“তুই এতটা অসভ্য কি করে হয়ে গেলি তাওসিফ? তোর বিবেক বুদ্ধি সব লোপ পেল কবে থেকে? তুই একটাবার চিন্তা করলিনা যে মেয়েটার পরিবারের কাছে কি জবাবদিহি করবি?”
মহিন হোসেন কারো কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজে একাই সমানে বলে যাচ্ছে। এর মাঝে আরমান অনেক বার অনেক কিছু বলার চেষ্টা করেছে তবে সফল হতে পারেনি। কিছু বলার আগেই মহিন হোসেন ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছে।
এ পর্যায়ে গিয়ে আরমান আবারও বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে নিল তবে আবারো মহিন হোসেন সেই একই কাজ করলেন। ধমক দিয়ে বললেন,
“একদম চুপ। যা করার সেটা তো করেই এসেছিস এখন কথা বলে কি হবে। আদৌ মেয়েটার পরিবার রাজি ছিল কিনা কে জানে। তোর সাথে বিয়ে দিত কিনা সেসবও তো জানি না। এখন যদি ঝামেলা করে। গ্রামে তোর বাবার কত সম্মান, কত শ্রদ্ধা করে সবাই। তোর বিয়ের কথা গ্রামে ছড়াছড়ি হয়ে গেলে সবাই কি ভাববে বল তো?”
জেবা এবারে বিরক্ত হলো। মৃদু রাগী গলায় বলল,
“তুমি একটু থামবে। ওদেরকে কিছু বলার সুযোগ দাও।”
“ওদের কি বলার বাকি আছে আর আমাদেরই বা কি শোনার বাকি আছে। সব তো দেখছি চোখের সামনে। ওকে আদর দিয়ে দিয়ে একদম বাঁদর বানিয়ে ফেলেছি। আমিই বেশি আহ্লাদ দিয়েছি ওকে, দোষটা আমারই। এতটাই প্রশ্রয় দিয়েছি যে আজ কাউকে কিছু না জানিয়ে সোজা বিয়ে করে এনেছে।”
আরজু চেনে না এদেরকে। তার উপরে আবার বুঝতে পেরেছে আরমানের বাড়ির লোক তাই কিছু বলতে চাইছিল না। ভেবেছিল আরমানই হয়তো সবটা সামলে নিতে পারবে। তবে সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোকটাকে তো কোনমতেই সামলানো যাচ্ছে না। কেমন পা'গলের মতন প্রলাপ বকে যাচ্ছে। এতটা অযৌক্তিক ভাবনা চিন্তা কি করে হতে পারে একটা মানুষের। কোন সেন্স নেই। আগে তো শুনবে ওদের থেকে। তা না করে নিজের মন মতোই গল্প বানিয়ে যাচ্ছে। পা'গল কিনা কে জানে।
মৃদু গম্ভীর গলায় আরজু মহিন হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি কি জ্যোতিষী?”
মুহূর্তের মাঝে মহিন হোসেনের অস্থিরতা কমে গেল। চুপ করে গেলেন। হা করে কিছুক্ষণ আরজুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“না তো।”
“তাহলে আমরা কিছু না বলাতেই সব কিছু জেনে গেলেন কি করে? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় মানুষের মুখ দেখেই তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব বলে দিতে পারেন।”
আরমান নাক মুখ কুঁচকে খিঁচে দুচোখ বন্ধ করলো। বুঝতে পারলো পা'গলি খেপেছে। এবারে আর একে থামানো যাবে না।
এদিকে মহিন হোসেন আরজুর কথার আগামাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার কথা আমি বুঝলাম না। আবার বলো।”
আরজু পুনরায় গম্ভীর গলায় বলল,
“এক কথার পুনরাবৃত্তি বারবার করতে আমি পছন্দ করি না। যাই হোক, আপনি ভাবলেন কি করে এই ছেলেকে আমি বিয়ে করবো? ওনাকে কেউ বিয়ে করে নাকি।”
আরমান বিরক্ত হলো। আরজুর মাথায় হালকা করে একটা চাটি মে'রে বলল,
“এই পা'গলি চুপ। আর কাকি তুমি একটু এই ভদ্রলোক কে থামতে বলো। মাথা কিন্তু আমার ঘুরিয়ে তুললেন ইনি।”
জেবা নিজেই রাগান্বিত গলায় বললেন,
“পারবো না আমি। মাথামোটা একটা।”
মহিন হোসেন অসহায় মুখ করে সবার দিকে তাকালেন। কেউ ওনাকে কিছুই বুঝিয়ে বলছে না। উল্টো সবাই ওনাকেই দোষারোপ করছেন। কেউ পা'গল ভাবছে, কেউ জ্যোতিষী ভাবছে, তো কেউ আবার মাথা মোটা বলছে। সাহস হয় কি করে ওনার সাথে এভাবে কথা বলার সবার? উনি হলেন মেজর। একটু তো ভয় পাওয়া উচিত। মহিন হোসেন নিজের অভিব্যক্তির বদল ঘটিয়ে গুরু গভীর গলায় বললেন,
“কি হয়েছে আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলবে তোমরা?”
