দুজনে

পর্ব - ৭

🟢

পুলিশের নোটিশ আর কোর্টের সমন জারি হতেই সামিউল শিকদারের অহংকারে বড়ো ধাক্কা লাগে। দুই ছেলেকে না পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা উনাকেই ধরে নিয়ে যান নিজ বাড়ি থেকে।

বাড়ির সদস্যরা পুলিশ কর্মকর্তাদের থামানোর অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউ তাদের থামাতে পারেনি। সামিউল শিকদারের ছোটো মেয়ে জামশেদ শিকদারকে কল করে জানিয়ে দেন সর্বনাশ হয়ে গেছে! সরোয়ার শিকদার থানায় মামলা দায়ের করেছে তাদের তিনজনের নামে। পুলিশ বাড়িতে এসে তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। তাদের দুজনকেও ধরার জন্য খুঁজছে।

বাবার গ্রেফতারের খবর শুনে জামিল আর জামশেদ শিকদারের মাথার র’ক্ত চড়ে যায়। ক্ষোভে, অপমানে আর প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে তারা সোজা রওনা হন সরোয়ার শিকদারের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

সরোয়ার শিকদারের বাড়ির দরজা খোলাই ছিল তাই দুই ভাই সহজেই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে পারলেন। ড্রয়িংরুমে এসেই জামশেদ শিকদার চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। সরোয়ার শিকদার ছোটো ছেলেকে কোলে নিয়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসেন। উনার চোয়াল শক্ত, রাগে লাল হয়ে উঠেছে চেহারা। দুজনকে দেখে কর্কশ গলায় বললেন,

“এই তোরা আমার বাড়িতে কেন? বের হ আমার বাড়ি থেকে। কোন সাহসে এই বাড়িতে এসেছিস?”

জামশেদ শিকদার বাজখাঁই গলায় বললেন,

“তুই কোন সাহসে খু’নের মামলা দিয়েছিস আমাদের নামে? তোর বাপকে খু’ন করেছি আমরা? ভালোয় ভালোয় সবগুলো মামলা তুলে নে।”

“তুলবো না। গতকাল না বললি ‘কোন বাল ছিঁড়তে পারিস ছিঁড়িস’, ছিঁড়েছি এখন!”

জামিল শিকদার দাঁত কিড়মিড় করে সরোয়ার শিকদারের দিকে এগিয়ে বললেন,

“তোর এই মামলা আমরা এমন জায়গায় ঢোকাব যে তোর বাপের নাম ভুলে যাবি।”

সরোয়ার শিকদার ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে সোফার ওপর বসিয়ে দিলেন বড়ো ছেলের পাশে, তারপর তেড়ে এসে জামিল শিকদারের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

“বেশি বাড়াবাড়ি করবি না, বের হ আমার বাড়ি থেকে। জালিয়াতি করে টাকা চুরি করেছিস, আমার বাবাকে খু’ন করেছিস, এখন আবার আমাদের বাড়িতে এসে দাদাগিরি দেখাচ্ছিস? তিন বাপ-ব্যাটাকে জেলে ঢুকিয়ে তবেই দম নিবো আমি।”

সরোয়ার শিকদারের কথা শুনে রগচটা জামিল শিকদার আরও রেগে গেলেন। রাগে উনার হিতাহিত জ্ঞান পুরোপুরি লোপ পেল। ড্রয়িংরুমের কোণায় একটা ভারী কাঠের গোল টুল রাখা। উন্মত্তের মতো জামিল শিকদার সেই ভারী কাঠের টুলটা দুই হাতে তুলে নিলেন এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই সজোরে আঘাত করলেন সরোয়ার শিকদারের মাথার বাম পাশে।

ধপাস করে নিচে পড়ে গেলেন সরোয়ার শিকদার। মুহূর্তের মধ্যে মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে র'ক্ত ছুটে এলো।

চোখের পলকে উনার ফরসা চেহারা আর ড্রয়িংরুমের মেঝে র'ক্তে ভেসে যেতে লাগল।এমন দৃশ্য দেখে সাইয়ারা আর রোকেয়া বেগম চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। দুজন দৌড়ে এলেন সরোয়ার শিকদারের কাছে। সোহান আর সায়েম ভয়ে আতঙ্কে সোফায় জড়সড়ো হয়ে বসে রইল।

সরোয়ার শিকদারকে ওভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে জামিল শিকদারের হাতের কাঠের টুলটা ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার ভেতরের উন্মাদনা দমে গেলো, চোখের পলকে যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন তিনি। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে সে নিজেই কেমন যেন শিউরে উঠল।

জামশেদ শিকদারও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। চাচাতো ভাইকে র’ক্তে ভেসে যেতে দেখে উনার নিজের পিলে চমকে গেছে। ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

“কী করলি এটা?”

