বাড়ি ফেরার পর আরজু দেখলো প্রার্থনা আর ফারিহা সোফায় বসে আছে। আরজুকে দেখেও প্রার্থনার মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না, চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে রয়েছে। আরজুকে দেখে ফারিহা এগিয়ে গিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কোথায় গিয়েছিলে ফুপি?”
“একটু কাজে গিয়েছিলাম।”
“না খেয়ে চলে গিয়েছিলে কেন? আমার তো ক্ষুধা লেগেছিলো, তাই আমি খেয়ে নিয়েছি।”
“ভালো করেছো। আমি ঘরে যাই হ্যাঁ?”
ফারিহা মাথা নাড়াতেই আরজু চলে গেল তবুও প্রার্থনা কিছু বলল না। এমনকি সাহিত্যের ব্যাপারে একটা প্রশ্ন অবধি করল না। ব্যাপারটা আরজুকে ভীষণ ভাবালো। তবে বেশি কিছু বলল না, চুপচাপ ঘরে চলে গেল।
পুরো দুপুরটা আরজুর ঘরেই কাটলো। আরমান খেতে ডেকেছিলো তবে আরজু কিছু খাবে না বলে জানিয়েছে। আরমানও আজ কেন যেন জোর করেনি।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল তবু আজ ঘর থেকে বের হলো না আরজু। প্রার্থনাও এলো না ওর ঘরে ইলহামের খোঁজ নিতে আর এই ব্যাপারটাই বেশি অবাক করছে আরজুকে। আরজু বুঝতে পারছে না যে কেন প্রার্থনা এমন করছে। আরমান হয়তো বলে দিয়েছে প্রার্থনাকে যে ও ইলহামের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে, সেই জন্য কি প্রার্থনা রেগে আছে ওর উপরে। তবে কথাটা তো প্রার্থনা অজানা নয় যে ইলহামের ওপর আরজুর ভীষণ ঘৃণা জমে আছে। এটা তো প্রার্থনা জানা কথা।
আরজু তখন ঘরে বসা। আরমান বারান্দায় কারো সাথে কথা বলছে। কার সাথে কথা বলছে সেটা আরজু জানে না তাই কৌতূহলবশত উঠে বারান্দায় গেল দেখার জন্য যে কার সাথে কথা বলছে।
আরমান তখন ফোনে ইলহামের সাথে কথা বলছে। প্রার্থনার সাথে কি হয়েছিল, কার সাথে বিয়ে হয়েছে, তার পরবর্তী জীবন প্রার্থনার কেমন কেটেছে, এখনই বা প্রার্থনা কিভাবে এখানে এলো সেসবই বলছে। কথা শেষে আরমান ফোনটা রেখে পিছন ঘুরে দাঁড়াতেই চমকে উঠলো।
“আরে আরু, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তো!”
আরজু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভয় কেন পেয়েছিলেন?”
“আমি তো জানতাম না আপনি পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন সেজন্য হঠাৎ করে দেখে চমকে গেছি। এটা তো স্বাভাবিক।”
“কার সঙ্গে কথা বলছিলেন?”
আরজুর প্রশ্নে আরমান চিন্তার মাঝে পড়ে গেল। বুঝতে পারছে না ইলহামের কথাটা বলবে কিনা। এখন যদি বলে যে ইলহামের সাথে কথা বলছিল আরমান, তবে আরজু ক্ষেপে যেতে পারে। কে জানে মেয়েটা কখন থেকে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো শুনেও নিয়েছে ইলহামের নামটা। সেখানে যদি মিথ্যে বলে তাও রেগে যাবে। সবশেষে অনেক ভাবনা চিন্তা করে আরমান ঠিক করেছে যা হওয়ার হবে তবে সত্যিই বলবে।
“ইলহাম ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম।”
আরমান ভেবেছিল তৎক্ষণাৎ অপর পক্ষ থেকে বেশ ভয়ানক কোন প্রতিক্রিয়া ভেসে আসবে, তবে না, তেমন কিছুই হলো না। আরজু অনেকটা সময় আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকার পর গম্ভীর গলায় বলল,
“হয়তো ওনার বাধ্যবাধকতা ছিল। আমি জানি ফিরোজের মতো জা’নো’য়া’র কোন পরিস্থিতি ফেলতে পারে, তবে তারপরও একটা কথাই বলবো ছেড়ে যাওয়া কখনো সমাধান না। আপাকে বাঁচাতে গিয়ে আরো মৃ’ত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছিলেন উনি। সব না হয় মেনে নিলাম কিন্তু অপবাদটা কেন দিলেন? খুব দরকার ছিল সবার সামনে ঐ নোংরা কথাগুলো বলার?”
