“আরু আজ ভার্সিটিতে আসার দরকার নেই। হোস্টেল থেকেও বেরোবেন না।”
ঘুমের মাঝেই হঠাৎ করে আরমানের এমন উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শুনে একটু চমকালো আরজু। তার ওপরে আবার বলছে ভার্সিটি তে না যেতে। এদিকে আজ তো যেতেই হবে, একটা ইম্পরট্যান্ট ক্লাস আছে।
আরজু ঘুমঘুম কন্ঠে বলল,
“আমি তো আর আধা ঘন্টা পর বের হবো। আজকে একটা জরুরী ক্লাস আছে।”
ফোনের অপর পাশ থেকে আরমান একটা ধমক দিয়ে বলে বলল,
“বললাম না আজ আসবেন না। ভার্সিটিতে ঝামেলা হয়েছে। মা'রা'মা'রি লেগে গিয়েছিল। আজ কোন ক্লাসই হবে না।”
মা'রা'মা'রি'র কথাটা শুনে মুহূর্তের মাঝে আরজুর ঘুম ছুটে গেল। লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে উদ্বিগ্ন গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি ঠিক আছেন?”
আরমান একটু হাসলো। ভালো লাগলো এটা ভেবে যে আরজু ওর জন্য চিন্তা করছে।
“আমি ঠিক আছি।”
“আর মুনতাসির ভাইয়া?”
“মুনতাসিরও ঠিক আছে। চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোন। এখন ফোন রাখি?”
আরমান নিজের প্রশ্নের কাঙ্ক্ষিত কোন উত্তর পেল না। আরজু চুপ করে থাকলো। আরমানও কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নিজেই বলল,
“রাখবোনা ফোন?”
“আপনি মা'রা'মা'রি করেছেন নাকি আপনাকে মে'রে'ছে?”
আরমান আরজুকে আশ্বস্ত করে বলল,
“না আমি মা'রা'মা'রি করেছি না আমাকে কেউ মে'রে'ছে। ঠিক আছি আমি।”
“একটা কথা বলি?”
“হ্যাঁ বলুন।”
এবারও আরজু বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। আরমান অপেক্ষা করলো আরজুর কথা শোনার জন্য।
“আমি শুনেছি অনেক রাজনীতিবিদ মা'রা যায়। ওদের জীবনের অনেক রিস্ক থাকে। যে কেউ যখন তখন মে'রে দিতে পারে।”
আরমানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বুঝতে পারলো আরজু কেন এই কথাটা বলেছে। বোধহয় একটু একটু ভয় করছে আরমানকে নিয়ে। ভয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। সত্যি আরমানের জীবনের নিশ্চয়তা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে যে ঝামেলাটা হলো সেই ঝামেলার সাথে তো আরমানের দলও জড়িত আছে। সে হিসেবে দেখতে গেলে আরমানের নিজের জীবনেরও ঝুঁকি আছে। তবে আরজুকে এসব বলা যাবেনা। অযথা চিন্তা করবে মেয়েটা।
হাস্যজ্জ্বল গলায় বলে উঠলো,
“আরে ওসব তো বড় বড় রাজনীতিবিদরা মা'রা যায়। আমি এখনো এত উঁচু তে উঠতে পারিনি, ছোটই আছি।”
আরজু থমথমে গলায় বলে উঠল,
“কজন প্রধানমন্ত্রী কিংবা এমপি, মন্ত্রীকে ম'রতে দেখেছেন? ম'রে তো ওই ছোটখাটো রাজনীতিবিদরাই। বড় বড় মন্ত্রীদের পেছনে সবসময় সিকিউরিটি লেগেই থাকে, আপনার পেছনে কে আছে?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছে আরু। ভরসা রাখুন। মৃত্যু যেদিন যেমন ভাবে লেখা আছে তেমনভাবে হবেই। এখন সেটা আমি রাজনীতি করি বা না করি তাতে যায় আসে না। আচ্ছা আমি এখন ফোনটা রাখি, একটা দরকারি কাজ আছে।”
আরমান এবারে ফোনটা রাখতে ধরলে অপর পাশ থেকে কাতর গলায় আরজু ডেকে উঠলো।
“আরমান!”
