দুজনে

পর্ব - ১২

🟢

ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে চারদিকে নজর বুলাল সাইয়ারা। ড্রয়িংরুমে সোফা আর টি-টেবিল ছাড়া কিছুই নেই।

ড্রাইভার ব্যাগ স্যুটকেস সব ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফ্ল্যাট থেকে চলে গেলো। দরজা লাগিয়ে বেডরুমের দিকে এগোল জাওয়াদ এর সাইয়ারা।

বেডরুমে বেশি কিছু নেই। খাট, ড্রেসিং টেবিল, ওয়ার্ডরোব, স্টাডি টেবিল, আর দুটো চেয়ার। একটা সেন্টার টেবিলও আছে।

জাওয়াদ শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল,

“পছন্দ হয়েছে?”

সাইয়ারা জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কী?”

“আমাকে।”

সাইয়ারা সরু চোখে তাকিয়ে রইল। তার এমন চাউনি দেখে জাওয়াদ হেসে ফেলল।

“নতুন সংসার পছন্দ হয়েছে নাকি তাই জিজ্ঞেস করলাম। এখনকার মতন একটু কষ্ট কর, ভবিষ্যতে সব হবে। পুরো ফ্ল্যাট সাজাতে গেলে আমার ব্যাংক ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাবে, তাই শুধু এ—

সাইয়ারা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“আমার এতটুকুও প্রয়োজন নেই। আমি এসব ছাড়াও থাকতে পারতাম সমস্যা হতো না। শুধু তুমি আমার পাশে থাকো, আমি নুন ভাত খেয়েও এই জীবন পার করে দিতে পারব।”

“এতগুলো বছর পর বউকে কাছে পেয়ে নুন ভাত খাওয়াব? আমি গরীব, কিন্তু অত গরীবও না যে—

সাইয়ারা আবার থামিয়ে দিলো জাওয়াদকে। কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,

“আবার দুই লাইন বেশি বুঝছো?”

সাইয়ারার বলার ধরন দেখে জাওয়াদ হা হা করে হেসে উঠল। সাইয়ারা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল জাওয়াদের হাসি মুখের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার নিজের ঠোঁটেও হাসি ফুটলো। জাওয়াদের কাছে এগিয়ে এসে বড়ো বড়ো চুল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল,

“এগুলো কা’টবে কবে?”

জাওয়াদ সাইয়ারার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,

“কেন? এভাবে ভালো লাগছে না?”

“চুলগুলো একটু ছোটো করলে আরও ভালো লাগবে।”

“আচ্ছা এগারোটা বারোটার দিকে গিয়ে কে’টে আসবো।”

একটু থেমে বলল,

“কী খাবি এখন?”

“রান্না করার মতন কিছু আছে?”

“থাকতে পারে, বলেছিলাম তো কিনে রাখতে। রান্না করতে হবে না এখন, অনলাইনে অর্ডার দেই।”

“না, রান্না করে খাব।”

“এই শরীর নিয়ে রান্না করতে হবে না, আগে সুস্থ হ তারপর রান্না করিস।”

“সমস্যা হবে না আমার, এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বেটার ফিল করছি। তুমি শুয়ে থাকো, আমি দেখি রান্না করার মতন কিছু আছে কি-না।”

সাইয়ারা জাওয়াদের হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করতেই জাওয়াদ আরও চেপে ধরে বলল,

“অসুস্থ তুই, আমি না। শুয়ে থাকার হলে তুই শুয়ে থাক, আমি রান্না করছি।”

“তুমি রান্না করতে পারো?”

“কোনো সন্দেহ আছে?”

“নাহ।”

“তাহলে চল দুজন মিলে নাশতা রেডি করি।”

“একদম না। যা রান্না করার আমি করব, তুমি শুধু বসে বসে খাবে।”

“দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাওয়ার মুরোদ আমার নেইও, জান।”

সাইয়ারা ফুঁসে উঠল জাওয়াদের কথা শুনে। জোর করে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। রুম থেকে বের হতে হতে বলল,

“আর একদিন এসব বললে খবর আছে তোমার!”

জাওয়াদ দরজার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল।

“আহারে আমার নরম সরম বউটা কেমন ডেঞ্জারাস হয়ে গেছে আমার বাটপার বাপ-শ্বশুরের কারণে!”

