“বাসুক, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসি, ও আমার বউ। তোমরা যে যা করতে চাও শুরু করে দাও, আমি সাইকে আনার জন্য যাচ্ছি।”
কথাগুলো বলেই বড়ো বড়ো কদমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো জাওয়াদ। তাকে থামানোর জন্য বাড়ির সবাই উঠেপড়ে লাগলেও পারল না থামাতে।
সরোয়ার শিকদারের বাড়ির গেইটের ভেতর পা রাখতেই জাওয়াদের বুকের ভেতর সেই চিরচেনা অনুভূতি ছুঁয়ে গেলো আবার। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল হাতের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেছে। লম্বা শ্বাস টেনে আবার পা বাড়াল সামনের দিকে। সাইয়ারা তাকে দেখলে কেমন রিঅ্যাকশন দিবে? নিশ্চই ভীষণ চমকে যাবে! সাইয়ারাকে প্রথমে দুটো চড় দিবে সে, তারপর আদর করবে। চড় দুটো তাকে রেখে অন্য ছেলেকে ভালোবাসার শাস্তি।
একবার কলিংবেল চেপে দাঁড়িয়ে রইল জাওয়াদ। দরজা খুলছে না দেখে পরপর আরও কয়েকবার চাপল। তবুও খুলছে না দেখে অধৈর্য হয়ে লাগাতার চাপতে লাগল।
দরজা খুলে দিলেন সরোয়ার শিকদার। কপালে বিরক্তির গাঢ় ভাঁজ। তিনি নিজের রুমের জানালা দিয়ে দেখেছিলেন জাওয়াদ আসছে, তাই ইচ্ছে করেই এতক্ষণ দরজা খুলছিলেন না, আর কাউকে খুলতেও দিচ্ছিলেন না। কিন্তু এই ছেলের লাগাতার বেল বাজানোর আওয়াজে উনাদের সকলের কানের বারোটা বেজে গেছে। শেষমেশ অতিষ্ঠ হয়েই দরজা খুললেন।
জাওয়াদ সরোয়ার শিকদারকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে রাশভারী গলায় সালাম দিলো। সরোয়ার শিকদার গুরুগম্ভীর গলায় সালামের জবাব দিলেন। জাওয়াদ পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে নিতেই বাধা দিলেন সরোয়ার শিকদার। শক্ত গলায় বললেন,
“ওদিকে কোথায় যাচ্ছো?”
জাওয়াদ নিজেও কঠিন স্বরে বলল,
“আমার বউকে নিতে।”
“আমার মেয়ে যাবে না তোমার সঙ্গে।”
“আমার বউ আমার সঙ্গে যাবে কি যাবে না সেটা আমি আপনার কাছ থেকে শুনতে চাইনি।”
জাওয়াদ সরোয়ার শিকদারের হাত সরিয়ে দিয়ে জোর করেই ভেতরে প্রবেশ করল। ড্রয়িংরুমে সাইয়ারা নেই। সোহান আর সায়েম বসে আছে সোফায়। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন রোকেয়া বেগম। জাওয়াদ শাশুড়ি মাকে সালাম দিয়ে বলল,
“সাই কোথায়?”
রোকেয়া বেগম স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন। সরোয়ার শিকদার বললেন,
“আমার মেয়ে কোথায় সেটা তোমাকে কেন বলবো? কোথাকার কে তুমি? বের হও আমার বাড়ি থেকে।”
“আমার বউকে ছাড়া এক চুলও নড়ব না আমি।”
জাওয়াদ গলার আওয়াজ বাড়িয়ে “সাই সাই” বলে ডাকতে লাগল। রোকেয়া বেগম বললেন সাইয়ারা তার রুমেই আছে।
জাওয়াদ ধুপধাপ পা ফেলে সাইয়ারার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে সাইয়ারাকে ডাকতে লাগল, কিন্তু সাইয়ারা সাড়াশব্দ করছে না।
সরোয়ার শিকদার এসে জাওয়াদের হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বললেন,
“সাইয়ারা যাবে না তোমার সঙ্গে। ও তোমার সামনে আসবে না, তোমার সঙ্গে কথাও বলবে না। কোনো রকম ঝামেলা না করে ভালোয় ভালোয় চলে যাও এখান থেকে।”
জাওয়াদ জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জেদ ধরে বলল,
“সাই আমার সঙ্গে কথাও বলবে, আর আমার সঙ্গে যাবেও। সাই, দরজা খোল।”
জাওয়াদ দরজায় জোরে জোরে করাঘাত করে ডাকতে লাগল আবার। সরোয়ার শিকদার তাকে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না।
রোকেয়া বেগম শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছেন দুজনের পেছনে।
জাওয়াদ হাজার ডাকার পরও একটা টু শব্দ অবধি করছে না সাইয়ারা। জাওয়াদ ব্যাকুল সুরে বলল,
“সাই, দরজাটা খোল একবার। তুই আমার সামনে আয়, কি হয়েছে বল আমাকে।”
