আজ ছিল আরজুদের বৌভাতের অনুষ্ঠান। সারাদিন প্রচন্ড ব্যস্ততার মাঝে কেটেছে। ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন রাত এগারোটার কাছাকাছি। যারা আশপাশ থেকে এসেছিল তারা আবার খাওয়া-দাওয়া শেষে নিজেদের বাড়ি ফিরে গেছে। আর যারা একটু দূর থেকে এসেছিল তাদের থাকার ব্যবস্থা এখানেই করা হয়েছে। আপাতত খাওয়া দাওয়া করে যে যার ঘরে ঘুমোতে গেছে। যদিও এখনো অনেকে জেগে আছে। কেননা এখনো আরজুর কানে নিচ থেকে হইচই এর আওয়াজ আসছে।
আপাতত ফুল দিয়ে সজ্জিত বিছানার উপর চুপচাপ বসে আছে আরজু। আজ ফুলশয্যার ঘর সাজানো হয়েছে ওদের জন্য। ঘরটা সাজিয়েছে তনুশ্রী, তাশরীফ আর তানভীর মিলে। ওদেরকে ইরা আর মৃনয়ীও একটু সাহায্য করেছিল।
সকাল থেকে আরমানের সাথে তেমন একটা কথা বলার সুযোগই পায়নি আরজু। সেই যে সকালে পার্লার থেকে আরজু কে সাজাতে এসেছিল, ছেড়েছে একদম দুপুরে। সাজগোজ শেষে তারপরে তো অনুষ্ঠান শুরু হলো। নিচে নিয়ে যাওয়ার পর দুজন কে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে সবাই দেখল। সেসব শেষ হতে হতে এখন রাত হয়ে গেছে।
খুব বেশিক্ষণ না, এই বিশ মিনিট মতন হবে আরজু একা একা বসে আছে। একটু আগে ওকে ঘরে রেখে গেছে তনুশ্রী। তবে এতোটুকু সময়ও আরজুর একা একা থাকতে ভালো লাগছে না। তনুশ্রী বলে গেছে এভাবেই ঘোমটা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে। আরজু বাধ্য মেয়ের মতন চুপচাপ বসে আছে।
আরজু মাঝে মাঝে নিজেই নিজের এমন আচরণে অবাক হয়। আরজু ভেবে পায় না ও কবে এত বাধ্য মেয়ে হয়ে গেল। আগে তো আরজুর এমন স্বভাব ছিল না। অন্য কেউ যদি কোন কিছু আরজু কে করতে বাধ্য করতো তাহলে সেটা কখনোই করত না, বরং যেটা করতে মানা করতো আরজু সেটাই বেশি করে করতো। কেননা আরজু কারো কথা শোনার মেয়ে না। ও ওর নিজের জীবন নিজের মতন করে কাটাবে। তবে বিয়েটা হওয়ার পর থেকে কেন যেন অনেকের কথা শোনে।
আরো কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আরজু দরজার বাইরে থেকে হালকা চেঁচামেচির আওয়াজ পেল। কন্ঠগুলো সবই ওর পরিচিত। তানভীর, তনুশ্রী, ইরা এছাড়া আরো কিছু পরিচিত কন্ঠ পেল। সেই সাথে কন্ঠ পেল আরমানেরও।
আরজু বুঝতে পারলো না এত চেঁচামেচির কারণ কি। কেন সবাই ওর ঘরের দরজার সামনে এভাবে চেঁচামেচি করছে। আর আরমান যেহেতু এসে গেছে তবে ভিতর আসছে না কেন। সবগুলোকে সামনে থেকে সরিয়ে দিলেই তো হয়। এত রাত হয়েছে নিজেদের ঘরে গিয়ে ঘুমোতে পারে না সবাই নাকি ওকে বিরক্ত করতেই হবে।
কিছুটা সময় পর ধীরে ধীরে পরিবেশ শান্ত হয়ে গেল। পরিবেশ শান্ত হওয়ার পরে আরমান ভেতরে এলো।
আরমান দরজাটা বন্ধ করে এসে বিছানার উপর আরজুর সামনা সামনি বসলো। একটু গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,
“ঘোমটা তুলবো আরু?”
