তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ২৮

🟢

দুই রুমের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট। একটা রান্নাঘর আর একটা বাথরুম। দুটো ঘরের মধ্যে যে ঘরটা বড় সেই ঘরের এক পাশে একটা বিশাল বড় বুক সেলফ। বুক সেলফের প্রত্যেকটা তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা অসংখ্য বই। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে বই রাখা বাকি আছে। বরং বইয়ের তুলনায় বুক সেলফের আকারটাই একটু ছোট হয়ে গিয়েছে।

বুক সেলফের সামনে ঘরের বাকি যে ফাঁকা জায়গা আছে সেখানে একটা টেবিল আর চেয়ার রাখা। সেই টেবিলের উপরেও অসংখ্য বই। বলা যায় পুরো ঘরটাতে বই ছাড়া আর কিছু চোখেই পড়বে না। এটা কে ইলহামের স্টাডি রুমই বলা চলে।

দিনের বেশিরভাগ সময়, না বলা যায় সারাটা দিনই ইলহাম কে এখানেই পাওয়া যায়। ওই মাঝে মাঝে একটু যদি ক্ষুধা লাগে তবে রান্না করতে চলে যায়। সে খাবার প্লেটসহ নিয়ে এসে আবার এই ঘরেই থাকে। কোন কোন দিন রাতে লিখতে লিখতে কিংবা পড়তে পড়তে এখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। আবার কোন কোন দিন পাশের ঘরে গিয়ে বিছানার উপর ঘুমোয়।

জীবনটা বড্ড ছন্নছাড়া আর এলোমেলো। লেখক মানুষ তো, সারাদিন শুধু বই পত্র নিয়েই পড়ে থাকতে পছন্দ করে। আর কোন কিছুতে তার কোন আগ্রহই থাকে না। যেটুকু সময় অন্যান্য কাজের মাঝে থাকে তখনো উপন্যাস নিয়েই ভাবতে থাকে।

এখনো লিখছেই । সামনের বইমেলায় দুটো বই প্রকাশ হওয়ার কথাটা সেই নিয়ে তুমুল ব্যস্ততার মাঝে দিন কাটছে। এত ব্যস্ততার মাঝে তো খাওয়া দাওয়া সবকিছু ভুলে বসেছে। আজ সকাল থেকেও কিছু খাওয়া হয়নি। বাজার শেষ। বাজার যে করতে যাবে সেটাও হয়ে ওঠেনি। মনে হয়েছে সময় নষ্ট হবে।

ইলহামের ব্যস্ততার মাঝে কলিং বেলটা বেজে উঠলো। মৃদু বিরক্ত হলো ইলহাম। এই ব্যস্ততার মাঝে আবার কে এলো! আজই আসতে হলো! কয়েকদিন পরে আসতো, তবে তো ইলহাম আর বিরক্ত হতো না।

তবে বিরক্ত হওয়ার সাথে সাথে ইলহামের মনে একটা প্রশ্নও এলো যে কে এলো। ওর বাড়িতে কেউ তো আসে না, কেউ তো নেই ইলহামের বাড়িতে আসার মত। তবে আজ এই অসময়ে কে এলো?

মুহূর্তের মাঝে বিরক্ত ভাব গুলো কৌতূহলে পরিণত হলো। হাতে থাকা কলমটা আলগোছে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সদর দরজার দিকে পা বাড়ালো। দরজা খুলতেই দেখল সামনে পরিচিত একটা মুখ, তবে সেই সাথে একটা অপরিচিত মুখও আছে। পরিচিত মুখটা হলো আরমানের, অপরিচিত মুখটা হলো আরজুর।

আরমান কে দেখতেই মুহূর্তের মাঝে ইলহামের বিরক্তিভাব কেটে গেল। হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“আরে তাওসিফ, তুই এতদিন পর। চমকে দিলি তো আমায়। ভিতরে আয়।”

আরমানও পাল্টা হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“সময় পাচ্ছিলাম না লেখক সাহেব।”

“সাথে এনাকে চিনলাম না তো। আমাদের গ্রামের কেউ বলেও তো মনে হচ্ছে না।”

“আরে না, উনি হচ্ছেন শহুরে মানুষ। তুমি কি লেখক হ্যাঁ? একটা কম বয়সী ছেলে সাথে করে একটা কম বয়সী মেয়েকে নিয়ে এসেছে কি সম্পর্ক থাকেতে পারে বুঝতে পারো না? এই তুমি নাকি লেখক, তুমি আবার প্রেমের উপন্যাস লেখো, হ্যাঁ?”

