তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৫৭

🟢

রাতে আরমান বাড়ি ফিরে দেখলো আরজু এখনো খায়নি। বেশ অনেকটাই রাত হয়ে গিয়েছে। আরজু এতক্ষণেও খায়নি জন্য আরমান হালকা একটু বকাবকিও করলো। সেই সাথে বেশ গম্ভীর গলায় আদেশ করে বলল এরপর থেকে যদি আরমানের ফিরতে দেরি হয়, তবে আর যেন আরজু না খেয়ে বসে না থাকে।

আরজু বাধ্য মেয়ের মতন চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে আরমানের কথায় সায় জানালো। প্রার্থনা আর ফারিহা আগেই খেয়ে শুয়ে পড়েছে। ওদেরকে জোর করে খাইয়ে দিয়েছে আরজু। অযথা আরমানের জন্য সবাই বসে থেকে তো লাভ নেই। আরজু আরমানের বউ, তার মানে শুধু আরজুই বসে থাকবে।

আরমান একটা ব্যাপার খেয়াল করলো, আরমান সারাদিন কোথায় ছিল, কি করেছে সেসব নিয়ে আরজু একটা প্রশ্নও করল না। একদিকে যেমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, অন্য দিক দিয়ে ঠিক তেমনি আবার চিন্তা হলো। এমনটা তো করার কথা না আরজুর। আরমান বাড়ি ফেরার পর প্রত্যেকদিন আরজু জিজ্ঞেস করে ওকে সারাদিন কি কি করলো। সেই সাথে আরজু নিজে কি কি করলো সেসবও বলে, তবে আজ তার ব্যতিক্রম হলো কেন?

আজ আর আরমান এই নিয়ে কোন কথা তুললো না। কেননা যত আজ এই কথাগুলি এড়িয়ে যেতে পারবে, ততই যেন আরমানের জন্য মঙ্গল।

খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘরে এসে দুজনে শুয়ে পড়লো। এতক্ষণে আরজু মুখ খুললো। বেশ উচ্ছ্বসিত গলায় আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জানেন আরমান, আজ একটা নতুন টিউশন পেয়েছি। মাসে দশ হাজার টাকা দেবে, স্টুডেন্টের মায়ের ব্যবহারও খুব ভালো।”

আরজুকে মুখে কথা বলতে দেখে আরমান শান্তি পেল।

“তাই নাকি? তাহলে তো দেখছি আপনি বড়লোক হয়ে যাবেন আরু।”

“আরে একটা টিউশনের টাকা দিয়ে বড়লোক হওয়া যায় নাকি। আমি তো চাকরি খুঁজছি। এই দশ হাজার টাকা দিয়ে এত খরচ চালানো যায় নাকি।”

“কিসের এত খরচ? আপনার দায়িত্ব তো এখন আমার।”

“গ্রাম থেকে ফেরার সময় বাবা বলেছিল আপনি তো বেকার, আপনাকেই তো বাবা খরচ পাঠায়। আপনি কি করে আমার দায়িত্ব নেবেন?”

আরমান বোধহয় একটু অপমানিত বোধ করলো, সেই সাথে একটু অস্বস্তিতেও পড়লো। তবে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,

“কে বলেছে আমি বেকার? আমি দোকানে যাই তো। আমি আমার বাবার দোকানের কর্মচারী। মাস শেষে বেতনও পাই।”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“বেকার হলেও সমস্যা নেই। আমি মাসে বেশ ভালোই টাকা উপার্জন করি। আমি বরং প্রত্যেক মাসে আপনাকে হাত খরচ দেবো ঠিক আছে?”

আরমান বেশ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“তাই নাকি? আমার বউ আমাকে হাত খরচ দেবে তবে তো আমি এই চাকরিটাও ছেড়ে দেব। ভালো লাগে না এসব কাজ করতে আরু।”

আরজু একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনার ভালো লাগেনা? কাজ করতে কষ্ট হয়?”

