ভোরের দিকে আরমানের কাছে কল এলো তানভীরের নাম্বার থেকে। এক ভয়াবহ সংবাদ দিল তানভীর আরমান কে। মুহিব হোসেন স্ট্রোক করেছেন। এখন ওনাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। অবস্থা সংকটাপন্ন।
খবরটা শুনে আরমান কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে ছিল। গত কয়েকটা দিন হলো ওদের সাথে কি হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। আরমান ভাবে আর কখনোই কি ওরা প্রাণ খুলে হাসতে পারবে না, আর কখনো কি পুরো পরিবারটা এক হতে পারবে না। এই সন্দেহ গুলো আরমানকে গিলে খাচ্ছে। তার মাঝে আজ সকাল সকাল আবার এমন একটা দুঃসংবাদ।
কোনরকম কোন সময় দেয় ব্যয় না করে আরমান হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। আরজুও গেল আরমানের সাথে। যাওয়ার আগে আকাঙ্ক্ষা আর প্রার্থনাকে খবরটা দিল।
হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারলো মুহিব হোসেনের অবস্থা যতটা খারাপ ভেবেছিল তার থেকেও খারাপ। হাসপাতালে আনতে দেরি হয়ে গেছে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। আদৌও উনি আবার সুস্থ হতে পারবেন কিনা এই বিষয়ে ডাক্তাররা এখনো কোনো আশ্বাস দেয়নি।
কল্পনা কাঁদছে। ওনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আজ কেও নেই। হিমি কে খবর দিয়েছে তানভীর, ও আসছে। তানভীর করিডরে সমানে পায়চারী করে যাচ্ছে। তাওকীর একপাশে চুপচাপ বসে আছে। মনে হচ্ছে রাজ্যের চিন্তা তাওকীরের উপরে ভর করেছে।
কল্পনাকে কাঁদতে দেখে আরজুর একটু হলেও খারাপ লাগলো। যতই হোক এটা তো এখন আরজুরও পরিবার। আরমানেরও তো কষ্ট হচ্ছে এই খবরটা শুনে। তাহলে আরজুর কষ্ট হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তবে সমস্যা একটাই, আরজু জানে না কি করে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে হয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যাপারটাও আরজুর তেমন একটা পছন্দ না, তবে তাও মনে হলো কল্পনার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে একটু সান্ত্বনা মূলক বাক্য বলার চেষ্টা করবে। কেননা আর কেউ নেই ওনাকে একটু সান্ত্বনা দেওয়ার মতন।
আরজু কল্পনার পাশে বসলো। কল্পনার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বড় আম্মু কাঁদবেন না। উনি সুস্থ হয়ে যাবে।”
কল্পনা ক্রন্দনরত গলায় বললেন,
“কখন যে লোকটা এতটা অসুস্থ হয়ে গিয়েছে আমি টেরই পাইনি। সারাটা রাত তো ওনার পাশেই শুয়ে ছিলাম আমি। অভিমান করে ওনার দিকে তাকাইনি। না জানি কত কষ্ট হচ্ছিল। হয়তো আমাকে ডাকতেও চেয়েছিলেন, তবে পারেন নি। না জানি কতজনের অভিশাপ লেগেছে মানুষটার উপরে। হয়তো তুমি অভিশাপ দিয়েছো, তোমার বোনও অভিশাপ দিয়েছে।”
“আমরা কেউই ওনাকে অভিশাপ দেইনি, তবে অভিশাপ এমন একটা জিনিস যেটা সব সময় দিতে হয় না। কর্মফল তো সবাইকেই ভোগ করতে হয়। আর আমি কিংবা আপা কেউই কখনো ওনার মৃ'ত্যু চাইনি বড় আম্মু। আমরা চেয়েছি উনি ওনার ভুলটা বেঁচে থেকে উপলব্ধি করুক।”
