তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৬৪

🟢

“মেয়েটার আজ জন্মদিন। তোমার কি এমন দরকারি কাজ আছে যে এভাবে চলে যেতে হচ্ছে? নিজেই এত আয়োজন করলে আর এখন নিজেই থাকবে না? আবার যাচ্ছ তো যাচ্ছ মেয়েকে বলেও যাচ্ছো না। আমি সামলাবো কি করে ওকে?”

হিমির কথার প্রেক্ষিতে তাওকীর ব্যস্ত গলায় বলল,

“খুব দরকারি কাজ পরে গেছে হিমি। যেতেই হবে।”

“কবে ফিরবে?”

“এখনই বলতে পারছিনা সেসব। কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবো। তুমি নিজের খেয়াল রেখো আর মেয়েকেও দেখে রেখো। আর যদি আমায় ফোনে না পাও তবে চিন্তা করার কিছু নেই। আমার হয়তো নাম্বার বদলাতে হতে পারে। আমি নতুন নাম্বার থেকে তোমায় কল করবো কিন্তু সেই নাম্বারটা তুমি কাউকে দেবে না।”

হিমির কেন যেন এবার একটু সন্দেহ হলো। হঠাৎ করে তাওকীর চোরের মতন কথা বলছে কেন। নাম্বারই বা বদলাতে হবে কেন। আবার সেই নাম্বার অন্য কাউকে দিলে সমস্যাই বা কি। তাওকীরকে দেখে কেন যেন হিমির মন হচ্ছে যে ও পালাচ্ছে। যেন কোন কিছু থেকে পালাতে চাচ্ছে। মনে হচ্ছে ও খুব আতঙ্কের মাঝে আছে, ওর মাথায় খুব বড় কিছুর চাপ।

হিমি সন্দেহি গলায় বলল,

“তুমি কি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছো তাওকীর? তোমায় দেখে আমার মনে হচ্ছে তুমি কোনো কিছু থেকে পালাতে চাইছো। এভাবে হুট করে কোথায় যাচ্ছো বলোতো?”

কাপড় গোছানো বন্ধ করে তাওকীর এবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হিমির দিকে তাকালো। হিমির হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

“তুমি আমায় বিশ্বাস করো হিমি? কতগুলো বছর তো আমরা একসঙ্গে দুজনে কাটিয়ে দিলাম তুমি কি আমায় চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারো?”

হিমি কোনরকম কোন সময় ব্যয় না করে বলল,

“অবশ্যই পারি। এই পৃথিবীতে আমি তোমায় সব থেকে বেশি ভরসা করি। আমি নিজেকে যতটা না বিশ্বাস করি তার থেকে হাজার গুণ বেশি বিশ্বাস করি তোমায়। কিন্তু হঠাৎ এই কথা বলছ কেন?”

তাওকীর জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল,

“এমনি।”

“সত্যিই কি কোন কারণ নেই নাকি তুমি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছো? তুমি আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছো না কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো।”

তাওকীর তাকাতে পারলো না হিমির চোখের দিকে। বরং দৃষ্টি মেঝের দিকে তাক করে বলল,

“তোমার কি মনে হয় হিমি, আমরা যদি কোন অপরাধ করি তবে সে অপরাধের শাস্তি কি কোন না কোন দিন আমাদের প্রাপ্য? আমাদের কি সে অপরাধবোধ থেকে পালিয়ে বেড়ানো উচিত নাকি নিজেদের অপরাধ মেনে নিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত?”

হিমি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কি অপরাধ করেছে তুমি?”

“আগে তুমি আমার প্রশ্নের উত্তরটা বলো।”

“না, আমাদেরকে পালিয়ে বেড়ানো উচিত না। ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত। কতদিন পালিয়ে বেড়াবে? একমাস, এক বছর, দশ বছর কিংবা হয়তো এর থেকে বেশি, তবে জীবনের শেষ দিনে গিয়ে হয়তো দেখলে যার থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াচ্ছিলে সে তোমার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছে গেছে। তখন কি করবে? পালানো কখনো সমাধান হতে পারে না তাওকীর। বরং নিজের অপরাধ স্বীকার করে নাও, ক্ষমা চেয়ে নাও। যদি বিপরীত পাশের মানুষটা দয়ালু হয় তবে হয়তো ক্ষমা করে দেবে।”

“কোনভাবেই কি পালিয়ে বাঁচা সম্ভব না?”