“কষ্ট হয় বলতে ভালো লাগে না। আসলে আমার দ্বারা এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকাটা হয় না। আর দোকানে গেলে তো চুপচাপ বসেই থাকতে হয়। মানুষের কথাও আমার অতটা সহ্য হয় না। আর দোকানে যেসব কাস্টমার আসে, এক একজনের কথা শুনে এমনি গা পিত্তি জ্বলে যায়।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি তবে চাকরিটা ছেড়ে দিন। আমি দরকার হলে বেশি বেশি টিউশন পড়াবো। আমি আপনার খরচ চালাবো কেমন? যেটা করলে আপনার কষ্ট হয় সেটা করতে হবে না আপনাকে।”

আরমান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আরজুর দিকে। আজকাল যেন আরমানের মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় যে এই মেয়েটাই সেই প্রথম দিনের আরজু, যে আরমানের দিকে তাকিয়ে থেকে কথা বলার অবধি প্রয়োজন মনে করত না। যার আরমানের নামটা শোনার প্রতিও অনিহা ছিল। যে মেয়েটা দু চোখে সহ্য করতে পারতো না আরমানকে, বিশ্বাসই করতে পারতো না। আর আজকে সেই মেয়েটাই আরমানের কষ্টের কথা ভাবছে। আরমানের কষ্ট কমাতে নিজেকে কতটা কষ্ট করতে হবে সেদিকেও ভাবছে না।

এদিকে আরমানকে নিজের দিকে এভাবে একনাগারে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরজুর চিন্তা হলো। ভাবলো কে জানে আরমান হয়তো খারাপ ভাবল। অস্বস্তি মাখানো গলায় বলল,

“আমার কথায় কি আপনি খারাপ ভাবলেন? আসলে আমি আপনাকে ছোট করার জন্য বলিনি যে আমি আপনার হাত খরচ দেব। আমি আপনাকে এটাও বোঝাতে চাইনি যে আপনাকে দিয়ে কিছু হবে না। আপনার কষ্ট হয় জন্য বললাম।”

আরমান আলতো হেসে আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আপনার কোন কিছুই আমার খারাপ লাগে না আরু। আপনি কি জানেন আপনি ভালোবাসা পাওয়ার মতনই একজন মানুষ? আপনি কি বোঝেন আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি?”

আরজু আরমানের প্রশ্নের উত্তরটা না দিয়ে পাল্টা নিজে প্রশ্ন করলো,

“আপনি কি বোঝেন আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি?”

“একটু একটু বুঝি। কখনো মনে হয় আপনি বোধহয় আমাকে অনেকটা ভালোবাসেন, আমি আপনাকে যতটা ভালোবাসি তার থেকেও বেশি। কখনো আবার মনে হয় হয়তো আপনি আমায় ততটাও ভালোবাসেন না।”

“আমি আপনাকে ততটা ভালোবাসি যতটা ভালোবাসলে চোখ বন্ধ করে আপনাকে বিশ্বাস করা যায়। আমি আপনাকে ততটা ভালোবাসি যতটা ভালোবাসলে আপনার বলা মিথ্যেগুলোকে আমি সত্যি ধরতে চাই। আমি আপনাকে ততটা ভালোবাসি যতটা ভালোবাসলে আমি নিজের চোখকে মিথ্যে ভেবে নিতে পারি, তবে আপনার বলা কথাগুলো কে না।”

হঠাৎ করে আরজুর মুখ থেকে এমন সব কথা শুনে আরমান ঘাবড়ালো।

“হঠাৎ এসব কেন বলছেন আরু? এত সত্যি, মিথ্যে, বিশ্বাস, অবিশ্বাসের কথাই বা কোথা থেকে এলো?”

