সামনে পরীক্ষা তাই আপাতত আরজুর পড়ার চাপ খুব বেশি। আজ শুক্রবার হওয়ায় না কোন টিউশন আছে আর না হসপিটালে যেতে হবে। আরজু তাই ঠিক করেছে আজ সারাটা দিন খুব ভালোভাবে পড়াশোনা করবে। মাঝে কয়দিন চাকরি আর টিউশন নিয়ে পড়াশোনায় বেশ ঘাটতি হয়ে গেছে। দিনের বেলাতে তেমন সময় পায়ই না। রাতে ঐ যা একটু পড়ে তাও বেশি রাত জাগতে পারেনা। না হলে দিনের বেলা আর ছোটাছুটি করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পায় না শরীরে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর একটু বিস্কুট খেয়েছে আরজু। দুপুরে খিচুড়ি আর ডিম ভাজি খেয়েছে। অনেকদিন থেকে খেতে ইচ্ছে করছিল তাই ভাবলো আজ খাওয়া যাক।
নিজের সাথে সাথে ইরার জন্যও রান্না করেছে। ইরা প্রায়ই ওকে এটা ওটা খাওয়ায় আর আরজু তো নিজের জন্যই তেমন কিছু রান্না করে না সেখানে ইরাকে আর কি দেবে। তারমধ্যে হাতের রান্নাও খুব একটা ভালো না। খুব বেশি কিছু রাঁধতে জানেও না।
এই যেমন আজকেও খিচুড়িতে পানি বেশি হয়ে গিয়েছে। লবণের আন্দাজ ঠিক না থাকার কারণে ডিম ভাজিতে একটু লবণও বেশি হয়ে গেছে। তবে এসবের একটা খুঁতও ইরা ধরেনি। বরং প্রশংসা করেছে আরজুর রান্নার।
দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষে ইরা একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘুমোলো। তবে আরজু ঘুমোলো না। বরং বই পত্র নিয়ে বসল। চোখে মুখে তার ক্লান্তি নেই, না ঘুমোনোর ইচ্ছে আছে। শুধু মাথার ভিতর এখন একটা কথাই চলছে সামনে পরীক্ষা, ভালো রেজাল্ট করতে হবে। নাহলে তো ভালো চাকরি পাবে না আরজু। আর যদি চাকরি না পায় তবে জীবনের পরিস্থিতি বদলাবে কি করে? ওর আপাকে কি করে ওর সাথে এনে রাখবে? আর মা?
আগে যখন আরজু ভাবতো সে যখন চাকরি করবে, অনেক টাকা উপার্জন করবে তখন ওর আপা কে নিজের কাছে এনে রাখবে। তখন ওর মায়ের কথা মনে পড়তো না। শুধুমাত্র প্রার্থনার কথাই মনে হতো। তবে কেন যেন আজকাল আরজুর মায়ের কথাও ভীষণ মনে পড়ে। মনে হয় ওর মা পরিস্থিতির শিকার। হয়তো আড়াল থেকে অনেক রকম ভাবে সাহায্য করেছে আরজু কে কিন্তু আরজু সেসব বুঝতে পারেনি। হয়তো ভালোবাসা দেখায়নি আরজু কে এতটা কঠোর বানানোর জন্যই। হয়তো মায়ের ভালোবাসা পেলে আরজু ধীরে ধীরে কোমল হয়ে যেত, হয়ত এতটা নিজেকে কঠোর বানাতেই পারতো না।
আরজু তখনও মন দিয়ে পড়তে ব্যস্ত। হঠাৎ করে ইরা উঠে দাঁড়িয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে তাড়াহুড়ো গলায় বলল,
“আরজু চলো নিচে যাই।”
আরজু কিছুক্ষণ হা করে ইরার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কিন্তু কেন আপু?”
“আরে চলই না তারপর বলছি।”
“কিন্তু কেন যাব বল না?”
ইরা এবার আর কোন কথাই বলল না। আরজুর হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“তুমি এত বেশি প্রশ্ন করো না আরজু মাঝে মাঝে মনে হয় তোমায় আমি স্কেল দিয়ে মা'রি।”
আরজু আর কিছু বলল না। ইরা ওকে টেনেই নিচে নিয়ে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পর ওদের সামনে একটা বাইক এসে থামল। দুজনেই হেলমেট পরা ফলে আরজু কাউকেই চিনতে পারল না। কে জানে হয়তো অপহরণকারী ভাবলো কিংবা ছিনতাইকারী। না হলে এমন হেলমেট পরে হঠাৎ করে বাইক নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াবে কেন?
তবে আরজুর একটা বিষয় ভালো লাগলো ওর কাছে এখন কিছুই নেই। হাতে যে ফোনটা আছে এটাও নিশ্চয়ই নিতে চাইবে না। কেননা এটা বিক্রি করলে হাজার টাকাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আরজু জন্যই ওটাকে এখনো সহ্য করছে।
আরজুর সব ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে হেলমেট এর ভিতর থেকে ওর পরিচিত দুজন মানুষের মুখে বেরোলে। আরমান আর মুনতাসির। মুনতাসির সমস্যা না তবে আরমানকে দেখে আরজুর কপালে ভাঁজের সৃষ্টি হল। গুরু গম্ভীর গলায় বলল,
“এখানেও চলে এসেছেন আমাকে বিরক্ত করতে?”