যেহেতু সামনে বসা মানুষটা আরজু তাই আরমান কোন ধরনের কোন ঝুঁকি নিতে চায় না, সেটা হোক সামান্য ঘোমটা তোলার বিষয়। এটাও আরজুর অনুমতি নিয়ে করাই ভালো। তবে মাঝে মাঝে আরমানের কিছু ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয়, ঠিক যেমন এখন এই ভাবনাটা ভুল প্রমাণিত হলো।
আরজু বিরক্ত হয়ে নিজেই নিজের ঘোমটা তুলে বলল,
“এই সামান্য একটা বিষয়ে এমন করার কি আছে? তুললেই হয় একজন।”
আরমান থমকে গেল আরজুর কথা শুনে। অসহায় মুখ করে বলল,
“ঘোমটা তুললেন কেন আরু? আমার তোলার কথা ছিল তো।”
আরজু রাগী গলায় বলল,
“আরো মিনমিন করুন, আরো অনুমতি চান। তবে তোলার সুযোগ পাবেন কি করে? আমার এসব পছন্দ না। যা করার সরাসরি করবেন।”
“সেটা করলেও সমস্যা হয়ে যাবে। এখন আমি চুমু খাই সরাসরি তাহলে তো তেঁতে উঠবেন।”
আরজু কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“সেটা আমার মনের উপর নির্ভর করে। আমি কি সবসময় খারাপ ব্যবহার করি আপনার সাথে? কম চুমুতো খাননি আমায়।”
আরমান আপাতত হিসাব নিকাশে গেল না যে সে কতগুলো চুমু খেয়েছে, আর আরজু কতবার ওকে বাঁধা দিয়েছে। আরজুর তুলে রাখা ঘোমটাটা আবারোও ফেলে দিল। আরজু বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে নিলে আরমান ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“একদম চুপ। আমি তুলবো ঘোমটা। তারপর আমি মন ভরে দেখবো।”
কি মনে করে যেন আরজু চুপ করে গেল। ঘোমটাটা তুলে কিছুক্ষণ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকলো আরমান আরজুর দিকে। দীর্ঘ একটা সময় ধরে আরমান এমন হা করে তাকিয়ে থাকলো আরজুর দিকে। একপর্যায়ে গিয়ে আরজু নিজেই ধৈর্য হারিয়ে বলল,
“প্রতিদিনই তো দেখেন আমায়। সেই একমুখ আবার এতক্ষণ ধরে দেখার কি আছে?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“আমার ঘর আলোকিত করার জন্য আর চাঁদের আলোর দরকার নেই। আমার ঘরে সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য ফুলের দরকার নেই। চাঁদের আলো কিংবা ফুলের গন্ধ সবকিছু কে হার মানাতে পারে আমার আরু। আমার জীবন আলেকিত করার হোক কিংবা সুবাস ছড়ানোর হোক সবটা আমার আরুই করতে পারে।”
আরজু বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“এত সুন্দর আমি?”
আরমান আবারো আলতো হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“হ্যাঁ আরু, আপনি এতটাই সুন্দর। আপনি ততটা সুন্দর যতটা বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই।”
আরজু নিজেও পাল্টা আলতো হেসে বলল,
“আপনিও খুব সুন্দর। আপনি জানেন আপনাকে সবথেকে বেশি সুন্দর লাগে একদম ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে। তার ওপরে যখন ধূসর রঙের শাল জড়িয়ে রাখেন গায়ে, হাতে একটা সিলভার ডায়ালের ঘড়ি থাকে, চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ানো থাকে খুব সুন্দর লাগে দেখতে। বিশেষ করে আপনি যখন হাঁটেন কিংবা চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকেন আরো বেশি সুন্দর লাগে দেখতে।”
আরমান বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“এত কিছু কবে খেয়াল করলেন আপনি?”
“কোন কিছুই আমার চোখে ফাঁকি নিতে পারে না। প্রথম প্রথম তো আপনাকে সন্দেহ হতো খুব বেশি, সেই জন্য খুব ভালোভাবে নজর রাখতাম। তার মাঝেই এসব খেয়াল করেছি।”
আরমান শুধু হাসলো। এরপর কিছুক্ষণ দুজনের মাঝে নীরবতা চলল। আরমান খুঁজছে কি বলা যায়। প্রতিদিনের সাধারণ আলোচনা না, সেসব আলোচনা করার জন্য তো বাকি জীবন পড়েই আছে। তবে আজকে ওদের জীবনের একটা বিশেষ রাত। আরমান বিশেষ কিছু আলোচনা করতে চায়।
কিছুটা সময় পর আগে আরজু কথা বলল।আরজুর মুখ থেকে যে ডাকটা আরমানের ভীষণ পছন্দ ঠিক সেভাবেই ডাকলো একবার।
“আরমান!”
