দুজনে

পর্ব - ৪

🟢

সকালে বাড়ির কারো সঙ্গে খাবার না খেলেও দুপুরের খাবার ডাইনিং টেবিলে বসেই খেতে হয়েছে সাইয়ারাকে। জাওয়াদের বাম পাশের চেয়ারে বসেই খেয়েছে সে। খাবার খাওয়ার সময় বারবার গলায় খাবার আটকে যাচ্ছিল তার। দম বন্ধ লাগছিল। ইচ্ছে করছিল সব ছুঁড়ে ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে।

এখন বিকেল পাঁচটার উপর বেজে গেছে। সাইয়ারাকে সাজানো হচ্ছে এখন। সাজাচ্ছে জাওয়াদের মামাতো বোন। সাইয়ারা পুতুলের মতন বসে আছে। সব অনুভূতি চেপে রেখেছে নিজের ভেতরে।

ভারী মেক-আপ, চোখে গাঢ় কাজল, আর ঠোঁটে ডার্ক লিপস্টিক। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে সাইয়ারা। এই অপরূপ রূপের আড়ালে সাইয়ারার ভেতরের অনুভূতিগুলো এখন সম্পূর্ণ ভোঁতা, নিস্প্রাণ। নিজের এই সাজগোজ, মানুষের আনাগোনা সবকিছুই তার কাছে এক প্রহসন মনে হচ্ছে।

ননদদের প্রশংসা শুনেও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।

জাওয়াদের ভারী গলার খাকারি শুনে দরজার দিকে তাকাল সবাই। হুইল চেয়ারে বসে আছে সে। সবসময়ের মতন পরনে কালো ট্রাউজার আর টি-শার্ট। চুলগুলো আগের মতোই যত্ন নিয়ে আঁচড়ানো। মুখে সেই পরিচিত গাম্ভীর্য।

রুমে ঢুকেই জাওয়াদের চোখ জোড়া স্থির হলো সাইয়ারার ওপর। মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো সে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। গাঢ় খয়েরি রঙের জামদানি পরনে এই রূপবতী রমণীকে দেখে জাওয়াদের বুকের ভেতর যেন তোলপাড় শুরু হলো। তার ভেতরের এই মারাত্মক ওলটপালট, এই তীব্র প্রতিক্রিয়া বাইরের কেউ টের পেল না বোধহয়। জাওয়াদ নিজের দৃষ্টির ওপর জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এনে নিজেকে সামলে নিলো। সাইয়ারার দিকে আর দ্বিতীয়বার তাকাল না। হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে চলে গেলো ওয়ারড্রোবের সামনে।

জাওয়াদের দৃষ্টি মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। কেউ বুঝতে পারেনি সেই কয়েক সেকেন্ডে তার চোখে কী ছিল, কিন্তু সাইয়ারা? ওই কয়েক সেকেন্ডের চাউনিতেই সাইয়ারার বুকে কাঁপন উঠে গেছে।

জাওয়াদ রুমে চলে আসায় সবাই সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। জাওয়াদ হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে সাইয়ারার দিকে না তাকিয়েই কর্কশ গলায় বলল,

“এমন সঙ সেজে ঢঙ করার কী দরকার?”

কথাটা বলেই জাওয়াদ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিলো। সাইয়ারা দুই হাতে শাড়ি খামচে ধরল শক্ত করে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তাকিয়ে রইল ওয়াশরুমের দরজার দিকে।

সে এই সঙ ইচ্ছে করে সেজেছে? দুপুরে তাকে সাজতে বলা হয়েছিল, সে সাজেনি বলে কথাও শুনেছে। এখন জোর করে সাজালো। আর এই অহংকারী, অসভ্য, ঠকবাজ লোক কি-না বলছে সে সঙ সেজে ঢঙ করছে! সঙ না-হয় সেজেছে, ঢঙ কোথায় করল?

সাইয়ারার ইচ্ছে করছে নিজের মাথার চুল টুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। রাগে তার কান্না পেয়ে গেলো। চোখে পানি জমলো। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বিছানায় এসে বসে পড়ল ধপ করে।

