“আপনি তো খুব ভালো করেই জানেন আমি কী বলতে চাইছি। জানার পরও এত নাটক করার কী আছে?”
জাওয়াদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই নাটক না করে কী বলতে চাইছিস ক্লিয়ার করে বল।”
সাইয়ারা রাগে ফেটে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল।
“এত বছর দেশের বাইরে থেকে আমাকে ভুলে অন্য মেয়ের সঙ্গে রঙ্গলীলা করে এখন আবার সেসব আমার মুখে বলাতে চাইছেন যেন আরও বেশি করে পোড়াতে পারেন? কোনো লাভ নেই, আমি আর পুড়বো না।”
জাওয়াদ হতবিহ্বল হয়ে সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ে কী বলছে এসব? সে আবার কবে তার বউকে ভুলে অন্য মেয়ের সঙ্গে রঙ্গলীলা করল?
“মাথা ঠিক আছে তোর? কি বলছিস বুঝে বলছিস?”
“না বুঝে বলবো কেন? আমার মাথা একদম ঠিক আছে।”
জাওয়াদও রাগে ফেটে পড়ে বলল,
“আমার জীবনে তুই ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে ছিল—এটা তোর মাথায় ঢুকল কীভাবে? তুই নিজে আমাকে ঠকিয়ে এখন আবার আমার উপর মিথ্যা দোষারোপ করছিস কোন সাহসে?”
সাইয়ারা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি মিথ্যা দোষারোপ করছি আপনার ওপর? আমি আপনাকে ঠকিয়েছি? শুনেছি চোরের মায়ের বড়ো গলা, এখন দেখছি ঠকবাজেরও বড়ো গলা। লন্ডনে গিয়ে সুন্দরী মেয়ের সাথে ঘুরে বেড়ানো, রেস্টুরেন্টে গিয়ে সেলফি তোলা, আর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া সব মিথ্যা? এসব করার সময় আপনার এই নীতিবাক্য কোথায় ছিল, জাওয়াদ শিকদার? নিজের সাত খু’ন মাফ করে এখন আমাকে জান্নাত আর জাহান্নামের ভয় দেখাতে এসেছেন?”
সাইয়ারার কথা শুনে জাওয়াদ স্তব্ধ হয়ে গেলো। মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। কিছু সময়ের জন্য শ্বাস নিতেও ভুলে গেলো। তার এমন রিঅ্যাকশন দেখে সাইয়ারা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“ভালোই তো নাটক করতে জানেন দেখছি! এমন ভাব করছেন যেন এসব আপনি করেনই নি।”
জাওয়াদ নিজেকে সামলে আঙুল তুলে বলল,
“কী বললি তুই? লন্ডনে আমি কী করেছি?”
“কী করেছেন সেটা মাত্র তিন বছরেই ভুলে গেছেন?”
“তোকে কে বলেছে লন্ডনে আমি এসব করেছি?”
“আপনার মা-বাবা, কাকা—আপনার পুরো পরিবার বলেছে। শুধু বলেনি তারা প্রমাণও দেখিয়েছিল আমাকে। আমি নিজের চোখে দেখেছি আপনি ওই মেয়েকে চুমু খাচ্ছেন। আপনি নিজের মুখেই তো বলেছিলেন আমাকে তালাক দিয়ে আপনার প্রেমিকাকে বিয়ে করবেন। এত দ্রুত সব ভুলে গেলেন কীকরে? নাকি নাটক করছেন ভুলে যাওয়ার?”