বরাবরের মতন আরমানও তৎক্ষণাত জবাবে বলল,
“হ্যাঁ আরু, বলুন।”
এরপর আরজু আবারও কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। প্রত্যেকবার যেমন আরমান ধৈর্য নিয়ে বসে থাকে এবারও তেমন ধৈর্য নিয়ে বসে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ পর আরজু আনমনে বলে উঠলো,
“আমার একটা সমস্যা আছে জানেন তো, কেউ আমাকে ছুঁলে আমি মাঝে মাঝে খুব ভয় পেয়ে যাই। কিছু সময় ভয় পেয়ে একদম গুটিয়ে যাই, তো কিছু সময় আমি রেগে যাই। আসলে ছোটবেলা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এমন অনেক স্পর্শের শিকার হয়েছি আমি যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে যা কখনো আমাকে কাঁদিয়েছে। কখনো আবার আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছি যে নিজেকে ঘর বন্ধ করে ফেলেছি।”
“আমি তো শুনতে চাইনি এসব কথা আরু। বলতে হবে না আপনাকে।”
“না, আমাকে বলতে হবে। আপনি মাঝে মাঝে যখন আমার কাছে আসেন আমার তখন অস্বস্তি হয় না, আমি মাঝে মাঝে নিজ থেকে আপনাকে জড়িয়ে ধরি তখনও আমার অস্বস্তি হয় না, তবে কিছু সময় আপনি আমায় ছুঁতে চাইলে আমি যখন বিরক্ত হই তখন আসলে আমার পুরনো কিছু কথা মনে পড়ে যায়। আমি নিজের মাঝে থাকি না তখন। জানিনা আপনি খেয়াল করেছেন কিনা, তবে আমি সব সময় বিরক্ত হই না আপনি আমাকে ছুঁলে। আর তার কারণ মাঝে মাঝেই আমার সেই স্পর্শ গুলোর কথা মনে পড়ে যায়।”
আরমান মনে করার চেষ্টা করলো। আরজুর কথাগুলো একদম ঠিক। আরমান তো প্রায়ই চুমু খায় আরজু কে তবে সবসময় আরজু বিরক্ত হয় না। তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যায়। তবে এটাই তার কারণ। আরমানের এসব ভাবনার মাঝে আরজু আবারো বলে উঠলো,
“আমার আজ আপনাকে এই কথাগুলো বলার একটাই কারণ, আমি জানি বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন হয়। আমি বোকা নই যে এই বিষয়ে আমার কোন আন্দাজ থাকবে না। আমি জানি আপনি আমায় খুব কাছে থেকে পেতে চান। বিশ্বাস করুন আমিও আপনার ডাকে সাড়া দিতে চাই তবে মাঝে মাঝে আমি না নিজের মাঝে থাকি না আরমান। আমার ভয় হয় যে যদি আমি নিজের অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলি, যদি অপমান করে ফেলি আপনাকে। সেই জন্য আমি খুব কমই আপনাকে আমার কাছে আসতে দেই।”
আরমান ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,
“আরু আপনাকে এত কিছু ভাবতে হবে না। আপনি আমাকে কষ্ট দেননি। আমি আপনার কোন কথায় কষ্ট পাই না। আপনি যাই করুন না কেন, আপনি যদি কখনো আমায় নিজেকে ছুঁতে নাও দেন তাও আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা কমবে না। আপনার শরীরের লোভে আমি আপনাকে ভালোবাসিনি বিশ্বাস করুন।”
“আমি জানি কিন্তু তবুও আপনাকে বললাম। যদি কখনো আমার দ্বারা এমন কোন আচরণ হয়ে যায় তবে যেন আপনি কষ্ট না পান, আপনি যেন ভুল না বোঝেন আমাকে। জানেন, অনেকবার আমি এমন অনেক স্পর্শের সম্মুখীন হয়েছি। আমি সাহসী, আমি লড়াই করতে জানি কিন্তু প্রত্যেকবার যখন দেখেছি এই বিষয়গুলোতে আমার বাবা, ভাই উদাসীন থেকেছে তখন কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়তাম। সব সময় কি লড়াই করা যায় বলুন?”
আরমানের কেন যেন নিজেরই এখন ভীষণ কান্না পাচ্ছে নিজের পা'গলীর কথাগুলো শুনে। কতটা অসহায় ছিল আরজু। যদি আরমান ওর জীবনে না আসতো তবে হয়তো আরজু এমন অসহায় চিরকাল থেকে যেত। হ্যাঁ লড়াই করত আরজু নিজের জন্য, কিন্তু কতদিন লড়াই করতো। কোন না কোন এক সময় হয়তো হার মানতেই হতো আরজু কে।
আরমানের ইচ্ছে করছে এখন শক্ত করে আরমানের পা'গলীর মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে রাখতে। জড়িয়ে ধরতে ধরল তারপর হঠাৎ করে থেমে গেল। ভাবলো ওর ছোঁয়ায় যদি আরজুর অস্বস্তি হয়। সেই ভেবেই থেমে গেল। আরমান আরজুর থেকে অনুমতি চাইলো,
“আমি কি এখন আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরতে পারি আরু? আপনার কি অস্বস্তি হবে?”
