মুনতাসিরের বাড়ির এলাকাটা বেশ শুনশানই বলা চলে। রাত দশটা টা বাজে। আর এই সময়েই আশেপাশে মানুষজন কিংবা গাড়ি কোন কিছুর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। যদিও রাত দশটা অনেক সময় তবে ঢাকা শহরে দশটা খুব একটা বেশি সময় হওয়ার কথা না। জায়গাটা শহর থেকে খুব একটা দূরে যদি গ্রাম হতো তাহলে না হয় তাও ফাঁকা থাকার কারণটা বোঝা যেত। জায়গাটা যেন কেমন একটু অদ্ভুত লাগলো আরমানের কাছে। বাড়িঘর অনেকই আছে তবে সেখানে মানুষজনের উপস্থিতি খুবই কম।অধিকাংশ বাড়িতে মনে হয় কেউ থাকেনা। তবে রাতে ফাঁকা রাস্তায় বাইক চালাতে আরমানের ভীষণ ভালো লাগছে। শীতের দিন হওয়ায় একটু দূরেও রাস্তাটা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না। বাইকের হেড লাইট জ্বালানো তারপরও বাইকটা চালাতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। তার উপরে আবার ঠান্ডা লাগছে। শার্টের উপরে জ্যাকেট পরেছে ঠিকই তবে এই শীতের তীব্রতা জ্যাকেটটা আটকাতে সক্ষম হচ্ছে না। তার ওপর আবার হাতে গ্লাভস পরার কথা ভুলে গেছে। ফলে হাত দুটো যেন ধীরে ধীরে জমে যাচ্ছে। তবে আরমান বেশ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ করে আরমানের চোখ গেল ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে থাকা একটা মেয়ের ওপর। অন্ধকারে যদিও তার মুখটা স্পষ্টভাবে দেখতে পেল না তবে জামার রংটা দেখতে পেল। আর এটা দেখেই আরমানের মনে হলো ওটা আরজু।
“এই মেয়ে শুনছেন?”
আরমান ডাকলো ঠিকই তবে আরজুর কানে সেই ডাক পৌঁছালো না। আরমান বাইকটা থামাতে চাইলো তবে সামনে তাকাতেই দেখল গলি দিয়ে একটা চার চাকার গাড়ি বের হচ্ছে। খুব দ্রুত পরিস্থিতিটা সামাল দেয়ার জন্য ব্রেক ঘোরাতেই তাল সামলাতে না পেরে বাইকটা রোডের ওপরে স্লাইড করে কিছু দূর গড়িয়ে গেল। বেশ জোরে একটা শব্দ হলো। সেই শব্দে আরজুর ধ্যান ভাঙলো। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল বাইকের নিচে কেউ একজন পরে আছে। আর কারটা এখনো ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আরজু তাড়াহুড়ো করে সেখানে এগিয়ে গেল। আরজু কে সামনে থেকে দেখে আরমান এবারে নিশ্চিত হলো যে ওটা পার্কে দেখা সেই মেয়েই ছিল, যাকে দেখে মনে হয় দিন দুনিয়া বিমুখ একটা মানুষ। যার যাই হয়ে যাক না কেন তাতে সেই মেয়ের কিছুই যায় আসে না। সেখানে আরমানের এক্সিডেন্ট হয়েছে দেখে আরজু যে এগিয়ে এসেছে ব্যাপারটা আরমানের কাছে অষ্টম আশ্চর্যর মতন লাগলো।
আরজু বাইকটা তোলার চেষ্টা করলো তবে ওর একার পক্ষে সম্ভব হলো না। এদিকে আরমান বেশ আঘাত পেয়েছে। হেলমেটটা থাকার কারণে মাথায় কোন চোট পায়নি ঠিকই তবে হাত-পায়ে বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে।
আরজু কে এত কষ্ট করতে দেখে আরমান বলে উঠলো,
“আপনি একা পারবেন না, দাঁড়ান আমি চেষ্টা করছি।”
আরজু আরমানের কথায় পাত্তা না দিয়ে সোজা কারটার দিকে গেল। আরজু কে এগিয়ে আসতে দেখে কারের ভেতরে ড্রাইভিং সিটে বসা মানুষটা গাড়ির কাঁচ নামালো। আরজু সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তবে গম্ভীর গলায় বলল,
“রাস্তা তো এতটাও অন্ধকার না যে সামনে থেকে একটা বাইক আসছে আর আপনি সেটা দেখতে পাবেন না। আবার যখন একটা ভুল কাজ করেই ফেলেছেন, দেখছেন মানুষটা পরে আছে তাহলে সাহায্যের জন্য বের হচ্ছেন না কেন? মনুষ্যত্ব, বোধ-বুদ্ধি, চোখ সব কি গেছে না ঠিক আছে? নাকি বড়লোক জন্য ভেবেছেন সাত খু'ন মাফ হয়ে যাবে?”
আরজুর কথা শুনে ভদ্রলোক হাসলো। সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“সবই ঠিক আছে তবে আপনার রাগটা বোধহয় একটু বেশি বেড়ে গিয়েছে আমার উপরে?”