জাওয়াদ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সাইয়ারাকে রুমে দেখল না। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল তার হুইল চেয়ার। চুলগুলো আবারও আঁচড়ে নিলো। টি-শার্ট খোলার সময় কিছুটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। গায়ে পারফিউম দিলো। তারপর হুইল চেয়ার নিয়ে ওয়ারড্রোবের কাছে এলো আবার। মেঝেতে পা রেখে হুইল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ওয়ারড্রোব খুলে ভেতর থেকে একটা সাদা শার্ট বের করল, তারপর আবার বসে পড়ল হুইল চেয়ারে। অন্যদিনের তুলনায় আজ সে ব্যতিক্রম কালারের শার্ট পরবে। তার বেশির ভাগ শার্ট, টি-শার্ট আর প্যান্ট কালো রঙের। হাতে গোনা কয়েকটা শার্ট আর টি-শার্ট আছে যেগুলো সাদা। আজ কালো ফরমাল প্যান্টের সঙ্গে সাদা ফরমাল শার্ট পরবে।

শার্ট পরে হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিলো। আবার উঠে দাঁড়িয়ে ইন করল শার্ট। পুনরায় বসে পড়ল, তারপর ঘড়ি পড়ল হাতে, সানগ্লাস পরার প্রয়োজন বোধ করল না।

পুরোপুরি তৈরি হয়ে আয়নার দিকে তাকাল জাওয়াদ। সে কতদিন পর এভাবে তৈরি হয়েছে মনে পড়ছে না। বিয়েতে রাজি ছিল না সে। তাই বিয়ে করতে যাওয়ার সময় ফিটফাট হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে তার হয়নি। গোসল করার পর যা পরে ছিল সেসব পরেই চলে গিয়েছিল বিয়ে করতে। চুল দাড়িও কাটেনা অনেকদিন হলো। জীবনের প্রতি চরম উদাসীনতা তৈরি হয়েছে তার। তার বারবার মনে হয় তিন বছর আগের ওই অ্যাকসিডেন্টে সে ম’রে গেলেই ভালো হতো। এভাবে বেঁচে থাকতে আর ভালো লাগছে না। নিজের ভালোবাসার মানুষকে সে কোনোদিন ঘৃণা করতে পারবে না, আবার মেনেও নিতে পারছে না।

চোখজোড়া বন্ধ করে জোরে শ্বাস টেনে নিলো জাওয়াদ। মনে পড়ল তার আর সাইয়ারার প্রথম বিয়ের কথা। সেদিন যখন দাদার মুখে শুনল তার আর সাইয়ারার বিয়ে হবে, কথাটা শোনার পর তার বুকের ভেতর কি হচ্ছিল সে কাউকেই বোঝাতে পারবে না কোনোদিন। সে কোনো কিছু ভাবতেই পারছিল না তখন। বারবার শুধু সাইয়ারা আর নিজেদের পরিবারকে দেখছিল।

তারপর যখন সিদ্ধান্ত হলো সেদিনই তাদের বিয়ে হবে তার হার্টবিট তখন ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করেছিল। উপরে উপরে সে নিজেকে যতটাই স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন সেই একমাত্র জানতো তখন তার ভেতরে কি শুরু হয়েছিল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই পুতুলের মতন দেখতে মেয়েটা সত্যিই তার বউ হবে। সাইয়ারা ছোটো থাকলেও সে তো বড়ো ছিল, সব রকম অনুভুতিই তার মধ্যে জন্মে ছিল। সাইয়ারাকে সে চাচাতো বোন হিসেবেই আদর করতো, ভালোবাসতো। নিজের আপন চাচাতো বোনের চেয়েও সাইয়ারার প্রতি তার টান, ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি, সীমাহীন। সাইয়ারা তার বউ হবে এমন চিন্তা ভাবনা সে কোনোদিন করেনি, তাই হয়তো সেদিন দুজনের বিয়ের কথা শোনার পর সে অমন হয়ে গিয়েছিল।

তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো সে সাইয়ারাকে বিয়ে করবে কি-না, তখন সে সাইয়ারাকে নিয়েই ভাবছিল। ভাবছিল সাইয়ারার সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ।

গোসল করতে আসার পর রুমে এসে আধা ঘন্টা সময় ধরে শুধু নেচে ছিল সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে। সাইয়ারা তার বউ হবে, সারা জীবন তার সঙ্গে থাকবে, তাদের দুজনের সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ হবে! গোসল করার পর একদম নতুন একটা পাঞ্জাবি পরে ছিল সে।

ছোটো দাদার বাড়িতে এসে জামা পরা সাইয়ারাকে দেখে সে সাইয়ারাকে শাড়ি পরতে বলেছিল। সাইয়ারা শাড়ি পরে যখন তার সামনে এলো তখন তার মনে হচ্ছিল সাইয়ারা যেন শাড়ি পরে অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে। সেদিন সাইয়ারাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে তার চাচাতো বোনকে দেখার অনুভূতি হয়নি, অনুভূতি হয়েছিল বউকে দেখার।

