আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টুম্পা সাজছে। দুপুরের দিকে লাইলী খবর পাঠিয়েছিল যে রাতে ফিরোজ আসবে। সময় হয়ে গিয়েছে, তাই টুম্পা সাজতে বসলো। টুম্পার সাজগোজ শেষ হতে না হতেই ঘরে এসে একজন তাড়া দিয়ে বলল ফিরোজ নাকি এসে গেছে। টুম্পা তাকে দিয়ে খবর পাঠালো যে ওর সাজ এখনো হয়নি, একটু সময় লাগবে।
মেয়েটা ফিরে এসে টুম্পাকে তাড়া দিয়ে বলল যে সাজতে হবে না, এভাবেই ফিরোজ ডেকেছে।
টুম্পা তখন ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাচ্ছে। মেয়েটার কথা শুনে লিপস্টিক লাগানো বন্ধ করলো না। লাল টকটকে লিপস্টিকটা ঠোঁটে লাগিয়ে তারপরে পিছন ঘুরে তাকিয়ে মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“গিয়ে বল টুম্পা নিজের খোদ্দেরদের সামনে সাজগোজ ছাড়া আসে না। যদি আবার টাকা কম দেয় তো।”
দরজায় দাঁড়ানো মেয়েটা কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলায় বলল,
“তোদের এই ঢং আমার দেখার সময় নেই রে টুম্পা। যেতে পারবো না। আমাকেও নিচে গিয়ে নতুন কাস্টমার ধরতে হবে।”
কথাটা বলে মেয়েটা চলে গেল ঘর থেকে। টুম্পা ইচ্ছে করে সাজতে দেরি করলো। প্রয়োজনের থেকে দ্বিগুণ সময় নিয়ে সাজলো এবং খুব সুন্দর করে সাজলো। সাজগোজ শেষে মনে হলো ওর এবারে যাওয়া দরকার।
ফিরোজের জন্য বরাদ্দ ঘরটাতে ফিরোজ অপেক্ষা করছে। বেশ অনেকটা একটা সময় ধরে অপেক্ষা করছে, তবে আজ ফিরোজ কে অধৈর্য হতে দেখা গেল না।
ঘরে ঢোকার জন্য টুম্পা কোন অনুমতি নিল না। সরাসরি ভেতরে ঢুকে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। দরজা বন্ধের শব্দ পেতে ফিরোজের ধ্যান ভাঙলো। সেদিকে তাকাতেই দেখলো টুম্পা।
ফিরোজকে দেখেই টুম্পা মুখে বিস্তর হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“দেরি করানোর জন্য ক্ষমা চাইছি সাহেব। আসলে সাজগোজ করতে একটু সময় লাগলো। আপনি আবার টাকা কম দেবেন না তো এর জন্য?”
টুম্পা ভেবেছিল টুম্পার এমন কথার প্রেক্ষিতে ফিরোজ প্রচন্ড রেগে যাবে। হয়তো তেড়ে এসে চোয়াল চেপে ধরবে, কিংবা চুলের মুঠি চেপে ধরবে। আবার হয়তো রাগের সীমা ছাড়িয়ে গেলে দু'চারটে চ’ড়ও মা’র’তে পারে।
তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং ফিরোজের অভিব্যক্তির মাঝে কোন পরিবর্তনই এলো না যা দেখে টুম্পার কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো। তবে টুম্পার উদ্দেশ্য তো ছিল ফিরোজ কে রাগানোর। ফের বলে উঠলো,
“কি হলো সাহেব, কোনো উত্তর দিলেন না যে? টাকা কাটবেন নাকি? এমনটা করবেন না। নয়তো লাইলীর কাছে আবার মা’র খেতে হবে।”
ফিরোজ এবারেও টুম্পার কথার প্রেক্ষিতে কিছু বলল না। তবে এবারে বসা থেকে উঠে টুম্পার দিকে এগিয়ে এলো। টুম্পার হাতটা ধরে হাতের মুঠোয় একটা চাবি দিয়ে বলল,
“তোর নতুন ঘরের চাবি টুম্পা।”
টুম্পা চাবিটা দেখে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“আমায় অন্য কোথাও পাঠানো হচ্ছে? মানে আমি আর এখানে থাকবো না? তুমিও তো সেখানে যেতে পারবে না।”
ফিরোজ আলতো হেসে বলল,
“তোকে অন্য জায়গাতেই পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি আমি, তবে পরিবেশটা এমন হবে না। তুই একটা স্বাভাবিক পরিবেশে থাকবি টুম্পা। কাল সকালে তৈরি থাকিস, আমি এসে তোকে তোর নতুন ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে আসবো। আজ আসি।”
কথাটা বলে ফিরোজ চলে যেতে নিলে পিছন থেকে টুম্পা ওর হাত টেনে ধরে বলল,
“দাঁড়াও। এভাবে অর্ধেক কথা বলে কোথায় যাচ্ছো? আর কোথায় নিয়ে যাবে? আমার নতুন ঠিকানা মানে?”
