তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৬১

🟢

মিজান হোসেনকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করার জন্য ঘরে ডেকে পাঠালেন মুহিব হোসেন। মিজান হোসেন ভাবলেন হয়তো তনুশ্রী আর তানভীর এর বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করবেন। এ ব্যাপারটা নিয়ে তিনি নিজেও বেশ চিন্তিত। সেই সাথে একটু অস্বস্তিও অনুভব করছে কেননা তানভীরের ব্যাপারটা শোনার পর থেকে কল্পনা যে আচরণ শুরু করে দিয়েছে তাতে ওনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই এই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার।

এদিকে ওনার বড় ভাই এখন অব্দি এ বিষয়ে কোন কিছুই জানাননি। সেজন্য তিনি নিজ থেকে আগে কোন সিদ্ধান্তও জানাতে পারছেন না, তবে একটা বিষয় তিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন যদি কল্পনা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেই বসে তবে তিনি মেয়েকে এ বাড়িতে বিয়ে দেবেন না।

তবে মিজান হোসানের ধারনা অনুযায়ী মুহিব হোসেন ওনাকে তানভীর আর তনুশ্রীর ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ডাকেনি। বরং ডেকেছেন অন্য কোন কারণে। যে বিষয়টাই তিনি প্রথমে জানালেন মিজান হোসেনকে।

নিজের ঘরে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে বসে আছে মুহিব হোসেন। তার সামনে চেয়ারে বসে আছে ওনার ভাই মিজান হোসেন। মিজান হোসেন স্বাভাবতই প্রচন্ড ধৈর্যশীল মানুষ। হয়তো ওনার এতটা ধৈর্যের কারণেই আরমানও এতটা ধৈর্যশীল হয়েছে। নয়তো কি আর আরজুকে সামলাতে পারে!

তিনি বড় ভাইকে কোন প্রকার তাড়া দিলেন না, কোন জোর জুলুম চালালেন না তাড়াতাড়ি কথাটা বলার জন্য। চুপচাপ ধৈর্য ধরে বসে রইলেন।

বেশ কিছুটা সময় পর মুহিব হোসেন সোজা হয়ে বসলেন। বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে মিজান হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আরজুর পরিবার সম্বন্ধে কতটুকু কি জানো তুমি? আরমান কি কি জানিয়েছে তোমাকে? বা আরমানই এ বিষয়ে কতটুকু জানে?”

মুহিব হোসেনের কাছ থেকে এই প্রশ্নটা আশা করেননি মিজান হোসেন। ফলস্বরূপ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,

“হঠাৎ এই কথা বলছেন কেন ভাইজান?”

“বলছি তার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।”

“আপনাকে আমি যতটুকু জানিয়েছিলাম ততটুকুই তাওসিফ আমাকে বলেছিল আর তাওসিক নিজেও অতটুকুই জানে।”

মুহিব হোসেনের মুখ মণ্ডল আবারও গম্ভীর হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ ভাবনা নিমগ্ন থাকার পর গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“তাওসিফকে যে আমি নিজের ছেলের চোখে দেখি এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই তোমার কোন সন্দেহ নেই?”

মিজান হোসেন সন্দেহ ব্যতীত বললেন,

“অবশ্যই ভাইজান। এখানে সন্দেহ থাকার কি আছে?”

ভাইয়ের উত্তরে খুশি হলেন মুহিব হোসেন। ফের বললেন,

“তাওকীর, তানভীর আর তাওসিফ এদের মাঝে আমি কখনো পার্থক্য করিনি। তাওসিফের যদি কিছু হয়ে যায় তুমি ওর বাবা হিসেবে যতটা কষ্ট পাবে আমিও ঠিক একই পরিমাণ কষ্ট পাবো।”

“হঠাৎ এই কথাগুলো কেন উঠছে ভাইজান? কিছু কি হয়েছে? ও কি আবার রাজনীতিতে কোন ঝামেলা করেছে নাকি?”

