তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৬৬

🟢

নিজের ঘরের আরাম কেদারায় চোখ দুটো বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে আছে মুহিব হোসেন। একটু পরে ঘরে কল্পনা এলো। মুহিব হোসেনের কানে একটু শব্দ যেতেই তিনি চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। তিনি খেয়াল করছেন কল্পনা তার সাথে কথা বলছে না। নিচে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও কল্পনা না নিজের কোন মতামত ব্যক্ত করেছে আর না একবারের জন্যও মুহিব হোসেনকে দোষারোপ করেছে। মুহিব হোসেনের ওপর কল্পনার রাগ জমে আছে না অভিমান জমে আছে তা মুহিব হোসেন ঠিক বুঝতে পারছেন না।

কল্পনা ওনার সাথে কোন কথা না বলে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল। মুহিব হোসেনের মনে হলো এবারে বোধহয় ওনার নিজ থেকে কিছু বলা উচিত। স্ত্রীর নাম ধরে উনি একবার ডাকলেন।

“কল্পনা!”

অপর পাশ থেকে কল্পনার কোনো উত্তর ভেসে এলোনা। মুহিব হোসেন ফের বলে উঠলেন,

“অভিমান কিংবা অভিযোগ যাই হয়ে থাকুক প্রকাশ করে ফেলো কল্পনা। আজ আমার ছেলে আমার গায়ে হাত তুলল, সবার সামনে আমাকে দোষারোপ করল। যে ছেলে আমার সাথে কখনো উঁচু গলায় কথা অব্দি বলেনি আজ আমার সেই ছেলে সবার সামনে আমায় যা নয় তাই বলে অপমান করলো। তাই এরপরে পরিস্থিতি যত খারাপই হোক না কেন, যে আমাকে যাই বলুক না কেন আমি খুব বেশি অবাক হবো না, আর না কষ্ট পাবো।”

কল্পনা এবারে মুখ খুললেন। বেশ গম্ভীর গলায় মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার কি মনে হয় না তোমার ছেলের থেকে এই ব্যবহারটাই তোমার প্রাপ্য?”

মুহিব হোসেন সরাসরি স্ত্রীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন,

“আমি যা করেছি ছেলের ভালোর জন্যই করেছি।”

“কি দরকার ছিল এমন ভালো করার যার জন্য একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে হয়?”

মুহিব হোসেন একটু অবিশ্বাস্য গলাতেই বললেন,

“তুমিও আমার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? বিশ্বাস কি নেই আমার উপরে?”

কল্পনা এবারে উঠে বসলেন। স্বামীর দিকে বেশ স্বাভাবিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,

“আমার ছেলে তো এমনি এমনি তোমায় দোষারোপ করবে না। তুমি তো নিজেই বললে ও কখনো তোমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলেনি, সেখানে আজ ও তোমার কলারে হাত দিয়েছে। তুমি কি বুঝতে পারছ না ঘটনাটার গুরুত্ব তাহলে কতটুকু?”

মুহিব হোসেন কোন উত্তর দিলেন না। আবারো গা টা এলিয়ে দিলেন চেয়ারে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর কল্পনা নিজ থেকে আবারো বলল,

“কি হয়েছিল চৌদ্দ বছর আগে? ওই আকাঙ্ক্ষা নামক মেয়েটার সাথে কি করেছিলে তুমি? আমি একটাও মিথ্যে শুনতে চাই না তোমার মুখ থেকে।”

মুহিব হোসেন ইতস্তত গলায় বললেন,

“খুব কি দরকার এখন এই কথাগুলো তোলার?”

“হ্যাঁ, দরকার। কেননা এই কথাগুলোর উপর নির্ভর করছে করছে যে আমি এই বাড়িতে আর থাকবো কিনা।”

মুহিব হোসেন চমকে উঠে বললেন,

“তুমি চলে যাবে আমায় ছেড়ে?”