“ভালোবাসলে তো বিশ্বাস থাকতে হয়। আর আমি যদি কাউকে বিশ্বাস করি তবে সবটা দিয়ে বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস এতটাই মজবুত হয় যে আমি নিজেকে মিথ্যে ধরে নিতে পারি, তবে যাকে বিশ্বাস করি তাকে না। সে মিথ্যে বললে আমি তার মিথ্যে গুলোকেও সত্যি ভেবে ভালো থাকতে পারি। তবে যাকে বিশ্বাস করিনা সে সত্যি বলুক বা মিথ্যে কোন কিছুতেই আমার যায় আসেনা।”

আরমান কিছু একটা যেন আন্দাজ করতে পারলো, আবার পারলো না। একবার মনে হলো আরজুর হঠাৎ করে এসব কথা বলার কারণ বোধহয় আরমান জানে। পরক্ষণেই আবার মনে হলো, না জানে না। আরমানের এসব ভাবনার মাঝে আরজু বলে উঠলো,

“ঘুমিয়ে পড়ুন। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।”

আরজু কথাটা বলে অন্য পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেল। আরমানেরও মনে হলো ও যা ভাবছে সেগুলো ঠিক না। যদি আরজু কোন কিছু সন্দেহ করে থাকতো, তবে সরাসরি বলে দিত। আরমানও ঘুমিয়ে পড়ল।

__________

আজ আবারো আরজু টিউশন পড়াতে এসেছে সেই একই এলাকায়, যেখানে এর আগের দিন আরমানকে দেখেছিল। তবে আজ নির্দিষ্ট সময়ের একটু আগে এসেছে।

আরমান বাড়ি থেকে বলে বেরিয়েছে আজও ভার্সিটি থেকে দোকানে যাবে। আরজু এখানে আসার আগে দোকানে গিয়েছিল, তবে সেখানে আরমানকে পায়নি। আরমান কে কলও করেছিলো, তবে আরমান কলটা রিসিভ করেনি। আর তাই আরজুর কেন যেন মনে হয়েছিল যে আরমানকে আজও হয়তো এখানেই পাবে।

প্রায় বিশ মিনিট যাবত আরজু রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই সরু গলিটার সামনে। তবে আরমানের দেখা পায়নি। আরজুর এখন মনে হচ্ছে ও বোধহয় বোকামি করছে। এভাবে কি কারো দেখা পাওয়া সম্ভব নাকি, তাও যেখানে জানেই না যে আরমান আদৌও আজ আসবে কিনা। আবার এমনও তো হতে পারে হয়তো অন্য কোন সময় এসেছিল, কিংবা আরজু চলে যাওয়ার পরে হয়তো আসবে।

আরজু নিজেই একবার নিজেকে প্রশ্ন করলো,

“আমি কি বোকামি করছি? আমি তো আরমানকে বিশ্বাস করি, তবে এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছি কেন? তবে কি আমি সন্দেহ করছি আরমানকে?”

আরজুর মনের ভেতরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেল। আরজু আরমান কে সন্দেহ করছে। কিন্তু আরজু তো আরমান কে সন্দেহ করতে চায় না। আরজু তো বিশ্বাস করে আরমানকে।

আরজু ভাবলো ওর এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হবে না। তবে ভাগ্য বোধহয় চাইলো যে আরজু আরমানের দেখা পাক। সেজন্যই তো আরজু যে মুহূর্তে চলে যেতে চাইলো ঠিক তখনই সেখানে আরমানের দেখা পেল। একটা রিকশা থেকে নামলো আরমান।

আরজু দেখলো আরমানকে। চমকে উঠলো আরজু। তার মানে ওর সন্দেহ ঠিক ছিল। আরজু এবারে দ্বিধাদন্দের মাঝে পড়লো যে এখনো এখানে দাঁড়াবে নাকি চলে যাবে। কেন যেন নিজের মনকে রাজি করাতে পারল না চলে যাওয়ার জন্য। মনে হলো আরজুর দেখা উচিত আরমান এখানে আবার কেন এসেছে। কেনই বা আরজু কে সমানে মিথ্যে বলে যাচ্ছে।

রিকশা থেকে নেমে আরমান কাউকে একটা কল করলো। কথা বলে ফোনটা রেখে দিল। কিছুক্ষণের মাঝে সেদিনের সেই মেয়েটা এলো। তবে আজ আর আগের দিনের মতন পোশাক পড়েনি, উদ্ভট ভাবে সাজেওনি। মেয়েটাকে আজ আগের দিনের থেকেও বেশি সুন্দর লাগছে। মেয়েটা একা না, ওর সাথে আরও একটা ছেলেও এসেছে।

