বেশ সকাল সকাল নিষিদ্ধ পল্লীতে পা পড়লো ফিরোজ আর আরমানের। সেখানে গিয়ে আগে আকাঙ্ক্ষার খোঁজ করলো। ওদের আসার খবর পেয়ে আকাঙ্ক্ষা সব কাজ ফেলে ওদের সাথে দেখা করতে এলো। ওদেরকে নিয়ে আকাঙ্ক্ষা নিজের ঘরেই গেল। ওর সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে বলার পরেই ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। কেননা আরমানরা এখন আকাঙ্ক্ষাকে যে কথাটা বলবে সেটা অন্য কারো না শোনাই ভালো। এই জায়গায় কাউকেই বিশ্বাস করা ঠিক না।
আকাঙ্ক্ষা দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
“কি হয়েছে? কি বলতে এসেছো তোমরা? তোমাদের বারবার এখানে এভাবে আসা ঠিক হচ্ছে না।”
আকাঙ্ক্ষা কথাটা বলতেই ফিরোজ আকাঙ্ক্ষাকে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে বলল,
“আজ রাতের মধ্যে তোমাকে এখান থেকে বের করব আপা, তবে তোমায় একটা সাহায্য করতে হবে।”
“কি?”
"সন্ধ্যের দিকে পুলিশ রেড করবে। হয়তো মিডিয়াও আসবে। আরমান ব্যবস্থা করে রেখেছে যেন তোমাকে মিডিয়ার সামনে আনা না হয়। তারপরেও তোমার সাবধান থাকতে হবে। সে সময় তো আমি কিংবা আরমান কেউই থাকবো না তাই কেউ এসে যদি তোমার পরিচয় জিজ্ঞেস করে তুমি নিজের নাম আকাঙ্ক্ষা বলবে। উনি তোমাকে পিছনের দরজা দিয়ে বের করে আনবে। আর মেইন রোডে আমরা থাকবো। "
আকাঙ্ক্ষার মাথাটা ঘুরে উঠল। কি বলছে আবির এসব! এতটা সহজ নাকি এখান থেকে বের করা! ওরা তো আর জানে না এই ব্যবসার সাথে কত বড় বড় মানুষ জড়িত। কত সভ্য মানুষের মুখোশ পরা অসভ্য মানুষের যাতায়াত আছে নিয়মিত এই জায়গাতে। আর পুলিশ? যে পুলিশের কথা বলছে ওরা সবাই ওদেরকে কেনা গোলাম। ওরা তো টাকার আগে কিছুই দেখতে পারে না।
আকাঙ্ক্ষার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে ফিরোজ ফের বলে উঠলো,
“কি হলো আপা? কিছু বলছো না যে।”
আকাঙ্ক্ষার ধ্যান ভাঙল। ঘোরের মাঝ থেকে বেরিয়ে এসে বলল,
“তোরা যতটা সহজ ভাবছিস ততটা সহজ না। পারবি না এখান থেকে বের করতে আমায়। পুলিশরা তো সবাই ওদের দলের লোক, যারা এ ব্যবসার সাথে যুক্ত।”
আবির আকাঙ্ক্ষাকে অভয় দিয়ে বলল,
“সেসব তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। সব ব্যবস্থা আরমান করে নিয়েছে।”
আবির থামতেই এবার আরমান আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমাকে আরেকটা সাহায্য করতে হবে আপনার।”
আকাঙ্ক্ষা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি সাহায্য?”