ভেতর থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ ভেসে এলো, কিন্তু কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না।
“আমার পরিবার তোদের সঙ্গে অন্যায় করেছে, আমি তো করিনি। তুই আমাকে কেন শাস্তি দিচ্ছিস এভাবে? জান… দরজাটা খোল, একবার দেখি তোকে।”
তবুও ভেতর থেকে কোনো কথা ভেসে এলো না। সরোয়ার শিকদার বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“সাইয়ারা আসবে না তোমার সামনে। তুমি যাও এখান থেকে।”
জাওয়াদ কড়া চোখে সরোয়ার শিকদারের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার দরজার দিকে তাকাল। আগের মতোই ব্যাকুল সুরে বলল,
“আচ্ছা আমার সঙ্গে না গেলি, তুই যাকে ভালোবাসিস তাকেই বিয়ে করিস তবুও বাইরে আয়। আমি তোকে একবার দেখে চলে যাব, কতগুলো দিন হয়ে গেছে তোকে দেখি না। দরজা খোল।”
এবারেও দরজা খুলল না, আর না তো কোনো কথা বলল। জাওয়াদের সকল ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। সে দরজায় একের পর এক লাথি ঘুষি মা’রতে লাগল। মনে হচ্ছে এই বুঝি দরজা ভেঙে যাবে। সরোয়ার শিকদার নিজের সর্বশক্তি দিয়েও জাওয়াদকে আটকে রাখতে পারছেন না। দরজা ভেঙে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। দরজার ওপারে সাইয়ারা নেই। গতকালই তিনি সাইয়ারাকে সিলেট পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানতেন জাওয়াদ দেশে এসে এবাড়িতে আসবেই সাইয়ারাকে নেওয়ার জন্য। তিনি কোনোভাবেই নিজের মেয়েকে ওই বাড়িতে পাঠাবেন না। জাওয়াদের সামনাসামনি হলে আর কথা বললে সব সত্য জেনে যাবে দুজন, তখন আর তার কিছুই করার থাকবে না।
“এই ছেলে, নিজেকে কী ভাবো কী হ্যাঁ? এই দরজা তোমার বাপ-দাদার টাকা দিয়ে কিনিনি। তোমার বাপ-দাদা আমার টাকা মে’রে যেই অট্টালিকা বানিয়েছে গিয়ে সেটা ভাঙো। বের হও আমার বাড়ি থেকে।”
জাওয়াদ সরোয়ার শিকদারের হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে বলল,
“সাই, তুই যদি আজ বাইরে না আসিস তবে আমি নিজেকে শেষ করে দিবো। বের হ একবার। দয়া কর আমার ওপর! বের হ, জান। আমি সত্যি সত্যিই ম’রে যাব তুই বের না হলে!”
বের হলো না সাইয়ারা। জাওয়াদ নিজের ভালোবাসার মানুষকে দেখার তৃষ্ণা, একবুক শূন্যতা, অভিমান আর কষ্ট নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। স্বস্তির শ্বাস ফেললেন সরোয়ার শিকদার। আপদ বিদায় হলো।
দুজন মানুষ যারা একে অপরকে ভালোবাসে, কিন্তু নিজেদের পরিবার আর পরিস্থিতি তাদের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিয়েছে।
সরোয়ার শিকদার সন্ধ্যার পর যখন বাজারে যান তখন জানতে পারেন জামশেদ শিকদারের বড়ো ছেলে যে কি-না গতকাল দেশে ফিরেছে সে অ্যাকসিডেন্ট করে হসপিটালে ভর্তি। অবস্থা ভয়াবহ, বাঁচবে কি-না সন্দেহ।
জাওয়াদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর অপরাধ বোধে ভেঙে পড়েন সরোয়ার শিকদার। তিনি শুধু নিজের মেয়ের জীবন থেকে জাওয়াদকে দূরে সরাতে চেয়েছেন, এই দুনিয়া থেকে নয়। জাওয়াদ সত্যি সত্যিই এমন কিছু করে বসবে তিনি বুঝতে পারেননি।
তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে জাওয়াদের সুস্থতার জন্য দোয়া করেন। জাওয়াদকে হসপিটালে দেখতেও গিয়েছিলেন তিনি আর রোকেয়া বেগম। জ্ঞান ফেরার পর থেকে জাওয়াদের চোখজোড়া শুধু একজনকেই খুঁজছিল, কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটি তাকে দেখতে যায়নি।
সাইয়ারা সিলেট থেকে এক মাস পর বাড়িতে ফিরেছিল। বাড়ি ফেরার পরও সে জানতো না জাওয়াদের অ্যাকসিডেন্টের খবর। কলেজে যাওয়ার পর জানতে পারে জাওয়াদ অ্যাকসিডেন্ট করেছে। নড়াচড়া করতে পারে না। মুখ দিয়ে কিছু খেতেও পারে না। বাঁচবে কি-না তখনো কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