ইলহাম শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“ঠিকই তো বলেছিস। আমি তো বড্ড বোকামি করে ফেললাম। সে যাই হোক, আগে ভিতরে আয়।”

আরমান আরজু কে নিয়ে ভেতরে এলো। ভেতরে আসতেই ইলহাম আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তবে তুই কিন্তু না জানিয়ে এসে একটা বোকামি করেছিস তাওসিফ। বিশেষ মানুষকে নিয়ে এসেছিস আমাকে কি একবার জানাতে হয় না? তুই জানিস না আমি ভবঘুরে মানুষ? এখন চা ছাড়া তো আর কিচ্ছু খাওয়াতেও পারব না।”

আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“কিছু খাব না আমি।”

আরজুর গম্ভীর গলা শুনে ইলহাম একটু ভরকালো। বুঝতে পারলো না এই স্বাভাবিক কথাটায় এমন গম্ভীর হওয়ার কি কারণ। তবে বেশি কিছু বলল না। আবারো আরমানকে উদ্দেশ্য করেই বলল,

“তা তাওসিফ পরিচয় করিয়ে দিবি না? তোর মনমোহিনীর নাম কি?”

আরমান কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,

“কে মনমোহিনী?”

ইলহাম আলতো হেসে বলল,

“মন মোহিনী অর্থ হলো যে মনকে মুগ্ধ করে। আকর্ষণীয়, সুন্দরী নারীকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আপনি তো তাওসিফ কে মুগ্ধ করেছেন, ওর মনে নিজের জায়গাও করে নিয়েছেন। সেই হিসেবে আপনি তাওসিফের মনমোহিনী। আপনার নামটাই জিজ্ঞেস করলাম।”

ব্যাপারটা আরজুর কাছে বেশ অদ্ভুত লাগলো। যদি ওর নামই জানার হয় তবে সরাসরি প্রশ্ন করলেই তো হতো। এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্রশ্ন করার কি আছে? কতগুলো কথা বাড়তি বলতে হলো এর জন্য আরজু কে।

যাইহোক এ নিয়ে আর কোন কথা বাড়াতে পছন্দ করলো না আরজু। এমনিতেই লোকটাকে কেমন যেন উদ্ভট লাগছে দেখতে। পরনে ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রংটাও অদ্ভুত, হলদে রকমের। চুল তো নয় যেন পাখির বাসা। দেখে মনে হচ্ছে জন্মের পর থেকে কখনো কাটেনি। সারা মুখ জুড়ে দাঁড়ি গোঁফে ভরে গেছে। তার ওপর আবার চোখে পরেছে মোটা ফ্রেমের চশমা। আরমান আরজুকে পা'গল বলে, তবে আসল পা'গল তো এই লোকটা।

আরমান বলে উঠলো,

“এটা হচ্ছে আমার পা'গলি ইলহাম ভাই। আর নাম হলো নীলাঞ্জনা আর…....”

আরমান কে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে আরজু প্রশ্ন করে উঠলো,

“কি নাম বললেন?”

“কেন নীলাঞ্জনা। ওই যে, সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা। আমার প্রথম প্রেমও নীলাঞ্জনা।”

“কে নীলাঞ্জনা? কে আপনার প্রথম প্রেম?”

আরমান ভ্যাবাচ্যাকা খেল। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“ইয়ে মানে আপনিই তো নীলাঞ্জনা, আপনিই তো আমার প্রথম প্রেম।”

আরজু ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“বাহ! খুব ভালোবাসেন আমায়। প্রতি পদে পদে প্রমাণ পাচ্ছি কতটা ভালোবাসেন আমাকে। এতটাই ভালোবাসেন যে আজ অব্দি আমার নামটাও ঠিক করে জানেন না।”

“নাম জানিনা মানে?”

আরজু কন্ঠে আকাশ বিরক্তি আর রাগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বলল,

“আমার নাম নীরাঞ্জনা গাধা। ‘ল’ আর ‘র’ এর মধ্যে পার্থক্য করতে শিখুন। মূর্খ কোথাকার। এই ব্রেন নিয়ে আপনি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন। চান্স পেলেন কি করে? সত্যি করে বলুন তো পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়েছিলে নাকি আবার ঘুষ দিয়ে ভর্তি হয়েছেন? এই ব্রেন নিয়ে তো কলেজ লাইফেই ফেল করার কথা।”

আরজু একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো। আরমান আর ইলহাম দুজনেই হা করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। সামান্য একটা অক্ষরের জন্য মেয়েটা এক নিঃশ্বাসে কতগুলো কথা বলে গেল আরমানকে। সামনে যে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তারও তোয়াক্কা করলোনা। অপমান করেই গেল, তো করেই গেল। একেবারে মান সম্মান এর দফারফা করে তারপরে থামল। আরমান আর কিছু বলার মতন সাহসই পেল না।

এবারে ইলহাম একটু হেসে উঠে বলল,

“ওহে বালিকা, সামান্য ‘ল’ আর ‘র’ এর পার্থক্যের জন্য প্রেমিকের ভালোবাসায় প্রশ্ন তুললেন? এ আপনার কেমন অবিচার? একবার আপনার প্রেমিকের মুখের দিকে তাকিয়ে তো দেখুন। আপনি নীলাঞ্জনা হন কিংবা নীরাঞ্জনা, আপনিই তার প্রথম প্রেম। নামে কি এসে যায়? ভালো তো উনি আপনাকেই বাসে।”