“আমার তো মনে হয় না। অন্তত সারা জীবন পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। তোমার নিজের মাঝে একটা সময় গিয়ে দেখবে অপরাধবোধটা এত প্রকট হয়ে দাঁড়াবে যে তুমি নিজে আর পালিয়ে বেড়াতে চাইবে না।”

তাওকীর একবার বিছানার উপর গুছিয়ে রাখা ব্যাগটার দিকে তাকালো। হঠাৎ করে কেন যেন মনে হলো এটার আর কোন প্রয়োজন নেই। তাওকীরের হয়তো পালানোটা উচিত হবে না।

হঠাৎ করে মনে হলো ও চাইলেও আর পালাতে পারবে না। অনেকগুলো বছর তো পালিয়ে থেকেছে, তবে এবারে বোধহয় তার সময় শেষ। সেই জন্যই তো যাকে এতদিন তাওকীর নিজেই খুঁজে বেড়াচ্ছিল আজ হঠাৎ করে তাকে দেখা সত্ত্বেও তার সাথে কথা বলতে পারল না তাওকীর।

তাওকীরকে কিছু হঠাৎ করে চুপ হয়ে যেতে দেখে হিমি হালকা করে ওর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“কি হলো? তুমি না বললে তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে?”

“যাবনা আমি। তোমার কি যেন রান্না বাকি ছিল না সেগুলো করো। সন্ধ্যায় কেক কা’টবে তাহি। বাইরের কোন অতিথিকে ডাকার দরকার নেই।”

হিমি এবারে মৃদু বিরক্তিকর গলাতেই বলল,

“তোমার আজ কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। এই যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছো, আবার এই বলছো যাবে না। পাগল হলে নাকি? তোমাদের বাবা, মেয়ের জ্বা’লায় কোনদিন আমিপা’গল হয়ে যাব।”

কথাটা বলে হিমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। হিমি ঘর থেকে চলে যেতেই তাওকীর পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফোন অন করো। কিছুক্ষণ পর দেখলো ফোনে অনেকগুলো মেসেজ এসেছে আরমানের নাম্বার থেকে। তাওকীর পড়লো মেসেজগুলো। আরমান বারবার ওর সাথে কথা বলতে চাইছে তবে তাওকীর আর কল ব্যাক করলো না। কেন যেন মনে হলো একটু পর আরমানের দেখা এ বাড়িতেই পাবে।

____________

ড্রয়িং রুমের সোফার বসে আছে তাওকীর। অনেকক্ষণ থেকে ওর আশেপাশে তাহি ঘুরঘুর করছে। কি সব যেন একা একাই বলে যাচ্ছে। তবে তাওকীরের সে সবে মন নেই। আনমনে কি সব ভেবে যাচ্ছে আর তাহির কথায় শুধু হু হা করছে। একটু পর সেখানে তানভীর এসে বসলো। মুহিব হোসেন আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাওকীরকে এমন আনমনে বসে থাকতে দেখে তানভীর বলে উঠলো,

“ভাইয়া, কি হয়েছে তোমার? এমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে কেন?”

তাওকীর একটু চমকে উঠলো। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“কিছু না তো।”

তানভীর আরো কিছু প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই কলিং বেল বেজে উঠলো। কলিং বেলেও আওয়াজে তাওকীর আরেক দফা চমকালো। কেমন যেন উদ্বিগ্ন গলায় তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কারো আসার কথা ছিল?”

“আমিতো জানিনা। ভাবি হয়তো কাউকে ডেকেছে।”

“না, হিমি কাউকে ডাকে নি। আমি ওকে নিষেধ করে দিয়েছেলাম।”

“আচ্ছা দেখি কে এলো। অপরিচিত কেউ তো আর বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারবে না। পরিচিত কেউই নিশ্চয় এসেছে।”

তানভীর দরজা খুলে দিতেই সামনে আরজুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। আরজুর সাথে আবার একজন অপরিচিত মহিলাও দাঁড়িয়ে আছে।

“আরে তুমি? তাওসিফ আসেনি? আর ইনি কে?”

তানভীরের বলা কথাগুলো কানে গেল তাওকীরের। সঙ্গে সঙ্গে কেমন জমে গেল শরীরটা, একটুও নড়লো না নিজের জায়গা থেকে। একবার সাহস করে দরজার দিকে তাকালো না অব্দি।

তানভীর এর প্রশ্নের কোন উত্তর দিলো না আরজু। সরাসরি আকাঙ্ক্ষার হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে ভিতরে এলো। তানভীর একটু অবাক হলো আরজুর এমন আচরণে। বাইরে উঁকি দিতেই দেখলো দরজার একপাশে আরমান দাঁড়িয়ে আছে। তানভীর আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“কি রে তোর আবার কি হয়েছে? দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভিতরে চল।”

“পা উঠছে না।”

“কেন? পেরেক পুঁ’তে দিয়েছে?”

“একটু পর তোর পাও উঠবে না।”

তানভীর কপাল কুঁচকে বলল,

“কেন?”