বিয়ের পর থেকে সকলের সামনে সে আর সাইয়ারাকে কোলে-কাঁধে নিতো না। কেন যেন লজ্জা লাগতো তার। সাইয়ারাকে একা পেলে মোটেও সে ছাড় দিতো না। ঝাপটে ধরতো। নরম তুলতুলে গালে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খেত। আগেও খেত। কিন্তু বিয়ের আগের আর বিয়ের পরের অনুভূতি তার কাছে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তবে শুধু এত টুকুই, সাইয়ারার গালে, মাথায় আর হাতেই শুধু চুমু খেত সে।

বিয়ের পরও সাইয়ারার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে ছোটো মানুষ অত কিছু বুঝত নাকি? সে জানতো জাওয়াদ ভাইয়া তার বর, বড়ো হলো তারা একসঙ্গে ঘুমাবে। সে প্রতিদিন জাওয়াদকে জিজ্ঞেস করতো, “ভাইয়া, আমি কবে বড়ো হবো? কবে থেকে আমরা একসঙ্গে ঘুমাব?”

সাইয়ারার বয়স তখন দশ বছর হলেও বুদ্ধির দিক থেকে সে আরও ছোটো ছিল, হাইট আর ওয়েটও কম ছিল। এবাড়ি থেকে ওবাড়িতে সে নিজ পায়ে হেঁটে যেতে-আসতে চাইতো না। জাওয়াদকে বলতো কোলে তুলে নয়তো কাঁধে তুলে নিয়ে যেতে, আবার নিয়ে আসতে। জাওয়াদ দুষ্টামি করে রাজি না হলে সাইয়ারা জেদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। আগে থেকেই সে এমন করতো। যখন আরও ছোটো ছিল তখন কোলে না নিলে তো মাটিতে বসে পড়তো, নয়তো গড়াগড়ি দিতো। অনেক সময় পা নয়তো কোমর জড়িয়ে ধরে ঝুলে থাকতো। কি মধুর সময়ই না তখন কে’টেছে দুজনের!

ছোটো ভাইয়ের ডাকে যেন ধ্যান ভাঙল জাওয়াদের। সে কিছুটা হকচকিয়ে তাকাল জাবিনের দিকে। জাবিন বলল,

“হয়নি তোমার?”

“হয়েছে।”

“চলো তাহলে।”

“যা আসছি আমি।”

জাবিন বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। জাওয়াদ নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে বের হলো রুম থেকে।

তার হুইল চেয়ার দুটো, একটা সাধারণ হুইল চেয়ার, আরেকটা ইলেকট্রিক। গতকাল জেদের ঠেলায় সে সাধারণ হুইল চেয়ারে বসে বিয়ে করতে গিয়েছিল।

রাত আটটা বাজতেই সরোয়ার শিকদার সাইয়ারা আর জাওয়াদকে নিয়ে নিজের বাড়িতে যেতে চাইলেন। উনি দুই ছেলেকে নিয়ে এই বাড়িতে এসেছেন ছয়টার সময়। খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে সকলের।

সাইয়ারা দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির রেখেই শক্ত কন্ঠে বলল,

“আমি কোথাও যাব না।”

সবাই অবাক হলো তার এমন কথায়। জাওয়াদ সরু চোখে তাকিয়ে রইল তার নত মুখের দিকে।

সরোয়ার শিকদার স্পষ্ট বুঝতে পারছেন মেয়ে তার উপর রেগে তার বাড়িতে যেতে চাইছে না। মেয়ের এই রাগ স্বাভাবিক। তিনি মেয়ের সঙ্গে অন্যায়ই করেছেন। মেয়ে যেদিন পুরো সত্যিটা জানতে পারবে সেদিন থেকে হয়তো তার চেহারাই আর দেখতে চাইবে না। তবে সব কিছুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছেন তিনি।

হোসনে আরা সাইয়ারার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“যাবি না কেন?”

সাইয়ারা মাথা নিচু রেখেই বলল,

“যাব না।”

“কেন যাবি না সেটা তো বলবি?”

