আইনজীবীর কথা শুনে জাওয়াদ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“না। তেমন কোনো প্রমাণ আমার হাতে নেই। যে ফোনে কিছু মেসেজ আর ভয়েস রেকর্ড ছিল, সেই ফোনটাও নষ্ট হয়ে গেছে।”
ওপাশ থেকে আইনজীবী শান্ত গলায় বললেন,
“সেক্ষেত্রে বিষয়টা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ এ ধরনের মামলায় মৌখিক বক্তব্যের চেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাক্ষী অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু সাক্ষ্যের ওপর ভর করে ডিজিটাল জালিয়াতি বা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র প্রমাণ করা সহজ নয়।”
জাওয়াদ হতাশ হলো আইনজীবীর কথা শুনে।
“আঙ্কেল, আমরা কী সাক্ষী নই?”
“হ্যাঁ, সেটা আদালত বিবেচনা করবেন। তবে যদি কোনো মেসেজ, ভয়েস রেকর্ড, ছবি, ভিডিও, কল রেকর্ড, বা অন্য কোনো ডকুমেন্টারি এভিডেন্স পাওয়া যায়, তাহলে মামলার অবস্থান অনেক শক্ত হবে। তুমি আরেকবার ভালো করে ভেবে দেখো। যদি কোনো সূত্র বা প্রমাণ খুঁজে পাও, আমি অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করব।”
একটু থেমে আবার বললেন,
“আর একটা বিষয় আছে। তোমার কথা মতো যখন এসব ঘটনা শুরু হয়, তখন তোমরা দুজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলে। তোমাদের বিয়েটাও হয়েছিল শুধু ইসলামী শরীয়াহ্ অনুযায়ী। আর এই বিয়ের সাক্ষীয় শুধু তোমাদের দুজনের পরিবার। তারা নিশ্চয়ই নিজেদের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দিবেন না। আর তোমাদের বিয়ে যেই ইমাম পড়িয়েছেন তিনি তো আরও সাক্ষী দিবেন না।”
জাওয়াদ চরম হতাশ গলায় বলল,
“ওরা আমাদের এতগুলো বছর এভাবে নষ্ট করে দিয়ে পার পেয়ে যাবে!”
“আমি সবকিছু বুঝতে পারছি, জাওয়াদ। কিন্তু শুধু অন্যায়ের শিকার হলেই মামলা জেতা যায় না। আদালতে সেই অন্যায় প্রমাণও করতে হয়। ভুয়া ছবি, মিথ্যা অপবাদ কিংবা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, এসবের পক্ষে শক্ত প্রমাণ না থাকলে মামলাটা দুর্বল হয়ে যাবে। উল্টো সময়, অর্থ আর মানসিক শক্তি—সবই নষ্ট হতে পারে।”
“তাহলে আমাদের আর কিছুই করার নেই?”
“আমি সেটা বলছি না। যদি ভবিষ্যতে কোনো ছবি, মেসেজ, ভয়েস রেকর্ড, প্রত্যক্ষ সাক্ষী বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাও, তখন বিষয়টা নতুন করে দেখা যাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আবেগের বশে মামলা শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। প্রমাণ ছাড়া মামলা করলে আদালতে খারিজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”
একটু থেমে শ্বাস টেনে নিয়ে আবার বললেন,
“জাওয়াদ, তোমার আর সাইয়ারার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আদালত আবেগ নয়, প্রমাণ দেখবে। এত বছর আগের ঘটনার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যদি তোমার হাতে না থাকে, তাহলে এই মুহূর্তে মামলা করার পরামর্শ আমি দেবো না।”
“আচ্ছা আঙ্কেল, বুঝতে পেরেছি আমি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান সময় আমাকে দেওয়ার জন্য। ভালো থাকবেন।”
“তোমরাও ভালো থাকো।”
কল কেটে দিলো জাওয়াদ। সাইয়ারা এতক্ষণ ধরে জাওয়াদ আর আইনজীবীর কথা শুনছিল। কল কেটে দিতেই শান্ত গলায় বলল,
“বাদ দাও এসব, কিচ্ছু করতে পারবে না শুধু শুধু হয়রান হবে।”
“বাদ দিতে বলছিস? ওরা আমাদের সঙ্গে এত কিছু করল আর আমি এমনি এমনি ছেড়ে দেবো?”