মুহূর্তের মাঝে আরমানের হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল। অসহায় গলায় বলল,
“পিছনে তো মুনতাসিরও আছে ওকে চোখে চোখে পড়লো না? ওকেও কিছু বলুন।”
“উনিতাে আমাকে বিরক্ত করতে আসেননি।”
“ইরাকে বিরক্ত করতে এসেছে তো।”
“ইরা আপু ওনার বউ। ওটাকে বিরক্ত করা বলে না।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তো চলুন আমরাও বিয়ে করি।”
আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ছিঃ! বিয়ে কে করে? আপনি ভাবলেন কি করে আমি আপনাকে বিয়ে করবো?”
“বিয়েও করবেন না, প্রেমও করবেন না তাহলে করবেন টা কি? হবেটা কি আপনাকে দিয়ে?”
আরজু আবারও গম্ভীর গলায় বলল,
“আমাকে দিয়ে কি হবে না হবে সেসব আমি বুঝে নেব। আপনাকে এত কথা বলতে বলিনি। কেন এখানে এসেছেন সেটা আগে বলুন?”
এতক্ষণ মুনতাসির আর ইরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দুজনের কথাবার্তা শুনছিলো। এ পর্যায়ে আরজুর প্রশ্নের উত্তরটা ইরাই আগে দিল,
“দেখা করতে এসেছে ওনারা আরজু। সেজন্যই তো তোমায় নিয়ে নিচে এলাম।”
“ওনার জন্য তুমি আমার এতটা সময় নষ্ট করলে ইরা আপু?”
ইরা এবারে মৃদু রাগ দেখিয়ে বলল,
“উপর থেকে নিচে আনার সময় তোমায় বলছিলাম না স্কেল দিয়ে মা'রবো আর একটা কথা বললে কিন্তু ওপরে নিয়ে গিয়ে সত্যি মা'র'বো।”
কি ভেবে যেন আরজু চুপ করে গেল। আরমান একটা শপিং ব্যাগ আরজুর দিকে আর একটা শপিং ব্যাগ ইরার দিকে বাড়িয়ে দিল। ইরা ব্যাগটা হাতে নিলো ঠিকই তবে আরজু হাতে নিল না। শপিং ব্যাগটার ভিতরে একবার উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলো তবে কিছু বোঝা গেল না।
ভ্রুঁ কুঁচকে আরমান কে প্রশ্ন করল,
“কি আছে এর ভেতরে?”
আরমান একটু হেসে বলল,
“বো'ম। আমার পাগ'লির জন্য এ'ট'ম বো'ম এনেছি। এই বো'মটা ফা'ট'বে আর আমার পা'গলি উড়ে সোজা আমার ঘরে এসে পড়বে।”
আরমানের কথা শুনে ইরা শব্দ করে হেসে উঠলেও মুনতাসির লজ্জা পেয়ে গেল। চুপচাপ মাথাটা নামিয়ে নিল।
আরজুও হকচকালো। এইভাবে সবার সামনে পা'গলি ডাকার কি আছে? আরজু কে চুপ করে যেতে দেখে আরমান আবারও বলে উঠলো,
“নিন ধরুন। আজ আমাদের দোকানের উদ্বোধন ছিল। সেটার মিলাদ এনেছি আপনাদের দুজনের জন্য।”
আরজু সন্দেহী গলায় বলল,
“সত্যিই?”
আরমান কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
“হায়রে আমার পা'গলি রে! এত বোকা কেন আপনি আরু? পা'গলিটা আমার সত্যি ভেবে নিয়েছে এর মাঝে বো'ম আছে!”
মুনতাসির এবার আর চুপ থাকতে পারলো না। ইতস্তত গলায় বলে উঠল,
“আরমান ভাই, পাশে আমরাও দাঁড়িয়ে আছি। আমি আরজুর বড় ভাই হই।”
আরমান কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“এই ছেলে, তুমি যাও তো এখান থেকে তোমার বউকে নিয়ে। বিয়ে করে এখন আবার লজ্জা! ইরা যাও তো তোমার জামাইকে নিয়ে। এই ছেলে না নিজে প্রেম করবে না আমাকে করতে দেবে।”
ইরা যেন অধীর আগ্রহে এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল। হাস্যোজ্জ্বল গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এক্ষুনি যাচ্ছি আমরা। মুনতাসির চলো।”
মুনতাসির কে আর কিছু বলার সুযোগও দিল না ইরা। হাত ধরে টেনে অন্য রাস্তায় নিয়ে গেল। এখন একটু হাঁটবে মুনতাসিরের হাত ধরে। বেশিদূর যাওয়ার ইচ্ছে নেই, আশে পাশেই থাকবে তবে একা একটু মুনতাসিরের সাথে সময় কাটাবে। অনেকদিন হলো সময় কাটানো হয় না একসাথে ।
মুনতাসিরেরা সেখান থেকে চলে যেতেই আরমান আবারও আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এর ভিতরে বিরিয়ানির প্যাকেট আছে আরু, বো'ম নেই। আপনাকে আমি কষ্ট দেব ভাবলেন কি করে?”
আরজু এবারে নিশ্চিত হলো। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একবার ভেতরে উঁকি দিল। কিছু একটা ভেবে আরমানকে বলল,
“ইরা আপুর জন্যও এটাই এনেছেন?”
“হ্যাঁ। দুজনেরটা একই। হোটেল থেকে অর্ডার দিয়েছিলাম ওখান থেকেই প্যাক করে দিয়েছে।”
“তার মানে যারা যারা এসেছিল সবাইকে এটাই দিয়েছেন? এক প্যাকেট বিরিয়ানি?”