“আমাদের পরিবারটা ভেঙে গেল রে তানভীর। বিশ্বাস কর, আমার কাছে কোন উপায় নেই। আমি কিচ্ছু ঠিক করতে পারবো না। কেননা যা হওয়ার সেটা অনেক বছর আগেই হয়ে গিয়েছে।”

তানভীর বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

“যদি কিছু বলার থাকে সোজাসুজি বল। ত্যাড়াব্যাকা কথা বলবি না। কি হয়েছে বল তো? তোর বউ সাথে করে কাকে নিয়ে এসেছে? জিজ্ঞেস করলাম কিছু জবাবও দিল না।”

আরমান তানভীরের প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারল না। ধীর পায়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।

ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই আরজু তাওকীরের দেখা গেল, কষ্ট করে আর খুঁজতে হলো না।

আরজু আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ে সরাসরি গিয়ে তাওকীরের সামনে দাঁড় করাতে চাইলো, তবে আকাঙ্ক্ষা থেমে গেল। আকাঙ্ক্ষার পা আর নড়ছে না। এতগুলো বছর পরে মানুষটার মুখোমুখি হবে কি করে তা ভাবতেই আকাঙ্ক্ষার পুরো শরীর যেন কাঁপছে ভয়ে আর আতঙ্কে। সেই সাথে অস্বস্তিও হচ্ছে কারণ আকাঙ্ক্ষা জানে এই বাড়িতে তাওকীরের স্ত্রী সন্তান আছে। আকাঙ্ক্ষা কি করে মুখোমুখি হবে ওদের! আকাঙ্ক্ষা দেখলো তাওকীরের পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে বসে আছে। ছবিতে তো একেই দেখেছিলে, এটাই তো তাওকীরের মেয়ে। বাবার কত নিকটে বসে আছে অথচ তাওকীরের যে আরও একটা মেয়ে আছে সেই দিকে কোন খেয়ালই নেই।

এদিকে কলিংবেলের আওয়াজে ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে হিমিও চলে এসেছে। আরজে কে দেখে ভীষণ খুশি হলো সে। আরজুর দিকে এগিয়ে গিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“তোমরা এসেছো আমি খুব খুশি হয়েছি। তাওসিফ কোথায়? ও আসেনি?”

আরজুর ভীষণ খারাপ লাগলো হিমির কথা ভেবে। এই মানুষটার কোন দোষ নেই, নিতান্তই সহজ, সরল, ভালো একটা মানুষ যার জীবনের হয়তো প্রধান লক্ষ্যই একটা সংসার করা তবে হিমির কপালটাই ভীষণ খারাপ।

“ভাবি, তাহিকে একটু ঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন? এখানে আমার কিছু কথা ছিল?”

তাওকীরের আর বুঝতে বাকি রইল না যে আরজু কি বলতে পারে, তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো আকাঙ্ক্ষার উপস্থিতি বুঝতে পারার পরও তাওকীর মাথা তুলে তাকালো না আকাঙ্ক্ষার দিকে। ওরা আসার শুরুতে মাথা নিচু করে বসেছিল তারপর থেকে আর মাথা তুলে নি। হিমি আরজুকে আগেই আর কোন প্রশ্ন করলো না। একজনকে ডেকে তাহিকে তার সাথে উপরে ঘরে পাঠিয়ে দিল এবং বলল যতক্ষণ না হিমি ডাকবে ততক্ষণ যেন ওকে নিয়ে নিচে না নামে।

তাহি চলে যেতেই হিমি প্রশ্নাত্মক গলায় আরজুকে জিজ্ঞেস করল,

“কি কথা আরজু? আর ইনি কে? আগে তো কখনো দেখিনি।”

আকাঙ্ক্ষার পরিচয়টা দিতে আরজুর একটুও অস্বস্তি হলো না, একটু বারের জন্যও মনে হলো না এই কথাটা বলার পর পরিস্থিতি ঠিক কেমন হতে পারে। আরজি ভাবলো ও তো মিথ্যে কিছু বলছে না, ভুল কিছুও বলছে না।

“ইনি হলো আকাঙ্ক্ষা, তালুকদার বাড়ির বড় বউ।”

তাওকীর খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে নিল। সোফায় বসে থাকা মুহিব হোসেন এক ঝাটকায় উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে উঠে বললেন,

“এইসব কোন ধরনের মজা? কে এই মেয়ে? তালুকদার বাড়ির বউ হতে যাবে কেন?”

হিমি কথা বলার মতন কোন শব্দই খুঁজে পেল না। আরজু বলল মেয়েটা তালুকদার বাড়ির বড় বউ। তালুকদার বাড়ির বড় ছেলে তো তাওকীর, তবে ওদের দুজনের পরিচয় এভাবে মিলে যাচ্ছে কেন?

ঘাড় ঘুরিয়ে হিমি একবার তাকালো তাওকীরের দিকে, যে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। কিচ্ছু বলার নেই, কিচ্ছু করার নেই।

আরজু আকাঙ্ক্ষার হাতটা ছেড়ে দিয়ে হিমিকে পাশ কাটিয়ে মুহিব হোসেনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,

“আপনি যে এতটা অবুঝ নন সেটা আমি এর আগের দিন আপনার ব্যবহার দেখেই খুব ভালোভাবে বুঝে গিয়েছি। আপনি যে আপনার পরিবারের সবার জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চান সেটা আমি বুঝে গিয়েছি। সে হিসেবে ধরতে গেলে এই মেয়েটাকে কেন আমি তালুকদার বাড়ির বড় বউ বলছি সেটা আপনার অজানা থাকার কারণ নয়? আপনার চোখ এড়িয়ে এতবড় একটা ঘটনা ঘটা সম্ভব বলে আমি মনে করি না বড় আব্বু।”