রান্নাঘরেও খুব বেশি কিছু নেই, তবে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আছে। সাইয়ারা ফ্রিজ খুলে দেখে নিলো কী কী আছে। নরমালে শাক সবজি আর ডিম রয়েছে। ডিপে শুধু মাংস, মাছ নেই। পুরো রান্নাঘর খুঁজেও আটা ময়দা পেলো না। চাউল ধুয়ে ভাত বসাল আগে, তারপর ডিম সিদ্ধ হতে দিলো। ফ্রিজ থেকে লাউ শাক বের করে কাটতে বসে গেলো।

জাওয়াদ নিজের এক ফ্রেন্ডকে দিয়ে সংসারের এই টুকটাক জিনিসগুলো কিনিয়েছে। সেই প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে গুছিয়ে রেখে গেছে গতকাল রাতে।

ভাত, ডিম ভুনা, আর শাক ভাজি করল সাইয়ারা। সকাল দশটার ওপর বেজে গেছে, দুজনেরই খিদে পেয়েছে ভীষণ। এখন এসবই খাওয়া যাক, দুপুরে মাংস রান্না করবে।

বিজ্ঞাপন

খাবার ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে হাতমুখ ধুয়ে জাওয়াদকে সঙ্গে নিয়ে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করল আবার। দুটো প্লেটে খাবার বেড়ে চেয়ার টেনে বসল জাওয়াদের পাশের চেয়ারে।

খাওয়ার মাঝে জাওয়াদ খেয়াল করল সাইয়ারার চোখজোড়া পানিতে টইটম্বুর, দুই এক ফোঁটা গড়িয়েও পড়ছে। জাওয়াদ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

“কী হয়েছে, সাই?”

সাইয়ারা দ্রুত চোখ মুছে পানি খেয়ে বলল,

“কিছু না, খাও তুমি।”

জাওয়াদ হাত বাড়িয়ে সাইয়ারার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,

“বাড়ির মানুষের কথা মনে পড়ছে?”

ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আবার সামলে নিলো নিজেকে। চুপচাপ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর খাওয়া শুরু করল আবার। জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“খাচ্ছো না কেন? খাও।”

জাওয়াদ আর কিছু না বলে খাওয়া শুরু করল। খেতে বসে বাবার কথা ভীষণ মনে পড়ছে সাইয়ারার। সে বাড়িতে থাকলে তার বাবা তাকে ছেড়ে ভাত খেত না কখনো। খাওয়ার সময় হলে বারবার মেয়েকে ডাকতেন খাওয়ার জন্য। যতক্ষণ মেয়ে খেতে না আসতো ততক্ষণ তিনিও খেতে বসতেন না। ছেলেদের চেয়ে মেয়েকে বেশি ভালোবাসেন তিনি, সাইয়ারাও তেমনই। মায়ের চেয়ে বাবাকেই বেশি ভালোবাসতো।

জাওয়াদকে আবার বিয়ে করতে না চাওয়ায় বিয়ের আগের দিন রাতে তার বাবা তার ওপর অনেক রেগে গিয়েছিল, তার গায়েও হাত তুলেছিল। হয়তো জোর করে রাজি করানোর জন্যই এমন করেছিলেন। তিনি জানতেন নরম থাকলে সাইয়ারা জীবনেও রাজি হবে না। আর সত্যিটা তিনি বলতেও পারছিলেন না। সাইয়ারা নিজেও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক কিছুই বলেছিল তার বাবাকে।

*****

মাঝখানে পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুদিন। জাওয়াদ একটা কর্পোরেট অফিসে সিভি জমা দিয়েছে গতকাল। সাইয়ারা এখন পুরোপুরি সুস্থ। দুজনের সংসার জীবন দারুণ কাটছে। মাঝেমধ্যে আবার বিষণ্নতাও গ্রাস করে দুজনকে। নিজেদের পরিবারের এমন বিশ্বাসঘাতকতা এখনো মেনে নিতে পারছে না দুজন।

নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন হোসনে আরা। জাবিন গতকাল রাতে কল করে কাকুতি মিনতি করেছে একটাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। জাওয়াদ কঠোর গলায় বলে দিয়েছে কেউ ম’রলেও তারা যাবে না। অবশ্য এটা সত্যি কথা নয়। মায়ের জন্য তার অন্তরও পুড়ছে ভীষণ, তবুও সে যাবে না ওই বাড়িতে।

জাওয়াদ স্পষ্ট শুনেছে জামশেদ শিকদার বলছিলেন ‘ওদেরকে ওদের মতন ছেড়ে দে এখন। কয়েক মাস যাক, রাগ কমলে ঠিকই আসবে।’

রাত প্রায় দশটা বেজে গেছে। সাইয়ারা মাত্র ফ্রেশ হতে গেলো। জাওয়াদ সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে লাইটার খুঁজতে লাগল।

লাইটার খুঁজে পাওয়ার আগেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সাইয়ারা। জাওয়াদকে বিছানায় কিছু খুঁজতে দেখে বলল,

“কী খুঁজছো এভাবে?”

