“কটা টাকার জন্য আমাকে এক প’ঙ্গু লোকের সঙ্গে বিয়ে দিবেন, আব্বা?”
সাইয়ারার কন্ঠস্বর ভীষণ অসহায় শোনাল। কথা বলতে গিয়ে কেঁপেও উঠল কিছুটা। তার কথা শুনে তার বাবা সরোয়ার শিকদার কর্কশ গলায় ধমকে বললেন,
“থাপড়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব। কাকে পঙ্গু বলছিস তুই?”
“যে পঙ্গু তাকেই পঙ্গু বলেছি আমি। আমি এই বিয়ে করব না।”
“আর একবার এসব বললে সত্যি সত্যিই মা’র খাবি, সাইয়ারা।”
“মা’রুন, মা’রতে মা’রতে মে’রে ফেলুন, তবুও এই বিয়ে আমি করব না। আপনি বাবা হয়ে মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট করতে চাইছেন কীভাবে?”
সরোয়ার শিকদার দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“তোর জীবন নষ্ট করতে চাইছি আমি?”
“তা নয়তো কী? আপনি জেনে শুনে টাকার বিনিময়ে এক পঙ্গু লোকের কাছে আমাকে বিয়ে দিতে চাইছেন কীভাবে?”
“তোর বিয়ে যে আরও দশ বছর আগেই জাওয়াদের সঙ্গে হয়ে গেছে সেটা ভুলে যাস না। এখন তোকে বিয়ে দিচ্ছি না বরং তোর স্বামীর কাছে তোকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।”
“স্বামী? কে স্বামী? দশ বছর আগে ওটা বিয়ে ছিল? এত বছর বউ না মেনে এখন এসেছে বউকে ঘরে তোলার জন্য? হাস্যকর ব্যাপার স্যাপার! বিদেশ থাকতে না বলেছিল দেশে ফিরে তালাক দিয়ে দিবে। তার নাকি প্রেমিকা আছে, সেই প্রেমিকাকে বিয়ে করবে। আপনারা সবাইও তো রাজি ছিলেন এতে। আপনি তো বলেছিলেন কোনোভাবেই আমাকে ওই বাড়িতে পাঠাবেন না। এখন ভাই আর ভাতিজার প্রতি এত পিরিত জেগে উঠছে কেন? টাকা দিয়েছে বলে? টাকার বিনিময়ে মেয়েকে বিক্রি করতে বুক কাঁপছে না আপনার? এত লোভী কেন আপনি?”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে শেষের কথাগুলো বলল সাইয়ারা। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে মেয়ের গালে চড় বসিয়ে দিলেন সরোয়ার শিকদার।
আঙুল তুলে শাসিয়ে বললেন,
“আর একটা উল্টাপাল্টা কথা বলবি তো থাপড়ে তোর গাল লাল বানিয়ে দিবো। আজকে জাওয়াদের সঙ্গে তোর আবার বিয়ে হবে, আর তুই ওই বাড়িতে গিয়েই থাকবি ওর সঙ্গে।”
“আমি ম’রে যাব তবুও ওই বাড়িতে যাব না। আপনি টাকা পেয়ে সবকিছু ভুলে গেলেও আমি কিচ্ছু ভুলিনি। ওরা বাড়ি বয়ে এসে যে আপনার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে গিয়েছিল সেটা ভুলে গেছেন? এত অপমান এত লাঞ্ছনা ভুললেন কীভাবে?”
“আজকে যদি তুই ওদের সঙ্গে ওদের বাড়িতে না যাস তবে আমি গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিবো। যদি এমন কিছু না চাস তবে চুপচাপ বিয়ে করে চলে যাবি ওদের বাড়িতে।”
আর এক মুহুর্তও মেয়ের রুমে দাঁড়ালেন না সরোয়ার শিকদার। গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন রুম থেকে। বাবার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল সাইয়ারা। সে আজ সত্যিই নিজের বাবাকে চিনতে পারছে না। দুদিনের মধ্যে এত বদলে গেলো কীভাবে? ইনি কী সত্যিই তার বাবা?