মুহিব হোসেন তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিলো না আরজুর কথার। হুট করে মস্তিষ্কে একটা বিষয় খেলে গেল। সেটা হচ্ছে আকাঙ্ক্ষা নামটা ওনার পরিচিত। বাকিটা বুঝতে বেশি সময় লাগলো না তার। তবে এই মেয়েটা এখানে কি করে এলো? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।এই মেয়েটা যেন কখনো ফিরে না আসতে পারে সেই ব্যবস্থাই তো করেছিলেন তিনি। তবে এই মেয়েটাএলো কি করে।

বিজ্ঞাপন

“কি হলো? চুপ করে গেলেন কেন? মনে পড়ে গেল কিছু কথা? আচ্ছা এখন একটা কথা বলুন তো সত্যিটা আমাদের তিনজনের মাঝে কে বলবে? আমি বলব, আপনি বলবেন নাকি আপনার কু’লা’ঙ্গা’র ছেলে বলবে?”

সবে মাত্র কল্পনাও সেখানে এলেন। আসতে না আসতেই আরজুর মুখ থেকে কু’লা’ঙ্গা’র ছেলে শব্দটা শুনে ভীষণ ক্ষিপ্ত হলেন। ক্ষিপ্ত গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই মেয়ে, আবার নাটক শুরু করেছো? তোমার স্বামী না খুব বড় মুখ করে বলে গিয়েছিলো যে কোনদিন এই বাড়িতে পা রাখবে না। তবে এসেছো কেন? অশান্তি করতে? দাওয়াত দিয়েছি জন্য নাচতে নাচতে চলে আসতে হবে? বাড়িতে গিয়ে খেতে পারো না?”

আরজু অগ্নিদৃষ্টিতে কল্পনার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

“আজ আমি আপনার সাথে এই রোজকার সাংসারিক বিষয় নিয়ে ঝামেলা করতে এখানে আসিনি। যা বলতে এসেছি সেটা শোনার পর এমনিতেও আপনার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই চুপচাপ যা বলছি সেটা শুধু শুনুন। আপনার এখানে বলার কিছুই নেই। এমনিতেই কিন্তু আমি বেয়াদব সেটা আমি নিজেও খুব ভালো করে জানি। আজকে আমাকে আরো বেয়াদবীর সীমা ছাড়াতে বাধ্য করবেন না।”

উপস্থিত প্রত্যেকে যেন মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরমানও দাঁড়িয়ে আছে তবে আরমানের বলার কিছুই নেই। ওর পাশে তানভীর দাঁড়িয়ে আছে। ও কিছু বলতে পারছে না। কাকে কি জিজ্ঞেস করবে জানেনা। তাওকীরও কিছু বলছে না, না ওর বলার মতন পরিস্থিত আছে।

হিমি একবার তাকালো আকাঙ্ক্ষার দিকে। ভীষণ চেনা চেনা লাগলো চেহারাটা। কি অপূর্ব দেখতে মেয়েটা। চোখ, নাক, ঠোঁট, ভ্রু সব কিছু যেন নিখুঁত। কোন ভুল নেই চেহারায়। হিমি চিনতে পেরেছে এই মেয়েটাকে। হিমি নিজ থেকে আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি তোমায় চিনতে পেরেছি। তুমি তাওকীরের সাথে একই ভার্সিটিতে পড়তে তাই না? আমি তোমার একটা ছবি দেখেছি তাওকীরের সাথে। ওই যে তোমাদের ভার্সিটিতে নাকি একটা নাটক করেছিলে, ওই নাটকে তোমাদের বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়ের ছবি দেখেছে আমি।”

আকাঙ্ক্ষা কিছু বলতে পারল না। যেখানে তাওকীর নিজেই বিয়েটাকে একটা নাটক বানিয়ে দিয়েছে, সেখানে কি বলতে পারে আকাঙ্ক্ষা। এমনিতেও তো এই বিয়েটার কোন মূল্য ছিল না আকাঙ্ক্ষার কাছে, তবে তাই বলে তাওকীর এভাবে নাটক বানিয়ে দিল বিয়েটাকে! আবার সেই কথাটা বলছে তাওকীরের স্ত্রী।

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ চুপ করে আছে, তবে আরজু চুপ থাকতে পারল না। আরজু এটাও খুব ভালো করে বুঝতে পারছে যে যদি ও কথা না বলে তবে কিছু হবে না। বাকি কেউই কথা বলতে পারবে না কারণ এত মনের জোরই নেই কারো। কারো এতো সৎ সাহসই নেই যে নিজের আপন মানুষের করা অন্যায়টা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবে।