আরজু তাচ্ছিল্য গলায় বলে উঠলো,

“প্রেমিক হওয়া বুঝি এত সহজ? অবশ্য আপনার কাছে সহজই হবে। ওইতো উপন্যাসে লিখে দেবেন প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেল দুজন দুজনের। তবে বাস্তবে প্রেম এত সহজ নয়, আর না প্রেমিক হওয়া এত সহজ। প্রেমিক হতে চাইলে প্রেমিকার ছোট ছোট বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানতে হবে। হোক সেটা নামের সামান্য ‘ল’ কিংবা ‘র’ এর পার্থক্য। এই সামান্য একটা অক্ষরেও কিন্তু অনেকটা অবহেলা প্রকাশ পেয়েছে।”

“দারুন কথা বলেন তো আপনি নীরাঞ্জনা। আপনি তো দেখছি যুক্তিতে আমাকে হারিয়ে দেবেন।”

“আপনি যুক্তিতে আমার কাছে তখনই হারবেন যখন আপনার যুক্তিটা ভুল হবে।”

“বেশ হার মানলাম আমি আপনার কাছে। তা তাওসিফ তুই দিনে কতবার হেরে যাস?”

আরমান বোকা বোকা হেসে বলল,

“তুমি দিনের হিসাব করছো, আমি এখন অব্দি ওনার কাছে জিততেই পারিনি। তবে একটা বিষয়ে আমি জিতে গেছি। আমি ওনাকে বলেছিলাম যে উনি একদিন ঠিক আমায় ভালোবাসবেন এবং উনি আমাকে ভালোবেসেছেন। এই একটা বিষয়েই আমি জিতে গেছি। আর কোন বিষয়ে আমি জিততে চাইও না। উনি জিতুক, উনি খুশি থাকুক। ওনার জিতেই আমার জিত, ওনার খুশিতেই আমার খুশি।”

ইলহাম আবারো হো হো করে হেসে উঠলো। আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে ইলহাম গেল চা বানাতে। আরমান গেল আরজুকে নিয়ে ইলহামের স্টাডি রুমে। এত এত বই দেখে আরজু তব্দা খেয়ে গেল। এত বই পড়ে কি করে মানুষ? সময় পায় কোত্থেকে?

আরজু কে হা করে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরমান বলে উঠলো,

“কি হলো আরু পছন্দ হয়েছে বইগুলো? নেবেন আপনি? আমার বাড়ি তেও একটা বুক সেলফ আছে, সেখানেও অনেক বই আছে। আপনি গেলে আপনাকে সব দিয়ে দেব। আরো নতুন নতুন বইও কিনে দেবো।”

আরজু ভালোভাবে পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে আরমান কে বলল,

“আমার গল্পের বই এতটা পছন্দ না, তবে আমার আপার পছন্দ কিন্তু কিনতে পারতাম না। বাবা তো টাকা দিত না। স্কুলের বেতনই কখনো দিত না ঠিক ঠাক ভাবে। সরকারি স্কুলে পড়েছি। আমি সেজন্য আপাকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি যখন চাকরি করব আপাকে অনেক বই কিনে দেবো। আপনার কাছে যখন অনেক বই আছে তাহলে সেগুলোর কয়েকটা আমাকে দেবেন, আমি আপাকে দেবো।”

“আরে আপাকে পুরোনো বই দেবেন কেন? আমি নতুন কিনে দেবো।”

আরজুর ভালো লাগলো আরমানের কথাটা। হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। ওদের কথাবার্তার মাঝে চায়ের কাপ নিয়ে সেখানে ইলহাম এলো।

দুটো কাপ দুজনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তৃতীয় কাপটা নিজের জন্য রাখল। আরমান চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে ইলহামকে উদ্দেশ্য করে বলল ল,

“যে বইটা আমায় দিয়েছিলে ওটা পড়া তো শেষ। দ্বিতীয় খন্ড কবে আসবে?”

ইলহাম চায়ের কাপে চুমু দিয়ে বলল,

“দ্বিতীয় খন্ড তো আসার কথা না।”

আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“ও কি কথা? বইয়ের শেষে যে অসমাপ্ত লিখেছো?”

ইলহাম আলতো হেসে বলল,

“সব গল্পের সমাপ্তি হয় না। এই উপন্যাসটা আমার অনেক আগের লেখা। ভেবেছিলাম হয়তো কাহিনীটা শেষ করব, তবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।”

আরমান কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“তো শেষ যখন হয়নি লিখেছিলে কেন? শিমুল আর নিয়াজের সাথে কি শত্রুতা ছিল? অযথা বাঁশ দিলে কেন ওদের?”

ইলহাম হো হো করে হেসে উঠলো। ওদের কথাবার্তার আগা মাথা আরজু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ইলহাম অপরিচিত তাই ওকে জিজ্ঞেস করারও মানে হয় না। ভ্রুঁ কুঁচকে আরমান কে বলল,

“শিমুল আর নিয়াজ কে?”