“হ্যাঁ আরু সবাইকে এটাই দিয়েছি। আপনি চিন্তা করবেন না। সবাই পেয়েছে।”
আরজু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“বাহ্ ভালো। যাকে ভালোবাসি বলে চেঁচান তার জন্য যেটা আর বাকি সাধারণ মানুষদের জন্যও সেই একই জিনিস তাহলে পার্থক্য থাকলো কোথায়? তার মানে আপনি আমার জন্য যেমন বাকিদের জন্যও তেমন। নিশ্চয় অনেক মেয়েও এসেছিল তাদেরকেও নিশ্চয় বলে বেড়ান আপনি তাদেরকে ভালোবাসেন। ভালো। খুবই ভালো।”
আরমানের এখন হাসা উচিত না কাঁদা উচিত বুঝতে পারছে না। আরমান তো ভেবেছিল অন্য কারণে আরজু জিজ্ঞেস করছে তবে এটা কেমন যুক্তি? আরজু একা মানুষ সেজন্যই তো এক প্যাকেটে নিয়ে এসেছে। আরমান যদি জানতো আরজুর বিরিয়ানি এত পছন্দ করে তবে না হয় আরো বেশি করে আনতো। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ইয়ে মানে আরু আসলে মিলাদের জিনিস তো সবাইকে একই দেয় তাই না?”
“অবশ্যই। তবে সবাই যদি আপনার নজরে সমান হয় তবে একই দেবেন। একটা বিষয় খেয়াল করে দেখবেন মাঝে মাঝে কারো কারো জন্য একটু বেশি করে রাখা হয় যারা আলাদা, বিশেষ। আমি আমার বাড়িতেও দেখেছি এমনটা। তার মানে শেষে কি দাঁড়ালো, আপনার জন্য অন্যরা আর আমি একই। আমিই বিশেষ কেউ না।”
আরমান বুঝলো এই মেয়েকে এখন কোনমতেই বোঝাতে পারবে না। কেননা এর তার কেটে গেছে। এখন নিজে নিজেই গল্প বানাবে, নিজে নিজেই আরমানকে দোষারোপ করবে, আর সমানে একই কথা প্যাঁচাতে থাকবে। আরমান যদি ওর প্রশ্নের উত্তর না দেয় তাতেও সমস্যা আবার উত্তর দিলে সেই উত্তরও পছন্দ হবে না। মানে সবদিক দিয়ে আরমানের বিপদ। একেই বলে জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। আর আরমানের জীবনে কুমির আর বাঘ দুটোই আরজু।
বেশ অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে আরমান হেলমেটটা আরজুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এটা পরে বাইকে উঠুন।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কেন উঠবো? আমি যার তার বাইকে উঠি না।”
“আপনি যার তার বাইকে উঠছেনও না আরু। আমি ভবিষ্যতে আপনার কিছু একটা হবো। চলুন। আপনাকে বোঝাবো আপনি আমার জন্য বিশেষ।”
আরমানের শেষের কথাটা শুনে আরজুর যাওয়ার ইচ্ছে হলো। তবে বাইকে উঠবে? আরজুর দীর্ঘ তেইশ বছরের জীবনে কখনো কারো বাইকে ওঠেনি। যদিও অনেকবার প্রস্তাব পেয়েছিল ওঠার তবে সেটা ফিরোজের থেকে সেজন্য আর কখনো ওঠা হয়নি। আর প্রিথুল কখনো তুলতে চায়নি। ওর তো সেসবে খেয়ালই নেই।
আজ আরমান প্রস্তাব দিল ওঠার জন্য। আরজু জানে আরমান খারাপ কিছু করবে না। তবে এভাবে একবার বলাতেই রাজি হওয়াটা কি ঠিক? আরজুর ব্যক্তিত্বের সাথে কি এসব যায়? কেমন হ্যাংলামো হয়ে যায় না?
আরজু গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“যাব না আমি।”
আরজু ভেবেছিল এবারে আরমান নিশ্চয় বিরক্ত হবে কিংবা রেগে যাবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং আরমান শান্ত গলায় বলল,
“আমি খারাপ না আরু। ভাববেন না আপনার স্পর্শ পাওয়ার জন্য বাইকে উঠতে বলছি। আপনি যদি একান্তই বাইকে যেতে না চান তবে ঠিক আছে হেঁটে যাব। এই কি বাইকে গেলে একটু তাড়াতাড়ি হত না হলে রাত হয়ে যেতে পারে। এতদিন হলো তো আমাকে চেনেন কখনো কি আমার ছোঁয়ায় খারাপ লেগেছে কিংবা আমি কি আপনাকে খারাপ ভাবে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছি কখনো? শুধু হাতটাই একটু ধরেছি।”
আরজুর ভেতর থেকে তৎক্ষণাৎ একটা উত্তর বেরিয়ে আসতে চাইলো যে, আরমানের সাথে থাকাকালীন কখনো আরজুর অস্বস্তি হয়নি। আরমান ওর হাত ধরলেও কখনো অস্বস্তি হয়নি। তবে বলতে পারল না। এত কিছু বলা সম্ভব না আরজুর পক্ষে। চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।
আরমান ভাবলো আরজু উঠবে না বাইকে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। হতাশ গলায় বলল,
“ঠিক আছে আমি নামছি।”
আরমান বাইক থেকে নামতে ধরলে আরজু বাঁধা দিয়ে বলল,
“যাব। তবে এই জামা পরে কি করে যাই? দেখুন জামাটা কেমন হয়ে গেছে। এভাবে কি আপনার সাথে যাওয়া যায়! পাঁচটা মিনিট সময় দিন আমি জামাটা বদলে আসি।”
আরমান একবার ভালো করে আরজু কে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরখ করে নিয়ে বলল,
‘কেন কি সমস্যা? বেশ সুন্দর লাগছে তো। অন্যান্য জামা পরলে যেমন আপনাকে আমার পা'গলি লাগে এই জামা পরেও আমার পা'গলিই লাগছে। তবে সমস্যা কি?”