“ঘরেই তো একটা ঝামেল এনে তুলেছে। রাজনীতির মাঠে কোনো ঝামেলা হলে তবে তো আমিই সামলে নিতাম। আরজুর পরিবার সম্বন্ধে আমি খোঁজ নিয়েছি। ওর বাবার নামে অনেক কেস আছে, এমনকি খু’নের কেসও আছে। ওর একটা কু’লা’ঙ্গা’র ভাই আছে, ওর নামেও কেস আছে। আরজুর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড একদমই ভালো না। ওর বোনের ওখানকার কোন গুন্ডার সাথেই বিয়ে হয়েছিল, যে আবার সম্পর্কে ওদের চাচাতো ভাই হয়। আরজুর পেছনেও একটা গুন্ডা পড়েছিল, যে ক্রমাগত নাকি তাওসিফকে হুমকি দিয়ে যায়। এগুলো শোনার পর তোমার অভিব্যক্তি জানাও আমায়?”

আরজুর পরিবার যে এমনই হবে সেই বিষয়ে হালকা একটু হলেও আন্দাজ করেছিলেন মিজান হোসেন। সেই সাথে আরমানের জীবনে যে এই বিয়ের জন্য একটা হুমকি তৈরি হয়েছে সেই বিষয়ে তিনি জানতেন। তাই খুব বেশি অবাক হলেন না তিনি। শুধু তার চিন্তাটা একটু বাড়লো।

“এই সমস্ত কিছু আমি না জানলেও আন্দাজ করতে পেরেছিলাম ভাইজান। কিন্তু এখন তো কিছু করার নেই আমাদের হাতে। মেয়েটাকে তো আর এভাবে ভাসিয়ে দিতে পারি না। যতই হোক আমাদের বাড়ির বউ বলে কথা।”

“বউ আগে না ছেলে আগে?”

“নিজের ছেলে বলে ওর জীবনের মায়ায় পড়ে তো আর অন্যের মেয়েকে ভাসিয়ে দিতে পারি না তাই না, ভাইজান? ভালোবাসাটা হয়তো ছেলের প্রতি বেশী, তবে দায়িত্ববোধটা ছেলের বউয়ের প্রতিই বেশী।”

একটু নড়ে চড়ে উঠলেন মুহিব হোসেন। খুব অল্প কিছু সময় কিছু একটা ভেবে ফের গম্ভীর গলায় বললেন,

“ছেলে বড় হয়েছে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখেছে ভালো কথা। বিয়ে সারা জীবনের ব্যাপারে তাই সিদ্ধান্ত অবশ্যই তাওসিফ নিজেই নেবে। তবে সময় থাকতে আমাদেরই বোধ হয় আরেকটু কঠিন হওয়া উচিত ছিল। আমার পছন্দ করা মেয়ের সাথে যদি বিয়েটা দিয়ে দিতাম তবে ছেলেটার জীবন নিয়ে কোন হুমকি থাকতো না আর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটাও গুছিয়ে যেত।”

মিজান হোসেন অল্প বিস্তর হেসে বললেন,

“এই ব্যাপারে তো আমরা কিছু করতে পারি না ভাইজান। আপনি জানেনই তাওসিফ কেমন। আপনাকে অপমান করত না ঠিকই, তবে যদি ওর পছন্দ না হতো তবে আপনার সিদ্ধান্ত ও মানতোও না ভাইজান। তাই আপাতত তাওসিফ আর আরজুর ব্যাপারটা থাকুক। আমরা না হয় তানভীর আর তনুশ্রীর ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করি। কি ভাবলেন আপনি?”

মিজান হোসেনের এই প্রশ্নটা শুনে মুহিব হোসেনের মুখ মন্ডল আরো গম্ভীর হয়ে উঠলো। তিনি একটু চিন্তিত ভঙ্গিতেই বললেন,

“তনুশ্রীকেও আমি নিজের মেয়ের মতন দেখি। আমাদের বংশের একমাত্র মেয়ে তনুশ্রী। আমার ভাইয়ের মেয়ে আমার বাড়িতে বউ হয়ে আসবে এটা তো আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। তবে এই মুহূর্তে যে আমি তোমায় এই বিষয়টা নিয়ে কথা দিতে পারছি না।”

মুহূর্তের মাঝে মিজান হোসেনের হাস্যজ্জ্বল মুখটায় কালো ছায়া নেমে এলো। শঙ্কিত গলায় বললেন,

“কিন্তু কেন ভাইজান?”