“এই সামান্য ব্যাপারটুকু বুঝলেন না আরু। ইলহাম ভাই চেয়েছিল আপা যেন ওনাকে ভুল বুঝে ভুলে যায়, নিজের নতুন জীবনে যেন ভালো থাকে, সেই জন্য এমনটা করেছিল।”
“তাহলে আবার ঐ কথা কেন বললেন যে আমার আপা খুব ভালো করে জানে যে উনি কোন পরিস্থিতিতে আপাকে ছাড়া পালিয়ে ছিল?”
“হয়তো বিশ্বাস থেকে গিয়েছিল তার ভালোবাসার প্রতি, এটা তো অপরাধ না তাই না?”
“যত যাই বলুন তারপরও আমি ওনাকে কোনদিন ক্ষমা করব না। কোনদিন না মানে কোনদিনও না।”
আরজুর কথাটা শুনে আরমানের এবারে কেন যেন রাগ হলো। মেয়েটার হৃদয় বড্ড বেশি কঠিন। কাউকে ক্ষমাই করতে পারে না। একবার যদি কারো প্রতি বিন্দু পরিমাণ ঘৃনা জমে, তবে আজীবন সেই ঘৃণাটা ঘৃণাই থেকে যায়, কখনো সেটা ভালোবাসার পরিণত হয় না সে বিপরীত পাশের মানুষটা যতই ক্ষমা চাক না কেন, যতই নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হোক না কেন। আরমান অসন্তুষ্ট গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এতটা ঘৃণা ঠিক না আরু। আপনাকে বুঝতে হবে ইলহাম ভাইয়ের অপারগতা।”
“উনি তো আমার আপার অসহায়ত্ব বোঝেনি, তবে আমি কেন ওনার অপারগতা বুঝতে যাব।”
আরমান এবারে কিঞ্চিত গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার কথা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করুন আরু। আপনি যেটা ধরে নিয়েছেন সেটাই যে সব সময় ঠিক হবে তেমনটা কিন্তু না। আর এই যে বারবার এক কথা বলছেন যে থেকে আপনার আবার নিজের মৃত্যুকে ভালোবাসতো তা আপনি বললেন আপনি আপনার আব্বাকে মরা অবস্থা দেখতে পারতেন? ইলহাম ভাইয়ের ওই ত্যাগের জন্যই কিন্তু এখনো আপনার আপা জীবিত আছে এটা ভুলে যাবেন না। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নাহয় নাই করলেন অন্তত ঘৃণা করবেন না।”
আরজু অসন্তুষ্ট গলায় বলল,
“আপনি ওর হয়ে ওকালতি করছেন কেন?”