আরমান রাগী গলায় বলল,
“কেন বলবো? আমাদের না কিছু বলার বাকি আছে, তোমার না কিছু শোনার বাকি আছে। তুমিই তো বললে।”
“আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি তাওসিফ। সত্যি করে বল তোরা বিয়ে করেছিস?”
“না রে বাবা করিনি বিয়ে। বিয়ে করলে অন্তত তোমায় জানাবো। হ্যাঁ বাড়ি থেকে লুকিয়ে বিয়ে করার ইচ্ছে আছে তবে তোমায় তো অন্তত জানাবো। সাক্ষী তো লাগবে।”
এতক্ষণে মহিন হোসেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। যাক অন্তত এরা বিয়ে করেনি। বাকি যা ঝামেলা হয়েছে সেসব সামলে নেওয়া যাবে।
“এখন বল সমস্যা কি? ব্যাগ পত্র নিয়ে হঠাৎ চলে এসেছিস কেন?”
আরমান একটা লম্বা শ্বাস টেনে পুরো ঘটনাটা বলল এবং বলল আরজু কিছুদিন এখানে থাকবে। আরমান মুখ দিয়ে কথাটা বের করতেই আরজু তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না। আমি এখানে থাকবো না। আমি এখানে কেন থাকতে যাব? আপনি তো আমায় এসব বলে আনেননি।”
আরমান জোরপূর্বক হেসে বলল,
“আগে বললে সমস্যা হতো। আর আপনাকে এখানেই থাকতে হবে আরু। আর কোন যাওয়ার জায়গা নেই। আমাকে তো বিয়েও করবেন না যে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখবো।”
“সে তো করবোই না। কিন্তু এখানেও থাকবো না। এখানে আমি কেন থাকবো? এটা আমার বাড়ি না।”
আরমান আরজুকে আশ্বস্ত করে বলল,
“এটা আপনার বাড়ি না হলেও এখান থেকে আপনাকে কেউ বের করে দেবে না, অপমানও করবে না। চিন্তা নেই। এনারা আমার কাকা-কাকি মানে আপনার এক ধরনের শ্বশুর শ্বাশুড়ি। মানে এটা আপনার এক ধরনের শ্বশুরবাড়ি, তারমানে আপনি এ বাড়ির বউ। কয়েকটা দিন কাকির সাথে মিলেমিশে থাকুন। ঝগড়াঝাঁটি করার দরকার নেই।”
আরমানের মুখ থেকে কথাগুলো শুনতেই আরজুর কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো। আরজু এই বাড়ির বউ? এটা ওর শ্বশুর বাড়ি? আবার সামনে দাঁড়ানো এরা ওর শ্বশুর শ্বাশুড়ি, মানে কাকি শ্বাশুড়ি আর কাকা শ্বশুর?
ভাবতেই অবাক লাগলো আরজুর কাছে যে এটা ওর শ্বশুর বাড়ি। অদ্ভুত লাগলো সম্পর্ক গুলো শুনতে। এত আপন মানুষ আছে আরজুর জানতোই না। চেনেই না তো এই মানুষগুলোকে।
আরজু চুপ করে থাকলো। বেশ অনেকক্ষণ নিজে নিজেই কি সব ভাবলো। এর মাঝে আরমান মহিন হোসেনের সাথে আরো টুকটাক অনেক কথাই সারলো।
আলোচনা শেষে আরমান নিচে রাখা ব্যাগটা আবার হাতে তুলে অন্য হাতে ভাবনার জগতে ডুবে থাকা আরজুর হাতটা ধরল। তারপর সোজা ওকে একটা ঘরে নিয়ে গেল। ব্যাগটা বিছানার উপর রেখে আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি যখন কাকার বাড়িতে আসি এই ঘরটাতেই আমি থাকি। বলতে পারেন এই ঘরটা আমারই। আপনি যে কয়দিন থাকবেন, এখানেই থাকবেন। এটা আপনার ঘর।”
আরজু একবার পুরো ঘরটা ভালো করে ঘুরে দেখলো। অনেক বড় একটা ঘর। পুরো ঘরটাই ভীষণ সুন্দরভাবে গোছানো। ঘরের আসবাবপত্রগুলোও নতুন চকচক করছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস খুব দামি।
আরজুর কেন যেন অস্বস্তি হলো। এত সুন্দর ঘর, এত দামি দামি জিনিসপত্রের মাঝে থাকার অভ্যাস আরজুর নেই। গ্রামে ওদের নিজস্ব বাড়ি ছিল তবে সেই বাড়িটা তো ভীষণ সাধারন। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘর যেমন হয় তেমনি। আসবাবপত্রগুলো মোটেও নতুন ছিল না, পুরনো ছিল। যে হোস্টেলে থাকে সেখানকার পরিবেশও তেমনই, খুব সাধারণ। আর এই বাড়ির পরিবেশ একদম অন্যরকম। রাজকীয় ব্যাপার-স্যাপার লাগলো আরজুর কাছে। এই পরিবেশে আরজুর নিজেকে নিজেরই মানানসই মনে হলো না।
“আমি এখানে থাকবো না আরমান। আমায় অন্য কোথাও রেখে আসুন।”
“আমার বাড়িতে যাবেন? তাহলে চলুন বিয়েটা করে নেই। নাহলে এক কাজ করুন আপনি আমার বাড়িতে গিয়ে থাকুন, আমি এখানে থাকছি। এক বাড়িতে থাকলেও অসুবিধা নেই আমার। কেননা আমি নিজেকে নিজে ভরসা করতে পারি। তবে আপনার অসুবিধা হবে।”
আরজু কন্ঠে একরাশ অনিহা নিয়ে বলল,