কল্পনা একটু ভাবনার মাঝে ডুবে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর আনমনে বলে উঠলেন,

“ওই মেয়েটার থেকে যা শুনলাম, ও এতগুলো বছর যে জায়গায় ছিল এর পিছনে যদি তোমার হাত থাকে, তবে যে তোমায় দেখে আমার ভয় হচ্ছে। তোমার ছেলে তো তোমার র’ক্ত, যদি তুমি নিজের স্বার্থের জন্য নিজের র’ক্তকে ধোঁকা দিতে পারো তবে আমি তো পরের মেয়ে। এর কি কোন নিশ্চয়তা আছে সে যদি কখনো তোমার স্বার্থের আঘাত লাগে তুমি আমার সাথেও এমন অন্যায় কিছু করবে না?”

মুহিব হোসেন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ওনারদের বিয়ের এতগুলো বছর হয়ে যাচ্ছে, তবে আজ অব্দি কল্পনা কখনো ওনার মুখের ওপর কথা বলার সাহস পায়নি। বাকিদের সাথে ওনার স্ত্রী যেমনই ব্যবহার করুক না কেন, তবে কখনো ওনার সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস পায়নি। ওনার থেকে জবাবদিহি চাওয়া তো দূরের কথা। স্ত্রীর প্রতি বরাবরই কঠোর থেকেছেন মুহিব হোসেন। তাই বলে কখনো ওনার স্ত্রী ওনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা মুখেও আনেননি। অথচ আজ কি অনায়াসে কথাগুলো বলে দিল। তবে মুহিব হোসেন আর কিছু বলতে পারলেন না স্ত্রীকে। তার আগেই ওনার ফোনটা বেজে উঠলো। পাশে ছোট্ট টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন হিমির বাবার নাম্বার থেকে কল এসেছে।

মুহিব হোসেন মনে মনে এটার জন্য প্রস্তুতিই ছিলেন। তিনি জানতেন এ কলটা তার কাছে আসবে, তাই খুব বেশি অবাক হলেন না। একটা লম্বা শ্বাস টেনে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলেন।

অন্যান্য দিন আজাদুর রহমান মুহিব হোসেনকে কল দেওয়ার পর দুজনের মাঝে যে হাস্যজ্জ্বল কথোপকথনটা চলে আজ তেমনটা হলো না। আজ সামান্য সালাম বিনিময়টাও হলো না দুজনের মাঝে। বরং ফোনটা ধরতেই তিনি রাগান্বিত গলায় মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমার মেয়ে আর যেভাবে অপমানিত হয়ে আপনার বাড়ি থেকে চলে এসেছে এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। মনে আছে আপনি কি বলে আমার মেয়েকে চেয়েছিলেন আপনার ছেলের জন্য? সম্পর্কের শুরুটাই তো আপনি করেছিলেন মিথ্যে দিয়ে, যে আপনার ছেলে আমার মেয়েকে পছন্দ করেছে। আপনার কি মনে হয়, আমার মেয়ের জীবন নষ্টের বিনিময়ে আমি আপনাদের শান্তিতে থাকতে দেবো?”

মুহিব হোসেন শুধু চুপচাপ শুনে গেলেন আজাদুর রহমানের কথাগুলো। ওনার মুখ দিয়ে একটা অক্ষরও বের হলো না। আজাদুর রহমান কিছুক্ষণ মুহিব হোসেনের উত্তরের অপেক্ষা করলেন। যখন বুঝলেন মুহিব হোসেন কথা বলবে না তখন তিনি নিজ থেকে ফের বলে উঠলেন,

“হতে পারেন আপনি এমপি, এই সমাজে আপনার প্রভাব প্রতিপত্তি আছে, তবে ভাববেন না আমি দুর্বল। আমার কতটুকু কি ক্ষমতা সেসবের লোভেই নিশ্চয়ই আপনার ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। এবার আপনাদের সেই ক্ষমতাই দেখাবো। আপনার ব্যবসা তো ডুববেই, আর সামনের নির্বাচনে আপনি আপনার গদিটা কি করে বাঁচান সেটাও আমি দেখে নেব। আর আপনার ঐ কু’লা’ঙ্গা’র ছেলেকে বলে দেবেন ভুলেও যেন ও আমার সামনে না পড়ে। আর ওকে নিষেধ করে দেবেন যেন আমার বাড়ি ত্রিসীমানাতেও যেন ও না আসে। ওই রা’স্কে’ল টাকে যদি আমি কখনো সামনে পেয়েছি তাহলে ওকে কিন্তু আর জীবিত দেখবেন না আপনি। আমার মেয়ের চোখের জলের প্রত্যেকটা ফোঁটার হিসেব নেব আমি।”

কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিলেন আজাদুর রহমান। কল্পনা মুহিব হোসেনকে জিজ্ঞেস করলেন যে ফোনে কি কথা হলো ওনাদের মাঝে কিন্তু মুহিব হোসেন কিছুই বললেন না। উনি আবারও চেয়ারের সাথে গা টা এলিয়ে দিলেন। কোন কিছু বলার বা ভাবার মত ইচ্ছেই আর তার হলো না।

__________

রাতে রান্নাবান্না করা হলেও খাওয়া আর হলো না কারো। আরমান খুব চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর জন্য। পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার জন্য বাড়ি ফেরার পর থেকে একটু হাসাহাসিও করছে। নিজে একাই কৌতুক পূর্ণ কথা বলছে আবার নিজে একাই বোকার মত হাসছে। কে জানে বাকিরা আরমানের এই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা বুঝতে পারছে কিনা।

তবে আরজু খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে।

রাতে ঘুমোনোর আগে আরমান গেল ফারিহার ঘরে। ফারিহা তখন ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফারিহা আর প্রার্থনা এক রুমে ঘুমোয়। আকাঙ্ক্ষা একবার চেষ্টা করেছিল ফারিহাকে নিজের সাথে নিয়ে ঘুমোনোর। প্রার্থনা ফারিহা কে বলেছিল যেতে, তবে ফারিহা কেন যেন রাজি হয়নি। আসলে আকাঙ্ক্ষাকে চেনে না তো তাই ওর সাথে থাকতে অস্বস্তি হয়। প্রার্থনা কে তো অনেকদিন থেকে চেনে, খুব ভালোওবাসে তাই প্রার্থনার সাথে থাকতে কোনো অসুবিধা হয় না। আকাঙ্ক্ষাও আর জোর করেনি। যেখানে ঠিকই করেছে যে নিজের মেয়েকে কখনো পরিচয় দেবে না, সেখানে মেয়েকে নিজের সাথে থাকতে জোর করা উচিত না।

আরমান ঘরে গিয়ে দেখল ঘরে তখন প্রার্থনাও আছে। আরমানকে এ অসময়ে আসতে দেখে প্রার্থনা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কিছু কি হয়েছে ভাইয়া?”

আরমান আলতো হেসে বলল,

“না, আপা। কিছু হয়নি। আমি একটু ফারিহার সাথে গল্প করতে এলাম।”

প্রার্থনা বোধহয় বুঝলো যে আরমান বোধহয় ফারিহার সাথে একটু একা সময় কাটাতে চায়। নিজ থেকেই একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,

“আচ্ছা ভাইয়া। আপনি কথা বলুন। আমি একটু আরুর রুম থেকে আসি। ওর সাথে একটা দরকারি কথা আছে।”

আরমান বাঁধা দিলো না প্রার্থনাকে। প্রার্থনা চলে যেতেই আরমান বিছানার উপর ফারিহার পাশে গিয়ে বসলো। ফারিহার প্রচন্ড ঘুম ধরেছে। ঘুমুঘুমু চোখ নিয়ে আরমানের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। বোধহয় আরমানের কিছু বলার অপেক্ষা করলো।

আরমান খুব মনোযোগ দিয়ে ফারিহার মুখটা পর্যবেক্ষণ করলো। এবং ভীষণ অবাকও হলো। একদম তাওকীসের মত চোখ দুটো, তাওকীরের মতই ঘন ভ্রু যুগল, নাকটাও তাওকীরের মত শুরু। আরো অবাক করার বিষয় হলো তাওকীরের ডান চোখের কোনার দিকটায় যেমন ছোট্ট একটা তিল আছে, ঠিক তেমনি একই জায়গায় ফারিহারও একটা তিল আছে। চেহারায় এত এত মিল থাকা সত্ত্বেও আরমান এতগুলো দিন এত কাছ থেকে দেখার পরও চিনতে পারল না! ফারিহা তো আরমানেরই র’ক্ত। তাও কি করে আরমান চিনতে ভুল করলো?