“ওনাকে গিয়ে সাহায্য করুন।”
কথাটা বলে আরজু আবারো আরমানের দিকে গেল। ওর পিছন পিছন ভদ্রলোকও গেল।
“কি রে আরমান তোর এই অবস্থা কেন? অবশেষে তবে আমি তোকে রাস্তায় ফেলতে পারলাম।”
পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর কানে যেতেই আরমান কিছু সময়ের জন্য নিজের ব্যথাটা ভুলে গেল। মাথা তুলে তাকিয়ে সামনে উপস্থিত ব্যক্তিটাকে দেখে চমকালো। বিস্ময় ভরা গলায় বলল,
“তুই এখানে?”
তানভীর বক্র হেসে বলল,
“তোকে তো আবার সোজা করে দাঁড় করাতে হবে সেজন্যই বোধহয় আমি এখন এখানে। দাঁড়া তোকে আগে তুলি।”
তানভীর বাইকটা তুললো। তারপরে হাত বাড়ালো আরমান কে তোলার জন্য। তবে আরমান সেই হাত ধরল না। চোখে মুখে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলে বলল,
“যে ইচ্ছে করে ফেলে দেয় তার হাত আবার ওঠার জন্য ধরতে নেই। বলা তো যায় না আবার ফেলে দিতে পারিস।”
আরমান কিছুক্ষণের জন্য তানভীরের ব্যাপারটা মাথা থেকে সরিয়ে আরজুর দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,
“আপনাকে ধন্যবাদ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।”
“আপনারা একে অপরকে চেনেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমি আসছি।”
আর একটা শব্দও ব্যয় করল না আরজু। চলে গেল নিজের গন্তব্যে। মেয়েটা প্রত্যেক পদক্ষেপে আরমানকে অবাক করে। মেয়েটা কেমন যেন একটা। কোন কিছুতেই কি তাই বলে তার আগ্রহ থাকবে না? আরমানের নাহয় খুব বেশি আঘাত লাগেনি তাই বলে কতটা কি লেগেছে, এখন ঠিক আছে কিনা এসব কি একটু জিজ্ঞেস করা যায় না? আরমানের ভাবনার ছেদ ঘটলো তানভীরের গলার আওয়াজে।
“ঠিক আছিস?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে তুই বল তুই এই রাস্তায় কি করছিস? এখানে তো তোর কোন কাজ নেই তবে এত রাতে এখানে কেন? আর গলি দিয়ে গাড়ি বের করার সময় হর্ন দেওয়া লাগে সেটা জানিস না? আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে তো মা’র খেতি।”
তানভীর আফসোসের সুরে বলল,
“তোর আয়ু বোধহয় অনেক তাই না? এই দেখ আমি যেভাবে যা পরিকল্পনা করেছিলাম এই এক্সিডেন্ট হলে তোর বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না। আমি গাড়ি দিয়ে মে’রে তোকে উড়িয়ে দিতাম। আবার সেটা যখন হলো না ভেবেছিলাম তোকে পিষে দিয়ে চলে যাবো। রাস্তা তো বেশ ফাঁকা ছিল কেউ টেরও পেত না। কিন্তু কোত্থেকে যে মেয়েটা চলে এলো কে জানে? অযথা তোর জন্য ওকে শাস্তি দিতে মন চাইলো না। আবার ম’রলি না সেটা না হয় ঠিক আছে অন্তত হাত পা তো ভাঙা উচিত ছিল, বা মাথা ফাটতো। অথচ দেখ কি সুন্দর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলছিস। ইচ্ছে তো করছে তোর ওই চোখ দুটো বের করে নেই। এত আগুন কেন ওখানে? এত তেজ কিসের তোর? আমার বাবা এমপি, ক্ষমতা আমার বাবার আর সেই ক্ষমতার বড়াই তুই করিস?”
“ভুল বললি। তোর বাবার ক্ষমতার বড়াই আমি কখনোই করি না। আমি যা করি নিজের ক্ষমতায় করি। কিসের এত ঘৃণা তোর আমার উপরে? তোর এতটা অধঃপতন হয়েছে যে তুই নিজের ভাই কে খু’ন করতে চাস তানভীর?”
“কিসের নিজের ভাই? চাচার ছেলে তুই। আর তুই যদি আমার নিজের ভাই হতিস তাহলে মুনতাসির এর বিপক্ষে আমাকে বসাতি। তোর জন্য মুনতাসিরের সামনে আমাকে ছোট হতে হয়েছে, শুধুমাত্র তোর জন্য। জানিস এখন ভার্সিটিতে আমার থেকে ওর সম্মান বেশি। সবাই ওকে দেখলে মাথা নিচু করে সালাম দেয়। ওর পাশে যদি আমি দাঁড়িয়ে থাকি কেউ আমায় পাত্তা দেয় না। সব ওর পেছনে ছোটে। তোর নিশ্চয়ই এসব খুব ভালো লাগে তাইনা?”
