ফাহিমের ঘরে ফাহিম আর ফিরোজ কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। বিষয়টা যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা তাদের কথাবার্তার ভাবভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আলোচনার মাঝে দুজন ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত নেই, দরজাটাও বন্ধ করা। হঠাৎই আলোচনার মাঝে বাঁধা পড়লো দরজায় করাঘাতের শব্দে। ফাহিমের মেজাজ চটে গেল। ভাবলো প্রার্থনা এসেছে বোধহয়। রাগান্বিত গলায় বলল,
“দেখছো না গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি? বিরক্ত না করে যাও এখান থেকে।”
তবে ফাহিমের কথার প্রেক্ষিতে বাইরে থেকে প্রার্থনার গলার আওয়াজ ভেসে এলোনা। ভেসে এলো ফারিহার গলার আওয়াজ। ফারিহা নিজের বাবা কে কিছু বলল না বরং চাচ্চুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চাচ্চু দরজাটা খোলো প্লিজ! তোমার সাথে আমার কথা আছে।”
ফারিহার কন্ঠটা পাওয়ার পরেও ফাহিমের মেজাজ ঠিক হলো না, বরং বিগড়েই রইল। আবারো চটে উঠে বলল,
“এখন যাও ফারিহা পরে কথা বলো তোমার চাচ্চুর সাথে।”
এবারও ফাহিমের কথার কোন উত্তর দিল না ফারিহা। বরং ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চাচ্চু আমি এখনই তোমার সাথে কথা বলবো।”
ফাহিম আবারও কিছু বলতে নিলে ফিরোজ হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল। গম্ভীর গলায় বলল,
“আগে ওর গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনবো তারপর তোমার।”
ফাহিম বিরক্ত হলো। তবে কিছু করার নেই। ফিরোজ যখন বলে দিয়েছে যে আগে ফারিহার কথা শুনবে তার মানে আগে ফারিহার কথাই শুনবে। ফিরোজ গিয়ে দরজা খুলে দিতেই সামনে স্কুল ড্রেস পড়া ফারিহা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোন কারণে ভীষণ কেঁদেছে। এখনো ফোঁপাচ্ছে। ফিরোজকে বিচলিত হতে দেখা গেল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে আম্মা? কাঁদছো কেন তুমি? কেউ কিছু বলেছে তোমায়?”
ফারিহার কান্নার তোপ কারো বাড়লো। এবারে টপটপ করে চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো যা ফিরোজকে আরো বেশি বিচলিত করে তুলল। ফিরোজ সযত্নে ফারিহার চোখের জল মুছে দিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হলো আম্মা বলো কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে তোমায়? আবার কেউ আমাদের নামে তোমায় খারাপ কিছু বলেছে জন্য তুমি কাঁদছো? আজ তোমায় নাম বলতেই হবে। আজ সবগুলোকে আমি শেষ করব।”
ফারিহা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“তুমি মানুষ মে'রেছো চাচ্চু? তুমি জেলে গিয়েছিলে খু'ন করার জন্য তাই না? এটা সত্যি?”
ফিরোজ কিছুক্ষণ অসহায় দৃষ্টিতে ফারিহার দিকে তাকিয়ে থাকলো। বুঝতে পারছে না যে ফারিহা এই কথাটা কি করে জেনেছে।
ফিরোজকে চুপ করে থাকতে দেখে ফারিহা আবারো প্রশ্ন করলো,
“কি হলো চাচ্চু বলো তুমি খু'ন করেছো নাকি ওরা মিথ্যে বলছিল? ওরা তোমায় পছন্দ করে না বলে এমন বলছিলো, তাই না?”
ফিরোজ এবারেও কোন উত্তর দিতে পারল না। দরজার কাছে প্রার্থনা দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে তার ভয়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে। সেই ভয় এর সঠিক কারণ প্রার্থনা নিজেও বুঝতে পারছে না।
এদিকে এত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে ফারিহার আগমনে এমনিতেই ফাহিমের মেজাজ চটে গেছে তার মাঝে ফারিহার আবার এসব প্রশ্ন। বিরক্তিকর কণ্ঠে ফারিহা কে ধমক দিয়ে বলল,
“স্কুলে যাও কি করতে? পড়াশোনা করতে না এসব শুনতে? বললাম তো এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। যাও তুমি।”
প্রার্থনা অনেক সাহস সঞ্চয় করে মিনমিনে কন্ঠে ফাহিমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ছোট মানুষ একটা কথা শুনে এসেছে তাই তো জিজ্ঞেস করছে। একটু ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেও তো পারেন।”
প্রার্থনার কোন কথাই ফাহিমের ঠিক সহ্য হয় না। মেয়েদের এত কথাই সে সহ্য করতে পারে না। যদিও সবসময় প্রার্থনা চুপ থাকে তবে আজকের এই কথা বলাটাই একদমই পছন্দ হলো না। সাহস বেড়ে যাচ্ছে বোধহয় দিনদিন।
বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনার দিকে তেড়ে এলো মা'রার জন্য। হাতও তুলল তবে কি ভেবে যেন গায়ে হাত দিলো না। শাষিয়ে বলল,
“একদম আমার মুখের উপর কথা বলবি না। মা'র কি কম হচ্ছে নাকি যে মুখ খুলছে দিন দিন?”
ফারিহা বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকালো ফাহিমের দিকে। ফারিহার সেই দৃষ্টি ফিরোজের নজর এড়ালো না। ফাহিম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সামনে মেয়ে আছে তো। ব্যবহার ঠিক করো।”
“তুই ওকে একটু বেশিই মাথায় তুলিস না ফিরোজ? আমার মেয়ে, আমার থেকে তোর দরদ বেশি কেন?”
“তোমার দরদ থাকে না কেন? দিনের অর্ধেক সময় তো তোমার মনেই থাকে না যে ও তোমার মেয়ে।”
“তাতে তোর কি? আমার মেয়ে আমি যা ইচ্ছে করবো। আদর করার হলে আমি করবো, বকার হলে আমি বকবো, বাঁচিয়ে রাখা হলে আমি রাখবো, আর মা'রা'র হলেও…...”
ফাহিম নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারলো না। তার আগেই ফিরোজ ঘুরে দাঁড়িয়ে কলার চেপে ধরল। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“মুখে দিয়ে আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে জানে মে'রে ফেলবো তোকে। যদি ওর দিকে কখনো চোখ তুলে তাকিয়েছিস তবে সেদিনই তোর শেষ দিন হবে। আর যাই করিস না কেন কখনো আমার আম্মার দিকে তাকাবি না।”
ফিরোজের দৃষ্টিতে ফাহিম ভরকালো। ভয়ও পেল। তবে সবটুকু ভয় প্রকাশ করলে চলবে না। তবে অবাক হয়েছে ফারিহার প্রতি ফিরোজের ভালেবাসায়। প্রত্যেকবারই অবাক হয়। ফারিহার প্রতি ফিরোজের এই অসীম ভালোবাসার কারণ ফাহিম আজও বুঝতে পারে না।
হঠাৎ করেই ফাহিম বেশ অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলো ফিরোজ কে।
“কে ফারিহা? সত্যি করে বল কে ফারিহা? তোকে আমার থেকে ভালো আর কেউ চেনে না ফিরোজ। সত্যি করে বল ফারিহা আমার মেয়ে তো?”
“নিজের মেয়ের ওপরে এখন সন্দেহ হয় তোর? মাল খেয়ে এসেছিস নাকি?”