এদিকে অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও আরমান কিছু না বলায় ফারিহা নিজ থেকে বলে উঠলো,

“তুমি না বললে আমার সাথে গল্প করতে এসেছো তাহলে চুপ করে আছো কেন?”

আরমানের ধ্যান ভাঙল। হালকা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল।

“আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আচ্ছা এখন গল্প করি। আচ্ছা মা, তার আগে তোমার একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি?”

“হ্যাঁ বলো।”

“আমার কোন আচরণে কখনো কি তুমি কষ্ট পেয়েছো? আমি কি আমার অজান্তে কখনো তোমায় কষ্ট দিয়ে ফেলেছি মা?”

ফারিহা একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,

“না তো। কিন্তু কেন?”

আরমান আবারও কিছুক্ষণ হা করে ফারিহার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর একটু হেসে উঠে বলল,

“না এমনি। তোমায় আর একটা কথা বলি। যদি তোমার কখনো কোন কিছুর প্রয়োজন হয় আমাকে বলো কেমন? আর তোমার প্রার্থনা ফুপি এখান থেকে চলে গেলে তুমি আমার আর তোমার আরু ফুপির সাথে থাকতে পারবে না?”

বিজ্ঞাপন

ফারিহা অস্বস্তি মাখানো গলায় বলল,

“একা একা থাকবো কি করে এখানে? আমি তখন আমার চাচ্চুর সাথে থাকবো।”

“আমিও তো তোমার চাচ্চু হই। ফিরোজের সাথে থাকতে পারলে আমার সাথে কেন থাকতে পারবে না আম্মু? আমি তোমায় খুব আদর করবো, তোমায় মাঝে মাঝে ঘুরতে নিয়ে যাব, তোমার যখন যেটা ইচ্ছে হবে সেটাই এনে দেব। শুধু তুমি আমার সাথে থেকে যেও। তুমি যে আমার দায়িত্ব। একটু নিজের অপরাধবোধটা কমানোর সুযোগ করে দিও।”

ফারিহা বুঝলো না আরমানের কথা গুলোর মানে। এর প্রেক্ষিতে ফারিহার কি বলা উচিত সেটাও সে জানে না। দুজনের নীরবতার মাঝে বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হলো। আরমানের ভেতরটা অস্থিরতায় ভরে উঠেছে। এক অজানা অপরাধবোধ ভীষণ বিরক্ত করছে আরমানকে। বারবার শুধু মনে হচ্ছে যদি আরমান সবকিছু ঠিক করে দিতে পারতো, যদি ফারিহাকে বলতে পারতো আরমানের আসল চাচ্চু খুব ভালো হতো।

আরমানকে নিজের দিকে ফ্যালফ্যাল করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফারিহা আবারো বলে উঠলো,

“তুমি তো দেখছি আজ শুধু আমার দিকে তাকিয়েই থাকছো। কি হয়েছে তোমার? আজ অন্যরকম লাগছে তোমায় দেখতে। তুমি তো এই সময় কখনো আমার সাথে গল্প করতে আসো না।”

আরমান ফারিহার আড়ালে চোখদুটো মোছার চেষ্টা করল। তবে ফারিহা বোধহয় সেটা দেখে ফেলল কিন্তু কিছু বলল না। আরমানের মনে হলো ওর আর এখানে থাকা বোধ হয় ঠিক হবে না। এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। যাওয়ার আগে ফারিহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“যদি কখনো কোন কিছুর প্রয়োজন হয় সঙ্গে সঙ্গে আমায় বলবে। যেকোনো সমস্যায় সবার প্রথম আমার কাছে আসবে।”

ফারিহা চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। আরমান উঠে চলে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেল। হঠাৎ করে ফারিহাকে অবাক করে দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। আরমান এবারে নিজের কান্নাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। কিছুটা সময় ফারিহাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। একপর্যায়ে গিয়ে ফারিহা নিজেই জিজ্ঞেস করল,

“কি হলো তোমার? কাঁদছো কেন?”

আরমান ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“বিশ্বাস করো মা, আমি তোমার পরিচয় জানতাম না এতদিন। আমরা এতটা খারাপ নই। তোমার বাবাও খুব ভালো। আমি যে মানুষটাকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি যদি তুমি সে মানুষটাকে দেখতে তবে তুমিও তাকে খারাপ বলতে পারতে না।”

ফারিহা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তুমি আমার বাবাকে চেনো? সবাই তো আমার বাবাকে খারাপ বলে তাহলে তুমি আবার ভালো বলছো কেন?”