কল্পনা এবারে অনুরোধের স্বরে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমি জানি আমার স্বামী অন্যায় করেছে, তবে তোমরা ওকে ক্ষমা করে দিও। তুমি তোমার বোনকে একটু বলো যেন ক্ষমা করে দেয় ওনাকে। আমি বুঝতে পারছি এসব চিন্তা থেকেই উনি অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন। তাওকীর আর ওনার সাথে ভালো করে কথা বলে না, সেদিন ওনার গায়ে হাত তুলেছে তারপর থেকে উনি কেমন যেন ঝিমিয়ে গিয়েছিলেন। উনি খুব ভালোবাসেন তাওকীর কে। যবে থেকে তাওকীর ওনার থেকে দূরে চলে গিয়েছে, তবে থেকেই এমন হয়ে গেছেন।”
আরজু আর কিছু বলল না, চুপ করে রইল। কেননা আরজুর মনে হলো এখন চুপ থাকাটাই শ্রেয়।
________
“বাবা তুমি আমার সাথে দেখা করতে আসো না কেন?তুমি আমার সাথে ফোনে কথাও বলো না। আমি খুব রেগে আছি তোমার উপরে।”
অনেকগুলো দিন পর তাওকীর নিজের আদরের মেয়ের দেখা পেলো। আগে মন ভরে মেয়েকে আদর করল। এবার এলো মেয়ের অভিমান ভাঙানোর পালা। সারা মুখে অজস্র চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বলল,
“আসলে মা, বাবা খুব ব্যস্ত থাকে কাজে। আমার ব্যস্ততা শেষ হয়ে গেলেই আমি তোমার সাথে দেখা করতে যাব। রোজ তোমার সাথে কথাও বলবো।”
“আমি আর নানুবাড়ি থাকবো না বাবা, আমি আমাদের বাড়িতে আসবো। ওখানে দাদুভাই, দিদিভাই, চাচ্চু, তুমি সবাই আছো। আমার এখানে ভালো লাগেনা। আমাদের বাড়িতে আমার সব খেলনাও আছে।”
“আচ্ছা চিন্তা করো না, বাবা তোমার জন্য নতুন খেলনা কিনে পাঠিয়ে দেবে।”
“নানাভাই তো অনেক খেলনা কিনে দিয়েছে, কিন্তু আমি ওখানে থাকবো না। তুমি আমাকে নিয়ে এসো না বাবা। আম্মুকে বললে আম্মু আমাকে বকা দেয়। তোমার কথা বললেই আম্মু বকা দেয়, রাগারাগি করে।”
তাওকীর মেয়েকে আর কিছু বলার সুযোগ পেল না, আর আদর করার সুযোগও পেল না। হিমি তাহিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তাহি চলে এসো। আমরা বাড়ি ফিরব।”
হিমির কথায় তাহি আপত্তি জানিয়ে বলল,
“আম্মু, নানু বাড়ি আর যাব না। আমরা আমাদের বাড়ি যাবো। চলো না বাবার সাথে চলে যাই। ওখানে ভালো লাগেনা আমার একা একা।”
হিমি তাহি কে ধমক দিয়ে বলল,
“সবসময় জেদ করবে না। তোমার এসব জেদ আমি সবসময় মেনে নেব না তাহি। আমি যা বলছি তোমাকে তাই করতে হবে।”
মায়ের ধমকে তাহি ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠলো। পাশে তানভীর দাঁড়িয়েছিলো। বুঝলো হিমির সবটুকু রাগ এখন তাহির উপরে পড়বে। তাড়াহুড়ো করে তাওকীরের কোল থেকে তাহিকে নিয়ে হিমি কে আসতে বলে নিজেও বাইরে চলে গেল। বুঝলো এখন পরিস্থিতি ওকেই সামাল দিতে হবে। তাহি তো ছোট মানুষ। ও তো আর বুঝবে না এত সব জটিলতা। ওর সাথে রাগারাগি করেও কোন লাভ নেই।
তানভীরের পিছু পিছু হিমিও চলে যেতে ধরলে তাওকীর পিছন থেকে হিমির হাতটা টেনে ধরল। বাধ্য হলো হিমি থামতে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাওকীরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমাকে আটকানোর অধিকার তুমি হারিয়েছো তাওকীর। আর তুমি জানো জোর করে কাউকে আটকে রাখা যায়ও না। হাত ছাড়াে।”
তাওকীর অসহায় গলায় বলল,
“তুমি আর কোনদিনও আমার কাছে ফিরবে না হিমি? আমরা কি আর কোনদিনও আগের মত থাকতে পারবো না? আর কি কখনো আমি আমাদের ঘরটায় তোমায় আর তাহি কে পাবো না?”