কাটতে পারলো না কলটা আরমান। তবে কেন যেন আরজুর সাথে এই নিয়ে আর কথা বলার সাহসও হচ্ছে না। তবুও ফোনটা কানে ধরল।
“হ্যাঁ আরু বলুন।”
“আমার অতীতের বিষাক্ত স্মৃতি গুলো মুছে দিতে চেয়ে আপনি আবার কখনো আমার অতীত হয়ে যাবেন না তো? আমাকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে কখনো আপনার সাথে কাটানো মূহুর্তগুলো দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসবে না তো?”
আরমান জানেনা এই প্রশ্নের ঠিক কি উত্তর দেয়া উচিত। বুঝে উঠতে পারছে না কি বলবে। এখন এত কিছু ভাবার সময়ও নেই। আরজুর প্রশ্নটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়ুন পা'গ'লি। বিকেলে দেখা করতে আসবো আমি।”
আরজু আবারও ডাকতে পারে সেই ভয়ে আরমান খুব তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কেটে দিল। আরজু বুঝতে পারলো কারণটা, তবে রাগ করলো না আজ। আরমানের আজকের কথা এড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
আর ঘুম ধরল না আরজুর। আরজু জানে না কেন ভয় করছে। কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছে মনের মাঝে। ইরাও নেই। তবে আরজুর মনে আছে ইরা ওকে বলেছিল যখনই মনের মাঝে অস্থিরতা কাজ করে, যখনই কোন বিষয় নিয়ে ভয় করে তখনই মুনতাসির ওকে বলেছে নফল নামাজ পড়তে।
আরজু ভাবলো তাই করা যাক। মুনতাসির যেহেতু বলেছে ভুল কিছু নিশ্চয়ই বলেনি। অনেক কিছু জানে, অনেক জ্ঞানী এসব বিষয়ে মুনতাসির। আরজু তাই করলো। আরমানের জন্য দোয়া করলো। ভয় অনেকটা কমলো, তবে একেবারে গেল না। কে জানে ভবিষ্যতে কি লেখা আছে।
________
“তোমরা সবাই বাড়িতে চলে যাচ্ছো?”
আরজুর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে মেয়েটা ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
“এখানে থেকে কি করব? ভার্সিটি তো বন্ধ। আর তাছাড়া যে অবস্থা শহরের, বাবা বলছে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে।”
আরজু ছোট্ট করে বলল,
“ওহ্।”
পাশের রুম থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে নিজের ঘরে আসতে ধরলো। পথিমধ্যে আরও বেশ কয়েকজন মেয়েকে দেখলো ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আরজু ওর পরিচিত একটা মেয়ে দেখে থেমে গেল। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আরজু তুমি এখনো তৈরি হওনি কেন? বাড়ি ফিরবে না?”
আরজু স্বাভাবিক গলায় বলল,
“না ফিরব না।”
মেয়েটা আতঙ্কিত গলায় বলল,
“কিন্তু কেন? কেউ তো হোস্টেলে থাকছে না, সবাই চলে যাচ্ছে।”
“তুমিও চলে যাচ্ছো?”
“হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। দেখলে না ঝামেলা হওয়ার জন্য ভার্সিটি বন্ধ দিয়েছে। শুনলাম মা'র্ডা'র হয়েছে নাকি দু-একটা। দু দলেরই নাকি একজন করে মা'রা গেছে। এখন দু দলই হুমকি দেওয়া শুরু করেছে যে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে, যে কয়টা খু'ন করার দরকার হয় করবে। এই নিয়ে তো ঝামেলা হচ্ছে খুব। আমার ভাইয়া নিতে এসেছে আমাকে, আমি যাচ্ছি তাই। তুমিও চলে যাও। একা থেকো না। এখানে একা থাকাটাও ঠিক হবে না।”
কথাটা বলে এই মেয়েটাও চলে গেল। আরজু আবার নিজের ঘরে চলে এলো। ইরাও নেই। অনেকেই চলে গেছে, বাকিরাও চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আরজু জানে যদি সবাই চলে যায় তবে ওকে একা থাকতেও দেবে না এখানে। আর একা থাকা নিরাপদও হবে না। তবে কি করবে আরজু?