আরজু অবুঝে ন্যায় প্রশ্ন করলো,
“ভালো লাগছে?’
“খুব সুন্দর লাগছে। আর এই জামাতে কি সমস্যা হয়েছে? এই রংটা আপনাকে খুব সুন্দর মানিয়েছে। উঠে আসুন, এভাবেই যাওয়া যাবে। এমনিতেই তো আপনার পাশে আমাকে মানায় না। তার উপরে যদি আবার একটু সাজগোজ করে আসেন আমাকে তো দেখাই যাবে না।”
আরজু আর কিছু বলল না। খুব ভালো লাগলো। এই প্রথম কেউ আরজুর প্রশংসা করলো, কেউ ওর পোশাক নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলল না। বরাবরই নিজের সাজ পোশাকের জন্য আরজুর কোন বন্ধু তৈরি হয়নি। যেখানে বাকিরা সব সময় গোছগাছ পোশাক, পরিপাটি ভাবে থাকতো সেখানে আরজু কখনো তেমন কোনো সুযোগ পায়নি।
মার্কেটে গিয়ে সব থেকে কম দামি জামাটা খুঁজেছে। যে কোন অনুষ্ঠানে যখন নিজের বান্ধবীরা দামি দামি পোশাক পরতো তখন আরজুর পরনে থাকতো নিয়মিত পরা সুতি থ্রি পিস।
কখনো কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগও হয়নি। যেতে পারত না, অস্বস্তি হতো। ভার্সিটিতে কত অনুষ্ঠান হয় তবে আরজু কখনো সেসবে যায়নি। একেই তো এত মানুষের মাঝে অস্বস্তি হয় তার মাঝে বিশেষ দিনগুলোতে সবার ভারী ভারী সাজ পোশাকের মাঝে আরজু কে দেখতে বড্ড বেমানান লাগে।
এজন্য অনেকবার অপমানিত হয়েছে নিজের বন্ধুদের কাছে। একপর্যায়ে বুঝতে পারলো যে সবাই আরজুর থেকে দূরত্ব চাইছে। কেউই সাদামাটা আরজুকে আর পছন্দ করে না। সেজন্য আরজুও সবার থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছিল।
আরজু বাইকে উঠতে রাজি হলো তবে হেলমেট পরতে আপত্তি জানিয়ে বলল,
“এটা পরবো না।”
“না আরু এটা পরতে হবে। যদি এক্সিডেন্ট হয়ে যায়।”
“তাও ভালো আছে তবুও আমি এটা পরবো না। কেমন একটা বন্দি বন্দি লাগবে আমার, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। আমার সমস্যা হবে আমি জানি। আর এক্সিডেন্ট যদি হয়ও, যদি তারপর আমি ম'রেও যাই ভালোই হবে। আপনি বিয়ে করে নেবেন।”
আরমান নিজেও হেলমেটটা খুলে হাতে নিয়ে আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“পরলাম না হেলমেট। আমিও দেখতে চাই কতদিন আপনি আমার ওপরে অবিশ্বাস রাখতে পারেন। বিশ্বাস তো আমায় আপনাকে করতেই হবে আর সেই সাথে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে আমি আপনাকে ভালোবাসি। আর আমি এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আজ যেমন আমি আপনার ভালোবাসায় পা'গল তেমনি একদিন আপনিও আমার ভালোবাসায় পা'গল হবেনই।”
__________
মুনতাসিরের হাতটা ধরে দোলাতে দোলাতে হাঁটছে ইরা। হাঁটার গতিও স্বাভাবিক না, যেন নাচছে। অনেকদিন পর মুনতাসির কে এমন একটু একা পেয়েছে। তাই আজ ভীষণ খুশি ইরা। দুজনেই চুপচাপ আছে, কেউ কোন কথা বলছে না, কোন গল্প গুজব হচ্ছে না শুধু হাঁটছে। তারা শুধু মুহূর্তটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছে।
মুনতাসির আড়চোখে একবার ইরাকে দেখে নিয়ে বলল,
“আপনার বোরকা কই? বোরকা ছাড়া এতদূর এলেন কেন?”
ইরা হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আরে তুমি আছো না সাথে। কেউ কিছু বললে ঘু'ষি লাগিয়ে দেবে। আর বোরকা পরিনি তো কি হয়েছে ওড়না দিয়ে মাথাটা তো ঢেকে রেখেছি।”
“আপনি জানেন না আপনার বোরকা ছাড়া বেড়োনো আমি পছন্দ করি না?”
ইরা এবার পাল্টা গম্ভীর গলায় বলল,
“আর তুমি জানো না তোমার এই আপনি আপনি করা আমি পছন্দ করি না?”
“আচ্ছা ঠিক আছে। তবে এবার চলো হোস্টেলে ফিরে যাই। আর বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই।”
ইরা আবদারের সুরে বলল,
“আর একটু যাই না। আমার ক্ষুধা লেগেছে কিছু খাওয়াও।”
“আচ্ছা তুমি হোস্টেলে চলো আমি খাবার কিনে দিয়ে আসছি।”
ইরা এবারে চোখ গরম করে তাকিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
“আমাকে রাগিও না মনু। চুপচাপ খেতে নিয়ে চলো। তুমি জানো আমি রাগলে কি করতে পারি। বউ সাথে আছে ভালো লাগছে না তাই না? প্রেম করছো নাকি অন্য কারোর সাথে ? বউ কে ভালো লাগছে না, প্রেমিকাকে ভালো লাগে?”