ফাহিম কলার থেকে ফিরোজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আমার তো মনে হচ্ছে তুই নেশা করে এসেছিস। এসব ছেড়ে পাশের ঘরে আয়। ব্যবসায় যে লাল বাতি জ্বলছে সেদিকে খেয়াল দিতে হবে।”
কথাটা বলে ফাহিম পাশের ঘরে চলে গেল। এই ঘরেই আর থাকলো না। ফাহিম চলে যেতেই ফারিহা আবারও ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু তুমি দিলে না চাচ্চু।”
ফিরোজ ফারিহা কে নিয়ে গিয়ে বিছানার উপর বসালো। কিছুক্ষণ ফারিহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হয়তো ভাবল কি দিয়ে আজেবাজে কিছু বোঝানো যায়, কি করে ফারিহার মাথা থেকে এই ব্যাপারটা বের করা যায়। বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পরে আদুরে গলায় বলল,
“সবার কথা ধরতে নেই আম্মা। লোকে অনেক কিছুই বলবে কিন্তু ওদের কথায় কান দিলে চলবে না।”
“কিন্তু ওরা যদি সত্যি কথা বলে তবে তো ধরতে হবে। তুমি একবার বলো না যে তুমি কাউকে খু'ন করোনি তাহলেই তো হয়ে যায়। ওরা যা ইচ্ছে বলুক আমি ওদের কথা বিশ্বাস করব না।”
ফিরোজের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। নিরুপায় লাগছে নিজেকে। চাইলেও এখন মিথ্যে বলতে পারবে না। আবার সম্পূর্ণ সত্যিটাও ফারিহাকে জানানো সম্ভব না।
“শোনো আম্মা, সব কিছুরই একটা কারণ থাকে। কোন কিছুই কারণ ব্যতীত হয় না। আর যেই প্রশ্নটা তুমি করছো তার পিছনে যে কারণ আছে সেই কারণটা জানার জন্য তুমি এখনো অনেক ছোট। যখন তুমি বড় হবে, যখন সেই কারণটা শোনার উপযুক্ত হবে তখন আমি তোমাকে বলবো। আর আমি জানি সেই দিন তুমি আমায় ঘৃণা করতে পারবে না বরং তুমি খুশি হবে। আর ধরো যদি আমি না থাকি তোমায় বলার জন্য তবে তোমার প্রার্থনা ফুপি আছে। তোমায় বলে দেবে।”
প্রার্থনা এবার চমকে উঠলো। ফারিহা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে প্রার্থনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমিও জানো ফুপি?”
প্রার্থনা মাথা নিচু করে ফেলল। উত্তর কি দেবে বুঝলো না। ফিরোজই বলে উঠলো,
“তোমার প্রার্থনা ফুপি এখনো জানেনা কিন্তু তোমার প্রার্থনা ফুপি তো অনেক বড়, আমি ওকে কারণটা জানিয়ে যাব।”
“তুমি কোথায় যাবে?”
“যাওয়ার তো ইচ্ছে নেই তবে যদি ডাক পড়ে যায় তবে তো যেতে হবে তাই না?”
“তুমি চলে গেলে বাবা আর ভয় করবে না কাউকে দেখে। তখন আমার আর প্রার্থনা ফুপির সাথে আরো খারাপ ব্যবহার করবে।”
ফিরোজ ফারিহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“চিন্তা করো না আম্মা। আমার নিঃশ্বাস থেমে যাওয়ার আগে তোমার ব্যবস্থা আমি করে দিয়ে যাব। আমার আম্মার জীবন আমি গুছিয়ে দিয়ে যাব। কেউ কখনো তোমার দিকে আঙ্গুল তুলতে পারবেনা, কখনো তোমায় কেউ বিরক্ত করতে পারবে না সেই ব্যবস্থা আমি করে দিয়ে যাব।”
_________
“ও ম্যাডাম দাঁড়ান!”
সম্মোধনটা আরজুর কানে এলো ঠিকই তবে ওকেই যে ডেকেছে সেটা বুঝতে পারলো না। তাই দাঁড়ালোও না। নিজের হাঁটা চালু রাখল। তবে খুব শীঘ্রই একটা ছেলে এসে ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। মুহূর্তের মাঝে আরজুর পা থেমে গেল। ভয় পেল না, চমকালোও না। চোখ মুখে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলল। ভীষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে সামনে দাঁড়ানো তানভীরের দিকে তাকালো।
আরজুর দৃষ্টি দেখে তানভীর নিজেই যেন একটু থতমত খেল। ভেবেছিল মেয়েটা বোধহয় ভয় পাবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। কিছু জিজ্ঞাসাও করলো না যে কেন তানভীর ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। মূর্তির মতন চুপচাপ শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে তানভীর কে ভস্ম করে দেবে। উপায় না দেখে তানভীর নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“চেনা যাচ্ছে আমায়?”
আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“খুব বিখ্যাত কেউ বলে তো মনে হচ্ছে না। তবে চেনার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?”
তানভীর ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,
“এই ভার্সিটিতে তানভীরকে চেনে না এমন কেউ নেই।”
“আমি চিনি না আপনাকে। কে আপনি?”
তানভীর আরেক দফা ভরকালো। সেদিনই তো কথা হলো মেয়েটার সাথে তবে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল কি করে? নাকি চিনেও না চেনার ভান করছে? সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করলো,
“সত্যি চিনতে পারোনি আমায়?”
“আপনার যদি সত্যি এই আত্মবিশ্বাসটা থাকতো যে আপনি এমন একজন মানুষ যাকে খুব সহজেই চেনা যায় তবে আপনি প্রথমে ওই প্রশ্নটা করতেনই না যে আপনাকে চেনা যাচ্ছে কি না। আপনি নিজেও জানেন যে আপনি এতটাও বিখ্যাত না। এখন বলুন কে আপনি? রাস্তার বখাটে?”
“এই মেয়ে ভেবে চিন্তে কথা বলো।”
“কথা বলার জন্য এত ভাবনা চিন্তার দরকার হয় না যুক্তির দরকার হয় যা আমার কাছে সব সময় থাকে।”
তানভীর বুঝলো এই মেয়ের সাথে এত আজেবাজে কথা বলে লাভ নেই। সরাসরি কাজের কথায় এলো।
“আরমান কে হয় তোমার?”
আজ আর আরজু বিরক্ত হলো না, অবাকও হলো না। বরং বেশ সহজ সাবলীল গলায় বলল,
“আরমান আমার যেই হয়ে থাকুক না কেন তাতে আপনার কি? আপনাকে আমি জবাবদিহি করবই বা কেন?”
“জিজ্ঞেস করেছি মাত্র। পরিচয় দিলে কি এমন হবে?”
“আপনাকে জিজ্ঞেস করতেই হবে বা কেন? আমি কি আপনার পরিচিত যে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে এসেছেন?”
তানভীরের এবার একটু রাগ হলো। রাগান্বিত গলায় বললো,
“এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে। বেয়া'দবি করছো তুমি আমার সাথে। আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি।”
“আপনি সবে মাত্র রাগা শুরু করছেন আর আমি অনেক আগেই রেগে গেছি। পথ ছাড়ুন না হলে যার পরিচয় জানতে চাইছেন তাকে কিন্তু ডাকবো।”
“আমাকে আমার ভাইয়ের ভয় দেখাচ্ছো? ও আমার ভাই, আমার র'ক্ত তোমার কিছু না।”
“আপনারই যখন ভাই তখন সেই ভাইয়ের কাছে গিয়েই পরিচয় জিজ্ঞেস করুন উনি আমার কি হয়। আমার কাছে কেন এসেছেন?”
“তোমার কি মনে হয় না তুমি বেয়াদব?”