হিমি খুব কষ্টে নিজেকে সামলে বলল,
“আগের মত আর কিছু আছে নাকি যে আমাদের সম্পর্কটা আবার আগের মতন হবে? যে পুরুষ একবার অন্য নারীকে ছেড়ে আমার কাছে আসতে পারে, সে অন্যের জন্য আমাকেও ছেড়ে যেতে পারে। আর যে সংসারে ভালোবাসাই নেই, বিশ্বাসই নেই সেই সংসারে ফিরে যাওয়ার কোন মানেই হয় না।”
“আমি আকাঙ্ক্ষার কাছে ক্ষমা চাইবো হিমি। আমি ওর পায়ে পড়ে দুহাত জোর করে ক্ষমা চাইবো। যতক্ষণ না ও ক্ষমা করবে আমি ওর পায়ের কাছ থেকে উঠবো না। আমি তোমার কাছেও ক্ষমা চেয়ে নেব। আমি সবার কাছে ক্ষমা চাইবো, শুধু তুমি আবার ফিরে এসো। আমার একা থাকতে খুব কষ্ট হয় হিমি।”
“আমারও খুব কষ্ট হয় তাওকীর। যখন আমার মনে পড়ে যায় আমার আগে তোমার স্ত্রী ছিল, তোমার সন্তান ছিল আমার তখন খুব কষ্ট হয়। যখন আমার মনে হয় আমার স্বামী আমি ব্যাতীত অন্য কোন নারী কে ছুঁয়েছিল আমার তখনও খুব কষ্ট হয়। যখন আমার মনে পড়ে যায় যে আমার স্বামী কোন একটা মেয়ের জীবন ধ্বংসের কারণ, কোন একটা মেয়ের সম্মান নষ্টের কারণ আমার তখনও খুব কষ্ট হয়। যখন আমার বার বার মনে পড়ে যায় যে আমার স্বামী আমার মাঝে তার প্রথম স্ত্রীকে খুঁজে বেড়াতো আমার তখনও কষ্ট হয়। বিশ্বাস করো, আমার কষ্টের তুলনায় তোমার কষ্ট নগণ্য।”
“তারমানে তুমি আর ফিরবে না আমার কাছে এটাই তোমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, তাই তো?”
হিমি একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“হ্যাঁ। এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আমি খুব চেষ্টা করছি তাওকীর তোমায় ভুলে যাওয়ার। আর আমি জানি খুব তাড়াতাড়ি তোমায় ভুলেও যাব। আর চিন্তা করো না, আমার মেয়েও খুব তাড়াতাড়ি তার পাপিষ্ট বাবাকে ভুলে যাবে।”
___________
রাতে আর হাসপাতালে আরজু থাকেনি, তবে আরমান থেকে গিয়েছে। আরজু কে বাড়ি রেখে গিয়ে আবারো হাসপাতালে গেছে। নিজের বড় আব্বুকে হাসপাতালে এভাবে অসুস্থ অবস্থায় রেখে আরমান বাড়িতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে না। এটা সম্ভব না। তাই আবার হাসপাতালে চলে গিয়েছে।
একা একা আরজুর আর ঘুম ধরছেনা। অস্থির লাগছে। বারবার শুধু এপাশ ওপাশ ফিরছে। এখন তো মনে হচ্ছে আরজুর বাড়ি ফিরে আসাই উচিত হয়নি। ওখানে কি হচ্ছে কে জানে। কেমন আছেন উনি, সুস্থ হলেন নাকি আবার অসুস্থতা বাড়লো কিছুই জানতে পারছে না। এসব ভাবতে ভাবতেই আরজু ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত একটা নাগাদ আরজুর ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো। ঘুমের মধ্যে থেকেই লাফ দিয়ে উঠে বসলো আরজু্। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিতে দেখলো আরমানের নাম্বার থেকে কল আসছে। কোনরকম কোন সময় ব্যয় না করে আরজু কলটা রিসিভ করলো।
“হ্যাঁ আরমান, বলুন? এত রাতে কল দিলেন কেন? সব ঠিক আছে তো?”
আরজুর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বরের প্রেক্ষিতে অপর পাশ থেকে ভেসে এলো আরমানের নিস্তেজ গলার স্বর।
“আকাঙ্ক্ষা আপাকে একবার ফোনটা দেবেন আরু।”
আরজু একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন? আপা তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে কথা বললে হয় না?”
“এখনই একবার দিন আরু। এমনিতেও অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
কি ভেবে যেন আরজু আর কোন কথা বাড়ালো না। বিছানা থেকে উঠে আকাঙ্ক্ষা ঘরে চলে গেল। আকাঙ্ক্ষা ঘুমিয়ে পড়েছে। আকাঙ্ক্ষা কে ঘুম থেকে তুলে বলল আরমান কথা বলতে চাইছে।
এত রাতে আরমান কথা বলতে চাইছে কথাটা শুনে আকাঙ্ক্ষা নিজেও একটু চিন্তার মাঝে পড়ে গেল। তবে তারপরও কোন কথা না বাড়িয়ে ফোনটা নিল। আরজু স্পিকারে দিল কলটা।
“আমি আকাঙ্ক্ষা বলছি আরমান, বলো কি বলবে?”