“যে সমস্যার কারণে আমার এ জায়গায় পা রাখা, আমার ভার্সিটির কয়েকজন মেয়েকে কিছুদিন আগে এখানে জোর করে আনা হয়েছে। যারা স্বেচ্ছায় এসেছে তাদের কথা বাদ দিলাম, তবে যাদেরকে জোর করে আনা হয়েছে তাদের খোঁজ আমায় দিতে হবে আপা। ওদেরকে ওদের পরিবারের কাছে আবার আমায় ফেরত দিতে হবে।”
আকাঙ্ক্ষা চিন্তিত গলায় বলল,
“তোমরা ফেঁসে যাবে কিন্তু। যাদেরকে এখান থেকে বের করতে চাইছো তারাই এখান থেকে বের হয়ে কিন্তু তোমাকেই বিপদে ফেলবে। তুমি নিজের পরিচয় গোপন রেখে যে কাজটা করতে চাইছো সেই পরিচয়টা কিন্তু ওরা ফাঁস করে দেবে। শেষে দেখবে ওরা তোমাকে এমনভাবে ফাঁসিয়ে দেবে যেন এই ব্যবসার মূলে তুমিই ছিলে।”
এ পর্যায়ে আরমানের কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ দেখা গেল। অন্যান্য সময় হলে নির্ভয়ে বলে দিতো যে ওকে বাঁচানোর জন্য অনেকে আছে। কিন্তু আজ কেন যেন সেসব বলতে পারল না। কিছু আপন মানুষের উপর থেকে বিশ্বাসটা দুর্বল হয়ে গেছে বোধহয়।
আরমান কে চুপ করে থাকতে দেখে ফিরোজ ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করোনা আরমান। তেমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হলে সব দোষ আমি আমার নিজের কাঁধে নিয়ে নেব। তুমি আমায় যত বড় সাহায্য করলে সেই ঋণ আমি আমার জীবন দিয়েও শোধ করতে পারবোনা। সেখানে তোমায় বিপদে একা ফেলে পালাবো না আমি।”
আরমান একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
“না, আমি এসব চিন্তা করছি না। যদি কোন ভালো কাজ করতে গিয়ে আমাকে বিপদেও পরতে হয় তাতে আমার কোন আফসোস নেই। তবে আমার চিন্তা আরুকে কে নিয়ে। আমার কিছু হয়ে গেলে ওকে সামলাবে কে? ওকে সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।”
হঠাৎ করে ফিরোজের বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। অনুভব করতে পারল যে বুকের বাঁ পাশটা একটা সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে।
আজকাল আরমানের ভালোবাসা দেখে প্রায়ই ফিরোজের মনে হয় ও বোধহয় আরজুকে এভাবে ভালোবাসতে পারেনি। ফিরোজ তো কখনো নিজের আগে আরজুর কথা ভাবেনি। আর না কখনো ফিরোজের কিছু হলে আরজুকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়তো। বরং এখন যদি ফিরোজের কিছু হয় আরজু বোধহয় খুশিই হবে। এখানেই বোধহয় পার্থক্য ভালোবাসা আর ঘৃণায়।
_________
আজ ঠিক কতগুলো বছর পর নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার জগত ছেড়ে একটা স্বাভাবিক পরিবেশে পা রাখল আকাঙ্ক্ষা তা তার নিজেরও জানা নেই। আকাঙ্ক্ষা যেন ভুলেই গিয়েছিল যে এই পৃথিবীতে একটা স্বাভাবিক সমাজ বলতেও জায়গা আছে। আকাঙ্ক্ষা ভুলেই গিয়েছিল যে নিষিদ্ধ পল্লীই এই পৃথিবীতে একমাত্র জায়গার নয়। এর বাইরেও একটা আলোকিত জগত আছে। আকাঙ্ক্ষার খুশি হওয়া উচিত কিনা তা সে জানে না। কিংবা খুশি হলেও কতটুকু খুশি হওয়া উচিত তাও আকাঙ্ক্ষার জানা নেই। আবার ভাবছে আদৌ কি ওর খুশি হওয়া উচিত! জীবনটা তো শেষই হয়ে গেছে। জীবনের স্বপ্ন, আশা, ভালো লাগা, খারাপ লাগা সব শেষ। সম্মান বলতে তো আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে অন্ধকার জগত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খুশি হয়েই বা লাভটা কি! যা হারানোর ছিল তা তো হারিয়েছে সেই বহু বছর আগেই।
