দুজনে

পর্ব - ৫

🟢

সাইয়ারা দূর থেকেই তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে। জাওয়াদের রাগী, কর্কশ গলার আওয়াজ সে শুনেছে, তবে জাওয়াদ কি বলছিল সেটা স্পষ্ট শুনতে পায়নি। ড্রয়িংরুমের আবছা হলদে আলোয় সরোয়ার শিকদারের ফ্যাকাশে মুখটাও তার নজরে এলো না সেভাবে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সরোয়ার শিকদারের সামনে দাঁড়াল। সরোয়ার শিকদারের চেহারায় যে ভয়ের ছাপ, তা সাইয়ারার নজর এড়াল না। সে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে? মাঝরাতে এখানে দাঁড়িয়ে তোমরা এভাবে কী নিয়ে কথা বলছ?”

সরোয়ার শিকদার মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। তারপর মেয়ের দিকে ফিরে স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করলেন।

“তেমন কিছু না, তুই না ঘুমিয়ে এত রাতে এখানে কেন?”

সাইয়ারা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মন বলল বাবা মিথ্যা বলছেন, কিন্তু এই মুহূর্তে আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না তার। জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে দেখল তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক অবজ্ঞা আর রাগ। সাইয়ারা আর দাঁড়াল না, ঘুরে রান্নাঘরের দিকে এগোল ঠান্ডা পানির বোতল আনার জন্য।

সাইয়ারা চলে যেতেই জাওয়াদ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। প্রশ্নের উত্তরও জানার ইচ্ছে হলো না আর। হুইল চেয়ারটা ঘুরিয়ে চলল বড়ো খোলা বারান্দাটার দিকে। বারান্দার মাঝখানে এসে জাওয়াদ চেয়ারটা থামাল। বাইরের আকাশে তখন মেঘের আনাগোনা, হালকা ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছে তার মুখে। কিন্তু তার ভেতরের আগুন নেভানোর ক্ষমতা এই বাতাসের নেই। সে পকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিলো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে উড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল সে।

সাইয়ারা পানির বোতল হাতে রুমে ফিরে এসে দেখল জাওয়াদ রুমে নেই। ড্রয়িংরুমেও তো জাওয়াদকে দেখল না। বারান্দার দরজা বন্ধ। জংলি লোকটা গেলো কোথায়? যেখানেই যাক, তাতে তার কী? পানির বোতলটা রেখে দিলো সেন্টার টেবিলের ওপর। তারপর লাইট নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল সে। গতরাতে না ঘুমানো, আর সারা দিনের ক্লান্তির কারণে শোয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলো সাইয়ারা।

জাওয়াদ যখন রুমে ফিরল তখন ঘড়িতে প্রায় একটা বেজে গেছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বসে থাকতে তার ভালোই লাগছিল, কিন্তু ঘুম পেয়ে যাওয়ায় চলে এসেছে।

দরজা লাগিয়ে ফ্রেশ হয়ে সাইয়ারার শিয়রে এসে থামলো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত সাইয়ারার মুখের দিকে। সাইয়ারা এপাশ ফিরেই শুয়ে আছে। ফ্যানের বাতাসে উড়াউড়ি করছে কিছু চুল। বাম হাতটা গালের নিচে।

ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়েও ফিরিয়ে আনলো জাওয়াদ। সাইয়ারার আরও কাছে এগিয়ে গভীর স্বরে বলল,

“হেই ভালোবাসা, এভাবে কীভাবে ঠকালি? আমার ভালোবাসায় কমতি ছিল কোথায়? নাকি তোর কাছ থেকে দূরে যাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল?”

হুট করেই চোখ মেলে তাকাল সাইয়ারা। সাইয়ারাকে তাকাতে দেখে জাওয়াদের বুকের ভেতর ধক করে উঠলেও তা চেহারায় প্রকাশ পেল না। কিন্তু সাইয়ারা ভয় পেয়ে ছিটকে দূরে সরে গেলো মৃদু চেঁচিয়ে। বুকে এক হাত হাত চেপে অন্য হাতের আঙুল তুলে কর্কশ গলায় বলল,

“এ্যাই, আপনি এখানে কী করছেন? আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে কী করতে চাইছিলেন আপনি?”