তৎক্ষণাত অপর পাশ থেকে আরমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না। বরং আরমান একটু সময় নিয়ে বলল,
“আমার বড় আব্বু কে কি ক্ষমা করা যায় না আপা?”
হঠাৎ আরমানের এমন প্রশ্নে চমকালো আকাঙ্ক্ষা আর আরজু দুজনেই। এই মাঝ রাতে আরমান এসব কেন বলছে? এখন কথাগুলো উঠছেই বা কেন? আকাঙ্ক্ষা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ এই কথাগুলো বলার মানে কি আরমান? এত রাতে তুমি এই কথাটা বলার জন্য কল করেছো? এই মুহূর্তে এই কথাগুলো তোলা কি খুব দরকার ছিল? উনি তো অসুস্থ। আপাতত থাক এই কথাগুলো।”
“ক্ষমা চাওয়া যে এখনই জরুরী আপা। আমার বড় আব্বু যে আপনার থেকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটাও পেল না। আমার বড় আব্বু যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে সেটা তো বুঝতে পারিনি। আমার যে এখন ক্ষমা দরকার আপা। একজন মৃত মানুষের আত্মার শান্তির জন্য তাকে ক্ষমা করতে পারবেন আপা?”
শেষের দিকে আরমানের গলাটা ধরে এলো। কান্না গুলো গলায় এসে দলা পাকিয়ে গেল। চমকে উঠল আরজু আর আকাঙ্ক্ষা। আকাঙ্ক্ষার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলো না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠলো,
“আরমান কি বলছেন এসব? বড় আব্বু.....”
“নেই আরু। বড় আব্বু আর নেই। আমার বড় আব্বু চলে গেছে আর আমাদের সবাইকে রেখে। আমি শেষ একবার আমার বড় আব্বুকে ডাকতেও পারলাম না। বড় আব্বু আমায় হাত বাড়িয়ে কাছে ডেকেছিল, কিন্তু আমি যাইনি। আমাকে ভালোবাসার একটা মানুষ কমে গেল আরু। আমায় বাবার বকার হাত থেকে বাঁচানোর মানুষ কমে গেল। আমি যে শেষবারের মতন আমার বড় আব্বু কে বলতেও পারলাম না, যে আমি ওনাকে খুব ভালোবাসি।”
_________
গ্রামের বাড়িতে মুহিব হোসেনের দাফন কাজ সম্পন্ন হলো। ওনাকে দাফন শেষে বাড়ি ফেরার পর কেউ তাওকীর কে খুঁজে পেল না। আশেপাশে অনেক খোঁজ করা হলো তবে কেউই তাওকীর কে খুঁজে পেল না। একপর্যায়ে সবার চিন্তা বাড়লো।
মুহিব হোসেন মা’রা যাওয়ার পর তাওকীরের চোখ দিয়ে একফোঁটা জলও বেরোয়নি। ছেলেটা একটু বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। বাইরের মানুষজন না জানলেও ঘরের মানুষজন তো জানে তাওকীরের মনের অবস্থা কেমন। তাই ওদের চিন্তাটা আরো বাড়লো।
তবে চিন্তিত দেখা গেল না হিমি কে। হিমি চেয়েছিল কিছুই বলবে না। নিজেকে তো এখন এই বাড়িতে অতিথি মনে হচ্ছে। তবে এক পর্যায়ে সবাইকে এত বেশি চিন্তা করতে দেখি হিমি বলে উঠলো ,
“তাওকীরকে নিয়ে এত চিন্তা করার দরকার নেই। ও ঠিকই আছে।”
হিমির কথাটা শুনে উপস্থিত প্রত্যেকের কপালে গাঢ় ভাজ সৃষ্টি হলো। আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ আপনি জানেন ভাবি,ভাই কোথায় আছে।”
“জানিনা, তবে আন্দাজ করতে পারছি। এত বছর সংসার করলাম, যদি এতটুকু না চিনলাম ওকে তবে আর সংসার করে লাভ কি হলো।”
“কি আন্দাজ করতে পারছেন? কোথায় গিয়েছে ভাই?”