“এই সাহিত্যকের লেখা একটা বইয়ের প্রধান দুটি চরিত্র। একদম আমার আর আপনার মতন। নিয়াজ শিমুলের পিছন পিছন ঘুরতো কিন্তু শিমুল পাত্তা দিত না, ঠিক যেমন আপনি আমায় দিতেন না। তারপর ওদের মাঝে প্রেম হলো ঠিকই তবে সাহিত্যিক মশাই ঝামেলা বাঁধিয়ে বিয়েটা আর দিলো না। আসলে নিজে এখনো বিয়ে করতে পারেনি তো তাই কারো বিয়ে সহ্য করতে পারে না। ঠিক বলেছি না সাহিত্যিক মশাই?”

শেষের বাক্যটা ইলহামকে উদ্দেশ্য করে বলল আরমান। ততক্ষণে ইলহামের চা খাওয়া শেষ। কাপটা ট্রের উপর রেখে মলিন হেসে বলল,

“শিমুল আর নিয়াজ এক হয়নি ঠিকই তবে ওরা ভালো তো আজও দুজন দুজনকেই বাসে। আজও শিমুল কোন এক সন্ধ্যায় বসে নিশ্চয়ই নিয়াজের তাকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতাগুলো মনে করে। নিয়াজ আজও শিমুলকে উদ্দেশ্য করে কবিতা লিখে যায়। দূর্ভাগ্য একটাই, ওদের বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য আমার ছিল না। ভাগ্য অন্য কিছুই লিখে রেখেছিল।”

ইলহামের কথাটায় আরমান সন্তুষ্ট হলো কিনা জানা নেই তবে আরজু মোটেও সন্তুষ্ট হলো না। কপাল কুঁচকে প্রশ্নাত্মক গলায় ইলহামকে জিজ্ঞেস করল,

“লিখেছেন তো আপনি তবে ভাগ্যের দোষ দিচ্ছেন কেন? বলুন ওদের ভালোবাসায় সমস্যা ছিল। কোথাও একটা কমতি ছিল। যদি ভালোবাসা সত্যি হতো তাহলে দোয়ার দ্বারাও ভাগ্য বদলানো যায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ করে কি হবে? শেষে গিয়ে দেখবেন হয়তো কেউ কখনো নিজেদের মোনাজাতে একে অপরকে চাইনি।”

থমথমে হয়ে উঠল ইলহামের অভিব্যক্তি। বেশ অদ্ভুত দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকালো। আরমানের চিন্তা হলো যে রেগে গেল কি না। এদিকে আরজুর দৃষ্টিও ভয়াবহ। আরমানের মনে হচ্ছে দুজনের মাঝে নিজে না ফেঁসে যায়। তবে তেমন কিছুই হলো না। ইলহামের থমথমে অভিব্যক্তির বদল ঘটলো। হেসে উঠে বলল,

“চাওয়ার কোন কমতি না থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত বস্তুটা হাত ফসকে বেরিয়ে যায়। বালিকা, আপনার বয়স কম। প্রেম ভালোবাসার বিষয়টা এখনো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আপনার মস্তিষ্কে ধরবে না। আমি সাহিত্যিক মানুষ, বয়স বেড়েছে, সেই সাথে কিছু চুলও সাদা হয়েছে। প্রেম ভালোবাসা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি।”

“কি বলতে চাইছেন?”

“শিমুল আর নিয়াজ নিজেদের মোনাজাতে একে অপরকে ঠিক সে ভাবে চেয়েছিল যেভাবে একজন মৃত্যু পথযাত্রী রোগী খোদার দরবারে নিজের প্রাণভিক্ষে চায়। তবে আয়ু যদি শেষ হয় তবে কি আর সে বাঁচে? ঠিক তেমনি শিমুল-নিয়াজের ভালোবাসার আয়ু ফুরিয়েছিল।”

কে জানে আরজুর ইলহামের বলা কথাটা পছন্দ হলো কি হলো না। তবে আর কিছু বলল না, তর্কও করল না। আরমান ভাবল পছন্দ হয়েছে বোধহয়।

আরজু চা খাওয়া শেষে কাপটা যথাস্থানে রাখতে ধরলে দেখলো আরমান এখনো চায়ে চুমুকই দেয়নি।

“চা তো ঠান্ডা হয়ে গেল। পুরো শরবত হয়ে গেছে। এখন খাবেন কি করে?”

আরমান চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে সন্তুষ্ট গলায় বলল,

“চা যেন শরবত হয়ে যায় এটাই তো চাইছিলাম পা'গলি। গরম কিছু আমি খেতে পারি না। যেকোনো গরম খাবার একদম ঠান্ডা করে তারপর খাই। আর এটা শুধু আমার একার অভ্যাস না, এটা আমার বংশগত সমস্যা।”

আরজু নাক মুখ কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করল,

“যেমন আপনি, তেমন আপনার বংশ আর তেমনই আপনার অভ্যাস।”

___________

ইলহামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা পার্কে গিয়েছিল আরমান আর আরজু। পার্কে বসে থাকতে থাকতেই রাত আটটা বেজে গেল। আরমান ঘড়িতে সময়টা দেখে উঠে দাঁড়িয়ে আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চলুন আরু আপনাকে হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে আসি। না হলে আবার ঢুকতে দেবে না।”

আরজুর মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল না। ঠায় সেখানে বসে থাকলো। আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“উঠছেন না কেন?”