“আমি কারো হয়ে ওকালতি করছি না। শুধু আপনাকে বোঝাতে চাইছি সব সময় মানুষকে ঘৃণা করতে হয় না। কেউ নিজের অপরাধ স্বীকার করলে তাকে ক্ষমা করতে শিখুন। আমি সব সময় একটা বিষয় খেয়াল করছি আপনি কাউকে ক্ষমা করতেই পারে না, কিন্তু কেন? আপনার মানসিক অশান্তির অর্ধেকের বেশি কারণ হলো কাউকে ক্ষমা করতে না পারা। সামান্য অপরাধগুলো পর্যন্ত আপনি ক্ষমা করতে পারেন না।”
“এটাই আমার বৈশিষ্ট্য। আপনি এসব জেনেই আমাকে গ্রহণ করেছিলেন, তবে এখন কি বিরক্তিকর লাগছে এগুলো? আমি এমনই ছিলাম, আর বরাবর এমনই থাকবো। আমি পারি না কাউকে বিশ্বাস করতে, পারি না কাউকে ক্ষমা করতে। কারণ আমি আগেই বলেছি আমার হৃদয় পাথরের থেকেও বেশি কঠিন।”
আরমান এবার একটু রাগী গলায় বলল,
“পাথর হলো আর ছেড়ে দিলাম নাকি। এরকম চলতে থাকলে তো হবে না আরু। আমার দ্বারা যদি কখনো আমার অজান্তে ছোটখাটো কোন ভুল হয়ে যায়, তবে তো আপনি আমাকেও ক্ষমা করবেন না কখনো। আর আমি সারা জীবন আপনার কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে পারবো না। ক্ষমা করতে শিখতে হবে আপনাকে।”
“সেটা নির্ভর করছে আপনার অপরাধটা কত বড় তার ওপর। আমি কোন অপরাধ করলে আপনিও আমাকে ক্ষমা করবেন না। আমি তো বলছি না আপনাকে আমায় ক্ষমা করতে। ইচ্ছে না হলে কখনোই ক্ষমা করবেন না। আমার হৃদয় পাথরের থেকেও কঠিন হাজার বার বলেছি আমি কথাটা আপনাকে।”
“তবে তো বলতে হচ্ছে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না আরু। যে হৃদয় পাথরের থেকেও বেশি কঠিন সেই হৃদয়ে তো কারো জন্য ভালোবাসা থাকতে পারে না। শুধু আমি নয় আমার বাবা, মা, ভাই, বোন, পুরো পরিবার যারা আপনাকে এতটা ভালোবাসলো আপনি তাদেরকেও ভালোবাসতে পারেননি। কেননা যে কাউকে ক্ষমা করতে জানে না, যার হৃদয় পাথর, সে কখনোই কাউকে ভালোবাসতে পারে না। তবে তো আমাকে এটা ধরে নিতেই হচ্ছে আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা নেই, তাই না?”
আরজু চমকে উঠে বলল,
“এমনটা কেন বলছেন? এটা মিথ্যে।”
“এটাই সত্যি। শুধুই ইলহাম ভাই তো না, ফিরোজের ক্ষেত্রেও একই। আপনাকে আমি বলছি না ফিরোজকে ক্ষমা করতে। আপনি ক্ষমা নাই করলেন। আমি আপনাকে ওর সাথে বন্ধুত্বও পাতাতে বলছি না। তাই বলে সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু আপনি প্রকাশ করতে পারেন না ফিরোজের প্রতি? ফিরোজ না চাইলে আপনার আপা এখনো আপনার কাছে থাকতো না, সেখানে আপনি অনবরত সেই মানুষটার মৃ’ত্যু কামনা করেছেন এটা কেমন স্বভাব?”
“ফিরোজ একটা জা’নো’য়া’র। ওর ভালোবাসা মিথ্যে। যদি ও আমাকে ভালোবাসতো তবে কখনো অন্য নারীর কাছে যেত না।”
“আরে বাবা আমি তো বলছি না ওর ভালোবাসা সত্যি। আমি বলছিও না যে ও জা’নো’য়া’র না মানুষ, তবে আপনি তো মানুষ, আপনার মধ্যে তো হৃদয় আছে। সে হৃদয়য়ে তো একটু কোমলতা থাকতে হবে। মনুষ্যত্ববোধ বলতে তো একটা বিষয় আছে। আপনি নিজেই কিন্তু বলেছেন আপনার ফিরোজের প্রতি সামান্য হলেও কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। তাহলে সেখানে আপনি কি করে ওর মৃত্যু কামনা করতে পারেন বোঝান আমায়? কারো সাথে দুটো কথা ভালোভাবে বললে খুব একটা ক্ষতি হয় না আরু।”
“আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয়। আপনার পুরো পরিবারের প্রতি আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয়। আপনি জোর করে মিথ্যে বানাতে পারেন না।”
আরমানের মনে হলো এই কথাটা দিয়েই কাজ হবে। এই কথার জ্বালেই আরজু কে ফাঁসাতে হবে। হয়তো কষ্ট পাবে, তবে আরমান কে এটা করতেই হবে। মেয়েটার মন নরম করতেই হবে।
আরমান চোখমুখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে রেখে বলল,
“বিশ্বাস করি না আরু। যার মন এতটা কঠিন সে হৃদয় কখনো ভালোবাসা থাকতে পারে না। আর যে হৃদয় ভালোবাসা থাকে সেই হৃদয় কখনো কঠিন হয় না। তবে কোনটা ঠিক আপনিই বলুন? আদৌ আপনার হৃদয়ে আমার জন্য ভালোবাসা আছে, নাকি আপনার হৃদয়টা পাথরের মতন কঠিন?”