মুনতাসির বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তওবা পড়ো।”
ইরা দাঁত দিয়ে জিভ কা'টলো। বুঝতে পারল রাগের মাথায় আসলেও ভুলভাল কথা বলে ফেলেছে। এভাবে বলাটা বোধহয় উচিত হয়নি। এমন কখনো না হোক। মুনতাসির যদি অন্য কারো দিকে কখনো তাকায় ইরা ম'রেই যাবে হয়তো।
অপরাধী গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“রাগ করোনা কেমন। রাগের মাথায় বলে ফেলেছি। তোমাকে অপমান করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। তুমি জানো আমি তোমায় সম্মান করি।”
মুনতাসির আলতো হেসে বলল,
“আমি জানি সেজন্যই তওবা পড়তে বলেছি, রাগারাগি করিনি। বলো কি খাবে?”
ইরা মিটমিট করে হেসে বলল,
“এসো তোমাকে একটা চুমু খাই।”
বরাবরের ন্যায় মুনতাসির আলতো একটু হেসে বলল,
“মারহাবা।”
ইরা বিস্ফোরিত নয়নে মুনতাসিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই মনু তুমি এমন হয়ে গেলে কবে? এসব কে শেখালো তোমায়?”
মুনতাসির আবারও মুচকি হেসে বলল,
“নিজের বিবির সাথে সব করা জায়েজ আছে। মাঝে মাঝে একটু মজা করাও জায়েজ আছে।”
ইরা হালকা করে মুনতাসিরের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“তবে এসো একটা চুমু খাই। আমার কিন্তু কোন সমস্যা নেই। তুমি লজ্জা পাবে।”
“তোমাকেও লজ্জা পেতে হবে ইরাবতী। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে কিছু গোপন বিষয় এভাবে সবার সামনে দেখাতে নেই। কিছু গোপন বিষয় সব সময় নিজেদের মাঝে গোপনই রাখতে হয়। প্রকাশ্যে আনলে সেগুলোকে বলে অশ্লীলতা। বুঝতে পেরেছো?”
“আচ্ছা ঠিক আছে বুঝতে পেরেছি। তোমাকে যে আমার চুমু খাওয়া হবে না সেটাও বুঝতে পারছি। চলো এখন অন্য কিছু খাওয়াও।”
মুনতাসির আলতা হেসে বলল,
“ঠিক আছে চলো। চুমু অন্য কোনদিন খাওয়াবো।”
_______
বেশ বড় একটা ফার্নিচারের শোরুমের সামনে এনে আরজু কে দাঁড় করিয়ে রেখেছে আরমান। আরজু দাঁড়িয়ে দেখছে আর ভাবছে এত বড় একটা শোরুমের দোকানের চাবি আরমান এর কাছে কি করে এলো? আরমান কি তবে এখানে কাজ করে? হতেই পারে। মালিক তো আর হতে পারে না। কেননা যদি মালিক হতো তবে তো আর টাকা পয়সা নিয়ে এত টানাটানি চলতো না।
আরজুর এসব ভাবনার মাঝেই আরমান বলে উঠলো,
“আরু, ভেতরে আসুন।”
আরজু গুটি গুটি পায়ে আরমানের সাথে ভিতরে গেল। বিশাল বড় শোরুম এবং ভীষণ জাকজমকপূর্ণ । ভেতরে অনেক ফার্নিচার আছে, সবগুলো চকচক করছে।
নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে এক পর্যায়ে গিয়ে আরজু আরমানকে প্রশ্ন করেই ফেলল,
“আপনি কি এখানে চাকরি করেন?”
“ঐরকমই বলতে পারেন। আমি এখানকার মালিক আর কর্মচারী দুটো একসাথে।
“মালিক মানে?"
“মালিক মানে হলো এটা আমার বাবার শোরুম। বাবার মানে তো আমারই, তাই আমিও মালিক।”
“তাহলে আমাকে যে গতকাল বললেন এই মাসে নাকি আপনার টানাটানি চলছে, টাকা নেই, বাড়ি থেকে চাইতেও পারেননি?”
আরমান দাঁত দিয়ে জিভ কা'টলো। এইজন্যই বলে মিথ্যে বলতে নেই। আবার বলেছে তো বলেছে এখন আবার নিজের ভুলেই ধরা পড়ে গেল। কি দরকার ছিল মালিক মালিক গল্প করার? কর্মচারী অবধি তো ঠিক ছিল। এত কিছু বলার কি দরকার ছিল?
“ইয়ে মানে আসলে আরু হয়েছেটা কি টানাটানি তো একটু চলছে। এত বড় একটা শোরুম নিলাম, এত ফার্নিচার তুলতে হলো অনেক খরচ হয়েছে।”
আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“ও আচ্ছা।”
আরমান চমকে তাকালো আরজুর দিকে। এক কথাতেই মেয়েটা কি করে বিশ্বাস করে নিল? সন্দেহও করল না? সত্যি বিশ্বাস করলো নাকি এটাও আরজুর কোন ষড়যন্ত্র। পরীক্ষা করতে চাইছে না তো আবার আরমান কে কোনোভাবে?
আশপাশটা কিছুক্ষণ ঘুরে দেখে আরজু আবার আরমানকে বলল,
“এখানে কেন এসেছি আমরা?”
