দুদিন আগে ফিরোজ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়েছিল একটা দরকারি কাজে। কাজটা অবশ্য ছিল টুম্পা কে কেন্দ্র করে, তবে সেই কথাটা আকাঙ্ক্ষাকে বলেনি। বলার সাহস হয়নি। শহরে ফিরেছে আকাঙ্ক্ষার থেকে খবর পেয়ে। যে আকাঙ্ক্ষার সাথে অন্যায় করেছিলো তার খোঁজ পেয়েছে ওরা। আর সেজন্যই ফেরত এসেছে আজ। ফিরোজের খুব ইচ্ছে সেই মানুষটার মুখোমুখি হওয়ার। ফিরোজের খুব ইচ্ছে তাকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার।
আরজুদের বাড়িতে এসে ফিরোজ আগে খোঁজ করলো আকাঙ্ক্ষার। দরজা প্রার্থনা খুলে দিয়েছিলো। ফিরোজ আকাঙ্ক্ষার কথা জিজ্ঞেস করতেই প্রার্থনা বলল ওর ঘরে আছে।
ফিরোজ আর কোন সময় না ব্যয় করে সোজা গেল আকাঙ্ক্ষার ঘরে। আকাঙ্ক্ষা তখন নিজের ঘরে একাই। ফিরোজ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার আপা বলে ডাকলো। ডাকটা আকাঙ্ক্ষার কানে যেতেই আকাঙ্ক্ষা একবার মাথা তুলে তাকালো দরজার দিকে। দেখলো ফিরোজ দাঁড়িয়ে আছে।
বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না আকাঙ্ক্ষার মাঝে ফিরোজকে দেখে। ফিরোজও সেসব খুব বেশি গায়ে মাখলো না।
আকাঙ্ক্ষা তখন বিছানার উপর বসে আছে। ফিরোজ সরাসরি আকাঙ্ক্ষার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
“কে ছিল ওই লোকটা আপা?”
আকাঙ্ক্ষা তাকালো একবার ফিরোজের দিকে। ফিরোজের প্রশ্নের কোন উত্তর দিলে না। বরং নিজে পাল্টা শান্ত গলায় প্রশ্ন করল ফিরোজকে।
“আবির থেকে ফিরোজ হলি কি করে? কে তোর এই নামটা দিলো, কেনই বা দিলো? কি করিস তুই এখন যে তোর এত টাকা? তুই তো পড়াশোনাটাও শেষ করিসনি, আমাদের না জমি জমা ছিল, না আমাদের বাবার কোন ব্যবসা ছিল, তবে কি এমন করিস তুই যে এত টাকার মালিক? আমাকে ওই জায়গা থেকে তুই কি করে বের করলি?”
হঠাৎ করে আকাঙ্ক্ষার এতগুলো জটিল প্রশ্ন শুনে ফিরোজ একটু থতমত খেল, ভয়ও পেল। একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“তোমাকে ওখান থেকে বের করতে তো আরমান আমায় সাহায্য করেছে আপা।”
“একটা প্রশ্নের উত্তর পেলাম। বাকি গুলোর উত্তর দে।”
“বাদ দাও না এসব কথা এখন। তুমি আগে আমায় সেই লোকটার পরিচয় দাও। ওকে আমার হাতে শাস্তি পেতেই হবে।”
“কটা খু’ন করেছিস? কতজন মা-বাবার থেকে তাদের সন্তান কেড়ে নিয়েছিস, কতজন সন্তান কে এতিম বানিয়েছিস, কতজন স্ত্রীর থেকে তাদের স্বামীকে কেড়ে নিয়েছিস, কতজন মেয়ের জীবন নষ্ট করেছিস, কতগুলো মেয়ের সম্মানে হাত দিয়েছিস বল? হিসেব করে একদম ঠিক ঠিক সংখ্যা বলবি আমায়।”
ফিরোজ চমকে উঠলো। আকাঙ্ক্ষা কে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। আকাঙ্ক্ষা এই কথাগুলো জানলোই বা কি করে সেটাও জানে না ফিরোজ। কোন উত্তর দিতে পারল না। আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকাতেই দেখলো আকাঙ্ক্ষা কাঁদছে। চোখ দুটো রাগের কারণে লাল হয়ে উঠেছে। ফিরোজের মনে হলো আকাঙ্ক্ষা যেন ওকে সহ্যই করতে পারছে না।
“আপা কি হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে তাকিয়ে আছো কেন আমার দিকে?”