কিছুক্ষণ সেখানে কথাবার্তা বলে তিনজনে মিলে সরু গলির ভেতরে গেল। আরজু নিজেকে কোন মতেই আটকাতে পারলো না। আরমান কেন এই গলির ভেতরে যাচ্ছে তাও এই রাতের বেলা আরজু কে সেটা জানতেই হবে। এই জায়গাটায় তো কোন ভদ্র বাড়ির লোকজন আসতে পারে না, তাও আবার নিয়মিত। তবে আরমান কেন আসছে এখানে বারবার? তাও একটা মেয়েকে সাথে নিয়ে।

রাস্তা পার হতে আরজুর একটু সময় লাগলো। ততক্ষণে আরমানরা অনেকটা দূরে এগিয়ে গেছে। আজকেও আগের দিনের মতনই পরিবেশ দেখতে পেল। তবে আজ আরজু ভয় পেল না। মনে মনে নিজেই নিজেকে সাহসী হিসেবে আখ্যায়িত করল।

তবে এত তাড়াতাড়ি আরমানরা চলে গেল কি করে। বেশ অনেকটা সময় হাঁটার পর আরজু বেশ লোক সমাগম পূর্ণ একটা জায়গায় এসে পড়ল। আর এই জায়গাটাই যে আসল নিষিদ্ধ পল্লী সেটা বুঝতা বাকি রইল না।

সামনে তাকাতেই আরমান কেও দেখতে পেল। অশ্লীল জামা কাপড় পরা যে মেয়েগুলোকে দেখলে আরজুর অস্বস্তি হচ্ছে তাদের মধ্যে থেকে দুই একজন আরমানের সাথে আবার কথা বলার চেষ্টা করছে, মাঝে মাঝে আবার আরমানের গায়ে হাতও দিচ্ছে। আর আরমান সেসব সহ্য না করে ওদের হাত সরিয়ে দিচ্ছে।

আরজু ধীরে ধীরে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ওর বিশ্বাসটাও যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এমন জায়গায় তো আর কেউ এমনি এমনি ঘুরতে আসবে না তাই না? অন্তত পুরুষ মানুষ। আরজুর মনে হলো এবারে এই লুকোচুরি খেলাটা থামানো দরকার। আরমানের মুখোমুখি হয়ে দেখা যাক না আরমান এখনো মিথ্যে বলতে পারে কিনা।

আরজু এগিয়ে গেল আরমানের দিকে। আরমানের থেকে দূরত্ব তখন খুবই সামান্য। আরমান পিছন দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে। আরজু একবার ডাকলো আরমানকে,

“আরমান!”

আরমান চমকে উঠলো ডাকটা শুনে। এখানে আরজুর কন্ঠ কি করে এলো? এটা তো আরজুরই কন্ঠ ছিল। আরমান তৎক্ষনাত ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল স্বয়ং আরজু দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে ফুটে উঠেছে আরজুর তীব্র অসহায়ত্ব।

হঠাৎ করে আরজু কে এখানে দেখে আরমানের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল। আরমান খেয়াল করলো আরজুর চোখ দুটো কেমন যেন ছলছল করছে। আরমান বুঝতে পারলো আরজু ভুল ভাবছে। আরজু কে বোঝাতে হবে ঠিকঠাক। আরমান কিছু বলে ওঠার আগে আরজুই বলে উঠলো,

“আমি আপনাকে বিশ্বাস করি আরমান। আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে চাই। তবে একটা ব্যাপার আমার বিশ্বাসে ফাটল ধরাচ্ছে, এখানে তো আপনি ঘুরতে আসেননি নিশ্চয়ই তাই না? একদিন না, পরপর দুদিন আমি আপনাকে এখানে আসতে দেখলাম। তবে কি এখানে আপনার নিয়মিত যাতায়াত আছে? যে কারণে আমি ফিরোজকে ঘৃণা করি সেই একই স্বভাব কি আপনার মাঝেও আছে?”