“এসব আমার হাতে ছিল না তানভীর। আমি শুধুমাত্র নিজের মতামত জানাতে পারি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের। আর এটা স্বীকার করতে শেখ যে তুই মুনতাসিরের থেকে অনেক পিছিয়ে। এখনো এই পদগুলোর জন্য তুই নিজেকে প্রস্তুত করতে পারিসনি।”
“চুপ কর তো। তুই শুধু নিজেরটা বুঝিস। তুই জানিস আমার হাতে যদি ক্ষমতা আসে তাহলে তোর সমস্যা হবে।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ অব্দি কখনোই তানভীর কে কিছু বোঝাতে পারেনি, আজও যে বোঝাতে পারবে না সেই ব্যাপারে আরমান নিশ্চিত। তাই অযথা বুঝিয়ে সময় নষ্ট করতে চায় না। একেই তো কে’টে যাওয়া জায়গাগুলো ভীষণ জ্ব’লছে। ঠান্ডার দিন হওয়ায় আরো বেশি ব্যথা করছে। বাইকটা ঠিক করে তাতে উঠে বসলো। পিছন থেকে তানভীর আবারও বলে উঠলো,
“নিশ্চয় আমার বাবাকে এখন অভিযোগ করবি তাই না? তারপর আমি বাড়ি গেলে বাবা আমাকে আবার কথা শোনাবে, আমাকে আবার বোঝাবে যে তোর তুলনায় আমি ঠিক কতটা নিচে আছি। তুই সবকিছুর যোগ্য, আমি বাবার ছেলে হওয়ার যোগ্য না তাইতো?”
আরমান পিছন ফিরে তাকালো না। বাইকটা স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
“বলার হলে অনেকদিন আগে আরো অনেক কিছুই বলতে পারতাম। আর সেগুলো যদি বলতাম তবে তুই আজ বাড়িছাড়া হতি। বাড়ি যা। তোর বাবা না হোক তোর মা অপেক্ষা করে আছে যে নিজের ছেলেকে সাধু ভাবে। আর এসব খু’ন খারাবির কাজ ছাড়। আজকাল তো দেখছি মদের নেশাতে ডুবে থাকিস। ছেড়ে দে এসব অভ্যাস। না হলে তোর বাবার কানে কথাগুলো দিতে আমি বাধ্য হব।”
আরমান চলে গেল। তানভীর বেশ অনেকক্ষণ আরমানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কি ভাবলো কে জানে। তবে একটা বিষয়ে তানভীরের খুব আফসোস হচ্ছে। আরমান কে আজও মা’রতে পারলো না। একটু র’ক্ত ঝরতে দেখতে পারলো না আরমানের শরীর থেকে।
_______
“আসসালামু আলাইকুম। আপনি আমায় চিনবেন না।আসলে আমার নাম্বার থেকে আপনার নাম্বারে ভুলে পাঁচ হাজার টাকা চলে গেছে। প্লিজ ওটা একটু ফেরত পাঠিয়ে দেবেন!”
আরজুর কন্ঠটা বেশ উৎকণ্ঠিত শোনালো। ভীষণ চিন্তায় আছে। পাঁচটা হাজার টাকা তো কম না। কত কষ্ট করে জোগাড় করেছিল টাকাটা ধার শোধ করবে জন্য। বিকাশে পাঠাতে ধরে ভুল করে অন্য নাম্বারে চলে গিয়েছে। আরজুর অনুরোধের প্রেক্ষিতে অপর পাশের মানুষটা ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখছি। চেক করে আপনাকে জানাচ্ছি।”
“আচ্ছা ধন্যবাদ।”
ফোনটা কেটে দিল আরজু। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো আবারও কল আসার।
এদিকে ভার্সিটিতে পুরোদমে নির্বাচনের প্রচারণার কাজ চলছে। আশেপাশের সবাই সেসব বিষয় নিয়েই আলোচনা করছে, তো কেউ আবার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আড্ডা দিতে ব্যস্ত। একদল আবার লিফলেট বিতরণ করছে। ওদের মধ্য থেকে একজন এসে আরজুর হাতে একটা লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে গেল। আরজু যন্ত্রের ন্যয় সেটা হাতে নিল। আর ঠিক তখনই তার সেই নাম্বার থেকে কল এলো। আরজু তাড়াহুড়ো করে কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বলল,
“কি আজেবাজে কথা বলছেন? কোন টাকা তো আসেনি।”
আরজুর হাত থেকে এবার লিফলেটটা পড়ে গেল। দুর্বল লাগছে শরীরটা। যেখানে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে টাকাটা অন্য নাম্বারে সেন্ড হয়েছে সেখানে কি করে অস্বীকার করছে উনি?
“ভাইয়া আমার কাছে মেসেজ এসেছে টাকা যাওয়ার। আপনি এভাবে অস্বীকার করতে পারেন না। এক দুই টাকা না যে ছেড়ে দেব। আমার কষ্ট করে উপার্জন করা পাঁচ হাজার টাকা। আপনি ফেরত দিতে বাধ্য।”
“বলছি তো কোন টাকা আসেনি আমার নাম্বারে।
অযথা বিরক্ত করবেন না, ফোন রাখুন।”
লোকটা সত্যি ফোনটা কেটে দিল। আরজু আবার ওনার নাম্বারে কল করল কিন্তু নাম্বারটা বন্ধ পেল। আরজুর এবারে অস্থির লাগছে। আরো বেশ কয়েকবার নাম্বারটায় কল দিলো কিন্তু কল গেল না। এরই মাঝে আরেকটা ছেলে এসে অন্য একটা লিফলেট আরজুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল। আরজু এবারেও রোবটের মতন চুপচাপ সেটা হাতে নিল। কে কি দিল সে সব খেয়াল নেই। যার ধারের টাকাটা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল তার নাম্বার থেকে কল এলো। আরজুর চিন্তা হতে লাগলো কি বলবে। কিন্তু ফোনটা রিসিভ না করে উপায় নেই। না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাবে।
ভয়ে ভয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। অপর পাশ থেকে কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলো।
“তুমি যে বললে পাঁচ মিনিটের মধ্যে টাকা পাঠাচ্ছি কোথায় এখনো তো আসেনি আমার নাম্বারে টাকা?”
