তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৬০

🟢

দেয়ালের রং চটে যাওয়া একটা ঘরের চৌকির উপর বসে আছে ফিরোজ। ঘরের কোন জানালা নেই। পুরো ঘর রঙিন লাইট দিয়ে সাজানো। একটু আগে একজন লোক গিয়ে ফিরোজ কে ডেকে নিয়ে এসেছে। বলেছে রূপসী ওর সাথে কথা বলতে চায়। ফিরোজ কোনরকম সময় ব্যয় না করে লোকটার সাথে চলে এসেছে। আশা একটাই, রূপসী হয়তো নিজের আসল পরিচয় বলবে। এতগুলো বছর পর ফিরোজ হয়তো নিজের আপাকে খুঁজে পাবে।

ফিরোজ দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। রূপসী যে ঘরে এসেছে সে দিকে খেয়াল করেনি। রূপসী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে রইল। রূপসী যখন ফিরোজকে শেষবার দেখেছিল তখন অনেক অল্প বয়স ছিল ফিরোজের। এখন বয়স বেড়েছে ফিরাজের, চেহারার মাঝেও পরিবর্তন এসেছে। তবে রূপসীর চিনতে ভুল হয়নি নিজের ভাইকে।

দরজার কাছে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো না রূপসী। ধীরপায়ে ঘরের ভিতরে এসে চৌকিতে ফিরোজের পাশে বসলো। ফিরোজ তাও খেয়াল করল না যে চৌকিতে তার পাশে এসে কেউ বসেছে।

“আমার মেয়েটা কি বেঁচে আছে আবির?”

চমকে উঠল ফিরোজ। কন্ঠটা অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো রূপসী বসে আছে। কিছুক্ষণ হা করে ফিরোজ তাকিয়ে থাকলে রূপসীর দিকে। বুঝতে পারল না রূপসী সত্যি ওকে এই প্রশ্নটা করল নাকি ও ভুল শুনলো। ফিরোজ এও বুঝতে পারল না যে রূপসী ওকে আবির বলে ডাকলো নাকি এটাও ভুল শুনলো।

ফিরোজকে নিজের দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখেই যেন ফিরোজের মস্তিষ্কে চলতে থাকা এই সকল প্রশ্ন রূপসী বুঝতে পারল। রূপসী ঠোঁট জোড়া কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো। মনের মাঝে একটা ইচ্ছে তৈরি হলো, ফিরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার। হাতটা তোলার সময় রূপসী অনুভব করল হাতটা কেমন যেন ভার ভার অনুভূত হচ্ছে। বহু কষ্টে কম্পনরত হাতটা ফিরোজের মাথায় রাখলো রূপসী। সযত্নে হাত বুলিয়ে দিল ফিরোজের মাথায়। রূপসীকে আর আল্লাদা করে পরিচয় দিতে হলো না যে ওই আকাঙ্ক্ষা। রূপসী এবারে আর নিজের পরিচয় লুকোলোও না। রূপসীর ছল ছল চোখ দুটো দেখেই ফিরোজ সব বুঝে গেল।

হঠাৎ করে ফিরোজ ডুকরে কেঁদে উঠলো। আকাঙ্ক্ষার থেকে অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। এতদিন পর যে দেখা হলো তার জন্য কোন সংকোচও কাজ করল না ফিরোজের ভিতর। একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়লে আকাঙ্ক্ষার উপর। দুই হাতে শক্ত করে আকাঙ্ক্ষার গলা জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

“আপা, তুমি এখানে কি করে এলে? কে এনেছে তোমাকে এখানে? সেদিন কেন চলে গিয়েছিলে? সেদিন আমার কোন কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। তবে আজ একবার শুধু তার নামটা বলো, তোমার ভাই তোমার পায়ের কাছে ওই কু’ত্তা’র বাচ্চার লা’শ এনে ফেলবে।”