“তোকে মুক্ত করেছি। তোর অভিযোগ ছিল না যে আমার জন্য তুই এই জায়গায় ফেঁসে গিয়েছিস? তাই সেই আমিই তোর মুক্তির ব্যবস্থা করলাম। যে টাকা দিয়ে লাইলী তোকে কিনেছিল তার দশ গুণ টাকা দিয়ে তোকে মুক্ত করেছি। তোকে আর এমন জায়গায় থাকতে হবে না টুম্পা। তুই এবারে একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবি।”
টুম্পার চোখ ছল ছল করে উঠলো। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি বললে ফিরোজ তুমি? আমায় সত্যি আর এখানে থাকতে হবে না?”
“সত্যি বলছি। তাও যদি বিশ্বাস না হয় তবে কাল সকালেই টের পাবি। তৈরি থাকিস, আমি নিতে আসবো তোকে। ফিরোজ যা কথা দেয় সে কথা রাখে।”
কথাটা বলে ফিরোজ চলে যেতে নিলে টুম্পা আবারো ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“এখান থেকে বেরোলো তো আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবো না। না জানি এই শহরের কত মানুষ কত রাত কাটিয়েছে আমার সাথে। ওরা সবাই তো আমায় চিনে ফেলবে। আমায় বাঁচতে দেবে না তো ওরা।”
“সেজন্য এই শহরে তোর থাকার ব্যবস্থাও করিনি, অন্য জায়গায় করেছি। কেউ চিনবে না তোকে সেখানে। আর যদি চিনেও ফেলে, তবে তুইও না হয় পাল্টা তার উপর আঙুল তুলবি যে সে কেন এমন একটা জায়গায় এসেছিল। ভয় দেখাবি। দেখবি এমনি চুপ করে যাবে।”
“হঠাৎ আমার প্রতি এই দয়ার কারণটা জানতে পারি?”
ফিরোজ থেমে গেল। কিছুক্ষণ নিজে আনমনে কি যেন ভেবে তারপরে বলল,
“আমার নিজের মুক্তির জন্য। তোরা মেয়ে জাতটা খুব ভয়ঙ্কর টুম্পা। আমার ধ্বংসের পেছনে বহু মেয়ে আছে। তুই, আরজু, আমার আপা, আমার আম্মা তোরা সবাই আমার ধ্বংসের কারণ। তোদের জন্য আমি ধ্বংস হয়েছি। সেজন্য এবারে কিছু অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দরকার। যার কারণে তোকে মুক্তি দিলাম। তুই তো এটাই চেয়েছিলি তাই না?”
“আমি তো আরো কিছু চেয়েছিলাম তোমার থেকে, সেটা দেবে না?”
ফিরোজ প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি?”