“করবো না বিয়ে আপনাকে।”
আরমান অল্প একটু হেসে আরজুর গালটা টেনে দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেব।”
আরজু কপাল কুঁচকে বলল,
“আমি বলেছি করবো না বিয়ে আপনাকে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে আরু। এত বায়না করতে হয় না বিয়ের জন্য। মানুষ খারাপ বলবে। বলেছি তো খুব তাড়াতাড়ি করে নেব বিয়ে।”
আরজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ছেলেটার মাথা পুরাই খারাপ। কি সব আজেবাজে কথা বলে। কথায় কোনো যুক্তি নেই। আরমান সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলে আরজু হাতটা টেনে ধরল। কেমন অসহায় কন্ঠে বলল,
“আমায় নিয়ে যান এখান থেকে আরমান। আমি এখানে থাকতে পারবো না। এই পরিবেশটা আমার জন্য ঠিক না। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। দেখুন এই ঘরের সব কিছু কেমন দামি দামি। বিছানাটা খুব নরম। আমি পারবো না এখানে থাকতে। দেখুন এই ঘরে কত বড় একটা আলমারি, ড্রেসিং টেবিলটাও কি সুন্দর, একটা টিভিও আছে। আমি এমন জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত নই। আমি খুব সাধারন বাড়ির মেয়ে। গরিব বাড়িরও বলতে পারেন। আর এই জায়গাটা হলো বড়লোকদের জন্য।”
আরমানের খারাপ লাগলো আরজুর কথাগুলো শুনে। আরমান নিজেও জানে হুট করে অন্যরকম একটা পরিবেশে থাকতে অসুবিধা হবেই। তবে আরমানের কাছে তো আর কোনো উপায় নেই। আর কাকে ভরসা করে আরজুর দায়িত্ব দেবে। আরমান নিজে পাল্টা আরজুর হাতটা ধরে অন্য হাত আরজুর গালে রেখে বলল,
“আমার কাছে যে আর কোন উপায় নেই আরু। আপনাকে না হয় গ্রামে আমার বাড়িতেই রেখে আসতাম কিন্তু বুঝতেই পারছেন ওটা গ্রামাঞ্চল। পাঁচ লোকে পাঁচটা কথা বলবে। আমি চাইনা কোন নোংরা কথা হোক আমাদের বিষয়ে। আবার এদিকে আপনি বিয়েও করবেন না। কি করি আমি বলুন তো?”
আরজু বুঝতে পারলো আরমানের অসহায়ত্ব। সত্যি আরমান নিরুপায়। আরজু কে যে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে তার জন্যই তো কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
না আর কোন কথা বলা ঠিক হবে না। তবে প্রশ্ন এখনও একটা থেকেই যাচ্ছে আরমান কি এখানে থাকবে, না চলে যাবে? চলে গেলে কি খোঁজ নেওয়ার জন্য আর আসবে না?
“আপনি কি এখানেই থাকেন?”
“না। আমার নিজের ফ্ল্যাট আছে আমি ওখানে থাকি। মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকা হয় তবে খুব কম। রাতে অন্তত থাকি না।”
“তারমানে দেখা হবে না আর আপনার সাথে? আপনি তো একবার গেলে আর খোঁজ থাকে না। নিশ্চয়ই আবার ব্যস্ততায় ভুলে যাবেন।”
আরমান নিজের হাতটা আরজুর গাল থেকে সরিয়ে মাথায় রেখে বলল,
“যাব না ভুলে। আমার কাকি খুব ভালো। আমার মায়ের সাথে পরিচয় করিয়াছিলাম না একদম আমার মায়ের মত। আমার কাকাও খুব ভালো। আসলে আমি অনেক ঝামেলা করি তো সেজন্য প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তবে দেখবেন আপনাকে খুব আদর করবে। আপনার কোন অসুবিধা হবে না এখানে। আর যদিও বা হয় সব ঠিক করার জন্য আমি তো আছি।”
আরমানের এতগুলো কথার প্রেক্ষিতে আরজু শুধু একটা বাক্যই বলল,
“আপনি যাবেন না।”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“আমি রাতে যাব, সারাদিন এখানেই থাকবো আর যদি কোন কাজ পড়ে যায় তখন যেতে হবে।”
“থেকে যান না।”
আরজু যেন একটু জেদ দেখিয়েই কথাটা বলল। আরমানের ভালো লাগলো। মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনের আরজুকে।
আরমান বুঝতে পারে সেই প্রথম দিনের আরজুর সাথে আজকের আরজুর পার্থক্যটা অনেক। কত পরিবর্তনে এসেছে আরজুর মাঝে। যে আরজু এক সময় আরমানের দিকে তাকানোরও প্রয়োজন মনে করতো না, আরমানের নামটা অব্দি কখনো জিজ্ঞেস করেনি আজ সেই আরজু কিনা আরমানের সাথে জেদ করছে! ব্যাপারটা সুন্দর।