আরজু এবারেও স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমি বেয়া'দব না। আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর যুক্তির সাথে দিচ্ছি বলে আপনার পছন্দ হচ্ছে না। যাইহোক আপনার ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবেন আমি কে বা উনি আমার কি হয়। সত্যি বলতে আমি নিজেও এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। যদি উনি জেনে থাকেন তবে ওনার থেকে জেনে পারলে আমাকে এসে জানিয়ে যাবেন তাহলে পরবর্তীতে যারা আমায় জিজ্ঞেস করবে আমার উত্তর দিতে সুবিধা হবে। প্রত্যেকদিন সবাই একই প্রশ্ন করে অথচ আমি কিছু উত্তর দিতে পারিনা যা আমার নিজের কাছে ভীষণ বিরক্তিকর লাগে। এখন সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।”
কথাটা বলে তানভীরকে আর কিছু বলার কিংবা ভাবার সময় দিল না আরজু। পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মেয়েটার দুঃসাহসিকতায় তানভীর অবাক না হয়ে পারল না। কি করে এত সাহস হয় যে তানভীরের সাথে এভাবে বেয়া'দবি করে, মুখে মুখে কথা বলে? আবার কিনা ওকে আরমানের ভয় দেখায়! কে এই মেয়ে আজ আরমানের থেকে জানতেই হবে। ওর এত বড় সাহস হয় কি করে যে তানভীরকে আরমানের ভয় দেখায়!
__________
প্রায় এক সপ্তাহ হতে চললো আরমানের আরজুর সাথে কোন রকম কোন কথা হয়নি। ভার্সিটিতে যে মেয়েটা কখন আসে সেসব খুঁজেই পাওয়া যায় না। তাছাড়া আরমানও সময় পাচ্ছে না। নির্বাচন একদমই কাছে এসে যাওয়ায় ব্যস্ততা আরো হাজার গুণ বেড়ে গেছে। এর মাঝে সময় করে একদিন পার্কে গিয়েছিল বিকেলে তবে সেদিন আরজু আসেনি। এত ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় বের করে গিয়েছিল অথচ মেয়েটা একবারও দেখা করলো না। ভার্সিটিতেও এই কয়দিন এসেছে কিনা আরমান জানে না। দেখেনি একদিনও। খোঁজ নিয়েছিল একবার জেনেছিল সেদিন নাকি আরজু আসে নি। বাকি দিনগুলোর কথা আরমান জানে না।
আজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়ে গেল। সভাপতি পদে আরমান নির্বাচিত হয়েছে। তবে এই নিয়ে আরমানের যতটা না খুশি তার থেকেও হাজার গুণ বেশি খুশি হয়েছে সহ-সভাপতি পদে মুনতাসির নির্বাচিত হওয়ায়। নিজের জয়েও আরমান এতটা উল্লাস করেনি যতটা মুনতাসিরের জয়ের পর করেছে। ভীষণ খুশি হয়েছে আরমান। এমন একজনের সহায়তা পাবে যার ভাবনা চিন্তা সবই ওর সাথে মেলে।
সারাদিনটা বেশ আনন্দে কাটলো। তবে এত আনন্দের মাঝে আরমানের মনটা একটু খারাপ। আজ টানা একটা সপ্তাহ আরজু কে দেখেনি। ফোন নাম্বারও জানে না যে মেয়েটাকে একটু কল করে খোঁজখবর নেবে। এত ব্যস্ততা, এত আনন্দের মাঝেও আরজুর শূন্যতাটা পূরণ করার জন্য আরমান গেল পার্কে। টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করলো।
তবে এলো না আরজু। আরমানের মনে এবার ভয় জাগল। হারিয়ে গেল না তো আবার আরজু? আরমানের জন্য আবার দূরে কোথাও চলে গেল না তো? যদি এমনটা হয় তবে আরমান খুঁজে বের করবে কি করে ওকে? মেয়েটার সম্বন্ধে তো নাম ছাড়া আর কিছুই জানে না, একটা কথাও মেয়েটা বলে না। ভালোবাসলো তো বাসলো একদম ভিন গ্রহের এক প্রাণীকেই যেন ভালোবেসে ফেলল আরমান।
বুক চিরে ক্রমাগত কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস বের হতে লাগলো আরমানের। প্রতিটা নিঃশ্বাস যেন এক একটা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। মনটা আনচান করছে একটু আরজুর সাথে কথা বলার জন্য। কতগুলো দিন হলো মেয়েটাকে দেখেনা, বোকা বোকা প্রশ্নগুলো শোনে না, আরজু নিজের সূঁচালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করেনা আরমানের ওপর। খারাপ কি লাগে না নাকি আরমানের? মেয়েটা না হয় ভালোবাসে না কিন্তু আরমানতো ভালোবেসে ফেলেছে।
আরমান মন কে বুঝিয়ে উঠলো। বুঝলো আজও আর আরজু আসবে না। কে জানে আর কখনো দেখা হবে কিনা?
পার্কিং এরিয়া থেকে বাইকটা নিয়ে উঠে বসে সেটা স্টার্ট দেওয়ার আগেই ফোনটা বেজে উঠলো।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো মুনতাসির কল করেছে। কোনরকম ভাবনা চিন্তা না করেই ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো। তবে অপর পাশ থেকে অপরিচিত একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো। আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“কে বলছেন?”
অপর পাশ থেকে এক ভদ্রলোক বেশ উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠলো,
“আসলে এটা যার ফোন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। ওনার কললিস্টে আপনার নাম্বারটাই প্রথমে ছিল, উনিও আপনাকেই কল করতে বলেছিলেন সেজন্য জানালাম আপনাকে।”
কিছুক্ষণের জন্য আরমানের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল। কি শুনলো, আদৌ ঠিক শুনলো কিনা এই নিয়ে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করলো। এদিকে আরমানের নিরবতা দেখে অপর পাশ থেকে ভদ্রলোক আবারো বলে উঠলেন,
“হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন? তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসুন। এখন ওনার অবস্থা খুব একটা ভালো না। অনেক র'ক্ত বেরিয়েছে।”
আরমানের হুঁশ ফিরলো। উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে ওর?”
“কারা যেন মে'রে'ছে। খুব বাজে ভাবে মে'রে'ছে। মাথা ফেটে গেছে, শরীরের আরও বিভিন্ন জায়গায় জখম হয়েছে। তাড়াতাড়ি আসুন।”
“কোন হসপিটালে?”
ভদ্রলোক নামটা বলতেই আরমান ফোনটা কেটে দিয়ে বাইক স্টার্ট করলো। যতটা দ্রুত চালানো সম্ভব ঠিক ততটাই দ্রুত চালালো বাইক। হাসপাতালের বাইরে বাইকটা দাঁড় করিয়ে একপ্রকার ছুটে ভেতরে চলে গেল।
রিসিপশনে গিয়ে সামনে বসা মেয়েটাকে দেখতেই আরেক দফা চমকালো আরমান। এখন মস্তিষ্কের যে পরিস্থিতি তাতে তো ভুল দেখার কথা না আরমানের। অন্তত সামনে আরজু কে দেখার তো কথাই না। তবে কি আরমান ঠিকই দেখছে? বিস্ফোরিত নয়নে আরজুর দিকে তাকিয়ে আছে। তবে আরজুর অভিব্যক্তি ভীষণ স্বাভাবিক। বুঝলো যেন আরমানের তাকিয়ে থাকার কারণ। নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“আমি আরজু।”
আরমান এবারে নিশ্চিত হলো। এরকম অদ্ভুত ভাবে অদ্ভুত গলায় নিজের পরিচয় একমাত্র ওর আরুই দিতে পারে। কিন্তু কথা হলো আরজু এখানে কি করছে?
“হ্যাঁ চিনেছি কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন”?
“ও আচ্ছা চিনতে পেরেছেন। আমি ভেবেছিলাম চেনেননি মনে হয়। আসলে অনেকদিন পর দেখা হলো তো তাই। আর এটা হাসপাতাল। হাসপাতালের রিসিপশনে আমি বসে আছি তার মানে আমি রিসিপশনিস্ট।”
“আচ্ছা বুঝেছি। মুনতাসির কে এখানে এডমিট করা হয়েছে জানেন?”