কথাটা বলে আরমান বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আরজুর উত্তরের আশায় আর রইল না।
আরজু আরমানের এমন আচরণে অবাক না হয়ে পারলো না। আরমান তো কখনো এমন করে না, কখনো রেগে যায় না, এভাবে কথাও বলে না আরজুর সাথে। আর আজকে সোজা আরজুর ভালোবাসার উপরে প্রশ্ন তুললো।
হঠাৎ করে আরজুর মনে হলো ও কি তবে বাড়াবাড়ি করছে? আরমান তো ভুল করে না। আরজু তবে কি অত্যাধিক বেশি হৃদয়হীনের মতন কথা বলেছে, যার জন্য আরমান এতটা রেগে গেল? নিশ্চয় তাই হবে।
_________
আরজুর সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি শেষে আরমান সোজা বাইরে চলে গিয়েছিল। রাত আটটা নাগাদ আবার বাড়ি ফিরে সোজা চলে গেল ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে। আরজুর সাথে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না।
আরজুর মনে ভীষণ অভিমান জমলো, তবে কিছু বলল না। ঠিক করলো আগে আগে আরমানের সাথে কথাও বলবে না।
আরজুর এসব ভাবনার মাঝেই ফোনের রিংটোনের আওয়াজ এলো ওর কানে। বুঝলা আরমানের ফোন বাজছে। ওয়াশরুমে ঢোকার আগে বিছানার ওপরে রেখে গেছে আরমান ফোনটা। আরজু উঁকি দিয়ে দেখল ক্রিনে ভেসে উঠেছে হিয়া নাম।
কপাল কোঁচকালো আরজু। এই নামটা তো আগে কখনো শোনেনি আরমানের মুখে। কে এই মেয়ে। আরজুর এসব ভাবতে ভাবতেই কলটা কেটে গেল। একটু বিরতি নিয়ে আবারও সেই একই নাম্বার থেকে কল এলো। আরজু একবার ভাবল কলটা রিসিভ করা উচিত হবে কি হবে না। পরমুহুর্তে মনে হলো ও তো আরমানের বউ, রিসিভ করতেই পারে।
যেই ভাবা সেই কাজ। আরজু কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে হিয়ার অভিমান মাখানো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“ভুলে গেছিস তবে আরমান?এতই পর হয়ে গেলাম আমি? ম/রলেও আর খোঁজ খবর নিবি না তুই, কিছু যায় আসে না তোর তাই না?”
মেয়েটার এত ঢং এর কথা আরজুর সহ্য হলো না। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
“কে আপনি?”
ফোনের অপুর পাশ থেকে একটা মেয়েলী কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই চমকালো হিয়া। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে দেখলো ভুল করে অন্য নাম্বার ডায়াল করেছে কিনা।কিন্তু না, এটা তো আরমানেরই নাম্বার।
আরজুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“ আপনি কে? এটা তো আরমানের নাম্বার। আরমান কোথায়।”
“আমি আরমানের বউ, আপনি কে?”
“কিইইই? কে আপনি?”
“বললাম তো আমি আরমানের বউ। তাওসিফ আরমানের বউ। চিনেছেন? এবার নিজের পরিচয়টা দিন?”