জাওয়াদের কথা স্মরণ হতেই রাগ আর ঘৃণায় শরীর রিরি করতে লাগল।
অ্যাকসিডেন্ট হয়ে পঙ্গু না হলে কী আজ তাকে নিজের বাড়িতে আর নিজের জীবনে নিতে চাইতো? জীবনেও না, বরং তাকে তালাক দিয়ে নিজের প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। অ্যাকসিডেন্ট হয়ে পঙ্গু হওয়ার পর নিশ্চই প্রেমিকা ছেড়ে চলে গেছে, আর কোনো ভালো অপশন না পেয়ে তাকে নিয়ে যেতে চাইছে।
রাগে দুঃখে মাথার চুল দুই হাতে খামচে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল সাইয়ারা। সে স্পষ্টই বুঝতে পারছে তার বাবার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে ওই বাড়ির মানুষগুলো। তার মা-ও কিছু বলছে না। ভাই দুটো তো ছোটোই।
.
রাত এগারোটায় সরোয়ার শিকদারের বাড়িতে প্রবেশ ঘটল জাওয়াদ শিকদার আর তার পরিবারের। জাওয়াদ হুইল চেয়ারে বসে আছে। হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে আসছে জাওয়াদের ছোটো ভাই জাবিন শিকদার। জাওয়াদের চোখমুখ গম্ভীর, চোয়াল শক্ত, ফরসা চেহারায় কাঠিন্য ভাব, দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে।
সরোয়ার শিকদার আর তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম হাসি মুখে সকলকে স্বাগতম জানালেন নিজেদের বাড়িতে। বিনয়ের সঙ্গে সকলকে সোফায় বসতে দিলেন। জাওয়াদ হুইল চেয়ারেই বসে রইল। আলাদা করে আর সোফায় বসার প্রয়োজন বোধ করল না সে। ঝামেলা শেষ করে যত দ্রুত বাড়িতে ফিরতে পারবে তার জন্য ততই ভালো।
সরোয়ার শিকদারের চাচাতো ভাই মানে জাওয়াদের বাবা জামশেদ শিকদার বললেন,
“রাত তো অনেক হয়েছে, আর দেরি করে কী হবে? বিয়ের ঝামেলাটা তাহলে মিটিয়ে ফেলা হোক।”
সরোয়ার শিকদার বললেন,
“খাবার খেয়ে নাও আগে, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে সব।”
জামশেদ শিকদারের ছোটো ভাই জামিল শিকদার বললেন,
“খেয়েই তো এলাম, এখন আর খাওয়ার ঝামেলা করতে হবে না। সাইয়ারার কাগজপত্র নিয়ে আসুন।”
“তা বললে তো হবে না। খেতে চলো সবাই।”
কেউ খেতে চাইল না এখন, কিন্তু সরোয়ার শিকদারও ছাড়লেন না কাউকে। এতগুলো বছর পর ভাই-ভাতিজারা তার বাড়িতে এসেছে আর তিনি না খেয়েই যেতে দিবেন তা কী করে হয়।
সবাই খাওয়ার জন্য এগোলেও জাওয়াদ হুইল চেয়ার নিয়ে আগের মতোই বসে রইল। জাবিন হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে যেতে উদ্যত হতেই জাওয়াদ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছে সে খাবে না। জাবিনও আর কিছু না বলে সকলের সঙ্গে ডাইনিংরুমের দিকে এগিয়েছে।
সরোয়ার শিকদার জাওয়াদের কাছে ফিরে এসে বললেন,
“জাওয়াদ, তুমি খাবে না?”