“হ্যাঁ জানি। সোজা গিয়ে বাঁ দিকে যাবেন। সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতলায় চলে যাবেন। দোতলায় উঠে ডানদিকে করিডোর দিয়ে সোজা গেলেই ওনার খবর পেয়ে যাবেন।”
ঠিকানাটা একদম মুখস্ত করে ফেলেছে যেন আরজু এমনভাবেই বলল। আরমান আবারও বিস্ময়ের সাথে বলল,
“এত লম্বা একটা ঠিকানা আপনি মুখস্ত করে ফেলেছেন?”
“হ্যাঁ। আসলে অনেকবার যাতায়াত হয়েছে তো তাই।”
“আপনি গিয়েছিলেন দেখতে মুনতাসিরকে?”
“হ্যাঁ গিয়েছিলাম।”
“কি অবস্থা এখন ওর?”
“মাথা ফে'টে গেছে। একটা হাতও ভেঙে গেছে। আর কি হয়েছে জানিনা। তবে নার্স বলল মাথায় অনেকগুলো সেলাই পড়বে। আপনি যান।”
“হ্যাঁ যাচ্ছি তবে একটা কথা, আপনি যাবেন না কিন্তু আগেই। আপনার সাথে দরকার আছে।”
আরমান দৌড়ে ওপরে চলে গেল। আরজুরও ইচ্ছে করলো যেতে। মুনতাসিরের জন্য তো চিন্তা হচ্ছে আরজুর। এর মাঝে অনেকবার গিয়েছে তবে এখন এখানে কাজ আছে। কাজ রেখে যাওয়া সম্ভব না।
আরজু জানে না কেন তবে সত্যি মুনতাসিরের জন্য ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। মানুষটা খুব ভালো। এমন একটা মানুষ যাকে এক দেখাতেই ভরসা করা যায়। তার সাথে যে কে এমন করলো সেটাই ভেবে পাচ্ছে না? এমন ভালো মানুষের সাথেও কারো শত্রুতা থাকতে পারে?
পরক্ষণেই আরজুর মনে পড়লো ভালো মানুষদের সাথেই তো সবার শত্রুতা থাকে। ভালো মানুষদেরই তো কেউ শান্তিতে বাঁচতে দেয় না।
_______
আরজুর ডিউটির সময় শেষ। ডিউটি শেষ হলে আরজু সাথে সাথে হোস্টেলে ফিরে যায়। এক মুহূর্ত হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন মনে করে না। কারো জন্য যে অপেক্ষা করবে যে তার সাথে একসাথে ফিরবে এমন কেউ নেই। কোন বন্ধু নেই আরজুর। শুধু হাসপাতালে আসে নিজের কাজটুকু করে চলে যায়। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে সেটুকুর উত্তর দেয় এ ছাড়া আর বেশি কিছু বলে না। তবে আজ যেতে পারলো না। মুনতাসিরের অবস্থা ভালো না, ক্ষত অনেক গভীর এখনো জ্ঞান ফেরেনি। এই অবস্থায় মুনতাসিরকে ফেলে রেখে যেতে ইচ্ছে করলো না।
মুনতাসির মানুষটা অনেক ভালো। কত সাহায্য করেছে আরজু কে। আর আজ মুনতাসিরের এই অবস্থায় ওকে ফেলে চলে যাবে ব্যাপারটা আরজুর কাছেই ঠিক ভালো লাগলো না। তাই যেতেও পারলো না। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আরমানকে যেখানে যেতে বলেছিল নিজে সেখানে গেল। গিয়ে দেখলো আরমান দুহাত কপালে ঠেকিয়ে বসে আছে।
আরজু গিয়ে কিছুক্ষণ আরমানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। আরমান খেয়াল করেনি আরজু কে। আরজু কি বলবে বুঝতে পারছে না। এখনো তো মুনতাসিরের জ্ঞান ফেরেনি, ডাক্তারেরাও কিছু বলেনি। রিপোর্ট হাতে পেলে তারপর জানাতে পারবে, তবে তো আরমান কে জিজ্ঞেস করেও কোন লাভ নেই যে এখন মুনতাসির কেমন আছে? প্রশ্নটা ভীষণ যৌক্তিক হয়ে যায় না? আরমান কি করে বলবে। এছাড়া আর বাড়তি কোনো কথাও খুঁজে পেল না।
হঠাৎ করে এসে কাউকে ভালো-মন্দ কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না আরজু্। সামনের মানুষটা কি ভাববে, বিরক্ত হবে কি না এসব ভাবতে ভাবতে আরজুর কথা বলার ইচ্ছেটাই ম'রে যায়।
এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। এত কিছু ভাবতে ভাবতে আরজুর কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছেটাই ম'রে গেল। তবে ভাগ্যিস আরমান দেখে নিয়েছিল। চোখ দুটো বন্ধ করে এতক্ষণ বসে ছিল জন্য খেয়াল করেনি। চোখটা খুলতেই মনে হলো পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল আরজু দাঁড়িয়ে আছে। আরমান কে তাকাতে দেখে আরজু একটু বিভ্রান্ত হলো। আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
“দেখতে এসেছিলাম উনি কেমন আছেন।”
“এখনো ডাক্তার কিছু বলেনি। একটু পর ওকে কেবিনে শিফট করবে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি।”
“ও আচ্ছা। ওনার বাড়ির লোককে খবর দিয়েছেন?”
“হ্যাঁ দিয়েছি। আসছেন ওনারা।”
“ও আচ্ছা।”
আরজু থেমে গেল। আরজু কে থেমে যেতে দেখে আরমান নিজেই আবার প্রশ্ন করলো,
“কিছু বলবেন কি আপনি?”
আরজু পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“আমাকে দেখে কি আপনার মনে হচ্ছে যে আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই আপনাকে?”
এমন একটা মুহূর্তেও আরজুর কথা শুনে আরমানের হেসে ফেলার মতন অবস্থা হলো। তবে এখন আর চাইলেও কেন যেন হাসিটা বের হতে চাইছে না।
“হ্যাঁ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছেন। তবে আপনার ভেতরে থাকা জড়তার জন্য জিজ্ঞেস করতে পারছে না। নিন এখন ঝটপট বলে ফেলুন কি জানতে চান?”
“বলছিলাম ওনাকে কে মে'রে'ছে আপনি কি জানেন কিছু?”
মুহূর্তের মাঝে আরমানের অভিব্যক্তি কেমন বদলে গেল। যখনই মনে পড়ছে যে কেউ মুনতাসির কে ইচ্ছাকৃতভাবে মে'রে'ছে তখনই মাথায় যেন র'ক্ত চড়ে বসছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা যে কে এত বড় দুঃসাহস দেখালো তাও আবার আজকের মতন একটা খুশির দিনে। এভাবে ছেলেটাকে আঘাত করলো কে?
“এখনো জানতে পারিনি তবে যাবে কোথায় পালিয়ে? গর্তের ভেতরে ঢুকলেও ওখান থেকে টেনে বের করে আনবো।”
“আপনার অনেক ক্ষমতা? মানে আপনি চাইলেই যে কাউকে শাস্তি দিতে পারেন? ধরুন একজন খারাপ মানুষ। কেউ আপনাকে এসে বলল তাকে শাস্তি দিতে হবে তবে আপনি তাকে শাস্তি দিতে পারবেন?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“না অতটাও ক্ষমতা নেই যে সবাইকে শাস্তি দিতে পারবো। কিন্তু হঠাৎ এই কথাটা কেন বললেন বলুন তো? আপনার কি কোন সাহায্য দরকার? কাউকে শাস্তি দিতে হবে?”