“আমার ইচ্ছে করছে না তাই আমি যাব না।”

সবাই তাকিয়ে রইল তার দিকে।

সরোয়ার শিকদার বললেন,

বিজ্ঞাপন

“আজকে গিয়ে তো আবার আগামীকালই চলে আসবি।”

সাইয়ারা এবার মুখ তুলে তাকাল বাবার মুখের দিকে। সে এখন পর্যন্ত বাবার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। সরোয়ার শিকদার যখন এবাড়িতে এলেন তখন সাইয়ারা বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। সরোয়ার শিকদার ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলেও সাইয়ারা উত্তর দেয়নি। তখন সরোয়ার শিকদারের মুখটা কালো হয়ে গিয়েছিল। দুই ভাইয়ের সঙ্গে টুকটাক কথা বলেছে শুধু।

সাইয়ারা জেদ ধরে বলল,

“আমি আর কোনোদিনও যাব না তোমার বাড়িতে।”

সামিউল শিকদারের স্ত্রী নাহার বেগম বললেন,

“বাপের বাড়িতে না যাইয়া থাকতে পারবি? খালি খালি জিদ না দেখাইয়া যা ঘুইরা আয়।”

“থাকতে পারব না কেন? অবশ্যই পারব। আমি যাব না ওই বাড়িতে।”

শেষ পর্যন্ত সাইয়ারার জেদ টিকলো না। বাবার অসহায় চোখমুখ আর নিচু মাথা দেখে রাজি হতে হয়েছে তাকে। আর একটা কারণ আছে, গিয়ে তার বইপত্রগুলো নিয়ে আসবে।

.

বাড়িতে পৌঁছানোর পর মায়ের সঙ্গেও কোনো কথা বলল না সাইয়ারা। ওবাড়িতে যাও দুই একজন আত্মীয় ছিল, এবাড়িতে তাও নেই।

জাওয়াদকে নিয়ে নিজের রুমে চলে এলো। ফ্যান চালিয়ে দিয়ে গয়নাগুলো খুলে রাখল। ওয়ারড্রোব থেকে সুতির জামা কাপড় বের করে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। এই ভারী শাড়ি, গয়না পরে থাকতে আর ভালো লাগছে না।

চেঞ্জ করে হাতমুখ ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল জাওয়াদ গায়ের শার্ট, জুতা, মোজা খুলে বসে আছে। সাইয়ারা বের হতেই তার দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বলল,

“আমার টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে দে।”

সাইয়ারা হাতের শাড়ি ব্লাউজ রেখে স্যুটকেস থেকে জাওয়াদের টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে দিলো। তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল চুল আঁচড়ানোর জন্য।

চুলের ক্লিপ খুলতে খুলতে স্মরণ হলো সেই দিনের কথা যেদিন পড়াশোনার জন্য জাওয়াদ দেশের বাইরে চলে গেলো।

সকলের সঙ্গে সেও গিয়েছিল এয়ারপোর্টে। আগের দিন থেকেই জাওয়াদ মন ম’রা হয়ে ছিল। ফ্লাইটের দিন চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি থেকে বের হলো। গাড়িতে পুরোটা রাস্তা তাকে কোলে নিয়ে বসে ছিল। তাকে বারবার বলেছিল ঠিক মতন পড়াশোনা করতে। ছেলেদের সঙ্গে না মিশতে। কোনো মেয়ে বন্ধুর সঙ্গেও যেন কখনো ঘুরতে না যায়।

ইমিগ্রেশনের জন্য জাওয়াদ এগোতেই সে যখন ছোটাছুটি করে কাঁদছিল জাওয়াদকে আটকানোর জন্য, তখন জাওয়াদ ঝাপসা চোখে দূর থেকে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। স্বামী চলে যাচ্ছে এজন্য সে কাঁদেনি সেদিন। কেঁদেছিল তার ভাই, তার বেস্টফ্রেন্ড, তার ছোটো বেলার সঙ্গী চলে যাচ্ছে বলে। সে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছিল, “ভাইয়া, তুমি যেও না। আব্বা, আমাকে ছাড়ো আমি ভাইয়ার কাছে যাব।”

সেদিন তার বাবা তাকে ছাড়েনি, জাওয়াদ-ও ফিরে আসেনি। গাড়িতে বসে কাঁদতে কাঁদতে সে বমি করে দিয়েছিল। বড়ো ভাই চলে যাওয়ায় জাবিনও অনেক কেঁদেছিল সেদিন। বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ কেঁদেছিল।

সেদিন যদি জাওয়াদ দেশের বাইরে না যেতো তবে তাদের দুজনের গল্পটা আজ অন্য রকম হতো।

রাতের খাবার খাওয়ার জন্য সোহান ডাকতে এলো দুজনকে। সাইয়ারা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জানাল সে খাবে না, রাতে খেয়েই এসেছে, খিদে পায়নি তার। জাওয়াদ-ও গম্ভীর গলায় জানাল সেও খাবে না।

