বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৯

🟢

নিধির ঘুম ভাঙলো সকাল নয়টা নাগাদ। এখনো চোখ দুটো খুলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তারপরও বাধ্য হয়ে খুলল। অন্তত সময়টাতো দেখতে হবে যে কটা বাজে। শাশুড়ি মা তো বলে দিয়েছিল সকাল সকাল উঠে রান্না করতে হবে। আদৌও সেই সময়টা হয়েছে কিনা দেখতে তো হবে।

নিধি আশেপাশে হাতড়ে ফোনটা হাতে নিয়ে যখন দেখল ঘড়িতে নয়টা বাজে অমনি দুচোখ থেকে ঘুম ছুটে পালালো। এক লাফে শোয়া থেকে উঠে বসলো। আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও গহন কে দেখতে পেল না নিধি। ঘরের দরজাটাও খোলা।

নিধির আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এই লোক অনেকক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে গেছে। তবে লোকটার আক্কেল জ্ঞান ঠিক কতটা কম সেটাই ভাবছে নিধি। সকাল হয়ে গেছে নিজের ঘুম ভেঙেছেও। কিন্তু তারপরও একবার নিধিকে ডাকেনি। মানুষটার মাথায় কি সামান্য বুদ্ধি নেই যে শ্বশুরবাড়িতে বাড়ির বউদের এত দেরি অবধি ঘুমোতে নেই। ওনার কি এতোটুকু বোধ বুদ্ধি নেই যে মানুষজন কথা শোনাতে পারে। উনি কি নিজের মা-বোনদেরকে চেনে না।

অবশ্য উনি নিধিকে জাগাবেনই বা কেন। উনি তো চানই যেন নিধি কে সবার কাছে কথা শুনতে হয়। উনি তো এটাই চান যে সবাই যেন নিধিকে খোঁচায়। ঠিক যেমন উনি নিজে খোঁচায়।

তবে আপাতত আর এসব আজেবাজে ভাবনায় নিজের সময় নষ্ট করতে চাইলো না নিধি৷ তাড়াতাড়ি করে হাত মুখ ধুঁয়ে ঘর থেকে বের হলো।

ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখল সালমা বেগম সোফায় বসে টিভি দেখছেন। বাড়িতে আর কারো উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে না। কে জানে আদৌও বাড়িতে আর কেউ আছে কিনা। নাকি সবাই নিধির মতনই ঘুমোচ্ছে।

নিধি সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,

“মা, বাকিরা কোথায়? কেউ কি নেই বাড়িতে?”

নিধির কন্ঠ পেয়ে সালমা বেগম ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন,

“আছে তো। ঘুমোচ্ছে ওরা। গহন আর জামাই শুধু বাইরে বেরিয়েছে।”

“ও আচ্ছা। আপনি অনেকক্ষণ ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন?”

সালমা বেগম এবারেও পূর্বের মতন মিষ্টি করে হেসে বললেন,

“হ্যাঁ। আমার তো সেই ফজরের সময়ই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যেস। আসলে গহনের দাদী মানে আমার শাশুড়ি পছন্দ করতেন না বাড়ির বউদের এত দেরি অব্দি ঘুমোনো। একদিন যদি একটু ঘুম থেকে উঠতে দেরি হতো সারাদিন কথা শুনতে হতো। সে আমাদের যতই মাথা ব্যথা কিংবা জ্বর সর্দি হোক না কেন।”

নিধি ঠিক বুঝে উঠতে পারল না যে সালমা বেগম ওকে কি বোঝাতে চাইলো। মানে নিধি দেরিতে ওঠার জন্য কি উনি অসন্তুষ্ট, রেগে আছেন নাকি ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন। আবার নিজের এমন করুণ পরিণতির কাহিনী কেনই বা শোনাচ্ছে হঠাৎ করে। নিধি কে কি বোঝাতে চাইলো যে নিধি অনেক ভালো শাশুড়ি পেয়েছে।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই সালমা বেগম ফের বলে উঠলেন,

“গহন নাস্তা করে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেছে। টেবিলে খাবার সাজানো আছে। তুমি গিয়ে খেয়ে নাও। বাকিদের জন্য অপেক্ষা করো না। ওদের ওঠার আরো দেরি আছে।”

“আপনি খেয়েছেন মা?”