আরমানের বাড়ির ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই আরজু আর প্রার্থনা এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল আকাঙ্ক্ষার উপরে। আরজু তাও দেখেছিল আকাঙ্ক্ষাকে কিন্তু প্রার্থনার তো সেই সুযোগও হয়নি। বেশ দীর্ঘ একটা সময় দু'বোন আকাঙ্ক্ষাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। একপর্যায়ে ওদের কান্নাকাটি দেখে আরমান বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনাদের মেয়ে মানুষের এই এক জ্বা’লা। আনন্দের মুহূর্তেও কাঁদেন আর কষ্টের মুহূর্তের কথা না হয় বাদই দিলাম। কান্না ছাড়া কিছুই পারেন না। আরু আপনাকেও বলি, এতদিন পর আপা এলো আগে নিয়ে গিয়ে একটু বসান, কিছু খেতে দিন। কান্নাকাটির জন্য তো সারা জীবন পরেই আছে।”
আরমানের এক কথাতেই তিনজনের কান্নাই থেমে গেল। ছেড়ে দিলা আকাঙ্ক্ষাকে তবে আকাঙ্ক্ষা আগেই গিয়ে বসতে পারল না। চোখ পরল ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়ানো ফারিহার উপরে। মেয়েটার চোখে মুখে হাজারো প্রশ্ন। অনেক কিছু জানার তীব্র ইচ্ছে তবে কেউ ওকে কিছুই বলছে না। আকাঙ্ক্ষা চিনতে পারল ফারিহাকে। দেখেছিল যে ফিরোজের ফোনে ছবি। মুহূর্তের মাঝে চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। তবে তাও যেন নিশ্চিত হতে পারল না। একবার তাকালো ফিরোজের দিকে। ফিরোজ আর আকাঙ্ক্ষা বাদে কেউই বুঝলো না এই তাকানোর মানে। ফিরোজ আলতো হেসে উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে ফারিহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মা, এদিকে এসো।”
ফারিহা গুটি গুটি পায়ে ফিরোজের দিকে এগিয়ে গেল। সামনে দাঁড়ানো আকাঙ্ক্ষাকে দেখিয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইনি কে চাচ্চু?”
ফিরোজ উত্তরটা দিতে ধরেও দিতে পারল না। আসল পরিচয়টা যে ফারিহা কে জানানো উচিত হবে না। আকাঙ্ক্ষা নিজেও নিষেধ করেছে তবে কি উত্তর দেবে।
এদিকে ফিরোজের চুপ থাকার কারণটা বাকি কেউ বুঝলো না। আরজু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মুখে তালা লাগিয়ে রেখেছিস কেন? বলে দিলেই তো পারিস ওর ফুপ্পি হয়।”
আরজু কথাটা বলতেই ফারিহা এবার আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিন্তু এটা আমার কোন ফুপ্পি? আগে তো কখনো দেখিনি, নামও শুনিনি।”
আরজুকে আর কিছু বলতে হলো না। তার আগেই আকাঙ্ক্ষা নিজেই ফারিহাকে ইশারায় কাছে ডাকলো। ফিরোজ ফারিহা কে যেতে ইশারা করলে ফারিহা এগিয়ে গেল। আকাঙ্ক্ষা আগে কিছুক্ষণ মন ভরে নিজের মেয়েকে দেখলো। সেই কোন ছোটবেলায় রেখে গিয়েছিল ফিরোজের কাছে। আর এখন কত বড় হয়ে গেছে। আকাঙ্ক্ষার নাকি আবার মেয়ে আছে! ভুলেই তো গিয়েছিল।
হঠাৎ করে আকাঙ্ক্ষা ফারিহা কে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। ফারিহা সহ উপস্থিত প্রত্যেকে ভরকালো। ফিরোজ বাদে বাকি কেউই বুঝলো না আকাঙ্ক্ষার এভাবে কাঁদার মানে। আকাঙ্ক্ষার তো ফারিহাকে চেনার কথা না। কেননা আকাঙ্ক্ষা থাকাকালীন তো ফাহিম নামক কেউ ছিল না। ওদের জীবনে ফাহিমের আগমন তো বহু পরে ঘটেছিল। সত্যি বলতে ফারিহার সাথে ওদের কারোরই রক্তের কোন সম্পর্ক নেই তবে ফারিহা সেটা জানে না। পাশাপাশি থাকতে থাকতে, মেয়েটার মুখ থেকে ফুপ্পি ডাক শুনতে শুনতে আরজু আর প্রার্থনার ওর প্রতি মায়া পড়ে গেছে। কিন্তু আকাঙ্ক্ষার মায়া জন্মালো কি করে? অনেকগুলো দৃষ্টি গিয়ে ফিরোজের উপর পড়লো। ফিরোজ যেন আন্দাজ করতে পারল যে এখন ওকে অনেকগুলো জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সেখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারল না। চলে গেল। আরমান ডাকলো তবে তাও থামলো না।
আরজু কোনমতেই নিজের মনে উদয় হওয়া প্রশ্নগুলো দমিয়ে রাখতে পারল না। প্রশ্নাত্মক গলায় আকাঙ্ক্ষাকে জিজ্ঞেস করল,
“আপা, তুমি ফারিহাকে চেনো? তোমার তো চেনার কথা না। তাহলে এভাবে কেন ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছো?”