আরমান হুঁশে ফিরল। তৎক্ষণাৎ ফারিহাকে ছেড়ে দিয়ে কান্না থামিয়ে সোজা হয়ে বসে মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে ফারিহাকে বলল,

“কিছু না। তুমি ঘুমোও আমি আসছি।”

ফারিহাকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরমান সেখান থেকে চলে গেল। ফারিহা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। ভাবলো পরে না হয় এ বিষয়ে আরমানের সাথে কথা বলা যাবে।

___________

সারাদিন আকাশে কালো মেঘের ছিটে ফোঁটা অব্দি ছিলো না, বরং তীব্র তাপদাহ জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো। সন্ধ্যের পর সে শান্ত আকাশটার হঠাৎ করে কি হলো কে জানে। হঠাৎ করেই কেমন অস্থির হয়ে উঠলো, যেন কারো দুঃখে সে সমবেদনা জানাতে চাইছে।

বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। অনবরত বৃষ্টির ছাঁট এসে গায়ে লাগছে। পাঞ্জাবির হাতার কিছুটা অংশ ভিজেও গেছে। তবে আরমানের সেদিকে কোন খেয়াল নেই।

হঠাৎ করে কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল আরজু দাঁড়িয়ে আছে। আরমান নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“এখনো ঘুমোননি যে আরু, কিছু বলবেন?”

আরজু আরমানকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। আরজুর আড়ালে আরমান চোখ দুটো মুছে নিলেও এখনো চোখের কোনায় এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে। আরজু সেই জলটুকু বৃদ্ধাঙ্গুলীর সাহায্যে মুছিয়ে দিল।

“আমার থেকে আড়াল করতে হচ্ছে কেন এই চোখের জল? আপনার দুঃখ ভাগ করে নেয়ার মত যোগ্যতা কি আমার নেই?”

আরমান বিচলিত ভঙ্গিতে বলল,

“না আরু, তেমন কোন ব্যাপার না।”

“তাহলে চোখের জল আমার থেকে লুকোনোর প্রয়াস কেন? এটাতো প্রমাণ করছে আমি অযোগ্য?”

আরমান ফের বিচলিত ভঙ্গিতে বলল,

“ধ্যাত পা’গ’লী, এমন কোন ব্যাপার না।”

আরজু নিজেই এবার ক্রন্দনরত ভঙ্গিতে বলল,

“তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন? ভুল তো করেছে ঐ লোকটা, ওনার জন্য আপনি কেন কষ্ট পাবেন?”

আরমান সযত্নে দু হাতে আরজুকে আগলে নিলো।

আরজুর কাঁধের উপর থুতনি ঠেকিয়ে বলল,

“ওটা যে আমার ভাই আরু। আমি তো আমার ভাইয়ের খারাপ রূপটা দেখে অভ্যস্ত নই। আমার বড় আব্বু, যাকে আমি আমার বাবার মতন সম্মান করেছি, ভালোবেসেছি। আমি জানতাম আমার বড় আব্বু একজন আদর্শ মানুষ। কিন্তু উনি যে একটা মেয়ের জীবনে এভাবে নষ্ট করে দিতে পারে তাও নিজের স্বার্থে সেটা আমি কখনো ভাবিনি।”

আরজু আরমানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আপনি কি জানেন আমাদের কাছের মানুষরাই আমাদের সব থেকে বেশি কষ্ট দেয়? আমি সত্যিই জানি না আপনি এত অবাক কেন হচ্ছেন। তবে বিশ্বাস করুন আমার কাছে এই ব্যাপারগুলো খুবই সাধারণ। হয়তো আমি এগুলোতে অভ্যস্ত বলে। আমি আপনাকে বলবো কারোর জন্য নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না। ওরা তো আপনার কথা ভাবেনি। ওরা তো জানতো আপনি এগুলো জানলে কষ্ট পাবেন, তাও ভাবেনি আপনার কথা। ওরা সবাই খারাপ।”

