তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৭৫

🟢

আরমানের পরিবারের সবাই আজ অনেকগুলো দিন পর আবারও গ্রামে এসেছে। আর গ্রামে আসার কারণ হলো তাশরীফের বিয়ে। আরমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী মৃন্ময়ীর সাথেই তাশরীফের বিয়ে ঠিক হয়েছে। দুই পরিবার মিলে সিদ্ধান্তটা অনেকদিন আগেই নিয়ে রেখেছিল, তবে ওদের কাউকে জানানো হয়নি।

দুজনকে নিজেদের পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সময় দেওয়া হয়েছিল। আজ দুজনেই পড়াশোনা শেষ করেছে এবং নতুন নতুন দুজনে চাকরি ও পেয়েছে। সেজন্য দুই পরিবার আর দেরি করতে চায়নি। যত তাড়াতাড়ি চার হাত এক করে দেওয়া যায় ততই মঙ্গল।

মুনতাসিরদের খুব বেশি আত্মীয়-স্বজন নেই। ওই তো মুনতাসিরের পরিবার আর ইরার পরিবার। সেই জন্য বিয়ের সম্পূর্ণ আয়োজনটা আরমানদের গ্রামের বাড়িতেই করা হয়েছে। বিয়ের দুদিন আগে সবাই গ্রামে এসেছিল, শুধু আসতে পারেনি আরমান।

সদ্য এমপি হয়েছে। এখন প্রচুর ব্যস্ততা যাচ্ছে আরমানের উপর দিয়ে। তবে আরজুর অভিমানের কারণে এখন নিয়ম করে বাড়িতে আসা হয়, সেটা যতই রাত হোক না কেন। আর আরজু এতেই খুশি। অল্প সময়ের জন্য হোক তবুও আরমানের দেখা পেয়ে সে সন্তুষ্ট।

আগামীকাল তাশরীফ মৃন্ময়ীর বিয়ে, আজ রাতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান আছে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের আগে সন্ধ্যের দিকে আরমান গ্রামে এলো। অন্যান্যবার আসা আর এবার আরমানের গ্রামে আসার মাঝে আছে বিস্তর পার্থক্য। এবারে আরমানের গ্রামে একটা আলাদা পরিচয় আছে, সংসদ সদস্য তাওসিফ আরমান। সাথে দু-তিনটে আরো গাড়ি এসেছে, আরমানের দেহরক্ষীরা এসেছে, ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।

গাড়ি থেকে নেমে সবার সাথে টুকটাক কথাবার্তা শেষে ছেলেকে কোলে নিয়ে আরমান গেল আরজুর খোঁজ করতে। তনুশ্রীর থেকে জানতে পারলো আরজু রান্না ঘরে আছে। আরমান আর সেখানে গেল না। তনুশ্রীকে বলে পাঠালো যেন আরজু কে ঘরে পাঠিয়ে দেয়।

তনুশ্রী আরজুকে গিয়ে কথাটা বলল ঠিকই তবে আরজু তৎক্ষনাৎ এলোনা। আরমান অনেক অপেক্ষা করিয়েছে আর আরজু অপেক্ষা করাবে না এটা তো হতে পারেনা। বোঝাতে তো হবে আরজু এখানে খালি খালি বসে নেই। ওরও অনেক কাজ আছে। আরমান যখন ডাকবে তখনই যাওয়ার সময় নেই আরজুর কাছে।

তবে আরজু দেরি করতে চাইলেও দেরি করতে পারলো না। আমেনা বেগম জোর করেই আরজুর হাতে নাস্তা পানি দিয়ে পাঠিয়ে দিলো আরমানের ঘরে। ছেলেটা অনেক দূর থেকে এসেছে। সারাদিন কত ব্যস্ততার মাঝে থাকে, কত খাটাখাটনি করে। নিশ্চয়ই খাওয়ার সময়টুকুও পায় না। এখন নিশ্চয় ক্ষুধা লেগেছে।