“হ্যাঁ আমি খেয়েছি। যাও তুমি খেয়ে নাও।”

নিধি আর কথা বাড়াতে চাইল না। ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখল টেবিলের উপরে পরোটা ভেজে রাখা আছে। আর সেই সাথে সবজি রান্না করেছে। সবজিটা দেখেই নাক শিটকালো নিধি। পরোটার সাথে একটু ডিম ভাজি না হলে ঠিক জমে না ব্যাপারটা। আর এই শাকসবজি কোন মানুষ খায় নাকি? এইসব শাকপাতা তো খাবে গরুরা। নিধি কি আর গরু নাকি যে এসব খাবে।

রান্না ঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখলো ডিম আছে। নিধি ভাবলো একটা ডিম ভেজে নেবে। ডিমটা হাতে নিতে গিয়েও আবার থেমে গেল। মনে হলো এটা করা বোধহয় উচিত হবে না। বাকিরা যেখানে শুধু সবজি দিয়ে খেয়ে নেবে সেখানে নিধি বাড়ির বউ হয়ে আলাদা করে ডিম ভেজে খাবে তাও আবার কারো থেকে অনুমতি না নিয়ে ব্যাপারটা কেমন যেন একটা দেখায় না! বাড়িতে তো ওর মা কে এটার জন্য প্রায়ই কথা শুনতে হতো।

ডিম খাওয়ার বিভিন্ন নেতিবাচক ভাবনা মাথায় আসতেই নিধির খিদেই ম’রে গেল। ভাবলাে আর যাই করুক না কেন ডিম খাওয়া যাবেনা। এই একটা ডিম খাওয়া সারা জীবনের বদনামের কারণ হয়ে যেতে পারে।

চুপচাপ গিয়ে প্লেটে শুধু একটা পরোটা নিল। খালি খালি পরোটাটাই খেয়ে নিল। তবুও সবজি ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে হলো না।

খাওয়া-দাওয়া শেষে নিধি ঘরে আর যেতে পারল না। দেখলো ও ডাইনিং রুম থেকে বের হওয়ার আগে সালমা বেগমই এসেছেন। ওনাকে আসতে দেখে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কিছু বলবেন মা?”

“হ্যাঁ। আসলে দুপুরে আজ অনেক কিছুই রান্নাবান্না করতে হবে। তোমার দেওর আসছে।”

“কোথা থেকে আসছে? মানে উনি কোথায় থাকেন? বিয়েতেও তো দেখলাম না। বিদেশ থাকেন কি?”

সালমা বেগম নিধির প্রশ্নের কোন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। ভিন্ন কথা বললেন।

“তোমার দেওর সবকিছু আবার একটু ঝাল ঝাল খেতে পছন্দ করে। দেখো খাবারে যেন ঝাল লবণ ঠিক থাকে। আর একটু গাজরের হালুয়া বানিয়ো। ছেলেটা খুব পছন্দ করে খেতে। আর শোনো, মিতা আজ কাজে আসেনি। ছুটি নিয়েছে। সব তোমায় একাই করতে হবে মা। আর বাড়িটাও অগোছালো হয়ে আছে। বিয়ে ছিল, মানুষের আনাগোনাও বেশি ছিল। রান্নাঘরে যাওয়ার আগে বাড়িটা গুছিয়ো।”

সালমা বেগম শুধু নিধি কে আদেশ করেই গেলেন। নিধি এত কাজ করতে পারবে কিনা কিংবা অসুবিধা হবে কিনা বা কারো সাহায্য প্রয়োজন কিনা কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার কিংবা জানার প্রয়োজন মনে করলেন না। বরং আগেই জানিয়ে দিলেন যে একাই করতে হবে সব।