আরজু আলতো হেসে বলল,
“না হবে না।”
আরমান আর এক মুহূর্ত ব্যয় না করে আরজু কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী আরজুর মাথাটা একদম বুকের সাথে চেপে ধরলো। যেন মিশিয়ে নেবে আরজু কে নিজের বুকের মাঝে। এই পৃথিবীর সমস্ত খারাপ নজর, সমস্ত বাজে স্পর্শ থেকে নিজের বুকের মধ্যেখানে আরজু কে লুকিয়ে রাখবে আরমান। কোন কুদৃষ্টি, কোন খারাপ স্পর্শ আরজু কে আর অনুভব করতে হবে না। আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“কত কষ্ট পেয়েছে আমার পা'গলীটা, আর আমি কিছু জানতামও না। তবে আর আপনাকে কষ্ট পেতে দেবো না আমি আরু। এই বুকের মাঝে আপনি খুব নিরাপদ, সব থেকে বেশি নিরাপদ। যত আঘাত আসতে চাইবে সমস্তটা আমি নিজে সহ্য করে নেব। তবুও আপনাকে একটু আঘাত পেতে দেব না।”
আরজু নিজেও পাল্টা দুহাতে আরমানকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“জানিতো আমি। আমি জানি এই বুকটা আমার নিরাপদ আশ্রয়। সেই জন্যই তো এই বুকটাতে চিরকাল মাথা রাখার ব্যবস্থা করে নিয়েছি।”
_________
“কোন কু'ত্তা'র বা'চ্চা এসেছিল বাড়িতে আমার অনুপস্থিতিতে? শু'য়ো'রে'র বা'চ্চার নামটা শুধু বল একবার, আজই ওর দেহ থেকে মাথা আলাদা করবো।”
ফিরোজের কথাটা শুনতেই প্রার্থনার অন্তরাত্না কেঁপে উঠলো। চোখের সামনে ফিরোজের বলা দৃশ্যটা কেমন যেন ভেসে উঠলো। হঠাৎ করে সেই সাথে মনে পড়ে গেল ফাহিম কে মা'রার দৃশ্যটা। তখনও তো র'ক্ত দেখেছিল প্রার্থনা।
খুব ভয় পেয়ে গেল হঠাৎ করে প্রার্থনা। প্রার্থনার পাশে দাঁড়ানো ফারিহা ভয় পেয়ে গেল ফিরোজের কথা শুনে। আতঙ্কিত গলায় ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এভাবে বলছো কেন চাচ্চু? তুমি মা'রবে কেন ওদেরকে?”
ফিরোজ হুংকার ছেড়ে বলল,
“তো আর কি করবো আম্মা? শু'য়ো'র গুলোকে হাজার বার করে সাবধান করে দিয়েছি যে আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন ওদের কে না দেখি, তবে ওদের জিভ এতটাই বড় হয়ে গিয়েছে যে আজ আমার বাড়িতে চলে এসেছে। শা'লা সবগুলো কে আজ টুকরো টুকরো করে কু'কু'রকে খাওয়াবো।”
ফিরোজের এমন ভয়ংকর আচরন কিংবা কথাবার্তা কোনটাই ফারিহার জন্য পরিচিত না। ফলস্বরূপ ভয় পেল ফারিহা। ফারিহার চোখে মুখে সেই ভয় আর আতঙ্কটা দেখতেই ফিরোজ যেন হুঁশে ফিরলো। বুঝতে পারলো ভুলভাল কথা বলে ফেলেছে ফারিহার সামনে। কথাগুলো বলা উচিত হয়নি।
নিজেকে শান্ত করে ফারিহার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফিরোজ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“আম্মা তুমি ঘরে যাও। প্রার্থনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
ফারিহা কম্পিত গলায় বলল,
“তার মানে সবাই ঠিক বলে তাই না? তুমি মানুষ খু'ন করো?”
ফিরোজ ফারিহার প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারল না। শান্ত গলায় বলল,
“ঘরে যাও আম্মা।”
ফারিহা পুনরায় প্রশ্ন করল,
“সত্যি করে বলো চাচ্চু তুমি কি মানুষ খু'ন করো? সবাই কি তাহলে ঠিক বলে?”
ফিরোজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“যার যখন ম'রা'র সময় হবে সে তখন ম'র'বে'ই আম্মা। তবে এই মৃ'ত্যুর মাঝে দুটো ভাগ আছে, স্বাভাবিক মৃ'ত্যু আর অস্বাভাবিক মৃ'ত্যু। তবে মৃ'ত্যু যেভাবেই হোক না কেন সময় এর আগে কেউ ম'র'বে না। যারা ম'রে'ছে তাদের আয়ু শেষ হয়েছিল বলেই ম'রে'ছে। ঘরে যাও তুমি এখন।”
ফারিহা আর কিছু বলল না, হয়তো বলার সাহসই পেল না। চুপচাপ ঘরে চলে গেল। ফারিহা চলে যেতেই ফিরোজ প্রার্থনার দিকে তেড়ে এলো। দাঁত কটমট করে প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কে এসেছিল বাড়িতে প্রার্থনা? কজন এসেছিল? চিনিস তুই ওদের? আগে কখনো দেখেছিস?”
প্রার্থনা কোন উত্তর দিলে না। ফিরোজ খেয়াল করলো প্রার্থনা বোধহয় কোন গভীর ঘোরের মাঝে আছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। চোখ মুখে যেন একটা তীব্র ভয় আর আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। ফিরোজ প্রার্থনার কাঁধে হাত রেখে হালকা একটু ঝাঁকিয়ে বলল,
“কি হয়েছে তোর? সামনে কি দেখছিস? তোর পিরীতের সোয়ামি কে আবার দেখছিস নাকি? ম'রেও শান্তি দিচ্ছে না তোকে?”
প্রার্থনা দৃষ্টি ঘুরিয়ে ভয়ার্ত চোখে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে কম্পিত গলায় বলল,
“ফিরোজ ভাই, তোমার মনে আছে আমি ফাহিমকে খু'ন করেছি?”