তবে চাইলেও আরমানের থাকার উপায় নেই। জানে মহিন হোসেন জীবনেও ওকে থাকতে দেবেনা। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
“থাকতে পারবো না পা'গলি। থাকতে দেবে না আমাকে। আমার সব থেকে ভালো বন্ধু যেমন আমার কাকা ঠিক তেমনি আমার জীবনের সবথেকে বড় শত্রুও আমার কাকা। জীবনেও আমায় থাকতে দেবে না।’
আরজু কন্ঠে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তাহলে ওনাকে বের করে দিন। ওনাকে বলুন আপনার বাড়িতে চলে যেতে।”
আরমান শব্দ করে হেসে উঠলো। আরজুর এলোমেলো চুলগুলো হাতের সাহায্যে আরেকটু এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
“পা'গলিটা আমার প্রেমে পড়ে গেছে।”
________
আরজু কে ফ্রেশ হতে বলে আরমান বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। ড্রইংরুমে দেখল মহিন হোসেন বসে আছে। ভ্রুঁ কুঁচকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আরমান খুব একটা বেশি পাত্তা দিল না। সরাসরি রান্না ঘরে গেল জেবার কাছে। ক্ষুধা লেগেছে। সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি তাই খাবার দিতে বলল। আসার সময় ফ্রিজ থেকে একটা আপেল বের করে সেটা খেতে খেতে এলো। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে মহিন হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি সমস্যা তোমার? ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন? বললাম তো করিনি বিয়ে।”
“সমস্যা তো ওখানেই। এতক্ষণ কি করছিলি ওই ঘরে?”
আরমান নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ছিঃ কাকা লজ্জা করে না ভাইপোকে এসব প্রশ্ন করতে? প্রেম তো তুমিও করেছো, তবে এত ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন আমায়?”
মহিন হোসেন সত্যি একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন। কেমন ঠোঁট কাটা হয়ে গেছে আরমান। তবে কন্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বললেন,
“তোর কাকিকে বাড়িতে এনে প্রেম করিনি আমি, বাইরে করেছি। “
“তো বাইরে এখন ঝামেলা চলছে। আরু কে নিয়ে আমার ঘুরে বেড়ানোটা ঠিক হবে না সেজন্য এখানে এনে রাখলাম বুঝতে পেরেছো। আর শোন, ওই যে ঘরটা বন্ধ পড়ে আছে ওটা পরিষ্কার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করো তো। আমি ওখানে থাকবো।”
আরমানের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে মহিন হোসেন গর্জে উঠে বললেন,
“কক্ষনো না। তুই এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের হবি। আরজু যতদিন ইচ্ছে থাকতে পারে তবে তোর ততদিন যেন এই বাড়িতে আনাগোনা আমি কম দেখি। রাতে তো কোনো মতই থাকতে দেবো না।”
আরমান বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আমরা কি এক ঘরে থাকছি? আমি কি বলেছি আমি আরুর ঘরে থাকবো? আলাদা ঘরে থাকবো তো।”
“এই বাড়ির ছাদেও তোর জায়গা হবে না। খাওয়া দাওয়া করে বের হ বাড়ি থেকে।”
আরমান এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“আসলে তুমি এখনও আরু কে চিনতে পারোনি জন্য ভয়টা পাচ্ছো কাকা। তুমি যেটা ভাবছো সেটা কখনোই সম্ভব না। আমি যদি ওর ঘরে ঢোকার চেষ্টা করি ও এমনই মেয়ে একটা লা'থি মে'রে আমাকে বের করে দেবে।”
“তাই করা উচিত। তবে তাওসিফ তুই থাকবি না রাতে এখানে।”
আরমান বুঝলো থাকা অসম্ভব। আরজুর অনুরোধটাও রাখতে পারবেনা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“যেদিন তুমি প্রেমে পড়বে সেদিন তোমাকে বোঝাবো কাকা প্রেমিকার থেকে দূরে থাকতে কি কষ্ট হয়।”
_________
হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ না করতেই ফিরোজ চলে এসেছে। এত ওষুধ পত্রের দরকার পড়ে না ফিরোজের। একটা সেলাই পড়েছে পেটে ওই যথেষ্ট। র'ক্ত তো আর বের হয়ে আসছে না। বাকি যা ব্যথা করে সেসব সহ্য করা যাবে। আর খুব বেশি ব্যথা করলে একসঙ্গে কয়েকটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে পড়ে থাকবে বিছানায়।