“আরজু তোমার পরিবার আসার জন্য তোমার পুরো পরিবার এখন হুমকির মাঝে আছে। এর মাঝে আমার ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা আমি ঠিক মনে করছি না। তাওসিফের রাগটা আমার ছেলের ওপরে এসে পড়তে পারে।”

এতোটুকু বলেই থেমে গেলেন মুহিব হোসেন। মিজান হোসেনও যেন ওনার কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে গেলেন। তিনি বরাবরই আত্মসম্মানসম্পন্ন মানুষ। তার এখনো এতটাও দুর্দিন আসেনি যে নিজের মেয়েকে এখানে বিয়ে দেয়ার জন্য উনি হাতে পায়ে ধরবেন। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই মুহিব হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমি বুঝতে পেরেছি ভাইজান। বরাবরই আমি আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে এসেছি। আজও তাই জানালাম। এখন উঠছি।”

মিজান হোসেন উঠে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে মুহিব হোসেন বলে উঠলেন,

“আরজুর ব্যাপারটা কি করবে একবার ভেবে দেখো।”

মিজান হোসেন হয়তো ওনার ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন। তিনি এবারও বেশ স্বাভাবিক গলায় বললেন,

“নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য পরের মেয়েকে ভাসিয়ে দিতে পারব না ভাইজান। আমার মেয়ের ভবিষ্যত যেখানে লেখা আছে সেখানে গিয়েই ও পড়বে। তবে অসহায় মেয়েটাকে আমি আর আশ্রয়হীন করতে পারবো না।”

কথাটা বলে মিজান হোসেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। উনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে না যেতেই তাওকির ঘরে ঢুকলো। কোন অনুমতি নিলো না। মুহিব হোসেন এ অসময়ে তাওকীরকে এখানে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“কিছু বলবে?”

তাওকীর বেশ শান্ত গলায় বলল,

“সব সময় সবার সংসার ভাঙ্গা কি খুব দরকার বাবা? যদি তোমার তাওসিফের সংসারটা ভাঙার ইচ্ছেই ছিল, তবে এত ধুমধাম করে বিয়ের নাটকটা কেন করলে? মেয়েটাকে এই বলে আশ্বস্ত কেন করলে যে ও এই পরিবারের প্রাপ্য সম্মান পাবে? শুরুতেই তো আপত্তি জানাতে পারতে, তাই না? নাকি সবটাই তাওসিফ এর কাছে ভালো সাজার ব্যবস্থা?”

“নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো কিন্তু তুমি। কার কাছে জবাবদিহি চাইতে এসেছো?”

“আমি এমপি মুহিব হোসেনের কাছে জবাবদিহি চাইতে আসি নি, আমি এসেছি আমার বাবার কাছে জবাবদিহি চাইতে। এই নোংরা কাজটা করো না বাবা। একটা অসহায় মেয়ের অভিশাপ লাগবে কিন্তু। আর তাওসিফ তোমার ছেলের মতন, তোমার নিজের ছেলে না যে চুপচাপ তোমার কথা মেনে নেবে। ওরও কিন্তু অভিশাপ লাগবে। আর বাকি রইল তানভীর এর কথা, আমার ভাই আমার কলিজার টুকরো। আমার ভাইয়ের জীবন নষ্ট হতে আমি দেব না।”

মুহিব হোসেন এবার গর্জে উঠে বললেন,

“ও আমারও ছেলে। তোমার থেকে আমার চিন্তা বেশি। ভুলে যেও না, বাবার থেকে ভাইয়ের স্নেহ বেশি হতে পারে না।”

