তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৭২

🟢

মুহিব হোসেন মা’রা যাওয়ার পর মাঝখানে প্রায় একমাস কেটে গেছে। সবাই আবার নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এক মাসে যেমন কয়েকজনের জীবনপ পরিবর্তন ঘটেছে ঠিক তেমনি কয়েকজনের জীবন সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রার্থনা আর সাহিত্যর বিয়ে হয়ে গেছে। দুজনে এখন খুব সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করছে। ফিরোজ, আকাঙ্ক্ষা আর ফারিহা কে নিয়ে অন্য শহরে থাকে এখন। ওদের সাথে অবশ্য আর একজনও থাকে, টুম্পা।

আকাঙ্ক্ষার কথাতেই ফিরোজ টুম্পাকে বিয়ে করেছে। ফিরোজের উপরে এক টুম্পার জীবন নষ্টের দায়ভারই ছিল। তাই ফিরোজ নিজে আবার টুম্পার জীবনটা গুছিয়ে দিয়েছে। টুম্পার স্বপ্ন পূরণ করেছে।

হিমি আর ফিরেও তাকায়নি তাওকীরের দিকে। মেয়েকে নিয়ে নিজের বাপের বাড়িতেই থাকে। কল্পনা এখন বেশিরভাগ সময়টা গ্রামেই থাকেন। ওখানে স্বামীর কবর আছে। সেখানে থাকতে তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। শহরেও থাকা হয়, তবে খুব কম।

অত বড় বাড়িতে এখন বেশিরভাগ সময়টাই তাওকীর একা থাকে। রাতের দিকে তানভীর ফেরে। ব্যবসার দায়িত্ব এখন তানভীরই বেশি সামলাচ্ছে। তাওকীর মাঝে মাঝে যায়, টুকটাক দেখাশোনা করে এই আরকি। কারো সাথে তাওকীরের যোগাযোগ নেই তেমন একটা। কেউই কথা বলে না তাওকীরের সাথে।

মৃন্ময়ীর বিয়েটা কয়েকদিন পিছিয়ে গিয়েছিল। আজ ওখানে এসেছে আরমানরা। সাথে তনুশ্রী আর তাশরীফও আছে। তানভীর কেও দাওয়াত দিয়েছিল মুনতাসির, তবে তানভীর আসতে আপত্তি জানিয়েছে।

খুব সামান্য আয়োজনেই মৃন্ময়ীর বিয়েটা হচ্ছে। খুব অল্পসংখ্যক মানুষকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। তবে বিয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে একটা বিপত্তি বাঁধলো।

বরপক্ষ আসার পর ছেলের মা গেল ছেলের বউকে দেখতে। মৃন্ময়ীর গায়ের গয়নাতে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। গয়নাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভেংচিয়ে রুবিনা খাতুন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আপা, আমরা কিছু চাইনি সেটা আমাদের উদারতা। তাই বলে আপনারা মেয়েকে এমন খালি গায়ে পাঠাবেন সেটা তো ভাবিনি। আমরা কিছু চাইলাম না যেন আমাদের চাহিদা মেটাতে না পেরে আপনারা লজ্জা না পান সেজন্য, কিন্তু আপনারা তো দেখছি কিছুই দিচ্ছেন না।”

ছেলের মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মুখটা কালো হয়ে গেল রুবিনা খাতুনের। মৃন্ময়ী নিজেও লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিল। রুবিনা খাতুন এর সাথে সেখানে আরজু আর ইরা উপস্থিত ছিল। নিজের শাশুড়িকে চুপ করে থাকতে দেখে ইরা নিজেই বলে উঠলো,

“আপনারা যেহেতু কিছু চাননি সেহেতু আমাদের যা সামর্থ্য সেই অনুযায়ীই তো আমরা মেয়েকে গয়না দেব তাই না আন্টি। আর যদি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আপনাদের না চলে তাহলে সেটা আপনাদের আমাদের আগে জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। বিয়ের আগ মুহূর্তে এসে এই কথাগুলোর মানে ঠিক বুঝতে পারছি না।”

“আসলে আমরা তো তাই বলে ভাবিনি যে তোমরা মেয়েকে একেবারে খালি হাতে পাঠাবে।”

ভদ্রমহিলার উক্ত কথাটা শুনে আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনার চোখের পাওয়ার কম? চশমা পরেন না কেন তাহলে?”