জাওয়াদের চেহারা রক্ত শূন্য হয়ে গেছে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাইয়ারার দিকে। দুজনেই চুপ হয়ে যাওয়ায় রুমের ভেতর নীরবতা নেমে এসেছে। দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। সাইয়ারার চোখে পানি টলটল করছে। জাওয়াদের সামনে নিজেকে যতই শক্ত রাখার চেষ্টা করুক এখন পারছে না। মুহূর্তের মধ্যে তার টলটলে চোখজোড়া থেকে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। সাইয়ারা চোখের পানি মুছে আঙুল তুলে জড়ানো গলায় বলল,
“আমি আপনাকে জীবনেও মাফ করব না। শেষ বিচারের দিন আমি আপনাকে ছাড়বো না। ওইদিন আমাকে ঠকানোর প্রতিটা হিসাব আমি নেব। আপনার জন্য আমি যত চোখের পানি ফেলেছি সব কিছুর হিসাব নেব। আপনাকে দেখলেও এখন ঘৃণা লাগে আমার। অথচ এই আমিই কি-না আপনাকে ভালোবেসে পাগলের মতন কাঁদতাম!”
কথাগুলো বলেই জাওয়াদের সামনে থেকে সরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল সাইয়ারা। পেছন থেকে জাওয়াদ বলল,
“সাই, দাঁড়া।”
সাইয়ারার পা দুটো থেমে গেলো।
“আব্বু-আম্মু সত্যিই তোকে এই কথা বলেছে?”
“মিথ্যা বলবো কেন আপনাকে?”
“তুই আমার কাছ থেকে কিছু না শুনে বাড়ির মানুষের মুখের কথা বিশ্বাস করে নিলি?”
“মুখের কথা বিশ্বাস করিনি বলেই তো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—যেন আর অবিশ্বাস না করি।”
“কী দেখিয়েছে?”
সাইয়ারা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আপনি অন্য মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছেন। আরও কিছু শুনতে চান?”
“আমি কোনো মেয়েকে চুমু খাচ্ছি এমন ছবি কে দেখিয়েছে তোকে?”
“আপনার বাপ-চাচাই দেখিয়েছে।”
“আমার যেদিন অ্যাকসিডেন্ট হলো সেদিন তুই কোথায় ছিলি?”
“সিলেটে, বড়ো ফুপুর বাড়িতে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“ওইদিন তুই তোর রুমে ছিলি না?”
“না। আপনি যেদিন এলেন তার আগের দিনই তো সিলেট চলে গিয়েছিলাম।”
“আব্বু-আম্মু আর বাড়ির সবাই তোকে বলেছে আমার গার্লফ্রেন্ড আছে, ওই মেয়ের আর আমার ছবিও তোকে দেখিয়েছে—যেখানে আমি ওই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুমুও খাচ্ছি, আমি তোকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করব সেটাও বলেছে, তাই তো?”
সাইয়ারা লম্বা করে শ্বাস টেনে নিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ।”
একে একে দুই মিলাতে খুব বেশি সময় লাগল না জাওয়াদের। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি মুহূর্তের মধ্যে পুরো সমীকরণটা মিলিয়ে নিলো। সে বুঝতে পারল, তাদের দুই পরিবার নিজেদের শত্রুতার জের ধরে বড়ো একটা নোংরা চাল চেলেছিল, যা দিয়ে উনারা তাদের দুজনের মন থেকে একে অপরকে চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। সে ভাবতো সাইয়ারা তাকে ঠকিয়েছে, আর সাইয়ারা ভেবে আসছে সে তাকে ঠকাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা একে অপরকে ঠকাচ্ছে না, বরং তাদের পরিবারই তাদের ঠকাচ্ছে তাদের দুজনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করে।
সাইয়ারার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাসল জাওয়াদ, অদ্ভুত তার হাসি। তাকে এভাবে হাসতে দেখে খ্যাপাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাইয়ারা। মুহুর্তের মধ্যেই নিজের মাথার চুল দুই হাতে খামচে ধরল জাওয়াদ। প্রচণ্ড ক্ষোভে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। তার চিৎকার শুনে হকচকিয়ে গেলো সাইয়ারা। ভয় পেয়ে পিছিয়েও গেলো কিছুটা।
জাওয়াদ থামল। মাথার চুলও ছেড়ে দিলো।
হুইল চেয়ার নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। কি হলো বুঝতে না পেরে পেছন থেকে জাওয়াদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল সাইয়ারা। লোকটা পাগল টাগল হলো নাকি হুট করে? জাওয়াদ কোথায় গেলো আর কী করতে গেলো দেখার জন্য সাইয়ারা নিজেও রুম থেকে বেরিয়ে এলো। জাওয়াদ ড্রয়িংরুমের মাঝখানে বসে আছে হুইল চেয়ারে। জামশেদ শিকদার আর জামিল শিকদার বাদে বাড়ির ছোটো বড়ো সবাই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত আছে।
হোসনে আরা ছেলেকে আবার একই প্রশ্ন করলেন।
“কী হয়েছে, জাওয়াদ? চিৎকার করলি কেন এভাবে? কী নিয়ে তর্কাতর্কি করছিলি দুজনে?”
