তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৫৬

🟢

প্রার্থনাদের ঢাকায় আসার প্রায় এক মাসেরও বেশি হতে চলল। অথচ একটা মাসে একবারের জন্যও প্রার্থনা সাহিত্যর সাথে দেখা করতে চায়নি। সাহিত্যও বিশেষ কোন জোর করেনি আরমানকে, কেননা সাহিত্যের মাঝেও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে।

বারবার ভাবছে ওর জন্যই প্রার্থনা এত কষ্ট পেয়েছে। এতগুলো দিন শুধু মানসিক না, শারীরিকভাবেও অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। না জানি প্রার্থনার কত কষ্ট হয়েছে, কত কেঁদেছে, কত মনে করেছে সাহিত্যের কথা, তবে সাহিত্য তখন ছিল না। সাহিত্য তো বেশ ভালোই ছিল। নিজের জীবন তো বেশ ভালোভাবেই কাটাচ্ছিল।

এমনটা না যে প্রার্থনা কে ভুলে গিয়েছিল। মনে তো পড়তো, রোজ মনে পড়তো। কাজের ফাঁকে কিংবা ব্যস্ততার মাঝে কোন না কোন ভাবে ঠিক প্রার্থনার কথা মনে হয়েই যেত। তবে সাহিত্যর আর প্রার্থনার সাথে দেখা করতে চাওয়ার ঠিক সাহস হয়ে ওঠেনি। আর প্রার্থনার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মুখ ফুটে বলতে পারেনি।

প্রথম কয়েকদিন আরজু বলেছিল ওকে সাহিত্যর সাথে দেখা করার কথা, আরমানও অনেক বুঝিয়েছে, তবে প্রার্থনা রাজি হয়নি জন্য এক পর্যায়ে গিয়ে ওরাও থেমে গেছে।

আজ ছুটির দিন হওয়ায় আরমান ওদেরকে নিয়ে একটু ঘুরতে বেরিয়েছে। এই গোটা একটা মাসের বেশি সময় ওরা ঘর বন্দি হয়ে ছিল। আরমান তাই ভাবলো আজ একটু শহরটা ঘুরিয়ে দেখানো যাক। বেরিয়েছিল দুপুরের পরপর। দুপুরে খাওয়া-দাওয়াটা বাইরেই করেছে।

খাওয়া-দাওয়া শেষে শহর থেকে বেশ অনেকটা দূরে একটা খোলা জায়গা পেল। জায়গাটা বেশ খোলামেলা। বসার জন্য বেশ অনেকগুলো বেঞ্চও আছে, খাবারের ছোট ছোট স্টলও আছে। কিছুক্ষণ আগে সবাই হেঁটে আশেপাশটা ঘুরে দেখল। হাঁটতে হাঁটতে সবাই যখন হাঁপিয়ে পড়লো তখন একটা বেঞ্চে বসে পড়লো।

আরমান ফারিহা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি খাবে আম্মু?”

এই কয় মাসে আরমানের সাথে ফারিহার সম্পর্কের বেশ উন্নতি হয়েছে। ফারিহাও যেমন মিশুক স্বভাবের, আরমানও ঠিক তেমনি। তাই দুজনের বেশ ভালোই ভাব জমেছে। তাই ফারিহা আরমান এর কাছে আবদার করতে একটুও সংকোচ হলো না।

“আইসক্রিম খাবো।”

“ঠিক আছে, চলো। আমরা আইসক্রিম নিয়ে আসি।”

ফারিহা উঠে দাঁড়ালো যাওয়ার জন্য। আরমান এবার আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরু আপনিও চলুন। আপা আপনি বসুন, হাঁপিয়ে গেছেন।”

আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“আপা থাকবে কেন? আপাও যাবে।”

আরমান জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“না আরু আপার যাওয়া হবে না। আমি আপনার হাত ধরে নিয়ে যাব, আপা থাকলে আপাও লজ্জা পাবে, আপনিও লজ্জা পাবেন, আমারও অস্বস্তি হবে। চলুন আমরা তিনজনেই যাই।”