ফিরোজ কথাটা বলতেই আকাঙ্ক্ষা কষিয়ে ফিরোজের গালে একটা চ'ড় লাগালো। তাল সামলাতে না পেরে ফিরোজ হুমড়ি খেয়ে মেঝের ওপর পড়লো। নিজেকে সামলে আকাঙ্ক্ষার দিকে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকালো। কিছু বলতে চেষ্টা করলো তবে সফল হতে পারলো না। তার আগেই আকাঙ্ক্ষা পুনরায় ওর গালে চ'ড় বসালো।
একে একে যে ঠিক কতগুলো চ'ড় ফিরোজের গালে পড়লো তার হিসেব ফিরোজের জানা নেই। আকাঙ্ক্ষাও জানে না যে কতগুলো চ'ড় মা'রলো। শুধু জানে সে তার মনের যত রাগ, ক্ষোভ বের করতে চাইছে।
ফিরোজ বাধা দিলোনা আকাঙ্ক্ষাকে। ফিরোজ হয়তো আন্দাজ করতে পারছে এর কারণ। ফিরোজ তো জানতো কোন না কোন একদিন আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হতেই হবে। তবে চেয়েও নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেনি ফিরোজ। কোন উত্তর ফিরোজের কাছে নেই। তাই চুপচাপ নিজের শাস্তি মাথা পেতে নিল।
একপর্যায়ে গিয়ে আকাঙ্ক্ষা নিজেই থেমে গেল। ক্রন্দনরত গলায় রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“কার বিচার করবি তুই, কাকে শাস্তি দিবি তুই? যার কাতারে তুই নিজেও পরিস তার শাস্তি কি করে দিবি? ঐ জা'নো'য়া'র তো শুধু আমার জীবন নষ্ট করেছে, তুই না জানি আরো কত মানুষের জীবন নষ্ট করেছিস, কত মেয়ের সম্মান নষ্ট করেছিস। এতগুলো বছর বন্দী থাকা অবস্থায় নিজের মেয়ের থেকে বেশি চিন্তা করেছি তোকে নিয়ে। জানিস, আমি ভেবেছিলাম আমি না থাকলেও আমার ভাই আমার স্বপ্ন পূরণ করবে, পড়াশোনা করে একটা ভালো চাকরি করবে, অনেক বড় হবে, মেয়েদের সম্মান করবে, খুব ভালো মনের মানুষ হবে। আর তুই তো একটা জা'নো'য়া'র হয়েছিস।”
কথাটা বলেই আকাঙ্ক্ষা শব্দ করে কেঁদে উঠলো। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে প্রার্থনা আর আরজু। আরমান আর ফারিহা বাড়িতে নেই। আরমান ফারিহাকে নিয়ে গেছে স্কুলে ভর্তি করাতে।
প্রার্থনা একবার এগিয়ে আসতে চাইলো তবে আরজু বাধা দিয়ে বলল,
“দরকার নেই আপা। ওকে উপলব্ধি করতে দাও ও এতদিন যা করেছে সেগুলো ঠিক কতটা অন্যায় ছিল।”
“ফিরোজ ভাই পরিস্থিতির চাপে পড়ে এই পথটা বেছে নিয়েছিলো আরু। বড় আপা না জানলেও আমরা তো জানি সেই সময় পরিস্থিতি ঠিক কতটা খারাপ ছিল।”
আরজু গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“সব সময় পরিস্থিতি কে দোষ দিতে নেই আপা। পরিস্থিতি কখনো একা আমাদের খারাপ করতে পারে না। আমাদের নিজেদেরও দায় থাকে। যদি পরিস্থিতি একাই সব কিছুর জন্য দায়ী হতো তবে আমি এদেশের সবথেকে বড় খু’নী হতাম।”