আকাঙ্ক্ষা নিজেও ফিরোজের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“সেদিন আমি যতটা নিরুপায় ছিলাম ততটা নিরুপায় এ পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না আর কখনো হবেও না রে ভাই। আমি বাধ্য হয়ে চলে এসেছিলাম। আমার কাছে আর কোন উপায় ছিল না।”

“কি এমন বাধ্যবাধকতা ছিল এখন আমায় বলো। তখন আমি কিছু করতে পারিনি। তবে এখন তোমার ভাইয়ের ক্ষমতা আছে।”

“তুই পারবি না ওদের সাথে আবির। ওদের ক্ষমতা অনেক। ওদের ক্ষমতার কাছে আমরা টিকতে পারবো না রে। সেজন্যি তো দেখছিস না আজ তোর আপার অবস্থান কোথায়। একসময় আমি যার জীবন বাঁচিয়েছিলাম সে নির্দ্বিধায় আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।”

ফিরোজ এবার আকাঙ্ক্ষা কে ছেড়ে দিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“সে যতই ক্ষমতাশীল হোক না কেন আমি বুঝে নেব। তুমি শুধু আমায় একবার তার পরিচয়টা বলো।”

আকাঙ্ক্ষা বলল না পরিচয়টা। আলতো হাসলো শুধু। পুনরায় ফিরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“আগে বলতো আমার মেয়েটা কি বেঁচে আছে? তুই কি পেরেছিলি ওকে সবার থেকে আড়াল করতে? আর যদিও বেঁচেও থাকে তাহলে কি পরিচয় নিয়ে বাঁচছে ও?”

“ও বেঁচে আছে আপা। ও অনেক বড় হয়ে গেছে, ও আমার অনেক আদরের। তুমি দেখবে? দাঁড়াও, আমি দেখাচ্ছি।”

কথাটা বলে ফিরোজ পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। ফারিহার একটা ছবি বের করে আকাঙ্ক্ষার দিকে বাড়িয়ে দিল। আকাঙ্ক্ষা ঝটপট ফোনটা হাতে নিল। ফোনের স্ক্রিনের উপর আকাঙ্ক্ষার গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো। স্ক্রিনের উপরে নিজের মেয়ের গালে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একটু আদর করার চেষ্টা করল। কতদিন পর দেখল নিজের মেয়েটাকে! জন্মের পর মনে হয় একটা সপ্তাহও মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখতে পারেনি।

কি করে রাখত? জীবনের ঝুঁকি ছিল যে! তখন মায়ের কাছে থাকার থেকেও বেশি প্রয়োজনীয় ছিল বেঁচে থাকাটা। আকাঙ্ক্ষা তাই করেছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে তবে তাও মেয়েটাকে বাঁচানোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করেছে।

আকাঙ্ক্ষা কাঁদলো। সেই সাথে আবার হাসলোও। আবেগে আপ্লুত হয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এটা আমার মেয়ে আবির? এত বড় হয়ে গেছে! কি নাম রেখেছিস ওর?”

ফিরোজ নিজেও পাল্টা হেসে বলল,

“তুমি বলেছিলে ওর নাম তাহি রাখতে। সেই সাথে আমি মিলিয়ে রেখেছি ফারিহা তাহি। জানো আপা, আমার আম্মা আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ও খুব ভালো মেয়ে একদম তোমার মতন। পড়াশোনাতেও খুব ভালো। স্কুলে সবসময় ফাস্ট হয়। আমি খেয়েছি কিনা সেসব খেয়াল রাখে, আমি অসুস্থ হলে আমার সেবা করে, বাড়ি ফিরতে দেরি হলে খোঁজ খবরও নেয়। আবার মাঝে মাঝে বকাবকিও করে একদম তোমার মতো।”