“কিন্তু আপা এখানে একা বসে কি করবে? আপার অস্বস্তি হবে।”

“আরে হবে না অস্বস্তি রে বাবা। আমরা এক্ষুনি চলে আসবো, চলুন তো। আপনি অতিরিক্ত কথা বলেন।”

আরমান আর আরজুর মতামতের অপেক্ষা করল না। আরজুর হাতটা ধরে দাঁড় করালো। দুই হাতে দুজনের হাত ধরে নিয়ে চলে গেল। প্রার্থনা কিছু বলল না।

এমনিতেও ওর যাওয়ার ইচ্ছে নেই। ঘুরতেই তো বেরিয়েছে নিজেকে জোর করে। প্রার্থনার আসার কোন ইচ্ছে ছিল না। তবে আরজু কষ্ট পাবে জন্য এসেছে।

হঠাৎ করে প্রার্থনার মনে হলো ওর পাশে কেউ একটা এসে বসেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল এক ভদ্রলোক বসে আছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনা চোখ ঘুরিয়ে নিল। কেমন যেন একটু অস্বস্তি হলো। ভাবলো এখানে আর বসবেই না। সেইসাথে পাশে বসা লোকটার ওপরও বিরক্ত হলো। দেখছে যে একটা মেয়ে বসে আছে, কি করে অনুমতি না নিয়ে সোজা তার পাশে বসে গেল। ভদ্রতা নেই এসব ছেলেদের।

প্রার্থনা উঠে চলে যেতে ধরলো। তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে ওর কানে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, যে কন্ঠে একরাশ কাতরতা মিশিয়ে প্রার্থনা কে ডাকছে,

“প্রার্থনা!”

তৎক্ষণাৎ থেমে গেল প্রার্থনা। পিছন ফিরে তাকানোর সাহস হচ্ছে না। এই কন্ঠটা প্রার্থনা চেনে, সাহিত্যর কণ্ঠ। তবে সাহিত্য এখানে এলো কোত্থেকে। প্রার্থনার এসব ভাবনার মাঝে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বরটা আবার ভেসে এলো প্রার্থনার কানে,

“আমার কন্ঠ তুমি চিনতে পারলে না প্রার্থনা?”

এবারে তো আর কোন সন্দেহ রইল না। এটাতো সাহিত্যরই কন্ঠ। খুব ভয়ে ভয়ে প্রার্থনা পিছন ফিরে তাকালো। দেখলো বেঞ্চে ওর পাশে এসে যে ভদ্রলোক বসেছিল সেই কেমন কাতর দৃষ্টিতে প্রার্থনার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রার্থনা খুব মনোযোগ দিয়ে মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তীক্ষ্ম চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার পর প্রার্থনা বুঝতে পারলো এটাই তো সাহিত্য, তবে চেহারায় এসেছে বিস্তর পার্থক্য।

পরনে সাহিত্যর ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি, চোখে একটা মোটা ফ্রেমের চশমা, চুলগুলো বড় হয়েছে, পুরো মুখ জুড়ে দাড়ি আর গোঁফে ভরে গেছে।

অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে প্রার্থনার দুগাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। বেঞ্চে বসা সাহিত্য উঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনার দিকে দু কদম এগিয়ে এসে কাতর দৃষ্টিতে প্রার্থনার দিকে তাকিয়ে বলল,

“সারা জীবন কি আমরা এভাবে একে অপরকে বারবার ছেড়েই চলে যাব শুধু প্রার্থনা? জীবনের এমন একটা মোড়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যে দুজন দুজনকে দেখতে পারছি, তবুও রাস্তাটা পার হয়ে একে অপরের কাছে যেতে পারছিনা, এতই বাধা আমাদের মাঝে। এই দ্বিধাদ্বন্দ, সংকোচ, অপরাধবোধ গুলো কবে কাটিয়ে উঠে আমরা একে অপরের দেখা পাব প্রার্থনা? অনেক তো হলো, এবারে না হয় পুরনো সব ভুলে যাই।”

অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রার্থনা ডুকড়ে কেঁদে উঠলো। ওদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরমানরা। প্রার্থনা কে কেঁদে উঠতে দেখে আরজু উদ্বিগ্ন গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপা কাঁদছে কেন? উনি নিশ্চয় খারাপ কিছু বলেছেন।”

আরমান একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ে বলল,

“আরে পাগলী, এতদিন পর দেখা হলো তাই সুখে কাঁদছে।”

আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“সুখে আবার কেউ কাঁদে নাকি? মানুষের জীবনে কান্নার কারণের এর এতই অভাব পড়েছে যে সুখে কাঁদবে? আমি তো দুঃখে কেঁদেই কুল পাই না।”

“অবশ্যই কাঁদে। আমি আমার পাগলী কে পাওয়ার পর খুশিতে কেঁদে ছিলাম তো।”

আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“ওহ্।”

এদিকে প্রার্থনা কে হঠাৎ করে কেঁদে উঠতে দেখে সাহিত্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কাঁদছো কেন? আমি আর তোমাকে কাঁদানোর জন্য আসিনি প্রার্থনা। আমি জানি আমি তোমাকে অনেক কাঁদিয়েছি, তবে আর কাঁদাবো না।”

প্রার্থনা ক্রন্দনরত গলাতেই বলল,

“তুমি চলে যাও সাহিত্য। আমি আর আগের মতন নেই। আমার শরীরের নোংরা স্পর্শ লেগেছে, আমি অনেক বড় পাপ করেছি সাহিত্য, অনেক বড় পাপী আমি। তুমি অযথা আমার সঙ্গে নিজের জীবনটা জড়িও না। আমি তোমার জীবনটা সহ ধ্বংস করে দেবো।”

সাহিত্যকে একটু বিচলিত হতে দেখা গেল না। বরং মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে প্রার্থনার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে প্রার্থনার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে বলল,

“তুমি যদি হও ধ্বংসের সুর তবে সেই সুরে আমি নিজেকে ধ্বংস করতে রাজি আছি। তবুও আমার লেখা প্রতিটা ছন্দে আমি তোমাকেই চাই। জানো, কত কবিতা জমিয়ে রেখেছি তোমাকে শোনাবো বলে? একটা গোটা উপন্যাস অসমাপ্ত পড়ে আছে শুধু তোমার অপেক্ষায়। এবারে পূর্ণতা দাও তাদের। এবারে পূর্ণতা দাও আমার অসমাপ্ত বইটাকে, এবারে পূর্ণতা দাও আমাদের ভালোবাসাকে প্রার্থনা। এই বিরহ যে আর সয় না।”

________

আরজুর হসপিটালে রিসিপশনিস্টের চাকরিটা চলে গেছে। সত্যি কথা বলতে ভুলটা ছিল আরজুরই। ছুটি না নিয়েই চলে গিয়েছিল বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি তে। ফেরার পরেও একবার কাজে যাওয়ার কথা মনেই ছিল না। তবে এই ব্যাপারে আরজুর কোন আফসোসও নেই।

সব সময় যে শুধু পেতেই হবে তেমনটা না। মাঝে মাঝে কিছু হারাতেও হয়। আর ভালো জিনিস পেতে গেলে কিছু না কিছু ত্যাগ তো করতে হবেই। আরমানকে পেয়ে গেল, সংসারে কিছু সুন্দর দিন উপহার পেয়ে গেল। এতকিছুর বদলে নাহয় চাকরিটা চলে গেলো, সেটা ব্যাপার না।