আরজু এবারে সরাসরি তাওকীরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“এই যে আপনি, সভ্য মানুষের মুখোশ পরে থাকা একজন মানুষরূপী জা’নো’য়া’র, এখন মাথা নামিয়ে রেখেছেন কেন? চোখ তুলে তাকান। আমার চোখে চোখ রেখে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। আচ্ছা আমার কথা বাদ দিলাম, নিজের স্ত্রীর চোখের চোখ রেখে বলুন এই আকাঙ্ক্ষা কে? আকাঙ্ক্ষার সাথে কি সম্পর্ক ছিল আপনার? চৌদ্দ বছর আগে কি কি করেছিলেন এই আকাঙ্ক্ষার সাথে? চুপচাপ বসে থাকলে তো হবে না।”

আরজুর মুখ থেকে এমন ভাষা শুনে হিমি ভীষণ রেগে গেল। রাগান্বিত গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এটা কেমন ব্যবহার আরজু? সম্পর্কে আর বয়সে উনি তোমার থেকে বড়। সম্মান দিয়ে কথা বলো আমার স্বামীকে।”

“আপনার স্বামীকে জিজ্ঞেস করুন না ভাবি যে উনি সম্মান পাওয়ার যোগ্য কিনা। সম্মান পাওয়ার জন্যই একদিন এই মেয়েটাকে ফাঁসিয়ে ছিল। আমি একটা কথা ভেবে ভীষণ অবাক হয়েছি ভাবি জানেন তো, এতগুলো বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দিলেন তবে আপনি মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্যই করতে পারলেন না।”

হিমি এবারে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তাওসিফ, তোমার স্ত্রীকে থামতে বল। আমি ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতে চাই না কিন্তু ও নিজের সীমা ভুলে যাচ্ছে।”

আরমান অসহায় গলায় হিমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভুল বললে তো অনেকক্ষণ আগেই থামিয়ে দিতাম ভাবি কিন্তু আরুর প্রতিটা কথা যে ঠিক।”

হিমি এবারে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“কিসব আজেবাজে কথা শুরু করেছো তোমরা? কোন ঠিক এর কথা বলছো? তোমার স্ত্রী সমানে তোমার ভাইকে অপমান করে যাচ্ছে আর তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো? আবার নিজের স্ত্রীকে সমর্থনও করছো?”

হিমির মনে হলো এবার তাওকীরের সাথে ওর কথা বলা উচিত। তাওকীর কেন চুপ আছে এতো অপমানের পরও। হিমি সরাসরি গিয়ে তাওকীরের পায়ের সামনে দুই হাঁটু গেড়ে বসে বলল,

“তুমি চুপ করে আছো কে?ন তুমি কথা বলো? কি সব আজেবাজে কথা বলছে ওরা দেখো? আমি জানি তোমায় অপমান করছে জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে। ঠিক আছে চলো উপরে চলো তুমি, ওরা যা ইচ্ছে বলুক।”

হিমির হাত দুটো তাওকীর নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে একটু শব্দ করে কেঁদে উঠে অপরাধী গলায় হিমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমায় ক্ষমা করে দিও হিমি। বিশ্বাস করো আমি তোমায় ঠকাতে চাইনি। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না। আমি তোমার সাথে সংসার করতে চাই। আমি তোমাকে আর আমার মেয়েকে নিয়ে সংসার করতে চাই। আমায় ক্ষমা করে দাও তুমি।”

হিমি ছেড়ে দিলে তাওকীরের হাত। ছিটকে দূরে সরে গেল। মেঝের ওপরে বসে পড়লো। তাওকীর নিজের ফাঁকা হাতের মুঠোর দিকে তাকিয়ে রইলো।

অনেকক্ষণ থেকে চুপ করে আছেন মুহিব হোসেন। তবে এবারে ওনার মনে হলো ওনার মুখটা খুলতেই হবে নয়তো আরজু বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে। তবে মুহিব হোসেন আরজু কিংবা আকাঙ্ক্ষাকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলেন না। সরাসরি আরমানকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বললেন,

“তাওসিফ, দিনদুপুরে তোমার স্ত্রী কি নাটক শুরু করে দিয়েছে? এবারে বুঝতে পারছো কেন আমি তোমার স্ত্রীকে পছন্দ করিনি। শুরুতে এই মেয়েকে যেমন ভেবেছিলাম এই মেয়েটা তেমন না। এই মেয়ের উদ্দেশ্যই আমাদের পরিবারটা নষ্ট করা। এক্ষুনি এই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাও এখান থেকে। আর একটা কথা মনে রেখো, এই বাড়িতে তোমার স্থান হলেও তোমার স্ত্রীর কোন স্থান নেই।”

আরমান ভীষণ শান্ত দৃষ্টিতে মুহিব হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই বাড়িতে আর কোনদিন আমি পা রাখবোও না বড় আব্বু। যে বাড়িতে পা রাখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আছে সেই বাড়িতে আমি আবার আসবো ভাবলে কি করে? আর আমার স্ত্রীর দিকে আঙ্গুল তোলার আগে তুমি নিজের ছেলেকে প্রশ্ন করো যে সে কি করেছে?”

