সাইয়ারার এমন উন্মত্ত আত্মপীড়ন দেখে ড্রয়িংরুমের থমথমে বাতাস এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো। তৃতীয়বার সোফার সঙ্গে মাথা বাড়ি দিতেই “সাই” বলে বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল জাওয়াদ। চতুর্থবার সোফার সঙ্গে মাথা আছাড় দেওয়ার আগেই নিজের শরীরের সমস্ত অক্ষমতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, নিজের অচল পা দুটোর কথা ভুলে গিয়ে হুইল চেয়ার থেকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল মেঝের ওপর। দুই হাতের জোরে নিজের শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে সাইয়ারার কাছে এগিয়ে এলো। সাইয়ারাকে টেনে সরিয়ে এনে শক্ত করে চেপে ধরল নিজের বলিষ্ঠ দেহের সঙ্গে। সাইয়ারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য পাগলামি করতে লাগল।
“ছাড়ুন আমাকে! ছাড়ুন! আমি বাঁচতে চাই না! কারও মুখ দেখতে চাই না! আমার বাবা... আমার নিজের বাবা আমার সাথে এই কাজ করল? আমি যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিলাম, সে আমার সঙ্গে এত বড়ো বেঈমানি করল! উনার কথা শুনে আমি আপনাকে—
কথা শেষ করতে পারল না সাইয়ারা। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল মেয়েটা। এ কেমন পরিবারে জন্ম হয়েছে তাদের? নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ছটফট করতে লাগল আবার। জাওয়াদ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে আটকে রাখল নিজের সঙ্গে। শান্ত করার চেষ্টায় বলল,
“জান, শান্ত হ। নিজেকে কেন আঘাত করছিস তুই? শান্ত হ, জান।”
সাইয়ারা বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“কীভাবে শান্ত হবো? আমি কী দোষ করেছিলাম? আমি তো শুধু আপনাকে ভালোবেসেছিলাম। এত বড়ো শাস্তি কেন দিলো সবাই? কেন? আমার নিজের পরিবার, আমার নিজের আব্বা আমার সঙ্গে এমন করল কেন? সবাই কেন এমন করল আমাদের দুজনের সঙ্গে?”
ড্রয়িংরুমের উপস্থিত সবাই তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। সাইয়ারা পাগলামি করছে, আর জাওয়াদ শক্ত বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে তাকে। যে মেয়ে এত বছর ধরে নিজের বাবাকে আদর্শ মেনে এসেছে, যার প্রতিটা কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছে, সে যখন জানল তার ভালোবাসার মানুষটি সম্পূর্ণ নির্দোষ, আর তার নিজের বাবাই দোষী, আর তার চরিত্রেও দাগ লাগিয়েছে, তখন সে কীভাবে সহ্য করবে? কীভাবে?
সরোয়ার শিকদার নিজের মেয়ের এমন অবস্থা দেখে অপরাধবোধে মাথা নিচু করে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রোকেয়া বেগম দুজনের পাশে বসে থরথর করে কাঁপছেন আর কাঁদছেন। মেয়েকে ছোঁয়ার সাহস পাচ্ছেন না। তিনি স্বামীকে অনেকবার বলেছিলেন সত্যিটা বলে দেওয়ার জন্য, নিজেও বলার চেষ্টা করেছিলেন। মেয়ের এত কষ্ট মা হয়ে কীভাবে সহ্য করেছেন তিনি আর আল্লাহ তায়ালাই শুধু জানেন। নিজের সংসার বাঁচাতে মেয়ের সংসার পায়ে পিষেছিলেন। সরোয়ার শিকদার উনাকে বলেছিলেন উনি যদি সাইয়ারাকে সত্যিটা বলে দেন তবে উনি রোকেয়া বেগমকে তালাক দিবেন। এই কারণেই উনি মেয়েকে কিছু জানাতে পারেননি।
সাইয়ারা যখন সোফার সঙ্গে নিজের মাথা বাড়ি দিলো তখন উনার মনে হচ্ছিল কেউ উনার বুকে হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে দৌড়ে এসেছেন মেয়ের কাছে। তিনি আসার আগেই জাওয়াদ এসে সাইয়ারাকে থামিয়েছে।
সাইয়ারার কপাল কে’টে গেছে, র’ক্ত পড়ছে। আগের চেয়ে আরও বেশি ছটফট করছে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সাপের মতো মোচড়ামুচড়ি শুরু করেছে। তাকে আটকে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে জাওয়াদ, কিন্তু কোনোভাবেই ছাড়ছে না সে। সাইয়ারার সাধ্য নেই তার আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে আসার। সাইয়ারা মুখ তুলে জাওয়াদের মুখের দিকে তাকাল। তার চেহারা দেখে আঁতকে উঠল জাওয়াদ। সাইয়ারার কপালের র’ক্ত তার চোখজোড়ায় ঢুকে গেছে। আর চোখের পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝরঝর করে। ভুতের মতন দেখতে লাগছে মেয়েটাকে। জাওয়াদের বুক আরও বেশি হুহু করে উঠল প্রিয়তমার এমন অবস্থা দেখে। সাইয়ারার পাগলামিতে এতক্ষণ খেয়ালই করতে পারেনি কপাল কে’টে যে এভাবে র’ক্ত পড়ছে। অস্থির হয়ে এদিক ওদিক তাকাল সে। ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“তাড়াতাড়ি পানি আর ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে আয়।”
জাবিন সঙ্গে সঙ্গেই ছুটল ফাস্ট এইড বক্স আর পানি আনার জন্য।
জাওয়াদ অস্থির হয়ে ছটফট করতে করতে বলল,
“জান, কেন করলি এমন? কেন এভাবে আঘাত করলি নিজেকে?”