ওর তো বাবাও নেই যে ফোন করে বলবে বাড়ি চলে আসতে। ভাইও নেই যে আরজুকে নিয়ে যাবে। কেউ নেই যে একটু খোঁজ নেবে। ভার্সিটিতে এত বড় ঝামেলা হলো আরজু আদৌ ঠিক আছে কিনা সেটার খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই।
কথাগুলো ভাবতেই হুট করে কেন যেন আরজুর ভীষণ কান্না পেল। গাল বেয়ে জলটা গড়িয়ে পড়তে নিল তবে আরজু বাধা দিল। তার আগেই মুছে নিল চোখ দুটো।
সামান্য কারণে কাঁদতে নেই। এত ছোট ছোট বিষয়ে কেউ কাঁদে নাকি। অন্তত আরজু তো কখনোই কাঁদতো না এত ছোট ছোট বিষয়ে। তবে হঠাৎ করে স্বভাবের এত পরিবর্তন হলো কি করে? বোধহয় আরমানের থেকে বেশি প্রশ্রয়, আস্কারা পেয়ে এখন ধীরে ধীরে অল্প বিষয়েই কান্নাকাটি শুরু করতে চাইছে আরজু।
________
আজ প্রথমবার আরমানের বাড়িতে মুনতাসির এসেছে। জরুরী একটা কাজে এসেছে। ঝামেলাটা তো লেগেছে ওদের দু দলের মধ্যেই। নিজেদের মাঝে যতই বন্ধুত্ব থাকুক না কেন তবে দু দলের মাঝে শত্রুতা লেগে গেছে। এই বিষয়েই মুনতাসির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছে আরমানের সাথে।
মুনতাসিরকে সোফায় বসিয়ে আরমান গেল কফি বানাতে। কফি বানানোর মাঝে বাড়িতে থাকা কিছু নাস্তাও সাজিয়ে নিয়ে এলো। মুনতাসির এর সামনে সেগুলো রাখতেই মুনতাসির চিন্তিত গলায় বলল,
“আরমান ভাই এখন এসব খাওয়ার সময় না। চিন্তায় আমার মাথা ঘুরছে আর আপনি নাস্তা দিচ্ছেন আমাকে।”
আরমান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“রাজনীতিতে এসব ঝামেলা তো নিত্যদিনের ব্যাপার। ঝামেলা ছাড়া রাজনীতি হয় নাকি? তুমি চুপচাপ খাও তো ছেলে।”
“সব দোষ কিন্তু আপনার উপর চলে আসছে ধীরে ধীরে। হামিদ সরাসরি বলে দিয়েছে যে ওর সাথে শত্রুতা থেকে আপনি আপনার দলের ছেলেদেরকে উস্কানি দিচ্ছেন।”
আরমানের মাঝে এবারও বিশেষ কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“এসব তো জানা কথা মুনতাসির। আমি হামিদের বিপক্ষ দলের লোক, তার উপরে আবার আমি ওর শত্রু। ও যে আমাকেই দোষারোপ করতে চাইবে এটাই কি স্বাভাবিক না?”
“কিন্তু আপনি চুপ করে আছেন কেন? আপনি কিছু বলুন। আপনার চুপ থাকারই তো সুযোগ নিচ্ছে।”
“তো কি করতে বলছো আমায় বলো? চেঁচানোর স্বভাব ওর, আমার না। যা দোষ দিচ্ছে দেক না। ওর কথায় তো আর পুলিশ আমায় গ্রেফতার করবে না তাই না? না দল আমায় বহিস্কার করবে। তদন্ত হোক, মামলা কোর্টে উঠুক, দেখিনা আমার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ খুঁজে পায় কিনা। তোমার কি মনে হয় এসব সাধারন বিষয় নিয়ে আমি আমার দলের ছেলেদের উস্কাবো যেন ওরা হামিদের লোকজনকে গিয়ে খু'ন করে আসে?