কোন উত্তর দিতে পারল না আকাঙ্ক্ষা। আদৌ আরজুর প্রশ্নটা ওর কানে গেছে কিনা সেটাই সন্দেহ। আকাঙ্ক্ষা ফারিহা কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে গালে মুখে অসংখ্য চুমু খেয়ে বলল,
“খুব অন্যায় করেছি তোর সাথে মা। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস। কোন একদিন তুই নিশ্চয়ই বুঝবি আমি ভুল ছিলাম না।”
ফারিহা আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকলো আকাঙ্ক্ষার মুখের দিকে। কিছুই বুঝলো না সে। আরজু, প্রার্থনা, আরমান আকাঙ্ক্ষাকে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করলো কিন্তু আকাঙ্ক্ষা কারোর প্রশ্নেরই উত্তর দিল না। আকাঙ্ক্ষা যেন ভুলেই বসেছে যে এখানে আরো অনেকে উপস্থিত আছে।
আরজু বুঝলো আকাঙ্ক্ষার থেকে কিছু জানা সম্ভব না। কাউকে কিছু না বলে নিজেও বেরিয়ে গেল। নিচে গিয়ে ফিরোজকে পেল। ফিরোজের হাত ধরে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে গম্ভীর গলায় বলল
“ফারিহা কার মেয়ে?”
আরজুর মুখ থেকে এমন কথা শুনে চমকালো ফিরোজ। যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“ফাহিমের মেয়ে।”
আরজু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফিরোজের দিকে তাকালো। ফিরোজ আরজুর সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। এতেই আরজুর যা বোঝার বুঝে গেল যেন।
“বরাবরই আমার মনে এই প্রশ্নটা ছিল যে তুই কেন ফারিহাকে এত ভালোবাসিস। ফাহিমের রক্তকে তো তুই এত ভালোবাসবি না। তুই নিজের রক্ত খুব ভালো করে চিনিস। আজ থেকে পনেরো ষোলো বছর আগে বড় আপা যখন গ্রামে এসেছিল তখন প্রেগনেন্ট ছিল। আপার সেই বাচ্চা কোথায়?”
ফিরোজ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
“আপাকে এ ব্যাপারে এখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি।”
“আমার থেকে লুকোতে চাইছিস? তোর চোখের ভাষা আমি খুব সহজে পড়ে নিতে পারি।”
“তাই নাকি? তা আমি তোকে কতটা ভালোবাসি বলতো সেটা?”
আরজু সহজ সাবলীল গলায় বলল,
“এক বিন্দুও না। তুই আমাকে ভালোবাসিস না। আমি তোর জেদ। আমি হচ্ছি সেই মেয়ে যে তোর অহংকার চূর্ণ করেছে। বারবার যে তোকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রেখেছে। আসলে তোর পুরুষত্বে আঘাত করেছি আমি। তাই আমার প্রতি তৈরি হওয়া তোর অনুভূতিটা ভালোবাসা না বরং জেদ।”
“ভালোবাসায় যদি জেদই না থাকে তবে সেটা কিসের ভালোবাসা? ভালোবাসায় যদি জেদ না থাকে তবে প্রেমিকাকে যে কেউ নিয়ে চলে যাবে আর প্রেমিক হা করে বসে বসে তা দেখতেই থাকবে।”
আরজু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“এসব কথায় আমি যেতে চাইছি না। সত্যি করে বল ফারিহা কার মেয়ে?”