ডেস্কের উপর আরো অনেকগুলো প্যাকেট রাখা ছিল। এগুলো মূলত রাখা ছিল আরমানের চাচা আর বড় আব্বুর বাড়িতে পাঠানোর জন্য। শুধুমাত্র তানভীর এসেছিল আর কেউ আসেনি, মহিন হোসেনও আসতে পারেননি সে জন্য ভেবেছিলো গিয়ে দিয়ে আসবে। তবে এখন আরমান নিজের মত বদলে ফেলেছে। ওদের জন্য দরকার হলে অন্য কিছু নিয়ে যাবে এখন আগে আরজু কে ওর গুরুত্ব বোঝাতে হবে।
আরজু কে সেগুলো দেখিয়ে বলল,
“এই দেখুন আরু এগুলো আমার চাচাদের বাড়িতে দেওয়ার জন্য রেখেছিলাম। তবে এখন এগুলো সব আমি আমার পা'গলিকে দেব। আপনার গুরুত্ব আমার কাছে সব থেকে বেশি। এসব আপনার। আপনি রেখে রেখে খাবেন কেমন?”
“এতগুলো আমি খাব? আমাকে কি আপনার দানব মনে হয়? আমাকে দেখে কি এতটাই মোটা লাগে আপনার যে ভাবলেন এতগুলো আমি একা খেয়ে নেব?”
আরমান দাঁত বের করে হেসে বলল,
“মোটা লাগে না তবে আপনি মোটা হলে অনেক কিউট লাগবে আপনাকে দেখতে।”
আরমানের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল আরজু। একটু অস্বস্তি হলো। তবে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি এতগুলো খেতে পারব না। তবে আমাকে যেহেতু দিয়েই দিয়েছেন আমি যা ইচ্ছে তাই তো করতে পারি তাই না?”
“একদম। যা ইচ্ছে তাই করবেন। কিন্তু কি করবেন?”
আরজু কিছুক্ষণ ভাবলো। আরমান ওকে ভাবার সময় দিল। ভাবনা শেষে আরজু একবার আরমানকে ডেকে উঠলো,
“আরমান!”
আরজুর মুখ থেকে ডাকটা শুনলেই আরমানের হৃদয়টা যেন জুড়িয়ে যায়। মনে হয় কত সুন্দর একটা নাম রেখেছে আরমানের। হয়তো আরজুুর মুখ থেকে নামটা শুনতেই এত বেশি ভালো লাগে। আলতো হেসে জবাবে বলল,
“হ্যাঁ আরু।”
“চলুন পার্কে যাই এগুলো নিয়ে। ওখানে না প্রায় দিনে অনেক বাচ্চাকে ঘুরতে দেখি, ওরা হাত পেতে টাকা চায়। দেখেই বোঝা যায় খুব ক্ষুধার্ত। চলুন ওদেরকে গিয়ে খাবারগুলো দিয়ে আসি।”
আরমান নিষ্পলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আরজুর দিকে তাকিয়ে থাকলো। আরমানের সে দৃষ্টিতে আরজুর আবারও একটু অস্বস্তি হলো। ভাবলাে ভুল কিছু বলে ফেলেছে হয়ত। আরমানের বোধহয় পছন্দ হয়নি ওর কথাগুলো। কে জানে হয়তো ভেবেছে নিজের টাকা খরচ করে কেন অন্যদেরকে খাওয়াতে যাবে? হতেই পারে।
“আপনার বোধহয় পছন্দ হয়নি আমার কথাটা তাই না?”
“হঠাৎ ওদেরকে খাওয়ানোর কথা বললেন কেন?”
আরজু আনমনে কিছু একটা ভেবে বলল,
“আসলে ক্ষুধা পেটে নিয়ে থাকতে না খুব কষ্ট হয়। কোন কিছুতে মন বসে না। কিন্তু যাদের উপায় থাকে না তাদের মন বসাতেই হয়। জানেন তো আমার তেমন অভ্যাস ছিল না না খেয়ে থাকার। আগে বাড়িতে থাকতে তাও লুকিয়ে হলেও খাবার পেতাম। মা না হলে আপা দিয়ে যেত। তবে যবে থেকে ঢাকা শহরে পা রেখেছি খাবারের জন্য খুব কষ্ট পেয়েছি।”
আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কষ্ট পেয়েছেন কেন?”
“আমি তো প্রথম বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। আমার মামা আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসে একটা হোস্টেলে তুলে দিয়ে যান। আমার কাছে তখন খুবই অল্প টাকা। বাড়ি থেকে কোন টাকা আসবে না সেটাও জানি। নিজের কাছে করার মতন কোন কাজও ছিল না। এক বেলা করে কোনমতে খেতাম। জানেন আমার যে রুমমেট ছিল ও তিন বেলাই ভাত খেত, কিন্তু ও একবারও আমায় খেতে বলত না। ও খেতে বললেও আমি খেতাম না তবে একটু খেতেও বলতো না। আমার সামনে বসেই মাছ, মাংস দিয়ে ভাত খেতো অথচ ওই একই রুমে থাকা আমি যে কিছুই খেতাম না সেদিকে ওর কোন খেয়ালই ছিল না।”
একটু থামলো আরজু। আরমানের দিকে তাকাতেই দেখলো আরমানের চোখ দুটো ছলছল করছে। আরজু বুঝলো না এখানে কাঁদার কি আছে, এতে কষ্ট পাওয়ারই বা কি আছে। কই আরজু তো কাঁদছে না। খারাপ লাগা থেকেও এই কথাগুলো বলছে না। আরজুর সাথে যা হয়েছে তাই বলছে তবে এখানে কাঁদার কি আছে সেটাই আরজু জানে না। একটু বিরতি নিয়ে আবারো বলল,
“জানেন আজ তিন বছর হলো আমি ঢাকা শহরে আছি। কখনো এক টাকা আমার বাড়ি থেকে আসেনি, আমি আশাও রাখিনি। আমার সমস্ত খরচ আমার নিজেকেই চালাতে হয়। মাসে বেশিরভাগ দিনই আমি রাতে পানি খেয়ে ঘুমোই, সকালে আমি বিস্কুট খাই আর দুপুরে ভাত খাই খুব অল্প করে। আপনি নিশ্চয় খেয়াল করেছেন আমি এক জামা ঘুরে ফিরে পরি? এটারও কারণ আছে। আমার না কোন অনুষ্ঠানে পরার জন্য আলাদা করে তোলা কোন জামা নেই। অবশ্য কেউ আমায় কোথাও দাওয়াতও দেয় না......”