আরজুর এমন কথায় ভদ্রমহিলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন

“আমার চোখের পাওয়ার কম হতে যাবে কেন? তোমায় কে বলল?”

“যদি চোখের পাওয়ার কম না হয় তাহলে বলছেন কেন যে ওকে খালি হাতে পাঠাচ্ছি আমরা? ওর গায়ে গয়না দেখতে পাচ্ছেন না?”

ভদ্রমহিলা মুখ ভেংচিয়ে বললেন,

“ওই থেকে বেশি গয়না তো আমার বাড়ির কাজের লোকই পরে থাকে।”

আরজু নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“তাহলে বাড়ির কাজের লোকের সাথেই ছেলের বিয়ে দিতেন। কষ্ট করে আবার আমাদের মতন ভিখিরি পরিবারে ছেলের বিয়ে দিতে চাইছেন কেন? এমনিতেই আপনার ছেলের যা যোগ্যতা, ওকে এতোটুকু গয়না দেওয়াও উচিত না। তবুও যা পাচ্ছেন শুকরিয়া আদায় করুন।”

এই প্রথম আরজুর কাঠখোট্টা কথাগুলো পছন্দ হলো ইরার। তবে পছন্দ হলো না ভদ্রমহিলার। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কি জন্য বেরিয়ে গেলে সেটা কারোরই বোধগম্য হলো না। ভয় পেলেন রুবিনা খাতুন। আতঙ্কিত গলায় আরজু আর ইরা কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমরা অমন করে বলতে গেলে কেন? ওরা ছেলে পক্ষ, এসব বিষয়ে একটু খুঁত ধরবে এটাই স্বাভাবিক। আর সত্যি মেয়েকে তো তেমন কিছু দিতে পারিনি আমরা। ওদের মনঃক্ষুন্ন তো হবেই।”

ইরা বিরক্তিকর গলায় বলল,

“মা তুমি চুপ করো তো। ওনারা যৌতুক চান কিনা এই বিষয় নিয়ে তো আগেই খোলামেলা কথা হয়েছে মুনতাসিরের সাথে। সেই জন্যই তো মুনতাসির পছন্দ করেছেন এই পরিবারকে। আমি এখন খুব ভালো করে বুঝতে পারছি ওনারা আগে কেন কিছু চাননি। ভেবেছেন বিয়ের আগ মুহূর্তে যা ইচ্ছে তাই চাইবেন তাহলে মেয়ের পরিবার ভয়ে সব দিয়ে দেব ওনাদের। মগের মুল্লুক পেয়েছেন তো।”

ওদের কথার মাঝেই বসার ঘর থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ কানে এলো। ভয়ে মৃন্ময়ী আর রুবিনা খাতুন এর মুখ নীল বর্ণ ধারণ করল। মৃন্ময়ী আতঙ্কিত গলায় ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইরা আপু এত চেঁচামেচির আওয়াজ কেন? ওনারা আবার বিয়েটা ভেঙ্গে দেবেন না তো?”

মৃন্ময়ী প্রশ্নের উত্তরটা ইরা দেওয়ার আগে আরজু ওর পাশে গিয়ে বসে বলল,

“এত সহজে ওরা বিয়েটা ভাঙবে না। ওরা এখন কি করবে আমি তোমায় বলি, তোমার ভাইকে চাপ দেবে। আসলে ওনাদের নেওয়ার ইচ্ছে অনেক কিছুই ছিল, ভদ্রতা দেখিয়ে সেসব বলেননি। এখন বিয়ের আগে আগে বলছে। এখন আমি তোমায় একটা কথা বলি, এখনো বিয়েটা হয়নি কিন্তু। মানে তোমার কাছে এখনো সুযোগ আছে। যারা বিয়ের দিন নতুন বউয়ের মনের পরিস্থিতি না বুঝে গয়না নিয়ে ঝামেলা শুরু করে সেই বাড়িতে বিয়ে করবে কি করবে না এই সিদ্ধান্তটা কিন্তু তোমায় নিতে হবে। তুমি তো মুনতাসির ভাইয়ার বোন। আশা করছি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী তুমি।”

আরজু কথাটা বলে উঠে বাইরে গেল। ওর পিছন পিছন ইরা আর রুবিনা খাতুনও গেল। গিয়ে দেখলো পাত্রের মা বাইরে বেশ ঝামেলা জনক একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মুনতাসির আর ইরার বাবা মিলে পরিস্থিতিটা আপাতত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। আরজু আর ইরা কে সেখানে যেতে দেখেই ভদ্রমহিলা ওদের দুজনকে ইশারায় দেখিয়ে বললেন,