কথাগুলো বলে সালমা বেগম চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেলেন। নিধিও আর বিশেষ কিছু মনে করলো না ওনার কথায়। শাশুড়িরা এমনই হবে। আর শ্বশুর বাড়িতে এলে তো কাজ করতেই হবে। ওকে তো আর বসে খাওয়ানোর জন্য এই বাড়িতে আনেনি তাই না? আর এমনিতেও নিধি তো কোন রাজার মেয়ে না যে দেমাগ দেখিয়ে বসে থাকবে। কাজ তো করতেই হবে।

_______

শাশুড়ির কথা মত নিধি পুরো বাড়িটা খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করলো। তবে নিধি একটা কথা বুঝে উঠতে পারছেনা যে বাড়িতে এত ধুলো ময়লা কেন থাকবে? কোনদিন কি কেউ পরিষ্কার করেনি? মনে হচ্ছে মেঝের উপরে বালি পড়ে আছে। এরা কি সবাই খুব বেশি নোংরা? গহনকে দেখে তো তেমন মনে হলো না। বরং যতটুকু গহনকে দেখেছে নিধির ভীষণ খুতখুতে মনে হয়েছে। গহনের ঘরের কোন কোণাতে একটুও ময়লা খুঁজে পায়নি নিধি। তাহলে বাড়ির এই অবস্থা কেন? নাকি এরা এই অপেক্ষাতেই ছিল যে কবে গহন বিয়ে করে নিধি কে আনবে আর নিধি কে দিয়ে সবটা পরিষ্কার করাবে। সেজন্য হয়ত জীবনেও কেউ বাড়ি পরিষ্কার করেনি।

এর মধ্যেই আবার সালমা বেগম মিষ্টি করে এসে বলে গেছেন যে ঘরটা মুছতেও হবে। এইসব কাজ করতে নিধির কোন অসুবিধা নেই। নিজের বাড়িতেও এসব কাজ প্রতিদিন করতেই হতো। নিধি ঘর পরিষ্কার না করলে তো ওর চাচিরা অসুস্থ হয়ে যেত। নিধি ওদের বিছানা গুছিয়ে না দিলে ওনারা সেই বিছানায় ঘুমোতেই পারতেন না। নিধি কাপড় না ধুঁয়ে দিলে সেই কাপড় ওনারা পরতেই পারতেন না। সেই দিক দিয়ে নিধির মনে হলো শ্বশুরবাড়িতে ওকে দিয়ে কম কাজই করে নেওয়া হচ্ছে।

সবার আগে নিধি গেলো সিনথিয়ার ঘর মুছতে। সিনথিয়া তখনও ঘুমোচ্ছে দরজা জানালা সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে। পুরো ঘর অন্ধকার। নিধি যেই না ঘরে ঢুকতে নিল অমনি কোত্থেকে যেন সালমা বেগম এসে চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“আরে আরে ওর ঘরে যাচ্ছো কেন? একটু শব্দ পেলেই সিনথিয়ার ঘুম ভেঙে যায়। আর এখন ওর ঘুম ভেঙে গেলে আবার মাথা ব্যথা করবে। তুমি অন্য ঘর মুছে দাও। ও ঘুম থেকে উঠলে তখন ওর ঘর মুছে দিও।”

নিধি একটু কেঁপে উঠেছিল। তড়িঘড়ি করে সিনথিয়ার ঘর থেকে বের হয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। সালমা বেগম নিজের বড় মেয়ের ঘরটা দেখিয়ে বললেন,

“শম্পার ঘরটা আগে মুছে দাও। বাচ্চা নিয়ে থাকে। নোংরা হয় বেশি ওর ঘর।”