“আমি যদি খুব বেশি ভুল না হই তবে ও গেছে ক্ষমা চাইতে। অপরাধবোধের পাল্লাটা বড্ড ভারী হয়ে গেছে ওর জন্য। সেজন্য ঠিক করে কাঁদতেও পারছে না। আমি অনেকটাই নিশ্চিত ও গেছে আকাঙ্ক্ষা কাছে ক্ষমা চাইতে।”
_________
কলিং বেল বাজতেই ফারিহা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। ভেবেছে বোধহয় আরজুরা এসেছে। দরজা খুলে দিতেই আরজুদেরকে পেল না, তবে পরিচিত একজনকেই দেখলো। তবে ফারিহা যতটুকু জানে এই লোকটারই তো বাবা মা’রা যাওয়ার কারণে আরজুরা গ্রামে গিয়েছে। তাহলে এই লোকটা আবার এখানে কেন এসেছে।
তাওকীর হা করে ফারিহার দিকে তাকিয়ে আছে। সেদিন তো আরমান বলেছিল ফারিহাই তাওকীরের মেয়ে। আজ কত স্পষ্টভাবে তাওকীর ফারিহার সাথে নিজের চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে তাওকীরের অপরাধবোধ।
তাওকীরকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারিহা নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“আরজু ফুপি আর আরমান চাচ্চু তো নেই আঙ্কেল।”
এর আগের বারও ফারিহা তাওকীর কে আঙ্কেল বলেই সম্মোধন করেছিল। তবে আজ কেন যেন এই ডাকটা শুনে তাওকীরের খুব কষ্ট হলো। তাওকীরের ইচ্ছা হলে ফারিহার মুখ থেকে একটু বাবা ডাকটা শুনতে। চাইলো একবার ফারিহা কে বলবে যেন ওকে বাবা বলে ডাকে, তবে সাহস হলো না। তবে ফারিহার মুখ থেকে বাবা ডাকটা শুনতে না পেলেও একবার হাত বাড়িয়ে একটু ফারিহা কে আদর করার ইচ্ছে হলো।
কম্পিত হাতটা ফারিহার দিকে বাড়িয়ে দিল। যেইনা ফারিহার মাথাটা ছুঁতে যাবে অমনি কোত্থেকে যেন আকাঙ্ক্ষা এসে ফারিহার হাত ধরে টেনে দূরে সরিয়ে দিল। আকস্মিক হামলায় ফারিহা চমকালো। ভয়ার্ত গলায় বলল,
“কি হয়েছে ফুপি?”
“কিছু হয়নি মা। তুমি ভিতরে যাও।”
আকাঙ্ক্ষা ফারিহা কে কথাটা বলতেই দরজায় দাঁড়ানোর তাওকীর আকুতি জানিয়ে বলল,
“একবার ছুঁতে দাও অন্তত আকাঙ্ক্ষা কে!”
ফারিহা বুঝতে পারলো না ওকে ছোঁয়ার জন্য এতো আকুতি জানানোর কি আছে। এর আগেও তো দেখা হয়েছিল লোকটার সাথে, তখনও বেশ ভালোভাবেই কথা বলেছিল, তবে আজ মনে হচ্ছে একটু বেশি ভালোবাসা দেখাচ্ছে।
আকাঙ্ক্ষা কোন উত্তর না দিয়ে গলা উচিয়ে প্রার্থনা কে ডাকলো। প্রার্থনা দৌড়ে আসতেই আকাঙ্ক্ষা গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বলল,
“ফারিহাকে নিয়ে ঘরে যা। আমি না বলা পর্যন্ত ওকে ঘর থেকে বের হতে দিবি না।”
দরজার কাছে প্রার্থনা তাওকীর কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সব বুঝে ফেলল। তাই বাড়তি কোন কথা বলার প্রয়োজন মনে করলো না। তবে একটু আকাঙ্ক্ষার জন্য চিন্তা হলো। যাওয়ার আগে একবার চিন্তিত গলায় আকাঙ্ক্ষা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপা আমি ফারিহাকে রেখে আসি। তুমি তো একা।”
“তো কি হয়েছে? রাস্তার কুকুর বিড়ালদের দেখেও আজকাল ভয় করিস নাকি? আমি তো করি না। তোর আপা এড দুর্বল নাকি? তুই ঘরে যা। অভুক্ত রাস্তার কুকুর বোধহয় বাসি খাবার পর উদ্দেশ্যে এসেছে। তাকে একটু উচ্ছিষ্ট দিয়ে বিদায় করে আসি আমি।”
প্রার্থনা সেখানে আর দাঁড়ালো না, ভেতরে চলে গেল ফারিহা কে নিয়ে। আকাঙ্ক্ষার এবার নিজের পুরো মনোযোগ নিক্ষেপ করলো তাওকীরের উপরে। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“কি চাই? হ্যাঁ জানি এটা তোমার ভাইয়ের বাড়ি, কিন্তু তোমার ভাই এখন এখানে উপস্থিত নেই সেটা তো তোমার জানা উচিত।”
“আমার বাবা মারা গেছে আকাঙ্ক্ষা।”
“তো?”