সাইয়ারার বুকের ভেতর সেদিন কি হয়েছিল সেটা আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ কী টের পেয়েছিল? না, পায়নি।
সরোয়ার শিকদার দশ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন কারখানার জন্য। ভেবেছিলেন দুই-তিন বছরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে যাবে সব। কিন্তু ব্যবসায় বড়ো ধাক্কা খাওয়ায় সব যেন শেষ হয়ে গেলো। তার ওপর চাচা আর চাচাতো ভাইদের জালিয়াতি, আর বাবার মৃ’ত্যু। ব্যাংক থেকে ঋণ করার পর টাকা কম পড়ায় জামশেদ শিকদারের কাছ থেকে যেই দশ লক্ষ টাকা এনেছিলেন এবং ফেরত দিতে গেলে তারা নেননি, বাবার মৃত্যুর পর সেই টাকা তাদের মুখের ওপর ছুঁড়ে মে’রে এসেছিলেন সরোয়ার শিকদার।
সাইয়ারা আর জাওয়াদের দ্বিতীয়বার বিয়ে হওয়ার এক সপ্তাহ আগে ব্যাংকের শেষ নোটিশ আসে সরোয়ার শিকদারের কাছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করতে না পারলে বন্ধক রাখা বাড়ি, জমি—সব আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে দেওয়া হবে।
নোটিশ পাওয়ার পর সরোয়ার শিকদার মাঝ সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে শুরু করেন। কি করবেন না করবেন তার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না। বারবার ব্যবসায় ধ্বস নামায় অনেক টাকা ঋণ করে ফেলেছিলেন। চারদিক থেকেই ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল তাকে।
বাড়ি, ব্যবসা, জায়গা জমি সব তার হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা। স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় থাকা ছাড়া কোনো পথ তিনি খোলা দেখছিলেন না। আগের এত ঋণ থাকার পর আবার কেউ এত বেশি টাকা ঋণ দিতে রাজি ছিল না।
সব কিছু হারানোর ভয়, সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। মৃ’ত্যু ছাড়া আর কোনো পথ তিনি দেখেননি। তখনই তার কাছে এলেন জামশেদ শিকদার। বললেন সাইয়ারাকে তার ছেলের বউ হিসেবে তাদের বাড়িতে পাঠালে তিনি তার সব ঋণ পরিশোধ করে দিবেন। মানে ব্যাপারটা এমন ছিল যে সরোয়ার শিকদার সাইয়ারাকে জাওয়াদের হাতে তুলে দিবেন আর তার বিনিময়ে জামশেদ শিকদার তাদের মে’রে খাওয়া টাকা ফেরত দিবেন।
সরোয়ার শিকদার প্রথমে রাজি হননি। জামশেদ শিকদারকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। অকৃতজ্ঞ, বাটপার, বেঈমানের দল। এখন এসেছে টাকা ফেরত দিতে আর নিজের পঙ্গু ছেলের জন্য তার মেয়েকে নিতে!
কিন্তু! কিন্তু! কিন্তু!
শেষমেশ আর কোনো পথ খোলা না পেয়ে সরোয়ার শিকদারকে এই প্রস্তাবেই রাজি হতে হয়েছে। তিনি অনেক ভেবেছেন, মূলত তাকে ভাবতে বাধ্য করেছিলেন জামশেদ শিকদার। সাইয়ারা জাওয়াদকে ভালোবাসে, আর জাওয়াদও সাইয়ারাকে পাগলের মতন ভালোবাসে যার কারণে এত দিনেও সে সাইয়ারাকে তালাক দেয়নি। তারপর দুজনের ভুল বুঝাবুঝির মাঝেই আবার তাদের বিয়ে হলো। দুজন একে অপরকে পাগলের মতন ভালোবাসে, অথচ কেউ কাউকে মানতে পারছে না।
জাওয়াদের ঘুম ভাঙলো আসরের নামাযের পর, তাও ফোনের রিংটোনে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল 24000 নাম্বার থেকে কল এসেছে। জাওয়াদের মেজাজ গরম হলো ভীষণ। রাগে সে নাম্বারটা ব্লক করে দিলো। তার সাধের ঘুম আর সুন্দর স্বপ্নের বারোটা বাজিয়েছে এই ফোনকল।
আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও ঘুম আর স্বপ্ন কোনোটাই তার ধারে কাছে এলো না। বিরক্ত হয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল। আর একটু হলেই সে নিজের বউকে জড়িয়ে ধরতো, শুধু এই কলের জন্য ধরতে পারল না। ধ্যাত!