জাওয়াদ মায়ের কথার জবাব দিলো না। ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোর বাপ-চাচাকে কল করে বাড়িতে আসতে বল। এই মুহুর্তেই যেন বাড়িতে আসে। আর সরোয়ার শিকদারকেও আসতে বল।”
জাওয়াদের কথা আর কথা বলার ধরন দেখে শকড বাড়ির সবাই। হোসনে আরার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো ছেলের চোখে চোখ পড়তেই। তিনি দ্বিতীয়বার আর ছেলের চোখের দিকে তাকাতে পারলেন না। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই জাওয়াদ কর্কশ গলায় বলল,
“আপনি ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন? একদম নড়বেন না এখান থেকে।”
হোসনে আরার মনে হলো উনার বুকের ভেতর কেউ ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। জাওয়াদ আজকের আগে এভাবে কোনোদিন উনার সঙ্গে কথা বলেনি। জাবিনকে এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বজ্রকণ্ঠে ধমকে উঠল জাওয়াদ।
“এই, কী বলেছি তোকে? এখনো দাঁড়িয়ে কেন এভাবে? কল কর তোর বাপ-চাচাকে, বল এই মুহূর্তেই বাড়িতে আসতে।”
জাবিন মিনমিন করে বলল,
“এভাবে কথা বলছো কেন? আব্বু আর চাচ্চু কী তোমার বাপ-চাচা না?”
“না।”
উপস্থিত সবাই বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল জাওয়াদের দিকে। রাগে রীতিমতো কাঁপছে জাওয়াদ। হুইল চেয়ারের হাতল ধরে রাখা হাত দুটোর রগ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। কপাল আর ঘাড়ের রগগুলোও ফুলে উঠেছে। চোয়াল শক্ত, চাউনি ভয়ংকর—যেন সবকিছু ধ্বংস করে দিবে।
জাওয়াদকে এই রূপে দেখে বুক কাঁপতে শুরু করেছে সাইয়ারার। জাওয়াদ এরকম করছে কেন? জাওয়াদের সত্যিটা তাকে বলে দিয়েছে বলে এমন করছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
“কল কর।”
জাওয়াদের বজ্রকণ্ঠে উপস্থিত সবাই কেঁপে উঠল আরও একবার। জাবিন দ্রুত কল করল বাবার ফোনে। রিসিভ হতেই বলল,
“আব্বু, দ্রুত বাড়িতে আসো তুমি আর চাচ্চু।”
ওপাশ থেকে কি বলল শোনা গেলো না। জাবিন বলল,
“ভাইয়া ভয়ংকর রকমের রেগে আছে। তোমাদের দুজনকে এই মুহূর্তে বাড়িতে আসতে বলেছে।”
“—
“জানি না কী হয়েছে, তোমরা দ্রুত আসো।”
“—
“আচ্ছা রাখছি।”
“সরোয়ার শিকদারকে কল কর।”
জাবিন বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকাল।
“চাচ্চুর নাম্বার নেই আমার কাছে।”
“কার কাছে আছে নিয়ে কল কর দ্রুত।”
জাবিন সাইয়ারার দিকে তাকাল। কাছে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“সাইয়ারা, তোর কা—
জাবিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই গর্জন করে উঠল জাওয়াদ। বেচারা জাবিন কী ভুল করেছে বুঝতে না পেরেও ভয়ে ভয়ে তাকাল বড়ো ভাইয়ের দিকে।
“ভাবি হয় তোর। জীবনে যেন তৃতীয়বার এই কথা মনে করিয়ে দিতে না হয়।”
জাবিন দ্রুত মাথা নাড়ল। সে ভুলে সাইয়ারার নাম ধরে ডেকে ফেলেছে। জাওয়াদ তাকে গতকাল সকালেই বলেছিল সাইয়ারাকে যেন নাম ধরে না ডাকে। গত পরশু রাতে সাইয়ারার সঙ্গে বাজে আচরণ করার কারণে গতকাল সকালে জাহানারাকে যেই ধমক দিয়েছিল জাওয়াদ তারপর জাহানারা সাইয়ারার দিকে চোখ তুলেও আর তাকায়নি। রাম ধমক খেয়ে বেচারির গতকাল দুপুরেই জ্বর চলে এসেছে।
জাবিন সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাবি, চাচ্চুর নাম্বার আপনার মুখস্থ নেই?”
সাইয়ারা জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে থেকেই মাথা নাড়ল। জাবিন নিজের ফোনটা এগিয়ে ধরে বলল,
“কষ্ট করে নাম্বারটা তুলে দিন।”
সাইয়ারা ফোনটা হাতে নিয়ে বাবার নাম্বার তুলে দিলো। জাওয়াদ বলল,
“সাইয়ের মা আর ভাইদেরও নিয়ে আসতে বলবি।”
“আচ্ছা।”
সাইয়ারা শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকাল। উনার চেহারা শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে, সঙ্গে উম্মে হাবিবা আর সামিউল শিকদারেরও।
সবাই এত ভয় পাচ্ছে কেন?
জাওয়াদ ঘেমে নেয়ে জবজবে হয়ে গেছে। সে গরম সহ্য করতে না পেরে হুইল চেয়ার নিয়ে সোফার কাছে এগিয়ে এলো। মুখ ওপরের দিকে তুলে চোখ বন্ধ করে বসে রইল।
আধা ঘণ্টার মধ্যে বাড়িতে হাজির হলো সবাই। জাওয়াদ এখনো ওপরের দিকে মুখ করে বসে আছে চোখ বন্ধ করে। সাইয়ারা রুমে চলে গেছে। এদের নাটক দেখার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই তার নেই।
বাকিরা বসে আছে সোফায়। সামিউল শিকদারের প্রেশার উঠছে আর নামছে। উনি বুঝতে পেরে গেছেন কাহিনী কী ঘটেছে। উনি আগেই বলেছিলেন দুজনকে সবকিছু জানিয়ে দিয়ে আবার বিয়ে পড়াতে, কিন্তু জামশেদ শিকদার রাজি হননি। তিনি বলেছেন নিজেরা যদি কখনো জানতে পারে জানবে নয়তো সারা জীবন না জেনেই পার করবে। যেহেতু দুজন একে অপরকে এখনো ভালোবাসে তাই এক ছাদের নিচে থাকতে থাকতে সব ঠিক হয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
হোসনে আরা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন ছলছল চোখে। বাকিরাও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
জামশেদ শিকদার বড়ো ছেলের দিকে তাকালেন। বুক ধড়ফড় করছে উনার। ঘটনা কি আচ করতে পারছেন বোধহয় কিছুটা। ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বললেন,
“জাওয়াদ, কী হয়েছে?”