আরজু মাথা তুলে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“যাব না।”

আরমান পুনরায় ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“যাবেন না কেন?”

আরজু কন্ঠে মৃদু বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,

“কি করব হোস্টেলে গিয়ে? ইরা আপুও নেই। সেই তো গিয়ে ম'রা মানুষের মত পড়ে থাকতে হবে। আজ হোস্টেলে ফিরব না।”

বিজ্ঞাপন

“তো কি করবেন?”

“আপনার কি বাড়ি ফেরার তাড়া আছে? কেউ অপেক্ষা করছে নাকি?”

আরমান অসন্তুষ্ট গলায় বলল,

“এত খোঁচাবেন না তো আরু। কেউ অপেক্ষায় নেই। মা-বাবাও গ্রামে ফিরে গেছে।”

আরজু উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“তাহলে চলুন আজ ঘুরবো। আপনার বাইকের তেলের অর্ধেক টাকা আমি দিয়ে দেব পরে।”

আরমান ধপ করে বেঞ্চের উপর বসে পড়ল। বিস্ময় ভরা গলায় বলল,

“আপনি আমার সাথে ঘুরতে যাবেন আরু, তাও সারারাত? ভুল শুনলাম আমি আরু নাকি আপনার শরীর খারাপ করেছে?”

আরজু সোজা হয়ে বসে স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় বলল,

“দ্বিতীয়বার আর এই কথা বলবো না। নিয়ে যাওয়ার হলে চলুন, না হলে সরাসরি না বলে দিন। আপনার সাথে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আমি ম'রে যাচ্ছি না। আপনি বায়না করেন আমার সাথে সময় কাটানোর জন্য তাই বললাম।”

আরমান তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত গলায় বলল,

“না না ঠিক আছে। ঠিকই তো বলেছেন আপনি কেন ম'রে যাবেন, আমিই তো জেদ করি। আমি রাজি আছি। কিন্তু সারারাত কি আর এভাবে বাইরে ঘোরা যাবে? মাঝরাতে আপনার ঘুম ধরলে কি করব? তখন তো আপনি হোস্টেলেও ফিরতে পারবেন না।”

আরজু একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“আমার ভাইয়ার বাড়ি আছে না। মুনতাসির ভাইয়ার বাড়িতে যাব। ওখানে আমি যখনই যাই না কেন ভাইয়া ঠিক দরজা খুলবে।”

আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মাঝে মাঝে মনে হয় ও যদি একটু মুনতাসিরের জায়গায় যেতে পারত তবে আরজুর চোখে নিজের জন্য ভরসা দেখতে পেত। পরক্ষণেই আবার মনে হয় তবে আরজু তো ওকে নিজের ভাই ভাবতো। থাক দরকার নেই মুনতাসিরের জায়গায় যাওয়ার। আরমান নিজের জায়গায় ঠিক আছে।

অনেক ভাবনা চিন্তা করে আরমান একটা যাওয়ার জায়গা ঠিক করল। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে হাইওয়ের ধারে একটা ধাবা তে যাবে। রাতে খাওয়া দাওয়া তো করতে হবে। আর তাছাড়া সেই ধাবায় গেলে যাতায়াতেই অনেকটা সময় পার হয়ে যাবে। রাস্তাটাও দারুন, বাইক চালিয়েও শান্তি পাবে।

আরজুকে একবার বলাতেই রাজি হয়ে গেল। আরমান এতটুকুতে শান্তি পেল। মেয়েটা এখন আর অত বেশি প্রশ্ন করে না, সন্দেহও করে না খুব একটা। আরমান বুঝতে পারে আরজু হয়তো ওকে মুনতাসিরের সমান বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি তবে বিশ্বাস করে। আর আপাতত আরমানের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

__________

হাইওয়ের ধারে একটা ধাবায় এসেছে আরমানরা। সময় তখন রাত দশটার কাছাকাছি। লোকজনে ভরপুর জায়গাটা। একটু পরপরই ট্রাক, প্রাইভেট কার এসে থামছে। মাঝে মাঝে বাসও থামছে। যাত্রীরা নেমে একটু মুখ-হাত ধুঁয়ে নিচ্ছে, কেউ বা আবার খাবার খেতে ব্যস্ত।

ধাবার পরিবেশটা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। কোথাও বোধহয় রঙিন লাইট লাগানো বাকি নেই। দুর থেকেই রঙিন লাইটে ঘেরা ধাবার নাম সহ সাইনবোর্ডটা সবারই নজরে পড়বে।

সামনে চেয়ার-টেবিল রাখা আবার কিছু বাঁশের তৈরি বেঞ্চও রাখা আছে। সেগুলোই বিভিন্ন রং এ সাজানো। সেগুলোরই একটাতে গিয়ে আরমান আর আরজু বসলো।

এত রাতে তো আরজু কে নিয়ে যেখানে সেখানে যেতে পারতো না আরমান। নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। এই জায়গাটা আরমানের পরিচিত। ধাবার মালিকও পরিচিত। আর তাছাড়া সারারাতই এখানে লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে। তাই আরমান ভেবেছে এই জায়গাটাই সবথেকে বেশি নিরাপদ হবে।