শাশুড়ির কথা মত নিধি আগে শম্পার ঘরেই গেল। শম্পা তখন বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আছে। ছোট ছেলে ঘুমোচ্ছে আর বড় মেয়ে খেলছে। নিধি ঘরে ঢুকে শেফা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি বিছানায় গিয়ে বসো। আমি ঘরটা মুছবো এখন।”

শেফা শুনলো নিধির কথা। ঘর মোছা তখন প্রায় শেষের দিকে নিধির। শম্পা মাথা তুলে দেখল ঘর মোছা প্রায় হয়ে গেছে। মেয়েকে উদ্দেশ্য করে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে কিছু একটা আনতে বলল। শেফা নেমে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে সেটা এনে দিল শম্পাকে। শেফার পায়ে ধুলো লেগে ছিল। ফলস্বরূপ ভেজা মেঝের ওপরে হাঁটার কারণে আবার সেটুকু জায়গা নোংরা হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

নিধি অসহায় দৃষ্টিতে শেফার নোংরা পায়ের ছাপের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু করার নেই। আবার গিয়ে সেটুকু জায়গা মুছে দিল। একটু পর শম্পা আবার কি যেন কাজে বিছানা থেকে নামলো। নিধি নিষেধ করল তবে শম্পা কানেই নিলো না নিধির কথাটা।

আদৌ কোন দরকারি কাজ ছিল কিনা কে জানে। পুরো ঘর জুড়ে এমনি হাটাহাটি করল। নিধি দেখলো শম্পার পায়ের ছাপ তবে আর মোছার প্রয়োজন মনে করলো না।

নিধি চলে যেতে নিলে শম্পা ওকে ডেকে উঠলো। মেঝের ওপর নিজের পায়ের ছাপ গুলো দেখিয়ে বলল,

“আরে আগেই কোথায় যাচ্ছো? দেখো ময়লা লেগে আছে মেঝেতে। এগুলো কে মুছবে? যদি ভালো করে মোছার ইচ্ছেই না থেকে থাকে তাহলে এসেছ কেন? ঢং দেখাতে?”

নিধি দাঁড়িয়ে গিয়ে শম্পা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ঢং দেখাতে কেন আসব? ঘর মোছা কি ঢং দেখানোর মতন কাজ? আর আপনার পায়ে ময়লা লেগে ছিল। আমি মুছে দিলে আবার আপনি নিচে নামবেন, আবার ময়লা হবে। তাই আর মোছার প্রয়োজন নেই।”

শম্পা কিঞ্চিত রাগী গলায় বলল,

“এই মেয়ে শোনো, মুখে মুখে একদম তর্ক করবে না। নতুন বউয়ের মুখে এত তর্ক মানায় না।”

নিধি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আপনার ভাইকেও এই কথাটা বলেছিলাম আপনাকেও বলছি। তর্ক পছন্দ না হলে আমার মতন মেয়েকে এনেছেন কেন আপু যে কথা বলতে জানে? বোবা মেয়েকে আনতেন। তাও আবার বেছে বেছে এমন একটা মেয়েকে ভাইয়ের বউ বানিয়ে এনেছেন যার মুখ বন্ধ থাকেই না। যাই হোক, যথেষ্ট মুছেছি ঘর বাড়ি। এখন আমার কোমর ব্যথা করছে। আর পারবো না।”

কথাটা বলে নিধি হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। শম্পা বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে নিধির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এভাবে অপমান করে গেল! শম্পাকে মুখের উপর বলে গেল পারবে না করতে! এই মেয়েটা নিজেকে ভাবে কি। আজ গহন ফিরুক। যদি ওর নামে নালিশ না করেছে তাহলে ওর নাম শম্পা না।

এই মেয়েটাকে আজকে নিজের জায়গা খুব ভালোভাবে দেখিয়ে দেবে। সেই সাথে মুখে মুখে তর্ক করার কি ফল হতে পারে সেটাও খুব ভালোভাবে বোঝাবে।