আরমান কথাটা বলতেই আরজু আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওনার আলাদা করে জানার কোন প্রয়োজন নেই আরমান। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এর সবটাই উনি আগে থেকেই জানেন। সেজন্যই তো আমাকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করছেন। উনি খুব সুন্দর ভাবে সবকিছু লুকোতে চাইছেন। দেখলেন না কিভাবে আমার ওপর একটা অপবাদ দিচ্ছে যে আমি এসেছি আপনাদের পরিবারটা ভাঙার জন্য। দেখবেন একটু পরে উনি বলবেন আমি আপাকে সাজিয়ে এনেছি।”

আরজুর ধারণাটা ভুল প্রমাণ করে মুহিব হোসেন বলল,

“না, সেটা তো আমি কখনোই বলবো না যে তুমি এই মেয়েকে ব্যবহার করছ। বরং এই মেয়ে আজ এতগুলো বছর পর ফিরে এসে তোমায় ব্যবহার করছে।”

আরজুর কপালে সূক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ তৈরি হলো। ঠিক বুঝে উঠতে পারলে না এই মানুষটা আবার নতুন করে কি বোঝাতে চাইছে সবাইকে। মুহিব হোসেন এবারে সরাসরি আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আর এই যে মেয়ে, সেই ভার্সিটি জীবন থেকে আমার ছেলের পিছনে পড়ে আছো শুধুমাত্র টাকা আর ক্ষমতার জন্য তাই না? আমি কোন মেয়েকে অপমান করতে চাই না কিন্তু তোমার মতন মেয়েরা তৈরিই হয়েছে অপমানিত হওয়ার জন্য। আমার ছেলেকে তো ভালোবাসো না, শুধু শুধু ওর মাথাটা খেয়েছিলে ওর টাকার জন্য। চলে তো গিয়েছিলে, আবার এত বছর পর ফিরে এসেছো কেন? টাকার দরকার পড়েছে নাকি?”

আকাঙ্ক্ষা হতভম্ব হয়ে গেল। কি বলছে মানুষটা? এনার সাথে তো কোনদিন আকাঙ্ক্ষার সামনাসামনি দেখা হয়নি। শুধু দু একবার ফোনে ছবি দেখেছিলো। সেই মানুষটাই আকাঙ্ক্ষাকে এত ভালো করে চেনে আবার কি সব আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছে। আকাঙ্ক্ষা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল,

“এসব আপনি কি বলছেন? কিসের টাকা? আর আমি আপনার ছেলের পিছনে পরেছিলাম না, আপনার ছেলেই আমার পিছনে পড়েছিল।”

“একদম চুপ! তোমার মতন মেয়েদেরকে কি আমি চিনি না। তোমাকে তো আজ আমি পুলিশে দেব। আমার ছেলের জীবনটা নষ্ট করতে এসেছো।”

মুহিব হোসেন বোধহয় আরো কিছু বলতো তবে তার আগেই তাওকীট চিৎকার করে উঠে মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এবার থামো বাবা। যথেষ্ট হয়েছে, এবার অন্তত আমাকে কিছু বলতে দাও।”

মুহিব হোসেন চোখ গরম করে তাওকীরের দিকে তাকালো। তাওকীরকে বোধহয় আজও ভয় দেখিয়ে চুপ করাতে চাইলেন, তবে আজ আর তাওকীর ভয় পেল না। ওর কাছে হারানোর মতন কিছুই নেই, আর না ভয় পাওয়ার কোন কারণ আছে। সবটা তো সবার সামনে এসেই গেছে।

তাওকীর মনে মনে সাহস সঞ্চয় করলো। সোফা থেকে উঠে এগিয়ে গেল আকাঙ্ক্ষার দিকে। একদম আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি দাঁড়ালো, তবে আকাঙ্ক্ষার চোখে চোখ রাখতে পারল না। মাথা নিচু করে দাঁড়ালো।

আকাঙ্ক্ষার দুচোখ ছাপিয়ে তখন অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। উপস্থিত প্রত্যেকেই চুপ।তাওকীর খুব করে চাইছে কিছু বলতে, তবে মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। বেশ অনেকটা সময় তাওকীর কে এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। এক পর্যায়ে গিয়ে আকাঙ্ক্ষা নিজ থেকেই বলে উঠলো,

“অপরাধী কি তবে অপরাধ স্বীকার করার জন্য আমার সামনে এসে দাঁড়ালো?”

“আকাঙ্ক্ষা আমি আসলে, জানিনা কি থেকে..”

তাওকীর নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না। তার আগেই আকাঙ্ক্ষা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ওর গালে কষিয়ে একটা চ’ড় বসালো। কল্পনা আঁৎকে উঠে এগিয়ে আসতে ধরলে তাওকীর হাত উঠিয়ে ওনাকে থামিয়ে দিল।

তাওকীর নিজের সমস্ত অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে মাথা নিচু করে আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি অপরাধী আকাঙ্ক্ষা। এই পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্ট পাপী আমি। আমি স্বীকার করে নিলাম আমার অপরাধ। তবে তুমি তো খুব ভালো বলো, তুমিতো পবিত্র। আমায় ক্ষমা করতে পারবে না?”