“লাইটারটা কোথায় গেলো? এখানেই তো রেখেছিলাম।”

সাইয়ারা বিছানায় উঠে জাওয়াদের হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,

“এই ছাতার মাথা না খেলে কী হয়? আজকে থেকে এটা খাওয়া বাদ।”

জাওয়াদ সাইয়ারার হাত থেকে প্যাকেটটা নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,

“জান, একবারে খাওয়া বাদ দিতে পারব না। আস্তে আস্তে খাওয়া কমাচ্ছি, কোনোদিন যদি পারি বাদ দিয়ে দেবো।”

“না, একেবারেই খাওয়া নিষেধ।”

“এমন করে না, জান। এদিকে দে প্যাকেটটা। আগে প্রতিদিন খেয়েছি এক প্যাকেট, তুই আমার কাছে ফিরে আসার পর থেকে খাই চার থেকে পাঁচটা। আজকে সারাদিনে মাত্র দুটো খেয়েছি। এখন আর একটা খাব। প্যাকেটটা দে, জান।”

“তোমাকে এই সিগারেট এনে দিতো কে আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না। সিগারেটও কী অনলাইনে অর্ডার দিতে নাকি?”

“জাবিন এনে দিতো। এখন প্যাকেটটা এদিকে দে।”

সাইয়ারা প্যাকেটটা দুমড়ে মুচড়ে বিনে ফেলে দিলো। হাঁ করে অসহায়ের মতন বিনের দিকে তাকিয়ে রইল জাওয়াদ। এটাই লাস্ট প্যাকেট ছিল।

সাইয়ারা বিছানায় উঠে বসে বলল,

“লজ্জা লাগে না বড়ো ভাই হয়ে ছোটো ভাইকে দিয়ে সিগারেট আনাতে?”

জাওয়াদ গম্ভীর গলায় বলল,

“তুই কী করলি এটা?”

“আজ থেকে সিগারেট খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।”

জাওয়াদ সাইয়ারার মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর হাত বাড়িয়ে সাইয়ারার মুখ দুই হাতের মাঝে নিলো , তারপর বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে সাইয়ারার ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

“সিগারেট খেতে না দিলে এটা খেতে দে। একটার নেশা আরেকটা দিয়ে দূর করি।”

“ইশ! সরো।”

লজ্জায় লাল হয়ে উঠল সাইয়ারার গাল দুটো। জাওয়াদকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলেও পারল না। জাওয়াদ তাকে নিচে ফেলে ওপরে উঠে গেলো। সাইয়ারা লজ্জায় পাশ থেকে বালিশ তুলে নিজের মুখের ওপর চাপা দিলো।

জাওয়াদ একটানে বালিশটা সরিয়ে ফেলে দিলো মেঝেতে। বাকা হেসে বলল,

“বিয়ের দশ বছর পর ফাইনালি বাসর করব।”

“একদম না, সরো আমার ওপর থেকে।”

“কোনো না না চলবে না, জান। কাছে আসো।”

জাওয়াদ সাইয়ারার ঘাড়ে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল। ফিসফিস করে বলল,

“আমি শুধু হাঁটতেই পারি না, তাছাড়া বা—

✦ রাইটার'স নোট ✦


হা হা, শেষ না? হ্যাঁ শেষ, ওদের বাসর আর দেখতে হবে না। যান, গিয়ে ঘুমান

গল্পটা আরও ছোটো হবে ভেবেই শুরু করেছিলাম, তাও লিখতে লিখতে অনেকটা বড়ো হয়ে গেলো। আমি এই গল্পে নায়ক নায়িকার রোমান্স লিখব ভেবে গল্পটা শুরু করিনি। সম্পত্তি আর টাকার লোভে মানুষ কীভাবে বদলে যায় সেটাই লিখতে চেয়েছি, তবুও ভালোভাবে বিষয়টা ফুটিয়ে তুলতে পারিনি। পুরো গল্পটা কেমন লেগেছে জানাতে ভুলবেন না।
বিজ্ঞাপন
দুজনে গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক গল্প