সাইয়ারার মনে হচ্ছে জাওয়াদ একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে-ও কোনো রকম সংকোচ বা দ্বিধা ছাড়াই চোখ তুলে সোজা তাকাল জাওয়াদের দিকে। জাওয়াদের পুরো চেহারা গভীর গাম্ভীর্যতায় ঢাকা, সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে তার মুখের সামনে। জাওয়াদের দৃষ্টি ভীষণ তীক্ষ্ণ, ধারালো, তবে তার চেয়েও বেশি গভীর। সেই অচেনা, অতলান্ত দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই সাইয়ারার বুকের ভেতরটা আচমকা কেঁপে উঠল, দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগল তার হৃৎস্পন্দন। জাওয়াদের দৃষ্টির গভীরতা সহ্য করতে না পেরে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো সে। কিন্তু জাওয়াদ দৃষ্টি সরাল না, সে আগের মতোই তাকিয়ে রইল সাইয়ারার মুখের দিকে।
সাইয়ারা নিজেকে সামলে কটমট করে আবার তাকাল জাওয়াদের দিকে। এগিয়ে এসে জাওয়াদের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
“এই নোংরা ধোঁয়া আমার অসহ্য লাগছে। বন্ধ করুন এটা!”
জাওয়াদ তার কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে আবার এক টান দিলো সিগারেটে, তারপর ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে হুইল চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে সিনা টানটান করে কর্কশ গলায় বলল,
“অসহ্য লাগলে দরজা খোলাই আছে, ওই যে। এই রুমে থাকলে আমার নিয়মেই থাকতে হবে।”
বলেই ইলেক্ট্রিক হুইল চেয়ারটা ঘুরিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে আবার বলল,
“রুমে ফিরে এসে সোফার উপরে শাড়ি আর রুমের মাঝখানে স্যুটকেস যেন না দেখি।”
খ্যাপাটে দৃষ্টিতে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে রইল সাইয়ারা। তবে মুখে আর কিছু বলল না, তার বলতে ইচ্ছেই হচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে এই বাড়িতে।
প্রায় বিশ মিনিট পর রুমে প্রবেশ করল জামিল শিকদারের ছোটো মেয়ে জেসমিন। সে ক্লাস সিক্সে পড়ে। জাওয়াদকে রুমের কোথাও দেখতে না পেয়ে সাইয়ারাকে বলল,
“ভাইয়া কোথায়?”
সাইয়ারা বারান্দার দিকে ইশারা করে থমথমে গলায় বলল,
“বারান্দায়।”
“খাওয়ার জন্য তোমাদের দুজনকে যেতে বলল বড়ো আব্বু। দ্রুত আসো।”
বলেই জেসমিন চলে যেতে নিয়েছিল, কিন্তু সাইয়ারা তাকে থামিয়ে দিয়ে আগের ভাব বজায় রেখে বলল,
“তোমার ভাইয়াকে তুমি বলে যাও।”
জেসমিন কিছুক্ষণ সাইয়ারার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। জাওয়াদ বাইরের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছে।
“ভাইয়া।”
“হুম।”
“খাওয়ার জন্য দ্রুত যেতে বলল বড়ো আব্বু।”
“যা, আসছি।”
জেসমিন চলে গেলো। জাওয়াদ সিগারেট শেষ করে রুমে ফিরে এলো। শাড়ি আর স্যুটকেস এখনো আগের জায়গায় রয়েছে। সাইয়ারা বিছানায় বসে আছে পা দুটো ঝুলিয়ে।
জাওয়াদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এগুলো এখান থেকে সরাতে বলেছি!”
“সরিয়ে রাখবো কোথায়?”
“এত বড়ো একটা ওয়ারড্রোব রয়েছে চোখে পড়ছে না?”
কথা বলল না সাইয়ারা। জাওয়াদ হুইল চেয়ার নিয়ে ওয়ারড্রোবের কাছে এগিয়ে এসে ভেতর থেকে কালো রঙের একটা টি-শার্ট বের করে গায়ে জড়াল, তারপর বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
.