বাড়ি ফিরে আগে প্রার্থনা কে হুকুম করলো ভাত দেওয়ার জন্য। বলল যেন একটু ঝাল ঝাল করে গরুর মাংস রান্না করে। কয়েকদিন সুপ খেতে খেতে মুখের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে। তার উপরে আবার এক বস্তা করে ওষুধ।
ফিরোজ ফ্রেশ হয়ে এসে রান্নাঘরে দেখলো প্রার্থনা রান্না করছে। কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে বলল,
“তোর জায়গায় আরজু হলে বি'ষ মিশিয়ে দিতো প্রার্থনা আর তুই সেখানে সামান্য ঝাল মেশাতে পারছিস না? পুরো লঙ্কার গুড়োর কৌটোটা ঢেলে দে।”
“আমি তো আর তোমাদের মতন অমানুষ না। অসুস্থ তুমি, এত ঝাল খাবার খাওয়া হবে না।”
“খুব বেশি হলে কি হবে, ম'রবো। শান্তি পাবি তুই।”
প্রার্থনা আলতা হেসে বলল,
“আমার শান্তি চাও তবে তোমার ভাইকে গিয়ে খু'ন করে রেখে এসো। ও ম'রলেই আমি শান্তি পাব। যেদিন কাফনে মোড়ানো ওর মুখটা দেখব সেদিনই আমি শান্তি পাবো।”
ফিরোজ চমকালো। প্রার্থনের কথাবার্তায় কেমন আরজুর ছোঁয়া পাওয়া গেল। আগে তো এমন ভাবে কথা বলতো না প্রার্থনা। হঠাৎ করে কি হয়ে গেল?আরজুর সাথে একবার ফোনে কথা বলেই প্রার্থনার মাঝে এতটা পরিবর্তন এসে গেল! কি এমন মন্ত্র শুনিয়েছে আরজু প্রার্থনা কে!
“তোর ফোনটা নিয়ে আয় তো।”
প্রার্থনা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেন? আমার ফোন দিয়ে তুমি কি করবে?”
ফিরোজ কৌতুকপূর্ণ গলায় বলল,
“আমার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতালে কল দিয়ে বলবো ফাহিম কে স্যালাইনের মাঝে যেন বি'ষ মিশিয়ে দিয়ে মা'রে। তোর পিরীতের সোয়ামি কে মা'র্ডা'র করার ব্যবস্থা করছি। যা নিয়ে আয়।”
“তুমি যে এতটা ভালো না সেসব আমি জানি। কি করবে সোজাসুজি বলো?”
“তুই কি একটু বেশি তেজ দেখাচ্ছিস না প্রার্থনা? মাথা গরম করিস না। কখন চ'ড় লাগিয়ে দেবো বুঝতেও পারবি না। ফোন নিয়ে আয় যা। আমার ফোন নষ্ট হয়ে গেছে, একটা দরকারি কল করতে হবে।”
ফিরোজের ঝারি খেয়ে আর কিছু বলার সাহস হলো না প্রার্থনার। ফোনটা নিয়ে এলো।
ফিরোজ কল লিস্ট ঘেঁটে দেখলো একটা মাত্রই নাম্বার থেকে কল এসেছে যে নাম্বারটা সেভ করা নেই। সময়টা দেখেই ফিরোজ বুঝতে পারলো এটাই আরজুর নাম্বার।
আবারো প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ব্যালেন্স আছে ফোনে?”
প্রার্থনা ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“আছে।”
ফিরোজ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“কে টাকা তুলে দিল? প্রেম করছিস নাকি? ও বিয়ের পরে করলে তো প্রেম না পরকীয়া হয়।”
প্রার্থনা ঠেস দিয়ে বলল,
“আমার চরিত্র তোমার আর তোমার ভাইয়ের মতো না। ফারিহা দিয়েছিল।”
“ও আম্মা দিয়েছে। তাহলে ঠিক আছে।”
ফিরোজ আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে আরজুর নাম্বার ডায়াল করলো।
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে জেবা এসেছিল আরজুর ঘরে। টুকটাক একটু গল্প করলো। এখন একটু অস্বস্তি কম হচ্ছে আরজুর। জেবা অনেক ভালো তবে মহিন হোসেন কে এখনো অতটা পছন্দ হয়নি আরজুর। আরমানও চলে গেছে। একটু আগে জেবাও চলে গেল ঘর থেকে।
আরজু দরজাটা বন্ধ করে ঘুমোতে ধরেছে এর মাঝে ফোনটা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখলো স্ক্রিনে প্রার্থনার নাম্বারটা ভাসছে।
আরজুর সন্দেহ হলো। বলা যায় অনেকটা যেন নিশ্চিত হতে পারল যে এটা প্রার্থনা কল করেনি। কেননা আরজু জানে প্রার্থনা সবসময় চায় আরজু যেন নিরাপদে থাকে। আর এখন রাত অতটা বেশিও হয়নি যে প্রার্থনা বাড়ির সবাইকে লুকিয়ে কল দেবে।
এত কিছু আন্দাজ করার পরও আরজু কলটা কেটে দিলে না, ফোনটাও বন্ধ করলো না। বরং রিসিভ করল।
কানে ধরে অপর পাশের ব্যক্তিটা কে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে নিজেই বলে উঠলো,
“ম'রি'সনি তাহলে?”