আরজু কে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে আরমান বলে উঠলো,
“আর বলবেন না আরু। আর শুনতে পারছি না আমি।”
আরজু স্বাভাবিক গলায় বলল,
“এই প্রথম আপনাকে বলছিলাম আপনিও শুনতে চাইলেন না?”
আরমান তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,
“না তেমন ব্যাপার না। তবে আপনার তো বলতে নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে। আর আপনার বলতে কষ্ট না হলেও আমার শুনতে খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে দেরি করে ফেললাম আপনার জীবনে আসতে। অনেকটা দেরি করে ফেলেছি তাই না?”
আরজু আনমনে বলে উঠলো,
“হয়তো। জানেন আমি মার্কেটে গিয়ে কখনো আমার পছন্দ মত জামা কিনিনি। আমি শুধু খুঁজেছি কোন জামার দাম সবথেকে কম। মাঝে এতটাই বেশি সমস্যার মাঝে পড়ে গিয়েছিলাম যে আমি ভেবেছিলাম আমায় হয়তো বাড়ি ফিরে যেতে হবে। জানেন একবার ভেবেছিলাম মানুষের বাসায় কাজ করি। কি হবে? কে চিনবে আমায়? তবু আমার এখানে থেকে পড়াশোনাটা শেখা জরুরী।”
“এত কষ্ট কেন করেছেন? এর থেকে ভালো তো নিজের বাড়িতে চলে যেতেন।”
“ওটা তো বাড়ি না। ওটা তো জা'হা'ন্না'ম। ওখানে তো মানুষ থাকেনা, ওখানে থাকে শ'য়'তা'নেরা। আর আশেপাশে থাকে কিছু নে'ক'ড়েরা যারা সারাক্ষণ মেয়েদেরকে খুবলে খাওয়ার ধান্দায় থাকে। কত বাঁচিয়েছি নিজেকে খারাপ ছোঁয়ার হাত থেকে জানেন? আমার বাপ, ভাই কেউ কখনো কোনো কিছুর প্রতিবাদ করেনি? আমি যে চুপ থেকেছি এমনটাও না। কখনো কোন কথার উত্তর দিতে ছাড়িনি। সেই জন্য অনেক মা'র খেয়েছি, দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে, এক ফোঁটা পানি অব্দি পাইনি। মানে আমার সারাটা জীবন শুধু খাওয়ার জন্য কষ্ট করেই কেটে গেছে। ভাবতে পারছেন এক মুঠো খাবারের জন্য আমি এখন পর্যন্ত কতটা সংগ্রাম করে যাচ্ছি।”
কথাটা বলে আরজু শব্দ করে হেসে উঠলো। এই প্রথম আরমান আরজু কে এভাবে হাসতে দেখলো। কখনো তো হাসতেই দেখেনি মেয়েটাকে, মুচকি হাসতেও দেখেনি আর সেখানে আজ কেমন শব্দ করে হাসছে। আরজু যতই লুকোনোর চেষ্টা করুক না কেন নিজের কষ্ট আরমান সেসব ঠিকই বুঝতে পারল যে আরজু কষ্ট থেকে হাসছে। এগুলো তো আর হাসির কথা না যে এভাবে হাসবে তাই না? মেয়েটা নিজের কষ্টগুলো কাউকে দেখাতে পছন্দ করে না সেজন্য এভাবে হাসছে।
আরমান পাঞ্জাবির হাতায় নিজের চোখ দুটো মুছে নিয়ে আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“চলুন আরু বিয়ে করে নেই। এই একটা সমাধানই আছে আমার কাছে। আর কি সমাধান দেবো বলুন?”
আরজু আলতো হেসে বলল,
“চলুন খাবার গুলো দিয়ে আসি।”
আরমান অসহায় গলায় বলল,
“বিয়ে করি না আরু চলুন। আমার বাবা-মা সবাই ঢাকায় এসেছে। ওদেরকে জানিয়ে করি। আপনার বাবা মার সাথেও কথা বলাবো।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আমার বাবা মা না হলে সম্ভব না কিছু?”
