নিজের ঘরের দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে তাওকীর। এই খালি ঘরটা তাওকীর কে ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছে। সারাটা রাত কেটে গেছে অথচ কেউ একটা বারের জন্য তাওকীকের খোঁজ নেয়নি। সেই যে ঘরের দরজাটা বন্ধ করেছিল না করেছিল আর খোলা হয়নি। রাতে খাওয়াও হয় না। তাওকীর ফোনটা হাতে নিয়ে বসে ছিল। ভেবেছিল একটাবার হয়তো হিমি কল করবে। তবে রিমি কল করেনি। তাওকীরের নিজ থেকে কল দেওয়ারও সাহস হয়নি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো গতকাল থেকে তাওকীরের একবারের জন্যও আর আকাঙ্ক্ষার কথা মনে পড়েনি। ওর আর আকাঙ্ক্ষার মেয়ের কথাটাও মনে পড়ে নি। বারবার শুধু মনে পরছিল হিমির কথা। চিন্তা হচ্ছিল যে তাহি কেমন আছে। তাওকীরের একবারও নিজেকে স্বার্থপর মনে হলো না। এত কিছু ভাবার সময়ই নেই তার। তবে তাওকীরের সব থেকে বেশি খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে ওর কাছের মানুষগুলো, ওর নিজের পরিবার ওর কাছ থেকে কিছু জানতে চাইলো না। তাওকীর কি রকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কি করতে বাধ্য হয়েছে সেসব একটা বারের জন্যও কেউ জানার ইচ্ছে প্রকাশ করলো না, এমনকি আরমানও না।
তাওকীরের এসব ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল হিমির মায়ের নাম্বার থেকে কল এসেছে। তাওকীরের মাথায় এসব কিছু এলোই না যে হিমি ফোন করলে কেন ওর মায়ের নাম্বার দিয়ে ফোন করবে। হিমির কাছে তো নিজের ফোন আছে। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করে কিছু বলবে তার আগেই অপর পাশ থেকে তাহির কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। মেয়ের কান্নার আওয়াজ পেতেই তাওকীর ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাওকীর উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে আম্মু? কাঁদছো কেন? এই তো বাবা কথা বলছে।”
অপর পাশ থেকে তাহি ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“বাবা, আম্মু হসপিটালে। আমি ওখানে। আম্মু আমার সাথে কথা বলছে না জানো? আম্মুর হাত দিয়ে অনেক র’ক্ত বেরিয়েছে।”
ভয় আর আতঙ্কে তাওকীরের মুখমণ্ডল নীল বর্ণ ধারণ করলো। আতঙ্কিত বলায় বলল,
“কেন? কি হয়েছে তোমার আম্মুর? আর তোমরা হসপিটালে কেন?”
তাহি আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই আজাদুর রহমান তাহির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিলেন। তাওকীরকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দিয়ে বললেন,
“যদি তোমার জন্য আমার মেয়ের কোন ক্ষতি হয় তাহলে তার খেসারত তোমার পুরো বংশকে দিতে হবে। আজ তোমার জন্য আমার মেয়ে মৃ’ত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। আমার মেয়ের মনের কষ্টগুলো ঠিকঠাক ভাবে আমাকে বোঝার সুযোগ টুকুও দিল না। তোমায় আমি শেষ করে ফেলব।”
তাওকীর উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“বাবা, হিমির কি হয়েছে সেটা আগে বলুন? হসপিটালে কেন ও? ও তো অসুস্থ ছিল না।”
আজাদুর রহমান রাগান্বিত গলায় হুংকার ছেড়ে বললেন,
“আমার মেয়েকে সু’ই’সা’ই’ড করতে বাধ্য করে এখন বলছো হসপিটালে কেন? রা’স্কে’ল কোথাকার। আমার মেয়ে তোমার মত একটা বা’স্টা’র্ডে’র জন্য সু’ই’সা’ই’ড করেছে।”
আজাদুর রহমানকে আর কোন কথা বলতে না দিয়ে পাশ থেকে ওনার স্ত্রী ফোনটা নিয়ে কানে ধরে ক্রন্দনরত গলায় তাওকীরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি তাড়াতাড়ি হাসপাতালে এসো। তাহিকে সামলাতে পারছি না আমরা। আমার মেয়েটার প্রতি না হয় অবহেলা করলে ও পরের মেয়ে বলে, নিজের মেয়ের প্রতি অন্তত দায়িত্ব পালন কর।”
“কোন হসপিটাল মা?”