অনিচ্ছা সত্বেও আরজু কে যেতে হলো। গিয়ে দেখলো আরমান ছেলের সাথে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেছে। আরজুর রাগ আরো বাড়লো। এতটা সময় পার হয়ে গেল, আরজু এখনো আসেনি সেই নিয়ে আরমানের কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। মনেই নেই হয়তো আরজুর কথা। ছেলেকে তো পেয়ে গেছে, আরজু কে আর কি দরকার।

আরজু খাবারের ট্রে শব্দ করে টেবিলের উপরে রেখে গম্ভীর গলায় গলে উঠলাে,

“যদি কারো পেটে খিদে থেকে থাকে, তবে সে গিলতে পারে খাবারটা।”

এতক্ষণে আরমান আরজুর উপস্থিতি লক্ষ করল। আরজুর কথাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই নিল কেননা আরজু প্রায় এভাবেই কথা বলে। সবার রাগ আরমানের উপরেই দেখায়। তাই আরমান আর বুঝতে পারলো না যে অপরাধটা ওরই।

“আপনি খেয়েছেন আরু?”

আরজু খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“হ্যাঁ গিলেছি তো। গিলতে গিলতে পেটে আর জায়গা নেই। শুধু খাবার না, আপনার গ্রামের মানুষদের অনেক কথাও গিলেছি। আপনি একবার আমার সাথে আসেননি তাই গ্রামের মানুষজন ভেবেছেন আমার কদর শেষ। আপনি বোধহয় আরেকটা বিয়ে করে নিয়েছেন। আমি তো পড়াশোনা শিখিনি, দেখতেও অতটা সুন্দর না তাই সবাই ভেবেছে আমার দিন ফুরিয়েছে। এখন আপনি শিক্ষিত, সুন্দরী কোন মেয়েকে দেখে বিয়ে করে আমাকে এক লাথি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। সত্যি করে বলুন তো আপনার উদ্দেশ্য কি এমন কিছু করার? আগে থেকেই বলে দিচ্ছি, বাড়ি থেকে আমি বের হব ঠিকই তবে তার আগে আপনাকে আর আপনার সুন্দরী কে খু’ন করে তবেই বের হব।”

আরমান বুঝলো আবহাওয়া বেশ ভালোই খারাপ। বউ খুব বেশি রেগে গেছে। এই গ্রামের মানুষগুলোর খেয়েদেয়ে কি আর কাজ নেই যে বেছে বেছে আরমানের বউয়ের সাথেই এসে লাগতে হয়? ওরা কি জানে না আরজুর মাথায় সমস্যা আছে? কেন যে সবাই মিলে আরমানের সংসারে আ’গু’ন লাগাতে আসে আরমান সেটা বুঝে উঠতে পারে না।

তবে আগেই আরজুর রাগ ভাঙাতে গেল না। আগে দরকার ঘরটা ফাঁকা করা। বউয়ের সাথে এখন একটু একান্তে কথা বলতে হবে, ছেলে থাকলে সমস্যা হবে।

আমান তখন আরমানের ফোন দেখায় ভীষণ ব্যস্ত। আরজু তো সারাদিন ফোন ছুঁয়েও দেখতে দেয় না। তাই যখনই আরমান বাড়ি ফেরে সেই ফাঁকে একটু ফোনটা দেখে। তাও আমানের কপাল ভালো যে আরজু এতক্ষণেও খেয়াল করেনি। নয়তো দু'চারটে চ’ড় পড়ে যেত গালে।

আরমান ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমান, মিরার সাথে কথা হয়েছে তোমার আজ?”

আমান ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“হয়েছে তো। তুমি আসার আগে ওর সাথেই খেলছিলাম।”

“তাহলে এখন চলে এসেছো কেন? ও যদি অন্য কারো সাথে খেলা শুরু করে দেয় তাহলে তো ওর তুমি ছাড়া আরো অনেক বন্ধু হয়ে যাবে। তখন তো আর তোমায় গুরুত্ব দেবে না। যাও মিরার সাথে খেলো।”

আরমানের কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারল আমান। সত্যি এটা তো ভেবে দেখেনি। মিরা এখন না জানি কার সাথে খেলছে।