আরমান বিদ্যুৎ বেগে বলে উঠলো,

“না আরু। কি বলছেন এসব? আপনি ঠিকই বলেছেন আমি এখানে ঘুরতে আসিনি, আমি একটা কাজে এসেছি।”

আরজুর গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আরমান অস্থির হয়ে উঠলো আরজুর চোখের জল দেখে। আরজু কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“আরু, আমায় দুটো মিনিট সময় দিন আপনাকে বোঝানোর জন্য। তার আগে আপনি এখান থেকে চলুন। আপনি কেন এই জায়গায় পা দিয়েছেন?”

“আপনিও তো পা রেখেছেন এই জায়গাটাতেই।”

“সে তো আমি বাধ্য হয়ে একটা কাজে এসেছি।”

“আমাকেও তা আপনি বাধ্য করেছেন, আমিও তো একটা কাজে এসেছি। কাল আমায় মিথ্যে কেন বলেছিলেন? আমি কেন যেন পারছি না আর আপনার মিথ্যে গুলোকে সত্যি হিসেবে ধরে নিতে। আমি যে গতকালও আপনাকে এখান থেকে বের হতে দেখেছিলাম আরমান। আর আপনি কি অনায়াসে আমায় মিথ্যে বলে দিলেন ফোনে। আর আমি রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আপনাকে।”

আরমান বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“গতকাল আপনি দেখেছিলেন আমায়? কথা বলেননি কেন?”

বিজ্ঞাপন

“আপনি তো খুব ব্যস্ত ছিলেন। এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে পাশে বসা মেয়েটার সাথে হেসে হেসে গল্প করছিলেন, অথচ ফোনের স্ক্রিনে আপনার আরুর নামটা ভেসে ওঠা সত্ত্বেও আপনি কলটা রিসিভ না করে পকেটে রেখে দিয়েছিলেন। আপনার এত ব্যস্ততার মাঝে বিরক্ত করতাম কি করে?”

ওদের এসব কথাবার্তার মাঝেই এক ভদ্র মহিলার আগমন ঘটলো সেখানে। ভদ্রমহিলা বললে হয়তো ভুল হবে। কেননা তার পোশাক আশাক, চলাফেরার ভাবভঙ্গি কিংবা কথাবার্তা কোন কিছুই প্রমাণ করে না যে সে ভদ্র ঘরের মেয়ে। বয়স তার বেশ ভালোই হয়েছে, তবে চেহারায় সৌন্দর্যের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এখনো। নিজের অপূর্ব সৌন্দর্যের জন্য নিষিদ্ধ পল্লীতে সে একটা নতুন নামও পেয়েছে, রূপসী। আর তার এই নামের সার্থকতাই তার রূপ লাবণ্য এখনো প্রমাণ করে।

রূপসী এসে সরাসরি আরমানের কাঁধের উপরে হাত রাখলো। হঠাৎ করে কাঁধে কারও স্পর্শ অনুভব করতেই আরমান চমকে উঠলো। পাশে তাকিয়ে রূপসীকে দেখতেই ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। বিরক্তিকর গলায় বলল,

“দূরে থাকুন।”

রূপসী তখন পান চিবোচ্ছিলো। পানের পিকটুকু ফেলে পুনরায় আরমানের কাঁধের উপর হাত রেখে বলল,

“তা বাবু, এই নিষিদ্ধ পল্লীতে পা রাখতে গা ঘিন ঘিন করেনা, আর আমাদের ছোঁয়াতেই গা ঘিন ঘিন করছে। তবে আমার সাহায্য নিতে চাইতে এসেছো কেন? তোমাদের ভদ্র সমাজের জাত যাবে না?”