সাইয়ারা রুমের দরজায় আসতেই তার কানে ভেসে এলো Masakali 2.0 গানের সুর, যেই সুর জাওয়াদ তুলছে খালি গলায়। সে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। জাওয়াদ ড্রেসিং টেবিলের সামনে হুইল চেয়ারে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে আর গানের সুর তুলছে মনের সুখে। জাওয়াদকে খুশি খুশি লাগছে, মনে হচ্ছে ফুরফুরে মেজাজে আছে।
এই সুরটা সাইয়ারারও ভীষণ পছন্দ। মাঝেমধ্যে সেও এই সুরটা তোলে।
হঠাৎ জাওয়াদ থেমে গেলো। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সাইয়ারার মুখের দিকে। জাওয়াদের চেহারা গাম্ভীর্যতায় ঢেকে গেছে। কপাল-ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চোখ সরিয়ে নিলো সে। দাড়িগুলোতে হাত বুলাল। বেশ বড়ো হয়ে গেছে, কাটতে হবে। বিয়ের আগের দিন সবাই তাকে অনেক বুঝিয়েছিল চুল দাড়ি ছোটো করার জন্য, সে জেদ ধরে করেনি। শেরওয়ানি কিনে এনেছে, সে পরেনি। নতুন জামা কাপড় পরতে বললেও পরেনি। যা পরে ছিল সেগুলো পরেই চলে গিয়েছিল। সে রাজি ছিল না এই বিয়েতে। যেই মেয়ে তার হাজার ডাক উপেক্ষা করে রুমের দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে ছিল, সে অ্যাকসিডেন্ট করে মৃ’ত্যুর সঙ্গে লড়ছে জানার পরও একটাবার তাকে দেখতে যায়নি, সেই মেয়েকে সে নিজের জীবনে আর জায়গা দিবে না।
মায়ের কান্নাকাটি, বাবার অনুরোধেও সে রাজি হচ্ছিল না। জামশেদ শিকদার তার পা পর্যন্ত ধরতে নিয়েছিলেন। মাফ চেয়েছেন অসংখ্যবার। বাড়ির সবাই তাকে বুঝিয়েছে সাইয়ারাকে বিয়ে করার জন্য, কিন্তু সত্যটা কেউ বলেনি।
অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার পরও তাকে অনেকবার বলা হয়েছিল সাইয়ারাকে তালাক দিয়ে দিতে। সে তালাক দেয়নি। তার একটাই কথা, সে এই জীবনে একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে, ওই একজনকেই ভালোবেসেছে, আর চিরকাল ওই একজনই তার বউ হয়ে থাকবে। সে এই এক জীবনে শুধু সাইয়ারাকেই ভালোবাসবে। সাইয়ারার জায়গা কেউ কোনোদিন নিতে পারেনি, আর পারবেও না। সে সাইয়ারাকে তালাকও দিবে না, আবার সংসারও করবে না।
সাইয়ারা নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে মৃদুস্বরে বলল,
“একটা কথা ছিল।”
জাওয়াদ তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল,
“বল।”
“আমি পড়াশোনা করব।”
“ঠিক আছে।”
“পড়াশোনার জন্য আমি হোস্টেলে থাকবো।”
জাওয়াদ সরু চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন তারপর আগের ভাব বজায় রেখে বলল,
“এটা হচ্ছে না।”
“কেন হবে না? আমি থাকবো না এখানে।”
“সেটা বিয়ের আগে ভাবা উচিত ছিল।”
“অত শত ভাবতে পারবো না আমি। আমি আগামীকাল হোস্টেলে উঠছি এটাই ফাইনাল।”
“স্বামীর অবাধ্য হওয়া মেয়েরা জান্নাতে যাবে না এটা নিশ্চয়ই জানিস?”
সাইয়ারা এতক্ষণ নিজেকে সামলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করলেও জাওয়াদের কথা শুনে খেপে গেলো। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“স্বামীর অবাধ্য হওয়া মেয়েরা জান্নাতে যাবে না আর স্ত্রী রেখে অন্য মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা ছেলেরা জান্নাতে যাবে তাই না?”
“কী বলতে চাইছিস তুই?”
“কী বলেছি বুঝতে পারেননি?”
জাওয়াদ দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“না, বুঝতে পারিনি। বুঝিয়ে বল তুই।”