ফিরোজ আরজুর সেই প্রশ্নের উত্তর দিল না। আরজু তখনো ফিরোজের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ফিরোজ আরজুর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আরমানের প্রতি আমার অনেক ঋণ। সেই ঋণের বোঝা এতটাই বেশি যে আমি আমার জীবন দিয়েও তা শোধ করতে পারবোনা। সেজন্য আমার ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে দিলাম। তবে তোর আর আমার জুটিটাও বেশ মানাত রে আরজু। এই দুনিয়া দেখতো পুরো এলাকা শাসিয়ে বেড়ানো ফিরোজ কিভাবে নিজের বউয়ের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।”
_________
সেদিন মুহিব হোসেনের বাড়ি থেকে চলে আসার পর ও বাড়ির কারো সাথে আর যোগাযোগ হয়নি আরমানের। তানভীর কল করেছিল, তাওকীরও কল করেছিল। এমনকি হিমিও কল করেছিল তবে রিসিভ করা হয়নি। ইচ্ছে করেই রিসিভ করেনি। একপর্যায়ে গিয়ে আরমান ওই সিমটাই বন্ধ করে রেখেছে। কথাই বলবে না কারো সাথে।
কয়েকটা দিন চুপচাপ বসে থাকার পর তাওকীর আর থাকতে পারলো না। আগে ভার্সিটিতে গিয়েছিলো আরমানের খোঁজ করতে। তবে সেখানে আরমানকে না পেয়ে এখন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। যে করেই হোক আরমানের সাথে কথা বলে তানভীর আর তনুশ্রীর ব্যাপারটা সমাধান করতেই হবে।
আরমানের ফ্ল্যাটে এসে কলিং বেল বাজালো তাওকীর। বাড়িতে তখন আরমান নেই। আরজু আর প্রার্থনা বোধহয় ঘুমোচ্ছে। আকাঙ্ক্ষাও সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠলো। রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে যাচ্ছিল এর মাঝে কলিং বেলের আওয়াজ কানে এলো। আশেপাশে কাউকে না দেখে একবার ভাবলো ওই গিয়ে খুলে দেখবে কে এসেছে। আবার অস্বস্তিও হলো। কে জানে কে এসেছে। যদি আবার আকাঙ্ক্ষাকে চিনে ফেলে। আকাঙ্ক্ষার এসব ভাবনার মাঝে আবারও কলিং বেল বেজে উঠলো। আকাঙ্ক্ষা ভাবলো যে হয় হোক সে দরজা খুলবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। আকাঙ্ক্ষা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই দেখল ওর দিকে পিঠ করে একজন সুঠাম দেহী পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। ফোনে কারো সাথে বোধহয় কথা বলছে। কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষা একটু অপেক্ষা করলো।
তাওকীর তখন ফোনে হিমির সাথে কথা বলছে। কন্ঠটা কানে যেতেই আকাঙ্ক্ষার কেন যেন চেনা চেনা লাগলো। বোঝার চেষ্টা করলো যে এ কন্ঠটা ও চেনে কিনা। বারবার মনে হচ্ছে আকাঙ্ক্ষা এই কন্ঠটা চেনে। কিন্তু কার কন্ঠ সেটা মনে করতে পারছে না। আকাঙ্ক্ষার এসব ভাবনার মাঝে তাওকীর ফোনটা রাখলো। দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সাময়িক সময়ের জন্য একটা অপরিচিত মহিলাকে দেখে থমকালো। তবে খুব তাড়াতাড়ি সে অপরিচিত মহিলাটা তাওকীর এর কাছে পরিচিত হয়ে উঠল। তাওকীরকে চিনতে ভুল হলো না আকাঙ্ক্ষার। ফলস্বরূপ হাতে থাকা কাচের গ্লাসটা মেঝেতে পরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। বেশ জোরে একটা শব্দ হলো তবে কারোরই ধ্যান ভাঙল না। ঠিক কতটা সময় দুজনে দুজনের দিকে পলকহীন ভাবে তাকিয়ে থাকলো তার হিসেব কারোরই নেই।
আকাঙ্ক্ষার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। এদিকে তাওকীরের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখা পাওয়া গেল। প্রথমে অল্প ঘামলেও এখন মারাত্মকভাবে ঘামছে। অস্পষ্ট গলায় তাওকীর বলল,
“আ….কা….ঙ্ক্ষা?”