“এই দুটো মেয়ে অত্যন্ত বেয়াদব। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেসব জানে না। এখন তো আমরা চিন্তায় আছি যে এই বাড়ির মেয়েকে বউ করে নিয়ে যাব কিনা। কে জানে মেয়ে কত বড় বেয়াদব।”

আরজু আবারো কিছু বলতে ধরলো, তবে তার আগেই ইরা ওর হাত টেনে ধরলো। ইশারায় বোঝাতে চাইলো আরজুকে যেন কিছু না বলে, তবে আরজু সেসব বুঝলো না। বরং বিরক্তিকর গলায় ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“হাত টেনে ধরছো কেন ইরা আপু? কিছু বলার থাকলে জোরে বল। আর তুমি না বললে আমায় বলতে দাও।”

ইরার এখন কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা কিছু বোঝে না কেন।

ইরার ইশারা আরজু না বুঝলেও আরমান ভালোই বুঝতে পেরেছে। ঝামেলার জটলা থেকে বেরিয়ে এসে আরজুর হাত ধরে একটা কোনার দিকে নিয়ে গিয়ে বলল,

“আরু, আপনি একটা কথাও বলবেন না। আমি আছি তো এখানে। আমি কথা বলব।”

“আপনিও কথা বলুন, আমিও কথা বলি সমস্যা কি? ওরা যে আমায় বেয়াদব বলল আপনি কিছু বললেন না কেন?”

আরমান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,

“এখনো তো সময় চলে যায়নি। আমি বলব তো, পরে বলব। তবে আপনি চুপ থাকুন।”

“ওই মহিলা খুবই খারাপ। উনি অত্যন্ত লোভি আরমান। এই বাড়িতে বিয়ে দেবেন না মৃন্ময়ীর। ও ভালো থাকবে না। চলুন বিয়েটা ভেঙে দেই।”

আরজুর কথাটা শুনে আরমানের মনে হলো বিয়ে ভাঙা খুবই সহজ ব্যাপার, তাও আবার বিয়ের আগ মুহূর্তে এসে। মেয়েটা আসলেই পাগ। তবে মুখে সেসব কথা বলল না। বরং আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“ঠিক আছে। পরিস্থিতি বেশি জটিল হলে আমরা বিয়ে ভেঙে দেবো। তবে আপনি এখন চুপ করে থাকুন। আমি কথা বলছি। একটা কথাও আপনি বলবেন না ঠিক আছে?”

আরজু চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো।

এদিকে ঝামেলা ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠলো। হঠাৎ করে পাত্রপক্ষ যৌতুকের দাবি করে বসলো এবং এমন কিছু দাবি করলো যেসব মুনতাসিরের সামর্থের বাইরে। মুনতাসির তাও হয়তো সময় নিয়ে চেষ্টা করতো সবকিছু পূরণ করার কিন্তু তারা জেদ ধরে বসলেন যে এখনই তাদের চাহিদ অনুযায়ী জিনিসপত্র না দিলে নাকি বিয়েই হবে না এবং সব থেকে অবাক করার বিষয় মুনতাসির যেটা খেয়াল করলো সেটা হলো পাত্র একদম চুপচাপ বসে আছে। যেন সে বোবা, কথাই বলতে জানে না। ওর মা-বাবার সিদ্ধান্তই সব।

মুনতাসির বরাবরই ঝগড়া ঝামেলা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। সেজন্য কখনো তানভীরের সাথেও ঝামেলা করেনি। কারো সাথে উঁচু গলায় কথা বলতেও মুনতাসির অপছন্দ করে। সেখানে ওর থেকে বয়সে অনেক বড় মানুষদের সাথে এই টাকা পয়সা নিয়ে তর্ক বিতর্ক করতে ভীষণ বিবেকে বাধছে।

একপর্যায়ে গিয়ে বরপক্ষের লোকজনের চেঁচামেচি যেন মুনতাসির এর জন্য অসহনীয় হয়ে উঠলো। ভিড় থেকে বেরিয়ে আরমান আর ইরার বাবাকে নিয়ে একটু কোণার দিকে এসে চিন্তিত গলায় বলল,

“আমার মাথা কাজ করছে না। বাবার অবর্তমানে তো বোনের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার, কিন্তু ওরা যেটা দাবি করছে সেটা আমার সামর্থের বাইরে।”