সোহান কতক্ষন ডাকাডাকি করে চলে গেলো দরজার সামনে থেকে। সোহানের বয়স পনেরো, সায়েমের তেরো। সাইয়ারা ছোটো বেলায় যতটা চঞ্চল আর ছটফটে ছিল তার ছোটো ভাই দুটো ঠিক ততটাই শান্ত।

দুজন খেতে না যাওয়ায় রোকেয়া বেগম এসেছিলেন ডাকতে। দুজনের একজনও খাবে না, জোরাজুরি করেও খাওয়ার জন্য নিয়ে যেতে পারেননি দুজনের একজনকেও।

রাত এগারোটার পর পর রুম থেকে বেরিয়ে এলো জাওয়াদ। তার ভালো লাগছে না এবাড়িতে। ঘুমোতেও ইচ্ছে করছে না। ড্রয়িংরুমে ম্লান হলদে আলো জ্বলছে। বড়ো খোলা বারান্দা আছে এবাড়িতে, সেদিকেই এগোল সে। বাড়িটা পুরোনো, এবং বেশ বড়ো। ছোটো বেলায় বেশির ভাগ সময়টা তার এবাড়িতেই কে’টেছে। নিজের ছোটো ভাই থাকা সত্ত্বেও শুভ্র তুলতুলে পুতুলের মতন মেয়েটার টানে সে বারবার ছুটে আসতো। ছোট্টো সাইয়ারাকে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোলে নিয়ে বসে থাকতো। সাইয়ারা ঘুমিয়ে গেলেও সে কোল থেকে নামাতো না। ঘুমন্ত সাইয়ারাকে তার কোল থেকে নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করলে সে আরও শক্ত করে চেপে ধরে রাখতো। সাইয়ারার জন্য কি পাগলামিটাই না করতো তখন! আর ওই মেয়ে তাকে কীভাবে ভুলে গেলো? কীভাবে ঠকালো তাকে?

ড্রয়িংরুম পার করার আগেই দেখা হলো সরোয়ার শিকদারের সঙ্গে। তিনি বড়ো বারান্দা থেকেই আসছেন। জাওয়াদকে ড্রয়িংরুমে দেখে বললেন,

“ওদিকে কোথায় যাচ্ছো?”

জাওয়াদ চুপ করে রইল, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না সে। হুইল চেয়ার নিয়ে আবার এগোতেই সরোয়ার শিকদার বললেন,

“জাওয়াদ, না ঘুমিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”

জাওয়াদ থামল। পিছু না ফিরেই বলল,

“যেদিকেই যাই তাতে আপনার কী?”

সরোয়ার শিকদারকে কিছু বলতে না দিয়ে চেয়ার ঘুরিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বলল,

“একটা সত্য কথা বলুন তো।”

সরোয়ার শিকদারের বুক দুরুদুরু করতে লাগল। কোন সত্য কথা জানতে চাইবে জাওয়াদ? নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বললেন,

“কোন সত্য কথা জানতে চাইছো তুমি?”

“আপনার মেয়ের বয়ফ্রেন্ডের কী হয়েছে?”

সরোয়ার শিকদারের মুখ চুপসে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। ম্লান আলোর বিপরীতে থাকায় তার মুখের অভিব্যক্তি খুব একটা বুঝতে পারল না জাওয়াদ। সরোয়ার শিকদারকে চুপ থাকতে দেখে জাওয়াদ আবার বলল,

“কথা বলছেন না কেন? আপনার মেয়ের বয়ফ্রেন্ড কোথায়? কী হয়েছে তার? আপনি আপনার মেয়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে যে তাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এটা তো ক্লিয়ার। আপনার মেয়ে এখনো ওই ছেলেকে ভালোবাসে? আরে কথা বলছেন না কেন?”

সরোয়ার শিকদার নিজেকে সামলালেন। বললেন,

“পুরোনো কাসুন্দি কেন ঘাটছো? ওইসব ভুলে যাও এখন।”

“কেন ভুলবো?”

“আস্তে কথা বলো।”

“কেন বলবো আস্তে? কেনই বা ভুলবো? সাই এখনো ওই ছেলেকে ভালোবাসে তাই না? আপনি টাকার জন্য আর আব্বুর চাপে ওর ভালোবাসাকে—

সরোয়ার শিকদার মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন জাওয়াদকে। চলে যাওয়ার জন্য পেছন ফিরতেই দেখলেন সাইয়ারা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েকে দেখে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো উনার। শ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেলেন।

বিজ্ঞাপন
দুজনে গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক গল্প