বিশ্বাস শব্দটা ছোট হলেও এর গুরুত্ব অনেক। বিশ্বাস গড়তে অনেক সময় লাগে কিন্তু সেটা ভাঙতে খুবই অল্প সময় লাগে। আর একবার সেই বিশ্বাসটা ভাঙলে জোড়া লাগানো ভীষণ কঠিন।
তিলে তিলে আরমানের গড়ে তোলা বিশ্বাসটা এক মুহূর্তের মাঝে ভেঙে গেল। ভুল বুঝল আরজু। কিন্তু কেন ভুল বুঝল সেটাই আরমান বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে আরজু এমন কেন করছে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।
এদিকে আরজু এখনো চুপচাপ কাঁদছে। এখন আর দৃষ্টিতে আরমানের জন্য কোন কোমলতা নেই। কেমন যেন ঘৃণা দেখতে পাচ্ছে আরমান আরজুর দৃষ্টিতে।
ওদের দুজনের নীরবতার মাঝে ফিরোজ আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এবার তুই কোথায় পালাবি আরজু? ফিরতে তো হবেই তোকে আমার সাথে। বলেছিলাম না তোকে এই ফিরোজ তোকে নিজের বউ বানিয়েই ছাড়বে।”
আরমান চমকে তাকালো ফিরোজের দিকে। এক্ষুনি কি বলল ফিরোজ? আরজুকে নিজের বউ বানাবে? মানে হচ্ছেটা কি এখানে? ফিরোজ তবে আরজুকে পছন্দ করে। তবে আরজু কাকে পছন্দ করে? আরজু কি আদৌ ফিরোজকে পছন্দ করে?
না তেমনটা তো হওয়ার কথা না। আরজু তো ভালোবাসায় বিশ্বাসই করে না। আরমানই তো ধীরে ধীরে ভালোবাসার প্রতি ওর বিশ্বাসটা ফিরিয়ে আনলো।
আরমানের এসব ভাবনার মাঝেই আরজু ঘৃণা ভরা কন্ঠে ফিরোজ কো উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোর কি মনে হয় ফিরোজ তোকে দেখে ভয়ে আমি গর্তে লুকোবো? এই চিনলি আমাকে? আর আমায় বানাবি বউ? বলেছি তো বি'ষ খেয়ে ম'রবো তবুও তোকে স্বামী বানাবো না। বিশ্বাস কর তোকে দেখে আমার একটুও ভয় হয় না। কেননা আমি জানি তুই জা'নো'য়া'র। কিন্তু তোর পাশে ভালো মানুষের মুখোশ পরে যিনি দাঁড়িয়ে আছে ওনাকে দেখে আমার ভয় হচ্ছে।”
হঠাৎ করে আরমানের প্রতি ঘৃণা জন্মানোর কারণটা আরমান বুঝতেই পারছে না, কোনমতেই বুঝতে পারছে না। ফিরোজ বুঝলো ওরা দুজন পূর্ব পরিচিত। মনে হচ্ছে ভালোই সম্পর্ক ছিল। তবে হঠাৎ করে আরজুর আরমানের প্রতি ঘৃণাটা জন্মালো কি করে সেটাই বুঝতে পারছে না।
আরমান কাতর গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি কি করেছি আরু? কেন আমায় ভুল বুঝছেন? আমাকে বলুন আমার দোষটা কি আমি শুধরে নেব। আমি তো বলেছি আপনাকে, আমি আপনার জন্য নিজেকে বদলে ফেলবো। আপনি শুধু বলুন আমার দোষটা কি?”
আরজু ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। এইভাবে আরমান আরজু কে কাঁদতে কখনো দেখেনি। মেয়েটা যে এভাবে কাঁদতে পারে সেটাই হয়তো আরমানের জানা ছিল না।
আরজু তো নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখায় না তবে আজ কি হয়ে গেল মেয়েটার? খুব কি কষ্ট দিয়ে ফেলল আরমান? কিন্তু কিভাবে কষ্টটা দিল সেটাও যে বুঝতে পারছে না। কি দোষ করলো কিচ্ছু বুঝতে পারছে না তবে শোধরাবে কি করে নিজের ভুলটা?