“আসলে আপু আপনার নাম্বারে টাকাটা পাঠাতে গিয়ে ভুল করে অন্য একজনের নাম্বারে চলে গেছে। এখন উনি অস্বীকার করছেন সেটা।”
“সে সব শুনে আমি কি করবো? এক মাসের কথা বলে দুই মাস পার করে ফেলেছো। তোমার দরকারের সময় আমি তোমায় দিয়েছিলাম এখন আমার দরকারে ফেরত দিতে পারছো না। এমন করলে কি আর কখনো কাউকে সাহায্য করতে পারবো?”
আরজু অপরাধী গলায় বলল,
“দুঃখিত আপু। আসলে আমি অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পেরে উঠছিলাম না। আর আপনি তো জানেন আমি আমার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম সেজন্য একটু দেরি হলো। এতদিন যখন অপেক্ষা করেছেন আরেকটু অপেক্ষা করুন প্লিজ। আমি ফেরত দিয়ে দেবো।”
“চুপ করো বাটপার মেয়ে। তুমি যে আমার টাকা কত ফেরত দেবে সে সব আমার বোঝা হয়ে গেছে। একের পর এক অজুহাত বানিয়ে আর কত অপেক্ষা করাবে? আমাকে কিছু না জানিয়ে হোস্টেলটা অব্দি বদলে ফেলেছো। কালকে তোমার হোস্টেলে গিয়ে তোমায় পাইনি এরপরও কি বলবে তুমি চোর না? কোথায় উঠেছো ঠিকানা বলো? সেখানে যাব আমি। কি ভেবেছো পালিয়ে বেঁচে যাবে? অত সহজ না।”
কথাগুলো ভীষণ আত্মসম্মানে লাগলো আরজুর। সচরাচর কারো থেকে ধার করে না। আর ধার করলেও সময়ের আগে সে ধারটা শোধ করে দেয়। কিন্তু এবারে কোনমতেই সম্ভব হচ্ছিলো না। অসময়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য একটা টিউশনও চলে গেছে। এর মাঝে আবার হোস্টেল বদলাতে হলো। অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে যাতায়াতে। তবে কিছু করার নেই। অবিশ্বাস করাটাই স্বাভাবিক। আরজু হলেও হয়তো বিশ্বাস করত না। নিজের মানুষদেরকেই তো বিশ্বাস করা যায় না সেখানে ও তো পর।
“আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে আর একটা সপ্তাহ সময় দিন। আমি আপনার ধার শোধ করে দেব।”
“সময় দিলাম। আর ভুলেও নাম্বারটা বদলিও না। তোমার ভার্সিটি কিন্তু আমি চিনি। সিনিয়রদের কে বলে অবস্থা খারাপ করে ছাড়বো।”
কথাটা বলে মেয়েটা ফোনটা কেটে দিল। এত অপমান করলো আরজু কে, এত কথা শোনালো তারপরও কেন যেন আরজুর কান্না পেল না। আরজু অবশ্য কাঁদে না। শেষ কবে কেঁদেছিল নিজেও জানে না। পাথরের মন তার। ধার শোধ করতে না পারলে কথা শোনাবে এটাই তো স্বাভাবিক। এতে কাঁদার কি আছে?
ভেঙে পরা নিজেকে আরো একবার আরজু শক্ত করে দাঁড় করালো। আরজু যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালে কয়েকটা ছেলে এসে ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। ওদের সাথে আরজুর কি লেনাদেনা সেটা আরজু নিজেও বুঝে উঠতে পারল না। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে একবার ভালোভাবে পরখ করে নিল। দেখতেই কেমন গুন্ডা গুন্ডা লাগছে। সাজ পোশাক দেখে মনে হচ্ছে না কোন ভদ্র বাড়ির ছেলে। আরজু প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কোন দরকার?”
“ভাইয়ের লিফলেট এর উপর পা রাখছেন কোন সাহসে? হাতে তো আবার বিপক্ষ দলের লিফলেট ধরে আছেন। আর এই দিকে এক ঠ্যাং তুলে রাখছেন ভাইয়ের মুখের উপর? হাতেরডা কি লাং লাগে?”