জাওয়াদের চোয়াল শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“কী বলতে চাইছিস তুই? তোর ঘুমের সুযোগ নিতে চাইছিলাম আমি? সবাইকে কী নিজের মতন—

“থামলেন কেন? নিজের মতন কী? চরিত্রহীন বলতে চাইছিলেন? চরিত্রে সমস্যা তো আপনার।”

“একদম ফালতু কথা বলবি না নয়তো চড়িয়ে দাঁত ফেলে দিবো!”

সাইয়ারার রাগ বেড়ে গেলো আরও। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

“বললে কী করবেন? সাহস থাকলে ছুঁয়ে দেখুন শুধু!”

জাওয়াদ হুইল চেয়ার ছেড়ে বিছানায় বসে পড়ল। হাঁটতে না পারলেও দাঁড়াতে পারে এখন, বহু কষ্টে দুই তিন কদম আগাতেও পারে। ডাক্তার বলেছেন সে আবার হাঁটতে পারবে।

জাওয়াদকে বিছানায় উঠে আসতে দেখে সাইয়ারা দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে গেলো। তবে জাওয়াদ সাইয়ারাকে কিছু বলল না, তার দিকে আর তাকালোও না। গায়ের টি-শার্ট খুলে উলটো ফিরে শুয়ে পড়ল।

ফ্যালফ্যাল করে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে রইল সাইয়ারা। কী হলো এটা? সে তো ভেবেছিল জাওয়াদ সত্যি সত্যিই তাকে মা’রার জন্য এগোবে, বা রূঢ় হয়ে কিছু কথা শুনিয়ে দিবে।

*****

রাতে আর কোনো রকম ঝামেলায় জড়ায়নি দুজন। সাইয়ারা বিছানায়ও ঘুমায়নি আর, নিজের রুমের সোফায় শুয়েছিল সে।

সকাল নয়টা বাজতেই বাড়িতে প্রবেশ করলেন জামশেদ শিকদার। তার সঙ্গে জেসমিনও এসেছে। এই অসময়ে বড়ো ভাইকে বাড়িতে দেখে বেশ অবাক হলেন সরোয়ার শিকদার।

রোকেয়া বেগম আঁচল টেনে এগিয়ে এলেন সোফার কাছে। দুজনের চিন্তিত মুখ দেখে জামশেদ শিকদার বললেন,

“জাওয়াদ কল করেছিল ওদের দুজনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, তাই এলাম।”

দুজনেই ভীষণ অবাক হলেন। সরোয়ার শিকদার বললেন,

“এখনই কেন? যাবে তো বিকেলে।”

“আমিও সেটাই বলেছিলাম কিন্তু জাওয়াদের নাকি ভালো লাগছে না।”

“আর তো মাত্র কিছু ঘণ্টা।”

“আমি বারবার বিকেল পর্যন্ত থাকতে বললেও ও রাজি হয়নি। অন্যদিন না-হয় আবার আসবে। জানিসই তো কথা শোনে না। মুখ দিয়ে একবার যা বলবে তাই করবে।”

স্বামীওস্ত্রী দুজন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। জাওয়াদকে তো সেভাবে কিছু খাওয়াতেই পারলেন না। গতরাতে খায়নি, সকালে শুধু হালকা নাশতা করেছে।

জামশেদ শিকদার আবার কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই ড্রয়িংরুমে এলো সাইয়ারা। শ্বশুরকে দেখে সাইয়ারার পা দুটো থেমে গেলো কিছুটা দূরে। জামশেদ শিকদার এসেছেন জানলে সে এখন রুম থেকেই বের হতো না। ভাবনায় এতই মশগুল ছিল যে আগে সোফার দিকে খেয়ালই করেনি।

জামশেদ শিকদার হাসি মুখে বললেন,

“ব্যাগ ট্যাগ গোছানো শেষ?”

সাইয়ারা বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল। কীসের ব্যাগ ট্যাগ গোছাবে?

“জাওয়াদ কোথায়?”

সাইয়ারা থমথমে গলায় বলল,

“রুমেই।”

“তাহলে রেডি হয়ে নাও।”

“কীসের জন্য?”

“কীসের জন্য আবার? বাড়িতে যাবে না?”

“গতকাল না বললেন বিকেলে যাব।”

“হ্যাঁ, বলেছিলাম কিন্তু জাওয়াদ তো এখনই চলে যেতে চাইছে। ও তোমাকে কিছু বলেনি?”