“আমি আপনাকে কত কষ্ট দিয়ে কথা বলেছি, কত কিছু বলেছি! কত নোংরা নোংরা কথা বলেছি! আমি আপনাকে ঘৃণা করেছি! আমি ভেবেছিলাম আপনি অন্য মেয়ের সাথে—
আমি ম’রে যাব, আমার দম আটকে আসছে! আমাদের পরিবার আমাদের সঙ্গে কেন এমন করল? সবাই মিথ্যা বলেছে আমাকে। সবাই বলেছিল আপনি আমাকে আর ভালোবাসেন না, আপনি অন্য মেয়েকে ভালোবাসেন। আমি কত কেঁদেছি আপনার জন্য। আমার বুকে অনেক কষ্ট হচ্ছে, আমি সহ্য করতে পারছি না আর। আমি ম’রে যাব! আমি ম’রে যা….”
জাওয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ঘাড় ছেড়ে দিলো সাইয়ারা। জাওয়াদ আরও উতলা হয়ে উঠল। সাইয়ারার গালে মৃদু চাপড় দিতে দিতে ডাকতে লাগল সমান তালে, কিন্তু সাইয়ারা চোখ মেলল না। মাথাটা বুকে চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল ভয়াবহ আক্রোশ নিয়ে। সে পারে না এইমুহুর্তেই বাড়ির সবাইকে খু’ন করে ফেলে।
জাবিন ফাস্ট এইড বক্স আর পানির জগ নিয়ে ছুটে এলো। জাওয়াদ সাইয়ারাকে ফ্লোরে শুইয়ে দিয়ে তার ওড়না দিয়েই সব র’ক্ত মুছে ফেলল। ক্ষত পরিষ্কার করে দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দিলো জাবিন। জাওয়াদের হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে, চোখজোড়া থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। বারবার কাঁধে চোখ মুছেও লাভ হচ্ছে না। জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করলেও জ্ঞান ফিরল না সাইয়ারার। জাওয়াদ আরও দিশেহারা হয়ে উঠল। এত সাধনার ভালোবাসাকে এত বছর পর ফিরে পেয়ে আর হারাতে দিবে না সে।
বাবা-কাকা আর শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“কু/ত্তা/র বাচ্চারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিস? ওকে হসপিটালে নে। ওর কিছু হলে তোদের তিনটাকে কুরবানী দিবো আমি!”
সরোয়ার শিকদার ছুটে এলেন মেয়ের কাছে। পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে আবার ছুটলেন দরজার দিকে। জাবিন বড়ো ভাইকে ধরে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিলো। তারপর কাকার কাছ থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে দৌড় দিলো বাইরের দিকে।
.