তুমি এত চিন্তা না করে কফিটা খাও, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
আরমানের এমন গা ছাড়া অভিব্যক্তি মুনতাসিরের পছন্দ হলো না। ওর তো নিজেরই ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। হামিদ তো মোটেও সুবিধার না। ওকে এক চিলতে পরিমাণও বিশ্বাস করা যায় না। না জানি কখন, কোথায় থেকে কিভাবে আরমানকে ফাঁসিয়ে দেয়।
এমনটাও তো না যে আরমানের দলের সবাই আরমানের পক্ষে। দলের অভ্যন্তরে যে শত্রুরা থাকে তারাই তো সব থেকে বেশি ক্ষতিকর হয়। মুনতাসিরের দলের অভ্যন্তরে সব থেকে বড় শত্রু হলো হামিদ। ঠিক তেমনি আরমানের দলের অভ্যন্তরেও এমন কিছু শত্রু আছে যারা আরমান কে দুচোখে সহ্য করতে পারে না।
আর এই সুযোগটা যে তারাও কাজে লাগাবে আরমান কে নিজেদের রাস্তা থেকে সরানোর জন্য সেটা মুনতাসির কিংবা আরমান কারোরই অজানা নয়। কিন্তু তারপরও আরমান এতটা শান্ত কি করে আছে মুনতাসির ভেবে পাচ্ছে না।
মুনতাসিরের এসব ভাবনার মাঝেই আরমান আনমনে কিছু একটা ভেবে বলে উঠলো,
“জানো তো মুনতাসির, আজকাল খুব আফসোস হয় রাজনীতিতে জড়ানোর জন্য। বাবার কথার তাৎপর্যটা এখন খুব ভালোভাবে বুঝতে পারি। আসলেই অযথা জীবনে অশান্তি ডেকে এনেছি।”
“এমন কেন মনে হলো ভাই?”
“জীবনে রাজনীতি যতদিন থাকবে ততদিন শান্তি থাকবে না, মুনতাসির। জীবনের কোন নিশ্চয়তা খুঁজে পাই না এখানে। আগে এমনটা হতো না জানো, তবে এখন না বারবার শুধু আরু আর আমার মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে। আমার কিছু হয়ে গেলে আমার মায়ের জন্য তো তাও আমার পুরো পরিবার আছে কিন্তু আমার পা'গ'লিটার জন্য কেউ নেই মুনতাসির। তুমি না আমার পা'গ'লিটাকে একটু দেখো। তোমার দেওয়া কষ্ট ও সহ্য করতে পারবে না। আমার অবর্তমানে ওর খেয়াল রেখো।”
মুনতাসির মুচকি হেসে বলল,
“আমি আপনাকে বলি আমার অবর্তমানে আমার পরিবারের দেখাশোনা করতে, আর আপনি বলেন আপনার অবর্তমানে আপনার ভালোবাসার মানুষটার দেখাশোনা করতে। কি অদ্ভুত একটা সম্পর্ক আমাদের মাঝে তাই না আরমান ভাই? আমরা দুজনেই জানি আমাদের ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত তারপরও আমরা এই পথ থেকে সরতে চাই না।”
“আমি সরে যাব মুনতাসির। একটা ভালো সুযোগ বুঝে আমি সত্যিই রাজনীতির মাঠ থেকে সরে যাব। একটু শান্তিপূর্ণভাবে সংসার করা দরকার, নিজের পরিবারের সাথে সময় কাটানো দরকার। সব সময় মাথার উপর এত বাড়তি চাপ ভালো লাগে না। ছেড়ে দেবো সবকিছু। একদিন দেখবে সব ছেড়ে আরু কে বিয়ে করে গ্রামে চলে যাব।”
মুনতাসির আবারও মুচকি হাসলো। এবারে কিছু বলল না। আরমান ওর হাসির দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“কি ভেবেছো আমি ছেড়ে দেব আর তোমাকে রাজনীতি করতে দেবো? অত সোজা না। যেদিন আমি রাজনীতি ছাড়বো সেদিন তোমাকেও কান ধরে ছাড়াবো।”
মুনতাসির কিছু বলতে নিল, তবে তার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো ইরার নাম্বার। আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাই ইরা কল করেছে, একটু কথা বলে আসছি।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“হ্যাঁ বলো কথা। তোমারই দিন। তোমারই বউ আছে। আমার তো আর বউ নেই যে ফোন করবে।”
মুনতাসির কলটা রিসিভ করল। অপর পাশ থেকে ইরার উদ্বিগ্ম কন্ঠ ভেসে এলো।
“আরজুর খোঁজ জানো?”