তাওকীরও পাল্টা চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“অবশ্যই হতে পারে। আমার জীবন তুমি নিয়ন্ত্রণ করেছো। আমার হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ, ভালো, মন্দ সবকিছু তুমি নিয়ন্ত্রণ করেছো। আমি কিছু বলিনি কারণ তোমায় আমি সম্মান করি। তোমার সম্মানহানি হোক এমন কোনো কাজ আমি কখনো করিনি, যার কারণে আজও অনেক ঘটনা সবার আড়ালে রয়ে গেছে। তবে তানভীরের সাথে তুমি একই কাজটা করতে পারবে না। আর সবথেকে বড় কথা তানভীর তাওকির না যে মুখ বুঝে তোমার কথা মেনে নেবে। এই বংশের মেরুদণ্ডহীন একজন পুরুষই আছে, সেটাই তাওকীর।”

মুহিব হোসেন অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“তুমি আমার সাথে গলা উঁচু করে কথা বলছো?”

তাওকীর এবার অসহায় গলায় বলল,

“বাধ্য করছো তুমি আমায় বাবা। আমার দুটো ভাইয়ের জীবন নষ্ট করো না এভাবে। তনুশ্রীও আমার বোন বাবা, আমার একমাত্র বোন, ওকে কষ্ট দিও না।”

“আরজু আমাদের পরিবারের জন্য হুমকিস্বরুপ।”

“তো তুমি সেটা সরাসরি গিয়ে তাওসিফ কে বলো। চাচাকে বলছো কেন? আর চাচাকে এভাবে অপমান করলে কেন? দোষ ছিল তোমার ছেলের। তানভীর আগে প্রস্তাব দিয়েছিল তনুশ্রীকে।”

“এ বিষয়ে আমি আর কোন কথা বলতে চাই না। একা থাকতে দাও আমায়।”

তাওকীর জানে একবার যখন মুহিব হোসেন বলে দিয়েছে এ বিষয়ে আর কোন কথা বলতে চায় না তবে বলবেই না। মুহিব হোসেনকে তাওকীর যতটা চেনে ততটা বোধহয় আর কেউ চেনে না। ওনার প্রত্যেকটা কথার মানে, উনি কখন কি করতে পারেন সেসব বিষয় তাওকীর খুব ভালোভাবেই জানে। তাওকীর চলে যেতে ধরলো। কি মনে করে যেন আবারও থেমে গেল।

পিছন ফিরে তাকিয়ে মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে এবারের শান্ত গলায় বলল,

“নিজের সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কেমন হয় সেটা তুমি কখনো অনুভব করো নি। এমন কিছু করো না যেন সেটা অনুভব করতে হয়। অনুভূতিটা কেমন হয় সেটা কিন্তু আমি জানি বাবা। একদম কলিজা ছিঁড়ে যাওয়ার মতন যন্ত্রণা হবে। সহ্য করতে পারবে না কিন্তু তুমি।”

__________

ড্রয়িং রুমে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা সভা বসেছে। কেবল হাসি দেখা যাচ্ছে কল্পনার ঠোঁটে। এই প্রথম তিনি তার স্বামীর সিদ্ধান্তে ভীষণ খুশি। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে তার স্বামীর সিদ্ধান্ত তার অনুকূলে আসবে। কি করে কি হলো সেসব তিনি জানেন না, তবে তার স্বামী যে তানভীর-তনুশ্রীর বিয়েতে আপত্তি জানিয়েছেন সে বিষয়টার কারণেই তিনি এতটা খুশি।

মুহিব হোসেনের ইঙ্গিতে বলা কথার মানেটা যখন সবাই বুঝতে পারলো তখন আরমান নিজ থেকেই মুহিব হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই বিয়েতে তোমার আপত্তির কারণটা কি আমি জানতে পারি বড় আব্বু?”

মুহিব হোসেন হালকা একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন,

“আরজুর পরিবার সম্বন্ধে আমি অনেক কিছু জেনেছি। ওর পরিবারের কেউ এখনো তোমাদের বিয়ের সম্বন্ধে জানে না, আমাদের সঙ্গে কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয়নি, তোমার জীবন হুমকি মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তোমার পুরো পরিবারের সাথেই কিন্তু একটা অদৃশ্য শত্রুতা তৈরি হয়ে গিয়েছে ওদের। সেই হিসেবে আমি এই ঝামেলার মাঝে তানভীরকে জড়াতে চাই না।”

কেমন যেন অদ্ভূত লাগলো আরমানের কথাটা। আরমান কোন যুক্তি খুঁজে পেল না।

“কিসের ঝামেলার কথা বলছো? কিসের শত্রুতা তৈরি হয়েছে, কার সাথে শত্রুতা তৈরি হয়েছে? আর কথা হচ্ছে তানভীর-তনুশ্রীর বিয়ের, তুমি আমায় আর আরজু কে কেন টানছো?”