এবারে তো আর কোনো সন্দেহ রইল না আকাঙ্ক্ষার। আকাঙ্ক্ষার সামনে সেই অপরাধী, সেই পাপী দাঁড়িয়ে আছে। এতগুলো বছর ধরে আকাঙ্ক্ষা যার কঠিন মৃ’ত্যু কামনা করেছে আজ সেই ব্যক্তিটাই আকাঙ্ক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো এক সময় আকাঙ্ক্ষার ভালোবাসা ছিল, যাকে ভালোবেসে আকাঙ্ক্ষা সব ছেড়েছিল, কোন এক সময় আকাঙ্ক্ষা যার জীবন বাঁচিয়ে ছিল সে মানুষটাই আকাঙ্ক্ষাকে মৃ’ত্যুর মুখে ছুঁড়ে ফেলতে দুবার ভাবেনি। আজ আকাঙ্খার সামনে সেই নোংরা নরকের কিট দাঁড়িয়ে আছে। এই জীবনে অনেকগুলো দিন হলো আকাঙ্ক্ষা যার মুখোমুখি হতে চাইছে, কিছু প্রশ্ন করতে চাইছে সে মানুষটার যখন দেখা পেল তখন আকাঙ্ক্ষার শরীরটা কাঁপছে, মুখ দিয়ে একটা শব্দ অব্দি বেরোচ্ছে না।
তাওকীর নিজের শরীরের ভার বইতে পারছে না। তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে ধরলে নিজেই আবার নিজেকে সামলে নিল। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এলো আরজুর কণ্ঠস্বর। বোধহয় আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে কে এসেছে।
তাওকীর ফের একবার তাকালো আকাঙ্ক্ষার দিকে। আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে পারল না।
এক প্রকার দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো। গাড়ি সাথে করে এনেছিল বিধায় তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল।
তাওকীর বেরিয়ে যেতেই আরমান সেখানে প্রবেশ করল। তাওকীরের গাড়িটা আরমান দেখেছে, যেটা চিন্তে আরমানের ভুল হলো না। ভাবলো বোধহয় ওকে না পেয়ে চলে গেলো। বাইকটা গ্যারেজে রেখে আরমান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গিয়ে দেখলো দরজার কাছে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আকাঙ্ক্ষা। আর আকাঙ্ক্ষাকে সমানে প্রশ্ন করে যাচ্ছে আরজু, তবে কোনো উত্তর পাচ্ছে না। আরমান বুঝতে পারল না এই পরিস্থিতির মানে। তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চিন্তিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে আরু? আর আপা এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”
আরজু নিজেও পাল্টা চিন্তিত গলায় বলল,
“বুঝতে পারছি না। আমি তো ওয়াশরুমে ছিলাম। কেউ এসেছিল বোধহয়। একটা গ্লাস ভাঙ্গার আওয়াজ পেয়ে তাড়াহুড়ো করে আমি বের হয়ে এসে দেখি আপা এভাবে দাঁড়িয়ে আছে দরজায় কাছে। কে এসেছিল জানিনা আমি।”
তাওকীর ভাই এসেছিলাম মনে হয়। গাড়ি দেখলাম বেরিয়ে যেতে।”
তাওকীর নামটা শুনতেই আকাঙ্ক্ষা আরেক দফা চমকে উঠলো। আরমানের দিকে তাকিয়ে কম্পিত গলায় বলল,
“তুমি চেনো তাওকীর কে?”
“হ্যাঁ চিনবো না কেন। আমার ভাই।”
আকাঙ্ক্ষা অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“তুমি তাওকীরের ভাই?”
“হ্যাঁ। কিন্তু কেন? আপনি চেনেন তাওকীর ভাইকে?”
“তুমি সত্যি তাওকীরের ভাই? তোমায় তো আমি ভালো ভেবেছিলাম কিন্তু ওই জা’নো’য়া’রের র’ক্ত তো ভালো হতে পারে না। তুমি আমায় এ কেমন দোটানার মাঝে ফেললে! আমি যে এখন বুঝতে পারছি না তোমার উদ্দেশ্য ভালো না খারাপ।”