মুনতাসিরের কথাটা শুনে পাশ থেকে ইরার বাবা বলে উঠলেন,

“আপাতত বিয়েটা হোক। ওনাদের থেকে কিছুটা সময় নাও। আমি আছি তো, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

ওনার কথায় মুনতাসির আপত্তি জানিয়ে বলল,

“আমার এটা ঠিক মনে হচ্ছে না বাবা। ওরা যা চাইছে সেটা আমরা এখন দিয়ে দিলে ভবিষ্যতে হয়তো ওদের দাবি আরো বেড়ে গেল। তখন যদি আমরা দিতে না পারি তার প্রভাব গিয়ে পড়বে মৃন্ময়ীর ওপর। ওনাদের ভুল চিনেছিলাম। বিয়ের আগ মুহূর্তে এসে এরা যে আচরণটা করছে আমার মাথা ঘুরে উঠেছে।”

আরমান বলল,

“তাহলে এখন কি করতে চাইছো?”

“ভাই বিয়েটা এখানে বন্ধ হয়ে যাক। আমার বোন বেশি হয়নি আমার কাছে। যে টাকা দিয়ে আমার বোনের বিয়ে দেবো, সেই টাকা আমার বোনের পেছনে খরচ করলে অনেক বড় কিছু হতে পারবে। নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারবে। আমি এখন এই একটাই সমাধান দেখছি ভাই। কারণ এনারা যে মানুষ, অন্তত এই ছেলে পুরো মেরুদণ্ডহীন। আর আমার বোনের যে মন মানসিকতা এদের সাথে মিলবে না।”

মুনতাসিরের কথাটা শুনে ইরার বাবা ধমকে উঠে বললেন,

“কি আজেবাজে কথা বলছো? বিয়ের আগ মুহূর্তে বিয়ে ভাঙ্গার মানে বোঝো? মেয়েটার মনের উপর দিয়ে কি যাবে। মেয়েটা বউ সেজে বসে আছে আর এখন গিয়ে কোন মুখে ওকে বলবো যে বিয়েটা ভেঙে গেছে।”

মুনতাসিরের কথায় সায় জানিয়ে আরমান নিজেও বলল,

"মুনতাসির ঠিকই বলেছে আঙ্কেল। এই বিয়েটা না হওয়াই ভালো। আমাদের ভাগ্য ভালো যে বিয়েটা হয়ে যাওয়ার আগে ওনাদের আসল রূপটা দেখতে পেয়েছি।”

ইরার বাবা একটু আপত্তি জানালেন তবে শেষমেষ মুনতাসির আর আরমান মিলে জোর করে ওনাদেরকে রাজি করালেন।

মুনতাসির পাত্রের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তারমানে আপনারা যা যা দাবি করছেন সেগুলো এই মুহূর্তে না দিলে আপনার বিয়েটা দেবেন না তাইতো?”

ভদ্রলোক তেজ দেখিয়ে বললেন,

“না। আমাদের ছেলের জন্য কত বড় বাড়ি থেকে সম্বন্ধ আসে। তোমাদের বাবা নেই, মেয়েটা অনাথ জন্য ভাবলাম এখানেই ছেলের বিয়ে দেই।”

ভদ্রলোক কথাটা বলতেই মুনতাসির হাত উঠিয়ে ওনাকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

বিজ্ঞাপন

“বোনের বিয়ে দিতে চেয়েছি, দয়া চাইনি আপনাদের থেকে। তবুও আপনারা যে দয়াটা করতে চেয়েছেন আমাদের উপর তার জন্য সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব। তবে এই সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ক্ষমা করবেন, আমার বোনকে আপনাদের বাড়িতে পাঠাবো না। আপনাদের কুলাঙ্গার ছেলেকে নিয়ে এবার আসতে পারেন।"

মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতিটা থমথমে হয়ে গেল। বরপক্ষের লোকজন হয়তো এটা আশা করেনি যে কনে পক্ষের লোকজন বিয়েটা ভেঙে দিতে পারে। বেশ কিছুটা সময় ওনারা চুপচাপ শুধু হাঁ করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। অনেকটা সময় নীরবতা সহ্য করার পর মুনতাসির ফের বলে উঠলো,

“বললাম না বিয়েটা হবে না। আপনারা আসতে পারেন।”