“কী করবে? কোনো প্রমাণ কী আছে? নেই তো। ছাড়ো এসব। অনেক কষ্ট পেয়েছি এই ছোটো জীবনে, আর কোনো অশান্তি চাই না, এখন একটু শান্তি চাই।”
জাওয়াদ হাত থেকে ফোনটা রেখে সাইয়ারার ওপর ঝুঁকে এলো। সাইয়ারা ড্যাবড্যাব করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চোখ সরিয়ে নিলো। গতকালও এই সময়ে রেগেমেগে এই ব্যাডাকে সে আচ্ছা মতন বকে ছিল মনে মনে, আর এখন কি মায়া! সময় আর পরিস্থিতি কীভাবে বদলে যায়!
জাওয়াদ গভীর চোখে তাকিয়ে দেখল সাইয়ারা লজ্জা পাচ্ছে। গাল দুটো কেমন লাল লাল হয়ে উঠছে। চোখের পলক ফেলছে ঘনঘন। গোলাপি ওষ্ঠজোড়া তিরতির করে কাঁপছে। শ্বাসও ভারী ঘন হয়ে উঠেছে।
“সাই।”
“হুম।”
“তাকা আমার দিকে।”
সাইয়ারা তাকাল সঙ্গে সঙ্গেই আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। জাওয়াদ বাকা হেসে বলল,
“দশ বছরের পুরোনো স্বামী স্ত্রী আমরা। নতুন বউয়ের মতন এখনো এভাবে লজ্জা পেলে হবে?”
“আমার ওপর থেকে সরো তুমি।”
“বিয়ের দিনও তো লজ্জা পেলি না, উলটো সিনা টানটান করে বাজখাঁই গলায় বললি এই বিয়ে আমি মানি না। এখন এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”
সাইয়ারা কড়া চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি সরবে?”
জাওয়াদ সাইয়ারার পাশে শুয়ে পড়ল চিত হয়ে। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমিও হাঁটতে পারি না, তোরও কপাল ফাটা। চল দুজন মিলে ভিক্ষা করি, এছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।”
জাওয়াদের কথা শুনে সাইয়ারা তাকাল ঘাড় ঘুরিয়ে, জাওয়াদও তাকাল ঘাড় ঘুরিয়ে। কেউ কোনো কথা বলল না কিছুক্ষণ। জাওয়াদ বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? বিজনেস আইডিয়া দিলাম পছন্দ হলো কি-না বল।”
“এই সময়েও তুমি মজা করছো?”
“মজা করতে যাব কেন? আমি সিরিয়াস। সংসার করতে হলে কিছু তো করতেই হবে। না করলে খাবি কী?”
সাইয়ারা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল আবার।
জাওয়াদ সাইয়ারাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আগামীকাল সকালে আমরা ফ্ল্যাটে উঠব।”
সাইয়ারা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আবার। চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে বলল,
“কার ফ্ল্যাটে?”
“আমার ফ্ল্যাটে।”
“তোমার ফ্ল্যাটও আছে?”
“আমি ফকির বলে আমার একেবারেই কিছু নেই নাকি?”
“এক লাইন বললে দুই লাইন বেশি বোঝো।”
“ঠিক আছে, পরের দুই লাইন তাহলে তুই-ই বোঝা আমাকে।”
সাইয়ারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকবো ঠিক আছে, কিন্তু খাব কী?”
