ফুটপাতের উপর বসে আছে ফিরোজ। তার কোন খেয়াল নেই যে আশেপাশের পরিবেশ কতটা ধুলো ময়লাযুক্ত। ফুটপাতের চারপাশে কোথায় কি পড়ে আছে সেসবেরও খেয়াল নেই। শরীরটা আর দাঁড়িয়ে থাকা আর শক্তি দিচ্ছে না। তাই চুপচাপ বসে পড়েছে ফুটপাতে। ওর পাশে ফারিহা কে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রার্থনা। চোখে মুখে একটা তীব্র উৎকণ্ঠা। বারবার ভাবছে আরজু কি আসতে পারবে? এখন তো আর ও আগের মতন নেই। আরজুর বিয়ে হয়ে গেছে, ওর সংসার আছে। ওর স্বামী, শ্বশুর বাড়ির লোকজন কি আসতে দেবে আরজুকে? আর তাছাড়া যদি এসেও যায় তাহলে প্রার্থনাদের নিয়ে যাবে কোথায়?
প্রার্থনার এসব ভাবনার মাঝেই ওদের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়ালো। সবার মনোযোগ গিয়ে স্থির হলো গাড়ির উপর। গাড়িটা থামতেই তাড়াহুড়ো করে নামলো আরজু। আর ড্রাইভিং সিট থেকে নামলো আরমান। প্রার্থনা কে দেখতেই আরজু সেদিকে ছুটে গেলো। আগে জড়িয়ে ধরল ওকে, প্রার্থনাও পাল্টে জড়িয়ে ধরলো।
“আপা ঠিক আছো তুমি?”
আরজুর কন্ঠে সামান্য প্রশ্নটা শুনেই প্রার্থনা কেঁদে ওঠে বলল,
“আমি ঠিক আছে। আর তুই ঠিক আছিস?”
“হ্যাঁ আমিও ঠিক আছি।”
ওদের কথাবার্তা শেষে কিছুক্ষণ পর ফারিহার সাথে কথা বলল আরজু। তবে ওদের পাশে যে ফুটপাতের উপরে ফিরোজ বসে আছে সেদিকে একবারও নজর দিলো না। তবে আরমানের নজর পড়েছে ফিরোজের উপর।
আরমান খেয়াল করলো ফিরোজ কেমন অসহায় দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে আছে। তবে আরজু একটা বারের জন্যও ফিরোজের দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না। একটাবার সামান্য কৃতজ্ঞতা বোধ পর্যন্ত দেখাতে ইচ্ছে হলো না। আরজু প্রার্থনা আর ফারিহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চলো বারি যাই।”
কথাটা বলতেই ফুটপাতের উপরে বসা ফিরোজ অসহায় গলায় বলে উঠলো,
“আমি কি এতটাই নিকৃষ্ট যে আমার দিকে একটাবার তাকানো যায় না? মানলাম তুই পবিত্র, আর আমি তোর তুলনায় অনেক নিকৃষ্ট, তাই বলে কি আমার দিকে একবার তাকনোও যায় না? একটাবার যদি একটু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিস তবে কি তোর জাত যাবে?”
থেমে গেল আরজু। হাসাহাসি মুখটা হঠাৎ করে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠল। সত্যি বলতে এমনটা নয় যে ইচ্ছে করে আরজু ফিরোজকে অবজ্ঞা করছিল, আসলে ফিরোজের কথা মনেই নেই আরজুর। এখানে আসার পর ফিরোজকে চোখেও পড়ে নি। শুধু সামনে দেখেছে ওর আপাকে আর কিছু দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।
আরজু তাকালো একবার ফিরোজের দিকে। এতক্ষণে ফিরোজ খুব ভালোভাবে আরজুকে দেখার সুযোগ পেল। আরজুর পড়নে একটা সুতি শাড়ি, কানে সোনার ছোট্ট একটা ঝুমকো, হাতে চুড়ি, নাকে একটা নাকফুল। সব মিলিয়ে যেন আরজুর চেহারার মাঝে নববধূ রূপটা খুব ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। ফিরোজ যেন বুঝতে পারলো আরজু আগের থেকেও আরো অনেক বেশি সুন্দর হয়েছে। আরজুর চেহারার উজ্জ্বলতাও বৃদ্ধি পেজ আর্য সৌন্দর্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে আরজুর মুখের হাসিটা।
ফিরোজ আনমনে হেসে উঠে বলল,
“বউ বেশে তোকে দারুন মানিয়েছে আরজু।”
আরজু গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো,
“আর কিছু বলবি? আর কিছু বলার আছে তোর?”