আরমান অধৈর্য গলায় বলল,
“আরে কাউকে লাগবে না। চলুন দুজনেই বিয়ে করে নেব।”
আরজু আবারো আলতাে হেসে বলল,
“না বিয়ে করব না। করলেও আপনাকে কখনো করবো না।”
কথাটা বলে আরজু আরমানকে ওখানে রেখে আগে আগে হাঁটা দিল। হাসতে হাসতেই আরজু গেলো তবে আরমান সেই হাসিটা দেখতে পেল না। আরমান বুঝলো না যে আরজু ওকে বিরক্ত করার জন্যই কথাটা বলল।
তবে আরমান আরো এক দফা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল বিয়ে যদি করে তবে ইনশাআল্লাহ আরজু কেই করবে। আরজুর জীবনের যত অভিযোগ, যত অপ্রাপ্তি আছে সব পূরণ করে দেবে। অতীতের এই খারাপ স্মৃতি গুলো আরজু কে মনে রাখতে দেবে না। আরজুর জীবনে এত সুখ এনে দেবে আরমান যে আরজু আর কখনো সেই কথাগুলো মনে করার সুযোগই পাবে না।
________
আরজু কে আবার হোস্টেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে এখন মুহিব হোসেনের বাড়ি যাচ্ছে আরমান। আজ সবাই ওখানে যাবে। আরমানের বাবা-মা সবাই আপাতত ওখানেই আছে, ওর কাকা-কাকিও আসবে। অনেক দিন পর পুরো পরিবার এক হয়েছে। মুহিব হোসেনের কড়া নির্দেশ যে ওনার ভাই আর ভাইয়ের পরিবার ওনার বাড়ি ছাড়া আর অন্য কোথাও উঠবে না।
যদিও কল্পনার এসব সহ্য হয় না। ভাইয়ে ভাইয়ে এত মিল যেন ওনার শরীরে জ্বা'লা ধরিয়ে দেয়। তবুও সাহস নেই স্বামীকে কিছু বলার। জানে নিজের পরিবারের সাথে কখনো সম্পর্ক শেষ করবে না তিনি। এই কথাটা বললে উনি তো নিজের ছেলেদের থেকেও সমর্থন পাবে না। তাওকীর তো দূর তানভীরের থেকেও সমর্থন পাবেন না। কেননা তানভীর শুধু সহ্য করতে পারেনা আরমানকে, বাকি সবাই ওর ভীষণ প্রিয়। কল্পনা একদম একা পড়ে যাবে।
ফোনটা বেজে উঠলে বাইকের স্পিড একটু কমিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে ধরল আরমান।
“হ্যাঁ কাকা বলো।”
অপর পাশ থেকে মহিন হােসেন বলে উঠল,
“কোথায় তুই?”
“এইতো আসছি।”
“একটা কথা জানিস?”
“জানি তো অনেক কথাই তবে তুমি কোন কথার কথা বলছো সেটা বল?”
“তানভীর সেদিন ওর গাড়ি নিয়ে না তাওকীরের গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল। মানে বুঝতে পারছিস?”
তৎক্ষণাৎ বাইকের ব্রেক কষলো আরমান। বুঝতে পারছে না যে মহিন হোসেন ওকে যা বোঝাতে চাইলো তাই বুঝলো কিনা। কিংবা আরমান যেটা বুঝেছে মহিন হোসেন আবার অন্য কিছু বুঝেছে কিনা। আরমান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“তুমি কি ভাবছো সেটা আগে বলো।”
মহিন হোসেন আপত্তি জানিয়ে বলল,
“তুই কি ভাবছিস সেটা আগে বল।”
“না না আগে তুমি বলো।’
বেশ অনেকক্ষণ দুজনের এমন তর্কাতর্কি হওয়ার পর অবশেষে মহিন হোসেন কে হার মানতে হলো। অসহায় গলায় বললেন,
“আমার মনে হচ্ছে উদ্দেশ্য ছিল তাওকীর কে মা'রা কিন্তু ভুল করে তানভীর শিকার হয়ে গিয়েছে। কেননা ঐ দিন সকালে তাওকীরের গাড়ি নিয়ে বেরোনোর কথা ছিল। কিন্তু তানভীর এর গাড়ি নষ্ট হয়। ওর যাওয়ার কথা ছিল ওর বন্ধুদের সাথে কোথাও একটা ঘুরতে। তাওকীরকে না জানিয়ে ওর গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে আর এক্সিডেন্ট হয়।”
“বুঝতে পেরেছি। ও নিজ থেকেই মা'রা খেতে গিয়েছিলো।”
মহিন হোসেন নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“আমি তোর চাচা হই। এসব কি ভাষা? মে'রে পিঠের ছাল তুলে নেব।”
“চাচা হওয়ার আগে তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ভুলে গেলে নাকি? বন্ধুদের সাথে তো এমন ভাবেই কথা বলে। তাও আমি কত ভদ্র থাকি।”
“বাড়ি আয়। মেজো ভাইজানকে বলে তোর ব্যবস্থা করছি।”
“তাহলে সোজা বিয়ের কথা তোলো না। বলো আমার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে।”
মহিন হোসেন শব্দ করে হেসে উঠে বললেন,
“ঠিক আছে আমি ভাইজান আর ভাবিকে বলব যে তাওসিফ বিয়ে করতে চায় না এখন। তাই ওকে জোর করো না।”
“ঠিক আছে, তুমি যদি আমার সাথে এমনটা করতে পারো তো করো।”
“আচ্ছা এসব কথা এখন বাদ দে। তোর কি মনে হয় তাওকীরের সাথে এই নিয়ে কথা বলা উচিত হবে?”
“অবশ্যই উচিত হবে। আমি আসছি। এই বিষয়ে না জেনে তো আমি বাড়ি ফিরব না। তাওকীর ভাইয়ের কার সাথে এত শত্রুতা সেটা তো আমাকে জানতেই হবে।”