“আপনি আমার বিশ্বাস নিয়ে খেলেছেন আরমান। যে ভালোবাসায় আমার কোন বিশ্বাস ছিল না আপনি আমাকে সেই ভালোবাসায় বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলেন। আর আজ আবার সেই আপনিই আমার ভালোবাসার প্রতি পুরনো ঘৃণাটা জাগিয়ে তুললেন। কেন এমনটা করলেন? খুব কি দরকার ছিল আমার সাথে এই নোংরা খেলাটা খেলার?”
আরমান আরজুকে বোঝানোর জন্য ওর দিকে এগিয়ে যেতে ধরলে আরজু ছিটকে দূরে সরে গিয়ে সাবধানী গলায় বলল,
“একদম আমার কাছে আসবেন না। আপনাকে দেখে আমার ঘৃণা হচ্ছে। কতটা নিকৃষ্ট মানুষ আপনি! আমি কি ভাবতাম জানেন? ফিরোজের থেকে নিকৃষ্ট মানুষ এই পৃথিবীতে আর নেই। তবে এখন বুঝতে পারছি আমি, আপনি তার থেকেও বেশি নিকৃষ্ট। আপনি এতটাই জঘন্য মানুষ যে আমার সরল মনের সাথে খেলেছেন আপনি। আমি আপনাকে বারবার বলেছিলাম আমার জীবনে অশান্তির শেষ নেই নতুন করে আর কোন অশান্তি তৈরি করবেন না কিন্তু আপনি সেটাই করলেন। শেষে কিনা আপনি ফিরোজের সাথে হাত মেলালেন?”
“কি বলছেন এসব? ফিরোজের সাথে আমি হাত মেলাতে যাব কেন? আপনি আগে আমায় বলুন আমার দোষটা কি?”
আরজু চিৎকার করে উঠে বলল,
“এখনো বুঝতে পারছেন না আপনার দোষটা কি? এখনো ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন কেন? আমার যা ক্ষতি করার তা তো করেই দিয়েছেন তবে এখনো কেন এই চেষ্টা? ফিরোজের সাথে কোন ভালো মানুষের যোগাযোগ থাকতেই পারে না। আপনি বলুন না ওর মতন একটা সন্ত্রাসী, চরিত্রহীন ছেলের সাথে কোন ভালো ঘরের ছেলের সম্পর্ক থাকতে পারে?”
আরমান বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“সন্ত্রাসী মানে?”
“এমন ভাব করছেন যেন বুঝতেই পারছেন না। আপনিও নিশ্চয়ই একই দলের লোক? এখনো কেন আমার সামনে ভালো মানুষ সাজার নাটকটা করে যাচ্ছেন? নাটক তো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা এবার।”
ওদের আজেবাজে কথাবার্তায় ফিরোজ ভীষণ বিরক্ত হলো। আরমানের সাথে আরজুর কি সম্পর্ক ছিল, ওদের সম্পর্কটা বর্তমানে কোন পরিস্থিতিতে আছে এসব জানার প্রতি বিন্দুমাত্র কোন আগ্রহ নেই। পেয়ে গেছে তো এখন আরজু কে, তবে তো ওকে আর কোনমতেই ছাড়বে না। এবারে নিয়েই যাবে সাথে করে।
ফিরোজ ক্ষিপ্ত গলায় আরজুকে বলে উঠলো,
“তোদের এসব নাটক নাহয় অন্য কোন সময় করিস, যদি পরবর্তীতে সময় পাস। এখন চল আমার সাথে।”
কথাটা বলে ফিরোজ আরজুর হাত ধরার চেষ্টা করলো তবে সক্ষম হলো না। তার আগেই ওর হাতটা খপ করে আরমান ধরে নিল। চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর গলায় ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভুলেও স্পর্শ করবে না আমার আরু কে। আমি সত্যিই জানিনা তোমার আসল পরিচয় কি ফিরোজ, তবে তোমার জন্য আমার আরু আমাকে ঘৃণা করছে। তার মানে নিশ্চয়ই ভালো কিছু নও তুমি। আরু তোমায় অপছন্দ করছে। আর আমি বেঁচে থাকতে তোমায় ওকে ছুঁতে দেবো না।”
ফিরোজ রাগে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“তুমি আমার অনেক উপকার করেছো তার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ আরমান। তাই বলে আমার আর আরজুর মাঝে এসো না। আরজুর জন্য কিন্তু আমি সব সীমা পার করে যেতে পারি, সব কৃতজ্ঞতা ভুলে যেতে পারি। শুনলে না আরজু আমাকে জা'নো'য়া'র বলল। আমি ওকে পাওয়ার জন্য জা'নো'য়া'রও হয়ে উঠতে পারি।”