জাওয়াদ সোজা হয়ে বসে হুইল চেয়ার ঘুরালো। তার চোখজোড়ায় র’ক্ত উঠে লাল টকটকে হয়ে গেছে। বড়ো বড়ো চুল দাড়ি, লাল লাল চোখ, আর কঠিন চেহারায় জাওয়াদকে দেখতে ভয়ংকরই লাগছে। সে বাবার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে উপস্থিত সকলের দিকে নজর বুলাল। সাইয়ারাকে দেখতে না পেয়ে জেসমিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সাই কোথায়?”
সাই বলতে জাওয়াদ কাকে বোঝাচ্ছে এটা বুঝতে কিঞ্চিৎ সময় লাগল জেসমিনের। বুঝতে পেরে বলল,
“ভাবি তো রুমে চলে গেছে।”
“যা ডেকে নিয়ে আয়।”
জেসমিন মাথা নেড়ে জাওয়াদের রুমের দিকে এগোল। সাইয়ারা এলো কয়েক মিনিট পর। বাবা-মা আর ভাইদের দিকে তাকিয়ে সোফার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
জাওয়াদ বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“আমাকে মিথ্যা কথা কেন বলেছিলেন?”
জামশেদ শিকদার ছেলের কথার মানে বুঝতে পেরেও কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে না বোঝার ভান করে বললেন,
“কী মিথ্যা বলেছি?”
“কী মিথ্যা বলেছেন বুঝতে পারছেন না এখন? আমার প্রেমিকা কোথায় যাকে আমি জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলাম?”
জামশেদ শিকদারের চেহারা চুপসে গেলো। বাকিদের চেহারায়ও আঁধার নেমে এসেছে। সাইয়ারা চোখজোড়া সরু করে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে আছে। জাওয়াদ সরোয়ার শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার মেয়ের প্রেমিক কোথায়? যান তাকে নিয়ে আসুন।”
জাওয়াদের কথা শুনে সাইয়ারার মাথায় যেন বাজ পড়ল। ফোস করে উঠে আঙুল তুলে শাসিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলুন! কী বলছেন এসব?”
জাওয়াদ সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“জান, আস্তে। আমার কথা শেষ করতে দে আগে।”
সাইয়ারার চোখজোড়া যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে এখন। সে ঠিক শুনছে তো? জাওয়াদ তাকে জান ডাকলো?
জাওয়াদ বাপ-চাচা আর শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্যিটা এবার বলে ফেলুন।”
কেউ কিছু বলছে না। সকলের চেহারা ফাটা বেলুনের মতন চুপসে রয়েছে। সাইয়ারা বুঝতে পারছে না জাওয়াদ কোন সত্য বলতে বলছে।
“কী হলো? কেউ কথা বলছেন না কেন? আমার প্রেমিকা আছে অথচ আমি নিজেই জানি না। আমি তাকে নিয়ে ঘুরতে গেছি, রেস্টুরেন্টে খেতে গেছি, জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছি, আমি আমার বউকে তালাক দিয়ে প্রেমিকাকে বিয়ে করব—এই গল্প আমার বউ সহ বাড়ির সবাই জানতো শুধু আমিই জানতাম না। বাহ দারুন!”
সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“জান, আরও একটা কাহিনী আছে যেটা শুনলে তুই সারপ্রাইজড হয়ে যাবি। তোরও একটা প্রেমিক আছে যার কথা আমি সহ আমাদের দুজনের পরিবার জানে, শুধু তুই জানিস না। বিষয়টা দারুন না?”
সাইয়ারা বিস্ফোরিত চোখে সকলের দিকে নজর বুলিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকাল আবার। জাওয়াদের ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেছে। সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কথা বলছেন না কেন, মিস্টার জামশেদ শিকদার? আমার বউকে কেন বলেছিলেন আমার প্রেমিকা আছে আর আমি তাকে তালাক দিয়ে প্রেমিকাকে বিয়ে করব?”
