রক্তের সম্পর্কের আড়ালে যখন লোভের বিষাক্ত ছোবল নিঃশব্দে এক মহীরুহকে গুঁড়িয়ে দেয়, তখন এক অদৃশ্য দেয়ালের ওপারে হারিয়ে যায় দুটি হৃদয়ের আজন্ম বন্ধন। দীর্ঘ এক দশক ধরে সত্যকে মিথ্যা আর ভালোবাসাকে ঘৃণার আবরণে ঢেকে রেখে যে কুয়াশাচ্ছন্ন নাট্যমঞ্চ সাজানো হয়েছিল, সেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস ছিল বিষাক্ত এক ষড়যন্ত্রের দাস। তবে ছাইচাপা অভিমান আর ধ্বংসস্তূপের নিচেও যে চকমকি পাথর লুকিয়ে থাকে, সেই রহস্যের পর্দা ছিঁড়ে চরম আঘাত হানতেই শুরু হয় দুই পোড় খাওয়া আত্মার অস্তিত্বের চরম পরীক্ষা।
"দুজনে" গল্পটি লেখিকা সানা শেখ-এর অনুমতিক্রমে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে গল্পের বাহার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
📖 গল্প সম্পর্কে
'দুজনে' গল্পটি সানা শেখের এক অসাধারণ পারিবারিক টানাপোড়েন ও সম্পর্কের গভীরতার আখ্যান। গল্পের সূচনাতেই দেখা যায় শৈশবে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জাওয়াদ ও সাইয়ারা পরিবারের নোংরা রাজনীতির নির্মম শিকার হয়। পৈতৃক সম্পত্তির লোভ এবং মিথ্যা চক্রান্তের কারণে দীর্ঘ এক দশক ধরে তারা পরস্পরের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও অভিমান পুষে রেখে আলাদা ছিল। পরবর্তীতে পরিবারের দেনা ও বিভিন্ন স্বার্থের জেরে পঙ্গু জাওয়াদ ও সাইয়ারাকে জোরপূর্বক আবার এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা হয়। শুরু থেকেই দুজনের মধ্যকার তিক্ত বাক্যবাণ, চাপা অভিমান ও অবদমিত যন্ত্রণা গল্পটিতে এক চরম মানসিক উত্তেজনা বজায় রাখে। কাহিনী যতই এগোয়, ততই তাদের পরিবারের চরম কুৎসিত রূপ, সম্পর্কের জালিয়াতি এবং ষড়যন্ত্রের জটিল জাল পরতে পরতে উন্মোচিত হতে থাকে। জাওয়াদ ও সাইয়ারা যখন জানতে পারে তাদের এতদিন ধরে পরস্পরের নামে মিথ্যা কুৎসা ও ছবি বানিয়ে ভুল বোঝানো হয়েছিল, তখন তাদের মধ্যকার ভাঙন এক তীব্র বেদনাবিধুর রূপ নেয়। পরিবারের সেই বিষাক্ত শেকল ও সব আঘাত উপেক্ষা করে শেষমেশ তারা নিজেদের ভালোবাসার সত্যতাকে আঁকড়ে ধরে আলাদা নীড় বাঁধে। এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো পারিবারিক স্বার্থপরতার নগ্ন চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি মানুষের খাঁটি ভালোবাসার অনমনীয় শক্তির রূপায়ণ। তীব্র আবেগ, চরিত্রের দৃঢ়তা ও বাস্তবমুখী সংঘাতের চমৎকার মেলবন্ধন গল্পটিকে অনন্য ও অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে।
📝 সম্পাদকীয় মন্তব্য
প্রিয় পাঠক, সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু যখন নিজের পরিবার হয়ে ওঠে, তখন জীবনের গতিপথ কতটা বিষাক্ত হতে পারে—তারই এক নিখুঁত দর্পণ সানা শেখের উপন্যাস 'দুজনে'। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা অর্থলিপ্সা কীভাবে রক্তের পবিত্র বন্ধনকে কলুষিত করে, গল্পের পাতায় পাতায় তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে উন্মোচিত হয়েছে। শৈশবের নিষ্পাপ ভালোবাসাকে বলি দিয়ে স্বজনদের তৈরি করা মিথ্যা অপবাদ ও চক্রান্তের বেড়াজালে আবদ্ধ দুই তরুণ প্রাণের লড়াই আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দেয়। চরম মানসিক দূরত্ব আর একরাশ ঘৃণার আড়ালে জাওয়াদ ও সাইয়ারার যে অবদমিত ব্যাকুলতা লুকিয়ে ছিল, তা গল্পের প্রতিটি পরতে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। স্বার্থান্ধ পরিবারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকে প্রকাশ্যে আনার যে সাহস তারা দেখিয়েছে, তা আমাদের প্রচলিত পারিবারিক ভণ্ডামির গালে এক সজোর চপেটাঘাত। হুইলচেয়ারে বন্দি জাওয়াদের পৌরুষদীপ্ত আত্মসম্মানবোধ এবং আত্মমর্যাদায় বলীয়ান সাইয়ারার অনমনীয় তেজ চরিত্র দুটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। লেখক নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন যে, অন্ধ আক্রোশ আর সম্পত্তির নেশা সাময়িকভাবে জীবন তছনছ করতে পারলেও সত্য অনুভূতির কাছে হার মানতে বাধ্য। ভুল বোঝাবুঝির আঁধার পেরিয়ে ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে এই জুটির নবসূচনা পাঠকদের মনে গভীর তৃপ্তি ও আশার আলো জোগায়। জীবনের কঠিন টানাপোড়েন ও সম্পর্কের জটিল সমীকরণ বুঝতে চাওয়া প্রতিটি পাঠকের জন্য গল্পটি এক অসাধারণ ও মননশীল পাঠ-অভিজ্ঞতা। হৃদয়স্পর্শী এই পারিবারিক আখ্যানটি আপনাদের অন্তরে দীর্ঘস্থায়ী দাগ রেখে যাবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।