“কি খাবেন আরু বলুন? এখানে সব ধরনের খাবারই পাবেন।”

আরমানের প্রস্তাবে আরজুর একটু অস্বস্তি হলো। হোস্টেল থেকে বের হওয়ার সময় তো তাড়াহুড়োতে নিজের ব্যাগটাই নিতে ভুলে গেছে। আরজু এতটাই গাধা যে ফোনটাও নেয়নি। খুশিতে সবকিছু ভুলে গিয়েছিল।

মুখে যতই দেখাক না কেন আরমানকে যে ওর প্রতি বিরক্ত তবে মনে মনে তো আরজু খুশি হয়েছে। আরমানের দেওয়া গুরুত্বে আরজু খুশি হয়েছে। তবে নিজের চিরাচরিত স্বভাব থেকে বেরিয়ে নিজের উচ্ছ্বাসতা খুব বেশি প্রকাশ করতে পারে নি।

তবে কথা হলো নিজে তো সাথে করে কোন টাকা আনেনি। তারমানে পুরো খরচটা আরমান কেই বহন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আরজুর নিজের কিছু বলা উচিত হবে না। আরমানের যা ভালো লাগে তাই অর্ডার দিক।

“আপনি যা খাবেন তাই অর্ডার দিন। আমার জন্য না দিলেও হবে। রাতে না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে আমার। দু গ্লাস পানি খেয়ে নিলে আমার পেট ভরে যাবে।”

আরমান চোখ ছোট ছোট করে আরজুর দিকে তাকালো। বেশ অনেকক্ষণ সেভাবেই তাকিয়ে থাকলো আরজুর দিকে। তবে আরজু বেশ স্বাভাবিক। নিজের বলা কথা নিয়ে কোন অপরাধবোধ নেই। আরজু আত্মবিশ্বাসী যে ও ভুল কিছু বলেনি।

তবে আরমানের এভাবে তাকিয়ে থাকা আরজুর খুব বেশিক্ষণ পছন্দ হলো না। পাল্টা নিজেও চোখ ছোট ছোট করে আরমানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

আরমানের অভিব্যক্তি বদলালো। চোখে মুখে কাতরতা ফুটিয়ে তুলে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমাকে কি একটুও নিজের ভাবা যায় না আরু? আমার সাথে এত সংকোচ কিসের? যা আমার তাইতো আপনার। কি ভেবেছেন বুঝিনি আমি আমাকে কেন খাবার অর্ডার করতে বললেন আমার পছন্দ অনুসারে?”

“কি বুঝেছেন?”

“আপনি যা বোঝাতে চাননি সেটাই আমি বুঝেছি। যাই হোক, আমি নিজের পছন্দ মতো খাবার অর্ডার করছি তার কারণ আমি জানি এখানকার কোন খাবারটা ভালো।”

আরজু আর কোন কথা বাড়ালো না। একটু পর খাবার চলে এলো। আরমান খেয়াল করল আরজু খুব অল্পই খেল। আরমান ভাবলো খেতেও বোধহয় আরজুর সংকোচ হচ্ছে।

“এত অল্প খেলেন কেন? পাঁচ মিনিট পরেই তো ক্ষুধা লেগে যাবে।”

“এতোটুকুতেই আমার পেট ভরে গেছে। আসলে টাকা বাঁচানোর জন্য অল্প করে খেয়ে খেয়ে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে এখন আর বেশি খেতেই পারি না। বরং বেশি খেলে অসুবিধা হয়। পেট ব্যাথা করে।”

আরমানের খাওয়ার হাতটা থেমে গেল। অবশিষ্ট খাবারটুকু আর খাওয়ার ইচ্ছে হলো না। পেটে যে খিদেটা ছিল সেটাও হঠাৎ করে ম'রে গেল। আরমানকে থেমে যেতে দেখে আরজু বলল,

“আপনি খাচ্ছেন না কেন?”

আরমান আরজুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“আপনার জীবনের এমন কিছু ইচ্ছে বলুন তো আরু যেগুলো আপনি পূরণ করার সুযোগ পাননি? আপনার কি করার ইচ্ছে, আপনার কি করতে ভালো লাগে, কি কি করতে চান আপনি সব বলুন তো আমায়?”

আরজু কখনো নিজের অপূর্ণ ইচ্ছে গুলোর কথা কাউকে বলেনি, বলার ইচ্ছেও হয়নি। বলবেই বা কাকে কেউ তো শুনতেও চায়নি। আরজুর জীবনে তো এমন কেউ কখনো আসেনি যে ওর অপূর্ন ইচ্ছে গুলো পূরণ করার দায়িত্ব নেবে। যেহেতু পূরণ করতে পারবেই না তাই আরজুও আগ বাড়িয়ে কাউকে কিছু বলেনি। সময় নষ্ট হতো তো।

তবে জানে না কেন আজ আরমানকে বলতে ইচ্ছে হলো। কারণ আরজু বুঝতে পারে আরমান চায় ওর অপূর্ণ ইচ্ছে গুলো পূরণ করতে। আরজু বুঝতে পারে আরমান ওকে সব সময় হাসি খুশি দেখতে চায়, ভালো রাখতে চায়। তাই আরজুরও বলতে ইচ্ছে করলো আরমানকে নিজের অপূর্ণ ইচ্ছে গুলোর কথা।