আকাঙ্ক্ষা কাঁদতে কাঁদতে আবারো হেসে ফেলল। ফোনের স্ক্রিনে ফারিয়ার ছবিটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ফিরোজ উঠে গিয়ে আকাঙ্ক্ষার পায়ের কাছে দুই হাঁটু গেড়ে বসে আকাঙ্ক্ষার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“এবারে আমি তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাব আপা। তুমি এতো বছর যত কষ্ট করেছো সব ভুলে যাবে। তুমি তোমার মেয়ের সাথে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কাটাবে। তুমি আমার সাথে থাকবে।”

আকাঙ্ক্ষা আঁতকে উঠে বলল,

“এসব বলিস না। কখনো ওকে জানতে দিবি না যে ওর মা এমন জায়গায় থাকে। তাহলে ও ওর মাকে ঘৃণা করবে, নোংরা ভাববে।”

ফিরোজ ব্যস্ত গলায় বলল,

“না আপ, আমার আম্মা এমন না।ওকে বুঝিয়ে বলল ঠিক বুঝবে।”

আকাঙ্ক্ষা এবারে মলিন হেসে বলল,

“ও বুঝলেও সমাজ বুঝবে না। আমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া অত সহজ না ভাই। আমি এ সমাজে ঠিকভাবে টিকতে পারবো না। তোদের জীবন নরক হয়ে যাবে। না জানি এ শহরের কত লোক রোজ নিয়ম করে আমার কাছে এসেছে। আমি মুখ দেখাবো কি করে বল? তোদের সম্মান থাকবে না।”

ফিরোজ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। খুব মনোযোগ দিয়ে যেন কিছু ভাবার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর আকাঙ্ক্ষার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পূর্বের থেকে দ্বিগুণ শক্ত করে ধরে বলল,

“তোমাকে এখান থেকে নিশ্চয় বের করবো আপা। একবার যখন তোমার খোঁজ আমি পেয়েছি তখন তোমাকে এই ন’র’কে আমি আর থাকতে দেবো না। আর এই সমাজের কথা ভুলে যাও। সমাজের পরোয়া এই ফিরোজ করে না।”

ফিরোজ কথাটা বলতেই আকাঙ্ক্ষা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ফিরোজ কে?”

ফিরোজ একটু নড়েচড়ে উঠলো। আপাতত কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলল,

“বাদ দাও এসব কথা। তবে তুমি চিন্তা করো না, আমি খুব তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করে তোমাকে এখান থেকে বের করব। আরজু এতে সাহায্য করবে, ওর স্বামীর অনেক ক্ষমতা। তোমাকে এখান থেকে ঠিক বের করবো। এখন আসছি। আমার অনেক কাজ। তবে তুমি এখানেই থেকো। তুমি যেন আবার আমায় ফাঁকি দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেও না।”

কথাটা শেষ করেই ফিরোজ সেখানে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। আকাঙ্ক্ষার থেকে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে আকাঙ্ক্ষা একবার আবির বলে ডাকল। আকাঙ্ক্ষ ছলছল চোখে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে কেমন অসহায় গলায় বলল,

“বিশ্বাস কর, আমার মেয়েটা অবৈধ না। আমাকে যে অপবাদ দিয়ে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল সেটা মিথ্যে ছিল। আমার মেয়ে বৈধ।”

ফিরোজ চমকে তাকালো আকাঙ্ক্ষার দিকে। এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে ছিল না ফিরোজের। তার কাছে সব থেকে বড় হলো, ফারিহা ওর আপার মেয়ে। ও বৈধ কি অবৈধ সে বিষয়ে দেখার কোন প্রয়োজন নেই। তবে অনেক বছর পূর্বেও আকাঙ্ক্ষা এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করেনি ফিরোজ এর কাছে। তবে আজ করল। ফিরোজ প্রশ্নাত্মক গলায় আকাঙ্ক্ষা কে জিজ্ঞেস করল,

“ফারিহার বাবা কে আপা?”