আরজু একটু অবজ্ঞার সাথে বলল,
“দেওয়ার হলেই বা কি? আপনি তো আর দিতে পারবেন না। নিজেই তো বললেন অত ক্ষমতা আপনার নেই।”
আরমান এবারে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। দুই হাত বুকে গুজে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকালো। এই প্রথম আরজু একটু থতমত খেল। আরমানের দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। আরমান ভরসা দিয়ে বলল,
“অন্যদেরকে শাস্তি দেওয়া আলাদা কথা আর আপনাকে কেউ বিরক্ত করলে তাকে শাস্তি দেওয়া আলাদা কথা। কেউ বিরক্ত করছে? কেউ কিছু বলেছে?”
আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“না।”
“তবে কাকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলছেন?”
“কাউকে না।”
“কেউ তো নিশ্চয়ই আছে?”
“বললাম তো নেই।”
“বলবেন না আমায় তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
আরমান আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যখন একবার মেয়েটা বলেছে বলবে না তার মানে বলবেই না, কোনমতেই বলবে না সেটা আরমান খুব ভালো করেই জানে। তাই এখন জোরও করল না।
বরং আরজুর কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে এখন বলতে হবে না। যখন আপনার মনে হবে আমাকে বলা যায়, আমি আপনার সমস্যাগুলো শোনার যোগ্য তখনি বলবেন কেমন? তখন আর লুকিয়ে রাখবেন না।”
আরজু কোনো উত্তর দিল না। ঠায় মূর্তির মতন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। দৃষ্টি এখন আরমানের দিকে নেই, মেঝের দিকে তাক করা।
আরজু কে চুপ হয়ে যেতে দেখে আরমানও আর কিছু প্রশ্ন করলো না। ভাবলো হয়তো বা বিরক্ত হবে আরমানের প্রশ্ন শুনে। আর অযথা আরজুকে বিরক্ত করার কোন উদ্দেশ্যে আরমানের নেই। আরমান তো চায় আরজু কে ভালো রাখতে, আরজুর হাসির কারণ হতে। সেখানে আরজু কে বিরক্ত করার কোন মানেই হয় না।
একটু পরেই হাসপাতালে এলো রুবিনা খাতুন আর মৃন্ময়ী। ওদের সাথে আরমানের পরিচিত এক ছেলেও এলো। বলা যায় আরমান ভীষণ ভরসা করে ছেলেটাকে। এখন আরমানের গিয়ে রুবিনা খাতুন আর মৃন্ময়ী কে আনতে দেরি হতো বলে ওই ছেলেটাকে পাঠিয়েছিল। রাতের বেলা একা একা এতটা রাস্তা আসতে হয়তো অসুবিধা হতে পারতো সেই ভেবে আরমান ছেলেটাকে পাঠিয়েছিল।
আরমানকে দেখেই রুবিনা খাতুন সেদিকে এগিয়ে এলেন। আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাবা আমার ছেলে কোথায়? ও ঠিক আছে তো বাবা? ওর কিছু হয়নি তো?”
আরমান সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না আন্টি। ঠিক আছে মুনতাসির। ডাক্তার দেখছে।”
রুবিনা খাতুন হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“বাবা তুমি সত্যি করে বলো আমার কোলটা খালি হয়ে যায় নি তো? আমার ছেলে আছে তো? ও কোথায়? আমার মুনতাসির কোথায়?”
রুবিনা খাতুন এবারে আরো বেশি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আরমান ওনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“আন্টি মুনতাসিরের কিছু হয়নি, ও ঠিক আছে। ডাক্তার রিপোর্টগুলো দেখলেই বলতে পারবে ও কেমন আছে। আপনি প্লিজ কাঁদবেন না।”
পাশে দাঁড়ানো মৃন্ময়ী ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরমান ভাইয়া সত্যি করে বলুন আমার ভাইয়া ঠিক আছে তো? কিছু হয়নি তো আমার ভাইয়ার?”
“তুমি আবার কাঁদছো কেন? তুমি কাঁদলে তোমার মা কে কে সামলাবে বলোতো? আর আমি বলছি তো কিছু হয়নি তোমার ভাইয়ার। আরজু আপনি বলুন যে মুনতাসির ঠিক আছে। কিছু হয়নি ওর।”
হঠাৎ করে আরজুর উপরে এত বড় একটা কথা বলার দায়িত্ব পড়ায় একটু চমকালো। তবে সত্যি বলতে মুনতাসিরের যে কিছুই হয়নি এমনটা তো না। ঠিক যে আছে এটাও সত্যি না। তবে আরমান কেন ওদেরকে মিথ্যে বলছে? সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য?
কিন্তু মিথ্যে বলে সান্ত্বনা দেওয়ার মানেটা কি? পরে যখন সত্যিটা জানতে পারবে তখন তো কষ্ট পাবে। তখন ওদের আরমানের কথার উপর থেকে ভরসা উঠে যেতে পারে।
আরজু কে চুপ করে থাকতে দেখা আরমান আবারো বলে উঠল,
“কি হলো আরজু বলুন যে মুনতাসির ঠিক আছ।”
মৃন্ময়ী এগিয়ে এলো আরজুর দিকে।
“আপু বলুন না ভাইয়া ঠিক আছে তো? কিছু হয়নি তো ভাইয়ার?”
আরজু সহজ গলায় বলল,
“ওনার কতটা কি আঘাত লেগেছে, অবস্থা সিরিয়াস কিনা এগুলা এখনও ডাক্তার জানায়নি। রিপোর্ট পেলে জানাতে পারবে। তবে হ্যাঁ বেশ অনেকটা আঘাতই পেয়েছেন উনি। মাথায় অনেকগুলো সেলাই পড়বে। ওনাকে যখন হসপিটালে এডমিট করা হয় তখন ওনার জ্ঞান ছিল না। তবে আশা করছি উনি ভালো হয়ে যাবেন।”
মৃন্ময়ী এবার আরমানের দিকে তাকে বলল,
“ভাইয়া আপনি যে বললেন কিছু হয়নি আমার ভাইয়ার?”
আরমান একটা হতাশার শ্বাস ফেলে আরজুর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে যেন বলতে চাইলো,
“একটু তো সান্ত্বনা দিতে পারতেন আরু!”
আরমান মৃন্ময়ীর গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“দেখো হসপিটালে যেহেতু এডমিট করা হয়েছে তার মানে আঘাত তো একটু লেগেছেই। কিন্তু ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বড় হয়েছো মৃন্ময়ী। তোমায় বুঝতে হবে সবটা। তোমায় শান্ত থাকতে হবে তোমার আম্মুর জন্য। দেখোতো আন্টি কিভাবে কাঁদছে। ওনাকে নিয়ে গিয়ে বসাও আমি পানি আনছি।”
মৃন্ময়ী রুবিনা খাতুন কে নিয়ে গিয়ে বসালো।
আরমান অসহায় কন্ঠে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একটু তো সান্ত্বনা দিলেও পারতেন আরু! এভাবে মুনতাসিরের আঘাতের কথাগুলো বললেন ওনারা শুনে তো আরো বেশি প্যানিক করবে তাই না?”
“মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার থেকে সত্যিটা একেবারে জানিয়ে দেওয়াই ভালো। আপনি এখন না হয় ওনাদেরকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিলেন কিন্তু পরবর্তীতে যদি ওনার অবস্থা সিরিয়াস হয়ে যায় তখন কি বলে সান্ত্বনা দেবেন? তখন ওনারা আপনাকে অবিশ্বাস করবে, ভাববে যে আপনি মিথ্যে বলেন। আর একবার যদি অবিশ্বাসটা তৈরি হয়ে যায় পরবর্তীতে আপনি যখন সত্যি কথা বলবেন তখন ওরা বিশ্বাস করবে না।”
“হ্যাঁ মানছি আমি মিথ্যে বলেছি কিন্তু ওনাদের কে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই তো বলেছি তাই না?”