থেমে গেল প্রার্থনা। আরজুর কথার প্রেক্ষিতে আর কি বলবে সেসব খুঁজে পেল না।
এদিকে আকাঙ্ক্ষা কে এভাবে পাগলের মতন কাঁদতে দেখে ফিরোজ কুলকিনারা হারিয়ে ফেলল। কি করবে, কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। খুব সাহস করে এগিয়ে গিয়ে একবার আকাঙ্ক্ষা কে ধরতে ধরলো তবে আকাঙ্ক্ষা ছিটকে ফিরোজের থেকে দূরে সরে গেল।
ফিরোজ ছলছল দৃষ্টিতে আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকিয়ে ব্যাথাতুর গলায় বলল,
“তুমি এমন করছ কেন আমার সাথে আপা? তুমি অন্তত ঘৃণা করো না আমায়।”
আকাঙ্ক্ষা ক্রন্দনরতা গলায় বলল,
“তোকে ঘৃণা না করে কোন উপায় আছে? তুই কি আদৌও মানুষ? তুই তোর নিজের বোনদের জীবন নষ্ট করেছিস আবির। জানিস আমি আগে ভাবতাম, তোর সাথে আরজুর এত মিল তাহলে আমি বড় হলে তোদের দুজনের বিয়ে দেব। ভাগ্যিস দেইনি। আমি কি ভাবতাম জানিস, আমার অনুপস্থিতিতে এই দুটো মেয়েকে দেখার জন্য ওখানে তুই আছিস। কিন্তু আমি তো জানতামই না যে তুই ওদের দুজনের সব থেকে বড় আতঙ্ক। তুই কিভাবে পারলি প্রার্থনার বিয়েটা এমন একটা জা'নো'য়া'রের সাথে দিতে? ওকে এত মা'র খেতে দেখার পরেও তুই কিভাবে চুপ করেছিলি দিনের পর দিন? আমি কিভাবে এটা মেনে নেই আবির যে আমার ভাই খু’নি?”
“আপা বিশ্বাস করো তুমি আমায় যতটা খারাপ ভাবছো আমি অতটা খারাপ না। আমি যে কতবার কত রকম ভাবে প্রার্থনা আর আরজু কে বাঁচিয়েছি সেটা ওরা দুজনেও জানেনা। আর আমি এমন হতে বাধ্য হয়েছি আপা। তোমরা সবাই চলে যাওয়ার পর আমার পাশে কেউ ছিল না, আরজুর বাপও ছিল না। আমি খেতে পারতাম না। আরজুর বাপ আমাদের বাড়িটাও নিয়ে নিয়েছিল, আমায় বাঁচতে দিত না চাচা। তুমি মানো বা না মানো এটাই সত্যি আপা, ক্ষমতার সামনে সবাই মাথা নিচু করে থাকে। তোমায় খুঁজে বের করার জন্য আমার ক্ষমতার দরকার ছিল।”
“তাই বলে তুই খু’নি হবি আবির?”
ফিরোজ একটা ঢোক গিলে বলল,
“আমি নিজের মুখেই স্বীকার করছি আমি খু’ন করেছি, তবে এজন্য আমার কোন আফসোস নেই। জীবনে অনেক জনকে মে’রে’ছি, জখমও করেছি, তবে আমি জীবনে একজনকেই খু’ন করেছি। আর ওকে খু’ন করার জন্য আমার কোন আফসোসও নেই।”
আকাঙ্ক্ষা শুধু অবাক হয়ে শুনলো ফিরোজের বলা কথা গুলো। আকাঙ্ক্ষা জানে না ফিরোজ কাকে কেন খু’ন করেছে, তার জন্য ওর কোন আফসোসও নেই। তবে খুব অবাক লাগছে ফিরোজ কে দেখে। এই ছেলেটা আকাঙ্ক্ষার ভাই ছিলো না।
ফিরোজ এবারে উঠে দাঁড়িয়ে আরজুর দিকে এগিয়ে গেল। ফিরোজ কে নিজের দিকে এগিয়ে আসে দেখে আরজু ভ্রুঁ কোঁচকালো, তবে নিজ থেকে আগে আগে কিছু বলল না। ফিরোজ নিজেই বলে উঠলো,
“প্রিথুলের বন্ধুর কথা তোর মনে আছে আরজু, যে তোর ঘরে ঢুকেছিল?”