তবে এই চাকরিটা চলে গেছে তো কি হয়েছে। আরজু বাড়িতে বসে থাকার মেয়ে না। শ্বশুরবাড়ি বড়লোক তো কি হয়েছে, আরজু ওদের টাকার উপরে নির্ভর করে থাকতে পারেনা। এখন ওর সাথে ওর আপাও থাকে, খরচ চালাতে হবে তো। ফারিহার খরচ যদিও এখন ফিরোজ পাঠায়, তবে আরজু ঠিক করেছে ও যখন একটু বেশি টাকা উপার্জন করা শুরু করবে তখন ফিরোজের থেকে আর ফারিহার খরচও নেবে না। ওর উপার্জন করা হারামের টাকা এই বাড়িতে ঢোকাবেই না।

আপাতত আরজু চাকরি খুঁজছে, তবে টিউশনি এখনো কয়েকটা আছে আর কয়েকটা হারিয়েছে।

তবে খুশির খবর হলো একটা নতুন টিউশন পেয়েছে আরজু। অন্য জায়গার থেকে এই জায়গাটাতে বেতনও বেশি দেবে বলেছে।

আজ প্রথম দিন সেখানে পড়াতে এসেছিল। এর আগেও আসা হয়েছে আরজুর এখানে। আগেও বেশ কয়েকটা টিউশন ছিল এখানে। প্রথম যখন ঢাকায় আসে তখন এখানকারই একটা মেসে উঠেছিল।

সময় তখন রাত আটটার কাছাকাছি। আরজু জানে আরমান এখনও বাড়ি ফেরেনি। তাই ভাবলো ওকে একটা কল করা যাক, একসঙ্গে বাড়ি ফেরা যাবে।

যেই ভাবনা সেই কাজ। টিউশন থেকে বেরিয়ে আরমানের নাম্বারে কল করলো। রিং হয়ে গেল তবে আরমান ফোনটা রিসিভ করল না। আরজু ভাবলো এখন আর কল না দেওয়াই ভালো। হয়তো বা ব্যস্ত আছে, একটু পরে দেয়া যাবে।

আরজু আর গাড়িতে উঠল না। আরজু জানে না আরমান কোথায় আছে। তাই ভাবলো, আপাতত একটু হাঁটা যাক। কিছুক্ষণ পর আবার আরমান কে কল করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

সেই সব ভেবেই আরজু হাঁটা ধরলো। হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা পথ চলে এলো। কতক্ষণ ধরে যে হাঁটছে, কতটা পথ যে চলে এলো সেই হিসেবে আরজুর নেই। তার কারণ আরজু তখন গভীর ভাবনায় নিমগ্ন। আর ভাবনার বিষয় হচ্ছে প্রার্থনার ভবিষ্যৎ।

আরজু একটা কথা কোনমতেই বুঝতে পারছে না, কেন প্রার্থনা বারবার নিজেকে পাপী বলছে। কেন বলেছ ও খুব বড় পাপ করে ফেলেছে। তার থেকেও বড় কথা, কেন সাহিত্যকে বিয়ে করতে রাজি হতে পারছে না। এমনটা তো নয় যে প্রার্থনা এখন আর সাহিত্যকে ভালোবাসে না। ভালো তো ঠিকই বাসে, তবে বিয়ে কেন করবে না।

আবার আরেকটা চিন্তা মাথায় ঘুরছে, যদি প্রার্থনা বিয়ে করতে রাজি হয় তবে কি সুখী হতে পারবে। ওই লোকটা এখন নিজেকে যেমন ভালো মানুষ দেখাচ্ছে, বিয়ের পরেও কি তেমন ভালো মানুষই থাকবে, নাকি তখন বদলে যাবে।