“সব বিষয়ের সান্ত্বনা হয় না আরমান। ওনার ছেলের আঘাত লেগেছে, ওনার ভাইয়ের আঘাত লেগেছে এই বিষয়ে কি করে সান্ত্বনা দেবেন আপনি? কিছু বিষয়ের সান্ত্বনা হয় না। কিছু আঘাত কখনোই এসব সান্ত্বনা দিয়ে কমানো যায় না। সান্ত্বনা কেবল একটা শব্দ, ব্যথা উপশমের ঔষধ না।”
আরমান বুঝলো আরজুর কথার গভীরতা। আর কথাটা একদমই ভুল বলেনি। সত্যিই কিছু আঘাতের যন্ত্রনা কখনোই সান্ত্বনা দিয়ে কমানো যায় না।
“বুঝতে পেরেছি আপনার কথা আরু। ধন্যবাদ এত সুন্দর বিষয়টা আমাকে সুন্দরভাবে বোঝানোর জন্য।”
“ঠিক আছে।”
রুবিনা খাতুনদের সাথে আসা ছেলেটাকে আরমান পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে পানি আনতে বলল এক বোতল। ছেলেটা বাধ্য ছেলের মত নিচে চলে গেল পানি আনতে। আরমান খেয়াল করলো আরজু হা করে মৃন্ময়ী আর রুবিনা খাতুনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে উপচে পড়ছে বিস্ময়ভাব। এই দৃষ্টির মানে আরমান বুঝলো না। তবে জানতে ইচ্ছে করলো।প্রশ্নাত্মক গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি দেখছেন এভাবে?”
আরজু আঙ্গুলের ইশারায় মৃন্ময়ী কে দেখিয়ে বলল,
“উনি কি পেশেন্টের বোন?”
“হ্যাঁ, মুনতাসিরের বোন মৃন্ময়ী।”
“নিজের বোন?”
“হ্যাঁ।”
আরজু এবার আরমানের দিকে তাকালো। চোখমুখে আকাশসম বিস্ময় ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“ভাইয়ের জন্য বোনেরা এত কাঁদে? ভাইকে বোনেরা এত ভালোবাসে? মানে ওর ভাই আঘাত পেয়েছে জন্য, হসপিটালে ভর্তি আছে জন্য, জীবন সংশয় জন্য এতটা কাঁদছে? ভাইদের জন্য এত ভালোবাসা থাকে বোনেদের?”
আরমান পাল্টা বিস্ময় নিয়ে বলল,
“এটাতো স্বাভাবিক বিষয় আরু।”
আরজু সরাসরি আরমানের কথাটা নাকচ করে বলল,
“মোটেই না। আমি মনেপ্রাণে চাই যেন আমার ভাই খুব তাড়াতাড়ি মা'রা যায়। যদি আমার ভাই হসপিটালে ভর্তি হতো তবে আমি মোটেই কাঁদতাম না।”
আরমানের মাথায় যেন বাজ পড়লো। কিছু সময়ের জন্য পুরো পৃথিবীটা সত্যিই ঘুরে উঠলো। আরমানের মাথা চক্কর খেল। এই মেয়ে বলে কি? ভাই মা'রা গেলে খুশি হতো? একটু কাঁদতোও না? এও সম্ভব?”
“কি সব বলছেন আরু? আপনি এতটা নির্দয় না যে নিজের ভাই মা'রা গেলে কাঁদবেন না।”
“আমি এতটাই নির্দয়। কেননা আমি জানি আমার ভাই যতদিন বেঁচে থাকবে অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করবে, অনেক মানুষের জীবন নষ্ট করবে। তার থেকে বরং ও নিজেই মা'রা যাক। ওর পাপও কম হবে, অনেকগুলো মানুষের জীবনও বেঁচে যাবে।”
“কি এমন অন্যায় করে আপনার ভাই?”
উত্তরটা জানতে ইচ্ছে করলো আরমানের। কেননা নিজের ভাইয়ের কথা বলার সময় আরজুর চোখে যে ঘৃণাটা ফুটে উঠেছিল সেই ঘৃণা ভীষণ ভয়ঙ্কর। নিশ্চয়ই কোন ছোটখাটো কারণ না যার জন্য নিজের ভাই মা'রা গেলে আরজুর চোখে পানি আসবে না। ভাই বোনের সম্পর্কটা তো ভীষণ সুন্দর সম্পর্ক, ভালোবাসার সম্পর্ক। সেখানে আরজু নিজ মুখে এত বড় একটা কথা বলল এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন বিরাট কারণ থাকবেই।
আরজু কে চুপ করে থাকতে দেখে আরমান ফের প্রশ্ন করলো,
“কি হলো বলুন কি অন্যায় করে আপনার ভাই? কেন এত ঘৃণা আপনার ভাইয়ের প্রতি?”
আরজু কিছু বলতে চাইলো, মুখটা খুললো তবে আবার থেমে গেল। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সংযত করে নিয়ে বলল,
“কিছু না। এমনি বললাম। আমি নির্দয় তাই বললাম।”
আরমান যে আর কি বলবে সেটা নিজেই বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ করিডরেই পায়চারি করলো। পায়চারি করে গেল তো করেই গেল সেই সাথে অপেক্ষা করতে লাগল যে কখন আরজু ওকে কিছু বলবে। কেননা আরমান খুব ভালো করে বুঝতে পারছে যে আরজু কোন কিছু নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা চিন্তায় নিমগ্ন আছে। আর এই মুহূর্তে আরজুর কাছে যে ভাবনার বিষয় শুধুমাত্র আরমানের করা প্রশ্নটা সেটাও আরমান জানে।
বেশ কিছুক্ষণ পর আরমানের ভাবনা অনুযায়ী আরজু একবার ওকে ডাকলো।
“এদিকে একবার শুনুন!”
আরজু আরমানের নাম ধরে ডাকে না। হয়তো হঠাৎ দুই একবার ডেকেছে কিন্তু সেই সংখ্যাটা এতটাই অল্প যে আরমান ঠিক করে মনেও করতে পারছে না। এখনো তার ব্যতিক্রম হলো না। তবে আরজুর এই সম্বোধনটা আরমানের ভীষণ পছন্দ হলো। কি সুন্দর আপন মনে হলো। এগিয়ে এসে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আপনি ডেকেছেন, আমি চলে এসেছি। এবার বলুন।”
আরজু ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে বলল,
“একটু আগে আমি আপনাকে যা বললাম সেগুলো ভুলে যান।”
“কোন বিষয়ের কথা বলছেন?”
“আমার ভাইয়ের সম্বন্ধে যা বললাম। ধরে নিন কখনো আমাদের মাঝে এই নিয়ে কোন কথাই হয়নি। আপনার এত ভাবতে হবে না এগুলো নিয়ে কেমন? ভুলে যান।”
“এত সহজ নাকি ভুলে যাওয়া? আমাকে কি আপনার মতন ভুলো মন মনে হয় নাকি যে এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাব?”
“কি সমস্যা ভুলে গেলে? চেষ্টা করুন না ভুলে যাওয়ার?”
আরমান কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করব। তবে তার বিনিময়ে আমার একটা ছোট্ট জিনিস চাই আপনার থেকে?”
আরজুর মুখ ভঙ্গি গম্ভীর হয়ে উঠলো। গম্ভীর গলায় বলল,
“দেখেছেন বলেছিলাম না এই পৃথিবীতে কেউই কোন কিছুর বিনিময় ছাড়া কিছু করতে চায় না। আপনাকে সামান্য একটা কথা শুধু ভুলতে বললাম তার বিনিময়েও আপনি আমার থেকে একটা জিনিস চেয়ে বসলেন। সবাই স্বার্থপর।”
আরজু স্বার্থপর বলায় এবার আরমানের মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। বলুক স্বার্থপর তাও যদি আরমান কাঙ্খিত কাজটা করতে পারে তবে ভালোই হবে।
“আচ্ছা ঠিক আছে। কিছুক্ষণের জন্য আমি মেনে নিলাম যে আমি স্বার্থপর কিন্তু তবুও এই কথাটা ভোলার জন্য আমার কিছু চাই আপনার থেকে।”
আরজু চোখ ছোট ছোট করে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি চাই?”