ভদ্রমহিলা হাসপাতালের নাম বলতেই তাওকীর কলটা কেটে দিল। যেমন ছিল তেমনিই হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলো বাড়ি থেকে।
ড্রয়িং রুমে তখন বাড়ির সবাই উপস্থিত। তবে তাওকীরের নজরে ওরা কেউই পরলো না। তাওকীরকে এভাবে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতে দেখে তানভীর গিয়ে আটকালো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় যাচ্ছ?”
তাওকীর উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“হিমি সু’ই’সা’ই’ড করেছে।”
তানভীর আতকে উঠে বলল,
“ভাবি সু’ই’সা’ই’ড করেছে?”
“হ্যাঁ। আমি ওখানেই যাচ্ছি।”
কথাটা বলে তাওকীর চলে যেতে ধরলে ওর কানে মুহিব হোসেনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। গম্ভীর গলায় তাওকীরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোমার একা যাওয়া ঠিক হবে না। তানভীর কে নিয়ে যাও।”
তাওকীর কিছুক্ষণের জন্য থামলো ঠিকই কিন্তু কোন উত্তর দিলে না মুহিব হোসেনের কথার। এমনকি ওনার কথামত তানভীরকে সঙ্গে যাওয়ার জন্য একবার বললও না। খুব সুন্দরভাবে মুহিব হোসেনের কথাগুলো শুনে অবজ্ঞা করে চলে গেল। মুহিব হোসেন শুধু হা করে ছেলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। আর কিছু বলার সাহস তার হলো না।
_________
“ভাই, মৃন্ময়ীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
নিজের মন খারাপটা আরমান প্রকাশ করতে চাইলো না। তাই বাধ্য হয়ে ফুরফুরে মেজাজে বলার চেষ্টা করলো,
“আলহামদুলিল্লাহ, এটা তো খুবই ভালো খবর।তা কবে বিয়ের তারিখ ঠিক হলো?”
“এইতো সামনের মাসের পনেরো তারিখ।”
“ছেলের সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজখবর নিয়েছো তো?”
“জ্বি ভাই। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব খোঁজ নিয়েছি। এখন আল্লাহ যা ভালো মনে করেন তাই করবেন। আপনাকে কিন্তু আমি দাওয়াত দেওয়ার জন্য ফোন করিনি। আপনার বোনের বিয়ে, দায়িত্ব থেকে কিন্তু পালাতে পারবেন না।”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“ইনশাআল্লাহ।”
“আমার বোন কোথায়?”