জাওয়াদ অত্যন্ত গম্ভীর গলায় ‘না’ উচ্চারণ করল। সরোয়ার শিকদার জোর করতেই জাওয়াদ বিরক্তি প্রকাশ করে রুক্ষ স্বরে বলল,
“বলেছি তো খাব না। কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবেন না।”
সরোয়ার শিকদার বাক্যহারা হয়ে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত, তারপর আর কিছু না বলে ডাইনিংরুমের দিকে এগোলেন।
খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই সোফায় বসল আবার। কাজী সাহেব ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপার রেডি করলেন, তারপর রেজিস্ট্রি পেপার সাইয়ারার কাছে নিয়ে আসা হলো। সাইয়ারা লাল টকটকে বেনারসি শাড়ি পরে বিছানায় বসে আছে, চোখজোড়া এখনো পানিতে টইটম্বুর। পার্লার থেকে একটা মেয়ে এসে তাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। সাজানোর পর থেকে সাইয়ারা নিজের রুমেই বসে আছে, বাড়ির কারো সঙ্গেই কথা বলছে না। সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না এই বিয়ে, যদিও সে আরও দশ বছর আগে থেকেই জাওয়াদ শিকদারের স্ত্রী। অবুঝ বয়সে না বুঝেই কবুল করে নিয়েছিল জাওয়াদ শিকদারকে। তারপর কত ঝড়ঝাপটা উত্থান পতন ঘটে গেছে। বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে ওই লোক আর তার পরিবারের উপর।
রেজিস্ট্রি পেপার সাইয়ারার সামনে রেখে সই করতে বললেন কাজী সাহেব।
সাইয়ারা চোখ তুলে তাকাল সকলের দিকে। ঘৃণা আর বিদ্বেষে চোখ নামিয়ে নিলো সঙ্গে সঙ্গেই। সরোয়ার শিকদার বললেন,
“সাইয়ারা, সই কর।”
সাইয়ারা চোখ তুলল আবার। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু। একরাশ ঘৃণা, অভিমান, রাগ আর বুক ভরা চাপা কষ্ট নিয়ে ঘস ঘস করে সই করে দিলো সে।
সই করা হয়ে যেতেই রোকেয়া বেগম বাদে সবাই বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। সাইয়ারা অশ্রুসিক্ত নয়নে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। রোকেয়া বেগম মেয়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“মাফ করে দে, মা। এটা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমাদের কাছে।”
মায়ের হাত সরিয়ে দিলো সাইয়ারা। কান্না জড়ানো গলায় বলল,
“ওই বাড়িতে পাঠানোর চেয়ে গলা টিপে মে’রে ফেলতে, মা।”
“তুই ভালো থাকবি ওই বাড়িতে।”
চোখে পানি অথচ সাইয়ারার ঠোঁটে হাসি ফুটল। ভালো থাকবে ওই বাড়িতে? আসলেই ভালো থাকবে সে।
আইনিভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে দুজনের। দশ বছর আগে ধর্মীয়ভাবেও দুজনের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল, তবু আজ আবারও ধর্মীয়ভাবে দুজনের বিয়ে সম্পন্ন করা হবে। সাইয়ারা কবুল বলেছে, এখন শুধু জাওয়াদ বলবে।
রেজিস্ট্রি পেপারে সই করার সময় সাইয়ারা সময় নিলেও জাওয়াদ নেয়নি।