আরজু আনমনে বলে উঠলো,

“আমার ইচ্ছে আমি অনেক টাকা উপার্জন করব। তারপর সেই টাকা দিয়ে একটা বাড়ি বানাবো। শহর থেকে অনেকটা দূরে, একদম নিরিবিলি পরিবেশে। আশেপাশে কোন বাড়ি ঘর থাকবে না। শুধু গাছপালা থাকবে, যেন মন খারাপ হলে প্রকৃতির সেই সুন্দর দৃশ্য গুলো দেখে মন ভালো হয়ে যায়। তারপর সেই বাড়িতে আমার আপাকে নিয়ে আসব। আমি আর আমার আপা থাকবো। এটাই আমার জীবনের সবথেকে বড় ইচ্ছে।”

আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“এটাই সবথেকে বড় ইচ্ছে কেন? আপনি তো চাইলে আপনার আপাকে নিয়ে এসে ভাড়া বাসাতেও থাকতে পারেন।”

“না। ভাড়া বাসা তো আমার নিজের হবে না। একটা বাড়ি তৈরি করা আমার সব থেকে বড় ইচ্ছে কেন জানেন আরমান?”

আরমান অবুঝের ন্যায় বলল,

“আপনি তো বলেননি, জানবো কি করে।”

আরজু আলতো একটু হেসে বলল,

“কারণ সেই বাড়ি থেকে আমাকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা কারো থাকবে না। আমি ছোটবেলা থেকে যেখানে বড় হয়েছি সেই বাড়িটা ছিল আমার বাবার। উনি আমাকে কখনোই পছন্দ করতেন না। কথায় কথায় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিতেন। শেষবার যখন ওনার কথা না মেনে ঢাকায় চলে এসেছিলাম তখন উনি হুমকি দিয়েছিলেন, এবার ওনার অনুমতি ছাড়া বাড়ি থেকে বের হলে আর কখনো ওই বাড়িতে ফিরতে পারবো না। আমার বাবার ছেলেও খুব হুমকি দেয়। বলে ওটা শুধু ওর বাড়ি, আমার বাড়ি না।”

আরমান বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“সত্যি? আপনার পরিবারটা এমন কেন আরু?”

“আমারও একই প্রশ্ন। আমার পরিবার কখনো আমার সুস্থ স্বাভাবিকভাবে মানসিক বিকাশ ঘটতে দেয়নি।”

আরমান আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“আমি আপনাকে একটা বাড়ি বানিয়ে দেবো আরু। সেই বাড়ি থেকে আপনাকে কেউ কখনো বের করতে পারবে না। আমাদের বিয়ের পর আমরা ওই বাড়ি তে সংসার করবো কেমন। যদি কখনো আমি ভুল কিছু করি তবে আপনি রেগে গিয়ে আমাকে বের করে দিতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।”

বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকালো আরজু। মুগ্ধও হলো। তবে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে আবারো বলল,

“দ্বিতীয় ইচ্ছে হলো তিনটে মানুষকে খু'ন করা।”

এ পর্যায়ে আরমান চমকে উঠল। কিঞ্চিৎ চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“এসব কি বলছেন আরু? খু'ন করে নাকি কেউ?”

“অবশ্যই করে। খু'ন না করলে দেশে এত জেল থাকত না। আর আপনাদের মতন রাজনীতিবিদরাই বেশি খু'ন করে। আপনিও নিশ্চয়ই করেছেন?”

আরমান তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কক্ষনো না। শুধু মা'র'পি'ট করেছি।”

“ও। তাহলে এই দিক দিয়ে আপনি আমার থেকে পিছিয়ে আছেন। সে যাই হোক তৃতীয় ইচ্ছেটা হলো একটা মানুষকে খুঁজে বের করা। তার থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার দরকার আছে আমার। তাকে জিজ্ঞেস করবো যে কেন আমার আপার জীবনটা নষ্ট করলো, কেন আমার আপা কে মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে পালিয়ে গেল চোরের মতন।”

“আচ্ছা এইসব ইচ্ছে খুবই ভয়ংকর। পূরণ করতে সময় লাগবে। আমায় বলুন এখন আপনার কি ইচ্ছে করছে? স্বাভাবিক কিছু বলুন হ্যাঁ যেটা আমি পূরণ করতে পারব। আবার এটা বলবেন না যে ওই তিনজনকে খু'ন করার পরিকল্পনায় সাহায্য করতে।”

আরজু এবারে শব্দ করে হেসে উঠলো। প্রাণ খুলে হাসলো। আরমান মুগ্ধ নজরে আরজুর হাসির দিকে তাকিয়ে থাকলো। কখনো আরজু কে এভাবে হাসতে দেখেনি। এ যেন এক নতুন আরজু কে আবিষ্কার করল আরমান।