“নাম জানতে চাস না ভাই। আমি চাই ওই শ’য়’তা’ন’টার পরিচয় কেউ কখনো না জানুক। ওর ক্ষমতার সাথে যে পেরে উঠতে পারবো না। ও যদি তোর কোন ক্ষতি করে দেয়! আমি যে মানতে পারবো না তাহলে।”

ফিরোজ আপাতত আর জোর করতে চাইলো না। ভাবলো আগে আকাঙ্ক্ষাকে এখান থেকে বের করা দরকার। তারপর নাহয় জানা যাবে সব।

“ঠিক আছে। আজ আর তোমায় জোর করলাম না। তবে একদিন তোমাকে বলতেই হবে পারিহার বাবার পরিচয়। কেননা ওর কুকর্মের শাস্তি ওকে পেতেই হবে। আসছি।”

------------------

আজ হঠাৎ করে আরমানকে কোন আগামবার্তা না জানিয়ে গ্রাম থেকে ওর মা, বাবা, ভাই, বোন সবাই শহরে এসেছে। তবে তারা আরমানের বাড়িতে ওঠেনি। সোজা উঠেছে মহিন হোসেনের বাড়িতে। আরমান কিছুই জানে না এই ব্যাপারে। কেন এসেছে সেটাও জানে না। তবে ওদের আসার খবর পেয়ে আরজুকে নিয়ে গেল সেখানে।

আসার পরে আরমান যে সংবাদটা পেল তাতে অবাক না হয়ে পারলো না। তনুশ্রী বিয়ে ঠিক করেছে, পাত্র পক্ষে দেখবে বলে নিয়ে এসেছে অথচ আরমান জানে না। আরমান তো দূর যাকে দেখতে আসবে সে নিজেও জানে না। খবরটা পাওয়ার পর আরমান আশেপাশে আগে তানভীরকে খুঁজলো। না, তানভীর কোথায় নেই। সোফার উপরে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে তনুশ্রী। আরমানের মাথায় এখন একটা কথাই ঘুরছে, তানভীর জানলে না জানি কোন ঝড় উঠে।

আরমান মৃদু রাগী গলাতে মিজান হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এসব আবার কেমন কথা বাবা? তনুশ্রীর এখনো পড়াশোনা শেষ হয় নি। এত তাড়াতাড়ি বিয়ের কি আছে? আর বিয়ে দেবে ভালো কথা আমাকে একটা বার জানাবে না?”

“তোমাকে জানানোর কি আছে? আমিতো জানি তোমাকে জানালে এখন তুমি বিয়েটা হতে দেবে না। ভালো সম্বন্ধে পেয়েছি, মেয়েও যথেষ্ট বড় হয়েছে বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো বলে আমি মনে করি।”

“তাই বলে এভাবে হুট করে বিয়ে দিয়ে দেবে? একটা তো প্রস্তুতির ব্যাপার আছে, তাই না?.....”

আরমান হয়তো আরো কিছু বলতো তবে তার আগেই আরজু ওকে থামিয়ে দিয়ে সরাসরি মিজান হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বাবা, আমার একটা কথা বলার ছিল।”

মিজান হোসেনের কন্ঠটা এবারে নরম হলো। স্নেহ পূর্ণদৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“হ্যাঁ মা বলো। আসলে মা তোমাকে জানানোর ইচ্ছে ছিল তবে তোমাকে জানালে ছেলেটাও জেনে যেত সেজন্য আর জানানো হয়নি। তবে তুমি ভেবোনা যে তোমাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“ঠিক আছে বাবা, সমস্যা নেই। তবে আমার একটা কথা ছিল। বিয়েটা ঠিক করেছেন কিন্তু আপনি কি জানেন যে তনুশ্রী কাউকে পছন্দ করে?”