এসবের মাঝে আবার ফিরোজের ভাবনাও মাথায় এলো। ফিরোজ দেখে গেল আরজু এত সুখে শান্তিতে সংসার করছে আরমানের সাথে, অথচ একটা বারের জন্য কোন ঝামেলা তৈরি করল না। বরং আরজুর জীবনের সুখ বাড়ানোর জন্য আরো প্রার্থনা কে দিয়ে গেল। এটা কি আদৌও সম্ভব? সত্যি কি ফিরোজ আরজুর বিয়েটা মেনে নিল? সত্যিই কি তবে ভালো মানুষ হয়ে গেছে, নাকি ভালো মানুষের নাটক করছে।

এসব ভাবনার মাঝে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে হোঁচট খেলো আরজু৷ ধ্যান ভাঙলো। কিসের সাথে হোঁচট খেল সেটা দেখার জন্য নিচের দিকে তাকাতেই দেখলো একটা ইট পড়ে আছে। মুহূর্তের মাঝে মেজাজটা গরম হয়ে গেল। রাস্তার মাঝখানে এভাবে কেউ ইট ফেলে রাখে। যে রেখে গেছে তাকে যদি দেখতে পেতো আরজু তবে ইটটা তুলে তার মাথায় মারতো নির্ঘাত।

নিজের রাগটা নিজেই কমালো আরজু। ভাবলো এখন আরেকবার আরমান কে কল করা যাক। এতটা সময় কেটে গেল অথচ আরমানের নম্বর থেকে কল এলো না। খুব বেশি ব্যস্ত কি আরমান?

ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করতে নিয়ে হঠাৎ করে রাস্তার ওপর পাশে চোখ গেল। একটা সরু গলি দিয়ে দুজন মানুষ হাসতে হাসতে আসছে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে আসছে। মেয়ের মুখটা দেখতে পেলেও ছেলের মুখটা এখনো স্পষ্ট করে অন্ধকারের মাঝে দেখতে পাচ্ছে না আরজু। তবে পাঞ্জাবিটা হালকা একটু দেখা যাচ্ছে এবং সেই পাঞ্জাবি প্রিন্ট আরজুর কাছে চেনা লাগলো। সকালে তো এমন একটা পাঞ্জাবি আরমান পরে বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে।

একটু অপেক্ষা করতেই সেই ব্যক্তিটার মুখও আরজুর কাছে স্পষ্ট হলো। কোন সন্দেহ নেই যে সেই লোকটা আরমান। মুহূর্তের মাঝে আরজুর কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। একবার ডাকতে চাইলো আরমান কে, তবে ডাকলো না। যে মেয়েটার সাথে আরমান এত হেসে হেসে কথা বলছে সেই মেয়েটাকে আরজু এর আগে দেখেনি। মেয়েটার সাজগোজ কেমন যেন অদ্ভুত। যেমন ভারি কাজ করা রঙিন জামা, তেমনি উগ্র মেকআপ। দেখতে ভালোই, অন্তত আরজুর মনে হলো ওর থেকে সুন্দর দেখতে। কথা বলার ভাবভঙ্গিও দারুন, যেন কথার দ্বারাই সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইছে।

তবে আরজুর কথা হলো আরমান এখানে কি করছে। সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তো আরজু কে বলে গিয়েছিল আগে ভার্সিটিতে যাবে, তারপর সেখান থেকে নিজেদের দোকানে যাবে। আর কোথাও যাওয়ার ছিল না। আর গেলে আরজু কে জানাতো। তবে এই জায়গাটায় কেন এসেছে আরমান? সাথের মেয়েটাই বা কে?

আরমান আর একটু হেঁটে মেয়েটার সাথে সামনের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো। এখনো আরমান মেয়েটার সাথে হাসছে আর কি সব যেন বলছে। এত দূর থেকে আরজুর পক্ষে সেগুলো শোনা সম্ভব না।

আরজু ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে আরমানের নাম্বারে কল করলো। দেখতে পেল আরমান এবারে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করল, তবে রিসিভ করল না। কলটা কেটে দিয়ে আবারো ফোনটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো। তবে আরজু থামলো না। দ্বিতীয়বারের মতন আরমানের নাম্বারে কল করলো। আরমান আবারো পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। এবারে আর কলটা কেটে দিল না। উঠে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। ফোনটা রিসিভ করে ফোনের অপর পাশে থাকা আরজু কে উদ্দেশ্য করে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“হ্যাঁ আরু বলুন।”

আরমানের এত ফুরফুরে মন মেজাজ দেখে আরজুর কপালে তৈরি হওয়া ভাঁজটা আরেকটু গাঢ় হলো। তবে বেশ স্বাভাবিক গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কোথায় আপনি?”