প্রার্থনা কথাটা বলার সাথে সাথে ফিরোজ ওর মুখ চেপে ধরে ধমক দিয়ে বলল,
“একটা চ'ড় লাগাবো তোকে। আমি বলেছি না এই কথা মুখে না নিতে।”
প্রার্থনা ওর মুখের উপর থেকে ফিরোজের হাতটা সরিয়ে পুনরায় কম্পিত গলায় বলল,
“আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সেদিনের সেই দৃশ্যগুলো। তুমি জানো আমি খুব কষ্ট দিয়ে মে'রে'ছি ফাহিম কে? আমার মনে হলে এখনও ভয় করছে। আমি কি করে মা'র'লা'ম ওকে?”
ফিরোজ আবারো প্রার্থনার মুখ চেপে ধরে দাঁত পিষে বলল,
“আর একটা শব্দ যদি উচ্চারণ করেছিস তবে কিন্তু আজ আমার হাতে মা'র খাবি তুই প্রার্থনা। শা'লা বাঁচিয়েছি তোকে আবার তুই আমাকে ফাঁসাতে চাস। তুই জানিস আমার মনে মায়া দয়া নেই। এমন ভাবে মে'রে দেবো যে ফাহিমের সাথে তুইও ক'ব'রে চলে যাবি।”
প্রার্থনা আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। নিজের ঘরে চলে গিয়ে শব্দ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ফিরোজের রাগ উঠে গেল। আরে যাবি যা ভালো কথা তবে বলে যেতি কে এসেছিল। এরা কেউ যেন ফিরোজ কে শান্তিতে থাকতে দেবে না।
এরা কি চায়, ফিরোজ ম'রে যাক? নিশ্চয়ই তাই চায়। খুশি হবে তো দুই বোনই ফিরোজ ম'রে গেলে। আরজু তো উৎসব পালন করবে। ওর তো আর ফিরোজ কে দরকার নেই, না কখনো দরকার ছিল। ভালোও তো বাসেনা ফিরোজ কে, না কোন মায়া দয়া আছে ফিরোজের প্রতি। বরং এখন নিজের স্বামী সংসার নিয়ে সুখে আছে। দুদিন পর বাচ্চাকাচ্চা হবে।
কথাটা ভাবতেই ফিরোজ কেমন থমকে গেল। হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল, আরজু কে কি তবে আরমান ছুঁয়েছে! ওদের দুজনের সম্পর্কটা কি তবে অনেকটাই এগিয়ে গেছে! ওরা কি একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে! খুব ঘনিষ্ঠ সময় কাটায় কি ওরা!
_________
বৌভাতের অনুষ্ঠানের পর আরো দশ দিন মতো থাকলো আরজুরা গ্রামে। আজ শহরে ফিরে যাবে। সবাই প্রায় শহরে ফিরে গেছে, বাকি আছে কেবল তানভীর। আরমানদের সাথে ও আজ ফিরবে। আরজুর মনটা একটু খারাপই বলা চলে। এই কয়দিন এখানে সবার বেশ আদর-যত্ন পেয়েছে, বিশেষ করে আরমানের মা আর বাবার।
আরজুর কিছু সমস্যা আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সহজে কাউকে কিছু বলে ডাকতে পারে না। কিছু নির্দিষ্ট ডাক আছে সেগুলোতো আরোই না। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভাইয়া, বাবা আর মা। এগুলো বলে ডাকতে আরজুর অসুবিধা হয়। ইচ্ছে করে না কাউকে ডাকার। কারণ এই তিনটা সম্পর্কই আরজুর জীবনে একটা কালো অধ্যায়ের মতন। খুব কষ্ট জমে আছে আরজুর এই তিনটে ডাকের সাথে। আর আপা বলে কাউকে ইচ্ছে করে না ডাকতে। ওর আপা একজনই।
মুনতাসির কে ভাইয়া ডাক শুনতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর আরজু ভাইয়া বলে ডেকেছিল। এদিকে আরমানের বাবা-মাকেও কিছু বলেই ডাকত না, কোন কিছু বলেই সম্বোধন করত না। তবে এই দশ দিনে আরমানের বাবা-মার ভালোবাসা আর যত্ন আরজুর মন অনেকটা গলাতে পেরেছে। আরজু এখন ডাকে মাঝে মাঝে বাবা মা বলে। সব সময় ডাকতে পারেনা। নিজের কাছে কেমন যেন একটু অস্বস্তি অনুভূত হয়। মনে হয় যে কিনা কি ভাববে তারা। তবে মাঝে মাঝে প্রয়োজন হলে এখন ডাকে।
আরজুর এসব ভাবনার মাঝে মিজান হাসেন এগিয়ে এসে আরজুর হাতে কিছু টাকা নিয়ে বললেন,
“এটা তুমি নিজের কাছে রেখো মা। কোনো প্রয়োজন হলে এটা দিয়ে কিনে নিও। আর যদি কখনো কোন টাকার দরকার হয় তবে আমাকে বলতে পারো। আমার ছেলে তো এখনো উপার্জন করে না সেজন্য তোমায় বলতে পারলাম না যে ওর থেকে চেও। যদিও খুব তাড়াতাড়ি আমার ছেলে নিজে উপার্জন করা শুরু করবে। আমার সবকিছু তো আমার ছেলেমেয়েরই। তবে আপাতত তোমায় বলবো, তোমার বাবা আছে।”