আরজুকে খুব বেশি কষ্ট করতে হলো না কথাটা মনে করতে। ওপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। ফিরোজ ফের বলে উঠলো,
“এই জীবনে শুধুমাত্র ওকেই খু'ন করেছি।আর ওকে কেন খু’ন করেছি জানিস? কারণ ও তোর দিকে হাত বাড়িয়ে ছিলো, তোকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছিলো। যে আরজু আমার বুকে থাকতো সেই বুকে আঘাত করেছিল। ওর বেঁচে থাকার কোন অধিকারই ছিল না। তাই মে’রে দিয়েছি।”
আরজুর মাঝে বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। ফিরোজের এই কথার সাথে হয়ত আরজুও একমত। ওই শয়তানটার বেঁচে থাকার কোন অধিকার ছিল না। পিছন থেকে আকাঙ্ক্ষা বলে উঠলো,
“প্রার্থনার জীবন কেন নষ্ট করেছিলি?”
এ পর্যায়ে ফিরোজের মুখটা একটু শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ নিজেই আনমনে কি যেন একটা ভেবে উত্তরে বলল,
“এই কথাটা থাক আপা। আমি তো তোমাদের সবার চোখে খারাপ, আমি বরং খারাপ হয়েই থাকি। আমি আলাদা করে ভালো হতে চাইও না। কোনদিন যে কারণটা কাউকে বলি নি, আজও তা বলতে পারবো না।”
ফিরোজের কথাটা শুনে আরজুর কপালে একটা গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
“কি কথা? কি সত্যি কাউকে বলিসনি?”
“আজও বলতে চাই না আমি আরজু। আমি ভালো সাজতে চাই না কারো কাছে।”
“চিন্তা করিস না, তুই এমনিতেও আমার কাছে ভালো হতে পারবি না। বলে দে।”
ফিরোজ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“বললাম তো বলবো না। থামবি তুই। অত্যন্ত জেদি একটা মেয়ে তুই।”
আরজু ফের একই ভঙ্গিতে বলল,
“জানিসই যখন আমি জেদি তাহলে বলে দে। না বলে আমি তোকে যেতে দেবো না।”
ফিরোজ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“আমার প্রতি তোর অধিকার খাটে না। অধিকার দেখাতে আসিস না, ফেঁসে যাবি।”
কথাটা বলে ফিরোজ চলে যেতে ধরলো তবে আরজু ওকে যেতে দিলো না। সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়ালো। রাগে ফিরোজের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গম্ভীর গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সামনে থেকে সর আরজু। আমার কিন্তু মাথা ঠিক নেই।”
আরজু নিজেও পাল্টা গম্ভীর গলায় বলল,
“কারণ না বলে যেতে পারবি না। কেন করেছিলি আমার আপার সাথে এসব? কেন কষ্ট দিলি আমার আপাকে?