________

দুপুর দুটো লাগাদ গহন বাড়ি ফিরলো। একা না, সঙ্গে করে আবার নিজের ভাই সাবিত কে নিয়ে এসেছে। নিধির রান্নাবান্না তখন প্রায় শেষ। শুধু বাকি আছে গাজরের হালুয়াটা বানানো। ভাবলো আগে নিজের দেওরকে দেখে আসবে। তারপরে গাজরের হালুয়া বানাবে। কোথায় থেকে ফিরলো, কেমন দেখতে, আদৌও মানুষ কিনা নাকি আবার গহনের মতনই কোন দানব সেটা দেখতে হবে তো। এই ছেলে আসতে না আসতেই বাড়ির সবাই যে মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে তাতে তো মনে হচ্ছে অন্য কোন গ্রহ থেকেই বোধ হয় এলো।

বসার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো নিধি সাবিত কে। সাবিত তখন একে একে নিজের মা-বোনদেরকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার বাক্য বিনিময় করছে। নিধি দেখল পাশেই ঋতু দাঁড়িয়ে আছে অথচ ছেলেটা একবারও ঋতুর সাথে কথা বলল না। ঋতু যে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকেই হয়ত খেয়াল করেনি।

নিধি কে দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিতে দেখলো গহন। সবার সামনে জোরে করে ডেকে ওকে আর লজ্জায় ফেলতে চাইলো না। নিজেই উঠে গিয়ে হাত ধরে ওকে ভেতরে নিয়ে এলো। লোকটা যে হঠাৎ হঠাৎ করে কোথা থেকে এসে এভাবে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় নিধি বুঝে উঠতে পারে না। একবার অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনা। অসভ্য কোথাকার!

গহন ইশারায় নিধি কে দেখিয়ে সাবিত কে বলল,

“সাবিত, তোমার বড় ভাবি।”

বড় ভাবির পরিচয় পেতেই সাবিত এগিয়ে গেল নিধির দিকে। উচ্ছ্বসিত গলায় ভাবি বলে নিধি কে জড়িয়ে ধরতে চাইলো। নিধি তৎক্ষণাৎ কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে বলে উঠলো,

“জড়িয়ে ধরতে আসছেন কেন? এসব কোন ধরনের আচরণ? দূরে থাকুন।”

সাবিতের এমন কাজকর্মে গহন নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। তবে কোন লজ্জা কিংবা সংকোচ দেখা গেল না সাবিতের চোখে মুখে। বরং পুনরায় বেশ স্বাভাবিকভাবে উচ্ছ্বাসিত ভঙ্গিতে বলল,

“আরে ভাবি আমি তো তোমাকে ওয়েলকাম করছিলাম। আসলে তুমি যখন এই বাড়িতে এসেছিলে তখন তো ছিলাম না। আর তাছাড়া এটা তো খুব কমন ব্যাপার।”

নিধি রাশভারি গলায় বলল,

“আমার কাছে মোটেও কমন ব্যাপার না। কথা বলার হলে দয়া করে দূরে দাঁড়িয়ে বলবেন। আমার অস্বস্তি হয়।”

গহন বুঝলো পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করতে হবে। তাই সাবিত কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সবার সাথে সব ধরনের ব্যবহার করা যায় না সাবিত। তুমি এ ধরনের ব্যবহারে অভ্যস্ত হলেও নিধি না। ভবিষ্যতে আর এমন কাজ করবে না। যাইহোক, পরিচয় যেহেতু হয়ে গেছে ঘরে যাও। হাত মুখ ধুঁয়ে খেতে এসো।”

সাবিত আর কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। নিধিও হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঘরে চলে গেল। গহন বোধয় আন্দাজ করতে পারলো যে নিধি ভীষণ রেগে গেছে। সাবিতের আচরণটা তো গহনের নিজেরও পছন্দ হয়নি। তবে নিধির সামনে তেমন কিছু আর বলতেও পারল না। আর তাছাড়া সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছে। এখনই আর এত শাসন করার ইচ্ছেও হলো না গহনের। তাই ভাবলো সাবিতের হয়ে নাহয় নিজে ক্ষমা চেয়ে নেবে।