ফিরোজ অবাক হলো এটা ভেবে যে আরজু কি করে ধরে ফেলল ওকে। আরজুর তুই সম্বোধন আর কথাটা শুনেই তো বুঝতে পারল যে আরজু ফিরোজকেই সন্দেহ করেছে। প্রার্থনা কে তো কখনোই এই কথাটা বলবে না। আরজু একমাত্র মৃত্যু কামনাই করে ফিরোজের।
অবশ্য অবাক হওয়াটাও বোধহয় ফিরাজের উচিত হয়নি। আরজুর থেকেই এমনটা আশা করা যায়। মেয়েটা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। ফিরোজ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“তোর ভালোবাসা আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে আরজু। আবার মা'র'লে তোর ভালোবাসাই হয়তো আমায় মা'র'বে।”
চমকে উঠল প্রার্থনা। রান্নার হাতটা থেমে গেল। বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো ফিরোজের দিকে। ফিরোজ খেয়াল করলো প্রার্থনা কে। হালকা একটু ঝাড়ি মে'রে বলল,
“আমার হবু বউ কে কল করেছি, তুই এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? চুপচাপ রান্না কর। খিদে পেয়েছে।”
প্রার্থনা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“তুমি আরজুকে ফোন করেছো? ওর নাম্বার কোথা থেকে পেলে?”
“এই ঢং করার দরকার নেই। হাসপাতালে আমাকে দেখতে গিয়ে যে কতক্ষণ বোনের সাথে গল্প করলি কি ভেবেছিস আমি টের পাইনি? তুই আরজু না প্রার্থনা, কখনো আরজু হতেও পারবি না। অযথা এসব লুকোনোর চেষ্টা করিস না। রান্না করতো। যদি মাংস খেতে খারাপ হয়েছে তবে আজ আমার হাতে সত্যি একটা চ'ড় খাবি।”
ফিরোজের কথাটা আরজুর কানে গেল। ফোনের অপর পাশ থেকেই ঝাঁঝালো গলায় হুমকি দিয়ে বলল,
“তোর কলিজা কিন্তু আমি টেনে বের করব ফিরোজ যদি আমার আপার গায়ে হাত দিয়েছিস তো।”
ফিরোজের একটুও রাগ লাগলো না বরং বেশ ভালো লাগলো। হুমকি দেক তবুও তো কথা বলেছে! কতদিন পর আরজুর কন্ঠটা শুনলো। খুব ভালো লাগলো।
বেশ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“বেশ আমার কলিজাই বের করিস। দেখতে পাবি ওখানে শুধু তোর নাম লেখা আছে। তবে যদি তোর বিশ্বাস হয় আমার ভালোবাসায়।”
আরজু ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,
“তোর কলিজা যদি আমি হাতে পাই না তবে খুব যত্নে একটা একটা করে সেখানে পেরেক পুঁতবো যেন তুই বুঝতে পারিস আমাকে ভালোবাসার পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তোর জন্য। এত কথা না বাড়িয়ে বল ফোন কেন করেছিস?”
“হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম একবার দেখতে এলি না যে? ওষুধ পত্র খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি আরজু। সেলাইয়ের কাছটা কেমন যেন জ্বলছে আর ব্যাথা করছে। হাত পা ব্যথা।”
“বেঁচে আছিস কি করে? এত আঘাত পাওয়ার পরেও ম'রিস না কেন তুই? কই মাছের প্রান তোর বলতেই হচ্ছে।”
কন্ঠে একরাশ বিস্ময় প্রকাশ পেল আরজুর। বারবার মনে এই প্রশ্নটা আসে এত কিছু সহ্য করে কি করে ফিরোজ বেঁচে আছে? ম'রে না কেন? কত আয়ু লিখে রেখেছে সৃষ্টিকর্তা ওর?
তবে আরজুর এবারের বলা কথাটায় কষ্ট পেল ফিরোজ। যদিও কষ্ট পাওয়া উচিত না। কেননা বরাবরই আরজু ওর মৃ'ত্যু কামনা করে এসেছে। তবে তাও কষ্ট হলো।
“এভাবে মৃ'ত্যু কামনা করিস না আরজু। কোন একদিন আমি না থাকলে হয়তো আফসোস করবি। এটাতো তুই অস্বীকার করতে পারিস না যে আমার জন্য অনেকগুলো নোংরা হাত থেকে তুই আর প্রার্থনা বেঁচে গিয়েছিস। তুই এটাও অস্বীকার করতে পারিস না যে শুধুমাত্র আমার ভয়ে তোর বাপ আর ভাইয়ের অমানবিক নির্যাতন থেকে বেঁচে গিয়েছিস। বল পারবি অস্বীকার করতে?”