আরমান একটু থেমে আরজুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“আপনি কোথায়?”

“আমি তো বাড়ির পথে। আর দশ মিনিট মত লাগবে পৌঁছাতে।”

“ওহ্। আমি দোকানে আছি আরু। আপনি বাড়ি চলে যান, আমার ফিরতে একটু রাত হবে। আর আমার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, আপনি খেয়ে নিন।”

“আপনি দোকানে আছেন? তবে এতো হইচই এর আওয়াজ হচ্ছে যে? সাথে আর কেউ আছে?”

আরমান আবারও একটু থেমে উত্তরে বলল,

“হ্যাঁ, ওই দলের কিছু ছেলেরা আছে সাথে। ওদেরকে নিয়ে পাশের একটা চায়ের দোকানে এসেছি চা খাওয়াতে।”

“আর কেউ নেই সাথে?”

“না, আর কেউ নেই।”

আরজু ফের প্রশ্ন করল,

“আপনি তাহলে দোকানে আছেন?”

“হ্যাঁ, আমি দোকানে আছি।”

আরজু আর কোন প্রশ্ন করল না। রাখছি বলে ফোনটা কেটে দিল। রাস্তার ওপর পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো আরমান। আরজু খেয়াল করল ফোনটা রাখার পর আরমান সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর আবারো গিয়ে পূর্বের জায়গায় বসে পড়ল।

আরো পনেরো থেকে বিশ মিনিট আরজু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো, আর রাস্তার অপর পাশে আরমানরা সেই চায়ের দোকানে বসে থাকলো। একটু পর আরমান একটা রিক্সা দাঁড় করিয়ে মেয়েটাকে রিকশায় তুলে দিল। মেয়েটা সেখান থেকে চলে যেতেই আরমান নিজেও একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে উঠে পড়লো।

আরজুর খুব কৌতূহল হলো জানার জন্য যে ওই গলির মাঝে কি আছে, কোথায় এসেছিল আরমান যে আরজু কে মিথ্যে বলতে হলো। এই জায়গায় তো আরমানদের দোকান না। এই জায়গার কাছাকাছিও না, বরং সম্পূর্ণ বিপরীত রাস্তা।

গাড়ি-ঘোড়ার ভিড় কাটিয়ে আরজু রাস্তা পার হয়ে সেই অন্ধকার সরু গলির ভেতরে এলো। রাস্তাটা বেশ অন্ধকার, তবে আরজুর একটুও ভয় করলো না। রাতের বেলা একা একা এমন অন্ধকার রাস্তায় হাঁটার অভ্যাস আছে আরজুর।

বেশ কিছুটা হাঁটার পর খেয়াল করলো পরের রাস্তাটা বেশ আলোকিত। জায়গাটা সাজানো ছোট ছোট রঙিন লাইট দিয়ে। আরেকটু এগোতেই মানুষজনের দেখাও পেল।

এই প্রথম মানুষজনের দেখা পেল। এতটুকু রাস্তা যে হেঁটে এলো একটা মানুষের দেখাও পায়নি। আর এখন ছেলে মেয়ে উভয় কে দেখতে পেল, তাও আবার সবাই জোড়া জোড়া। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো মেয়েদের পোশাকগুলো কেমন যেন। যে মেয়েটা আরমানের সাথে ছিল একদম সেই মেয়ের মতন।