“বলার তো অনেক কিছু আছে, বলার অনেক কিছু ছিল আর ভবিষ্যতেও বলার জন্য অনেক কিছুই থাকবে। তবে শোনার জন্য তো তুই থাকবি না, আর না তোকে বলে কোন লাভ হবে।”
“তাহলে তোকে একটা সহজ সমাধান বলি, আমাকে কিছু বলিসই না। আর তুই একদম ঠিক বলেছিস, তোর আমাকে কিছু বলা না বলা আমার কাছে দুটোই এক।”
আরমানের মনে হলো আরজুকে এখান আর বেশি কথা বলতে দেওয়াটা ঠিক হবে না। কেননা ফিরোজকে দেখে আরমানের মনে হচ্ছে না, ও এইখানে কোন ঝামেলা করতে এসেছে। যদিও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না, আবার হঠাৎ করে প্রার্থনা কে ফিরিয়ে দেওয়া ব্যাপারটাও আরমানের কাছে কেমন যেন একটু ঘোলাটে লাগছে। আরজু হাত ধরে ইশারায় চুপ করতে বলে নিজে ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“হঠাৎ করে আপাকে নিয়ে আসার কারণটা কি জানতে পারি ফিরোজ? যদি তোমার আপাকে আরুর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ারই ছিল তবে অযথা ঐ নরকের মতো জীবনে বেঁধেছিলে কেন?”
ফিরোজ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“যেই জীবনে বেঁধেছিলাম সেই জীবনে শেষ। ওর স্বামী তো ম’রে গেছে, তবে ওকে ঐ জীবনে বেঁধে রেখে কি করবো আমি?”
আরজু চমকে উঠলো। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“ফাহিম ম’রে’ছে?”
“হ্যাঁ। কেন তোর বোন বলে নি তোকে?”
“না তো, আপা কবে ম’রেছে ফাহিম? তুমি তো আমায় কিছু বলোনি। আমার তো তোমার সাথে কথা হলো এর মাঝে।”
প্রার্থনা একটু থতমত খেলো আরজুর প্রশ্নের উত্তরটা দিতে গিয়ে। কি বলা উচিত আসলে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ইচ্ছে করেই তো আরজুকে বলেনি। এখন আবার যদি মিথ্যে বলতে যায় তাও হয়তো তোতলাতে গিয়ে ধরা খেয়ে যাবে। ফিরোজ সেসব বুঝতে পারল। পরিস্থিতির সামাল দেয়ার উদ্দেশ্যে নিজ থেকে আরজুকে বলে উঠলো,
“প্রার্থনা তো ভুলো মনা। নিশ্চয়ই ভুলে গিয়েছিল বলতে। যাইহোক, আরজু তোকে কিছু বলার আছে আমার। জানি তোকে কখনো কিছু দিতে পারিনি আমি, তবে তোর থেকে আজ আমার কিছু চাওয়ার আছে। খালি হাতে ফিরিয়ে দিবি না তো? ভয় পাসনা তোকে চাইবো না, খুব ভালো করে বুঝতে পারছি তুই আর আমার নেই, হয়তো কখনো ছিলিও না।”
কথাটা বলে ফিরোজ ফারিহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মা তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো।”
ফারিহা কোনো কথা বাড়ালো না। বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ গিয়ে গাড়িতে বসলো।
এদিকে আরজুর মায়া হলো না ফিরোজের জন্য। ওর কন্ঠের কাঁতরতা কিংবা ওর চোখ মুখে ভেসে ওঠা অসহায়ত্ব দেখেও বিন্দুমাত্র মায়া হলো না। একটু খারাপ লাগাও কাজ করলো না।