এখন ঘড়িতে সময় সকাল দশটা।
জাওয়াদের বাড়িতে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে ধীরে ধীরে। জাওয়াদ সেই যে সকালে রুম থেকে বেরিয়েছে এখনো আসেনি আর। সাইয়ারাও আর রুম থেকে বের হয়নি। সে খাবার খেতে না যাওয়ায় তার খাবার রুমে দিয়ে গিয়েছিল। বহু কষ্টে একটা রুটি খেয়েছিল সে। গলা দিয়ে খাবার নামতেই চাইছিল না, পানি দিয়ে গিলে গিলে খেয়েছে।
রুমে আবারও প্রবেশ ঘটল জেসমিনের। তার হাতে দুটো শপিংব্যাগ। জেসমিনের পেছন পেছন প্রবেশ করলেন হোসনে আরা।
সাইয়ারা না উঠে আগের মতোই বসে রইল বিছানায়। হোসনে আরা বললেন,
“শাড়ি পরে সুন্দর করে রেডি হও, মানুষজন আসছে তোমাকে দেখার জন্য।”
সাইয়ারা শুনল তবে বলল না কিছু। তাকে নির্বিকার চিত্তে বসে থাকতে দেখে হোসনে আরা আবার বললেন,
“জেদ ধরে বসে থেকো না। যা হবার হয়ে গেছে, এখন ভাগ্যকে মেনে নাও। দ্রুত রেডি হও ওদিকে আমার কাজ পড়ে আছে। জেসমিন তোর ভাবির সাহায্য লাগলে সাহায্য করিস।”
জেসমিন মাথা নাড়ল। হোসনে আরা বেরিয়ে গেলেন ব্যস্ত পায়ে। সাইয়ারা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। এখন শাড়ি পরে সেজে গুঁজে মানুষের সামনে গিয়ে সঙ সেজে বসে থাকতে হবে ভেবেই রাগে তার নাকের পাটা ফুলে উঠছে।
জেসমিন ব্যাগ দুটো এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ভাবি, ধরো। এখানে শাড়ি, ব্লাউজ আর পেটিকোট আছে।”
সাইয়ারা নামল বিছানা ছেড়ে। ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে গজগজ করতে করতে ওয়াশরুমের দিকে এগোল।
বেলা এগারোটায় নিজের রুমে প্রবেশ করল জাওয়াদ। এই রুমে প্রবেশ করতে তার মন টানছে না আর। তখন ওভাবে সাইয়ারাকে দেখা তার মোটেও উচিত হয়নি। ওই দেখার পর থেকেই সে এমন অস্থির হয়ে আছে, সবকিছু এলোমেলো লাগছে তার। গতরাতেও তো সাইয়ারাকে দেখার পর বেহায়ার মতন তাকিয়ে ছিল। তাকাবে না? টানা দশটা বছর পর হৃদয়ে রাজত্ব করা রমণীকে দেখেছিল।
হুইল চেয়ারের মৃদু শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সাইয়ারা। জাওয়াদ নিজেও তাকাল সাইয়ারার দিকে। চোখে চোখ পড়ল দুজনের।
সাইয়ারা হালকা সেজেছে, ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়েছে, কানের দুল পরছে এখন। হলুদ শাড়িতে সুন্দর লাগছে তাকে। সাইয়ারা ঘাড় সোজা করল। তার গম্ভীর চেহারায় রাগ ফুটে উঠেছে আবার।
কতক্ষন পর সাইয়ারার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো জানা নেই জাওয়াদের। হুইল চেয়ার নিয়ে বারান্দায় চলে এলো। তার হৃৎস্পন্দন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেটি দ্রুত ছুটে চলেছে অজানা এক আবেগের টানে। যাকে সে চেয়েও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইল জাওয়াদের, কিন্তু চোয়াল শক্ত করে সেটিকে ভেতরেই চেপে রাখল সে। চোখ দুটো শক্ত করে বুজল। দশটা বছর! কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে কত কিছু বদলে গেছে। তার নিজের শরীরটা পঙ্গু হয়ে হুইল চেয়ারে বন্দী হয়েছে, তার চঞ্চল মনটা রূপ নিয়েছে এক গম্ভীর রুক্ষ পাথরে, মেজাজ হয়েছে খিটখিটে। কিন্তু বদলায়নি শুধু একটা জিনিস—সাইয়ারার প্রতি তার সেই তীব্র টান, অনুভূতি।
রুমে দাঁড়িয়ে থাকা সাইয়ারার কান লাল হয়ে উঠেছে রাগে। বারান্দার দিকে তাকিয়ে তার ভেতরের ক্ষোভ আরও দ্বিগুণ হলো। জোরে জোরে শ্বাস নিলো নিজেকে শান্ত করার জন্য। ঠোঁটের লিপস্টিক এখন তার কাছে বিষের মতন ঠেকছে। সঙ সেজে নিচে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই, কিন্তু গিয়েও তো উপায় নেই।
জেসমিন আবার প্রবেশ করল রুমে। সাইয়ারার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,
“বাহ্, ভাবি! তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।”
সাইয়ারা তার দিকে তাকাতেই আবার বলল,
“হয়েছে না তোমার? চলো এখন।”
সাইয়ারা হাতে চুড়ি পরে আঁচল তুলে জেসমিনের সঙ্গে বের হলো রুম থেকে। জাওয়াদের রুমটা নীচ তলায়। তার চলাচলের সুবিধার জন্য নিচে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে অ্যাকসিডেন্টের পর। উপরে তার আগের রুমটা এখনো খালি পড়ে আছে।
সোফার কাছে এগিয়ে আসতেই বেশ কিছু মানুষের সম্মুখীন হলো সাইয়ারা। তাকে সোফায় বসানো হলো। গম্ভীর আর রাগী রাগী চেহারায় বসে রইল সে। এরা সবাই কাছের আত্মীয়, কয়েকজন প্রতিবেশীও আছে।
সাইয়ারার নজর পড়ল সামিউল শিকদারের দিকে। রাগে ঘৃণায় চোয়াল আরও শক্ত করল সে। জাওয়াদের চেয়েও এই মানুষটার উপর তার বেশি রাগ। সব হয়েছে এই বুড়োর জন্য।
সামিউল শিকদার এখন আর আগের মতন নেই। লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না, চশমা ছাড়া চোখে দেখেন না। অপরাধ বোধেও নুয়ে পড়েছেন অনেকটা।
.