আরমানের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না, ভয়ও পেল না। ভয় পাওয়ার কি আছে? ফিরোজ তো এসেছে আরমানের এলাকায়। ভয় তো ফিরোজের পাওয়ার কথা। আরমানের এলাকায় এসে, ভার্সিটির মাঠে দাঁড়িয়ে, আবার আরমানের চোখে চোখ রেখে ওকেই হুমকি দিচ্ছে! ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগলো না আরমানের। তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“আমার এলাকায় এসে আমাকে হুমকি দিচ্ছো ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর না ফিরোজ? আমি জানিনা তোমার আর আরুর মাঝে কি সম্পর্ক, আর না আমি জানতে চাই। আমি বেঁচে থাকতে আমার আরু আর কারো হবে না তুমি শুধু এতটুকু মাথায় রাখো।”
ফিরোজকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরজু আবারো চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“খবরদার আমাকে আরু বলে ডাকবেন না। আপনি ওই জা'নো'য়া'র'টার মতনই। আমার এখন আপনাকে দেখে ভয় হচ্ছে। আমি ওই জা'নো'য়া'রটা কে দেখে কখনো ভয় করিনি কিন্তু আমার আপনাকে দেখে ভয় হচ্ছে। কেননা ফিরোজ যেমন তেমনভাবেই থেকেছে কিন্তু আপনি একটা মুখোশ পরে থেকেছেন আমার সামনে। দেখুন ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছে, আমি ঘামছি। আমি কখনো কাউকে দেখে ভয় করিনি কিন্তু আজ আমার আপনাকে দেখে ভয় হচ্ছে। আপনি, আপনি খুব নোংরা, আপনি অমানুষ। আপনাকে দেখলে আমার ঘৃণা হচ্ছে।”
আরজু আর কাউকে কিছু বলার সুযোগই দিলোনা। গেটের দিকে দৌড় দিল। আরমান পিছন থেকে অনেকবার ডাকলো তবে আরজু থামলো না। ফিরোজও ডাকলো তবে আরজু থামল না। যেখানে আরমানের ডাকেই থামছে না সেখানে ফিরোজের ডাকে থামবে এটা আশা করাই বোধহয় ভুল।
ফিরোজ অনেক চেষ্টা করলো আরমানের থেকে ছাড়া পাওয়ার তবে আরমান ওর হাত ছাড়লো না।
কেননা এতক্ষণে আরমান যতটুকু বুঝতে পেরেছে তাতে ফিরোজ আর আরজুর সম্পর্ক ঠিক না। এখন আরমান একে একে সব মেলাতে পারছে। আগে আরমান খেয়াল করেনি ফিরোজ আর আরজু দুজনেই তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকে। তারমানে দুজনের মাঝে নিশ্চয় বেশ ভালোই জানা শোনা আছে। তবে কি ফিরোজের ভয়েই আরজু নিজের বাড়ি যেতে পারত না? বলতো গেলে আর ফিরে আসতে পারবে না। হতেই পারে।
আরমানের এসব ভাবনার মাঝেই ফিরোজ এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে আরমানকে শাসিয়ে বলল,
“যদি আরজু কে না পাই তবে তোমার প্রতি আমি আমার সব কৃতজ্ঞতা ভুলে যেতে বাধ্য হব। তুমি ভাবতেও পারবে না আরজুর ব্যাপারে আমি কতটা হিংস্র হতে পারি।”
ফিরোজের হুমকিটা আরমানের গায়ে লাগলো না। বেশ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“আরজুর ভাষায় তুমি সন্ত্রাসী, তবে তোমার থেকে হিংস্রতাই আশা করা যায়। তবে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না আরুর জন্য আমার এই ভদ্র মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকা হিংস্র সত্তাটা কি ভয়ংকর ভাবে বেরিয়ে আসতে পারে। পারলে আমার আরুর ধারের কাছে এসে দেখিও।”
ফিরোজ আর কোন কথা না বাড়িয়ে ছুটে গেল গেটের দিকে। তবে বাইরে গিয়ে আরজুকে পেল না। এখন আরজুর সন্ধান পাওয়ার ফিরোজ একটাই উপায় খুঁজে পেল, সেটা হলো আরমানের উপরে নজর রাখা।