“শোন ফিরোজ, আ'গুনের মাঝে ফেলে দিয়ে যদি তুই পু'ড়ে যাওয়ার পর উপর থেকে পানি ঢালিস তবে তার কোন মূল্য থাকে না। আশা করছি আর কিছু বোঝাতে হবে না আমায় তোকে। ফোন রাখ। আর মনে রাখিস আমার আপার গায়ে যেন হাত না ওঠে তোর।”
“তুই কষ্ট পাবি? একবার বল তুই কষ্ট পাবি তাহলেই মা'রবো না, কাউকে মা'রতেও দেবো না। শুধু তুই বল তুই কষ্ট পাবি।”
আরজু বিরক্তিকর গলায় বলল,
"জানা কথা আবার জানতে চাইছিস কেন? শুধু কষ্টই পাবো না ভীষণ রাগও হবে। আর সেই রাগ এতটাই ভয়ঙ্কর হতে পারে যে তোকে মা'রতেও হাত কাঁপবেনা আমার। তোর প্রতি আমার একটা কৃতজ্ঞতা থেকে গেছে যার জন্য এতদিনেও তোকে খু'ন করিনি আমি। শুধু অপেক্ষা করছি কোন দিন তুই আমার কৃতজ্ঞতার সীমা পেরিয়ে যাবি। যেদিন তোর অপরাধের বোঝা গুলো আমার কৃতজ্ঞতার থেকে ভারী হয়ে যাবে সেদিন তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।”
ফিরোজ এবারে হো হো করে হেসে উঠলো। আরজুর সহ্য হয় না ফিরোজের হাসি। গা জ্বলে ওঠে, ঘিনঘিন করে গা। ইচ্ছে করে গলা টিপে মে'রে ফেলতে।
তবে ফিরোজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রার্থনার কাছে ফিরোজের হাসিটা অদ্ভুত লাগলো। খুব অল্প কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো ফিরোজ খুব গভীর একটা কষ্ট থেকে হাসছে। তবে সহানুভূতি দেখানো যায় না ফিরোজের উপর। ফিরোজের পাপের বোঝা যে অনেক ভারী।
ফিরোজ কে অনবরত হাসতে দেখে আরজু প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“হাসছিস কেন অমানুষের মতন? তোর হাসির শব্দ আমার সহ্য হয় না। মনে হয় কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে।”
ফিরোজের হাসি থামলো না বরং হাস্যজ্জ্বল গলাতেই বলল,
“শালা ভালোবাসায় প্রেমিক হয়ে যায় কুত্তার লেজের মতন। প্রেমিকা যতই বাঁশ দিক না কেন তবু ওই বাঁকা লেজ সোজা হবে না। ঘুরে ফিরে আবার প্রেমিকার পিছনেই যাবে। তোর মাঝে কি এমন আছে আরজু বলতো যেটা আমাকে বারবার তোর পিছনে ছুটে যেতে বাধ্য করে? তুই কুকুর বললি আমাকে তবুও তোর মুখ থেকে কুকুর ডাকটা শুনতেই ভালো লাগলো। শালা এই ভালোবাসার মাঝে আছেটা কি? শালা কি করলে তোকে পাব?”
আরজু আলতো হেসে বলল,
“আমাকে তো তুই কখনোই পাবি না। আছে তো অনেক কিছুই ভালোবাসার মাঝে। তবে তোর বোঝার ক্ষমতা নেই। তুই মানুষ হতে পারিসনি ফিরোজ। মানুষ হলে তবে না বুঝবি ভালোবাসার মাঝে কি আছি।”
ফিরোজের হাসিটা এবারে বন্ধ হয়ে গেল। কাতর গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার হয়ে যা আরজু, কথা দিচ্ছে আমি আবির হয়ে যাব।”
আরজু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তুই আবির হয়ে গেলেও ফিরোজ হিসেবে তোর গায়ে যে কলঙ্কের দাগগুলো লেগেছে সেগুলো কোনদিনও মুছতে পারবি না। বরং যদি তুই আবির হয়ে থাকতি তবে হয়তো আমি সত্যি কোন একদিন তোর হতাম। তবে তোর এখনকার ফিরোজ সত্তাটাকে আমি কোনদিনও না ভুলতে পারবো, না ক্ষমা করতে পারব। আর সেই আগের আবির তো ম'রে গেছে। আমি নিজে তাকে কবর দিয়েছি।”
কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিল আরজু। আরজুর আর মনে পড়লো না ফিরোজের কথা। শুধু চিন্তা হলো প্রার্থনার জন্য। তবে আশা করা যাচ্ছে মা'রবে না ফিরোজ ওকে। শুধু ভয় দেখালো বোধ হয়।
কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ফিরোজ সেটা প্রার্থনার দিকে বাড়িয়ে দিল। প্রার্থনার নরম কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ফিরোজের কানে।
“তোমার ম'রার কথা বলল তাই তো?”