আরজুর কাছে ফিরোজের অনুভূতির কখনো মূল্যই ছিল না। বরাবরই আরজুর কাছে ফিরোজের ভালোবাসার সবটাই মিথ্যে মনে হতো। কেন না আরজুর মতে, যদি ফিরোজ সত্যি ওকে ভালোবাসতো তবে অন্য কোন নারীর শরীরের লোভে তার কাছে ছুটে যেতনা দিনের পর দিন। আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“বেশ দেবো। তবে চাওয়ার আগে একটা কথা শুনে রাখ, তুই যেমন জানিস আমাকে চাইলে কখনোই পাবি না, তাই এমন কোন কিছু চাস না আর।”
ফিরোজ আলতো হেসে বলল,
“চাইবো না। আসলে তুই তো এটা জানিস আমার জীবনটা স্বাভাবিক না। আমার জীবনের তেমন একটা নিশ্চয়তা নেই, তবে আমার ইচ্ছে জানিস তো আমার আম্মাকে খুব ভালোভাবে মানুষ করার। তুই ওকে একটু দেখে রাখিস। একা প্রার্থনার উপর ভরসা করতে পারব না। ও তো নিজেকেই সামলাতে পারে না, আমার আম্মাকে কি সামলাবে। তুই ওকে একদম তোর মতন করে মানুষ করিস, প্রার্থনার মত দুর্বল বানাস না। ভালো কিছু একটা বানাস ওকে। তারপর খুব ভালো কারো একটা সাথে বিয়ে দিয়ে দিস।”
“তার মানে কি বলতে চাইছিস তুই ম’রবি খুব তাড়াতাড়ি? তা কবে ম’রছিস? আমাকে খবরটা পাঠানোর ব্যবস্থা করিস কিন্তু, অপেক্ষায় থাকবো।”
আরজুর এই কথাটা কেন যেন আরমানের একটুও পছন্দ হলো না। উপকার তো করেছে ফিরোজ আরজুর। হ্যাঁ, আরমান এটা বলবে না যে ফিরোজ ভালো মানুষ, তবে যেমনই হোক আরজুর জন্য তো খারাপ ছিল না। অনেকবার অনেক কিছুর হাত থেকে আরজুকে বাঁচিয়েছে। কৃতজ্ঞতা আছে আরজুর ওর উপরে। তবে কিভাবে এমন নির্দয়ের মতন যখন তখন ওর মৃ’ত্যু চেয়ে বসে? এতটা পাথর হৃদয় কেনো আরজুর?
আরমান অসন্তুষ্ট গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরু, এই কথাগুলো বাদ দিন। যদি কোন দরকারি কথা থাকে সেগুলো বলুন।”
“আমার ওর সাথে কোন দরকারি কথা নেই আরমান। দরকারি কথা কেন, ওর সাথে আমার কথা বলতেই ইচ্ছে করেনা।”
“ঠিক আছে। আপনি যান, আপাকে নিয়ে গাড়িতে বসুন।”
“আপনি কি করবেন? আপনিও চলুন। আমি আপনাকে ওর সাথে থাকা ছাড়বো না। আমি ওকে একবিন্দু বিশ্বাস করি না।”
ফিরোজ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“মা’রব না তোর স্বামীকে। আমাকে দেখে বুঝতে পারছিস না তুই আমি নিজেই ম’রে গেছি? লা’শ কি কখনো কারো খু’নি হতে পারে?”
আরজু ফিরোজকে আরো কিছু বলতে নিলে আরমান ওকে বাঁধা দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আপাকে নিয়ে গাড়িতে বসুন, আমি আসছি।”
আরজু আবারো আরমানের কথায় আপত্তি জানাতে ধরলে প্রার্থনা ওকে জোর করে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসালো। অন্তত প্রার্থনা তো জানে যে ফিরোজ এখানে কেন এসেছে। আরমানের কোনো ক্ষতি করবে না ফিরোজ।
আরজুরা চলে যেতেই আরমান সন্দেহী গলায় ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সত্যি করে বলোতো ফিরোজ, তোমার উদ্দেশ্য কি? এত সহজে ছেড়ে দিলে আরজুকে? হঠাৎ করে আপাকেই বা কেন নিয়ে এলে আমাদের কাছে? বিশ্বাস অর্জন করে একদম কাছ থেকে ছু’রিটা মা’রতে চাইছো?”