আরমান ফের রূপসীর থেকে দূরে সরিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনি জানেন আমি এখানে একটা কাজে এসেছি।কোন কাজে এসেছি সেটাও জানেন। তাই বাজে কথা বন্ধ করুন। আর অযথা আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না, আমার পছন্দ না এসব।”

রূপসী শুধু হাসলো, তবে মানলো না আরমানের কথাটা। আবারো আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে একহাতে আরমানের চোয়ালটা ধরে বলল,

“বাবুর মাথা দেখছি ভীষণ গরম। তা বাবু ঘরে চলুন, নতুন মেয়ে এসেছে। আগে মাথা ঠান্ডা করি, তারপর না হয় এসব আলোচনা হবে।”

রূপসী কথাটা বলতেই আরজু রাগান্বিত গলায় রূপসী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার আরমান এমন না। আপনি দূরে সরে যান ওর থেকে। আমার সহ্যের সীমা ছাড়াবেন না।”

রূপসীর দৃষ্টি পড়লো এবারে আরজুর ওপরে। আরমান কে ছেড়ে দিয়ে এবার আরজুর দিকে এগিয়ে এসে বলল,

“ওমা, বাবু দেখি সঙ্গে করে আবার একটা মেয়েও নিয়ে এসেছে। তা বাবু বেঁচতে এসেছো, নাকি একদিনের জন্য ঘর ভাড়া করতে এসেছো?”

আরমানের মাথাটা এবারে গরম হয়ে গেল। আগে এসে আরজু কে নিজের পিছনে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে রূপসীকে শাসিয়ে বলল,

“ও আমার স্ত্রী। ভুলেও আমার স্ত্রীকে নিয়ে কোন আজেবাজে কথা বলবেন না আপনি। আমার স্ত্রী পবিত্র। ওকে অপবিত্র করার চেষ্টা করবেন না।”

রূপসী তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“আরে যাও যাও। তোমাদের মতন ছেলেরা যে স্ত্রীর পবিত্রতা, অপবিত্রতা নিয়ে কতটা মাথা ঘামাও সেসব জানা আছে। দুদিন পর তো এসব সহজ সরল মেয়ের ঠিকানা এমনি পল্লীই হয়। আর তোমরা গিয়ে তখন পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ে কর বড় বাড়ির মেয়েদের। তোমাদের সবাইকে চেনা আছে। তুমি হয়তো জানো না বাবু, রোজ আমাদের এই পল্লীতে কমপক্ষে একটা মেয়ে আসবেই যাকে নিজের প্রেমিক বিক্রি করে দিয়ে যায় এখানে। কারো কারো আবার স্বামীও বিক্রি করে দিয়ে যায়। তাই এসব প্রেম পিরীতির কথা আমার সামনে বলতে এসো না।”

রূপসী এবার আরমানের পেছনে দাঁড়ানো আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আর এই যে মেয়ে তোমায় বলছি, আদৌও তোমরা স্বামী স্ত্রী কিনা জানিনা। তবে যদি স্বামী হয়েও থাকে, তবে তাও তাকে ভরসা করে কখনো এমন জায়গায় পা রাখতে নেই। নিজের ছায়াকেও তো বিশ্বাস করতে নেই, সেখানে বিশ্বাস করো পুরুষ মানুষকে। কখন কোথায় কিভাবে তোমার জীবনটা ধ্বংস করে দেবে টেরও পাবে না।”

রূপসীর এত বড় একটা কথার প্রেক্ষিতে আরজু কিছু বলল না। আরমান ভাবল আরজুর মনে হয়তো অবিশ্বাসগুলো আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আরজুর দিকে তাকাতেই দেখলো আরজু বেশ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রূপসীর দিকে, যেন কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। কিংবা রূপসীকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

আরজু কে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রূপসী বলে উঠলো,

“কিরে মেয়ে, রূপসীর রূপে মুগ্ধ হলি নাকি? তুই মেয়ে মানুষ, তোকে মুগ্ধ করতে পারলাম অথচ কাল থেকে তোর এই স্বামীকে একবারও আমার দিকে ভালো করে তাকাতেও দেখলাম না। ছেলেটা বোধহয় ভালো। তবে তাও তোকে বলবো বিশ্বাস করিস না। শুরুতে সবাই ভালো থাকে, তারপর ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়ে পালিয়ে যায়।”