আরজু ছেলেটার কথা বুঝে উঠতে না পেরে নিজের পায়ের দিকে তাকালো। একটা লিফলেট এর উপরে পা টা উঠে আছে কিন্তু কি করে পরলো সেটা আরজু জানেনা। মাঠের চারপাশে তো কত লিফলেট পড়ে আছে, হাঁটতে গেলে সেগুলোর উপরে পা পরবে এটাই স্বাভাবিক। পা টা সরাবে কিনা সেটা বুঝে উঠতে পারছে না সেজন্য সরালো না। সম্মুখে দাঁড়ানো ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মাঠের আশেপাশে দেখেছেন কত লিফলেট পরে আছে? আপনি নিজেই তো একটার উপরে দাঁড়িয়ে আছেন।”
“কিন্তু হাতে তো আর অন্য দলের লিফলেট নাই। কি ভাবছেন বুঝি না কিছু? ভাইরে অপমান করার জন্য পাঠাইছে আপনারে তাই না? ভাবছেন মাইয়া মানুষ জন্যে আমরা কিছু কমু না।”
“দেখুন অযথা ঝামেলা করবেন না। আমার পায়ের নিচে কার লিফলেট, হাতে কার লিফলেট এই সবে আমার কোন খেয়ালই ছিল না। সামনে থেকে সরুন যেতে হবে আমায়।”
ছেলেগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ওরা যেন ইচ্ছে করে একটা ঝামেলা পাকাতে এসেছে। শুধু একটা ছোটখাটো অজুহাত খুঁজছিলো। অবশেষে একটা অজুহাত পেয়েও গেছে। তবে সেই অজুহাতটা এতটাই নিম্ন পর্যায়ের যেটাকে অজুহাত হিসেবে গণ্যও করা যায় না। আরজুর সামনে থেকে ওরা সরলো না। বরং রাগান্বিত গলায় বলল,
“এই মাইয়া, একটু বেশি গরম দেখাইতেছো না? জানো আমরা কার লোক? তুমি জানো তোমার কি অবস্থা করতে পারি আমরা? তুমি হামিদের পক্ষের লোক তাই না? সেজন্য আমাদের আরমান ভাইয়ের ছবিকে অপমান করছো?”
আরজু প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“হামিদ কে?”
“এমন ভাব করছে যেন চেনোই না? পুরো ভার্সিটি চেনে আর তুমি চিনবানা এটা হতে পারে না। এবার তো আরো নিশ্চিত হলাম যে তুমি ইচ্ছে করে এসেছো। ওর দলের লোক তাই না?”
আরজু বিস্ময়াবিভূত গলায় বলল,
“অদ্ভুত কথা বলছেন তো। আমি কি রাজনীতি করি যে ওনার পক্ষের লোক হবো? আমাকে কি আপনাদের স্টুপিড মনে হয় যে আমি ওনার হয়ে ওনার শত্রুদের সাথে ঝামেলা করতে যাব? সত্যি করে বলুন তো আপনাদের উদ্দেশ্যটা কি? আমি খুব স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারছি আপনারা ইচ্ছে করে একটা ঝামেলা তৈরি করার মতলবে এসেছেন। সব থেকে বড় কথা আপনারা ঝামেলা করুন, মা'রা'মা'রি করুন, যুদ্ধ লাগান তাতে আমার কিছু যায় আসে না। গো টু হে'ল। কিন্তু এসবের মাঝে ভুলেও আমাকে জড়াবেন না। আমাকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে যাবেন না আপনাদের এসব রাজনীতির নোংরা খেলায়।”
আরজুর এত তেজে ছেলেগুলো অবাক না হয়ে পারল না। কি করে এতগুলো ছেলের সাথে এভাবে গলা তুলে কথা বলছে? একটুও কি ভয় করছে না? কই আজ পর্যন্ত তো কেউ ওদের সাথে এভাবে কথা বলার সাহস পায়নি। ছেলেটা দুকদম এগিয়ে এলো। ভেবেছিল আরজু হয়তো এতে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং আরজু সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কোন ভয় নেই, কোন নমনীয়তা নেই। আছে এক ভয়ংকর রকমের তেজ আর হিংস্রতা। যা ছেলেটার একটুও পছন্দ হলো না। ইচ্ছে হলো আরজুর দৃষ্টির এই হিংস্রতা একদম শেষ করে দিতে। তবে জন সম্মুখে তো সবকিছু করা সম্ভব না। গম্ভীর গলায় বলল,
“ছবিটা পায়ের নিচ থেকে তোল। তুলে তোর ওড়না দিয়ে পরিষ্কার করবি। করে আমাদের হাতে দিবি।”
আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“এটা অনুরোধ না আদেশ?”
ছেলেটা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“অনুরোধ করবো আমি তোকে? এটা আদেশ।
ভাষা শুনে বুঝতে পারছিস না?”