ফিরোজ নির্জীব গলায় বলল,
“যে ছু’রিটা দিয়ে ভাবছে আমি তোমাদের মা’রবো, সেই ছবিটা দিয়ে তোমার স্ত্রী আমার হৃদয়টা টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। ছেড়ে দেবো কি ওকে, আরজুকে তো কখনো ধরতেই পারলাম না।”
আরমানের একবার মনে হচ্ছে যে, ফিরোজের সত্যি আলাদা কোন উদ্দেশ্য নেই, তবে তাও যেন পুরোপুরি ভরসা করে উঠতে পারছে না। পুনরায় প্রশ্ন করল,
“হঠাৎ এত শান্ত হয়ে গেল কেন ফিরোজ?”
“লড়াই করার জন্য শক্তি দরকার, ভরসা দেওয়ার জন্য পাশে কিছু আপন মানুষ দরকার, সেই লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার জন্য কারোর দোয়া দরকার। আর সব থেকে বেশি দরকার যাকে জয়ের জন্য লড়াই করছি সে কি আদৌও আমার হতে চায় কিনা সেটা জানা। লড়াইয়ের ময়দানে নেমে দেখি যাকে জয়ের জন্য প্রাণ অব্দি উৎসর্গ করতে পারি সে আমায় ধ্বংস করার ফন্দি আঁটছে। কিচ্ছু নেই আমার হাতে, তবে কি শান্ত হবো না আমি?”
আরমান আর কিছু বলার মতন খুঁজে পেল না। গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো। গাড়িটা ছাড়ার আগে ফিরোজ এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। জানালা দিয়ে মুখ বের করে ফারিহা চিন্তিত গলায় ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি একা একা কি করে থাকবে চাচ্চু? এত রাতে বাড়ি ফিরতে পারবে তুমি একা একা? আমি যাই তোমার সাথে?”
ফিরোজ আলতো হেসে ফারিহার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“না আম্মা, আমি ঠিক চলে যাব, চিন্তা করো না। তোমার চাচ্চুর একা একা রাত বিরেতে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস আছে। তুমি ভালোভাবে থেকো। আর চিন্তা করো না, তোমার কোন অসুবিধা তোমার চাচ্চু হতে দেবে না। প্রত্যেক মাসে আমি তোমার খরচের টাকা ঠিক পাঠিয়ে দেবো। তুমি শুধু ভালোভাবে পড়াশোনা করো আর পারলে ভুলে যেও তোমার চাচ্চুর কথা।”
“কিন্তু কেন? আমি বলেছিলাম আমি তোমার সাথে থাকবো। আমার তোমার সাথে থাকতে ভালো লাগে।”
ফিরোজ আবারো আলতো হাসলো। ফারিহা কে আর কিছু বলল না। ওর পাশে বসা প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ক্ষমা করে দিস প্রার্থনা। যা ভুল করার তা তো করেই ফেলেছি, তার প্রতিশোধ যেন কখন আবার আমার আম্মার উপর নিতে যাস না। ভরসা করে কিন্তু তোদের হাতে আমার আম্মার জীবনটা দিয়ে দিলাম।”
ফিরোজের প্রতি প্রার্থনার মনটা বরাবরই নরম। কোথাও গিয়ে যেন একটা দুর্বল জায়গা থেকেই গেছে ফিরোজের জন্য মনের মাঝে। খারাপ লাগে প্রার্থনার ফিরোজের জন্য, এই যেমন এখনো লাগলো। চিন্তিত গলায় বলল,
“তুমি তো অসুস্থ, একা ফিরতে পারবে তো?”