আরমানও বেশ ভালোই বুঝতে পারল যে এখন ফিরোজ ওরই পিছু করবে। আরমান বুঝতে পারছে এখন আরজুর কাছে যাওয়াটা জরুরি, ওকে বোঝানোটা জরুরী তবে তেমনটা করল না। আরজুর ঠিকানাটা ফিরোজকে জানানো ঠিক হবে না। চব্বিশ ঘন্টা তো আরমান হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে পারবে না। যদি কোন একটা ফাঁকফোকর দিয়ে ফিরোজ আরজুর কোনো ক্ষতি করে বসে। আরজুর ঠিকানা ফিরোজ কে জানতে দেওয়া যাবে না।
_______
ইরা বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুদিন পর ইরার ভাইয়ের জন্য সম্বন্ধ দেখতে মেয়ের বাড়িতে যাবে সেজন্যই যাওয়া। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ব্যাগে তুলছে যেগুলো ছাড়া চলবেই না। ইরার গোছগাছের মাঝেই ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো আরজু।
সোজা বিছানার উপরে গিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। ইরা মৃদু কেঁপে উঠলো। কানে এলো আরজুর কান্নার শব্দ। বুঝতে পারছে আরজু কাঁথার ভিতরে শুয়ে কাঁপছে।
হঠাৎ করে এমন অপ্রত্যাশিত অবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেল যে ইরার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আরজু এমন ছুটেই আসল কেন, আবার এসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়েই পড়লে কেন, আবার এখন কাঁদছেই বা কেন?
তড়িঘড়ি করে আরজুর দিকে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় ওর পাশে বসলো। ইরা আরজুর গায়ে হাত দিতেই আরজু কেঁপে উঠলো। শোয়া থেকে উঠে বসে পড়লো। চোখে মুখে আরজুর আতঙ্ক। ইরাকে দেখেও যেন ভয় পাচ্ছে।
পিছিয়ে গেল আরজু। কিছু বললও না। ইরা আরো অবাক হলো। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“এমন করছ কেন আরজু? কি হয়েছে তোমার? ভয় পাচ্ছ কেন? আর কাঁদছো কেন এমন করে?”
আরজু কোন উত্তর দিল না। আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে একদম দেওয়ালের সাথে চেপে বসলো।
ইরা বুঝলো ওকে দেখে আরজু কোনো কারণে ভয় পাচ্ছে তাই আর এগিয়ে গেল না। তবে এমন কেন করছে সেটা তো জানতে হবে। দূরে দাঁড়িয়ে থেকেই আবারও উদ্বিগ্ন গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি হয়েছে আরজু আমায় বল? কেউ কিছু বলেছে? কিছু হয়েছে তোমার সাথে?”
ফ্যাল ফ্যাল করে ইরার দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ করে আরজু শব্দ করে কেঁদে উঠলো। আরজু কে এভাবে কেঁদে উঠতে দেখে ইরা ভরকালো। এবারে আর দূরে থাকতে পারলো না। বিছানার উপর উঠে গিয়ে আরজুর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“কি হয়েছে আরজু আমায় বলো? আমায় না বললে আমি বুঝবো কিভাবে। ভয় পেয়েছো কোন কিছুতে?”
ইরা কে অবাক করে দিয়ে আরজু এবারে দুহাতে ইরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ইরার পিঠের জামা খামচে ধরলো।
এবারে ইরার ভয় হলো। আরজু তো এভাবে কাঁদার মেয়ে না। তাও আবার জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। ইরাও পাল্টা দু হাতে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমার সাথে কি খুব খারাপ কিছু হয়েছে আরজু?”
