভব না। বলা যায় আগবাড়িয়ে গিয়ে কারো সাথে কথাই বলতে পারবে না আরজু।
কোন উপায় না পেয়ে আরমানের কাছে গিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“ক্ষমা করবেন। আসলে আমার কাছে এখন খুচরো নেই। আর একটা দিন অপেক্ষা করুন।
আমি আগামীকাল ভার্সিটি গিয়ে আপনাকে ফেরত দিয়ে দেব কথা দিচ্ছি।”
“আরে ঠিক আছে এত ব্যস্ত হতে হবে না। আপনার যখন সুবিধা হয় তখন দেবেন। আরে আমরা তো নিজের মানুষই। একে অপরের থেকে টাকা ধার নেব বিপদে আবার ফেরত দেবো এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। এত ব্যস্ত হবেন না।”
মুহূর্তের মাঝে আরজুর মুখ ভঙ্গি আবারো গম্ভীর হয়ে উঠলো। সেই পূর্বের ন্যয় গম্ভীর গলাতে বলল,
“এই পৃথিবীতে কেউ নিজের হয় না। নিজের র'ক্তের মানুষই হয় না, নিজের মা-বাবাও নিজের হয় না সেখানে আপনি কে? আপনি কেন আমার নিজের হতে যাবেন?”
আরমানের হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল। এই মেয়েকে কখন কি বললে যে রেগে যায় কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ভালো কথা বললেও রেগে যায়, খারাপ কথা বললে তো কোন কথাই নেই। তাহলে বলবেটা কি? আবার আরমান চুপচাপ থাকলে তো এই মেয়ে আগবাড়িয়ে কোনদিনও কথা বলবে না। তাহলে আরমানও যদি চুপ করে থাকে তাহলে সম্পর্কটা এগোবে কি করে? প্রেম হবে কি করে?
ভালোবাসার প্রতি এই মেয়ের যে তীব্র ঘৃণা তাতে তো একে এখন সরাসরি বলাও যাবে না যে ওর সাথে প্রেম করতে চায়। বলা যায় না আবার যদি থানায় গিয়ে মামলা করে দেয়।
আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু ফের বলে উঠলো,
“দেখেছেন আমার এক যুক্তির কাছে চুপ করে গেছেন। আপনি যদি সত্যি আমার নিজের মানুষ হতেন তাহলে আপনি জোর গলায় আমাকে নিজের মানুষ হিসেবে দাবি করতেন। সেজন্যে ভাবনা চিন্তা করে কথা বলবেন।”
আরমান অসহায় মুখ করে বলল,
“আমি যদি জোর গলায় দাবি করতাম আপনি তখন বলতেন কোন অধিকারে এভাবে বলছি? আপনি আসলে চানটা কি আমার থেকে বলুন তো? আমি কি করলে আপনি খুশি হবেন?”
আরজুর ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে সূক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো। সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আমায় খুশি করে আপনার কি লাভ? আমার থেকে তো আপনার কিছু পাওয়ার আশা নেই। উদ্দেশ্য কি আপনার? আমার থেকে একটা ভোট পাওয়ার জন্য এমন করছেন?”
আরমান এবারে কিঞ্চিৎ বিরক্তি মাখা গলায় বলল,
“রাখুন তো আপনার ভোট। আপনার একটা ভোটের জন্য আমি এত কষ্ট করব? কিছুই কি বোঝেন না আপনি? আর সবকিছুতে এত লাভ ক্ষতি খোঁজেন কেন?”
"পুরো পৃথিবীটাই যেখানে লাভ ক্ষতির ওপরে চলে সেখানে আমি খুঁজলেই দোষ? আপনি আমার পেছনে ঘুরছেন কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে, কোন কিছু পাওয়ার লোভেই তো? তাহলে আমি মিথ্যে বললাম কোথায়?”
আরমান অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আমি তো বলিনি আপনি মিথ্যে বলেছেন। আপনি মিথ্যে বলতেই পারেন না। তবে একটা কথা বলি আপনাকে বলতে পারেন উপদেশ, মাঝে মাঝে একটু হেসে হেসেও কথা বলা যায়। তাতে অপর পাশের মানুষটা একটু নার্ভাস কম হবে। এই দেখুন আমি হাসছি, হেসে হেসে কথা বলছি সেজন্য আপনি নার্ভাস হচ্ছেন না। কিন্তু আপনার গম্ভীর কণ্ঠ শুনে আমি নার্ভাস হচ্ছি।”
আরমানের কথায় আরজুর অভিব্যক্তির কোন পরিবর্তন ঘটলো না। কাট কাট গলায় বলল,
“আপনি নার্ভাস হচ্ছেন তার কারণ আপনি জানেন আপনি যুক্তিহীন কথা বলছেন। আর আমার কথায় যে যুক্তি আছে সেটা আমিও জানি আপনিও জানেন। নিজের ওপরে কনফিডেন্স থাকলে অপর পাশের মানুষ যে গলাতেই কথা বলুক না কেন আপনি কখনোই নার্ভাস হবেন না। যখন স্টেজে উঠে সবার সামনে বক্তব্যে নানা কথা বলেন তখন নিজের উপর কনফিডেন্স থাকে জন্যই আপনি নার্ভাস হন না। সেই কনফিডেন্সটা সবসময় নিজের মাঝে ধরে রাখবেন। আসছি।”
আরমানের আর সাহসই হলো না আরজুর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর। এবার যদি আটকানোর চেষ্টা করে মেয়েটা নির্ঘাত ওকে মে'রে দেবে।
আরজু যেতেই আরমান একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বেশ বড়সড় একটা ঝড় বয়ে গেল ওর উপর দিয়ে। জুবায়ের আরমানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই ঠিক আছিস তুই? কেন ওর সাথে লাগতে গিয়েছিলি? আমার তো মনে হয় মেয়েটা পা'গল।”
আরমান ঝারি মে'রে বলল,
“একটা থা'প্পর লাগাবো। আর একদিন পা'গল বললে তোকে পাবনা পাঠাবো। ভাবি ডাক, ভাবি।”
আরমানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মলি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“ওকে করবেন বিয়ে? অসম্ভব। আরজু তো ব্রত করেছে বিয়ে না করে জীবন কাটাবে। আর জুবায়ের যে ওকে পা'গল বলেছে, ভুল কিছু বলেনি। পরিস্থিতির চাপে ও পা'গলই হয়ে গেছে।”
আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেমন পরিস্থিতি? কিসের পরিস্থিতি? কি হয়েছে?”
“এত কিছু তো জানিনা। ও নিজের সম্বন্ধে কিছু বলে না। তবে আমি বুঝতে পারি ওর পারিবারিক কিছু সমস্যা আছে।”
আরমান আর কোন কথা বাড়ালো না। আরজুর ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে সেখান থেকে চলে গেল।