তাওকীরের কথাগুলো শুনে আকাঙ্ক্ষা শব্দ করে হেসে উঠলো। আকাঙ্ক্ষার হাসির মাঝে তাওকীরের প্রতি বিদ্রুপ প্রকাশ পেল। আকাঙ্ক্ষার হাসির শব্দগুলো বিষাক্ত তীরের মত তাওকীরের হৃদয় দিয়ে আঘাত করছে। খুব কষ্ট হচ্ছে তাওকীরের, তবে তাওকীরের কাছে কিছু করার নেই্ সবটা মুখ বুঝে ওকে মেনে নিতেই হবে। আকাঙ্ক্ষা শব্দ করে হাসতে হাসতে তাচ্ছিল্য ভরা গলায় তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি বললে আমি পবিত্র? আমার পবিত্রতা রেখেছো তুমি? তুমি এতটা অমানুষ সেটা তো তোমায় ভালোবাসার সময় টের পাইনি আমি তাওকীর। নিজে আমার সম্মান বিক্রি করে দিয়ে আজ আমায় পবিত্র বলছো। একটুও কি লজ্জা করছে না তোমার এই কথাগুলো বলতে? তুমি কোন মুখে আমার থেকে ক্ষমা চাইছো?”

আকাঙ্ক্ষার কথার মানে গুলো তাওকীরের ঠিক বোধগম্য হলো না। মাথা তুলে আকাঙ্ক্ষার দিকে প্রশ্নাত্মক গলাশ জিজ্ঞেস করলো,

“বিক্রি করেছি মানে? আমি কাকে বিক্রি করেছি?”

“বুঝতে পারছ না। নিজের বউ, মা, বাবার সামনে ভালো সাজার চেষ্টা করছো? বিশ্বাস করো তুমি যদি শুধু শুধু আমায় ছেড়ে দিতে তাও হয়তো আমি তোমায় ক্ষমা করে দিতাম, কিন্তু তুমি যে আমার জীবন, মান সম্মান সবকিছু শেষ করে দিয়েছো। এই সমাজে আমি মাথা উঁচু করে বাঁচতাম, অথচ তুমি আমার পরিচয় বানিয়েছো পতিতা। তুমি স্বামী হয়ে তোমার স্ত্রীকে অন্য পুরুষরা ছুঁতে পারে যেন সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছো। তোমাকে কি আদৌও ক্ষমা করা যায়? স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও তো তোমায় ক্ষমা করবেন না।”

বসার ঘরে আবারো একটা বিস্ফোরণ ঘটলো। তাওকীরের মাথা কাজ করছে না। কি বলছে এসব আকাঙ্ক্ষা। তাওকীর তো এই ব্যাপারগুলোর কিচ্ছু জানে না। ও তো জানতই না এতদিন আকাঙ্ক্ষা কোথায় ছিল। তাওকীর তো নিজেই খুঁজেছে আকাঙ্ক্ষাকে। আর আকাঙ্ক্ষা আজ বলছে কিনা ও বিক্রি করে দিয়েছিল।

হঠাৎ করে তাওকীরের কি যেন মনে হলো পিছনে ফিরে তাকালো নিজের বাবার দিকে। তবে মুহিব হোসেনকে ভীষণ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। তাওকীরের মনে হলো না, ওর বাবা এটা করতে পারে না্ নিশ্চয় এখানে কোন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তাওকীর ফের আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি ভুল ভাবছো আকাঙ্ক্ষা। আমি এমন কিছু করিনি। আমি তো তোমায় বলে গিয়েছিলাম যে আমি ফিরব, কিন্তু আমি ফিরে এসে তোমায় পাইনি। বিশ্বাস করো আমি অনেক খুঁজেছি তোমায়, আমি এখনো তোমায় খুঁজি। আমি তোমায় বিক্রি করে দেবো এটা তুমি ভাবতে পারলে?”

“তুমি আবার নতুন করে সংসার শুরু করেছো,আর আমায় বিক্রি করে দেবে এটা ভাবতে পারবো না। আদৌ কি তোমার আমার কথা মনে আছে তাওকীর? যদি তোমার আমার কথা মনে থাকতো তবে তুমি সংসার করতে পারতে না, যদি তোমার মাঝে এতই অপরাধবোধ কাজ করতো তবে তুমি রোজ তোমার স্ত্রীকে নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারতে না, আজ তোমার সংসারে একটা মেয়ে থাকতো না। তুমি তোমার এই সন্তানকে সমস্ত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, ভালোবাসা সবকিছু দিয়েছো, আর আমাদের মেয়েটার কি হলো তাওকীর? ও যখন এই পৃথিবীতে এলো তখনো তুমি আমার পাশে ছিলে না, তুমি তো আমাদের মেয়েটাকে অব্দি মে’রে ফেলতে চেয়েছিলে। কিন্তু ভাগ্যের খেলা দেখো, বেঁচে গেছে আমার মেয়েটা। তবে দুর্ভাগ্য আমার, যে আমি ওকে জানাতে পারিনি যে আমি ওর আসল মা।”