“শুনলে কিন্তু তোর অপরাধবোধ বাড়বে, আমার কিছুই হবে না। আমি তো তোকে চিনি, যদি কারণটা শুনিস তবে সারাটা জীবন তুই নিজেই নিজেকে অপরাধী ভেবে যাবি। অযথা নিজের অপরাধবোধ বাড়াস না। সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করছিস, সেটাই কর।"
ফিরোজ ভেবেছিল এই কথাটা বললে হয়তো আরজুর আগ্রহ কমে যাবে। হয়তো ভয়েতে আর শুনতে চাইবে না। তবে হলো তার বিপরীত। বরং আরজুর আগ্রহ আরো বাড়লো। আরজু তো কখনোই প্রার্থনার সাথে এমন কিছু করতে পারে না যার জন্য ওর অপরাধ বোধ বাড়বে। তাই ভাবলো ফিরোজ হয়তো মিথ্যে বলছে ।
আরজু প্রচন্ড জোরাজুরি চালাতে লাগলো। একপর্যায়ে ফিরোজ বিরক্ত হয়ে রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“তোকে বাঁচানোর জন্য বিয়ে দিয়েছিলাম প্রার্থনার ফাহিমের সাথে। শুধুমাত্র তোকে বাঁচানোর জন্য আরজু। তোকে বাঁচাতে গিয়ে প্রার্থনার জীবন নষ্ট করেছি, তোকে বাঁচাতে গিয়ে তোর সব থেকে বড় শত্রু হয়েছি, তোকে বাঁচাতে গিয়ে তোর চোখে অমানুষ হয়ে গেছি, তোকে বাঁচাতে গিয়ে আজ আপার চোখেও অমানুষ হয়ে গেলাম। আমার পুরো জীবনটা আমি নির্দ্বিধায় শেষ করে দিলাম শুধুমাত্র তোকে বাঁচানোর জন্য, কিন্তু দিন শেষে তুই আমাকে সব থেকে বেশি ঘৃণা করিস।”
উপস্থিত প্রত্যেকেরই বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেল। সবথেকে বেশি অবাক হলো বোধহয় আরজু নিজেই। প্রার্থনার বিয়ের সাথে আরজুকে বাঁচানোর কি সম্পর্ক? প্রশ্নাত্মক গলাশ জিজ্ঞেস করল,
“এর মাঝে আমি কি করে এলাম?”
“তুই সব জায়গাতেই ছিলি। মনে আছে ফাহিমের বাপকে মে'রেছিলি অনেক বছর আগে? তুই নিজের হাতে খু’ন করেছিলি।”
কথাটা বলে ফিরোজ আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপা আমার আগে ও খু’ন করেছে। আমার এখনো খু’ন করতে হাত কাঁপে তবে ওর কাঁপে না। ও খু’ন করেছে কেননা ঐ লোকটা প্রার্থনা কে খারাপ ভাবে ছুঁয়েছিলাম। আর আমি খু’ন করেছি ও আরজুকে খারাপ ভাবে ছুঁয়েছিল বলে। তবে তো দুজনের অপরাধ একই। তাহলে আরজু ক্ষমা পেলে আমি কেন পাব না? আরজু মানুষ হলে আমি কেন মানুষ না?”
চমকে উঠলো আকাঙ্ক্ষা। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালো আরজুর দিকে। একবার অবাক হলো, আবার মনে হলো অবাক হওয়াটা হয়তো উচিত নয়। আরজু ছোটবেলা থেকেই ভয়ানক সাহসী ছিল। আকাঙ্ক্ষার ওকে দেখে আগে থেকেই কেন যেন মনে হতো, আরজুর বাপ ভাইকে কেউ সোজা করতে পারলে আরজুই পারবে।
আকাঙ্ক্ষার এসব ভাবনা আছে ফিরোজ ফের বলে উঠলো,
“ফাহিম এর কাছে প্রমাণ, সাক্ষ্যি দুটোই ছিল। তখন অনেক কষ্টে ফাহিমকে আটকে ছিলাম যেন আরজুর নামে কোন কেস না করে। কেস করলে ফেঁসে যেত আরজু। ওর হয়ে কে লড়তো তখন? ওর বাপ না ভাই? আমার তো ক্ষমতাই ছিল না ফাহিমের সাথে লড়াই করার। তখন তো থামিয়েছিলাম কিন্তু তার বদলে ফাহিম খুব দামী একটা জিনিস চেয়েছিল আমার কাছ থেকে। প্রার্থনা কে চেয়েছিল আমার থেকে। ও জানতো আমি বিয়েটা হতে দেব না সেজন্য ও আমায় হুমকি দিল।”
কথাটা বলে ফিরোজ থামলো। তবে আরজু খুব বেশি সময় চুপ থাকতে দিল না।প্রশ্ন করে উঠলো,
“কি হুমকি দিয়েছিল?”