আরমানের কথায় সায় জানিয়ে তানভীর নিজেও বলে উঠলো,

“তাওসিফ তো ঠিকই বলেছে বাবা। এর মাঝে ওদের দুজনকে টানছো কেন? ওরা জা'হা'ন্না'মে যাক আমার কিছু যায় আসে না। তবে তনুশ্রীর জন্য যদি আমাকে জা'হা'ন্না'মে যেতেও হয় তাও যেতে রাজি আছি আমি।”

তানভীর এর কথায় আরমান সন্তুষ্ট হলেও সন্তুষ্ট হতে পারলো না মুহিব হোসেন। ছেলেকে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,

“দেখছো না আমি কথা বলছি। নিজের মুখটা বন্ধ রাখো।”

তানভীর মানলো না মুহিব হোসেনের কথাটা।

বিজ্ঞাপন

“মুখ বন্ধ রাখবো কেন? আমার বিয়ের কথা হচ্ছে। আর তাছাড়া এত কথাবার্তার আমি কিছু দেখছি না। কে মানবে, কে মানবে না এসব ভেবে তাে আমি ভালোবাসিনি তাই না?”

কথাটা বলে তানভীর একবার তনুশ্রীর দিকে তাকালো। মেয়েটা কোনার দিকে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁদছে, লজ্জাও পাচ্ছে বোধ হয়। কেননা আপত্তি এসেছে তানভীরের বাড়ির পক্ষ থেকে। হয়তো ভাবছে ওর মাঝেই কোন খুঁত আছে সেই জন্য এই বিয়েটাতে রাজি হতে পারছে না মুহিব হোসেন।

তানভীরের সহ্য হলো না তনুশ্রীর চোখের জল। কে এখানে উপস্থিত আছে সেইসব দেখার প্রয়োজন মনে করলো না। সরাসরি তনুশ্রীর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর চোখের জলটা মুছিয়ে দিয়ে বলল,

“তুমি কাঁদছো কেন? আমি কি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি? আমার বাপ বিয়েতে আপত্তি জানালো, না আমার চাচা বিয়েতে আপত্তি জানালো তাতে আমার যায় আসে না। আমি যখন তোমায় কথা দিয়েছি বিয়ে করব মানে তোমাকে বিয়ে করবোই।”

এতক্ষণ সোফায় চুপচাপ বসে ছিলেন মিজান হোসেন। তবে এবারে মনে হলো ওনার কথা বলা উচিত, না হলে ওনার মেয়ের অসম্মান হচ্ছে। তিনি ভীষণ শান্ত ভঙ্গিতে তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তানভীর, আশা করছি তোমাদের এতটা অধঃপতন হয়নি যে পরিবারের আপত্তি আছে জেনেও তোমরা বিয়েটা করবে। ভাইজান যখন এই বিয়েতে আপত্তি করেছে নিশ্চয়ই অনেক কিছু ভেবেই আপত্তি করেছেন। হয়তো যা ভেবেছেন সেটা উনি আমাদেরকে সরাসরি জানাতে পারছেন না জন্য আজেবাজে যুক্তি দেখাচ্ছেন। তবে আমি ওনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। আশা করছি তুমিও করবে।”

মিজান হোসেনের কথাটা তানভীরের পছন্দ হলো না, পছন্দ হলো না আরমানেরও। অসন্তুষ্ট গলায় মিজান হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এটা কেমন কথা হলো বাবা। আর বড় আব্বু তোমাকেও বলছি, আজ তোমায় এমন অপরিচিত লাগছে কেন হঠাৎ করে? কি আজেবাজে কথা বলছো? আর আমি সবাইকে প্রথম দিনেই স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছিলাম আরুর অতীত নিয়ে, ওর পরিবার নিয়ে কেউ কোনো কথা তুলবে না।”