সাইয়ারা চোখ মেলতেই নিজেকে আবিষ্কার করল হসপিটালের বেডে। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। মাথা চেপে ধরার জন্য দুই হাত তোলার চেষ্টা করতেই বাম হাতে বাঁধা পেল। মাথা বাম পাশে কাত করতেই দেখল জাওয়াদ তার বাম হাতটা দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বেডে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে হুইল চেয়ারে। হাতে টান পড়ায় জাওয়াদও মুখ তুলে তাকাল। জাওয়াদের চোখজোড়া আরও লাল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কাঁদলে চোখ থেকে পানি নয়, র’ক্ত গড়িয়ে পড়বে।
ডুকরে কেঁদে উঠল সাইয়ারা। জাওয়াদ হুইল চেয়ার ছেড়ে বেডে উঠে বসল। সাইয়ারাও শোয়া থেকে উঠে বসল জাওয়াদের সাহায্যে। তার কান্না ধীরে ধীরে বাড়ছে। মুখ নামিয়ে রেখেছে, জাওয়াদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না।
জাওয়াদ সাইয়ারার মুখ দুই হাতে আগলে ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“কেন এমন করলি, জান? যদি তোর কিছু হয়ে যেত তবে আমার কী হতো?”
সাইয়ারা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে বলতে লাগল বাড়ির সবাই তাকে কীভাবে ভুল বুঝিয়েছিল, কীভাবে তার ব্রেইন ওয়াশ করেছিল।
সাইয়ারার এই বুকফাটা কান্না আর আর্তনাদ জাওয়াদের ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে দিলো। সাইয়ারার কপালে কপাল ঠেকিয়ে রেখেই ডুকরে কেঁদে উঠল নিজেও। কান্নার দমকে তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, শক্তপোক্ত শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। সাইয়ারা জাওয়াদের বুকে মুখ গুঁজে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। পারলে জাওয়াদের বুকের ভেতরেই ঢুকে যায় সে। জাওয়াদও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মিশিয়ে নিলো নিজের সঙ্গে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল দুজনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাওয়াদ নিজেকে সামলে নিলো। প্রিয়তমার মাথায়, কপালে, গালে সমানে চুমু খেতে লাগল—যেন এই স্পর্শ দিয়ে সে প্রিয়তমার এত বছরের সব ক্ষত এক নিমেষে সারিয়ে দিতে চাইছে। সঙ্গে বারবার বলছে জীবনে আর কোনোদিন যেন নিজেকে আঘাত না করে।
স্বামীর আদরে আর আদর মাখা কথা শুনে সাইয়ারার কান্না আরও বেড়ে গেছে, হাতের বাঁধনও শক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে দরজা নক করে কেবিনে প্রবেশ করলেন একজন নার্স। দুজনকে এভাবে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন বটে তবে এমন দৃশ্য হরহামেশাই দেখতে হয় তাদের। পেশাদার ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বললেন,
“রোগীকে একটু দেখি।”
সাইয়ারা চোখ মুছতে মুছতে সোজা হয়ে বসল। নার্স সাইয়ারাকে দেখে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, এখন অবস্থা স্থিতিশীল। তবে রোগীকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখবেন। বেশি কান্নাকাটি বা মানসিক উত্তেজনা হলে মাথাব্যথা বেড়ে যেতে পারে, আবার মাথা ঘোরাও শুরু হতে পারে।”
একটু থেমে আরও বললেন,
“আপনি আর কখনো এভাবে নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করবেন না। যত কষ্টই হোক, নিজের ক্ষতি করলে সমস্যার সমাধান হয় না। এখন একটু বিশ্রাম নিন। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন। আমি আবার কিছুক্ষণ পর এসে দেখে যাব।”
নার্স সাইয়ারাকে আবারও সাবধান করে বেরিয়ে গেলেন কেবিন থেকে।
জাওয়াদ সাইয়ারাকে আবার জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“শান্ত হ, জান।”
“আমি পারছি না।”
“ঠিক আছে কাঁদ...যত ইচ্ছে কাঁদ। কিন্তু নিজেকে আর কোনোদিন আঘাত করবি না।”
সাইয়ারা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আবার।
“আমি সহ্য করতে পারিনি, নিজেকে আটকাতে পারিনি। আমাদের এতগুলো বছর কে ফিরিয়ে দেবে? সবাই কেন এমন করল?”
“ওরা শুধু কেড়ে নিতে জানে, ফিরিয়ে দিতে নয়। ওরা স্বার্থপর, মনুষ্যত্বহীন। ওরা নিজেদের স্বার্থের জন্য আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।”
“আমি আপনাকে বিশ্বাস করিনি।”
“তোর কোনো দোষ নেই, জান।”
“আমি আপনাকে ঘৃণা করেছি!”
“এতেও তোর কোনো দোষ নেই।”
“আমি আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।”
“তোর কোনো কথায় আমি কষ্ট পাইনি, তুই শান্ত হ।”
“আমাকে মাফ করে দিন!”