আরজু খুব সহজে কথাগুলো বলে ফেলতে পারলেও আরমান সহজ ভাবে কথাগুলো নিতে পারলো না। আরজু কে খুব শক্ত করে চেপে ধরলো। এতক্ষণে যেন আরমান নিজের দূর্বলতা প্রকাশের একটা বিশ্বস্ত জায়গা খুঁজে পেল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না আরমান। ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

“আমার পরিবারটা ভেঙে গেল আরু। আমি কোনোদিন ভাবিনি যে আমার এত সুন্দর পরিবারটা ভেঙে যাবে। আমার বড় আব্বুর বাড়ি মানে আমার নিজের বাড়ি আরু, অথচ আমি আর কোনোদিন ওই বাড়িতে পা রাখতে পারবো না। কোনো অনুষ্ঠানে আমরা সবাই একসাথে আর গ্রামে যেতে পারবো না। আমরা সব ভাই-বোন আর কখনো একসাথে আড্ডায় বসতে পারবো না। অনেক রাত অব্দি জেগে থাকলে হিমি ভাবি আমাদের জন্য আর চা বানিয়ে আনবে না। আমার আর তানভীরের মাঝে ঝামেলা হলে তাওকীর ভাই আর আমাদের ঝামেলা থামাবে না। সব শেষ হয়ে গেলো আরু, সব শেষ হয়ে গেল।”

এই প্রথম কারো কান্না দেখে আরজুর খুব কষ্ট হলো। তবে সান্ত্বনা দিতে যে আরজু জানে না। কি বলে সান্ত্বনা দিতে হয় আরজু সেসব জানে না। কখনো কাউকে সান্ত্বনা দেয়নি, আর না কেউ কখনো আরজুর থেকে সান্ত্বনা চেয়েছে। তাই এখন আরমান কে কি বলে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত আরজু বুঝতে পারলো না। আরমানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“কাঁদবেন না আরমান। আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি যে আপনাকে সান্ত্বনাও দিতে পারছি না। আপনি তো জানেন আপনার আরু এসব পারে না। আচ্ছা আপনি আমায় বলে দিন কি বলে সান্ত্বনা দিতে হয়, কিভাবে সান্ত্বনা দিতে হয় আমি সেভাবেই দেব।”

এমন পরিস্থিতিতেও আরজুর কথা শুনে আরমান হেসে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই আরমান হেসে ফেলল। আরজু কে ছেড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,

“এই পা’গ’লীটাকে নিয়ে আমি কি করি। আগে তো আদর করে পা’গ’লী বলে ডাকতাম, এখন তো দেখছি সত্যি সত্যিই পা’গ’লী।”

আরজু ফ্যালফ্যাল করে আরমানের দিকে তাকিয়ে থেকে অবুঝের মতন বলল,

“আমার কথায় আপনি হাসছেন? খুব বেশি বোকাদের মতন কথা বলে ফেললাম কি?”

আরমান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“হ্যাঁ, খুব বেশি বোকাদের মতন কথা বলে ফেলেছেন। আর আপনার কথা শুনেই আমি হাসছি। তবে আপনার বোকা বোকা কথাগুলো শুনেই আমার আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।”

এবারে আরজু নিজেও আলতো একটু হেসে বলল,

“যদি আপনার আমার কথা শুনে ভালো লাগে তাহলে আমি এমন বোকা বোকা কথাই বলবো। তবুও আপনাকে কাঁদতে দেবো না। আর যারা আপনাকে কাঁদাতে আসবে তাদের আমি ছাড়বো না।”

শেষের লাইনটা আরজু খুব দৃঢ় গলায় বলল। আরমান দু হাতের আজলায় আরজুর মুখটা নিয়ে কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“ভাগ্যিস এই পা’গ’লীটা কে পেয়েছিলাম। নয়তো আজ আমায় কে সামলাতো, কে আমায় হাসাতো। আমার শুধু আপনাকে পেলেই চলবে। বাকি সবকিছু হারানোর কষ্ট আপনাকে জড়িয়ে ধরলেই শেষ হয়ে যাবে। তবে আপনাকে হারানোর কষ্ট কিন্তু কোনোকিছুতেই কমবে না আরু। আপনার তুলনা আপনি নিজেই।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প