ফিরোজ বেশ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“ফেরার হলে ফিরব, না ফিরলে রাস্তায় কোথাও একটা ম’রে পড়ে থাকব। কি এমন বড় ব্যাপার? ম’রতে তো কথা হবেই, সে পালঙ্কের উপর ম’রি বা রাস্তায় পড়ে ম’রি ব্যাপারটা তো একই। মৃ’ত্যু যন্ত্রণা তো সেই একই হবে। সে যাই হোক, আরমান গাড়ি স্টার্ট দাও আর এখানে অপেক্ষা করে লাভ নেই।”
ফিরোজ একবার তাকালো আরজুর দিকে। সে হয়তো ভাবলো বিদায়ের আগ মুহূর্তে এসে আরজু কিছু একটা বলবে, তবে না কিছুই বলল না। আরজুর মনোযোগই নেই ফিরোজের প্রতি। ফিরোজও আর আশা রাখল না। চলে গেল ওদের গাড়িটা।
ফিরোজ বুঝলো জ্বরটা বেড়ে গেছে, দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে আবারও ফুটপাতের উপরে বসে পড়ল। ইচ্ছে করছে এখানেই শুয়ে পড়তে। জায়গাটা কতটা অপরিষ্কার সেসব দেখার কোন প্রয়োজন নেই। ফিরোজ আর কোন মতেই বসে থাকতে পারলো না। শুয়ে পড়লো সেখানে। চোখের সামনে সবটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।
হঠাৎ করে একটা কথা মনে পড়ল ফিরোজের, আর যদি রাতে ফিরোজ এখানে ম’রে পড়ে থাকে, তবে কাল তো পত্রিকায় সংবাদ বেরোবে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ম’রদেহ পাওয়া গেছে। সে খবরটা নিচে আরজুর কানেও পৌঁছাবে। তখন কি আরজু সত্যিই খুশি হবে, নাকি আফসোসে ওর গাল বেয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়বে?
_________
রাতের রাস্তাটা বেশ ফাঁকা। যানবাহন যে একেবারেই নেই তেমনটা না। আরমান বেশ স্বাভাবিক গতিতেই ড্রাইভ করছে। তবে একটা বিষয় বেশ অনেকক্ষণ থেকে খেয়াল করছে, বাসস্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ছাড়ার কিছুক্ষণ পর থেকে ওদের পিছনে একটা বাইক আসছে। আরমান খেয়াল করেছে ও যেদিকে গাড়ি ঘোড়াচ্ছে সেদিকেই বাইকটাও আসছে।
প্রথম প্রথম আরমান ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল, তবে এখন কেন যেন আর স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। আধ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়েছে অথচ সেই বাইকটা পিছু ছাড়েনি। বাইক চালক হেলমেট পরা, মুখ দেখার কোন কায়দা নেই।
আরমান গাড়ির স্পিডটা একটু বাড়ালো। খেয়াল করলো বাইকের স্পিডটাও বেড়ে যাচ্ছে। আরমানের সন্দেহ আরো বাড়লো। আরমান ধীরে ধীরে নিজের গাড়ির স্পিড যত বাড়াতে থাকলো দেখল বাইকের স্পিডটাও ঠিক ততই বাড়ছে। এবারে ব্যাপারটা আরমানের মোটেও সুবিধার লাগলো না, সন্দেহ বাড়লো।
এদিকে হঠাৎ করে আরমানকে এত জোরে গাড়ি চালাতে দেখে আরজু প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“এতো জোরে গাড়ি চালাচ্ছেন কেন, আরমান? আস্তে চালান।”
আরমান আরজুকে কিছু বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিক গলায় একটু হেসে বলল,
“তেমন কিছু না আরু। রাস্তাতো এখন ফাঁকাই, আর তাছাড়া ঠান্ডা লাগছে। তাই ভাবছি যত তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়া যায় আরকি।”
আরজু স্বাভাবিকভাবেই নিলো কথাটা। আরমান এবারে পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি তাওকীরের নাম্বারে কল দিলো। তবে তাওকীর কলটা রিসিভ করলো না। বাধ্য হয়ে এবার তানভীরকে কল দিলো। তানভীর একবারেই কলটা রিসিভ করলো। কলটা রিসিভ করে তানভীর বিরক্তিকর গলায় বলল,
“ঘুমোতে দিচ্ছিস না কেন?”
আরমান একটা ঝাড়ি মেরে বলল,
“ঘুম রাখ, গেট খোল। আমি গাড়ি নিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা বন্ধ করবি। আর তাওকীর ভাইকে বল রাতেই যেন বাড়ির সিকিউরিটি বাড়ায়।”
“হঠাৎ সিকিউরিটি নিয়ে পড়লি কেন? আছে তো বাড়ির বাইরে অনেকগুলো, আরো লাগবে?”