আরজু হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“ভালোবাসা খুব খারাপ। আমি তোমায় বলেছিলাম ইরা আপু ভালোবাসা বলতে কিছু হয় না। দেখেছো মিলে গেল আজ আমার কথা। আমি যেই না ওনাকে ভালোবাসতে চাইলাম অমনি ওনার সব সত্যি বেরিয়ে এলো।নউনি ঠকিয়েছেন আমায়।”
“কাকে ভালোবাসার কথা বলছো? কে ঠকিয়েছে?”
ইরার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আরজু আবারো বলল,
“আমার এখন খুব ভয় করছে ইরা আপু। উনি তো জানে আমি এখানে থাকি। উনি নিশ্চয়ই ফিরোজকে নিয়ে আমায় ধরতে আসবেন তাইনা? তারপর আমাকে আবার আমার বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। আমার জীবন এখানেই শেষ। উনি ওই জা'নো'য়া'র'টা'র সাথে মিলে আমার জীবনটা শেষ করে দিলেন। আমি এখন কোথায় পালাবো? ওরা ধরে ফেলবে আমায়।”
এবারে ইরারই কেমন যেন পা'গল পা'গল লাগছে। এই ফিরোজটা কে? কে ধরতে আসবে আরজু কে? কে জা'নো'য়ার? কোথায় পাঠিয়ে দেবে? কার কথা বলছে মেয়েটা? মাথা ঠিক আছে তো?
ইরা অনেক কষ্টে আরজু কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দুই হাতে আগে ওর চোখের জল মুছে দিয়ে চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,
“কান্না থামাও। আর ভয় পাচ্ছ কেন? এখানে কেউ আসতে পারবে না।”
“না ওরা চলে আসবে। তুমি চেনো না ওদের। ওরা খুব খারাপ। আমি যেখানেই যাই না কেন ওরা আমায় বাঁচতে দেবে না। তুমি.. তুমি আমায় কোথাও একটু লুকিয়ে রাখবে? ওরা এলে বলে দেবে তুমি আমাকে চেনো না।”
“আগে আমায় বলো কার কথা বলছো? কে তোমায় ঠকিয়েছে? কাকে ভালোবাসতে চেয়েছিলে তুমি?”
হুট করে আরজুর অস্থিরতা গুলো কমে গেল। আরমানের সাথে কাটানো কিছু মুহূর্তের কথা মনে পড়ে গেল। সবই কি তবে আরমানের নাটক ছিল? আরজুর এতো খেয়াল রাখা, আরু বলে ডাকা, পা'গলী বলে ডাকা, হাত ধরে হাঁটা, ঘন্টার পর ঘন্টা পার্কে গিয়ে অপেক্ষা করা সব কি তবে মিথ্যে ছিল?
আরজু নির্জীব গলায় বলল,
“আরমান।”
ইরা চমকে উঠে বলল,
“কে? আরমান ভাইয়া?”
আরজু শুধু উপর নিচ মাথা নাড়ালো। ইরার বিশ্বাস হলো না কথাটা। ইরা তো জানে আরমান আরজু কে পছন্দ করে। সারাদিন ওর পেছনে ঘুরে বেড়ায় তবে আরমান ঠকাবে কি করে?