আরজুর যেন বুঝতে অসুবিধা হলো না যে জায়গাটা ঠিক কেমন। আর এখানে এমন জোড়ায় জোড়ায় সবাই কি করছে কিংবা কি তাদের উদ্দেশ্য সেসব বুঝলো।

আরজুর কেন যেন আর ভিতরের দিকে পা বাড়ানোর সাহস হলো না। কেউ আরজু কে তেমন একটা খেয়ালও করলো না। যারা খেয়াল করলো খুব একটা বেশি পাত্তা দিল না। আরজু তাড়াহুড়ো করে গলিটা থেকে বেরিয়ে এলো।

মেইন রোডে পা রাখতেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ভয় পায়নি মুখে বলছে ঠিকই, তবে ভিতরে ভিতরে ভয় পেয়েছিল। আত্মাটা শুকিয়ে এসেছিল।

তবে প্রশ্ন এখন একটাই, আরমান এই জায়গাটায় কি করছিল? মেয়েটাই বা কে? এত হেসে হেসে কথা বলছিল কেন? আরজু কে মিথ্যেই বা বলল কেন?

_________

“হ্যালো কাকা!”

“হ্যাঁ বল। কোথায় তুই? বউকে পেয়ে তো কাকাকে ভুলেই গেছিস। বাড়িতে আসিস না কেন?”

ফোনের অপর পাশ থেকে আরমানের কানে বেশ কিছু অপরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কার কন্ঠ শোনা যাচ্ছে?”

“আরে তোর কাকির বোন এসেছে তার পরিবারকে নিয়ে এই প্রথমবারের মতন। ওনাদেরই কণ্ঠস্বর।”

“ওহ্। তাহলে আর বাড়ি যাব না আজ। তোমার সাথে একটু কথা ছিল, কাল একবার বাইরে দেখা করো তো।”

“আরে তুই বাড়িতে আয় না। কি হয়েছে ওনারা আছেন তো।”

মহিন হোসেনের প্রস্তাবটা আরমান নাকচ করে দিয়ে বলল,

“না, আজ আর যাব না। তুমি কাল দেখা করো। এখন বাড়ি ফিরব।”

“এত রাতে তুই বাইরে কি করছিস?”

“একটু কাজ ছিল, সেই নিয়েই তোমার সাথে কথা আছে। কাল দেখা করো। এখন ফোন রাখি। বাড়িতে বউ আমার অপেক্ষা করছে।”

মহিন হোসেন একটু নড়েচড়ে উঠে গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলেন,

“এই কথাগুলো আমার সাথে না বললেই খুশি হব।”

আরমান বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“বউ অপেক্ষা করছে তো সেটাও বলা যাবে না? তোমার বউ অপেক্ষা করে না তোমার জন্য?”

মহিন হোসেন বুঝলেন এই ছেলের সাথে এখন কথা বাড়ালে ওনার মানসম্মান নিয়েই টানাটানি লেগে যাবে। তাই চুপচাপ নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য কলটা কেটে দিলেন। আরমান হাসলো মহিন হোসেনের এমন আচরণে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত এগারোটা বাজছে।

এদিকে বাড়ি ফেরার কথা মনে হলেও আরমানের চিন্তা হচ্ছে। তখন তো বলে দিল আরজুকে মিথ্যে। ফোনে কথা বলেছিলো জন্য না হয় আরজু ওর মুখটা দেখে ধরতে পারেনি যে সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে বলছে। কিন্তু এখন বাড়ি ফেরার পর যদি আরমান মিথ্যে বলতে ধরে তাহলে তো ধরা খেয়ে যাবে। আর যদি একবার ধরা পড়ে যায় তবে তো আরজুর মনে সন্দেহ তৈরি হবে। আর আরজুর মনে সন্দেহ তৈরি হওয়া মানে সাংঘাতিক ব্যাপার। যদি আরমানকে আর ক্ষমা করতে না পারে!

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প