“না।”

“আচ্ছা ওকে ডাকো।”

সাইয়ারা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চোয়াল শক্ত করে রুমের দিকে এগোল আবার। রুমে এসে জাওয়াদকে পেল না। জাওয়াদ ওয়াশরুমে। পুনরায় ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে বলল,

“উনি ওয়াশরুমে।”

“রুমে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নাও। আমার একটু তাড়া আছে।”

সাইয়ারা বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের রুমের দিকে এগোল। তারও ভালো লাগছে না এখানে। বাবা-মায়ের মুখ দেখলেই তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। বাবা-মা হয়ে তারা সন্তানের সঙ্গে এত বড়ো অন্যায় কীভাবে করতে পারল? সব জেনেশুনে তাকে এমন একটা জীবনের দিকে ঠেলে দিলো। যেই জামশেদ শিকদারকে দুই চোখে দেখতে পারতো না, এখন তার সঙ্গে কত সুন্দর করে কথা বলছে। যেই কাকাকে দিনরাত অভি’শাপ দিত তার সঙ্গে কী সুন্দর করে কথা বলল!

রাগে রিরি করে উঠল সাইয়ারার পুরো শরীর।

রুমে এসে প্রথমে কাপড়চোপড়গুলো গুছিয়ে নিলো, তারপর নিজের সব বই খাতা। সে আর আসবে না এই বাড়িতে। কোনোদিনও না।

জাওয়াদ ওয়াশরুমে থেকে বেরিয়ে দেখল সাইয়ারা কিছু খুঁজছে। ড্রেসিং টেবিলের আশপাশটা সে খুব ভালোভাবে খুঁজছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পাচ্ছে না।

স্যুটকেসের দিকে নজর পড়তেই দেখল স্যুটকেসের কাছে ছোটো চকচকে কিছু একটা পড়ে আছে। ভালোভাবে খেয়াল করতেই জাওয়াদের হার্টবিট বাড়তে লাগল। সে যা ভাবছে ওটা কী সেটাই? জাওয়াদ হুইল চেয়ার নিয়ে এগিয়ে এসে জিনিসটা হাতে তুলে নিলো। হাতে নেওয়ার পরই কয়েক মুহূর্তের জন্য তার হৃৎস্পন্দন থমকে গেলো। সে যেন কোনো এক ঘোরের মধ্যে চলে গেলো মুহূর্তেই।

সাইয়ারা ড্রেসিং টেবিলের আশপাশটা খুব ভালোভাবে খুঁজেও পেল না আংটিটা। এখানেই তো পড়েছিল, কোথায় গেলো? কান্না পেয়ে গেলো সাইয়ারার। কেন যে তাড়াহুড়ো করতে গেলো সে! এর আগেরবার গলার চেইন ছিঁড়ে যখন হারিয়ে গিয়েছিল তখন পুরো দুদিন সে কেঁদেছিল। দুদিন পরই ড্রয়িংরুমের সোফার চিপায় পেয়েছিল। আংটিটা পড়ে এক জায়গায় আর চলে যায় আরেক জায়গায়। আজকেও এমনটাই হলো।

ফ্লোরে নজর বোলাতে বোলাতে পেছন ফিরতেই দেখল জাওয়াদকে। আর জাওয়াদের হাতে আংটিটা দেখে তারও হৃৎস্পন্দন থমকে গেলো। আংটিটা এই জংলি খাটাস লোকের হাতে গেলো কীভাবে?

সাইয়ারা এগিয়ে এসে ছো মে’রে আংটিটা নিয়ে নিলো জাওয়াদের হাত থেকে। হাতটা নিজের পেছনে লুকিয়ে শুকনো মুখে জাওয়াদের গুরুগম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল।

জাওয়াদও তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

এই স্বর্ণের আংটিটা বিয়ের পরের দিন জাওয়াদ তাকে এনে দিয়েছিল। আংটিটা যখন ছোটো হয়ে গিয়েছিল, তার হাতে আর লাগছিল না তখন সে চেইনের লোকেট বানিয়ে গলায় পরে থাকতো। চেইন ছিঁড়ে হারিয়ে ফেলার পর আবার যখন খুঁজে পেয়েছিল সেদিনের পর আর সে এই আংটিটা পরেনি, যত্ন করে রেখে দিয়েছিল এতকাল। আজকে তাড়াহুড়ো করে বের করতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিল।

নিজের দেওয়া আংটিটা চিনতে জাওয়াদের বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি। দূর থেকে দেখেই সে চিনতে পেরে গিয়েছিল। এটা এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছে সাইয়ারা?