বিশ্বাস হলো না হিয়ার আরজুর বলা কথাটা। ভাবলো নিশ্চয়ই আরমানই মজা করছে। সে হিসেবেই বলল,
“আপনি মজা করছেন তাই না? নিশ্চয় আরমানের কোন কাজিন, ওই শয়/তান/টা নিশ্চয়ই আমাকে জ্বালানোর জন্য এই কথাগুলো বলছে।”
“কাকে শ’য়’তা’ন বললেন? ভদ্রতা জানেন না? কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেন না? শ’য়’তা’ন বলছেন কেন ওকে? আর বারবার জিজ্ঞেস করছি আপনি কে উত্তর দিচ্ছেন না কেন?”
হিয়া এবার একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল। আরজির কন্ঠের দৃঢ়তাই ওকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছে এটা কোন মজা না। তবে আরমান বিয়ে করেছে এই কথাটা ভাবতে যে কষ্ট হচ্ছে।
পূর্বের তুলনায় এবারে হিয়ার কন্ঠটা অনেকটা মিইয়ে এলো। ধীর গলায় বলল,
“আমি হিয়া, আরমানের ফ্রেন্ড। আপনি সত্যি ওর বউ? আরমান বিয়ে করেছে কই বলেনি তো কিছু।”
“এত বড় করে অনুষ্ঠান করা আমাদের বিয়ে হল তারপরও আপনাকে দাওয়াত দেয়নি? সে যাই হোক, সবাইকে তো জানানো সম্ভব না যে বিয়ে করেছি আমরা তাই না? আরমানের সাথে কি দরকার?”
“ওকে ফোনটা দিন। ও কোথায়?”
“ওয়াশরুমে গেছে।”
“ফিরলে বলবেন হিয়া কল করেছিল। আশা করছি ওর কল ব্যাক করার সময় হবে।”
কথাটা বলে হিয়াই ফোনটা কেটে দিল। আরজুর একটাও পছন্দ হলো না হিয়া নামক মেয়েটাকে। খুব ভালো করে আরজু বুঝতে পারছে মেয়েটা নিশ্চয়ই আরমানের পেছনে ঘুরঘুর করে্
আরজুর ভাবনার মাঝে আরমান ওয়াশরুম থেকে বেরোলো। ওকে বেরোতে দেখে আরজু রাগী ভঙ্গিতে বলল,
“আপনার বান্ধবী কল করেছিল, হিয়া। বলল যদি আপনার সময় হয় ওকে একটু কল ব্যাক কর।তে ফোনটা ধরুন। আপনার হাতে তো অঢেল সময়।”
আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ হিয়া কল করেছিলা? কথা হল আপনার সাথে?”
“না, ওনার কথা বলার ইচ্ছে নেই ক,লটা কেটে দিলেন। আপনি কথা বলুন।”
আরমান বুঝলে আরজু বোধহয় হিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে একটু রেগে আছে। তবে এই নিয়ে আরজুর সাথে আর কোন কথা বারানোর ইচ্ছা হলো না। আরজুর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে আরজু বলে উঠলো,
“হিয়ার সাথে কি সম্পর্ক আপনার? সত্যিই কি বন্ধু?”
আরমান বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করছি না?”
“কেন?”
“যার হৃদয়ে আমার জন্য কোন ভালোবাসা নেই, তাকে জবাবদিহি করার প্রয়োজন মনে করি না আমি।।”
আরজু ছোট্ট করে উত্তর বলল,
“ওহ।”
আরমান চলে যেতে ধরলা আরজু আবারো বলে উঠল,
“ ঘরেই কথা বলুন, বাইরে যাওয়ার কি আছে?”