“আপনার ফোন নাম্বার।”
আরজুর কপালে একটা গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। বেশ অনেকটাই কুঞ্চিত করলো কপাল। মনের মাঝে সৃষ্টি হলো হাজার একটা প্রশ্ন আর সন্দেহ। সেই সন্দেহ গুলোকে দাবিয়েও রাখতে পারলো না, রাখার চেষ্টাও করলো না। সন্দেহী গলায় বলল,
“আমার ফোন নাম্বার দিয়ে কি করবেন? কি কাজ আপনার আমার ফোন নাম্বার দিয়ে?”
“তেমন কিছু না। এই যে মাঝে মাঝে দেখা হয় না, আপনার খোঁজ পাই না, সেজন্য ফোন নাম্বারটা থাকলে খোঁজ নিতে সুবিধা হবে।”
“কি দরকার আমার খোঁজ নেওয়ার? আমার খোঁজ নিয়ে কি করবেন আপনি?”
আরমান আলতা হেসে সহজ সাবলীল গলায় স্বীকারোক্তি দিয়ে বলল,
“ভালোবাসি আপনাকে আরু। আপনার খোঁজ না পেলে অস্থির লাগে ভীষণ। চিন্তা হয় আপনাকে নিয়ে। মনে হয় আমার পাগলিটা না জানি কি করছে। হয়তো আবার কোন আজেবাজে চিন্তায় মাথাটা খারাপ করে ফেলছে।”
আরজু একটু ভরকালো আরমানের এমন কথাবার্তা শুনে। এভাবে আরজু কে নিজের বলার কি আছে? আরজু তো ওর কেউ না তবে নিজের বলবে কেন?
অবাক যেমন হয়েছে তেমনি যে ভালোও লেগেছে একথা আরজু অস্বীকার করতে পারে না। আরমান কিংবা অন্যদের কাছে অস্বীকার করলেও নিজের কাছে অস্বীকার করতে পারে না।
আরজু খেয়াল করছে ওর মনের মাঝে নতুন এক ধরনের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। আরমানের প্রতি কিছু চাহিদা তৈরি হচ্ছে, কিছু আশা তৈরি হচ্ছে। আরজু জানে এগুলো ঠিক না, চায় না কোনো আশা তৈরি করতে কিন্তু তবুও হয়ে যাচ্ছে। চেয়েও আটকাতে পারছে না নিজেকে। তবে আরমানকে এত কিছু বুঝতে দিলে চলবে না। আরজুর দুর্বলতার কিঞ্চিৎ পরিমাণও আন্দাজ করতে দেওয়া যাবে না। আরজুর ইচ্ছে করলো আরমানকে একটু ভয় দেখানোর। কন্ঠ খাদে নামিয়ে আরমান কে বলল,
“আমাকে পা'গ'লি বললেন কেন? আমাকে পা'গ'লি মনে হয় আপনার? আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ মনে হয় আপনার, তাই না?”
আরমানের মুখ থেকে দপ করে হাসিটা নিভে গেল। আরজুর কথায় অসম্মতি জানিয়ে বলল,
“আরে না না। ওটা তো ভালোবেসে ডাকলাম।”
“ভালোবেসে কেউ কখনো কাউকে পা'গ'ল বলতে পারে না।”
“কেউ না পারলেও আমি পারি। আমি যেমন আপনার ভালোবাসায় পা'গল হতে পারি ঠিক তেমনি আপনাকে আমার পা'গলিও বানাতে পারি। এটা ভালোবাসার ডাক ছিল আরু। এমনি কি আর আপনাকে পা'গলি বলি!”
আরজু এবারে হয়তো একটু লজ্জা পেল। ভয় পেল সেই লজ্জার ভাবটুকু না আবার ওর চোখে ফুটে ওঠে। আবার না আরমানের কাছে ধরা পড়ে যায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে কাট কাট গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি যাচ্ছি। আমার পেছনে আসবেন না, এখানেই থাকুন। ওনাদের দরকার আপনাকে।”
কথাটা বলে আরজু সত্যি সেখান থেকে চলে গেল। আরমান চেয়েও পেছনে যেতে পারলো না। রুবিনা খাতুন ডাকছেন। তাই রুবিনা খাতুনের কাছে যেতে হলো। বেশ কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। তবে আরজু একটা বারের জন্যও আর তাকালো না।
________
সময় তখন রাত এগারো টার কাছাকাছি। মুনতাসির কে কেবিনের শিফট করা হয়েছে তবে এখনো জ্ঞান ফেরেনি। আরমান, মৃন্ময়ী আর রুবিনা খাতুন দেখে এসেছেন। এতক্ষণে আরমান একটু নিশ্চিন্ত হলো। এবার এই বিষয়টা তে আরো ভালো করে মনোযোগ দিতে পারবে যে আসলে মুনতাসিরের উপর এই আঘাতটা কে করলো।
ওপরে রুবিনা খাতুন আছে তাই এই বিষয় নিয়ে কারো সাথে কোন আলোচনা করতে আরমান চাইলো না, নিচে এলো। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করে মহিন হোসেনের কাছে কল করল। কয়েকবার রিং হতেই মহিন হোসেন ফোনটা রিসিভ করলো।
“হ্যাঁ তাওসিফ বল।”
“কাকা একটা সাহায্য লাগবে তোমার?”
“কি সাহায্য বল না?”
“তুমি তানভীর কে ফোন করবে। ফোন করে ওর থেকে শুনবে যে ও এখন কোথায় আছে, আজ সারাদিন কোথায় ছিল অন্তত বিকাল ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে কোথায় ছিল।”
ফোনের অপর পাশে থাকা মহিন হোসেন জিজ্ঞেস করলেন,
“কিন্তু কেন?”
আরমান সম্পূর্ণ কথাটা এখনই বলল না। নিজের সন্দেহের বসে কোন অপবাদ লাগাতে চায় না তানভীরের ওপর তাই আগে নিশ্চিত হবে তারপর যা বলার বলবে।
“তুমি আগে জিজ্ঞেস করো তারপরে আমি তোমায় সবটা বলছি।”
“কোন ঝামেলা করেছে কি?”
“তেমনই কিছু বলতে পারো।”
“যদি ঝামেলাই করে থাকে তাহলে এভাবে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলে তো মিথ্যে বলবে।”
“তো তুমি ওভাবে জিজ্ঞেস করবে না। তুমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করবে। একটু আগে ভালো মন্দ কথা বলবে, বাড়িতে আসতে বলবে, তারপর বলবে কিসের এত ব্যস্ততা যে আসতে পারেনা। সারাদিন কি কি করে এসব জিজ্ঞেস করবে।"
“এসব বললে কিন্তু সন্দেহ করবে তাওসিফ। ও খুব ভালো করেই জানে আমি ওকে পছন্দ করি না। আজ হঠাৎ করে যদি ফোন করে এত ভালোবাসা দেখাই তবে অবশ্যই সন্দেহ করবে।”
“করবেনা। ওর মাথায় এত বুদ্ধি নেই। তুমি বিশ্বাস করো আর না করো তানভীর মাথা মোটা। ও যা করে সবটাই ঝোঁকের বসে করে।”
“যদি ও মিথ্যে বলে তবে মিথ্যেটা ধরবো কি করে?”
“তুমি ওকে জিজ্ঞেস করো না তারপরে আমি তাওকীর ভাইকে জিজ্ঞেস করবো।”
মহিন হোসেন বিরক্তিকর গলায় বলল,
“তাওকীর তোকে সত্যি বলবে সেটা কে বলল?”