ফিরোজ হাসলা। বৃদ্ধাঙ্গুল এর সাহায্যে চোখের কোনে জমা হওয়া জলটুকু মুছে নিয়ে বলল,
“আরজু বলল আমি যদি আবিরই থাকতাম তবে হয়তো কোনদিন ও আমার হয়ে যেত। তোরা কেউ কখনো বুঝলি না আমি কেন ফিরোজ হলাম। আবির থেকে ফিরোজ হওয়ার যাত্রাটায় আমার নিজের কতটা কষ্ট হয়েছে তোরা কেউ বুঝলি না প্রার্থনা। তোরা শুধু এই ফিরোজকে ঘৃণাই করে গেলি। অথচ আমি নিজে যে আমার এই ফিরোজ সত্তাটাকে কতটা ঘৃণা করি সেটা কেউ কখনো বুঝলি না তোরা।”
প্রার্থনার খারাপ লাগলো। ওইযে প্রার্থনার মনটা আরজুর মতন কঠিন না, নরম মন। কারো অল্প একটু কষ্ট দেখলে খারাপ লাগে। সেখানে প্রার্থনা যে ফিরোজের পুরনো আবির রুপটা কে ভীষণ ভালোবাসে, শ্রদ্ধাও করে। তবে ফিরোজ সত্তাটাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। আর যখনই পুরনো আবিরের কথাটা মনে হয় খুব কষ্ট লাগে।
“তোমায় ফিরোজ হতে কেউ কখনো বাধ্য করেনি। তুমি নিজের ইচ্ছেতে হয়েছো, ক্ষমতার লোভে হয়েছো। ভুল বললাম কি?”
“না ভুল বলিস নি। ক্ষমতার খুব দরকার প্রার্থনা। অন্তত আমার খুব দরকার ছিল। তুই ভেবে দেখ মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে একটু খাবার ভিক্ষে করতাম সেখান থেকে এখন আমার বাড়িতে খাবারের অভাব নেই। দেখ তুই গরুর মাংস রান্না করছিস। কত দামি একটা জিনিস। তুই বল ক্ষমতার কি দরকার ছিল না?”
“ক্ষমতার বেশি দরকার ছিল নাকি আরজুর? এই প্রশ্নের উত্তরটা দাও।”
থেমে গেল ফিরোজ। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল সত্যিই তো কোনটার বেশি দরকার ছিল ক্ষমতার নাকি আরজুর। দুটোরই দরকার ছিল তবে গুরুত্ব বোধহয় ক্ষমতার পিছনে বেশি দিয়েছে যার ফলে আরজু হারিয়ে গেল। ফিরোজের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে প্রার্থনা পুনরায় বলল,
“কি হলো উত্তর দাও।”
ফিরোজের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আনমনে বলে উঠলো,
“যে মুহূর্তটায় ক্ষমতার দরকার ছিল সেই মুহূর্তটা তে আরজু কে দরকার ছিল না। এখন আরজুকে দরকার, ক্ষমতা গেলে যাক। তবে বল কি বুঝলি? কোনটার বেশি দরকার ছিল?”
প্রার্থনা একটু হেসে বলল,
“তবে বলবো তোমার আরজুকে কখনোই বেশি দরকার ছিল না। তুমি বরাবরই ক্ষমতার পিছনে ছুটেছো। তুমি বলছো আরজু তোমার হলে তুমি আবার আবির হয়ে যাবে। তবে আগে তুমি আবির হয়ে ওকে দেখাও।”
ফিরোজ নির্জীব হেসে বলল,
“তাও ফিরবেনা। যে আরজুর কন্ঠে ভালোবাসা নিয়ে একসময় তীব্র ঘৃণা ছিল আজ সে আমাকে বলল ভালোবাসার মাঝে অনেক কিছু আছে। তার মানে বুঝলি? ও প্রেমে পড়েছে। ভালোবেসে ফেলেছে অন্য কাউকে। ও স্বেচ্ছায় আমার হবে না। জোর করে দেখি আমার করা যায় কিনা।”
__________
সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুঁয়ে ঘর থেকে বেরোলো আরজু। দেখলো সোফায় জেবা বসে আছে। চোখে মুখে তার চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। কোথাও মহিন হোসেন কে দেখতে পেল না।
দরজাটা খোলা, বোধহয় বেরিয়ে গেছে। তবে দরজা বন্ধ করেনি কেন? টিভিও চলছে। টিভিতে খবর দেখাচ্ছে। ওদের ভার্সিটির ঝামেলার খবরই দেখাচ্ছে। তবে এসব ঝামেলার ব্যাপারে আরজুর কোন আগ্রহ নেই তাই সেদিকে মনোযোগও দিলো না।
এগিয়ে গিয়ে জেবা কে প্রশ্ন করল,
“আন্টি আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে যে? কিছু হয়েছে কি?”
আরজুর কণ্ঠে জেবার ধ্যান ভাঙলো। চিন্তিত গলাতেই বলল,
“তুমি তো মনে হয় জানো না কিছু তাই না আরজু?”
কি জানার কথা বলছে আরজু তো সেটাই জানে না। ফলস্বরুপ বলল,
“না তো।”
জেবা এবারে কেঁদে ফেললেন। হঠাৎ করে ওনার কান্নার কারণটাও আরজু ধরতে পারল না। গুটি গুটি পায়ে গিয়ে জেবার পাশে বসে বললেন,
“কি হলো আন্টি কাঁদছেন কেন? আরমানকে কল করবো? কোন ঝামেলা হয়েছে কি?”
জেবা ক্রন্দনরত গলাতে বলল,
“ছেলেটাকে কি করে কল করবে? ছেলেটাকেই তো আমার ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। সকালে উঠে খবরে শুনি ওকে নাকি পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।"