বসার ঘরে ছোটখাটো একটা বি’স্ফো’র’ণ ঘটলো। অবশ্য ছোটখাটো বললে ভুল হবে, বেশ বড়সড়ই একটা বি’স্ফো’র’ণ ঘটলো।

চমকালো তনুশ্রী। সেই সাথে চমকালো বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ। সবাই এখানে উপস্থিত আছে।

সবার বিস্ময় ভরা দৃষ্টি গিয়ে পড়লো তনুশ্রীর উপর। আর আরমান বসে থেকে কপাল চাপড়ালো। একেই তো বুঝতে পারছে না আরজু বিষয়টা জানলো কোত্থেকে। তার উপরে আবার এখানে বলে ফেললো সবার সামনে। তনুশ্রী ওপর থেকে এবারে সবার অদ্ভুত দৃষ্টি গিয়ে পড়লো আরজুর ওপর। আরজু একটু থতমত খেলো। সবার এমন অদ্ভুত দৃষ্টির মানে আরজু বুঝে উঠতে পারল না। এদিকে সবাই চুপ থাকলেও চুপ থাকতে রাজি নন কল্পনা। কল্পনা বেশ জোর গলায় বললেন,

“আমি জানতাম এই মেয়ে ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে। তা আমেনা, এই ছেলেমেয়েদের নিয়ে এত গর্ব তোমার? তোমার বড় ছেলে তো পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করল, ছোট মেয়ে এক জায়গায় প্রেম করে বসে আছে, ছোট ছেলেটা আবার কোথায় কি করছে কে জানে। আমার ছেলেরা তো এমন না। বড় ছেলেকে যেখানে বিয়ে দিয়েছি মুখ বুজে মেনে নিয়েছে। আর আমার ছোট ছেলে তো আমার কথা উঠে আর বসে। মা যা বলবে তাই শোনে।”

কল্পনার কথায় বিরক্ত হলো উপস্থিত তাওকীর আর মুহিব হোসেন। আরমান তো রাগান্বিত গলায় কিছু বলে উঠতে ধরলো তবে আরজু কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে নিজেই কল্পনার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি থামুন। একেই তো আপনি অতিরিক্ত কথা বলেন, যে কথাগুলোর মাঝে অযৌক্তিক কথাই বেশি থাকে। তারপরও আপনাকে জানিয়ে দেই, গর্ব করা আপনার সাজে না। আপনার ছেলেই তনুশ্রীকে ফাঁসিয়েছে। নয়তো তনুশ্রী এমন মেয়েই না যে আপনার ছেলের পেছনে পড়ে থাকবে।”

কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলা শেষে আরজু এবারে মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বড় আব্বু, তানভীর তনুশ্রী কে পছন্দ করে। ওই মেয়েটার পিছনে পিছনে ঘুরে ছিল। তনুশ্রী এমন মেয়ে না যে ও আগে আগে তানভীর কে প্রেমের প্রস্তাব দেবে। এই বংশের সব ছেলেদের একটাই স্বভাব, শুধু মেয়েদের পিছন পিছন ঘোরা আর কি করে মেয়েদেরকে নিজেদের বাইকে তুলবে সেইসব পরিকল্পনা করা। একটা ছেলের চরিত্রও তেমন একটা ভালো না এই বংশের। কিন্তু তনুশ্রী খুবই ভালো। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আপনি তানভীর কে জিজ্ঞেস করে দেখবেন।”

আরজু কথাগুলো বলতেই কল্পনা এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠে বলল,

বিজ্ঞাপন

“এই মেয়ে, একদম আমার ভোলাভালা ছেলপর নামে অপবাদ দিতে আসবে না। তাওসিফ তোমার বউকে সামলাও। এবারে কিন্তু আমি নিজের ভদ্রতা হারিয়ে ফেলবো।”

আরজু বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“যতদিন আপনাকে দেখেছি আপনি কখনো ভদ্র ছিলেন না। আপনি বরাবরই অভদ্র বলে আমার মনে হয়েছে। তাই এখনো আপনি যদি ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়েছেন আমি একটুও অবাক হবো না। যা ইচ্ছে বলতে পারেন।”

বসার ঘরে যেন একটা গ্যাঞ্জাম বেঁধে গেল। একেই তো কল্পনার চেঁচামেচি। তার উপরে আবার মাঝে মাঝে আরজুর কিছু কথার দ্বারা বি’স্ফো’র’ণ ঘটানো। অন্যদিকে তনুশ্রীর কান্না আর বাকি সবার নিশ্চুপতা।

এরই মাঝে আবার আগমন ঘটলো তানভীরের। বাড়িতে ঢুকেই এত হইচইয়ের আওয়াজ পেয়ে তানভীর বলল,

“কি হয়েছে? এতো চেঁচামেচি কেন?”