“বাইরে গিয়ে কথা বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করব। ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
কথাটা বলে আরমান সত্যি বাইরে চলে গেল। আরজু না আরমানকে কিছু বলতে পারল, না আটকাতে পারল, আর না কাঁদতে পারলো। আরমানের পিছনে পিছনে গেলও না দেখার জন্য যে হিয়ার সাথে কি কথা বলছে। তবে খুব কষ্ট পেল। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়ল।
_________
আরজু তো এটা ভেবে অভিমান করে শুয়ে পড়ল যে আরমানের কাছে নিশ্চয়ই হিয়া বিশেষ কেউ, সেজন্য আলাদাভাবে কথা বলতে গেছে। অথচ আরজু জানতেও পারল না যে আরমান হিয়া কে কলও করেনি। এটাতো আরমানের আজ নতুন স্বভাব না, পুরনো স্বভাব। তবে তাও এক দেড় ঘন্টা পর আরমান ঘরে ফিরলো।
লাইট জ্বালাতেই দেখল আরজু বিছানায় শুয়ে আছে। এই বাড়িতে আসার পর থেকে আরমান আর আরজু এক বিছানায় শুয়েছে। আরমান কে আর কষ্ট করে সোফার ঘুমাতে হয়নি। আজ আরমানের মনে হলো ওর বিছানায় ঘুমানোটা ঠিক হবে না। লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে একটা চাদর নিয়ে গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো।
আরজু এমন ভঙ্গিতে শুয়ে ছিল যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, তবে আরমান ঠিকই জানে যে আরজু ঘুমায়নি, তবে কিছু বুঝতেও দিল না। আরজহ যখন দেখল আরমান সোফায় গিয়ে ঘুমিয়েছে বুক ফেটে কান্না এলো।
তারমানে বদলে গেছে আরমান। আর তো ভালোবাসেনা আরজু কে। পুরনো হয়ে গেছে যে আরজু। এতদিন আরজু কে কাছে পাওয়ার জন্য ছটফট করতো, কত তালবাহানা করতো, আর এখন আরজু সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও আরজুর কাছে আসে না। সারাটা দিন একবার ভালো করে কথাও বলেনি। এই যে আরজু রাতে খায়নি, একটাবার খোঁজও নিল না। একটু জোর ও করলে না খাওয়ানোর জন্য।
এই যে আরজু এখন কাঁদছে আরমান একবারের জন্য কি একটু এসে খোঁজ নেবে না, একটুও কি বুঝতে পারছে না যে আরজুর কষ্ট হচ্ছে? একটুও কি সান্তনা দেবে না?
বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হয়ে গেছে। আরমান বোধহয় হালকা একটু ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, তবে হঠাৎ করে ওর কানে কান্নার শব্দ এলো। সবে মাত্র একটু ঘুম ধরেছে, তাই আর চোখ দুটো খুলতে ইচ্ছে করছে না। আরমান ভাবলো বোধহয় ভুল শুনছে। তবে না, সময় যত গড়াচ্ছে কান্নার শব্দ ততই বাড়ছে। হঠাৎ করে আরমানের মনে হলো যে ঘরে তো ও ছাড়াও আরও একজন আছে। আরজুর কান্নার আওয়াজে মুহূর্তের মাঝে ঘুম ছুটে গেল আরমানের চোখ থেকে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। আগে গিয়ে ঘরের আলো জ্বালালো।
বিছানার দিকে তাকাইতে দেখলো আরজু একেবারে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে শরীরটা একটু কেঁপে উঠছে। আরমানের আর বুঝতে বাকি রইলো না আরজু কাঁদছে। মেয়েটা প্রাণপণে চেষ্টা করছে কান্নার শব্দ যেন বাইরে না বের হয়, যেন আরমানের কান অব্দি না যায় কান্নার আওয়াজ। তবে আরজু সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে।
আরমানের রাগ হলো এবারে নিজের ওপর। আরজুকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বোঝাতে গিয়ে বোধ হয় আরমান একটু বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। অন্যভাবেও হয়তো বোঝানো যেত, তবে এভাবে বোঝানোটা ঠিক হয়নি।
আরমান এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে মেঝের ওপরে হাঁটু গেড়ে বসলো আরমান। আরজুকে একবার ওর নাম ধরে ডেকে উঠল,
“আরু!”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য হঠাৎ করে আরজুর কান্নাটা থামল। এই সুযোগ আরমান আরও একবার ডাকল।
“আরু!”