আরমানকে আর বাড়তি একটা কথাও বলতে হলো না। আমান ফোনটা ফেলে রেখে দৌড়ে চলে গেল বাইরে। আমান বাইরে চলে যেতেই আরজু চোখ রাঙিয়ে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কেন অযথা ছেলেকে মিরার পিছনে লাগাচ্ছেন? আমি মুনতাসির ভাইয়াকে বলে দেব।”

আরমানের গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“এই নিয়ে মুনতাসিরের সাথে আমার অনেক আগেই কথা হয়ে গিয়েছে। আমাদের কথা তখন হয়ে গেছে যখন আমাদের ছেলেমেয়ে হয়নি। আপনার ষড়যন্ত্র কিছু করতে পারবে না আরু। যাইহোক, এদিকে আসুন একটু চুমু খাই। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গেছে আমার।”

আরজু তেঁতে উঠে বলল,

“দেব না চুমু খেতে, খাবার গিলুন। আর একটা কথা স্পষ্ট ভাবে শুনে রাখুন, রাতে অনুষ্ঠানে আমি দেখাবো কে কে আমায় জ্বালিয়েছে। তাদের যদি আপনি উপযুক্ত জবাব না দিয়েছেন তবে রাতে আপনি কি করে ঘরে ঢোকেন সেটাও আমি দেখে নেব।”

কথাটা বলে আরজু বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আরমানের তো ঘর ফাঁকা করার পরিকল্পনা কোন কাজেই দিল না। আরজু কিছু করার সুযোগই দিল না। দু-তিন দিন পর আরমান বাড়ি ফিরলো। কোথায় একটু শখ করেছিল বাড়ি ফিরে আগে বউকে ইচ্ছামত চুমু খাবে, কিচ্ছু করতে পারল না আরমান। জীবনটাই ব্যার্থ মনে হলো।

আরমানের এসব ভাবনার মাঝে ফোনটা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নাম্বারটা আরমানের চিনতে ভুল হলো না। ঠোঁটে ফুটে উঠলো কুটিল হাসি। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে হামিদের কটমটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“কু’ত্তা’র বাচ্চা, ভুলে যাস না তোর এমপি হওয়ার মেয়াদ কিন্তু পাঁচ বছর। এর পরের নির্বাচনে আদৌ তুই জিতবি কিনা সেটারও গ্যারান্টি নেই। তখন তোর কি হবে ভেবে দেখেছিস? তোকে তো মা’র’বো’ই, তোর বউ বাচ্চার কি হবে ভেবেছিস একবারও? তোর ছেলের চোখ উপরে ফেলে রাস্তায় ভিক্ষা করাবো, আর তোর বউ থাকবে আমার ঘরে।”

“শু’য়ো’রে’র বাচ্চা যে জিভ দিয়ে আমার বউ বাচ্চার নাম নিয়েছিস সেই জিভ তোর টেনে ছি'ড়ে ফেলবো। একবার ভেবে দেখ তো দুদিনে তোর কি হাল করে ছেড়েছি আমি, তাহলে পাঁচ বছরে কি করতে পারি। তোর অস্তিত্বই তো মিটিয়ে ফেলবো। তোর সবগুলো গোডাউনে তালা লাগিয়েছি, তোর অর্ধেক কুকীর্তির কথা মিডিয়ার সামনে এনেছি, বাকিটাও খুব তাড়াতাড়ি আনবো। হাসপাতালে গরীব মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার নামে যে অর্গান ট্রাফিকিং এর বিজনেস চালাস সেটাও খুব তাড়াতাড়ি সবার সামনে আসবে। তোর তো একটা হালাল ব্যবসাও দেখলাম না আমি। বাটপারি ছাড়া আর পারিসটা কি?”