বিজ্ঞাপন

সাইয়ারা দ্রুত উলটো ফিরে দাঁড়াল। আংটিটাকে কেন এই জংলি খাটাস লোকের হাতে গিয়েই পড়তে হলো? খাটাস লোকটা যদি বুঝে যায় সে এখনো—

না কিছুতেই না। সে ভালোবাসে নাকি এই জংলি লোকটাকে? সে তো তার স্বামিকে ভালোবাসে যে কি-না এখন আর বেঁচে নেই। হ্যাঁ, বেঁচে নেই।

সাইয়ারা আবার ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। জাওয়াদের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনার আব্বু এসেছেন। ড্রয়িংরুমে বসে আছে, আপনাকে ডাকছে।”

সাইয়ারা গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলার চেষ্টা করলেও জাওয়াদ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে সাইয়ারার কণ্ঠস্বরের কম্পন। সাইয়ারা তার সামনে থেকে পালিয়ে গেলো কেন? কী লুকাতে চাইছে সে?

জেসমিন রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে টোকা দিয়ে বলল,

“ভাইয়া-ভাবি তোমাদের হলো? বড়ো আব্বু দ্রুত করতে বলেছে।”

জাওয়াদ গম্ভীর গলায় বলল,

“আসছি।”

জেসমিন ফিরে গেলো। জাওয়াদ সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কী একটু ওখান থেকে সরবেন? সরলে চুলগুলো আঁচড়ে নিতাম।”

সাইয়ারা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা বাক্সটা নিয়ে সরে গেলো দ্রুত। জাওয়াদ এগিয়ে এসে চুলগুলো আঁচড়ে ঘড়ি পরে নিলো। জুতো জোড়া পরে রুম থেকে বের হতে হতে বলল,

“দ্রুত রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে আয়।”

জাওয়াদ হুইল চেয়ার নিয়ে চলে গেলো।

সাইয়ারা হাতের মুঠোয় থাকা আংটিটার দিকে তাকাল। এই আংটিটাকে সে মৃ’ত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের কাছে রাখবে।

সাইয়ারা বোরকা হিজাব পরে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সে যে পুরোপুরি পর্দা করে ব্যাপারটা এমন নয়, তবে বাইরে বের হলে বোরকা হিজাব পরেই বের হয় সবসময়। নিয়মিত নামায আদায় করারও চেষ্টা করে।

সরোয়ার শিকদারের কথা মতন সোহান সাইয়ারার রুমে এলো স্যুটকেস নেওয়ার জন্য। দুটো স্যুটকেস আর একটা বড়ো ব্যাগ দেখে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর তার চোখ পড়ল স্টাডি টেবিলের ওপর আর ছোটো খাটো বুক শেলফের দিকে। তার বুঝতে বাকি নেই বাকি দুটো ব্যাগ আর স্যুটকেসে কি রয়েছে। দুটো স্যুটকেস টেনে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। তার হাতে দুটো স্যুটকেস দেখে তিনজন অবাক হয়ে তাকালেন সোহানের দিকে। জামশেদ শিকদার বললেন,

“স্যুটকেস দুইটা কেন?”

সোহান স্যুটকেস দুটো রেখে আবার রুমের দিকে হাঁটা ধরে বলল,

“আরও একটা ব্যাগ আছে।”

ভীষন অবাক হলো তিনজন। জামশেদ শিকদার সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“এত কী নিয়েছো?”

সাইয়ারা নিচের দিকে দৃষ্টি রেখেই গম্ভীর গলায় বলল,

“আমার বই খাতা।”

“বই খাতা নিয়ে কী করবে?”

এবার চোখ তুলে তাকাল সাইয়ারা। বলল,

“বই খাতা দিয়ে মানুষ কী করে? নিশ্চই লেখাপড়া করে, আমিও সেজন্যই নিচ্ছি।”

জামশেদ শিকদার কিছু বললেন না আর।

সোহান ব্যাগটা নিয়ে আসতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ওজনে হালকা স্যুটকেসটা জেসমিনের হাতে ধরিয়ে দিলেন। ব্যাগ আর অন্য স্যুটকেসটা নিজের হাতে নিলেন। তারপর সকলকে নিয়ে এগোলেন দরজার দিকে।

জাওয়াদের মাথায় ঘুরঘুর করছে আংটির ব্যাপারটা।

বাড়ির গেইট থেকে বের হওয়ার সময় সাইয়ারা মৃদুস্বরে বাবা-মাকে শুধু বলল “আসছি।”

দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তাদের ভালোভাবে পড়াশোনা করতে বলল। বাজে ছেলেপেলেদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করল। শেষে ছলছল চোখে দুই ভাইকে দেখতে দেখতে এগোল শ্বশুরবাড়ির দিকে।

রোকেয়া বেগম সকালে যখন সাইয়ারাকে এটা সেটা খেতে বলছিলেন আর তার সঙ্গে বারবার কথা বলার চেষ্টা করছিলেন তখন সাইয়ারা রুক্ষ গলায় বলেছিল তার জন্য যেন আদিখ্যেতা না করে। এসব নাটক তার ভালো লাগছে না।

দুটো স্যুটকেস আর একটা ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে হোসনে আরা আর জেসমিনের মা উম্মে হাবিবাও অবাক হলেন। সাইয়ারা দুজনকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করেই রুমের দিকে এগিয়ে গেলো জাওয়াদের পেছন পেছন।

জেসমিন স্যুটকেস দিয়ে ফিরে আসতেই হোসনে আরা তাকে বললেন,

“এত কিছু কী আনছে?”

“কাপড়চোপড় আর ভাবির বই খাতা।”

“বই খাতা আনছে?”

“হুম।”

“কেন?”

“পড়াশোনা করার জন্য।”

হোসনে আরা আর কিছু বললেন না। উম্মে হাবিবা কর্কশ গলায় বললেন,

“বিয়ের পর আবার কীসের পড়াশোনা? যা করছে বিয়ের আগেই করছে, বিয়ের পরে আর কোনো পড়াশোনার প্রয়োজন নেই।”

জেসমিনের নানি এগিয়ে আসতে আসতে বললেন,

“নতুন তাওইয়ের বাড়িত যাইয়া কী কী খাইলি?”

“গিয়ে তো ছিলামই অল্প সময়, এর মধ্যে আবার কী কী খাব? বাড়ি থেকে তো খেয়েই গিয়েছিলাম।”

“তাই বলে কিছুই খাসনি?”

“খেয়েছি। অরেঞ্জ জুস, ফ্রুটস, মিষ্টি, দই, আইসক্রিম।”

হোসনে আরা বললেন,

“খাসনি তাও দেখছি অনেক খেয়ে ফেলেছিস।”

জেসমিন হেসে সিঁড়ির দিকে এগোল চেঞ্জ করার জন্য।

সাইয়ারা রুম থেকে বের হলো যোহরের নামায আদায় করে। খাওয়ার জন্য ডাকছে তাকে। সামিউল শিকদার আর জাওয়াদ বাদে বাড়িতে আর কোনো পুরুষ নেই। জাওয়াদ ঘুমাচ্ছে, সে খেতে আসবে না এখন।

বাকিদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিলে বসল সাইয়ারা। খাবার বেড়ে দিতে দিতে হোসনে আরা থমথমে মুখে বললেন,

“তুই নাকি বইপত্র নিয়ে এসেছিস?”

সাইয়ারা হাতের গ্লাসটা রেখে বলল,

“হ্যাঁ।”

“বিয়ের পর পড়াশোনা করার এর কী দরকার? বিয়ে হয়েছে এখন সংসার করবি।”

“বিয়ে তো আরও দশ বছর আগেই হয়েছে, এতকাল তো পড়াশোনা বাদ দিয়ে সংসার করার কথা বলেননি, তবে এখন কেন বলছেন?”

“তখন তুই ছোটো ছিলি।”

“দুদিনেই বড়ো হয়ে গেলাম?”

উম্মে হাবিবা বললেন,

“মুখে মুখে এত তর্ক করছো কেন?”

“তর্ক কোথায় করছি, কাকি? আমি তো শুধু উত্তর দিলাম। যখন বিয়ে হয়েছিল তখন না-হয় ছোটো ছিলাম, এর পর কী বড়ো হইনি? আমি বিয়ের পর পড়াশোনা করতে চাইছি বলে আপনারা নিষেধ করছেন, অথচ আপনাদের ছেলে বউ রেখে যখন অন্য মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছে তখন তাকে নিষেধ করেননি। কেন করেননি? তখন যখন সবাই চুপচাপ মেনে নিয়েছিলেন, এখনো মেনে নিন। আমি পড়াশোনা করছি মানে করছি-ই।”

বিজ্ঞাপন
দুজনে গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক গল্প