তাওকীর দুই হাত জোড় করে আকাঙ্ক্ষা সামনে দাঁড়িয়ে অনুনয়ের স্বরে বলল,
“তোমার সাথে হওয়া প্রত্যেকটা অপরাধের সব থেকে বড় অপরাধী আমি। তুমি তো সবকিছুর জন্য আমাকে দায়ী করো, তাহলে আমার বাবাকে ক্ষমা করে দিও। মানুষটা মা’রা গেছে। বাকি সবাই হয়তো ওনাকে ক্ষমা করে দিয়েছে, তুমিও ক্ষমা করে দিও।”
“আর যদি ক্ষমা না করে কি করবেন? হুমকি দেবেন?নাকি এবারে একেবারে আমাকে খু’নই করে ফেলবেন?”
“কি বলছো এসব? এমন কিছু করবো না আমি। আমি শুধু তোমার কাছে মিনতি জানাতে পারি আমার বাবাকে ক্ষমা করার জন্য, এর থেকে বেশি আমি আর কিছু পারবো না। আমরা তো নিত্যদিন অনেক পাপই করি আকাঙ্ক্ষা, আমার বাবাও করে ফেলেছেন। আমার বাবার বদলে নাহয় তুমি আমায় শাস্তি দিয়ে দিও, কিন্তু আমার বাবাকে ক্ষমা করে দিও।”
আকাঙ্ক্ষা এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“এর বিনিময়ে আমি কি পাব? তোমার থেকে, পুরো দুনিয়ার থেকে মহৎ উপাধি?আচ্ছা তাওকীর তুমি তোমার বাবাকে কি একবারও বলেছিলে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে? তুমি একবারও তোমার বাবাকে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলে তার অপরাধ কত বড়?”
“এত কিছুর তো সময় পাইনি আমি। হঠাৎ করে তো চলে গেল বাবা।”
“হ্যাঁ, তোমার বাবা হঠাৎ করেই চলে গিয়েছে
একজন মানুষ হিসেবে হয়তো আমার আফসোস হওয়া উচিত, তবে হচ্ছে না। যে আমার জীবন থেকে পনেরোটা বছর কেড়ে নিয়েছে, আমার সন্তান, স্বামী, সংসার, পুরো পরিবার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে তাকে কি ক্ষমা করা যায়, তুমি বলো?”
তাওকীর ঝাপসা হয়ে ওঠা চোখ দুটো মুছে নিয়ে ফের আকুতি করে বলল,
“ক্ষমা করে দাও আকাঙ্ক্ষা আমার বাবা কে। আমি এখন এত সমীকরণ মেলাতে পারছি না বিশ্বাস করো। আমি এখন নিঃস্ব, আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছি। কেউ নেই আমার পাশে। আমার জীবনটা একদম উলটপালট হয়ে গেছে।”
“আর আমার জীবন? আমার জীবনটা তো ধ্বংস হয়ে গেছে তাওকীর তোমায় ভালোবেসে। তুমি জানো তোমার আর তোমার বাবার জন্য কি কি হয়েছে? আমি তোমায় বলি। আমার বাবার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দেনা হয়ে গিয়েছিল। তুমি তো জানতে আমি টুকটাক কাজ করে সেগুলো শোধ করার চেষ্টা করছিলাম। আমাকে আমার পুরো সংসার চালাতে হতো, কারণ আমার বাবার তখন আর কাজ করার সামর্থ্য ছিল না। আমি হারিয়ে যাওয়ার পর আমার বাবার অবশিষ্ট দেনাগুলো শোধ করার মতন কেউ ছিল না। পাওনাদার বাড়িতে এসে যখন অশান্তি শুরু করলো তখন একদিন আমার বাবা স্ট্রোক করে মা’রা গিয়েছিলেন, আমি সেই খবর পাইনি। বাবা মা’রা যাওয়ার পরও পাওনাদারদের অশান্তি কমেনি। তখন ওরা মায়ের সাথে অশান্তি করতো। আমাদের ওই এলাকাটা না খুব জঘন্য ছিল। সবাই মাকে অনেক খারাপ খারাপ প্রস্তাব দিত। এসব সহ্য করতে না পেরে আমার মা গলায় দড়ি দিয়ে ম’রে’ছি’ল। আমি সেই খবরটাও পাইনি। তার কারণ তখন প্রতিটা দিন নিষিদ্ধ পল্লিতে আমার উপরে অসহ্য নির্যাতন চালানো হতো তাওকীর।”