মুহিব হোসেন কোন উত্তর দিলেন না আরমানের কথার।

আরজু সেই শুরু থেকেই চুপ ছিল। আরো চুপ হয়ে গেল যখন জানালো যে তানভীর-তনুশ্রীর সম্পর্কটা মেনে না নেয়ার পেছনে কারণটা আরজু। ওর নিজেরই কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে ওর জন্য একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল। তার উপরে এখন আবার মুহিব হোসেন আরমানের কথার কোন উত্তরও দিলেন না। আরজুর মনে হলো এবার ওর কিছু বলার দরকার।

গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মুহিব হোসেনের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলল,

“সত্যিই কি ওদের বিয়েটা মেনে না নেওয়ার কারণ আমি?”

মুহিব হোসেন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, কোন উত্তর দিলেন না আরজুর প্রশ্নের। আরজু ফের বলল,

“যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমার বাবার খেয়ালই নেই যে আরজু নামের ওনার কোন মেয়ে আছে। আমাকে যদি আপনারা খু’নও করেন তবুও আমার বাবা আপনাদের থেকে এর কারণ জানতে আসবে না। বিশ্বাস করুন আমি কেউ না আমার বাবার।”

মুহিব হোসেন এবারে আরজুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“আর তোমার সেই গুন্ডা চাচাতো ভাই, যে তোমার পিছনে পড়েছিল? যার ভাইয়ের সাথে আবার তোমার বোনেরও বিয়ে হয়েছিল। কিছুদিন আগে তো দিয়ে গিয়েছে এখানে তোমার বোনকে তাই না? তুমি এমন একটা জায়গা থেকে এসেছো যে তোমার আশেপাশে কেউ শান্তি তে থাকতে পারবে না।”

আরজু খুব আঘাত পেল কথাটায়। আরজু সত্যি কখনো ভাবেনি এই পরিবারে এই কথাগুলো উঠবে। তবে আরজু রেগে গেলো না। কেননা ওকে পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে। এই কয়দিনে প্রার্থনা শিখিয়েছে আরজু কে, সংসার করতে হলে সব সময় মুখ খুলতে নেই। কিছু সময় মুখ বুঝে সব কিছু সহ্য করে নিতে হয়, তো কিছু সময় নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। আরজু তাই করতে চাইলো। তবে ওকে সে সুযোগটা আরমান দিল না।

আরমান এগিয়ে এসে আরজুর হাতটা শক্ত করে ধরে ওর পাশে দাঁড়ালো। আরজু ঘাড় ঘুরিয়ে আরমানের দিকে তাকাতেই আরমান বলল,

“আমি আছি না। আপনাকে আর একটা কথাও বলতে হবে না।”

আরজু কে কথাটা বলে আরমান এবারে সরাসরি মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার থেকে এমন আচরণ সত্যি অপ্রত্যাশিত ছিল আমার জন্য বড় আব্বু। প্রথমত, আমার স্ত্রীর ব্যাপারে কথা বলার অধিকার তোমরা কেউ রাখো না, কেউ না। আর না আমার স্ত্রীর অতীত সম্পর্কে কথা বলার অধিকার আমি কাউকে দিয়েছি। আর দ্বিতীয়ত, আমার বোন আমাদের কাছে বোঝা না। এমনটাও না যে তানভীরের সাথে বিয়ে না দিলে আমার বোন ম’রে যাবে।”

আরমানের কথার প্রেক্ষিতে কল্পনা বলে উঠলো,

“তো নিয়ে যাও তোমার বোনকে।”

কল্পনা কথাটা বলতেই মুহিব হোসেন চোখ রাঙালেম ওনাকে। সঙ্গে সঙ্গে কল্পনা থেমে গেলেন। এই ব্যাপারটাই সহ্য হয় না কল্পনার। মুহিব হোসেন যা ইচ্ছে বলবেন, তবে কল্পনাকে কিছু বলতে দেবেন না।