“আমি কী ম’রে গেছি? অ্যাকাউন্টে যা আছে সেগুলো খাব। ততদিনে একটা জব জোগাড় করতে পারলে করব, নয়তো ভিক্ষার অপশন তো আছেই।”
সাইয়ারা কটমট করে তাকিয়ে রইল। জাওয়াদ তার গালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,
“আরেহ মজা করছি তো, এত রেগে যাচ্ছিস কেন? অত শত ভাবতে হবে না তোকে। আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলব। এখন দাঁড়াতে পারি, দুই তিন কদম করে হাঁটতেও পারি। আশা করা যায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে একা একা হাঁটতে পারবো, তার পরের ছয় মাসের মধ্যে দৌড়াবোও।”
একটু থেমে আবার বলল,
“আমরা দুজন একই রকম স্বভাবের মানুষ। আমাদের দুজনের মধ্যে যতই ঝগড়া হোক আমরা একে অপরের মাথা কোনো দিনই ফাটাবো না রাগের মাথায়। কারণ আমরা রাগের মাথায় নিজেই নিজের মাথা ফাটাই। এই রাগের কারণে আজ আমি হুইল চেয়ারে, আর তুই মাথা ফাটিয়ে বিছানায়।”
জাওয়াদের কথা শুনে সাইয়ারার গম্ভীর মুখে হাসি ফুটলো। জাওয়াদ ভুল কিছু বলেনি। সাইয়ারার ঠোঁটে হাসি দেখে জাওয়াদও মুচকি হাসল। তারপর আস্টেপিস্টে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“আমার জান।”
.
আরও একটি রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটেছে ধরণীর বুকে। পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসছে। জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে রুমে।
জাওয়াদ রেডি হয়ে বসে আছে। সাইয়ারা বোরকা পরে হিজাব বাঁধছে এখন। দুজনের প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিল রাতেই।
ড্রাইভার এসে স্যুটকেস আর ব্যাগ নিয়ে গেছে।
সাইয়ারার হয়ে যেতেই জাওয়াদ আগে আগে বের হলো রুম থেকে, পেছন পেছন বের হলো সাইয়ারা। ড্রয়িংরুমে বাড়ির সবাই থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার যখন একে একে স্যুটকেস আর ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছিল তখন থেকেই এভাবে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।
দুজন দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই হোসনে আরা ধরা গলায় বললেন,
“এভাবে কোথায় যাচ্ছিস তোরা?”
সাইয়ারা চুপ রইল। জাওয়াদ গম্ভীর অথচ রাগী গলায় বলল,
“যেখানে গেলে আপনাদের মুখ আর দেখতে হবে না সেখানে।”
হোসনে আরার বুক মুচড়ে উঠল। শব্দ করে কেঁদে ফেললেন তিনি। অনুরোধের সুরে বললেন,
“যাস না, বাবা।”
“একদম নাটক করবেন না। আমাদের এতগুলো বছর নষ্ট করে এখন ন্যাকামি হচ্ছে? আমার এই অবস্থার জন্য শুধুমাত্র আপনারাই দায়ী। সাইয়ের বাবার তেমন কোনো দোষ আমি দেখছি না। সব দোষ আপনাদের। আপনাদের ভাগ্য ভালো আপনাদের এসব নোংরামির কোনো প্রমাণ আমার হাতে নেই, নয়তো দেখতেন এই জাওয়াদ শিকদার আসলে কী!”
জাওয়াদ আর সাইয়ারা বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। হোসনে আরা ধপ করে বসে পড়লেন মেঝেতে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।
“শান্তি হয়েছে এখন? শান্তি লাগছে অন্তরে? আমার ছেলেটারে জীবন্ত লা’শ বানাইয়া ফালাইছিলা, এখন আমার চোখের সামনে থেকেও দূরে সরাইয়া দিলা! কেমন ঘৃণা ভরা চোখে তাকিয়েছিল আমার দিকে। এর পর আর কোনোদিন আমার মুখও বোধহয় দেখবে না। আমি ম’র’লে আমার বড়ো ছেলে আমার খাটিয়া কাঁধেও নিবো না, মাটিও দিবো না এক মুঠ। সব তোমাদের লোভের কারণে হয়েছে। দোষ করলা নিজেরা আর শাস্তি দিলা আমার নির্দোষ ছেলে আর ছেলের বউরে! আমারে ডর ভয় দেখাইয়া মিথ্যা বলাইছিলা, কসম দেওয়ায়ছিলা। আল্লায় বিচার করব তোমাগো।”