“উনি তো রান্না করছে।”
আরমান কথাটা বলতেই দেখলো ওর ফোনে তানভীরের নাম্বার থেকেও কল আসছে। আরমান তাড়াহুড়ো করে মুনতাসির কে বলল,
“মুনতাসির, কলটা একটু কাটো তো। তানভীর কল করছে।”
মুনতাসির সঙ্গে সঙ্গে কলটা কেটে দিল। আরমান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতে তানভীর হিমির খবরটা দিল। তানভীর এর থেকে হাসপাতালের নামটা শুনেই আরমান কলটা কেটে দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। বসার ঘরে যেতেই আরজুর সাথে দেখা হলো, বাকিরাও সেখানেই ছিল। আরমান কোথায় যাচ্ছে সেটা আরজু জিজ্ঞেস করতেই আরমান তানভীর এর থেকে যা শুনেছিল সেগুলো বলল। মুহূর্তের মাঝে পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গেল। আকাঙ্ক্ষা অপরাধী গলায় বলল,
“আমার জন্য এসব হলো। আমি তোকে বলেছিলাম আরু ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। আমার সাথে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আমরা পারবো না ওদের সাথে। যদি তাওকীরের বিবেকবোধ থেকে থাকতো তাহলে অনেকদিন আগেই অপরাধবোধ ভুগতো। কিন্তু তেমন কিছুই হয় নি। জোর করে মনে করিয়ে দিয়ে কিছুই করানো সম্ভব নয়। শুধু শুধু আমার মত আরেকটা নিরপরাধ মেয়ের জীবন শেষ হয়ে গেল।”
________
প্রায় আধ ঘন্টা হলো হিমির জ্ঞান ফিরেছে। জ্ঞান ফেরার পর কারো সাথে দেখা করতে চাইনি, এমনকি নিজের মেয়ের সাথেও না। তাওকীরের সাথেও দেখা করার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু তাওকীর কারো নিষেধ শোনে নি, এমনকি হিমিরও না। হিমি ঐ প্রথমেই আরকি যা আপত্তি করেছিল, হয়তো হিমিও চাইছিলে তাওকীরকে দেখতে। তবে দুজনের মাঝে এখনো কোনো কথা হয়নি। তাওকীর চুপচাপ হিমির পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে আছে। বেশ লম্বা একটা সময় দুজনের মাঝে নীরবতা চলো। অবশেষে তাওকীর নিজেই বলে উঠলো,
“আমি না হয় অমানুষ, আমার সাথে আর থাকা যায় না, তাই বলে কি নিজের মেয়ের কথাটা একবার তোমার ভাবা উচিত ছিল না? তোমার থেকে কি এমন অবুঝের মতন আচরণ আশা করা যায়?”
হিমি বেশ শান্ত ভঙ্গিতে জবাবে বলল,
“জীবনের সবথেকে মূল্যবান সম্পদটা যখন হারিয়ে যায় তখন কোন কিছুর ওপরেই আর টান অনুভব করা যায় না। আমার কাছে আমার জীবনটা এখন অর্থহীন। আজ আমার বেঁচে ফেরাতে আমার একটুও আনন্দ হচ্ছে না বরং আমার আফসোস হচ্ছে।”
তাওকীর এবারে একটু ধমকের সুরে বলে উঠলো,
“আর একটা আজেবাজে কথা বললে আমার থেকে খারাপ কিন্তু আর কেউ হবেনা হিমি। কাল থেকে কিছু বলছি না জন্য খুব সাহস বেড়ে গেছে। বলছি তো তোমায় ভালোবাসি।”
হঠাৎ করেই হিমি শব্দ করে কেঁদে উঠলো। তাওকীর ভরকালো। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কাঁদছো কেন? আমি তো সেভাবে বকিনি।”
হিমির কান্না থামলো না বরং আরো বাড়ল। তাওকীর এবারে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে বেডের উপর হিমির পাশে বসলো। হিমির মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে ধরলো। হিমি শোয়া থেকে একটু উঠে বসে দুহাতে তাওকীরের গলা জড়িয়ে ধরলো। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“শুধু আমিই কেন তোমার ভালোবাসা হলাম না তাওকীর? তুমি কেন এতগুলো বছর ধরে আমায় মিথ্যে বলে গেলে? আমি তোমার এই রূপটা মেনে নিতে পারছি না। আমার স্বামী আমার আগে অন্য কারো ছিলো এটা আমি কি করে মেনে নেব? তোমাদের যে একটা সন্তানও আছে। আমার বারবার শুধু মনে হচ্ছে যখন তুমি আমার কাছে আসতে তখন কি তুমি আমার মাঝে আকাঙ্ক্ষাকে খোঁজার চেষ্টা করতে? তুমি কি আমাদের দুজনের মেয়ের মাঝে তোমার ওই মেয়েকে খোঁজার চেষ্টা করতে? তুমি যে বললে তুমি এখনো খুঁজতে আকাঙ্ক্ষাকে। তার মানে কি আমার কখনো ভালোবাসনি তুমি? আকাঙ্ক্ষা চাইলেই তুমি ওর সাথে সংসার করবে তাই না? আমি তো আমার জায়গা ছেড়ে চলে এসেছি স্বইচ্ছায়।”