“প্রথম এবং শেষবারের জন্য বলছি ভাষা ঠিক করে কথা বলুন। আমি আপনার পরিচিত নই, আপনার সহপাঠী নই কিংবা আপনার দলের কোনো কুকুর নই যে আপনি আমার সাথে এই ভাষায় কথা বলবেন।”
“এর থেকেও বেশি নোংরা ভাষায় তোর সাথে কথা বলতে পারি। কি করবি তুই? কিসের এত গরম দেখাচ্ছিস? এত দেমাক কিসের তোর? শুধু একবার ভাইয়ের নির্বাচনটা শেষ হতে দে। তোর তেজ বের করে ছাড়বো। তোর চেহারাটা না একদম মুখস্ত করে রাখলাম। তোর......।”
ছেলেটাকে নিজের কথা সম্পন্ন করতে দিলোনা আরজু। নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে গালে একটা চ’ড় বসালো। এতক্ষণ তবুও খুব অল্পসংখ্যক লোক ওদের বাকবিতণ্ডা দেখছিল তবে এবারে মাঠে উপস্থিত অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টি ওদের ওপরে পরলো। সেই সাথে অনেকে হা-হুতাশ করে উঠলো। অনেকে চিন্তিত হয়ে পড়লো আরজুর জন্য। মেয়েটা বোধহয় খুব ভুল কিছুই করে বসলো।
ছেলেটা চ’ড় খেয়ে যেন নিজেই অবাক না হয় পারল না। ওর সাথে আসা বাকি ছেলেগুলোও অবাক হলো। এভাবে যে চ’ড় মে’রে দেবে সেটা বোধহয় আশা করেনি। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তুই চ’ড় মা’রলি আমাকে?”
“আর একবার তুইতুকারি করলে এর থেকেও খারাপ অবস্থা করব। যে ভাইয়ের হয়ে চামচামি করতে এসেছেন সেই ভাইয়ের নামে কমপ্লেইন করব। তারপর দেখব ওনার রাজনীতি, ওনার নির্বাচন কোথায় যায়। আর আপনার জন্য যদি ওনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা নষ্ট হয় তাহলে আমাকে আপনার সাথে কিছু করতে হবে না। উনিই আপনার সাথে অনেক কিছু করে দেবেন। আর ভবিষ্যতে আমার সামনে আসবেন না। মেয়েদেরকে সম্মান দিয়ে কথা বলবেন। আর ভুলেও আমার সাথে এসব ব্যবহার করতে আসবেন না।”
“কি হয়েছে এখানে?”
দোতলা থেকে আরমান খেয়াল করেছিল যে একটা মেয়েকে কেন্দ্র করে বেশ অনেকগুলো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেখানে কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে। যদিও বিষয়টা দেখেছে অনেক পরে তাই তৎক্ষণাত ব্যাপারটা জানার জন্য নিচে নেমে এসেছে। আরমানের কণ্ঠ শুনে ছেলেগুলো পিছন দিকে তাকালো। ভিড়টা একটু কমতেই সামনে আরজু কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরমানের চক্ষু চড়ক গাছ। বুঝলো না যে ঠিক দেখছে না ভুল দেখছে।
এদিকে ঘটনার মাঝে নতুন কারো আগমনে আরজু একটু বিভ্রান্ত হলো। বুঝলো না যে এই নতুন মানুষটা ঠিক কে? প্রশ্নাত্মক গলায় আরমান কে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কে?”
ছেলেগুলোকে যেন প্রতি পদে পদে অবাক করছে আরজু। এই মেয়েটা আরমান কেও চেনে না? ওরা তো ভেবেছিল ইচ্ছে করে আরমান কে অপমান করছে। কিন্তু এখানে তো দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা আরমানকে চেনেই না।
আরজুর প্রশ্নে আরমানের ধ্যান ভাঙ্গলো। বুঝতে পারলো না আরজু ওকে চিনতে পেরেছে কিনা? তবে সেসব আর ভাবলো না। উত্তরে বলল,
“তাওসিফ আরমান। ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনের সভাপতি পদপ্রার্থী।”
আরজু এবার ছেলেগুলোকে দেখিয়ে বলল,
“এনারা তাহলে আপনার চামচা?”
এমন প্রশ্নে আরমান নিজেও বিভ্রান্ত হলো। সে নিজেও জানে না ছেলেগুলো কোন দলের। ওদের কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,
“তোমরা কোন দলের?”
আরমানের পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলে বলল,
“আমাদের দলেরই ভাই।”
আরমান এবার আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি সমস্যা হয়েছে জানতে পারি? আমাকে বলা যাবে?”
“নিশ্চয়ই বলা যাবে। কারণ এই ঘটনার সাথে আপনি নিজেও জড়িত আছেন। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে।”
ঘটনাটা এবারে বেশ গোলমেলে লাগল আরমানের কাছে। তবে সে বরাবরই ধৈর্যশীল মানুষ ও মনোযোগী শ্রোতা। তাই বেশি তাড়া দেখা গেল না তার মাঝে।
“কিভাবে আমি জড়িত?”
“একবার আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন তো কত শত লিফলেট পড়ে আছে। সেগুলোর উপর দিয়ে কত মানুষ হাঁটাচলা করছে। আপনাদের কি মনে হয় আপনারা যে লিফলেট গুলো বিতরণ করেন সেগুলো আমাদের মতন সাধারণ মানুষরা বুকে জড়িয়ে বসে থাকবে? না ঘরে নিয়ে গিয়ে সেগুলো আলমারির ভেতর সাজিয়ে রাখবে? আপনারা কি এটাই মনে করেন?”
“এর সাথে আমার যোগসূত্র কি?”