“নিশ্চয়ই বলবে। মিথ্যে কেন বলবে? তাওকীর ভাই মিথ্যে বলে না।”
মহিন হোসেন তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“নিজের ভাইয়ের জন্য সবই করা যায়। যদি তানভীর ওকে আগে থেকেই বলে রাখে মিথ্যে বলার জন্য? তার থেকে বরং তুই বড় ভাইকে কল করে শোন।”
আরমান এবারে চিন্তিত গলায় বলল,
“কিন্তু বড় আব্বু কিভাবে জানবে?”
“সেটাও ঠিক বলেছিস।”
দুজনেই এবার ফোনের দুপাশে ভাবনায় পড়ে গেল। সত্যি তো যদি তানভীর মিথ্যে বলে তবে মিথ্যেটা ধরতে পারবেনা। যাই বলবে তাই বিশ্বাস করে নিতে হবে। এখন মহিন হোসেন এর কথা শুনে তাওকীর কেও আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। বাকি রইলো তানভীরের মা উনি যদি সত্যি জেনে থাকেন তবুও কিছু বলবেন না। বরং আরমান যদি তানভীরের খোঁজ করে তবে রেগে যাবেন। হঠাৎ করে মহিন হোসেনের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।
“তাওসিফ হিমিকে কল কর। ওই মেয়েটার মনে কোন প্যাঁচ নেই, সব সত্যি বলে দেবে।”
আরমান একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“তা ঠিক বলেছ কিন্তু ভাবি কি জানবে?”
“আরে না জানলে বলবি তানভীরের থেকে জেনে নিতে। ওকে যদি বলিস তানভীরকে না জানাতে তবে জানাবে না। মেয়েটা খুব ভালো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। তবে তুমি আর তানভীরকে কল করো না। আমি ভাবিকে কল করে শুনি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আর কি ঝামেলা হয়েছে আমাকে জানাস। সাহায্য লাগলে বলিস।”
“আচ্ছা।”
ফোনটা কেটে দিয়ে আরমান হিমির নাম্বারে কল দিল। প্রথমবার রিং হয়ে গেল কিন্তু হিমি কলটা রিসিভ করলো না। দ্বিতীয়বার আরমান আবার একটু সময়ের ব্যবধানে কল করলো। এবারে কলটা রিসিভ করল হিমি।
“হ্যাঁ তাওসিফ বলো।”
আরমান সালাম দিল। হিমি অপর পাশ থেকে সালামের উত্তর দিল। টুকটাক কিছু কথাবার্তার পর আরমান একটু ইতস্তত গলায় বলল,
“ভাবি একটা সাহায্যের জন্য কল করেছি। আপনাকে এই সাহায্যটা আমায় করতেই হবে সেটাও কাউকে না জানিয়ে। এমন কি তাওকীর ভাই কেও না।”
হিমির পাশে তখন তাওকীর বসে। কথাগুলো কানে গেল ঠিকই তাওকীরের। ইশারায় হিমি কে বলল সম্মতি জানাতে এবং ওকে বুঝতে না দিতে যে ওর পাশে তাওকীর আছে। হিমি এমনটা করতে চাইল না তবে বাধ্য হলো করতে। অনেক কষ্টে আরমানকে মিথ্যে বলল।
“আচ্ছা ঠিক আছে বলো।”
“ভাবি তানভীর কোথায়?”
“তানভীর তো এখনো বাড়ি ফেরেনি। সেই দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিল।”
“ও সারাদিন কোথায় ছিল এই বিষয়ে আমায় একটু জানাতে পারবেন ভাবি? বিশেষ করে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে কোথায় ছিল, এখন কোথায় আছে আর সারাদিন কোথায় ছিল এই বিষয়গুলো একটু আমায় জানাতে পারবেন ভাবি প্লিজ! খুব দরকার ছিল।”
“কেন কিছু কি হয়েছে তাওসিফ? তানভীর কি কিছু করেছে?”
“না ভাবি তেমন কিছু না। আসলে আমার জানাটা একটু দরকার ছিল। আমি আপনাকে এখনই কারণটা বলতে পারছি না তবে আমি যা সন্দেহ করছি যদি তা ঠিক হয় তবে আপনারা সবাই কারণটা জানতে পারবেন। তবে আপাতত আমার এই ছোট্ট একটা সাহায্য করে দিন প্লিজ ভাবি!”
হিমি আবারো তাওকীরের দিকে তাকালো। তাওকীর আবারো ইশারায় আরমানকে হ্যাঁ জানাতে বলল। হিমি তাই করলো। সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে আমি সবটা জেনে তারপর তোমাকে ফোন দিচ্ছি কেমন।”
আরমান কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,
“অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ভাবি। আপনার এই ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারব না। আর যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ততটা তাড়াতাড়ি আমাকে জানাবেন। আর এই ব্যাপারে কাউকে বলবেন না যে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি কিছু।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
হিমি ফোনটা রেখে তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখন কি করব?”
“তোমাকে কিছু করতে হবে না। যা করার আমি করছি।”
কথাটা বলে তাওকীর নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে তানভীরের নাম্বারে কল করলো। তিন চার বার কল করলো তবে তানভীর একবারও রিসিভ করার প্রয়োজন মনে করলো না। অতঃপর পঞ্চম বারে গিয়ে তানভীর ফোনটা রিসিভ করলো। কন্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে বোধহয় আবার নেশা করেছে। তাওকীর গম্ভীর গলায় বলল,
“কোথায় তুই তানভীর?”
তানভীর খুব চেষ্টা করলো নিজের কণ্ঠকে স্বাভাবিক রাখার। সেভাবেই বলল,
“আমি ক্লাবে ভাই।”
“সময় দেখেছিস ঘড়িতে? কোন ভদ্র বাড়ির ছেলে এত রাত অব্দি ক্লাবে পড়ে থাকে? বিশ মিনিটের মধ্যে তোকে আমি বাড়িতে দেখতে চাই না হলে আজ আমি গিয়ে তোকে ঘাড় ধরে বাড়ি নিয়ে আসবো। আর মনে রাখিস যদি আমাকে যেতে হচ্ছে আজ তবে তোর রাজনীতি কিন্তু শেষ। এরপর আমিও দেখবো তুই কি করে রাজনীতি করিস।”
তানভীর কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“ভাই এখান থেকে যেতেই তো লাগে তিরিশ মিনিটের বেশি, তাহলে আমি বিশ মিনিটে পৌঁছাবো কি করে?”
“তবে মনে রাখিস আমি ঘড়িতে সময় দেখছি। তিরিশ মিনিটের এক সেকেন্ডও বেশি না লাগে যেন। তিরিশ মিনিটের মধ্যে হয় তোর পা বাড়িতে পড়বে, নয়তো আমার পা ক্লাবে পড়বে। আর মনে রাখিস আমার পা যদি ক্লাবে পড়ে তবে সেটা তোর জন্য ভালো হবে না।”
কথাটা বলে তাওকীর ফোনটা কেটে দিল। হিমি চিন্তিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
“কি হয়েছে আমি নিজেও জানিনা। তানভীরের থেকে শুনতে হবে।”
“তুমি বরং একবার তাওসিফ কে কল করে দেখো ও ঠিক আছে কিনা। ওর কণ্ঠ শুনে আমার ভালো লাগলো না।”
“উঁহু। তাওসিফের আমার উপর অবিশ্বাস জেগেছে। আমি কল করলে এখন ও আমায় কিছু বলবে না।”
“কিন্তু অবিশ্বাসটা তৈরি হলো কি নিয়ে? তুমি কি এমন কিছু করেছো যাতে অবিশ্বাস তৈরি হয়? তাওসিফ তো এমন ছেলে না।।”
তাওকীর হেসে বলল,
“ঘটনা কি ঘটেছে সেটা তো জানিনা তবে অবিশ্বাস তৈরি হলো কি করে সেটা কি করে জানবো বলো? আগে তানভীরকে আসতে দাও। ওর থেকে শুনি কিছু করেছে কিনা তারপর না হয় তাওসিফের সাথে কথা বলবো।”