জাওয়াদ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
“এই কথা আর কোনোদিন বলবি না, জান। তোর কোনো দোষ নেই। দোষ তাদের যারা আমাদের বিশ্বাস নিয়ে খেলেছে। আমি কাউকে ছাড়বো না, কাউকে না!”
সাইয়ারা মুখ তুলল স্বামীর বুক থেকে। হাত বাড়িয়ে গালে হাত রাখল। হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
“আমার জন্য কি অবস্থা হয়েছে আপনার!”
জাওয়াদ নিজের গালে থাকা সাইয়ারার হাতটা টেনে চুমু খেয়ে পুনরায় গালে চেপে ধরে বলল,
“তোর জন্য হয়নি, হয়েছে ওই মানুষগুলোর জন্য।”
“কত কষ্ট পেয়েছেন আপনি, আর আমি আপনাকে ভুল বুঝে এসেছি।”
“আর কত আপনি আপনি করে বলবি, জান? তুমি করে বল না আগের মতন, আপনি আপনি শুনে পর পর লাগছে নিজেকে।”
সাইয়ারা জাওয়াদের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল আবার। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, আর কোনোদিন ভুল বুঝবো না তোমাকে।”
“আমি কাউকে আর আসতেই দিবো না আমাদের মাঝে।”
*****
রাতটা হসপিটালে কাটিয়ে পরদিন সকাল দশটায় বাড়িতে ফিরল সাইয়ারা আর জাওয়াদ। দুজনের সঙ্গে জাবিন আর সরোয়ার শিকদারও হসপিটালে ছিলেন রাতে।
বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে ঘৃণায় কারও দিকে চোখ তুলে তাকাল না সাইয়ারা। জাওয়াদ আগুন চোখে সকলের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের রুমে চলে এলো সাইয়ারার সঙ্গে। সাইয়ারা জামা কাপড় পরিবর্তন করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। জাওয়াদ একেবারে গোসল করে এলো। সারারাত ঘুমাতে পারেনি সে। লাইট নিভিয়ে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল, তারপর সাইয়ারাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলো। তার বুকে মুখ গুঁজে থাকতে থাকতে ফুঁপিয়ে উঠল সাইয়ারা। জাওয়াদ পিঠে হাত বুলিয়ে মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“অনেক কেঁদেছিস, আর কাঁদিস না। একটু ঘুমা এখন।”
সাইয়ারা কথা বলল না। আস্তে আস্তে তার কান্না কমে এলো। জাওয়াদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েও গেলো একসময়।
.
ঘড়ির কাঁটা বিকেল চারটার ঘর পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। জাওয়াদ বিছানায় বসে আছে, পাশেই শুয়ে আছে সাইয়ারা। একটু আগেই দুপুরের খাবার খেয়েছে তারা। খাবার বাইরে থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছিল জাওয়াদ।
বাড়ির কেউ এখন পর্যন্ত তাদের রুমে আসেনি, মূলত আসার সাহসই পায়নি।
জাওয়াদ আইনজীবীর নাম্বারে ডায়াল করল। নাম্বারটা সে জোগাড় করেছে এক ফ্রেন্ডের মাধ্যমে। ওই ফ্রেন্ডের মামা এই আইনজীবী।
কল রিসিভ হতেই সালাম দিলো জাওয়াদ। নিজের পরিচয় দিতেই ওপাশ থেকে ভদ্রলোক বললেন,
“হ্যাঁ চিনতে পেরেছি, তোমার কথা বলেছে হৃদয়। তুমি খুলে বলো সবকিছু।”
জাওয়াদ একে একে সব কিছু খুলে বলল। সব শুনে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলেন। জাওয়াদ দুই পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইছে। ভদ্রলোক বললেন,
“আমি পুরো বিষয়টা বুঝতে পেরেছি, জাওয়াদ। তোমার বর্ণনা অনুযায়ী ভুয়া ছবি তৈরি করে প্রতারণা, পরিকল্পিতভাবে তোমাদের সম্পর্কে বিভেদ সৃষ্টি এবং মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার অভিযোগে একাধিক ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রয়োজনে ডিজিটাল অপরাধসংক্রান্ত আইনও বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এসব মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রমাণ। মুখের কথায় তেমন কিছু করা সম্ভব না। যদি এই জালিয়াতি ও ষড়যন্ত্রের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে মামলার অবস্থান অনেক শক্ত হবে। তোমার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ বা সূত্র আছে?”