মুহিব হোসেন আরমানের কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বললেন,

“আমাকে ভুল বুঝো না বাবা। তুমি, তনুশ্রী, তাশরীফ তিনজনেই আমার সন্তান।”

মুহিব হোসেন কথাটা বলতেই আরমান ওর কাঁধ থেকে মুহিব হোসেনের হাত নামিয়ে দিয়ে বলল,

“সন্তানের মতন। নিজের র’ক্তের ব্যাপারটাই আলাদা। যাইহোক আমি এই নিয়ে কোন কথা বাড়াতে চাই না। তোমার কথার দ্বারা আমি যতই কষ্ট পাই না কেন, আমি চাইনা আমার কোন কথার দ্বারা তুমি কষ্ট পাও। তাই এই আলোচনার সমাপ্তি এখানেই ঘটলো। আর আজ এই বাড়িতে আমার স্ত্রীকে যেভাবে অপমান করলে তুমি একটা কথা মিলিয়ে নিও, বেঁচে থাকতে তাওসিফ আরমানের পা আর এই বাড়িতে কোনদিন পড়বে না।”

আরজু কিছু বলতে চাইলো তবে আরমান ওকে বলার সুযোগ দিলো না। আরমান এবারে সরাসরি তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুই কি আরও অপমানিত হতে চাস তনুশ্রী?”

তনুশ্রী চোখের জল মুছে তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলল,

“না ভাইয়া। যেই বাড়িতে শর্ত দেয়া হচ্ছে যে আমার সংসারটা গোছাতে চাইলে অন্য একটা মেয়ের সংসার ভাঙতে হবে সেই বাড়িতে আমি সংসারই করতে চাই না। হোক সেটা আমার চার বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক।”

তনুশ্রীর কথাটা শুনে তানভীরের মাথাটা ঘুরে উঠল। আরে কেউ ওর কথায় পাত্তাই দিচ্ছে। তানভীর কখন বলল যে ও বিয়ে করবে না? সরাসরি আরমান কে উদ্দেশ্য করে খ্যাক খ্যাক করে বলল,

“একদম তনুশ্রী কে আমার বিপক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবি না তুই তাওসিফ। আমি একবারও বলেছি যে আমি তনুশ্রী কে বিয়ে করবো না?”

আরমান পাল্টা খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“তো একবারও জোর গলায় বলেছিস যে তুই তনুশ্রী কে বিয়ে করবি, কেউ যেন এই বিষয়ে একটা কথাও না বলে? তোর দম আছে?”

“ভুলে যাস না তোর বিয়েটা আমি দিয়েছিলাম। তোর বিয়ে দিতে পারলে নিজে বিয়ে করতে পারবোনা।”

“তুই পারলেও তোর সাথে আমার বোনের বিয়েই দেব না।”

লেগে গেল দুই ভাই আবার ঝগড়া। বর্তমানে এই পরিস্থিতিটা ভীষণ অপছন্দ হল মিজান হোসেনের নিজের পরিবারের মাঝে এই ঝামেলা আর ওনার পছন্দ হচ্ছে না। দুজনকে উদ্দেশ্য করে একটা ধমক দিতে দুজনেই থেমে গেল। সেখানে আর বেশিক্ষণ থাকা হলো না ওদের। এমনটা না যে মিজান হোসেন মনঃক্ষুন্ন হয়ে চলে এলেন। ভাইয়ের সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তা শেষে বেশ স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়ে চলে এলেন।

_________

সকালে আজ বেশ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়লো আরমান। ওর পরিবার এক সপ্তাহ আগেই গ্রামে ফিরে গেছে। আরমান কোথাও একটা বেরোবো। ওর এত তাড়াহুড়ার কারণ আরজু ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। অনেক জোড়াজুড়ির পর আরমান জামলো যে ফিরোজ কে নিয়ে আকাঙ্ক্ষার সাথে দেখা করতে যাবে। কি যেন কাজ আছে। সেই সাথে আরজু কে এটাও বলল আজ রাতের মাঝে আকাঙ্ক্ষা কে বাড়িতে নিয়ে আসবে।

আরজু জানে না কিভাবে কি করবে আরমান, তবে আরমান যেহেতু বলেছে তাহলে নিশ্চিত করবেই করবে।

ব্যস্ততার মাঝে আরমানের ফোনটা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখল মুনতাসির কল করেছে। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে মুনতাসিরের গলা ভেসে এলো,

“আসসালামু আলাইকুম আরমান ভাই। ভালো আছেন?”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?”