রূপসী এবার আরমানের দিকে এগিয়ে এসে আরমানের গালে আলতো করে হাত ঠেকিয়ে বলল,

‘তুমি ঘরে এসো বাবু। তোমার সাথে আলাদা করে কথা বলবো।”

আরমান এক ঝটকায় রূপসীর হাতটা সরিয়ে দিল। রূপসী হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“হায় রে পুরুষ, তোমার কতই রূপ। আজ এই রূপসীর ছোঁয়া ঘৃণ্য মনে হচ্ছে। অথচ একদিন এই রূপসীও এই সমাজে তোমাদের সাথে বাস করতো নিজের সম্মান নিয়ে। দিনশেষে তোমাদের মতন কোন এক পুরুষ বেঁচে দিয়ে গেল এখানে।”

কথাটা বলে রূপসী চলে যেতে নিল তবে হঠাৎ করে ওর কানে পিছন থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“বড় আপা!”

না চাইতেও রূপসী থেমে গেল। চট করে পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলল,

“কে ডাকলি?”

আরজু আরমানের পিছন থেকে বেরিয়ে এসে সন্দেহী গলায় রূপসীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি বড় আপা তাই না? তুমি আমার বড় আপা, আমার আকাঙ্ক্ষা আপা।”

চমকে উঠলো রূপসী। এই মেয়েটা কি করে ওর আসল নাম জানলো? আর এভাবে বড় আপা বলে ডাকছে কেন? কে এই মেয়েটা?

রূপসী প্রশ্নাত্মক গলায় আরজু কে বলল,

“কে তুই? নাম কি তোর?”

“আমি আরজু আপা। আমায় চিনতে পারছো না? তুমি আমায় আরু বলে ডাকতে। তুমি আমার আকাঙ্ক্ষা আপা তাইনা?”

রূপসী চোখ বড় বড় করে তাকালো আরজুর দিকে। সেই ছোট্ট আরজু কত বড় হয়ে গেছে। আরজু চিনে ফেললো আকাঙ্ক্ষা কে অথচ আকাঙ্ক্ষা চিনতে পারল না। তবে এই কাজটা যে ঠিক হলো না। আরজুর চেনা উচিত হলো না আকাঙ্ক্ষাকে। কাজটা তো আরজু মোটেই ঠিক করল না। অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলল।

রূপসীর এসব ভাবনার মাঝে আবারো আরজুর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। আরজু এবার দু হাতে রুপসীর দু বাহু ধরে একটু ঝাকিয়ে বলল,

“কি হলো? চুপ করে আছো কেন? বলো তুমি আমার বড় আপা তাই না? আমার স্পষ্ট মনে নেই তোমার চেহারা, তবে একেবারে ভুলেও যায়নি। আমার আপা এমন সুন্দর ছিল। তুমি এখনো সুন্দর আছো। তোমার চোখ, তোমার নাক, তোমার কপাল এসব আমি ভুলিনি।”

কান্নারা রূপসীর গলায় দলা পাকিয়ে গেল। এই কয়টা বছরে রূপসী নিজেকে অনেক শক্ত বানিয়েছে। কখনো ভাবেনি যে এই মানুষগুলোর সাথে আবার দেখা হতে পারে, তবে তারপরও নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করেছিলো যেন কখনো দেখা হলেও কেউ আর ওকে চিনতে না পারে। রূপসী এক ঝটকায় আরজু কে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বিরক্তিকর গলায় বলল,

“মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোর? স্বামীকে এই জায়গায় দেখে আমার মাথা খেতে এসেছিস? এই বাবু, তোর বউকে নিয়ে বাড়িতে যা। এসব দরকারি কথা পরে হবে।”

কথাটা বলে রূপসী ভেতরে চলে যেতে নিলে আরজু দৌড়ে গিয়ে রূপসীর সামনে দাঁড়িয়ে পথরোধ করল। রূপসী এবারে রাগী গলায় বলল,

“সামনে থেকে সর বলছি। আমার পথে দাঁড়াবি তো সোজা ভেতরে নিয়ে গিয়ে কাজে লাগিয়ে দেব।”

পেছনে দাঁড়ানো আরমান খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“আপনাকে বলেছি না আমার স্ত্রীর সাথে এভাবে কথা বলবেন না।”

রূপসী নিজেও পাল্টা খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“তোর বউকে বল না আমার রাস্তা থেকে সরে যেতে।”

“তার আগে আপনি উত্তর দিন। আপনি সত্যি আকাঙ্ক্ষা, ফিরোজের বোন?”