আরজু হাতের টাকাগুলোর দিকে একবার তাকালো। তারপর মিজান হোসেনের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত গলায় বলল,
“আমি কি করবো এগুলো দিয়ে? আমি নিজে চালিয়ে নিতে পারি আমার খরচ। আমি টিউশন করি, চাকরিও করি। এই টাকাটা বরং আপনি আরমান কে দিন। ও তো কিছু করে না, ওর লাগবে।”
মিজান হোসেন একটু হেসে উঠে বললেন,
“জানি তো আমার ছেলের বউ চাকরি করে, স্বনির্ভরশীল। তবে তাও আমি আমার দায়িত্ব থেকে টাকাটা দিলাম। আর চিন্তা করো না তাওসিফ কে আমি আলাদা করে দিয়েছি। এটা তুমি তোমার কাছে রেখে দাও। যদি কখনো কোন প্রয়োজন হয় আমাকে অবশ্যই জানিও।”
আর কোন কথা বাড়লো না মিজান হোসেন। এবার আমেনা বেগম এগিয়ে এসে আগে আরজু কে খুব ভালোমতো আদর করলেন। গালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে একটা স্নেহের চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বললেন,
“যদি সংসারে কোন কাজ নিয়ে সমস্যা হয় তবে আমাকে জানিয়ো। কোন রান্নাবান্না না পারলে আমাকে বলো আমি তোমায় শিখিয়ে দেবো। আর চিন্তা করো না আমি আমার ছেলেকে বলে দিয়েছি যেন তোমায় সাহায্য করার জন্য একটা লোক রেখে দেয়। যদিও জানি আমার ছেলে তোমার সাথে কখনোই খারাপ ব্যবহার করবে না তবে তাও বলছি, যদি কখনো ওর কোন কথায় কষ্ট পাও আমায় বলো, আমি ওকে বকে দেব। আর কোন কষ্ট নিজের মনের মাঝে চাপিয়ে রাখবে না। কোন কিছু প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে ওকে।”
আরজু শুধু মাথা নাড়ালো। একে একে তনুশ্রীর সাথে কথা বলল, তাশরীফের সাথে কথা বলল। তাশরীফের খুব ইচ্ছে ছিল আরজুদের সাথে আসার, তবে পারলো না। কলেজে ফাইনাল পরীক্ষা। তনুশ্রীরও একই অবস্থা। সবশেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল।
গাড়িটা ছাড়ার পরপর আরজুর হঠাৎ করে কেমন যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব হলো। মনে হলো পেছনে যেন কিছু আপন মানুষকে ফেলে রেখে আসলো, নিজের বাড়ি ফেলে রেখে আসলো, নিজের সংসারটাকে ফেলে রেখে আসলো। পাশে আরমান আছে। আরমান তো আরজুর জীবনের সবথেকে বড় পূর্ণতা, তবে তারপরও কিছু একটা শূন্যতা অনুভূত হলো আরজুর।
_________
আরজুকে নিয়ে আরমান আগে নিজের ফ্ল্যাটে যায়নি। সরাসরি এসেছে মুহিব হোসেনের বাড়িতে। এর অবশ্য দুটো কারণ আছে। প্রথম কারণ হলো, মুহিব হোসেন নিজেই আরমানকে এখানে আসতে বলেছেন। নতুন বউকে নিয়ে আরমান নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে একা একা থাকবে এটা ওনার পছন্দ না। উনি তো আরমান কে আরজু কে নিয়ে এখানেই থেকে যেতে বলেছিলেন, তাতে আরমান আবার রাজি হয়নি।
আরজু কে বিয়ে করেছে ওকে শান্তি দেওয়ার জন্য। আরমান খুব ভালো করে জানে যদি এই বাড়িতে ওরা থাকে তবে দিনরাত কল্পনা একদম জ্বা'লিয়ে মা'রবে আরজু কে। একটুও শান্তি পেতে দেবেনা। আর তাছাড়া অন্যের বাড়িতে রাখবে না আরমান আরজু কে। ওর নিজের বাড়িতে, নিজের দায়িত্বে রাখবে।
তবে আজ নিজের ফ্ল্যাটে যায়নি। আর না যাওয়ার দ্বিতীয় কারণটা হলো আরমান একা একা থাকতো ওর বাড়িতে। বাড়ির অবস্থা খারাপ। সংসারের কোন কিছুই তেমন কেনা হয়নি। আরমান তাই ঠিক করেছে আগে কোনরকম একটু সংসারের কিছু খুঁটিনাটি জিনিসপত্র আরজুকে নিয়ে কিনে গোছাবে, তারপর আরজুকে নিয়ে গিয়ে তুলবে। এমন অগোছালো সংসারে আরমান তুলবে না ওর আরু কে।