“জি আলহামদুলিল্লাহ।”

আরমান এবার একটু ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,

“ যা বলার একটু তাড়াতাড়ি বলো মুনতাসির।”

মুনতাসির একটু ইতস্তত করে বলল,

“আজ সন্ধ্যায় একবার বাড়ি আসতে পারবেন?”

“কেন?”

“আসলে মৃন্ময়ী কে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে।”

আরমান চমকে উঠে বলল,

“ মৃন্ময়ী, মানে তোমার বোনকে দেখতে আসছে? কেন?”

“আসলে ভাই একটা ভালো সম্বন্ধ পেয়েছি। তো ভাবলাম ও তো বড় হয়ে গেছে। পড়াশোনা চলুক, এর মাঝো বিয়েটাও দিয়ে দেই। এই দায়িত্বটা পালন করতে পারলে আমি নিশ্চিন্ত হই।”

“তাই বলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার কি ছিল? মনে হয় পাত্র আর খুঁজে পাওয়াই যেত না। না তুমি আমার বোনটাকে বিয়ে করলে, না তোমার বোনটাকে আমার ভাইটাকে বিয়ে করতে দিলে। আচ্ছা বজ্জাত ছেলে তুমি।”

“আপনার আবার ভাই কোথায়?”

“আরে তাশরিফ, আমার ছোট ভাই।”

মুনতাসির এক হাতে মাথা চুলকে বলল,

“ও তো অনেক ছোট। এখনই বিয়ে করবে?”

“এমন ভাব করছো যেন এই বয়সে কেউ বিয়েই করে না। তুমিও তো এমন বয়সেই বিয়ে করেছো, আমার ভাই করলে দোষ কি? যাই হোক জোর করে দেব না আমার ভাইয়ের বিয়ে তোমার বোনের সাথে। তবে ছেলে সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজখবর নিয়েছো তো?”

“জ্বী নিয়েছি। যতটুকু খবর পেয়েছি মন্দ না।”

“নাম, ঠিকানা আমায় পাঠিয়ে দিও। আমি একবার খোঁজ নিয়ে দেখব। আর শোনো, আমি কথা দিতে পারছি না যে আজ বিকেলে যেতে পারবো কিনা। খুবই দরকারী একটা কাজ আছে। তবে কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমায় জানিও।”

মুনতাসির ফের ইতস্তত গলায় বলল,

“আপনি না এলে আরজু কে কি পাঠানো যায় না? আমার এক বোনকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে, আরেক বোন না থাকলে চলে।”

ফোনে মুনতাসিরের কথাটা শুনতে আরমান আগে দেখে নিল ঘরে আরজু আছে কিনা। দেখলো নেই। এই সুযোগে একটু ধীর গলাতে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরু কে ডেকো না। পাত্রপক্ষ একটু তেরিবেরি করলে বিয়ে ভেঙে দিতে পারে। আর তাছাড়া ত আরু কে দেখে শেষে মৃন্ময়ী কেও সে পাগলর ভেবে চলে যাবে।”

মুনতাসির মৃদু হেসে বলল,

“এই কথাটা আরজুকে বলতে হচ্ছে যে আপনি ওকে পাগল বলেছেন।”

আরমান একটুও ভয় পেল না। বরং আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“বিশ্বাস করবে না আমার বউ। ও এখন তোমার থেকে বেশি আমায় বিশ্বাস করে।”

“মাশাআল্লাহ। এটা তো অনেক ভালো খবর। তবে ভাই চেষ্টা করবেন আসার জন্য,ভালো লাগবে।”

“ঠিক আছে চেষ্টা করবো। এখন রাখছি।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প