তানভীরকে দেখতেই কল্পনার সব কিছু বাদ দিয়ে আগে ছেলের কাছে ছুটে গিয়ে ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“তুই তো তোর মায়ের কাছে কোন কথা লুকোস না, তাই না বাবা? তুই তো আমার বাধ্য ছেলে।”

হঠাৎ করে কল্পনার মুখ থেকে এমন কথা শুনে তানভীর একটু ভরকালো। তবে উত্তরও দিলো কল্পনার কথার।

“হ্যাঁ মা আমি আমার বাধ্য ছেলে। কিন্তু হয়েছেটা কি?”

“আমি জানি তুই আমার বাধ্য ছেলে। তুই আমায় মিথ্যে বলতেই পারিস না। ওই মেয়েটা মিথ্যে বলছে। ওদের দুজনের কাজই তো তাই। শুধু আমার ছেলেটার নামে বদনাম বের করা। আগে এক তাওসিফ করতো, এখন নতুন করে জুটেছে ওর বউ।”

“কিন্তু হয়েছেটা কি সেটা তো আমায় বলো?”

কল্পনাকে আগেই কিছু বলতে না দিয়ে মুহিব হোসেন বেশ গম্ভীর গলায় একবার ছেলের নাম ধরে ডাকলেন। তানভীর কল্পনাকে সেখানে রেখে এগিয়ে গেল। মুহিব হোসেনের দিকে তাকিয়ে তানভীর বলল,

“হ্যাঁ বাবা বলো।”

মুহিব হোসেন আগেই তানভীর কে জিজ্ঞেস করলেন না যে ও তনুশ্রী কে পছন্দ করে কিনা।

“তনুশ্রীর বিয়ে ঠিক করেছি আমি। আগামীকাল পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে ওকে।”

মুহিব হোসেন কথাটা বলতেই তানভীর চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“কি? কাকে দেখতে আসছে? কে দেখতে আসছে? আমাকে তো জানাওনি কিছু। তনুশ্রীকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে কেন? তনুশ্রীর বিয়ে হবে কেন? অদ্ভুত তো!”

তানভীরের এই অস্থিরতা দেখেই যেন উপস্থিত সবাই সব কিছু বুঝে ফেলল। তবে মুহিব হোসেন তাও আগেই কিছু বললেন না। ফের গম্ভীর গলায় বললেন,

“মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে তো বিয়ে দেব না? কাল বাড়িতে থেকো তুমি। বড় ভাই হিসেবে তোমার দায়িত্ব আছে তো বোনের বিয়েতে।”

তানভীর পুনরায় চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“কিসের বড় ভাই? কিসের বিয়ে? কোন পাত্রপক্ষ ঢুকবে না এই বাড়িতে। আমি কিন্তু আগেই বলে রাখছি বাবা তনুশ্রী কে দেখতে যেন কেউ এই বাড়িতে না ঢোকে। আমি কিন্তু মারামারি বাঁধিয়ে ফেলবো।”

“কেন তোমার কি সমস্যা?”

তানভীর এবারে কোনো উত্তর দেওয়ার আগে কল্পনা চেঁচিয়ে উঠে বলেলেন,

“বাবা, ওদের জালে পা দিসনা। তুই ঘরে চল আমার সাথে।”

তানভীর রাগান্বিত গলায় কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি একটু চুপ থাকো তো মা। দেখছো একটা ঝামেলার মাঝে পড়েছি, আগে ঝামেলাটা মেটাতে দাও।”

তানভীর এবারে সোজা তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তনুশ্রী, তোর বিয়ের ব্যাপারে আমায় জানাস নি কেন কিছু?”