জামশেদ শিকদার কথা না বলে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোন মুখে বলবেন কথাগুলো? লোভে অন্ধ হয়ে আর জেদের বশে ভুল তো তিনি করেই ফেলেছেন। জাওয়াদ সরোয়ার শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি নিজের মেয়ের নামে এত বড়ো মিথ্যা কেন বলেছিলেন? নিজের মেয়ের চরিত্রে দাগ লাগাতে বুক কাঁপেনি আপনার? সবাই এখন মুখে কুলুপ এঁটেছেন কেন?”
সরোয়ার শিকদার নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে বললেন,
“আমার মেয়ের চরিত্রে দাগ লাগাতে আমার বুক অবশ্যই কেঁপেছিল, কিন্তু আমার মেয়ের চরিত্রে দাগ প্রথম তোমার বাড়ির মানুষই লাগিয়েছিল। তুমি যখন কল করে আমাকে জিজ্ঞেস করলে সাইয়ারার প্রেমিক আছে কি-না তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম তোমার বাড়ির মানুষ সাইয়ারার নামে মিথ্যা বলেছে তোমার কাছে। আমি শুধু তোমার বাড়ির মানুষদের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়েছিলাম।”
“কেন মেলালেন? সত্যিটা বললেই তো পারতেন।”
“আমি চাইনি সাইয়ারাকে এই বাড়িতে পাঠাতে।”
“কেন চাননি? আমার বাপ-দাদা আপনাদের টাকা মে’রে খেয়েছিল, আর তাদের জন্য আপনার বাবা মা’রা গেছেন বলে?”
“হ্যাঁ। এত কিছু ঘটার পর কে চাইবে সেই বাড়িতে মেয়ে দিতে?”
“দোষ করলো এই মানুষগুলো, শাস্তি এত বছর ধরে আমি আর সাই কেন পাচ্ছি? দোষ তো আমরা করিনি তাহলে শাস্তি আমরা কেন পেলাম?”
সরোয়ার শিকদার কথা বললেন না। জাওয়াদ বাবার দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“আপনার মুখে কী গ্লু আটকে গেছে? কথা বলছেন না কেন? সাইকে কেন বলেছিলেন আমার প্রেমিকা আছে? ফেইক ছবি বানিয়ে ওকে কেন দেখিয়েছেন?”
জামশেদ শিকদার মুখ তুলে গম্ভীর গলায় বললেন,
“আমি চাইনি সাইয়ারাকে এই বাড়িতে তুলতে। তুই ওকে ছাড়বি না, সাইয়ারাও তোকে ছাড়বে না তাই মিথ্যা বলেছিলাম আর—
“আর এডিট করে ছবি বানিয়ে ওকে দেখিয়ে বলেছিলেন ওই মেয়ে আমার প্রেমিকা আর তাকে আমি বিয়ে করব।”
জামশেদ শিকদার কথা বললেন না। জাওয়াদ চুপ করে বসে রইল। সে আসলে গুছিয়ে কিছু বলতে পারছে না। সে অনেক কষ্টে নিজেকে এমন শান্ত রেখেছে। তার তো ইচ্ছে করছে বাড়ির সবাইকে খু’ন করে ফেলতে। এরকম পরিবারও হয়? এরা নিজেদের শত্রুতার জের ধরে তাদের দুজনের কতগুলো বছর নষ্ট করে দিলো! এই যে সে স্বাভাবিক মানুষের মতন হাঁটতে চলতে পারে না, এটাও তো এই পরিবারের মানুষগুলোর জন্যই।
সরোয়ার শিকদারের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“তিন বছর আগে আমি যখন সাইকে নিতে গেলাম তখন সাই কোথায় ছিল?”
“সিলেট।”
“সাই যদি সিলেটেই ছিল তবে আমাকে কেন বলেছিলেন সাই রুমের ভেতরে রয়েছে?”