আকাঙ্ক্ষা অনেক শক্ত থাকার চেষ্টা করলেপ কথাগুলো বলে হালকা একটু কাঁদলো। তাওকীর কিছু বলে উঠতে ধরলো, তবে আকাঙ্ক্ষা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“এতটুকুই না, আরো আছে। আমার মা বাবা মা’রা গেল, বাকি রইল শুধু আমার ছোট ভাই। ওর তখন খুবই অল্প বয়স। মাথার ওপরে লাখ লাখ টাকার দেনা, তোমার সন্তানের দায়িত্ব ছিল ওর কাঁধের উপরে, ছিল ওর বড় বোন মানে আমাকে খুঁজে না পাওয়ার চিন্তা। আমার ভাইটা তিন বেলা খেতে পেত না। গ্রামে ওর টেকা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে জড়িয়ে গেল সন্ত্রাসের সাথে। তোমার মেয়ের ব্যবস্থা ও খুব ভালোভাবে করে দিয়েছিল। কোন আঁচ লাগতে দেয়নি ওর গায়ে। আমার ভাইটা হয়ে গেলে সন্ত্রাসী। আর আমার ভাইয়ের নৃশংসরূপের প্রভাব গিয়ে পড়েছিল আমার আরো দুই বোনের প্রতি। তুমি কখনো কল্পনাও করতে পারবে না তাওকীর তোমরা বাবার ছেলে কিভাবে আমার জীবন, আমার পরিবারটা শেষ করে দিয়েছো। এখন আমি যদি তোমার বাবাকে ক্ষমা না করি তবে আমি অমানুষ। আর তোমরা আমার সাথে যা করেছে তার বিচার আমি কার কাছে গিয়ে চাইবো বলো?”
তাওকীর হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো আকাঙ্ক্ষার সামনে। আকাঙ্ক্ষার পা ধরতে চাইলো, তবে আকাঙ্ক্ষা ছিটকে দূরে সরে গিয়ে ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,
“তোমায় দেখলে আমার ঘৃণা হচ্ছে, সেখানে ভাবলে কি করে আমার স্পর্শ করতে দেবো তোমায়?”
তাওকীর অনেক কষ্টে আকাঙ্ক্ষার এই কঠিন বাক্যগুলো হজম করে নিল। ফের দু হাত জোর করে আকাঙ্ক্ষার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“তুমি যদি আমায় নিজের হাতে খু’ন কর তাও হয়তো আমার অপরাধের ক্ষমা হবে না আকাঙ্ক্ষা। আমি তোমায় বোঝাতে পারবো না তোমার সাথে করা অপরাধের জন্য আমি ঠিক কতটা লজ্জিত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী তোমার কাছে আকাঙ্ক্ষা। আমি জানি আমাকে ক্ষমা করা অসম্ভব। আর এই জন্য আমি তোমার কাছে কখনো অভিযোগও করব না। তুমি যা ইচ্ছা আমায় শাস্তি দিও, তবে আমি তোমার কাছে শুধু একটাই বিনীত প্রার্থনা নিয়ে এসেছি আমার বাবাকে ক্ষমা করে দাও।”
আকাঙ্ক্ষা নিজের কান্না থামালো। দুই হাতে চোখের জল মুছে নিয়ে বলল,
“আজ যদি মহৎ হওয়ার উদ্দেশ্যে তোমার বাবাকে ক্ষমা করে দেই তবে আমার নিজের সাথে নিজের অন্যায় করা হবে, আমার মেয়ের সাথে অন্যায় করা হবে।চলে যাও এখান থেকে। তোমার মুখ আমি দেখতে চাই না।”
তাওকীর আকাঙ্ক্ষা কে কিছু বলতে চাইলো তবে তার আগেই আকাঙ্ক্ষা ফের বলে উঠলো,
“তোমায় আরো কঠিন কিছু বলি তার আগে চলে যাও এখান থেকে। আমার জীবন থেকে চলে যাও, আমার মেয়ের জীবন থেকে চলে যাও। দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে।”
তাওকীর বুঝলো আকাঙ্ক্ষার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়ার যোগ্যতাও হারিয়েছে।ক্ষমা করবে না আকাঙ্ক্ষা। খুব বেশি অবাক হলো না তাওকীর। কেননা ক্ষমা না করাটাই হয়তো স্বাভাবিক। তাওকীর নির্লজ্জ জন্য ওর বাবার হয়ে ক্ষমা চাইতে এসেছিল।