শুরু হয়ে গেল আবারো বর পক্ষের লোকজনের চেঁচামেচি। মাঝে আবার তারা গালাগালিও করলেন। শেষমেষ আর কোন অজুহাত খুঁজে না পেয়ে মেয়েকে দোষ দিলেন। বললেন মেয়ের নিশ্চয়ই কোন খুঁত আছে সেই জন্য এখন শেষ মুহূর্তে এসে বিয়ে দিতে চাইছে না। নিশ্চয়ই মেয়ের কোথাও সম্পর্ক আছে। সেই সাথে তারা এটাও বললেন যে মেয়ের রূপ নেই, বাপ ভাইয়ের টাকা নেই সেই মেয়ের বিয়ে কোথায় হয় সেটা ওনারা দেখবেন। আর বিয়ে হলেও ওদের মতন ভিখিরিদের পরিবারেই হবে। ওনাদের বাড়ির বউ হয়ে আসার যোগ্যতাই নেই মৃন্ময়ীর।

আরো তুমুল ঝামেলার পর পাত্র পক্ষের লোকজন চলে গেলেন। ওনারা চলে যাওয়ার পর রুবিনা খাতুন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। মুমতাসির এগিয়ে গেল ওনাকে সামলানোর জন্য। ছেলের কাঁধে মাথা রেখে রুবিনা খাতুন ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“এটা কি করলি তুই বাবা? মেয়েটার তো বদনাম হয়ে গেল। ওর কি আর ভালো বাড়িতে বিয়ে দিতে পারবো? সবাই বলবে বিয়ের দিন ওই মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেছে, মেয়েরই দোষ আছে। আমার মেয়েটাকে কি জবাব দেব? ওর মনের অবস্থাটা বুঝলি না তোরা?”

রুবিনা বেগম হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল। মুনতাসিরের নিজেকেই অপরাধী মনে হলো। একবার ভাবলো, মৃন্ময়ী কি ওকে অপরাধী ভাববে? মৃন্ময়ী কি ভাববে যে ওর ভাই টাকা দেবে না জন্য বিয়েটা ভেঙে দিলো? মৃন্ময়ী কি বুঝবে না যে মুনতাসির ওর ভালোর জন্যই এই বিয়েটা দেয়নি?

পরিস্থিতিটা কেমন যেন বিষাক্ত হয়ে উঠলো। আরমানের নিজেরই কেমন যেন হাসফাস লাগছে।মুনতাসিরের মুখ দেখেই বুঝতে পারছে ও নিজেকেই অপরাধী ভাবছে। ওদিকে রুবিনা খাতুন কাঁদছে, ঘরের ভেতর থেকে মৃন্ময়ীর কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আরমানের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো।

হঠাৎ করেই আরমানের চোখ গেল তাশরীফের ওপর। চুপচাপ তনুশ্রীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তৎক্ষনাত হাসি ফুটে উঠলো আরমানের ঠোঁটে। নিজে নিজেই অনেক কিছু ঠিক করে ফেলল।

আরমান এবারে এগিয়ে গেল রুবিনা খাতুনের দিকে। ওনার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“আন্টি, ভরসা আছে তো আমার উপরে? মৃন্ময়ী আমারও বোন, ওর দায়িত্ব আমারও। আপনি শুধু কান্নাকাটি থামান দয়া করে। আপনি এভাবে কাঁদলে মৃন্ময়ী কে, কে সামলাবে? আমরা সবাই আছি তো ওর জন্য। ওর দুটো ভাই আছে এখনো।”

“আমার মেয়ের কাছে যে অপরাধী হয়ে গেলাম আমি। ওর বাবা বেঁচে থাকলে ঠিক একটা ব্যবস্থা করতো।আমি পারলাম না।”

“ব্যাপারটা টাকা পয়সা দেওয়ার না, ওখানে বিয়ে হলে মৃন্ময়ী ভালো থাকতো না জন্য এই বিয়েটা ভাঙা হয়েছে। মৃন্ময়ীর বিয়ের ব্যবস্থা আমি করবো, কথা দিচ্ছি আপনাকে। ওর অনেক ভালো পরিবারে, অনেক ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দেব আমি। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি ওর বিয়ের। আপনি শুধু নিজেকে সামলান।”

রুবিনা খাতুন ফের কিছু বলে উঠতে ধরলে আরমান ওনাকে থামিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত করে বলল,