এবারে আরজুর কান্না আবারও শুরু হলো। আরমান হাত বাড়িয়ে আরজুর গা থেকে কাঁথাটা সরানোর চেষ্টা করল, তবে ভেতর থেকে আরজু হয়তো খামচে ধরে আছে। অভিমান জমতে জমতে পাহাড় সমান হয়ে গেছে।
তবে আরমানের শক্তির সাথে পেরে ওঠা অতটা সহজ না, যার ফলে শেষমেষ আরজুকে হার মানতে হলো। কাঁথার নিচ থেকে আরজুর মুখটা বেরোতেই আরমান দেখলো কাঁদতে কাঁদতে মুখটা লাল হয়ে উঠেছে আরজুর। আরমান যে কাঁথা সরিয়ে সম্মুখে বসে আছে সেদিকে মেয়েটার কোন খেয়াল নেই। এখনো মুখে ওড়না গুঁজে কেঁদেই যাচ্ছে।
আরমানের বুকটা ফেটে গেল আরজুকে এভাবে কাঁদতে দেখে। উঠে এসে বিছানার পাশে বসে জোর করে আরজুকে তুলে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। নিজের উপরে নিজে অভিযোগ করে বলল,
“এটা আমি কি করে ফেললাম আরু? এত বড় ভুলটা আমি কি করে করলাম? আমি তো আপনার চোখের জল মুছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেই আমি কিনা আপনার চোখের জলের কারণ হলাম। এই ভুলের জন্য আমি নিজেকে ক্ষমা করব কি করে?”
আরমানের থেকে সামান্য একটু আস্কারা পেয়ে আরজুর কান্নার বেগ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“আপনি কেন আমার ভালোবাসাকে মিথ্যে বললেন? কেন আমার ভালোবাসায় সন্দেহ করলেন? আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, আপনি আমায় অবিশ্বাস কেন করলেন? আমি রাতে খাইনি, কেন আমাকে জোর করলেন না? ওই হিয়া মেয়েটা কে সেটা আমাকে কেন বললেন না? কেন ওর সাথে কথা বলার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন? কেন বললেন আপনার পরিবারকে আমি ভালোবাসি না?”
“ভুল হয়ে গেছে আরু। আর কখনো বলবো না। আর হিয়া তেমন বিশেষ কেউ না আমার কাছে। শুধুমাত্র আমার ভার্সিটির বন্ধু। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে কেউকে কলও করিনি, ওর সাথে আমার কোন কথাই হয়নি।”
“সেসব না হয় বুঝলাম। কিন্তু আমার ভালোবাসাকে মিথ্যে বললেন কেন? আমার ভালোবাসা কি প্রকাশ পায়নি? আপনি কি এতটাই অবুঝ যে বুঝবেন না আমার ভালোবাসা? যদি আপনাকে ভালো না বাসি, তবে তো ফিরোজের কাছেই চলে যেতাম। যে আমি কাউকে বিশ্বাস করি না সে আমি আপনাকে বিশ্বাস করে আপনার হাত ধরতে চেয়েছি নিজ থেকে। আর এত কিছুর পর আপনি কিনা বললেন আমি আপনাকে ভালোবাসি না!”
আরমান আরজুকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে দু হাতে আগে আরজুর চোখের জল মুছিয়ে দিলো। আরজু এখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আরমান গালটা মুছে দিতেই মুহূর্তের মাঝে আবারও দুটো গাল ভিজে উঠছে।
“আমি শুধু আপনাকে বোঝাতে চেয়েছ যে আপনার মনটা পাথর না। আপনিও মানুষকে ভালোবাসতে জানেন, তবে চান না ভালোবাসতে, যেটা খুবই অন্যায়। আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনি ক্ষমা করতে শিখুন, অন্তত যে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী তাকে ক্ষমা করে দিন। আর সব সময় আপনি যেটা ভাববেন সেটাই সঠিক হবে এমনটা না। আপনার আড়ালে অনেক কিছুই হতে পারে, যেটা সত্য।”
আরজু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“সেটা কি আমাকে ভালোভাবে বললে আমি বুঝতাম না? আমি কি আপনার কথা শুনি না? আপনি রেগে গেলেন কেন? আপনি বিরক্ত হলেন কেন? কেউ আমার কথা শুনতে চায় না। সবাই শুধু বিরক্ত হয়। সে আপনিও বিরক্ত হলেন, আমাকে একটু ভালোভাবে বুঝিয়ে বললে কি আমি বুঝতাম না?”