টুম্পা ছলছল নয়নে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমায় চেয়েছিলাম। তোমার বউ হতে চেয়েছিলাম, তোমার সাথে একটা সংসার করতে চেয়েছিলাম। আরজু কে তো পেলে না, আর না কখনো পাবে, তবে কি আমায় গ্রহণ করা যায় না? আমায় তো একটা স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিলে, তুমিও এসব ছেড়ে চলো না দুজনে একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। একটা সংসার হোক আমাদের। ফারিহা কে তো তুমি অনেক ভালোবাসো। ওকে নিজের থেকে দূরে রাখতে হয়েছে। আমাদের দুজনের একটা সংসার হলে না হয় আমরা ওকে আমাদের কাছে রাখবো আমাদের মেয়ের পরিচয়ে।”
ফিরোজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
"তৈরি থাকিস কাল সকালে। নিয়ে যাব আমি।”
কথাটা বলে ফিরোজ আর সেখানে দাঁড়ালো না, বেরিয়ে এলো। টুম্পা মেঝের উপরে বসে পড়লো।
এই নরক থেকে মুক্তি পাবে সেই কথাগুলো ভেবে একটুও আনন্দ করতে পারলো না, একটু খুশিও হতে পারল না। ফিরোজ টুম্পাকে সব দেবে, শুধু দেবেনা টুম্পার স্বপ্নের সংসারটা।
________
“আরমান ফিরোজ কে কল দিন। ওকে এক্ষুনি আসতে বলুন।”
আরজু কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। আরমান ওকে শান্ত হতে বলে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে কল করবো। আগে বাড়ি চলুন। বাড়ি গিয়ে আমরা কথা বলি, তারপর ফিরোজ কে কল করব।”
আরমানের কথা আরজু কোনমতেই মানতে পারলো না। তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না, আমি যাব না এখান থেকে। আমি এখান থেকে চলে গেলে আপাও অন্য কোথাও চলে যাবে। আমাকে এখানেই থাকতে হবে ফিরোজ না আসা অব্দি।”
“কিন্তু আরু উনি যদি সত্যিই আপনার আপা হতেন তবে তো পরিচয় দিতেন। আপনিও তো বললেন আপনার পরিচয়, তারপরও উনি কেন স্বীকার করলেন না বলুন তো? আমার মনে হয় আপনি ভুল চিনেছেন। অনেক ছোটবেলায় দেখেছিলেন তো। হয়তো চেহারার মিল আছে কিন্তু এটা আপনার আপা না।”
“অসম্ভব। আমি আমার বড় আপাকে চিনবো না এটা হতে পারে না। হ্যাঁ, এটা ঠিক অনেক ছোটবেলায় দেখেছিলাম। তাই বলে তখন এতটাও ছোট ছিলাম না যে চেহারা একেবারে ভুলে যাব। আমার বড় আপা আমায় কত ভালোবাসতো জানেন। আর সেই আপাকে আমি ভুলে যাব!”
আরমান বুঝে উঠতে পারছে না ওর এখন ঠিক কি করা উচিত। ওর সঙ্গে যে ছেলে মেয়ে দুটো ছিল ওরা অনেকক্ষণ আগেই আরমানের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। আজকে আর কোন কাজের কথাবার্তাই সারতে পারলো না।
এদিকে আরমানকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরজু বুঝতে পারলো আরমান বোধহয় ওর কথা বিশ্বাস করছে না। বিশ্বাস করতে না পারাটাই স্বাভাবিক। রূপসীর যেভাবে, যে ভাষায় আরজুর সাথে কথা বলল তাতে যে কেউ ভাববে যে এটা কখনোই আরজুর বোন হতে পারে না।
আরমান কখন ফিরোজকে কল দেবে আরজু আর সেই আশায় রইল না। নিজের ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে ফিরোজের নাম্বার খুঁজতে থাকলো।
আরজুকে ফোনটা বের করতে দেখে আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ফিরোজ কে কল করছেন?”
“হ্যাঁ।”
আরমান একটা হতাশার শ্বাস ছাড়লো। বুঝলো এই পা'গ'লীকে আটকানো সম্ভব না।
ফিরোজ তখন বাইক চালাচ্ছে, বাড়ি ফিরছিল। টুম্পার ওখানে তো বেশিক্ষণ থাকেনি। অন্য কোথাও যাওয়ারও নেই। শেষ ঠিকানা বাড়িই। যদিও বাড়িতেও ফিরতে ইচ্ছে করে না। কেমন খালি খালি লাগে, কেউ নেই। ফিরোজকে যে একটু তিন বেলা খাবারটা সামনে বেরে দেবে তেমন কেউও নেই।
ফোনের রিংটোন ফিরোজ এর কানে এলো, তবে বাইক থামালো না। রিসিভ করার ইচ্ছে হলো না। যার কল করার হয় করুক গে।
এদিকে ফিরোজ কল না ধরায় আরজু প্রচন্ড পরিমাণে বিরক্ত হলো, আবার রেগেও গেল। রাগান্বিত গলায় বলল,
“এমনি সময় তো আমাকে জ্বালানোর জন্য শ’য়’তা’ন’টা ঠিকই ফোন করে। আর আজ যখন আমার প্রয়োজন তখন ধরছে না। হা’রা’মি কোথাকার।”
আরজু অপেক্ষা না করে আবারও কল দিলো। আবারো রিংটোনের আওয়াজ ফিরোজের কানে গেল। এবারে বিরক্ত হলো। মনে মনে ভাবলো কে কল করেছে আগে তার কাহিনীই শোনা যাক।
বাইকটা দাঁড় করিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে আরজুর নাম্বারটা দেখতেই কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। আরজু কল করেছে ফিরোজকে, এটা সম্ভব? ফিরোজের মনে হলো ভুল দেখছে। চোখটা কঁচলে আবার তাকালো ফোনের স্ক্রিনের দিকে, তবে এটা তো আরজুরই নাম্বার।
হঠাৎ করে ফিরোজের আবার একটু ভয় হলো। ফারিহার কিছু হলো কি? নাহলে কোন দরকার ছাড়া তো অন্তত আরজু কখনো ওকে কল দেবে না।
কোনরকম কোন সময় ব্যয় না করে ফিরোজ কলটা ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে আরজু? সব ঠিকঠাক?”