হামিদ ফের কটমট করে উঠে বলল,

“তোকে কিন্তু রাস্তায় ফেলে রেখে মা’র’বো। আমার পিছনে লাগা ছেড়ে দে।”

আরমান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“ক্ষমতা থাকলে পিছু ছাড়িয়ে দেখা। যদি তাওসিফ আরমান কে আটকাতে পারিস তবে বুঝবো তুই এক বাপের ছেলে। যাই হোক, তোর জন্য আরোও চমক আছে। কাল সকাল অব্দি অপেক্ষা কর আর বাড়ির সিকিউরিটি বাড়া। বলা যায় না শেষে দেখা গেল আমজনতার হাতে মা’রা পরলি।”

কথাটা বলা আরমান কলটা কেটে দিল। আর কিছু বলার কিংবা শোনার ইচ্ছে হলো না। আরমান বলার থেকে বেশি করাতে বিশ্বাস করে।

আরমানের এসব ভাবনার মাঝে আবার ওর ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকাতেই একটা অপরিচিত নাম্বার দেখলো এবং নাম্বারটা যে এদেশের না সেটাও বুঝলো।

তবে যেহেতু নাম্বারটা পরিচিত না তাই খুব বেশিক্ষণ আর ভাবনা চিন্তা করে সময় নষ্ট করল না। কলটা রিসিভ করে কানে ধরে সালাম দিতেই অপর পাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর পর এই কন্ঠটা আবারও শুনলো আরমান। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“হিয়া! কি খবর তোর? কোথায় ছিলি এত বছর? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে তোর কন্ঠ শুনছি আবার।”

ফোনের অপর পাশে থাকা হিয়া আলতো হেসে বলল,

“এতগুলো বছর পরও তুই যে আমায় চিনতে পেরেছিস এটা ভেবেই তো আমি অবাক হচ্ছি, সেই সাথে আবার ভালোও লাগছে। আজ সত্যি মনে হলো আরমান তোর জীবনে আমার গুরুত্ব ছিল, তবে আমি নষ্ট করেছি সেটা। একটা সুন্দর সম্পর্ক শেষ করে ফেলেছি আমি তাই না?”

“বাদ দে এসব কথা এখন। তা কি করছিস এখন? পরিবারের সদস্য কি বেড়েছে?”

হিয়া একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল

“একজন বেড়েছে, তবে খুব শীঘ্রই আরেকজন বাড়বে। তোকে তো বলে এসেছিলাম সেদিনই আবার তোর সাথে যোগাযোগ করবো যেদিন পুরনো সবকিছু ভুলতে পারবো। দুই বছর হলো বিয়ে করেছি। তারপরেও যেন কোথায় একটু আটকে ছিলাম। তবে যেদিন থেকে বাচ্চার খবর পেয়েছি সেদিন থেকে মনে হয়েছে, এবারে জীবনে সত্যি এগোনো দরকার। এবারে তোকে সম্পূর্ণভাবে মন থেকে বের করে দেওয়া দরকার। আর তার জন্য তোর সাথে কথা বলাটা দরকার ছিল, তাই কল করেছি।”

আরমান ফের অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“এতগুলো দিন তুই আমাকে ধরে বসেছিলি? আমি তোর জীবনের নয়টা বছর নষ্ট করলাম? কেন কল করতে গেলি? অযথা আমার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে এখন।”

“থাক সেসব কথা। তোর বউ কেমন আছে? ছেলে মেয়ে কজন আছে সংসারে?”

বিজ্ঞাপন

“একটা ছেলে আছে, আমান। আর আমি থাকতে আমার বউ খারাপ থাকতে পারে নাকি।”

“তাও ঠিক। যার জীবনসঙ্গী তুই সে কি করে খারাপ থাকতে পারে। যাইহোক, তিন মাস পর দেশে ফিরব আমি। আমার বাড়িতে দাওয়াত রইলো তোর। তোর স্ত্রীর সন্তানসহ আসিস, ভালো লাগবে আমার। আর এখন রাখি। বেশি কথা বলতে চাই না তোর সাথে।”

আরমানের মনে হলো ওরও আর কথা বাড়ানো উচিত হবে না।

“ঠিক আছে, আগে তুই দেশে আয় তারপর দেখা যাবে সেসব। ভালো থাকিস, নিজের খেয়াল রাখিস।”

ফোনটা রেখে আরমান বিছানায় গা এলিয়ে দিল। হঠাৎ করেই বুক চিড়ে কেমন যেন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। হয়তো পুরনো সেই সুন্দর বন্ধুত্বটা হারিয়ে ফেলার জন্য।

__________

“তাশরীফের বিয়ে ভাবি, আপনি আসবেন না? তাহি থাকবে না ওর চাচ্চুর বিয়েতে?”