আরমান অপরাধী গলায় বলল,
“সেটাই তো ভুল হয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি আরু। আর কখনো এমন ভুল হবে না। তবে বিশ্বাস করুন আমি মন থেকে কথাগুলো বলিনি। আমি শুধু আপনাকে উপলব্ধি করাতে চেয়েছিলাম যে আপনি ইলহাম ভাই সম্বন্ধে যে ধারণাটা মনের মাঝে পুষে রেখেছেন সেটা ভুল। আর রাতে তো আমিও খাইনি। আপনি খান নি সেখানে আমি কি করে খেয়ে নিতে পারি একা একা?”
আরজু তারপরও সন্তুষ্ট হতে পারল না। এখনো আরমান সব অভিমান ভাঙাতে পারেনি, তবে আপাতত আর কিছু বলল না। কিছু ভাবনার মাঝে পড়ে গেল। আরমান এবার একটু চিন্তার মাঝে পড়লো। আরজুকে কিছু ভাবতে দেখে আরমানের চিন্তা বাড়লো। কি ভাবছে মেয়েটা কে জানে? কি যে মাথার মধ্যে চলছে?
একটু বিরতি নিয়ে আরজু আবারো কেঁদে উঠে বলল,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি। কিন্তু আপনি আমাকে অনেক কষ্ট দিলেন। আপনি রেগে কথা বলেছেন আমার সাথে, যাওয়ার আগে বলে গেলেন আমাকে জবাবদিহি করার প্রয়োজন নেই।
আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আপনি আমাকে অনেক অনেক কষ্ট দিয়েছেন।”
আরমান আবারও আরজুর চোখের জল মুছে দিয়ে দুহাতে আঁজলায় মুখটা নিয়ে কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে আরজুর মাথাটা আবারো বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,
“আমি অপরাধী আপনার কাছে, তবে চিন্তা নেই আমার ভালোবাসা দিয়ে আপনার সব কষ্ট দূর করে দেব। এতটা ভালোবাসবো যে আপনি এই কষ্ট ভুলে যাবেন। কখনো মনে পরবেনা আপনার এই কষ্ট। তবে আরু একটা কথা মনে রাখবেন, কেউ ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করতে হয়। আর ক্ষমা নাই করলেন, তবে যে আপনার জীবন বাঁচিয়েছে কখনো তার মৃ’ত্যু কামনা করতে নেই। কে কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সেটা আমরা জানি না, তাই নিজের মন মতন একটা ভাবনা ভেবে কখনো তাকে বিচার করবেন না।”
আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“ঠিক আছে।”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“এই কথাটা আগে শুনে নিলেই তো আর এত কষ্ট করতে হতো না আমায়। সারাটা দিন আমার আরুকে একটা চুমু খেতে পারি নি, আমার কি কষ্ট হয়নি নাকি! ঠোঁট দুটো আমার শুকিয়ে গেছে।”
আরমানের কথাটা শুনে আরজু নিজেও পাল্টা আফসোস করে বলল,
“আজ সারাদিনে একবারও আপনি আমায় জড়িয়ে ধরেননি।”
আরমান বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল,
“ওমা! এই নিয়ে আবার আপনার আফসোস জমে আছে?”
“হ্যাঁ আছে তো জমে। আপনার ভালোবাসা, আপনার যত্ন, আপনার আদরে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি আরমান। আপনার থেকে সামান্য অবহেলা পেলে আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আপনার প্রতি কখনো আমার অবিশ্বাস জন্মাবে না। আপনি হয়তো কখনো বুঝতেও পারেনি, তবে আপনি চাইলে আমাকে দিয়ে আপনি সব করাতে পারেন শুধু একটু ভালোবেসে। আর যদি এমন অবহেলা করে বলেন তবে আমি ম’রে যাব।”