ফিরোজের কন্ঠটা পেতেই আরজু রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,
“শ’য়’তা’ন কোথাকার ফোন ধরিস না কেন? তোর কি মনে হয় আমি তোর সাথে প্রেম করার জন্য কল দিয়েছি, না গল্প করবো বলে কল দিয়েছি? নিশ্চয়ই কোন দরকার আছে সেজন্যই তো কল দিয়েছি।”
হঠাৎ করে আরজুর এমন রাগের কারণ ফিরোজ ঠিক বুঝতে পারল না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
“গালাগালি না করে কি হয়েছে সেটা বললে কি হয় না? এখন দেরি হচ্ছে না?”
আরজু ফিরোজের কথায় যুক্তি পেল। তাই আরজু নরম হলো। হঠাৎ করে রাগী অভিব্যক্তিটা কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ল। মৃদু কান্নার ভঙ্গিতে বলল,
“আমি বড় আপাকে খুঁজে পেয়েছি ফিরোজ।”
চমকে উঠলো ফিরোজ। নিজের কানকে যেন ঠিক বিশ্বাস হলো না। সন্দেহী গলায় বলল,
“কি বললি আরজু? কাকে খুঁজে পেয়েছিস?”
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আরজু এবারে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। কান্নার তোপে কিছু বলতেও পারল না। আরজু কে কাঁদতে দেখে আরমানের ভীষণ মায়া হলো। ইচ্ছে করলে আরজু কে থামাতে, তবে থামালো না। মেয়েটা তো কাঁদতেই চায় না। এখন যখন কাঁদছে তখন একটু কাঁদুক। নিজের কোন আপন মানুষকে দেখে যে আরজু কাঁদছে এটাই তো বড় ব্যাপার।
এদিকে হঠাৎ করে এভাবে আরজুর কান্নার শব্দে ফিরোজ বিচলিত হয়ে উঠলো। উদ্বিগ্ন গলায় বলল
“কি হয়েছে আরজু? কাঁদছিস কেন?”