জামিল শিকদার তাকালেন কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলেন না।

রোকেয়া বেগম স্বামীকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“খুনি! আপনারা খুনি! এতগুলো টাকা খেলেন, শ্বশুর আব্বারে খেলেন! তবুও পেট ভরেনি? এখন আমার স্বামীকেও শেষ করে দিলেন!”

সাইয়ারা এত র’ক্ত দেখে আর ঠিক থাকতে পারল না। এগারো বছরের বাচ্চা মেয়েটা বাবার পাশেই পড়ে যায় অজ্ঞান হয়ে।

চোখের সামনে বাবার অমন পরিণতি দেখে সাইয়ারার মনে ক্ষোভ জন্ম নেয় জাওয়াদের পরিবারের ওপর। সেদিনের পর থেকে সে জাওয়াদের পরিবারকে সহ্য করতে পারে না। তবে সে জাওয়াদকে ভালোবাসতো।

সরোয়ার শিকদারের মাথা ফাটানো ছাড়া আর কোনো অভিযোগের ভিত্তি ছিল না। জামশেদ শিকদার আর জামিল শিকদার প্রমাণ করেছিলেন সরোয়ার শিকদার তাদের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। সরোয়ার শিকদার আর তার বাবা সাজিদুল শিকদার তাদের বাড়িতে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে তখন কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। সরোয়ার শিকদার আগে মেরেছিলেন জামিল শিকদারকে, তাই তারা পাল্টা আঘাত করেছিলেন। আর অতিরিক্ত চিৎকার চেঁচামেচি করার কারণে সাজিদুল শিকদারের ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে গিয়েছিল, এতে তাদের কোনো দোষ নেই। টাকার কাছে সেদিন সত্য হয়েছিল মিথ্যা, আর মিথ্যা হয়েছিল সত্য।

আর এই সত্য মিথ্যার মারপ্যাঁচে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল জাওয়াদ আর সাইয়ারার সাজানো গোছানো ভবিষ্যৎ।

জামশেদ শিকদারও সাইয়ারাকে ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করলেন, আর সরোয়ার শিকদার তো দিবেনই না।

কিন্তু জাওয়াদ আর সাইয়ারা? তারা একে অপরকে ছাড়া বাঁচবেই না। জাওয়াদকে প্রথমে ভালোভাবে বলা হয়েছিল সাইয়ারাকে পুরোপুরি ভুলে যেতে, ওই মেয়েকে তারা বাড়ির বউ হিসেবে মানবেন না। কিন্তু জাওয়াদ কোনোভাবেই মানেনি সে কথা। সে তখনো জানতো না তাদের দুই পরিবারের মধ্যে আসলে হয়েছে কি।

সরোয়ার শিকদারের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হতো। অনেক চেষ্টার পর একদিন যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। সরোয়ার শিকদার স্পষ্ট গলায় বলে দিয়েছিলেন তার মেয়েকে ভুলে যেতে। তিনি মেয়েকে দিবেন না। জাওয়াদ যখন না দেওয়ার কারণ জানতে চায় তখন সরোয়ার শিকদার সব বলে দেন।

দুজনের মধ্যকার সব যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাইয়ারা বারবার কান্নাকাটি করতো জাওয়াদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। আর ওপাশে তো জাওয়াদ পাগলই হয়ে যাচ্ছিল। কোনোভাবেই সাইয়ারার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে জাওয়াদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে বাংলাদেশে চলে আসবে। তার পড়াশোনা, ব্রাইট ফিউচার সব গোল্লায় যাক। তার কাছে সাইয়ারা সবার আগে। বাড়ি থেকে সবাই তাকে হাজারভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু সে কারো কোনো কথাই শুনছিল না।