নিশ্চয় আরজু ভুল কিছু বুঝেছে। আর আরমান যদি খারাপই হতো তবে তো মুনতাসির আরমানের সাথে কখনোই মিশতো না। এতোটুকু ভরসা ইরার মুনতাসিরের উপর আছে। মুনতাসির সবসময় ভেবেচিন্তে মানুষের সাথে মেশে। আর সেখানে আরমান তো খুবই কাছের, মুনতাসির ভীষণ ভরসা করে আরমানকে। আরমান কখনো খারাপ হতে পারে না।
“তুমি ভুল ভাবছো আরজু। আরমান ভাইয়া খারাপ হতে পারে না। আরমান ভাইয়া যদি খারাপ হতো তবে তোমার মুনতাসির ভাইয়া ওনার সাথে কখনোই মিশতো না।”
মুনতাসির নামটা আরজুর কানে যেতেই মনে হলো যে মুনতাসিরই এখন একমাত্র ওকে বাঁচাতে পারে। একমাত্র মুনতাসির কেই ভরসা করা যেতে পারে। হ্যাঁ, মুনতাসির তো নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ। আরজু কে বোন বলে, ভীষণ স্নেহ করে। নিশ্চয়ই মুনতাসির ওকে বাঁচাবে। আরজু ব্যস্ত গলায় ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইরা আপু মুনতাসির ভাইয়াকে ডাকো। তুমি... তুমি এক্ষুনি ওনাকে আসতে বলো। দয়া করে তুমি আসতে বলো ওনাকে।”
“ও তো ভিতর আসতে পারবে না। আর এখন বোধহয় ও কোন কাজে আছে। একটু আগে কথা হলো তখন আমাকে তাড়া দিয়ে ফোনটা রাখতে বলছিল।”
আরজু মানল না ইরার কথা। অনুরোধ করে বলল,
“দয়া করে মুনতাসির ভাইয়াকে আসতে বলো। আমি জানি যদি উনি শোনেন আমার দরকার উনি মানা করবেন না। প্লিজ ইরা আপু একবার ওনাকে ফোন করো না। উনি খুব ভালো, আমি জানি উনি আমাকে সাহায্য করবেন। ওনাকে বলতেও তো হবে যে আরমান খারাপ। যদি ওনার কোন ক্ষতি করে দেয় ওরা দুজনে মিলে। ফিরোজ আমার ভালো সহ্য করতে পারে না। তুমি ডাকো মুনতাসির ভাইয়াকে।”
ইরা বুঝলো এখম মুনতাসির কে ফোন না দিলে আরজু কে শান্ত করা অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে কল করলো মুনতাসির কে। প্রথমবার রিং হয়ে গেল তবে মুনতাসির ফোনটা রিসিভ করল না।
আরজুর কান্নার বেগ আরো বাড়লো।
“আবার কল করো ইরা আপু। ওরা এসে যাবে কিন্তু।”
আরজুর কথা অনুযায়ী ইরা আবারও মুনতাসির কে কল করলো এবং এবারে মুনতাসির কলটা রিসিভও করল। ইরা মুনতাসির বলে একবার ডাকতেই আরজু ওর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে নিজেই কানে ধরে ক্রন্দনরত গলায় মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মুনতাসির ভাইয়া আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। আপনি না এলে ওরা চলে আসবে, ওরা আমাকে নিয়ে যাবে। আমি খুব বিপদে পড়েছি, আমাকে বাঁচান ভাইয়া।”
ইরার নাম্বার থেকে কল আসার পরে আরজুর কন্ঠ পেয়ে একেই তো মুনতাসির অবাক হয়েছে। তারওপর আবার আরজুর ক্রন্দনরত গলার এমন আকুতি। বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। অবুঝের ন্যায় বলল,
“কি হয়েছে আরজু?”
আরজু আবারও ক্রন্দনরত গলায় অনুনয় করে বলল,
“আপনি তাড়াতাড়ি আসুন না ভাইয়া। আমি তো আপনার বোন। আপনার নিজের বোন যদি বিপদে পড়তো আপনি না এসে থাকতে পারতেন? আমি আর কাউকে ভরসা করতে পারছি না। শুধু আপনাকে ভরসা করে আসতে বলছি। আমাকে নিয়ে যান না এখান থেকে। আমাকে কোথাও একটা লুকিয়ে রাখুন। আমি এখানে থাকলে ওরা খুঁজে নেবে আমায়। ওরা মেরে ফেলবে আমায়।”
কথাটা বলে আরজু আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লো। ইরা বুঝতে পারল আরজু আর কিছু বলতে পারবে না। ওর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিজেই মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে ব্যস্ত গলায় বলল,
“তুমি তাড়াতাড়ি এসো। আমি জানিনা আরজুর কি হয়েছে? কি সব বলছে। বলছে আরমান ভাইয়া নাকি খারাপ। ওকে সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার পক্ষে।”
মুনতাসির এক মুহূর্তে ব্যয় না করে বলল,
“আমি এক্ষুনি আসছি।”