ফিরোজ ফের বলে উঠলো,
“প্রার্থনার সাথে ওর বিয়েটা না দিলে তুই আজ জেলে থাকতি। ওর কাছে তখনো প্রমাণ সাক্ষী সব ছিল। আমি পারতাম না ফাহিমের সাথে আরজু। ফাহিমের অনেক দূর পর্যন্ত হাত ছিল। আমি কারো গোলামী কিংবা দাসত্ব করতে রাজি ছিলাম না, সেইজন্য আমার অঢেল শত্রু ছিল। কিন্তু ফাহিম ছিল সব বড় বড় মানুষদের কেনা গোলাম। সেজন্য ওর ক্ষমতার হাত অনেকদূর পর্যন্ত ছিল। বিশ্বাস কর আমি পারতাম না তোকে বাঁচাতে। ফাহিম চেয়েছিলো ঝামেলা ছাড়া বিয়েটা করতে। আমার কাছে তুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলি, প্রার্থনা না। আমি তোকে বেশি ভালোবাসতাম, প্রার্থনা কে না। আমার উদ্দেশ্য ছিল তোকে বাঁচানো সবকিছু থেকে, প্রার্থনা কে ন। আমি তাই প্রার্থনাকে দিয়ে দিয়েছিলাম শুধু তোকে বাঁচাবো বলে। আর দিন শেষে আমি অপরাধী, আমি সবার কাছে অপরাধী। তোর চোখে আমি একটা ঘৃণ্য মানুষ।”
________
নিজের ঘরের বারান্দায় মেঝের উপর দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দুই হাঁটু মুড়ে বসে আছে আরজু। মন মেজাজ কোনটাই ভালো নেই। আরমান সেই সকালে বেরিয়ে ছিল আর বাড়ি ফেরেনি। ফারিহাকে নিচে নামিয়ে দিয়ে আবার কোথায় যেন চলে গিয়েছিল। সারাদিনে একটাবার কলও করেনি। আরজুও আর নিজ থেকে কল করেনি।
আরজু জানে আজ আরমানের সাথে কথা বলতে অস্বস্তি হবে, কন্ঠটাও কাঁপবে। আরমানের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে না। আরমান তো ওকে দেখেই বুঝতে পারবে যে আরজুর মনটা খারাপ। আরজুও নাটক করতে পারবেনা। আর আরমান যখন মন খারাপের কারণটা জিজ্ঞেস করবে তখন আরজু ওকে মিথ্যে বলতে পারবে না। আরজুর মিথ্যে বলার স্বভাবই নেই। আবার সত্যিটাও বলতে পারবে না, কন্ঠটা কাঁপবে।
আরজুর এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে আরমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। তবে আরমান আরজু কে না বরং আকাঙ্ক্ষাকে ডাকছে। আরজুর কৌতূহল হলো জানার জন্য যে আরমান বাড়ি ফিরেই কেন আকাঙ্ক্ষা কে ডাকছে। কন্ঠটাও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
আরজু উঠে বসার ঘরে যেতেই দেখলো আরমান একা না, ওর সাথে আরো কিছু মানুষ এসেছে। সবাই কে ছাপিয়ে আরজুর চোখ গেল মধ্যবয়স্ক এক মহিলার ওপর। বোরকা-হিজাব পরা। হয়ত মুখটাও ঢাকা ছিল, এখানে এসেই খুলেছে। ভদ্র মহিলা কে চিনতে আরজুর একটুও অসুবিধা হলো না। তবে প্রচন্ড অবাক হলো ওনাকে এখানে দেখে। অস্পষ্ট গলায় বলল,
“পুতুল আপা এখানে কি করছে?”