“এভাবে একটু হাসতেও তো পারেন আরু। মাঝে মাঝে একটু এভাবে হেসে আমার বুকের ব্যথাটা জাগিয়ে তুলবেন। তবেই না বুঝতে পারবো যে প্রেমে পড়েছি।”

মুহূর্তের মাঝে আরজুর হাসি থেমে গেল। স্বাভাবিক হয়ে বলল,

“খু'ন করার জন্য পরিকল্পনা আমি নিজেই করতে পারবো, আপনার দরকার নেই। তবে জানেন এখন আমার ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে আপাকে জড়িয়ে ধরতে। আপার হাতের রান্না খেতে। অনেক দিনের জমিয়ে রাখা গল্প আছে সেগুলো আপার সাথে করতে ইচ্ছে করছে। আপাকে খুব দেখতে মন চাইছে আমার। আমার আপা খুব কষ্টে আছে জানেন। আমার খুব দেখতে মন চাইছে আপা কে, আরমান। যে গ্রামটাকে আমি ঘৃণা করি সেই গ্রামে যেতে মন চাইছে। শুধুমাত্র আমার আপার জন্য।”

হুট করে আরজুর চোখ দুটো ভিজে উঠলো। আরমান খেয়াল করলো যে মেয়েটা একটু আগেও হাসছিল সে এখন কাঁদছে নীরবে।

আরমান নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল আরজুর ইচ্ছেটা কি পূরণ করতে পারবে না? অসম্ভব তো না। বাইক নিয়ে যেতে সর্বোচ্চ তিন ঘন্টা লাগতে পারে। অবশ্য এখন তো আরো কম সময় লাগবে। অনেকটা পথ তো এমনিতেই এসে গেছে।

আর আরজু তো বলল আজ রাতে হোস্টেলে ফিরবে না, আরমানের সাথে কাটাবে। তবে তো পূরণ করা যায় আরজুর এই ইচ্ছেটা।

“আপনার গ্রামে যাবেন আরু?”

আরজু চমকে উঠে বলল,

“কিভাবে?”

“আপনি যাবেন কিনা সেটা বলুন। নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমার।”

“এত তাড়াতাড়ি কি করে সম্ভব? আর গেলে আমি আর আসতে পারবো না।”

“ওসব চিন্তা বাদ দিন। আপনি শুধু বলুন আজ, এক্ষুনি যাবেন কিনা। আপনাকে যেভাবে নিয়ে যাচ্ছি সেভাবেই আবার ঢাকায় ফিরিয়ে আনব। শুধু আমার উপরে ভরসা রাখতে হবে।”

আরজু কিছুক্ষণ হা করে আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। হঠাৎ করে বলে উঠলো,

“ফিরোজ আর ফাহিম ও বাড়িতে নেই, হাসপাতালে ভর্তি। আপা বাড়িতে একা আছে। আমরা এখন রওনা দিলে মাঝরাতে গিয়ে পৌঁছাবো। ধরা পড়ারও কোন সম্ভাবনা নেই। বাকি রইল আমার ভাই, ওকে আপনি একাই সামলাতে পারবেন। আর আপনি না পারলে আমি তো আছি। চলুন আরমান যাই।”

আরজুর কথায় সায় জানিয়ে আরমান বলল,

“ঠিক আছে চলুন যাই।”

খাবারের বিল দিয়ে বাইকের কাছে এলো। এতদূরের রাস্তা, তার উপর বাইকে যেতে ঠান্ডা লাগবে। আরমান তাই নিজের গায়ের শালটা খুলে আরজুর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আমার ঠান্ডা লাগুগ, তাও আমার পা'গলির ঠান্ডা না লাগুক।”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“আপনি খুব ভালো আরমান।”

আরমান চোখ বড় বড় করে আরজুর থেকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“এটা সত্যি আপনি মন থেকে বললেন আরু?”

“হ্যাঁ মন থেকে বলেছি। আপনি খুব ভালো।”

“মুনতাসিরের থেকেও ভালো?”

“মুনতাসির ভাইয়া আলাদা, আপনি আলাদা। দুজনে দু'রকম ভালো। তবে ওনার সাথে কারোর তুলনা হয় না।”

সবশেষে আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝতে পারলো যত যাই করুক না কেন মুনতাসিরের সাথে পেরে উঠবে না।

সে যাই হোক এসবে আরমান এখন কান দেবে না। মনেও নিলােনা। বাইকে উঠে আরজুকেও উঠতে বলল। দুজনে পাড়ি দিল নির্দিষ্ট গন্তব্যে। রাস্তাটা একদম ফাঁকাও না আবার খুব বেশি গাড়িও চলছে না। তবে খুব ভালো লাগছে। দুজনেই পরিবেশটাকে দারুন ভাবে উপভোগ করছে। মনে মনে দুজনেই ভাবছে এই সময়টা যেন এখানেই থমকে থাকে। কোনো দূরত্ব যেন তৈরি না হয় দুজনের মাঝে। মনে পড়ে গেল সেই পুরনো গানটা,

❝এই পথ যদি না শেষ হয়,

তবে কেমন হত তুমি বলোতো?

যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়,

তবে কেমন হত তুমি বলত?❞

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প