“যা বলছি তাই চুপচাপ কর তানভীর।”
তানভীর বুঝলো কথা বাড়িয়ে আর লাভ নেই। আরমানের কথা শুনে মনে হচ্ছে কোন গুরুতর বিষয়।
ফোনটা রাখার কিছুক্ষণ পর আরমান খেয়াল করলো বাইকটা আর তাদের পিছনে আসছে না।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আরমান। এবারের মতন হয়তো বেঁচে গেলো।
__________
হিমি এসে তাওকীর কে বলল যে আরজুর বাড়ির লোক এসেছে। বাড়ির লোক বলতে ওর আপা আর একটা বাচ্চা মেয়ে। আরজুর বোন এসেছে কথাটা শুনতেই লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল তাওকীর। তাড়াহুড়ো করে গেল আরজুর বোনকে দেখতে। ওপর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলো আরজুর পাশে একজন অপরিচিত অল্প বয়স্ক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাওকীর বুঝলো এটাই আরজুর বোন।
খুব ভালো ভাবে প্রার্থনা কে তাওকীর দেখল। যাক বাঁচা গেল। যাকে সন্দেহ করেছিল তাওকীর সে এই মেয়েটা না।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাওকীর আবার ঘরে গেল। তাওকীর কে এত তাড়াতাড়ি ঘরে আসতে দেখে হিমি বলল,
“কি হলে, দেখা করলে না ওদের সাথে?”
“না, দেখা করে কি করবো। মেয়ে মানুষ এসেছে, তুমি যাও।”
“আমি দেখা করেছি। তুমি একটা কাজ করো, তোমার মেয়েকে ওর ঘর থেকে নিয়ে এসো। মেহমান আসবে আগে থেকে তো জানতাম না। জানলে অন্য ঘরগুলো পরিষ্কার করে রাখতাম। ওদের আজ তাহির ঘরে রাখি।”
তাওকীর গেল মেয়েকে আনতে।
তাহি তখনও ঘুমায়নি। মেয়েটার অনেক রাত করে ঘুমানোর স্বভাব। বিছানার ওপর বসে খাতায় কিসব আঁকিবুকি করছে। তাওকীর মেয়ে লে আদূরে গলায় বলল,
“আম্মু চলো, আজ তুমি বাবার সাথে থাকবে।”
বাবার সাথে থাকবে কথাটা শুনতেই তাহি খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। তাওকীর হাত বাড়াতেই তাহি লাফ দিয়ে এসে ওর কোলে চলল। তবে হঠাৎ করে তাহির মাথায় একটা কথা এলো, হঠাৎ করে আজ কেন নিয়ে যাচ্ছে ওকে? অন্যান্য দিন তো ঘুমোতে চাইলেও ঘুমাতে দেয় না ওর আম্মু।
“বাবা, আজ কেন আমাকে নিয়ে যাচ্ছো তোমাদের ঘরে? অন্য দিন তো আম্মু যেতে দেয় না।”
“আসলে আজ আমাদের বাড়িতে দুজন নতুন গেস্ট এসেছে।তাই আজকে রাতের জন্য ওদেরকে তোমার ঘরটা দেব।”
তাহি তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না, আমি আমার ঘর কাউকে দেবো না। এটা আমার ঘর, তুমি অন্য ঘরে থাকতে বলো।”
তাওকীর কিছু বোঝাতে নেবে মেয়েকে তার আগেই আরমান ফারিহা কে নিয়ে ঘরে এলো। ফারিহা কে দেখতেই তাওকীর তাহির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“এখানে আর একটা কথাও না আম্মু। এই দেখো এই আপু থাকবে এই ঘরে। তুমি যদি এখন এসব বলো কষ্ট পাবে তো।”
তাওকীরের কথাটা মোটেও পছন্দ হলো না তাহিট, তবে আর কিছু বলল না। গাল ফুলিয়ে বসে থাকলো। আরমান তাহির গাল ফুলানোর ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারল না। ফারিহা কে নিয়ে এগিয়ে এসে তাহির গাল দুটো টেনে দিয়ে বললো,
“ কি হয়েছে? তুমি এভাবে গাল ফুলিয়ে আছো কেন আম্মু?”