ঘরে গিয়ে দেখলো নিধি বিছানার উপর বসে পা দোলাচ্ছে। মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে মাথার ভেতরে আগুন জ্বলছে। তবে গহন কিভাবে যেন বুঝতে পারল। পরিচয়টা অল্প দিনের তবে মেয়েটাকে বুঝতে শিখছে ধীরে ধীরে গহন। আর এই মেয়ের মাথায় যে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টাই আগুন জ্বলে থাকে সেটাও খুব ভালো করে জেনে গেছে গহন।

ঘরের ভিতরে ঢুকে দরজাটা চাপিয়ে দিল। ছিটকিনি বন্ধ করলো না। নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে হালকা একটু কেশে ওর মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। নিধি গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

“শুনছি আমি। ভাইয়ের হয়ে ওকালতি করতে এসেছেন তাই তো?”

গহন অপরাধী গলায় বলল,

“আমি জানি সাবিত কাজটা ঠিক করেনি। তোমার অস্বস্তি হয়েছে। ওর হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি।”

নিধি মাথা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“কখনো নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন যে ভাইয়ের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছেন? আপনাদের পুরুষ জাতির আসলেই লজ্জা খুব কম।”

“কথা বাড়িও না নিধি। ক্ষমা চেয়েছি। ক্ষমা করলে বলো করেছো নয়তো বলো করোনি। কথা শেষ।”

“ওহ্ তার মানে আমি ক্ষমা না করলেও যায় আসে না। তাহলে ক্ষমা চাইতে এসেছেন কেন? মানে ধরুন আমি ক্ষমা করলাম না, আপনি ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টাও করবেন না?”

“আবারো বলছি কথা বাড়িও না। সাবিত একটু মিশুক স্বভাবের। আমি বলছি না ও যা করেছে ঠিক করেছে। ও এমন কাজে অভ্যস্ত। আমি তোমাকে এজন্য তোমার নিজের স্বভাবও বদলাতে বলছিনা। কিন্তু তোমায় বুঝতে হবে ও তো জানতো না তোমার স্বভাব কেমন। তাই প্রথমবার ভুল করে ফেলেছে। ক্ষমা করতে শেখো মানুষকে।”

নিধি তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না। মাথা নামিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলো। কে জানে এটা হয়তো রাগ কমানোর কোন কৌশল। হঠাৎ করেই আবার উঠে দাঁড়ালো। গহন চমকে দু কদম পিছিয়ে গেল। নিধি গহনার দিকে দু কদম এগিয়ে গিয়ে বলল,

“ঠিক আছে। আপনার দেওয়া এই শিক্ষাটা গ্রহণ করলাম। ক্ষমা করতে শিখবো আমি। আপনাকেও একটা শিক্ষা দেই। আমাকে যেমন ক্ষমা করতে শিখতে বললেন, ঠিক তেমনি আপনি ক্ষমা চাইতে শিখুন। অন্যের ভুলের জন্য না নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে শিখুন।”

কথাটা বলে নিধি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গহনের মনে হলো নিধি সেদিনকার সিনথিয়ার চুরির ঘটনাটা নিয়ে ওকে ক্ষমা চাওয়ার কথা হয়তো বলে গেল। গহনের হঠাৎ করে মনে হলো আসলেই বোধহয় ওর ক্ষমা চাওয়াটা উচিত ছিল সেদিন। তবে কেন যে চাইতে পারল না কে জানে।

তবে গহন ঠিক করলো আজ ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করবে নিধির কাছে। এই ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি গুলো দূর করতে হবে। নয়তো সম্পর্কটা আর স্বাভাবিক করা সম্ভব না।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প