কাজী সাহেব সাইয়ারার রুম থেকে বেরিয়ে জাওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
“জামশেদ শিকদারের সুযোগ্য পুত্র জাওয়াদ শিকদার আপনি কী সরোয়ার শিকদারের সুযোগ্য কন্যা সাইয়ারা সিকদারকে এক কোটি টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি? রাজি থাকলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
জাওয়াদ রোবটিক ভঙ্গিতে সশব্দে উচ্চারণ করল “আলহামদুলিল্লাহ কবুল।” তারপর আরও দুবার একই বাক্য উচ্চারণ করল।
বিয়ে বাড়ি হলেও কোনো কোলাহল নেই, বাড়ির পরিবেশ একদম শান্ত। কেউ বলতেই পারবে না এটা বিয়ে বাড়ি।
কাজী সাহেব বিদায় নিলেন নিজের কাজ শেষ করেই। জাওয়াদকে সাইয়ারার রুমে নিয়ে আসা হলো হুইল চেয়ার ঠেলে।
মাথা নিচু করে বসে থাকা সাইয়ারা মুখ তুলে তাকাল। দেখল জাওয়াদ শিকদারও তার দিকে তাকিয়ে আছে। জাওয়াদকে দেখে পায়ের র’ক্ত ছলকে মাথায় উঠে গেলো তার। এই অসভ্য অভদ্র লোককে তার দুই চোখে সহ্য হয় না।
আর এই লোক বিয়ে করতে এসেছে নাকি চুরি করতে এসেছে? চুল দাড়ির এই অবস্থা কেন? দেখে মনে হচ্ছে কয়েক মাস ধরে চুল দাড়ি কা’টে না। বিয়ে করতে এসেছে শেরওয়ানি তো দূর একটা পাঞ্জাবি পর্যন্ত পরে আসেনি। সাধারণ টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে হুইল চেয়ারে বসে এসেছে বিয়ে করতে, তার উপর চুল দাড়ির কী অবস্থা! তার দিকে তাকিয়ে আছে কেমন করে। মনে হচ্ছে ধরে চিবিয়ে খাবে তাকে।
চোয়াল শক্ত করে চোখ নামিয়ে নিলো সাইয়ারা।
হুইল চেয়ার ঠেলে বিছানার কাছে নিয়ে আসা হলো। সরোয়ার শিকদার মেয়ের হাত ধরে বিছানা থেকে নামালেন। জাওয়াদের ডান হাতটা ধরে তার হাতের মুঠোয় সাইয়ারার ডান হাত রেখে আবেগঘন কণ্ঠে বললেন,
“আমার একমাত্র মেয়েকে আমি আজ তোমার হাতে তুলে দিলাম। ও অনেক কষ্ট পেয়েছে, ওকে আর কখনো কষ্ট দিও না।”
বাবার কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল সাইয়ারার ঠোঁটে। তাকে হাত-পা বেঁধে আগুনে ফেলে দিয়ে আগুনকে বলছে যেন তাকে না পুড়ায়। সাইয়ারা জাওয়াদ আর বাবার হাতের মাঝখান থেকে নিজের হাত বের নেওয়ার চেষ্টা করতেই জাওয়াদ শক্ত করে চেপে ধরল হাতটা, খুবই রুক্ষভাবে ধরেছে, সাইয়ারার মনে হচ্ছে এই বুঝি হাতটা গুড়ো গুড়ো হয়ে যাবে জাওয়াদের শক্ত হাতের চাপে। চোখে চোখ পড়ল দুজনের। সাইয়ারার চোখে আগুন জ্বলছে। জাওয়াদের চোয়াল কঠিন, তীক্ষ্ণ রুক্ষ দৃষ্টি। কেমন একটা তাচ্ছিল্যভাব চোখেমুখে।
বিদায়ের সময় একটুও কাঁদল না সাইয়ারা। তার চোখমুখ কঠিন, বহু কষ্টে নিজেকে শক্ত করে রেখেছে। বাবা-মায়ের উপর তার ভীষণ রাগ আর অভিমান জমে গেছে। দুজনেই নিজেদের স্বার্থ দেখল, অথচ তার কথা ভাবল না। দাদা এক ভুল করেছিল, এখন বাবাও করল। টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিলো তাকে! টাকার এত ক্ষমতা কেন?
শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না সাইয়ারার। নিজের বাড়ি থেকে বের হওয়ার তিন মিনিট পর শ্বশুরবাড়িতে এসে পৌঁছেছে। কাছাকাছিই বাড়ি। বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হওয়ার পর ডান দিকে তিন মিনিট হাঁটলেই জাওয়াদের বাড়ি।
সাইয়ারা জাওয়াদের পাশাপাশি হাঁটছে অনুভূতি শূন্যের মতন। জাওয়াদের হুইল চেয়ার ঠেলছে জাবিন। জাওয়াদের বাপ, চাচা, মামা, ফুপা, আর ভাইয়েরা তাদের তিনজনের পেছনে রয়েছে। মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সকল নারীরা।
সাইয়ারার ইচ্ছে করছে এখান থেকেই দৌড়ে পালিয়ে যেতে। তার মন মানছে না বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে বা এই পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে। জাওয়াদকে তো তার সহ্যই হচ্ছে না, আর এই পরিবারকে দেখতেই ইচ্ছে করে না।
দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই তাকে বরণ করলেন জাওয়াদের মা হোসনে আরা।
বরণ শেষ হতেই সাইয়ারাকে ফেলে নিজের রুমের দিকে এগোল জাওয়াদ।
জামিল শিকদারের মেয়ে জাহানারা সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ করে বলল,
“এত নাটক করে কী হলো? সেই তো আমাদের বাড়িতেই আসতে হলো।”
সাইয়ারা তাকাল, তবে কিছু বলল না। জাহানারাকে ধমক দিলেন তার মা নীলিমা ইয়াসমিন। হোসনে আরা সাইয়ারাকে বললেন,
“জাওয়াদের রুমে চলে যাও।”
সাইয়ারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল আগের মতো। সে জাওয়াদের রুম চেনে? অবশ্য আগে চিনতো, এখন চিনবে কীভাবে? আর ওই অসভ্য অভদ্র লোক তাকে ফেলে চলে গেলো কেন? যখন এতই অপছন্দ তখন আনলো কেন এই বাড়িতে? এখন এনে আবার অপমান করা হচ্ছে।
জামশেদ শিকদার ছোটো ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“স্যুটকেসটা জাওয়াদের রুমে দিয়ে আয়। সাইয়ারা, তুই জাবিনের সঙ্গে যা।”
জাবিন স্যুটকেস টেনে নিয়ে এগোল, তার পেছন পেছন এগোল সাইয়ারা। রাগে তার শরীর জ্বলতে শুরু করেছে। বাবা যদি আত্মহত্যার ভয় না দেখাতো তবে সে সন্ধ্যার পরই বাড়ি ছেড়ে পালাতো, সারা জীবন একা একা কা’টাতো তবুও এই বাড়িতে আসতো না, আর না তো কোনোদিন জাওয়াদের মুখ দেখতো।
রুমের সামনে এসে স্যুটকেস ভেতরে ঠেলে দিয়ে চলে গেলো জাবিন। রুমের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সাইয়ারা। মনে মনে কিছু কথা গুছিয়ে নিলো, তারপর ভেতরে প্রবেশ করল ধীর পায়ে।
জাওয়াদ হুইল চেয়ার থেকে নেমে সোফায় বসে আছে। চুলগুলো এলোমেলো করে ফেলেছে এটুকু সময়ের মধ্যেই। এত বড়ো বড়ো চুল দাড়ি দেখে জাওয়াদকে জংলির মতন লাগছে সাইয়ারার কাছে।
সিগারেট ধরিয়ে সেটা খাওয়া শেষ করল জাওয়াদ। সিগারেটের বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো রুমে। গন্ধে নাকমুখ কুঁচকে ফেলেছে সাইয়ারা।
জাওয়াদ জুতো খুলল, মোজা খুলল, তারপর টি-শার্টটাও খুলে ফেলল। উন্মুক্ত হলো ফরসা শরীর। সে একবারের জন্যও তাকাচ্ছে না সাইয়ারার দিকে। তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে এই রুমে সে ব্যতীত অন্য কেউ নেই।
কসরত করে সোফা ছেড়ে হুইল চেয়ারে বসল আবার। ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল চিত হয়ে। কর্কশ গলায় বলল,
“সঙের মতন দাঁড়িয়ে আছিস কেন এখনো?”
কথা আর কথার ধরন দেখে মেজাজ আরও বিগড়ে গেলো সাইয়ারার। জাওয়াদের চেয়েও বেশি কর্কশ গলায় বলল,
“আমি থাকবো না আপনার সঙ্গে। মানি না আমি এই বিয়ে।”
“কে মানে এই বা/লের বিয়ে? ভালো না লাগলে বের হ আমার রুম থেকে। এই মাঝ রাতে বকবক করতে পারব না তোর সঙ্গে।”