“আমি আছি আন্টি। আজীবন আপনাদের পাশে আমি আছি। আপনার দুটো ছেলে আছে। শুধু ভরসা রাখুন।”

_________

শাড়ি পরতে বড্ড অপটু আরজু। তবে আজ হঠাৎ করে শাড়ি পরার ইচ্ছে হলো। এরও একটা কারণ আছে। আরমান নিজে পছন্দ করে একটা শাড়ি কিনে এনেছে আরজুর জন্য। সেটা যদি এখন না পরে তাহলে তো হবে না। শাড়িটা পরে তো আরমানকে দেখাতে হবে কেমন লাগছে। আরমান শুধু শাড়িই না, সেই সাথে সাজার আরো বেশ কিছু জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। আরজু সেসব জিনিসপত্রগুলো চেনেই না, ব্যবহারও জানে না।

আরমান রাতে বাড়ি ফেরার সময় শাড়িটা কিনে এনেছে। খাওয়া দাওয়া শেষে রুমে এসে দেখলো আরজু ফোনে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে। আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি এত মনোযোগ দিয়ে দেখছেন আরু?”

আরজু ফোনের ওপরে মনোযোগ নিবদ্ধ করে আরমানের প্রশ্নের জবাবে বলল,

“শাড়ি পরা শিখছি।”

“এই মাঝরাতে? এখন শেখার কি দরকার? কিছুদিন পর গ্রামে যাব, তখন মায়ের থেকে শিখে নেবেন।”

আরজু ফোনের স্ক্রিনের থেকে চোখ সরিয়ে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিন্তু আমি যে এখন শাড়ি পরবো।”

“এখন কেন পড়বেন? এখন তো ঘুমোবো।”

“আপনি তো এখনই শাড়ি আনলেন, তাহলে আগে শাড়ি পরবো তারপরে ঘুমোবো।”

আরমান জোরপূর্ব হাসার চেষ্টা করে বলল,

“এই রাতে আর কষ্ট করে পরতে হবে না। আপনি যেহেতু পরতে পারেন না এখন পরার দরকারই নেই। ওটা আলমারিতে তুলে রাখুন।”

আরমানের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারল না আরজু্। মৃদু রাগী গলায় বলল,

“তাহলে এনেছেন কেন? আমার না হয় এত সময় ছিল না যে শাড়ি পরা শিখব, আপনি জানেন না কেন কি করে শাড়ি পরে?”

“আমার কি আর দু চারটে বউ ছিল নাকি আগে যে আমি শিখবো? যাইহোক এখন শাড়ি পরতে হবে না। রেখে দিন, ঘুমোবো।”

আরমান কথাটা বলে নিজেই শাড়িটা নিয়ে গিয়ে আলমারিতে তুলে রাখলো। ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল আরমান। হঠাৎ করে বিছানায় বসা আরজুর দিকে তাকাতেই দেখল কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে। গাল ফুলিয়ে রেখেছে। মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না।

আরমানের একটু ভয় হলো আরজুর এই রূপটা দেখে। বিছানায় আরজুর পাশে গিয়ে বসে দুহাতে আরজুর গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,

“অনেকদিন হলো আমার আরুর নরম নরম গাল দুটো টানা হয় না। একটা চুমু খাবো নাকি?”

আরজু এক ঝটকায় গাল থেকে আরমানের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“জীবনেও চুমু খেতে দেবো না। আপনি চুমু খাওয়ার জন্য ম’রে গেলেও আপনাকে চুমু খেতে দেবো না। আপনার শেষ ইচ্ছে যদি হয় আমাকে চুমু খাওয়ার তাও খেতে দেব না।”

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল আরমান। অসহায় গলায় বলল,

“কেন? কি করেছি আমি?”

আরজু পূর্বের মতন করেই বলল,

“শাড়ি কেন তুলে রাখলেন আলমারিতে? আমি শাড়ি পরতাম। আমি একটু সাজতাম, আপনি প্রশংসা করতেন আমার। আপনি কেন আমাকে উৎসাহ দিলেন না শাড়ি পরার ব্যাপারে? আপনি কেন আমার ইচ্ছের গুরুত্ব দিলেন না? আপনি কেন অবহেলা করলেন আমার ইচ্ছেকে?”