“আপনার নামের লিফলেটটা আমার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। এখন আপনার দলের ছেলেরা সেটা আমার পায়ের নিচে পরে থাকতে দেখে অতি আবেগে ভেসে গিয়ে বলা শুরু করেছে যে আমি বিপক্ষে দলের লোক, আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করার জন্য এই কাজটা করেছি। তারা আমার সাথে তুই-তুকারি করেছে, আমাকে হুমকি দিয়েছে এবং অত্যন্ত অসম্মানজনক ভাষায় আমার সাথে কথা বলেছে। এখন বলুন এর দায় কার?”
আরমান অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো ছেলেগুলোর দিকে। গম্ভীর গলায় বলল,
“এসব কি শুনছি আমি? হাজার বার করে বলে দিয়েছিলাম নির্বাচনে আমাকে নিয়ে কোন ধরনের বাড়াবাড়ি আমি পছন্দ করি না তারপরও আমার দলের লোক হয়ে তোমরা কোন সাহসে একটা মেয়ের সাথে এরকম অসম্মান জনক ভাষায় কথা বলেছো?”
ছেলেগুলো উত্তর দেওয়ার কোন সাহস পেল না। অবশ্য ওদেরকে উত্তর দেয়ার সুযোগও আরজু দিল না। তার আগে নিজেই আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সুযোগ তৈরি করে দিয়ে এখন ওদেরকে দোষারোপ করছেন? বলছেন তো ওদেরকে আপনার দলের লোক, তার মানে ওদের দায়িত্ব নিশ্চয়ই আপনার? আপনার কি উচিত ছিল না একদম ভালো করে ওদের মস্তিষ্কের মাঝে এই কথাটা ঢুকিয়ে দেওয়া যেন ঝামেলা না করে? সবথেকে বড় কথা আপনি কে? আপনার সাথে আমার কি যোগ সূত্র আছে যে আমি আপনার জন্য এই পুরো ভার্সিটির সকলের সামনে অপমানিত হবো?”
আরমান অপরাধী গলায় বলল,
“দেখুন মিস আমি ক্ষমা চাইছি ওদের হয়ে। আমি বুঝতে পারছি দোষটা আমারই যেহেতু আমার দলের লোক ওরা। আমি কখনো এই দায় এড়িয়ে যাব না।”
“আপনি চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারেন না। বিশ্বাস করুন নির্বাচন হচ্ছে আমি এই খবরটাই একটু আগে জানলাম আপনার লোকেদের মাধ্যমে। আপনার কোন আন্দাজ আছে আমি নিজের জীবনের সমস্যায় কতটা জর্জরিত? তার মাঝে আপনার লোকেরা এসে উটকো ঝামেলা তৈরি করছে যেখানে আমি অলরেডি একটা ঝামেলার মাঝে জড়িয়ে ছিলাম। আমি কেন আপনার জন্য অসম্মান সহ্য করব বলুন তো? আপনার দ্বারা আমার কি উপকার হবে? আর এই যে এত নির্বাচনের প্রচারণা করছেন, এত ভালো মানুষীর নাটক করছেন, প্রতিদিন নিশ্চয়ই ভাষণ দিয়ে বেড়াচ্ছেন যে আপনি নির্বাচনে জিতলে আমাদের জন্য এই করবেন, সেই করবেন কিন্তু সত্যি করে বুকে হাত রেখে বলুন তো জেতার পর আমাদের কথা মনে পড়বে? আদৌও কি ভোটের কোনো দরকার আছে? ক্ষমতা যার বেশি সে তো সবার আড়ালে নিজেই নিজেকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেবে তাহলে এত আনুষ্ঠানিকতার কি আছে? আপনারা এখন আমাদের থেকে একটা ভোট নেওয়ার জন্য পারলে আমাদের পায়ে অব্দি পরে যান। আর জেতার পর যদি আমরা আমাদের বিপদে আপনাদের পেছনে কুকুরের মতন ঘুরি তারপরও আপনাদের থেকে পাত্তা পাই না।”
আরমান জানে আরজুর কথা গুলো একদমই মিথ্যে না। সত্যি এমনটাই হয়ে এসেছে। তবে আরমান আরজু কে কি করে বোঝাবে যে ও একটু ব্যতিক্রম ধর্মী হতে চায়। সবাই এক হয় না। অনেকে সৎ উদ্দেশ্যেই রাজনীতির অঙ্গনে আসে। বিনম্র গলায় বলল,
“আমি জানি অনেকে এমন করে। অনেকে বলবো না আমি বলব বেশিরভাগ মানুষই হয়ত এমন করে তবে একটা কথা আপনাকে মানতে হবে। অনেকে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জনগণের সেবা করার জন্যই রাজনীতির ময়দানে পা রাখে। আর আমি আপনাকে কথা দিতে পারি যে আমি তাদের মধ্যে থেকেই একজন হবো। বিশ্বাস রাখতে পারেন।”
আরজু কাটকাট বলল,
“এই সব কিছু জেতার আগ পর্যন্ত। রাজনীতিবিদদের সাথে বিশ্বাস শব্দটা একদমই মানানসই না। এই দেখুন আমি এখনো ভীষণ বিপদের মাঝে ডুবে আছি কিন্তু আপনারা আমায় কোনদিনও সাহায্য করবেন না। আপনাদের কোন লেনদেনই নেই জনগণের সাথে। আপনারা শুধু বোঝেন নিজেদের ব্যাপার।”
“কি সাহায্য দরকার আপনার বলুন? আমি চেষ্টা করব সাহায্য করার।”
আরজু সন্দেহী গলায় বলল,
“তাই?”