হিমি চমকে তাকালো আকাঙ্ক্ষার দিকে। কি বলল আকাঙ্ক্ষা, ওদের একটা মেয়েও আছে। আকাঙ্ক্ষা তাওকীরের বউ,ওদের সংসারও ছিল। তার মানে হিমি এই সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি। হিমি জোর করে ঢুকেছে এই সম্পর্কে। হিমির জন্য তাওকীর আর আকাঙ্ক্ষার সংসারটা ভেঙে গেছে। হিমির জন্য একটা মেয়ে এতিমের মতন বড় হচ্ছে।

এদিকে আকাঙ্ক্ষার বলা কথাগুলো মাথার ভেতরে ঢুকলো না তাওকীরের। ওদের মেয়ে মানে, ওদের মেয়ে তো নেই তাওকীর তো এমনটাই জানতো। তাওকীর তো জানতো ওদের মেয়ে ম’রে গেছে, কখনো এই পৃথিবীর আলোয় দেখেনি, তবে আকাঙ্ক্ষা এটা কার কথা বলছে?

“কি বলছো এসব আকাঙ্ক্ষা? আমাদের মেয়ে তো কখনোই পৃথিবীর আলো দেখেনি। ও তো মরে….”

তাওকীর শব্দটা উচ্চারণ করতেই আকাঙ্ক্ষা পুনরায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাওকীরের গালে কষিয়ে একটা চ’ড় লাগিয়ে তাওকীরের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাগান্বিত গলায় বলল,

“অমানুষের বাচ্চা, নিজের মেয়েকে মৃ’ত বলিস? কোনদিন খোঁজ নিয়েছিল যে তোর মেয়ে বেঁচে আছে নাকি নেই? কোনদিন খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলি যে তোর মেয়ে কেমন ভাবে বেঁচে আছে, কার পরিচয় বেঁচে আছে? তোর মতন একটা কুকুর আমাকে কোনদিন স্পর্শ করেছিলে এটা ভাবলেই তো আমার গা ঘিন ঘিন করছে। তোর সন্তান যেদিন জানতে পারবে ওর শরীরে তোর মতন একটা নোংরা কিটের র’ক্ত বইছে সেদিন ওর নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা হবে। তুই এতটা অমানুষ যে নিজের মেয়েকে মৃত বলছিস? একবারো বুক কাঁপলো না তোর?”

তাওকীরের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। আকাঙ্ক্ষা আঘাত করলেও একটুও ব্যথা অনুভব করল না, তবে কষ্ট হচ্ছে বুকে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুধু আকাঙ্ক্ষার কথাগুলো শুনলো। মনে মনে যেন সবটা মিলিয়ে ফেলতে পারলো তাওকীর।

আপাতত আকাঙ্ক্ষাকে আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলে না তাওকীর। পিছন ফিরে তাকিয়ে নিজের বাবার দিকে এগিয়ে গেল। তাওকীরের চোখ দুটো লাল টকটক করছে। রাগের কারণে নাকি কান্নার কারণে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কিংবা হয়তো দুই অনুভূতির সংমিশ্রণে এমনটা ঘটেছে। তবে কন্ঠের মাঝে সেসব প্রকাশ পেল না তেমন একটা। ভীষণ শান্ত গলায় মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার মেয়ে বেঁচে আছে, বাবা?”

মুহিব হোসেন ভীষণ গম্ভীর গলায় বললেন,

“তুমি ওপরে যাও, আমি বাকিটা সামলে নেব।”

“আমার মেয়ে কোথায় বাবা? আকাঙ্ক্ষা পতিতালয়ে ছিল মানে কি? তুমি জানতে সব?”

“বললাম তো তোমায় তুমি ওপরে যাও, আমি বাকিটা সামলে নেব।”

বেশ অনেকটা সময় তাওকীর খুব ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাওকীর কখনো চায়নি নিজের বাবার সাথে খারাপ আচরণ করতে। উঁচু গলায় কথাও বলতে চায়নি, তবে এবারে যেন ধৈর্যে কুলালো না। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। দুই হাতে মুহিব হোসেনের কলার চেপে ধরে রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,

“তুমি বলেছিলে আমার মেয়ে ম’রে গেছে। তুমি বলেছিলে তুমি আকাঙ্ক্ষা কে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছো আমার থেকে। তুমি বলেছিলে আকাঙ্ক্ষা নিজের জীবনের ভয়ে আমার থেকে দূরে চলে গিয়েছে আমাকে ছেড়ে দিয়ে। তুমি আমায় বলেছিলে আমার আর আকাঙ্ক্ষার মেয়ে কখনো এই পৃথিবীর আলোই দেখতে পারেনি। কেন এসব মিথ্যা বলেছিলে বলো? কেন আমার জীবনটা শেষ করে দিলে তুমি? আমার মেয়ে বেঁচে থাকাকালীন কেন আমার কাছে ওকে মৃ’ত বানালে?”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প