তাওকীরের গলা কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা হাতে হিমিকে আঁকড়ে ধরেছে ঠিকই, তবে শরীরে কোন বল পাচ্ছে না। কোন উত্তরও দিতে পারলো না হিমির প্রশ্নের। তাওকীরকে চুপ করে থাকতে দেখে হিমি পুনরায় বলে উঠলো,
“কেন আমায় আর আকাঙ্ক্ষাকে ঠকালে এভাবে? খুব কি দরকার ছিল আমাদের সাথে এগুলো করার? যেকোনো একজনকে নিয়ে সংসার করতে। যখন ওকেই ভালোবেসেছিলে তখন অযথা আমার জীবনে কেন আসতে গেলে? আমি আমার স্বামীর ভাগ কি করে অন্যকে দেব তাওকীর? আমার যে কোন কিছুতেই মন বসছে না। বারবার শুধু মনে হচ্ছে আমি আমার বেঁচে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলেছি। আমার জীবনের সবথেকে মূল্যবান সম্পদটা হারিয়ে ফেলেছি। যে মানুষটাকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করেছি সে আমার বিশ্বাস ভেঙেছে। এখন আর আমার বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না।”
“সবথেকে বেশি আফসোস যে আমার নিজেরই হচ্ছে হিমি। আমি খুব বোকা ছিলাম। আমি চেয়েছিলাম তোমরা সবাই ভালো থাকো। কিন্তু এখন দেখছি আমিই তোমাদের খারাপ থাকার কারণ। আমি তোমাকে কি করে বিশ্বাস করাই হিমি যে আমি শুধু তোমার সাথেই সংসার করতে চাই।”
“তাহলে ওই মেয়েটার কি হবে, যাকে তুমি সংসার করার স্বপ্ন দেখিয়েছিলে?”
তাওকীর চুপ করে রইলো। কোনো উত্তর দিতে পারলে না হিমির এই কথার।
ওদের এসব কথাবার্তার মাঝে বাইরে থেকে তানভীর এর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ভিতরে আসার অনুমতি চাইছে। ওদের কণ্ঠস্বর পেয়ে তাওকীর হিমি কে ছেড়ে দিতে চাইলে হিমি তৎক্ষণাৎ রাগান্বিত গলায় বলল,
“ছেড়ে দিতে চাইছো কেন আমায়? লজ্জা করছে অন্যের সামনে আমায় স্ত্রী বলে পরিচয় দিতে? তোমার প্রথম ভালোবাসা ফিরে এসেছে জন্য আমি সত্যিই পর হয়ে গিয়েছি?”
তাওকীর বুঝতে পারলো হিমি রাগে, দুঃখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তাই কোন উত্তর দিলো না হিমির কথার, ছেড়েও দিলো না। বরং হিমিকে জড়িয়ে ধরেই বসে থাকলো। হিমি সেভাবেই তানভীর কে ভিতরে আসার অনুমতি দিলো। শুধু তানভীর না, ওর সাথে আরমান আর আরজুও এসেছে। ওদের সবাইকে একসাথে আসতে দেখে হিমি নিজেই চট করে তাওকীরকে ছেড়ে দিল। তানভীর আর আরমান বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও আরজুকে বেশ স্বাভাবিকই দেখালো। কেননা আরজুর কাছে তো এটা স্বাভাবিক যে স্ত্রী স্বামীকে জড়িয়ে ধরবে।
আরজু আড় চোখে একবার তাওকীরকে দেখে বেশ স্বাভাবিক গলায় হিমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাবি, যদি আপনার রুচি হয় এই লোকটাকে জড়িয়ে ধরার তবে ধরতেই পারেন। আমাদের কোন অসুবিধা নেই।”
তাওকীরের রাগ হলো। মৃদু রাগী গলাতেই বলল,
“তোমার কি কাজই অন্যের সংসারে অশান্তি তৈরি করা? তোমার সাথে তো আমি কিছু করিনি তবে কিসের বদলা নিচ্ছো আমার উপরে?”