তনুশ্রী কোন উত্তর দিল না। তানভীর আবারো রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি তনুশ্রী। তোর বিয়ে ঠিক করেছে আর তুই এরকম চুপচাপ বসে আছিস কেন? খুব শখ তাই না অন্য কাউকে বিয়ে করার?একদম ঠ্যাং ভে’ঙ্গে বাড়িতে বসিয়ে রাখব যদি আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভেবেছিস তো।”

তানভীর কথাটা বলতেই তনুশ্রী চোখ বড় বড় করে তাকালো ওর দিকে। আরজুর মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি। সরাসরি কল্পনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেখেছেন তানভীর এর মা, এই হলো আপনার গর্বের নমুনা। আপনার ছেলে আপনাকে না জানিয়ে আরও অসংখ্য কাজ করেছে। আমি বলেছিলাম না তানভীর ফাঁসিয়েছে তনুশ্রী কে। আমাদের তনুশ্রী ভালো মেয়ে, সব দোষ তানভীরের।”

তানভীর জানেনা এখানে পরিস্থিতি কি, কি হয়েছে। তবে ও সব দোষ নিজের ওপর করে নিয়ে বলল,

“হ্যাঁ সব দোষ আমার। একদম ঠিক বলেছো তুমি আমি ফাঁসিয়েছি তনুশ্রীকে। আর যেহেতু ফাঁসিয়েছি তাহলে তনুশ্রীর সাথেই আমার বিয়ে হবে। বাবা আমি তনুশ্রী কে বিয়ে করবো। আরে অনেক বছর ধরে আমাদের সম্পর্ক। এভাবে হুট করে অন্য কারো সাথে ওর বিয়ে ঠিক করলেই হলো নাকি!”

কল্পনা এবারে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। এটা কি হয়ে গেল ওনার সাথে! যে পরিবার, যে পরিবারের সদস্যগুলোকে উনি দুচোখে সহ্য করতে পারে না, সব থেকে বেশি ঘৃণা করেন, সেই বাড়ির মেয়েই কিনা হবে ওনার ছোট ছেলের বউ হবে। এই বিয়ে দেখার আগে তো ভালো ছিল উনি কবরে চলে যেতেন, তবুও কষ্ট হতো না তবে তাওসিফের বোনকে উনি নিজের ছেলের বউ হিসেবে কোনমতেই মেনে নিতে পারেন না।

___________

“তানভীর তনুশ্রীর ব্যাপারটা নিয়ে তো বাবা কিছুই বললেন না। মা তো মানবেনই না, তোমার কি মনে হয় ওদের বিয়েটা হবে?”

হিমির চিন্তিত কন্ঠের কথার প্রেক্ষিতে তাওকীর বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“বাবা যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে।”

“তোমার কি মতামত এই বিষয়ে?”

“বললাম তো বাবা যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে। আমি আপত্তি করলেও কিছু হবে না, আবার আমি মত দিলেও কিছু হবে না। সবশেষে বাবার সিদ্ধান্তটাই সবাই মানবে।”

হিমি এবারে কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“তাই বলে তোমার ব্যক্তিগত কোন সিদ্ধান্ত থাকবে না? সব সময় একই কথা বলো। হ্যাঁ আমি মানছি তুমি বাবার সিদ্ধান্তকে সম্মান করো, তাই বলে কোনটা ভুল কোনটা ঠিক সেটাও তুমি জানাতে পারো না? তুমি এ বাড়ির বড় ছেলে। বাবাও নিশ্চয় আশা করে যে তুমি তোমার মতামত জানাবে।”

তাওকীর এবারও বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“যেখানে আমার জীবনের সিদ্ধান্তগুলোই বাবা নেওয়ার আগে আমার মতামত জানার প্রয়োজন মনে করে না, সেখানে অন্যের জীবনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমি কি মতামত জানাবো।”