কান্নার তোপে আরজু কিছু বলতেও পারলো না। হঠাৎ করে ফিরোজের মনে হলো আরজু বোধহয় ভালো নেই। রাগী গলায় বলে উঠলো,
“কি হয়েছে আরজু বলতো আমায়? কাঁদছিস কেন? আরমান কিছু করেছে তোর সাথে, তোকে কষ্ট দিয়েছে? একবার শুধু আমায় বল গিয়ে ওর গলা কে’টে রেখে আসবো।”
অন্য সময় হলে ফিরোজের বলা এই কথাটার জন্য ওকে বেশ ভালোই কথা শুনতে হতো আরজুর কাছে। প্রচুর গালাগালিও করতো আরজু। তবে এখন আরজু সেসব ধান্দাতেই নেই। ক্রন্দনরত গলাতে বলল,
“আমি বড় আপাকে খুঁজে পেয়েছি। আকাঙ্ক্ষা আপাকে খুঁজে পেয়েছি। ফিরোজের না, আবিরের আপাকে খুঁজে পেয়েছি আমি।”
ফিরোজের বিশ্বাস হলো না আরজুর বলা কথাটা। এবার তো স্পষ্ট শুনেছে, তবে তাও বিশ্বাস হলো না।
“মজা করছিস আমার সাথে আরজু? আমি জানি তুই আমায় কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাস, আমি কাঁদলে তুই খুব ভালো থাকিস, তাই বলে এই বিষয়টা নিয়ে মজা করিস না আমার সাথে।”
“আমি মজা করছি না। বিশ্বাস কর আমি সত্যি খুঁজে পেয়েছি বড় আপাকে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুই আরমানের সাথে কথা বল।”
ফিরোজ গম্ভীর গলায় বলল,
“থাক তার দরকার নেই। আমি তোর কথাই বিশ্বাস করি। তোর কথাই আমার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তুই কি করে খুঁজে পেলি? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি কত খুঁজেছি আপা কে, আর তুই কি করে চেষ্টা না করে খুঁজে পেয়ে গেলি? আমার মনে হয় তুই অন্য কাউকে দেখেছিস।”
“একটা থা’প্প’র দেবো তোকে। আমার আপাকে আমি ভুল চিনব? তুই না হয় পুরনো সবকিছু ভুলে গিয়ে অমানুষ হয়ে গেছিস, তবে আমি এখনো সেই পুরনো আরজুই আছি যে তার আপা কে ভীষণ ভালোবাসে।। কিন্তু জানিস ফিরোজ, আপা স্বীকার করছে না যে ওটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা আপা। তুই একটু আয় না। আমি জানি তুই এসে যদি আপাকে ডাকিস, আপা তোকে ফিরিয়ে দিতে পারবেনা।”
ফিরোজের মাঝে একটা চাপা উত্তেজনা তৈরি হলো। আরজুর কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে, আবার বিশ্বাস করতে পারছেও না। যেখানে ফিরোজ এতগুলো বছর ধরে, এত চেষ্টা করছে তা সত্বেও আকাঙ্খা কে খুঁজে পায়নি, সেখানে আরজু কি করে পেয়ে গেল। কোথায় বা পেল। আবার এই যে বলছে আকাঙ্ক্ষা স্বীকার করছে না তাহলে কি ফিরোজের সন্দেহটাই ঠিক, আরজু ভুল বুঝছে।
ফিরোজ সন্দেহী গলায় বলল,
“না আরজু, আমার মনে হচ্ছে তুই ভুল দেখেছিস। অযথা আমাকে এত দূর থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিস না।”
আরজু এবার রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,
“বলছি তো ওটা আপা। তুই না এলে কিন্তু সব শেষ হয়ে যাবে। আপা কিন্তু আবার হারিয়ে যাবে। এক্ষুনি রওনা দিবি তুই।”
“এত অধিকার দেখাচ্ছিস যে? তোর কি সাজে আমাকে এভাবে বলা?”
“আমি তোকে আমার কোন প্রয়োজনে ডাকছি না। তোকে বিয়ে করবো বলেও ডাকছি না, ডাকছি তোরই প্রয়োজনে। আপা কোথায় আছে জানিস? যে জায়গাগুলোতে তোর নিয়মিত যাতায়াত, যে জায়গাগুলোতে তুই টুম্পার মতন নিষ্পাপ মেয়েদেরকে এনে ফেলিস। আপা সেই জায়গায় আছে যে জায়গায় মেয়েদের পরিচয় হয় বে'শ্যা।”
আঁৎকে উঠলো ফিরোজ। এবারে কপালে তৈরি হওয়া ভাঁজটা আরেকটু গাঢ় হলো। কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। কি বলল এসব আরজু। ওখানে কি করে থাকবে আকাঙ্ক্ষা। ওর তো এমন জায়গায় যাওয়ার কথা না। তাছাড়া আরজু যখন এত জোর গলাতে বলছে তবে কি সত্যি ওটা আকাঙ্ক্ষাই।
এদিকে ফিরোজের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আরজু ফের অসহায় গলায় বলল,
“আয় ফিরোজ। আমি তোকে বলছি ওটা বড় আপা।”
ফিরোজের মনে হলো ওর একবার গিয়ে দেখা উচিত। সারা জীবন তো আকাঙ্খার খোঁজে কত জায়গায় না গেল, আর এই একবার যেতে পারবে না যেখানে বলছে আরজু খোঁজ পেয়েছে।
“ঠিক আছে আসছি। তোর স্বামীকে বল আমার ফোনে ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিতে।”