আরজুও পাল্টা রাগী গলায় বলল,
“আকাঙ্ক্ষা, যার সাথে এত কিছু করেছেন সে আমার বড় আপা। আমাদের পরিবারের একটা শক্ত খুঁটি ছিল আমার আপা। আপনি ভাবতেও পারবেন না শুধুমাত্র আপাকে কেন্দ্র করে কত কিছু বদলে গেছে আমাদের পরিবারে। আপনি শুধু আপার জীবন নষ্ট করেছেন এমনটা না, আপনি আমাদের সবার পুরো জীবন নষ্ট করেছেন। অসভ্য, ইতর কোথাকার।”
উপস্থিত প্রত্যেকেই চুপচাপ শুধু আরজুর কথাগুলো হজম করলো। তাওকীর একবার তাকালো আরমানের দিকে। আরমান কোনো প্রতিবাদ করল না। তাওকীর এবার নিজেই নিজের নিজের উপর হাসলো। মনে মনে ভাবলো এটাই তার প্রাপ্য।
আরমান হিমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাবি, এখন কেমন আছেন? আর আজ আপনি যে কাজটা করেছেন সেটা কিন্তু মোটেও ঠিক করেননি। প্রচন্ড রেগে আছি কিন্তু আমরা সবাই আপনার উপর।”
হিমি মাথা তুলে আরমানের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
“তোমার প্রশ্নের উত্তরটা পরে দেই তাওসিফ। আগে আকাঙ্ক্ষার স্বামীর থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার আছে আমার।”
আকাঙ্ক্ষার স্বামী পরিচয়টা শুনতেই তাওকীর আতকে উঠল। সেই সাথে চোখ বড় বড় করে তাকালো হিমির দিকে। অনেকগুলো দিন পর কেউ তাওকীরকে এই পরিচয়টা মনে করিয়ে দিল। একটুও ভালো লাগলো না তাওকীরের এই পরিচয়টা, অস্বস্তি হলো ভীষণ। তাওকীর কিছু বলতে চাইলো হিমিকে তবে হিমি ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে নিজেই গম্ভীর গলায় তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“গতকাল তো সব দোষ বাবার উপরে চাপানোর চেষ্টা করলে। এখন একটা সত্যি করে কথা বলতো তুমি কি আসলেও কিছু জানতে না? তুমি আকাঙ্ক্ষার খোঁজ করোনি কেন? হারিয়ে গেল কি করে তোমার থেকে ও?”
তাওকীর অস্বস্তি মাখানো গলায় বলল,
“এখন কি এই কথাগুলো তোলার খুব দরকার হিমি? পরে কখনো…….”
তাওকীরকে কথার মাঝপথে হিমি থামিয়ে দিয়ে বলল,
“পরে আর সময় হবে না তাওকীর। আর কখনো তোমার সাথে দেখা হবে কিনা সেটাও জানি না। তাই আজই সবটা শুনে নেওয়া ভালো। আমি আর বাড়তি একটা কথাও শুনতে চাই না।”
তাওকীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো এখন না বলে কোন উপায় নেই। একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“তোমার আর আমার বিয়ের এক সপ্তাহ আগের কথা। তখনও আমার পরিবার কিংবা আকাঙ্ক্ষার পরিবারের কেউই জানতো না আমাদের বিয়ের কথাটা। এর মাঝে বাবা আমার আর তোমার বিয়ের কথাটা পাকা করে ফেলে। তোমাকে আর তোমার পরিবারকে জানায় আমি তোমায় পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে বলেছি অথচ আমি তোমাকে চিনতামই না।”
কথাটুকু বলে তাওকীর একটু থামলো। একবার আড় চোখে তাকালো হিমির দিকে। হিমির কষ্ট হলো কথাটা শুনে। তবে তাওকীরের কোন উপায় নেই। হিমি নিজেই সব শুনতে চাইছে। তাওকীট আবারও বলা শুরু করলো,
“আমি আপত্তি করেছিলাম আমাদের বিয়েতে। বাবা কারণ জানতে চাইলে আমি বলে দিয়েছিলাম আকাঙ্ক্ষার কথাটা। তখন আকাঙ্ক্ষা….…”
নিজের কথাটা কেন যেন সম্পূর্ণ ল করতে পারল না তাওকীর। তবে তাওকীরের অসম্পূর্ণ কথাটা হিমি সম্পূর্ণ করে দিয়ে বলল,
“প্রেগনেন্ট ছিল তাই তো?”