ফোনের অপর পাশে থাকা হিমি মলিন কণ্ঠে বলল,

“যার সূত্র ধরে তোমাদের সাথে আমার সম্পর্কটা তৈরি হয়েছে তার সাথেই তো আর সম্পর্ক নেই। তাহি তোমাদের র’ক্ত, তবে ও যে আর যেতে চায় না ওখানে।”

“আপনি নাহয় আপনার ভাইয়ের বিয়ের জন্য আসুন। আমরা কি আপনার কেউ না ভাবি? আপনি তো সব সময় আমাদেরকে আপনার ছোট ভাইয়ের মতন দেখেছেন, আমরাও আপনাকে বড় বোনের মতন সম্মান করেছি সেসব সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল?”

“সেসব কথা এখন থাক। দেশ থেকে দূরে আছি জন্য কি তাই বলে অনুষ্ঠানটা ফোনেও দেখতে পাবো না? ভিডিও কলে দেখাও আমায় সবকিছু।”

আরমান বুঝল হিমি আর এই নিয়ে কথা বাড়াতে চাইছে না, সেজন্য অন্য প্রসঙ্গ তুলল। আরমানও তাই আর কথা বাড়াতে চাইল না। ভিডিও কলে হিমি কে সবটা দেখালো।

হঠাৎ করে কোত্থেকে যেন তাওকীর এসে উপস্থিত হলো। একটু ব্যস্ত ভঙ্গিতে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওদিকে ডেকোরেটরের লোকজন ডাকছে, গিয়ে দেখতো কি বলছে। আমি বুঝতে পারছি না ওদের কথা।”

কথাটা বলেই তাওকীর আবার ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে গেল সেখান থেকে। ব্যাক ক্যামেরা অন থাকায় তাওকীরের মুখটা দেখতে পেয়েছে হিমি। তাওকীর সেখান থেকে চলে যেতেই উদ্বিগ্ন গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তাওকীরের এ কি হাল হয়েছে তাওসিফ? ও চুল, দাঁড়ি কাটতে পারেনা? আর ওর জামা কাপড় এমন লাগলো কেন দেখতে? আয়রন করেনি?”

আরমান মলিন হেসে বলল,

“সবই পাপের শাস্তি ভাবি। আপনি আমি আফসোস করে কি করবো।”

আরমানের কথাটা শুনে থেমে গেল হিমি। আর কোনো কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। ফোনটা রেখে দিলো। আরমানও ব্যস্ত হয়ে গেল বিয়ে বাড়ির কাজে।

________

“এই এমপির বাচ্চা এমপি, এখানে এনেছেন কেন আমায়? আমি আপনার চাকর নাকি যে আপনি যখন যেখানে আমায় টেনে নিয়ে যাবেন আমি সেখানেই যাব? আর এভাবে টানছেন কেন? ওর সমস্যা হবে।”

আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“সব ঠিক ছিল, কিন্তু কার সমস্যা হবে?”

আরজু কোন উত্তর দিলো না। চুপচাপ মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে রইলো। আরমানও উত্তর এর আশা ছেড়ে দিল। আবারো আরজুর হাত ধরে হাঁটা শুরু করলো। কিছুক্ষণ হাঁটার পর আরজু ফের বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কোথায় যাচ্ছি আমরা? বাড়িতে আমান একা আছে।”

“অনেক মানুষ আছে আমান কে দেখার জন্য। আপনাকে ভাবতে হবে না।”

আরজু কথা বাড়ালো না। কিছুটা সময় হাঁটার পর আরজুরা এসে পৌঁছালে নদীর পাড়ে সেই বিশাল গাছটার নিচে। প্রথমবার এসেই আরজুর এই জায়গাটা খুব পছন্দ হয়েছিল। আরমান কে বলেও ছিল এখানে একটা দোলনা থাকলে আরো বেশি ভালো লাগতো। পরেরবার যখন গ্রামে এসেছিল তখনই আরমান এখানে একটা দোলনার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। আজও সেখানেই এসেছে আরজু কে নিয়ে।