তাহি মৃদু রাগী ভঙ্গিতে বলল,
“বাবা বলছে আমার ঘরে এই আপুটাকে থাকতে দেবে, কিন্তু আমি দেবো না। এটা তো আমার ঘর।”
তাহির কথাটা শুনে ফারিহার কেন জানি একটু অস্বস্তি হলো। মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। তাওকীর সেটা খেয়াল করল। হালকা একটু ধমকের সুরে তাহি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মু, এসব আমি তোমায় শিখিয়েছি? গেস্টদের সাথে এভাবে কথা বলে কেউ? আর এটা তোমার বড় আপু। সুন্দর ভাবে কথা বলতে হয়।”
তাহি আর থাকলোই না তাওকীরের কোলে। । কোল থেকে নেমে ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল নিজের মায়ের কাছে নালিশ করবে বলে।
এদিকে তাওকীর একটু অস্বস্তির মাঝে পড়ল। অস্বস্তির মাঝে পড়েছে আরমান নিজেও। ফারিহা যথেষ্ট বড়। সম্মান অপমানের বোধ ওর হয়েছে। নিশ্চয় মেয়েটা অস্বস্তির মাঝে পড়েছে।
তবে তাওকীরের মনে হলোএখন যদি এই কথাগুলো আবার তোলে তবে ফারিহার আরো বেশি অস্বস্তি হবে। সেই কথাগুলো তুললো না। আলতো হেসে ফারিহা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার নাম কি আম্মু?”
ফারিহা ধীর গলায় বলল,
“ফারিহা তাহি।”
চমকে উঠলো তাওকীর। সেই সাথে চমকালো আরমান নিজেও। আরমান বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তোমার নামও তাহি! একটু আগে যে বাচ্চাটা গেল ওর নামও তাহি।”
প্রত্যুত্তরে ফারিয়া শুধু অল্প বিস্তর হাসলো, কিছু বলল না। এদিকে আরমান খেয়াল করল তাওকীর কেমন যেন থমকে গেছে। একবার ডাকলো তাওকীর ভাই বলে। তাওকীরের ধ্যান ভাঙলো।
জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরজুর কে হয় মেয়েটা?”
আরমান যা জানে তাই বলল,
“আরজুর চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে।”
তাওকীর নিশ্চিত হতে পুনরায় বলল,
“চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে? তুই নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
তাওকীরের সন্দেহটা গেল না। ভাবলো আরেকটু নিশ্চিত হওয়া যাক। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে ফারিহা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার বাবা মা আসেননি? ওনারা কোথায়?”
“বাবা মা/রা গেছে কয়েকদিন হলো।”
তাওকীর এবার উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
“ আর মা? মায়ের নাম কি তোমার?”
“মা আছে, তবে মায়ের সাথে আমি থাকি না।”
“নাম কি তোমার মায়ের?”
“মিতা।”
“নিশ্চিত তুমি?”
ফারিহা ভ্যাবাচ্যাকা খেল। মায়ের নাম মিতা, এখানে নিশ্চিত হওয়ার কি আছে বুঝে উঠতে পারলো না। ওর কি বলা উচিত তাও বুঝলো না।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছে খোদ আরমানও। তাওকীরের হঠাৎ করে এমন ফারিহার বাবা-মার পিছনে পড়ে যাওয়ার কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এত উদ্বিগ্নই বা কেন দেখাচ্ছে তাওকীর কে।
“তাওকীর ভাই, এটা কেমন প্রশ্ন হলো? ঠিক আছো তুমি?”
তাওকীর যেন হুঁসে ফিরলো। বুঝতে পারলো এতক্ষন বোধ হয় অনেক উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে ফেলেছে। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে অপরাধী গলায় ফারিহা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সরি আম্মু, আসলে একটু অন্য খেয়ালে চলে গিয়েছিলাম। আচ্ছা তাহলে থাক তাওসিফ, আমি আসছি, ঘুমাবো।”
কথাটা বলে খুব তাড়াহুড়ো করে তাওকীর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলো দরজার কাছে গিয়ে দেখল আরজু দাঁড়িয়ে আছে। কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে তাওকীরের দিকপ। তাওকীর আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না, চলে গেল। যেন বুঝলে এখানে দাঁড়ালে ওর বিপদ হবে।