তানভীর বিরক্তিকর গলায় ওদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এসব কথা এখন তোলার কি দরকার? ভাবি, আপনারা নিজেদের মধ্যে এসব কথা বলে নিয়েন। তাওসিফ তোর বউকে নিয়ে চল তো এখান থেকে।”
তানভীর কথাটা বলতেই আরজু চোখ গরম করে তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে যাও, আমাকে টানছো কেন? আমি শুনতে চাই সব। আমি শুনতে চাই উনি ঠিক কি কি বলে পুরো দোষটা আমার আপার ওপর চাপিয়ে নিজে সাধু সাজেন।”
“তোমার কি একটুও অস্বস্তি হচ্ছে না কথাগুলো শুনতে?”
আরজু বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“অপরাধী নিজের অপরাধ স্বীকার করছে এখানে অস্বস্তি হওয়ার কি আছে? বরং আমি স্বস্তি পাচ্ছি। ওনার করতে লজ্জা করেনি, তোমার এখন ওনাকে ভাই বলে ডাকতে লজ্জা করছে না আর আমার ওনার কুকীর্তির কথা শুনতে লজ্জা লাগবে? যদি আজ আমার বোনের জায়গায় তোমার বোনের সাথে এমনটা হতো তাহলে তুমি অপরাধী স্বীকারোক্তি শুনতে লজ্জা পেতে নাকি তৃপ্তি পেতে? উত্তর দাও?
থেমে গেল তানভীর। আর কিছু বলার সাহস হলো না। আরমান সেই প্রথম থেকেই চুপ করে আছে। শুধু হা করে তাকিয়ে তাওকীরের স্বীকারোক্তি শুনছে।
ওদের বাকবিতণ্ডার মাঝে তাওকীর নিজে তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি চাই তোরা সবটা শোন। আমি চাই সবটা শোনার পর তোরা বিচার কর যে আমার অপরাধটা খুব বেশি নাকি আমি নিজেও ভুক্তভোগী।”
তাওকীট কথাটা বলতেই হিমি তাচ্ছিল্য গলায় বলে উঠলো,
“তুমি কোন যুক্তি দিয়েই নিজেকে নিরাপরাধী প্রমাণ করতে পারবে না তাওকীর। বাবা যাই করে থাকুক না কেন, তুমি তো সব ভুলে সংসার করছিলে আমার সাথে। তোমার এটা আন্দাজে ছিল যে আকাঙ্ক্ষার সাথে খারাপ কিছু হয়েছে কিন্তু তারপরও তুমি বেশ সুখী ছিলে। তুমি আকাঙ্ক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলে, তুমি সারা জীবন ওর পাশে থাকার কথা দিয়েছিলে, তুমি সেই কথাটা রাখতে পারেনি। তুমি না আকাঙ্ক্ষাকে দেওয়া কথা রাখতে পেরেছো না আমাকে দেওয়া কথা।”
নিজের হয়ে তাওকীট কোন সাফাই গাইতে পারলো না। তার আগে ক্যাবিনে তাহি এলো। বাধ্য হলো সবাই আপাতত আলোচনাটা থামাতে। অন্তত তাহির সামনে এই কথাগুলো কেউ তুলতে চায় না।