“মিথ্যা বলেছিলাম যেন তুমি সাইয়ারাকে নিতে আর না যাও।”
“আমার অত আহাজারি সেদিন আপনাকে একটুও ছুঁতে পারেনি? একটু মানবিকতা তো দেখাতেই পারতেন, তা না করে উলটো ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। সেদিন যদি আমি ম’রে যেতাম তবে আজ কী হতো বলুন তো? আমিও সত্যিটা জানতে পারতাম না, সাইও কোনোদিন জানতে পারতো না। ভুল বুঝাবুঝি দিয়েই আমাদের এক জনম শেষ। সাই যদি কোনোভাবে জেনেও যেত তাতেও কোনো লাভ হতো না উলটো ও আরও বেশি কষ্ট পেত, কারণ তখন তো আমি থাকতামই না। ভাগ্যিস সেদিন মৃ’ত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলাম।”
একটু থেমে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুরু থেকে বলুন যা যা মিথ্যা বলেছেন এখন পর্যন্ত আমাকে আর সাইকে।”
জামশেদ শিকদার মাথা নিচু করে একে একে বলতে লাগলেন সব। তিনি বুঝতে পেরেছেন কোনো কিছু লুকিয়ে আর কোনো লাভ নেই এখন। আর সত্য যে সারা জীবন লুকিয়ে রাখা যায় না এটাও জানেন। আজ না-হয় কাল সত্যিটা তাকে বলতেই হতো।
জামশেদ শিকদারের বলা শেষ হতেই সরোয়ার শিকদারকেও সব কিছু বলতে বলল জাওয়াদ। সরোয়ার শিকদারও মাথা নিচু করে বলতে লাগলেন। অপরাধ বোধে মেয়ের দিকে আর তাকাতে পারলেন না। সাইয়ারা কেমন করে তাকিয়ে আছে উনার মুখের দিকে! উনি সব কিছু বলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু এত দ্রুত বলতে হবে ভাবেননি। ভেবেছিলেন অন্তত কয়েক মাস তো পার হবেই, অথচ দুজনে একসঙ্গে আছেই গত পরশু রাত থেকে।
সরোয়ার শিকদার থামলেন। জাওয়াদ তাকাল সাইয়ারার দিকে। সাইয়ারার চোখেমুখে অবিশ্বাস, টপটপ করে চোখজোড়া থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটা কাঁপছে থরথর করে। জাওয়াদের মুখের দিকে তাকাতেই জাওয়াদ চোখে চোখ রেখে বলল,
“জানিস তো, জান… আমি তোকে ভালোবাসি, তুইও আমাকে ভালোবাসতি। আমাদের ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না, কমতি ছিল আমাদের পরিবারের মানুষগুলোর ভালোবাসায় আর মনুষ্যত্বে। ওরা তোকেও মিথ্যা বলেছে, আমাকেও মিথ্যা বলেছে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই—তুই মিথ্যাকে সত্যি ভেবে আমাকে ঘৃণা করেছিস, আর আমি মিথ্যাকে সত্যি ভেবেও তোকে ভালোবেসে গেছি। তুই ছাড়া আমার জীবনে কোনো নারী কোনোদিন ছিল না, আজও নেই, আর কোনোদিন আসবেও না। আমি তোর ছিলাম, আছি, আর থাকবোও। তুই না থাকলেও তোর জায়গা কেউ কোনোদিন নিতে পারবে না, কারণ আমি শুধু তোকেই ভালোবাসি!”
সাইয়ারা আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে। অবিশ্বাস্য চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল আরও কিছুক্ষন। তারপর জাওয়াদের মুখের দিকে। বিশ বছরের একটা মেয়ে, নিজেকে আর কত শক্ত করে রাখবে? হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। বাবার এই বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে পারল না সে, সোফার সঙ্গে বাড়ি মা’রল নিজের মাথা। তারপর আবার মা’রল, আবারও মা’রল। ঠাস ঠাস শব্দ ড্রয়িংরুমের দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খেতে লাগল।