আরমান একটা ঢোক দিলে বলল,

“আসলে আরু আমি ভেবেছিলাম এই রাতের বেলা আবার শাড়ি পরতে তো আপনার কষ্ট হবে। আর আপনার প্রশংসা করার জন্য শাড়ি পরতে হবে না। আমি তো এমনিতেই সারাদিন আপনার প্রশংসা করি। এই যে এখন আমার পাগলীটাকে অগোছালো চুল গুলো নিয়েই দারুন লাগছে দেখতে। ঠোঁটটা একটু শুষ্ক লাগছে। না ভ্যাসলিন লাগান, না আমায় চুমু খেতে দেন। আবার দেখি জামা, পাজামা, ওড়না তিনটে তিন রকমের। ম্যাচিং করে পরবেন, তাহলে দেখতে আরো সুন্দর লাগবে।”

আরজু ফের রাগে চিৎকার করে বলল,

“পরবো না। কিছু ম্যাচিং করে পরবো না। আমি পাগল, আমাকে পাগলের মতোই লাগবে দেখতে। আমি কোনদিনও শাড়ি পরবো না। আর আপনাকে কোনদিন চুমুও খেতে দেবো না।”

কথাটা বলে আরজু তেজ দেখিয়ে বিছানা থেকে নামলো। চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে আরমান হাত টেনে ধরে একটা হেচকে টান দিতেই আরজু হুমড়ি খেয়ে আরমানের গায়ের উপরে পড়লো। তাল সামলাতে না পেরে আরমান আরজু সমেতে বিছানার উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়লো।

পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরজু খুব চেষ্টা করলো উঠে বসার, তবে আরমান ছাড়লো না। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলো। একপর্যায়ে গিয়ে আরজু বিরক্ত হলো। মাথা তুলে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এখন না ছাড়লে কামড়ে দেবো।”

আরজুর কথাটা শুনে আরমান ফিক করে হেসে উঠে বলল,

“আমার আপত্তি নেই, তবে ঠোঁটে দিতে হবে কামড়টা।”

আরজু ফের বিরক্তিকর গলায় বলল,

“ছাড়ুন আমায়। আমার সহ্য হচ্ছে না এখন আপনাকে। আমার ভালোই লাগছে না। আপনি জানেন আমার মাথার সমস্যা আছে, এখন আমাকে অযথা রাগাবেন না।”

আরজু ভেবেছিল এবারের কথায় আরমান ওকে ছেড়ে দেবে, তবে তেমন কিছুই হলো না। আরমান আরজুকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আরজুর উপর আধশোয়া হলো। বেশ অনেকটাই ঝুঁকে গেল আরজুর উপরে।

মুহূর্তের মাঝে আরজু জমে গেল। আরমান ওর মুখ দেখে বুঝলো আরজু ঘাবড়ে গেছে। তেজ, রাগ, বিরক্তি সবকিছু এক মুহূর্তের মাঝে পালালো। আরমান আরজুর নাকে নিজের নাক ঘষে বলল,

“আজ কিছু একটা ঘটিয়েই ফেলব আরু। নিজেকে আর কত নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলুন? চলুন না, দুজনের সম্মতিতে আজ কিছু একটা করি।”

আরজু নিজেকে কঠিন রাখার চেষ্টা করে বলল,

“কি করার কথা বলছেন?”

আরমান মুখটা আরজুর কানের কাছে নামিয়ে এনে ফিসফিস করে বলল,

“আপনি যা ভাবছেন সেটা করার কথাই বলছি। চলুন, আজ আমাদের সম্পর্কটাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাই।”

“আর যদি আমি সম্মতি না দেই তো?”

আরমানের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। কিছুক্ষণ খুব চিন্তিত ভঙ্গিতে কিছু একটা ভাবলো। তারপর হঠাৎ করে আবার হেসে উঠে বলল,

“আজ আপনার সম্মতি না নিয়ে উঠবোই না। আজ আমি কোনমতেই ছাড়বো না আপনাকে। দিয়ে দিন না অনুমতি আরু। অনেক তো অপেক্ষা করলাম, এবারে কি আমার ধৈর্যের ফল পাওয়া উচিত না?”

শেষের আরমানের কন্ঠটা খুব অসহায় শোনালো। আরজু শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আরমানের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আরমান অসহায় গলায় ফের বললো,

“আরু! কিছু একটা করি আমরা।”

আরজু এবারও কোন উত্তর দিল না। আরমান যেন বুঝে গেল আরজুর নীরবতাই ওর সম্মতির লক্ষণ। মুহূর্তের মাঝে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে,

“আমি তাহলে লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে আসি।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প