হিমি এবারে হাল ছেড়ে দিল। জানেই তাওকীর এমনই, তারপরও যেন কি ভেবে আজ কথাগুলো তুলেছিল।

হঠাৎ করেই আবার হিমির একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ে গেল। সেই সকাল থেকেই কথাটা তাওকীর কে বলবে বলবে করছিল, তবে সময় হয়ে ওঠেনি। আর দুপুরের পর থেকে তো একটা ঝামেলাই লেগে গেল।

তাওকীর তখন ল্যাপটপে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে ব্যস্ত। হিমে বইয়ের ভাঁজ থেকে একটা ছবি নিয়ে তাওকীরের সামনে ধরে বলল,

“এই মেয়েটা কে? দেখে মনে হচ্ছে দুজনে বিয়ে করছো?”

হিমির কথা শুনে তাওকীর চমকে উঠলো। ওর সামনে হিমি যে ছবিটা ধরে রেখেছে সেটার দিকে তাকাতেই যেন দম বন্ধ হয়ে গেল। হ্যাঁ, তাওকীর অনুভব করল কিছু মুহূর্তের জন্য ওর নিঃশ্বাস আটকে গেছিল।

তাওকীরের শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখে হিমির কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,

“এমন করছ কেন? কে এই মেয়েটা? দুজনের গলায় এমন বিয়ের মালা ঝুলছে কেন?”

তাওকীর চট করে হিমির হাত থেকে ছবিটা কেড়ে নিয়ে বলল,

“এই ছবিটা কোথায় পেলে?”

“তাহির কিছু পুরনো জামা কাপড় আর খেলনা স্টোর রুমে রাখতে গিয়ে তোমার একটা পুরনো ব্যাগ পেয়েছিলাম। তার মধ্যে থেকে এই ছবিটা পেয়েছি। কিন্তু তুমি এমন করছো কেন? এখনো তো উত্তর দিলে না এই মেয়েটা কে?”

তাওকীর জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস টেনে আগে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। তারপরে মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“একই ভার্সিটিতে পড়তাম আমরা। আমার জুনিয়র।”

“তো এভাবে মালা পরে ছবি তুলেছো কেন দুজনে? যে কেউ কিন্তু এই ছবিটা দেখে বলবে যে এটা বিয়ের ছবি। মেয়েটার পরনে লাল শাড়ি, তোমাদের দুজনের মুখেই হাসি।”

তাওকীর খুব চটজলদি একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,

“আরে ভার্সিটিতে থাকতে একটা নাটক করেছিলাম। সেই নাটকেই বিয়ে হয়েছিল।”

হিমির কাছে অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। কেননা হিমির প্রবল আত্মবিশ্বাস নিজের স্বামীর প্রতি যে তাওকীর কখনো ওকে মিথ্যে বলবে না। তাই এক কথাতেই বিশ্বাস করে নিলো। হিমি আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই নিচ থেকে ওর ডাকে এলো।

হিমি নিচে চলে গেল। তাওকীর ছবিটা হাতে নিয়ে সোজা বারান্দায় গেল। তাওকীর চাইলো না ছবিটা আর কেউ দেখুক। তার আগেই তাওকীর নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। সবকিছুই তো হয় পুড়িয়ে ফেলেছে, নয়তো লুকিয়ে রেখেছে। এই ছবিটা যে কি করে থেকে গিয়েছিলে তাওকীর জানে না।

ছবিটা ছিড়ে ফেলতে ধরলো তাওকীর, তবে কেন যেন আটকে গেল। ছবিতে তাওকীর এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আর ছবিটা কেন যেন ছিঁড়তে পারলো না। তাওকীর হার মানলো। নিজের উপর আর জোরও চালালো না। ভাবলো এটাও নাহয় কোথাও লুকিয়ে রাখবে।

সবশেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় গলায় নিজেই বিড়বিড় করে বলল,

“কোথায় তুমি আকাঙ্ক্ষা?”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প