সরোয়ার শিকদারের ছোটো বোন সেলিনা পারভীন বাড়িতে প্রবেশ করেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। তার চিৎকার শুনে সরোয়ার শিকদার দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন রুম থেকে। রোকেয়া বেগমও রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। সরোয়ার শিকদারের দুই ছেলে ড্রয়িংরুমেই বসে ছিল, ফুপুর হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে দুজনেই হকচকিয়ে গেছে।
সরোয়ার শিকদার বোনকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
“সেলিনা, চুপ কর। এমন করতাছোস কেন?”
সেলিনা পারভীন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করেই বললেন,
“কেন করতেছি বুঝতেছো না তুমি? ওই ডাকাতদের বাড়িতে আমার ভাতিজিরে কেন পাঠাইছো তুমি? ওরা কী করেছিল ভুলে গেছো তুমি? ওদের জন্য আব্বা মা’রা গেছে! ওরা বাড়িতে আইসা তোমারে মে’রে হাসপাতালে পাঠাইছিল! সব ভুলে গেলা কেমনে, ভাই?”
“তুই আগে শান্ত হ। এত চিৎকার চেঁচামেচি করলে অসুস্থ হয়ে পড়বি তো।”
“তুমি কেন সাইয়ারাকে ওই বাড়িতে পাঠাইলা এটা আগে বলো।”
“তোরা তো জানিসই আমার ব্যবসায় ধস নেমেছে। তোদের কাছে তো গিয়েছিলাম তোরা কেউ সাহায্য করেছিস আমাকে? জামশেদ ভাই টাকা না দিলে বাড়ি ব্যবসা সব হারিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে এখন রাস্তায় থাকা লাগতো আমার।”
“টাকার জন্য তুমি তোমার মেয়েকে বিক্রি করে দিলে!”
“বিক্রি করতে যাব কেন? সাইয়ারা যে জাওয়াদের স্ত্রী এটা ভুলে যাস না।”
“স্ত্রী তো কী হয়েছে? তুমি তো তালাক করাতে চেয়েছিল।”
“চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন আর চাই না।”
“হুইল চেয়ারে ঘুরে বেড়ানো ওই প’ঙ্গুর কাছে সাইয়ারা ভালো থাকবে? সাইয়ারা ওদের সহ্যই করতে পারে না। ওদের সঙ্গে থাকবে কীভাবে এক ছাদের নিচে?”
“তুই কী চাইছিস আমি সব হারিয়ে বউ বাচ্চাদের নিয়ে রাস্তায় থাকতাম? সোহান আর সায়েমের ভবিষ্যৎ কী হতো? রাস্তায় থেকে সাইয়ারাকে ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারতাম?”
“এতটাও অভাবে পড়োনি যে রাস্তায় থাকতে হবে।”
“রাস্তায় থাকা ছাড়া তো কোনো রাস্তাও দেখছি না। তখন যখন সাহায্য করিসনি এখন চিৎকার চেঁচামেচিও করিস না।”
“ওরা আব্বার খু’নি এটা ভুলে যাচ্ছো তুমি!”
“তুই এখন কী চাইছিস বউ বাচ্চাদের খু’ন করে আমিও ম’রে যাই? আমি কম চেষ্টা করিনি, দিশা বিশা হারিয়ে এই পর্যন্ত এসে ঠেকেছি। আমার মেয়ের জন্য আমার চেয়ে তোর বেশি দরদ না নিশ্চই? আমি জানি আমার মেয়ে কীভাবে ভালো থাকবে, সব ভেবে চিন্তেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর চেঁচামেচি করিস না, একটু শান্তি দে আমাকে।”
রোকেয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রান্না হয়েছে?”
“তরকারিটা বাকি আছে।”
বোনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“চিৎকার চেঁচামেচি করে অস্থির হয়ে গেছিস, গেস্ট রুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে বিশ্রাম নে।”
বলেই নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। রোকেয়া বেগম কোনো কথা না বলে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন আবার।
সেলিনা বেগম রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ড্রয়িংরুমেই।