আরজুকে দোলনায় বসিয়ে আরমান ওর পিছনে দাঁড়ালো। বেশ কিছুটা সময় আরমান পিছনে দাঁড়িয়ে দোল দিলো। আরজু একটুও বাধা দিলোনা।

মাথায় থাকা ওড়নাটা নামিয়ে নিল। অমনি খোলা চুল গুলো হাওয়ায় উড়তে থাকলো। প্রকৃতির শীতলতায় আরজুর মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। মুহূর্তের মাঝে মন মেজাজ ফুরফুরে হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ পর নিজেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনিও বসুন।”

আরমানও দ্বিমত পোষণ করলো না। আরজু একটু সরে বসতেই আরমান গিয়ে ওর পাশে বসলো। আরজু আরমানের কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বসলো। আরমান আরজুর হাতটা নিজের হাতের মুঠো নিয়ে বলল,

“আমি আপনার সাথে খুব অন্যায় করি তাই না আরু? আজকাল আমার পাগলীটাকে একটুও সময় দিতে পারি না।”

আরজু অভিমানি গলায় বলল,

“সারাদিন কেউ আর এখন আমায় পাগলী বলে ডাকে না। আমার একটুও ভালো লাগে না।”

“আমি চেয়েও সময় দিতে পারিনা আরু। তার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমার, আপনার আর আমাদের ছেলে কে নিয়ে কত সুন্দর একটা পরিবার আমাদের। তারপরেও আমি সময় দিতে পারিনা আপনাদের।”

আরজু মাথা তুলে বসে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তিনজন না, আরেকটা আছে।”

আরমান বুঝলো না আরজুর কথার মানে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“মানে?”

আরজু নিজের পেটের দিকে ইশারায় দেখিয়ে বলল,

“এখানে আরেকটা আছে। সবমিলিয়ে আমরা চারজন।”

আরমান চোখ বড় বড় করে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“মানে আপনি প্রেগন্যান্ট?”

আরজু ওপর নিচে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ। আমার পেটের ভেতরে আরেকজন আছে।”

কথাটা বলে আলতো হাসলো। আরমান বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আমায় বলেননি কেন আপনি? এত সুন্দর একটা খবর কেউ লুকিয়ে রাখে?”

“আপনাকে তো পাচ্ছিলামই না। দুদিন আগেই আমি জানতে পেরেছি।”

আরমান হা করে আরজুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কি করবে এই পাগলীটা কে নিয়ে বুঝে উঠতে পারেনা। অবশ্য আরমানের পাগলী তো এমনই।

দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আরজু কে। আরজুর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,

“আপনি যে আমায় কত মূল্যবান কিছু উপহার দিয়েছেন আরু ভাবতেও পারবেন না। আপনি আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। তারপরে পেলাম আমাদের ছেলেকে। আর এবারে আরো একটা উপহার। আপনার এত ঋণ শোধ করি কি করে আরু বলুন তো?”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“আপনিও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আমায় সব দিয়েছেন আপনি। কিচ্ছু ছিলো না আমার জীবনে আরমান, কেউ ছিলো না। সুখ, স্বাচ্ছ্যন্দ কিচ্ছু ছিলো না। আর আজ দেখুন আমার সব আছে। আমি অভিমান করতে পারি, আবদার করতে পারি আবার কোনো কারণ ছাড়া রাগও করতে পারি, তবুও আপনি সবসময় আমায় শুধু ভালোই বেসেছেন।”

“আমার ভালোবাসা আপনাকে পরিপূর্ণ করেছে, আর আপনার ভালোবাসা বানিয়েছে আমায় পাগল। সারা পৃথিবীর সামনে আমি চিৎকার করে বলতে চাই, আমার আরুর ভালোবাসায় উন্মাদ হয়েছি আমি। ভালোবাসি আরু। আমার পাগলী কে আমি খুব ভালোবাসি।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প