সময় তখন রাত দশটার কাছাকাছি। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই যে যার ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটু আড্ডা দিতে বসলো সবাই। আর আজকের আড্ডার বিষয়বস্তু হচ্ছে তানভীরের বিয়ে। বিয়ের সিরিয়ালে এবার তানভীরই আছে। তবে তানভীরের বিয়ের কথাটা তুলতেই কেমন যেন তেলে ভেগুনে জ্বলে উঠলো। আরমান হয়তো কারণটা জানে, তবে সেটা না জানার ভাব করে বসে থাকলো। বরং বিভিন্নভাবে তানভীর কে আরো বেশি বিরক্ত করলো।
ভার্সিটির কিছু সুন্দর সুন্দর মেয়ের নাম বলল আরমান। আরো কিছু মেয়ের নাম বলল যারা তানভীর কে পছন্দ করে, কিছু মেয়ের প্রশংসা করলো। তবে এত কিছুর মাঝে আরমান খেয়ালই করল না যে যখন ও মেয়েগুলোর প্রশংসা করছিল তখন কি ভয়ংকর ভাবে পাশে বসা আরজু ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে মনে আরজু ঠিক করলো ঘরে গিয়ে সবকিছুর ফয়সালা হবে।
হঠাৎ করে আরজুর ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো একটা অপরিচিত নাম্বার। হঠাৎ করে নাম্বারটা দেখেই কেন যেন আরজুন মনে হলো যে নাম্বারটা ওর অপরিচিত হলেও যে কল করেছে তাকে আরজু চেনে। আরজু নিশ্চিত না তবে সন্দেহ হলো। কারণ ওর ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কেউ কল করলে সেটা শুধুমাত্র ফিরোজই করে। আরজু কলটা ধরল না, কে'টে দিল।
পাশে বসা আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কে কল করেছিল আরু?”
“কেউ না।”
“আমি যে শুনলাম কলের রিংটোনের আওয়াজ?”
“বললাম তো কেউ না।”
আরমান আর কোন প্রশ্ন করলো না। যেহেতু আরজু বলেছে কেউ কল করেনি তার মানে কল করেনি। আরমান নিজের কানকেই ভুল ভেবে নিল, তবুও আরজুর কথা কে ভুল ভাবলো না
কয়েক মুহূর্ত বাদে আরজুর ফোনে আবারো কল এলো। এবারে কল এলো প্রার্থনার নাম্বার থেকে। প্রার্থনার নাম্বার থেকে এখন কল আসতে দেখেই আরজু এবারে নিশ্চিত হয়ে গেল যে ফিরোজই ওকে কল করেছিল। কিন্তু যেহেতু এবারে প্রার্থনার নাম্বার থেকে কল এসেছে তাহলে কলটা তো আরজু কে রিসিভ করতেই হবে।
তবে এখানে এত মানুষের মাঝে রিসিভ করা যাবেনা। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি ঘরে যাচ্ছি। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।”
আরজুর মুখ থেকে শরীর খারাপের কথা শুনে আরমান চিন্তিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে আরু? চলুন আমিও যাই।”
“না দরকার নেই, আপনি থাকুন। আমি যাচ্ছি।”
আরমান আরো কিছু বলতে ধরলো তবে তার আগেই আরজুর গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
“বললাম তো একাই যাব, আপনি থাকুন।”
আরমান আর কিছু বলল না। আরজু চলে গেল। আরজু সেখান থেকে চলে যেতেই তানভীর ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“কিরে বউকে দেখে তো দেখছি ভয়ে কাঁপছিস তুই। সেদিন তো খুব বড় বড় কথা বললি তুই তাওসিফ আরমান নাকি কাউকে দেখে ভয় পাস না।”
আরমান বেশ গর্বের সাথে বলল,
“বউকে দেখে ভয় পাই কথাটা বলতে আমার কোন লজ্জা নেই। আর এতে খারাপ কিছু নেই। তবে তোকে দেখে ভয় পাই না।”
লেগে গেল দুই ভাইয়ের ঝগড়া। দুজনের মাঝে তর্কাতর্কি চলল বেশ কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে হিমি বিরক্ত হয়ে নিজে উঠে চলে গেল, তবে দুই ভাইয়ের ঝগড়া থামল না।
আরজু ঘরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল আগে। ততক্ষণে প্রার্থনার কলটা কেটে গেছে। আরজু নিজে এবার কল ব্যাক করলো প্রার্থনার নাম্বারে। সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ হলো। তবে অপর পাশ থেকে প্রার্থনার কণ্ঠস্বর ভেসে না এসে ফিরোজের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“তোর এত বুদ্ধি কেন রে আরজু? অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসা দেখেই বুঝে গেছিস যে আমি কল করেছি নাকি এটা তোর ভালোবাসা?”