“হ্যাঁ।”
“ঠিক আছে তবে একটা সাহায্য করুন আমায়। একজনের নাম্বারে বিকাশে টাকা পাঠাতে গিয়ে ভুলে আমার হাতে অন্যজনের নাম্বারে পাঁচ হাজার টাকা চলে গেছে। এখন সেই মানুষটা টাকা পাঠাতে অস্বীকার করছে। আমার টাকাটা ফেরত দেওয়াতে পারবেন? যদি আমার এই কষ্টের টাকাটা আপনি ফেরত দিতে পারেন তবে মানবো আপনি হয়তো সৎ উদ্দেশ্যে এই ময়দানে পা রেখেছেন।”
“নাম্বারটা দিন।”
“নোট করুন।”
আরজু সত্যি নাম্বারটা বলল, আরমান সেটা নোট করে নিল। নাম্বারটা তুলতেই আরমানের পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখেছেন আপু আমাদের ভাই সবার থেকে আলাদা। আপনার সাহায্য করেলো। এবার কিন্তু ভোটটা আমাদের ভাইকে দেবেন।”
ছেলেটা কথাটা বলার সাথে সাথে আরমান চোখ গরম করে তাকিয়ে ওকে থামিয়ে দিল। আরজু তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“আমাকে সাহায্য করার দাম তার মানে একটা ভোট তাইতো? দেখলেন বলেছিলাম আমি আপনারা রাজনীতিবিদরা খুবই স্বার্থপর হন। স্বার্থ ছাড়া আপনারা জনগণের জন্য কিছু না, কেউ না।”
আরমান পাল্টা হেসে বলল,
“সবই তো আপনিই বলে দিলেন মিস। যদি আমি এই নির্বাচনে জিতে যাই তবে আশা করছি আপনি আমার কথার প্রমাণ আমার কাজের মাধ্যমে পেয়ে যাবেন। আর চিন্তা করবেন না আমি আপনার টাকাটা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।”
আরমানের কথায় আরজু ভরসা পেল কিনা সেটা জানা নেই ওর নিজেরই। আরমান কে কেন নিজের বিপদের কথাগুলো বলল সেটাও জানে না। আরমানকে নাম্বারটাই বা কেন দিলো সেটাও জানে না। তবে মনে হলো একবার পরীক্ষা করে দেখা দরকার যে ছেলেটা যখন এত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছে যে সৎ উদ্দেশ্যে রাজনীতির অঙ্গনে এসেছে তাহলে কতদূর কি করতে পারে।
আরজু আর কোন কথা বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলো না। এমনিতেই নিজের কাছে মনে হলো আজ একটু বেশিই কথা বলে ফেলেছে। এত কথা বলার স্বভাব আরজুর সাথে ঠিক যায় না। চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতন আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি জানিনা আপনি আমায় কতটা সত্যি বললেন বা কতটা মিথ্যে বললেন। তবে একটা কথা বলতে পারি আপনার দলে যদি এই ছেলেদের মতন লোক থাকে যারা আপনার ক্ষমতার বলে আমার মতন সাধারণ মানুষ কে ভয় দেখায় তবে আপনার এই ক্ষমতা বেশি দিন টিকবে না এটা মনে রাখবেন।”
কথাটা বলে আরজু চলে গেল। আরমান মুগ্ধ হবে না অবাক হবে সেটা বুঝে উঠতে পারল না। প্রত্যেকবারই মেয়েটা ওকে মুগ্ধ করছে নয়ত অবাক করছে। কিংবা মাঝে মাঝে বলা যায় দুটো মিলিয়ে মিশ্র অনুভুতির সৃষ্টি করছে। মেয়েটা আদৌ আরমান কে চিনতে পেরেছে কিনা সেই বিষয়টা আরমানের কাছে পরিষ্কার না। তবে হ্যাঁ এতোটুকু বলা যায় মেয়েটা আরমানের আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিল ওর প্রতি। এখন তো আরমানের এই মেয়েটাকে পুরোটা জানতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটার এত গাম্ভীর্যতা, এত রাগী ভাব, এত তেজ, চোখের আগুন সব কিছু জানতে ইচ্ছে করছে আরমানের।
সামনে যেই থাকুক না কেন তার চোখ আর কন্ঠের মাঝে থাকা তেজটা একটুও কমে না। তবে হ্যাঁ মেয়েটা একদমই যুক্তিহীন কথা বলেনি। যে কয়বারই কথা বলেছে মেয়েটার কথায় সব সময় যুক্তি ছিল। দারুন সাহস মেয়েটার। ওই দৃষ্টির তেজ দেখে মনে হয় যেন মেয়েটার কোন কিছুতেই ভয় নেই। হয়তো কোন কিছু হারানোর নেই বলে কোন ভয় নেই। তবে যাই হোক না কেন আরমানের কৌতুহল মেয়েটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আরমান এই মেয়েটাকে এখন আরো ভালোভাবে জানতে চায়, বুঝতে চায়। আর বোঝাতে চায় যে আরমান আলাদা। ঠিক যেমন মেয়েটা সবার থেকে আলাদা।