মুনতাসিরের কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আরজুর খোঁজ জানি মানে?”
“আরে ভার্সিটি বন্ধের কারণে সবাই তো হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আরজু একা থাকবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু যাবে কোথায় ও? আমি যে ওকে আমার বাড়িতে আসতে বলবো ওর ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি। হোস্টেলে চেনা জানা যাদের নাম্বার আমার কাছে ছিল তাদেরকে কল করেছিলাম। ওরা নাকি বাড়ি চলে গিয়েছে। কেউ আরজুর খোঁজ দিতে পারল না। তুমি একটু দেখো না। আমার চিন্তা হচ্ছে মেয়েটার জন্য।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি ফোন রাখ আমি দেখছি।”
মুনতাসির ফোনটা রেখে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাই আরজুর কোন খোঁজ জানেন? কথা হয়েছে ওর সাথে?”
আরমান সোফার সাথে গা এলিয়ে দিয়ে বসেছিল। কিছু একটা ভাবছিল। আরজুর কথাই ভাবছিলো নিশ্চয়ই। এছাড়া তো আর কোন ভাবনা আজকাল তেমন একটা আসে না। তবে এ পর্যায়ে মুমতাসিরের মুখ থেকে আরজুর কথাটা শুনতেই কপালে চিন্তায় রেখা ফুটে উঠলো।
সকালের পর থেকে তো আরজুর সাথে আর কথা হয়নি। বাড়িতেই তো ছিল না। একটু আগে বাড়ি এলো। এত ব্যস্ততার মাঝে আজকাল দিন কাটছে যে তিনবেলা খাওয়ার সময়টাও ঠিকঠাক পাচ্ছে না। তাই ভেবেছিলো একটু ফাঁকা হলে তারপর আরজু কে কল দেবে।
তারপরে আবার চলে এলো মুনতাসির। এসবের মাঝে তো ভুলেই বসে ছিল। আরমান পাল্টা নিজেও চিন্তিত গলায় বলল,
“না তো। কেন কি হয়েছে?”
“ইরা কল করে বলল যে হোস্টেলের সবাই নাকি বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আরজু কে তো একা থাকতে দেবেনা। এদিকে ওর ফোনটাও নাকি বন্ধ পাচ্ছে।”
আরমানের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিয়ে আরজুর নাম্বারে ডায়াল করলো। বন্ধ দেখাচ্ছে নাম্বারটা। বেশ কয়েকবার ডায়াল করলো কিন্তু ফলাফল একই, সেই নাম্বারটা বন্ধই দেখাচ্ছে।
ভয়ে আরমানের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। বসে থাকতে পারলো না সেখানে আর এক মূহূর্ত। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরুর ফোনটা বন্ধ দেখাচ্ছে মুনতাসির। তুমি থাকো। আমি ওর হোস্টেলে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসি, না হলে শান্তি পাবো না। কে জানে কি হলো আমার পা'গ'লিটার।”
মুনতাসিরও উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাই চলুন আমিও যাই। আরজু তো সচরাচর ফোন বন্ধ রাখে না। এদিকে সবাই নাকি হোস্টেল থেকে চলেও গিয়েছে। কে জানে কোথায় আছে মেয়েটা।”