চোখের জল মুছে উঠে চলে যেতে নিল তাওকীর, তবে পিছন থেকে ভেসে এলো আকাঙ্ক্ষার গলার আওয়াজ। একটা আশার আলো দেখতে পেল যেন তাওকীর। কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো হয়তো আকাঙ্ক্ষা ক্ষমা করবে ওর বাবাকে।
তাওকূর পিছন ফিরে তাকাতেই আকাঙ্ক্ষা ছলছল দৃষ্টিতে তাওকীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ খুব আফসোস হয় আমার এটা ভেবে জানাতো তাওকীর, সেদিন কেন তোমার জীবন বাঁচিয়েছিলাম। সেদিন যদি আমিও বাকিদের মতো তোমায় র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় ওভাবেই রেখে পালাতাম, তবে আজ আমার জীবনটা নষ্ট হতো না। আমার আফসোস হয় এটা ভেবে আমি কেন সেদিন তোমার দিকে আমার বন্ধুত্বের হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তুমি আমায় বলেছিলে যে আমায় একা ফিরতে হবে না, অথচ জীবনের সবথেকে কঠিন একটা মুহূর্ত আমি একা ছিলাম । জানো প্রথম দিকে খুব কষ্ট হতো এটা বিশ্বাস করতে যে তুমি আমায় ঠকিয়েছো। কিন্তু ধীরে ধীরে সবটা বিশ্বাস হয়ে গেল। যেদিন প্রথম আমায় কোনো পর পুরুষ ছুঁয়েছিল, সেই অনুভূতিটা যদি আমি তোমায় বোঝাতে পারতাম তবে তুমি বুঝতে পারতে আমি আজ কেন তোমার বাবাকে ক্ষমা করলাম না।”
তাওকীরের গাল বেয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। তাওকীর পাঞ্জাবির হাতায় সেটুকু মুছে নিয়ে আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার কারনে তোমার সাথে যা যা অন্যায় হয়েছে আমি নিজে চাই আমার সৃষ্টিকর্তা যেন সেই সবকিছুর শাস্তি আমায় দেয় আকাঙ্ক্ষা। আজ আমি নিজে তোমায় বলছি আমাকে কখনো ক্ষমা করো না । আমার শাস্তি চেয়ো, খুব কঠিন মৃত্যু চেয়ো আমার।”
“হিমি কে খুব ভালোবাসো তাই না?”
কথাটা বলে আকাঙ্ক্ষা একটু হাসলো। হয়তো খুব কষ্ট হলো আকাঙ্ক্ষার কথাগুলো বলতে। তাওকীর বুঝলো কিনা কে জানে, তবে আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারল না। নিরুত্তর হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তাওকীরের নীরবতায় যেন আকাঙ্ক্ষার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। আকাঙ্ক্ষা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“যাও। তোমাদের পুরুষ মানুষের ভালোবাসা কেমন হয় আমার বোঝা হয়ে গেছে। তোমাদের কাছে ভালোবাসা হলো কর্পূর, যা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়।”
“তুমি এখনো ভালোবাসো আমায়?”
তাওকীরের প্রশ্নটা শুনে আকাঙ্ক্ষা ঘৃণা ভরা গলায় বলল,
“ছিঃ। তোমাকে ভালোবাসা যায় নাকি? পুনর্জন্ম যে আর হবে না আমাদের, নয়তো পরের জনমে তোমার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দুজনে একসাথে অনেকটা পথ হেঁটে চলে যাওয়ার পর, তোমাকে একা ফেরত পাঠিয়ে বোঝাতাম যে ঠিক কতটা কষ্ট হয়। তারপরে গুনে গুনে ঠিক পনেরোটা বছর তোমাকে আমার সমান কষ্টের মাঝে রেখে তারপরে জিজ্ঞেস করতাম যে তুমি এখনো আমায় ভালোবাসো কিনা। তবে তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তরটা নিজেই খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারতে।”