আরমান কথাটা বলতেই আরজু আরমানের ভুলটা সংশোধন করে দিয়ে বলল,

“না আরমান, ফিরোজ এর বোন না, আবিরের বোন। আপা তুমি কি ভুলে গেছো আমাদেরকে? আচ্ছা আমায় না হয় ভুলে গেলে, আবিরকে ভুলে যেতে পারো না তুমি। ওকে তো তুমি খুব ভালোবাসতে। ও তোমার জীবন ছিল।”

আবির! কতগুলো দিন পরে নামটা শুনলো। রুপসীর বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। খুব করে আরজু কে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো কেমন আছে ওর আবির, কত বড় হয়েছে। নিশ্চয়ই এতদিনে বিয়ে করেছে, সংসার হয়েছে, আবিরের সংসারে ছোট ছোট বাচ্চাও এসেছে। আচ্ছা আবির কে যে দায়িত্বটা দিয়ে এসেছিলো সেই দায়িত্বটা ঠিক করে পালন করেছে?

মনের মাঝে হাজারো প্রশ্ন তৈরি হওয়া সত্ত্বেও রুপসী একটা প্রশ্নও করতে পারল না। বরং রাগান্বিত গলায় বলল,

“আমি এসব আবির কে চিনি না। সর তো সামনে থেকে। ভিতরে আমার হাজারটা কাজ পড়ে আছে।”

আরজু এবারে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“এমন কেন করছো আপা? তুমি জানো আবির তোমায় কত খুঁজেছে। ঢাকা আসার পরে আমিও তোমায় খুঁজেছি। তোমার একটা বান্ধবী ছিল না, আমরা জানতাম উনি তোমার খোঁজ জানে। একদিন ওনাকে খুঁজেও পেয়েছিলাম, তবে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম ওনাকে। কেন এমন করছো? আর তুমি এখানে এইভাবে কি করছো?”

“যার যেখানে জায়গা সে তো সেখানেই থাকবে তাই না? তোর জায়গা তোর স্বামীর সংসারে তুই সেখানে যা, আমার জায়গায় এই পল্লীতে। আর কি আকাঙ্ক্ষার কথা বলছিস? আমি সেসব না, আমি হলাম রূপসী। ধান্দার সময় যত সব আজেবাজে লোকজন চলে আসে।”

কথাটা বলে রূপসী ভেতরে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে আরজু বলে উঠল,

“বেশ। আমার কাছে তো স্বীকার করলে না যে তুমি আমার বড় আপা। আমি তবে এবার আবিরকেই ডাকি। দেখি তুমি ওকে দেখার পর কি করে মিথ্যেটা বলো।”

থেমে গেল রূপসী। পিছন ফিরে তাকিয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“অযথা এসব করিস না, সময় নষ্ট হবে। আমায় যাকে ভাবছিস আমি সে না। তুই ভুল চিনছিস আমায়, অন্য কারো সাথে গুলিয়ে ফেলছিস।”

আরজু চোখের জলটা মুছে পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,

“আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে যে আমি হয়তো গুলিয়ে ফেলছি। কেননা আমার বড় আপা এতদিন পর আমায় দেখলে অন্তত একবার বুকের মাঝে জড়িয়ে নিত। আর ঠিক সেই কারণেই নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবিরকে ডাকবো। আমি দেখতে চাই ও এসে যখন তোমায় আপা বলে ডাকবে, তখন তুমি কি করে ওকে ফিরিয়ে দাও।”

রূপসী রাগে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“যা ইচ্ছে তাই কর, ম'র গিয়ে।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প