ফিরোজের কন্ঠটা কানে যেতেই আরজু আগে নিজেকে প্রস্তুত করলো খুব কড়া কিছু কথা শোনানোর জন্য। ঘৃণা ভরা গলায় বলল,
“বলেছি না তুই একটা জা'নো'য়া'র। আর জা'নো'য়া'রকে আমি ভালোবাসি না। আর তোর নাম্বারটা চেনার কারণ হলো আমাকে অপরিচিত নাম্বার থেকে তুই ব্যতিত আর কেউ বিরক্ত করে না। কেউ আর আমার জীবনটাকে বি'ষা'ক্ত করতে চায় না। সে জন্য অপরিচিত নাম্বার দেখলেই বুঝে যাই যে ফিরোজ নামের কোন জা'নো'য়া'র কল করেছে।”
আজ শুধু ফিরোজ হাসলো। খারাপ লাগলো ঠিকই তবে সেসব গায়ে মাখলো না। হাসতে হাসতে বলল,
“জা'নো'য়া'র হই তবে এই জা'নো'য়া'রই অনেকবার তোর উপকারে এসেছে, অনেক বার তোর জান বাঁচিয়েছে, তোর সম্মান বাঁচিয়েছে। আর আমি জানি আজ তুই আরও একবার এই জা'নো'য়া'রটার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবি।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কেন?”
“তোর ভার্সিটির সামনে যে বাস স্ট্যান্ড আছে সেখানে চলে আয়। তোর জন্য তোর জান কে নিয়ে এসেছি, সেই সাথে আমার জান কে দিতে এসেছি।”
আরজু বুঝলো না ফিরোজের কথার মানেটা। ভ্রুঁ কুঁচকে আবারও প্রশ্ন করলো,
“কি বলছিস, বুঝতে পারছি না। ভালো করে বল।”
“প্রার্থনা কে নিয়ে এসেছি। তোর আপাকে দিয়ে যাব তোর কাছে। আর বিরক্ত করবো না তোর আপাকে। আর শুধু প্রার্থনা কে না, আমার আম্মাকেও নিয়ে এসেছি। তোর দায়িত্ব রেখে যাব। আমি তো অমানুষ, কিন্তু তুই ওকে মানুষ করতে পারবি না? একদম তোর মতন করে মানুষ করবি, যেন আমার মতন কোন জা'নো'য়া'র ওর ধারের কাছেও না আসতে পারে।”
আরজুর বিশ্বাস হলো না ফিরোজের বলা কথাটা। সন্দেহী গলায় বলল,
“মজা করছিস আমার সাথে? টোপ দিচ্ছিস আমায়? ভেবেছিস এগুলো বললে আমি তোর জালে ধরা দেবো?”
ফিরোজ কেমন যেন অসহায় গলায় বলল,
“একটু তো বিশ্বাস কর আমায় আরজু। এতটা কষ্ট দিস না। একটু তো আমার ভালোবাসার মূল্য দে। ঘৃণা করবি কর, তাই বলে কথায় কথায় এত কষ্ট দিতে হবে আমায়? তোর দেওয়া আঘাতে বুকটা আমার ঝাঁঝড়া হয়ে গেল রে। আর কষ্ট দিস না, এবার থেমে যা।”
ফিরোজের বলা গভীর, বেদনাদায়ক কথা গুলো আরজুর মনে বিন্দুমাত্র কোন দাগ কাটতে পারলো না। গম্ভীর গলায় বলল,
“আপাকে ফোন দে। আপার মুখ থেকে শুনব আমি, তবে বিশ্বাস করবো। তোকে আমি এক চিলতেও বিশ্বাস করি না।”
ফিরোজ আবার হাসলো। পাশে দাঁড়ানো প্রার্থনার দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তোর আরু তোকে বিশ্বাস করে, আমাকে করে না রে প্রার্থনা। ফিরোজ নিজের জান দিয়ে দিলেও আরজু কখনো ওকে বিশ্বাস করবে না।”
প্রার্থনা ফোনটা কানে ধরতেই আজ অপর পাশ থেকে উদ্বিগ্ন গলায় আরজু বলল,
“আপা তুমি ঠিক আছো? ওই শ'য়'তানটা ঠিক বলল? ও তোমাকে নিয়ে এসেছে?”
“হ্যাঁ। আমি সত্যি ঢাকায় এসেছি। তুই নিয়ে যা আমাকে। আমাকে বি'ষা'ক্ত জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে আরু ফিরোজ ভাই। ওখানে ফিরতে হবে না আর আমায়।”
আরজু আর কোন কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করলো না। সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তুমি দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি আসছি।”
আরজু কলটা কেটে দিয়ে দৌড়ে নিচে চলে গেল। তানভীরের সাথে তখনো আরমান তর্কাতর্কি করছিল। আরজু কে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে আরমান একটু ভরকালো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“দৌড়াচ্ছেন কেন আরু, কি হয়েছে?”
আরজু ব্যস্ত গলায় বলল,
“চলুন, যেতে হবে।”
“কোথায় যাব?”
আরজু তাড়া দেখিয়ে বলল,
“চলুন, যেতে যেতে বলছি।”
তানভীরকে কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ দিলো না আরজু, আর না আরমানকে কিছু বলার সুযোগ দিল। এক প্রকার ওর হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল।
আরমান আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। কে জানে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওর পা'গলী!