বিজ্ঞাপন

জাওয়াদ যেদিন টিকেট কাটবে তার আগের দিন তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেলো। কোথা থেকে কীভাবে হারালো জাওয়াদ বুঝতেই পারছিল না। সেদিন সে বন্ধ রুমের ভেতরে চিৎকার করে কেঁদেছিল। টানা কতদিন না খেয়ে ছিল তার মনে নেই। সে রুমের বাইরেও বের হতো না। ফোনে সাইয়ারার ছবি দেখতো আর কাঁদতো। সাইয়ারার সঙ্গে কথা বলতে না পেরে নিজের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে হোস্টেলের লোকজন তাকে হসপিটালে নিয়ে ভর্তি করায়।

জাওয়াদ সুস্থ হওয়ার পর পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে। তার জেদ সে দেশে ফিরবেই। তার সাইয়ারাকে তার কাছ থেকে কিছুতেই আলাদা করতে পারবে না কেউ। যদি আলাদা করারই ছিল তবে বিয়ে দিয়েছিল কেন? তার মনে অনুভূতির জন্ম দিলো কেন? সে তো নিজে থেকে বিয়ে করতে চায়নি।

এর মধ্যে তার মা হোসনে আরা তাকে আল্লাহর নামে কসম দিলেন। তাদের কথা অমান্য করে যদি জাওয়াদ দেশে ফিরে আসে তবে তিনি গলায় দড়ি দিবেন। উনার জীবনের চেয়ে সাইয়ারা যদি বড়ো হয় তবেই যেন দেশের মাটিতে পা রাখে জাওয়াদ। একই কথা বলেছিলেন জামশেদ শিকদারও। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করা পর্যন্ত সে দেশের মাটিতে পা রাখতে পারবে না।

জাওয়াদ সেদিন দমে গিয়েছিল। মনে মনে জেদ পুষে রাখে সে। আবার গভীরভাবে ভেবেও ছিল। সাইয়ারা এখন ছোটো, আবার তার স্ত্রী। সরোয়ার শিকদার চাইলেও সাইয়ারাকে অন্য কোনো জায়গায় বিয়ে দিতে পারবেন না। তার পড়াশোনা শেষ হতে হতে সাইয়ারার বয়স হবে মাত্র সতেরো। তখন সে দেশে ফিরে সরোয়ার শিকদারের কাছ থেকে সাইয়ারাকে ছিনিয়ে নিবে। ততদিন না-হয় একটু কষ্ট সহ্য করল।

কারো বাপের মুরোদ আছে নাকি তার কাছ থেকে তার স্ত্রীকে কেড়ে নিবে? সে জানে সাইয়ারা তাকে ভুলবে না, ভোলার প্রশ্নই আসে না।

সময় গড়ায়, জাওয়াদের ভালোবাসা আগের চেয়েও গভীর হয়। সে কল্পনা করতো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইয়ারা কত টুকু বড়ো হয়েছে, দেখতে কেমন হয়েছে। মাঝেমধ্যে তার ভয়ও হতো, সাইয়ারা কী তাকে ভুলে যাচ্ছে? যদি ভুলে যায়? তবে সে কীভাবে সইবে?

তার ভয়গুলো একদিন সত্যি হয়ে ধরা দিলো তার সামনে। তখন সাইয়ারা ক্লাস নাইনে পড়ে, বয়স পনেরো। সে জানতে পারে সাইয়ারা অন্য কাউকে ভালোবাসে, তার সঙ্গে নাকি ঘুরাঘুরিও করে। জাওয়াদ সেদিন আবার এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। জাওয়াদ অনেক কষ্টে তার এক পুরোনো ফ্রেন্ডের মাধ্যমে সরোয়ার শিকদারের নাম্বার জোগাড় করে। সরোয়ার শিকদার আগের নাম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। কল দেওয়ার পর জাওয়াদ নিজের পরিচয় দিতেই সরোয়ার শিকদার কল কেটে নাম্বার ব্লক করে দেন। আগেরবারের মতন তার সকল ফ্রেন্ডদের ফোন থেকে কল দিতে শুরু করে। একে একে সবার নাম্বার ব্লক করে দিচ্ছিলেন সরোয়ার শিকদার।

শেষে সরাসরি কথা বলার আশা ছেড়ে দিয়ে ভয়েস মেসেজ পাঠাতে শুরু করে। তার কন্ঠস্বর কাঁপছিল, গুছিয়ে কথা বলতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল এই বুঝি হাউমাউ করে কেঁদে দিবে ছেলেটা। সে বারবার রিকুয়েস্ট করছিল তাকে যেন একটাবার সাইয়ারার সঙ্গে কথা বলতে দেয়। বেশি না এক মিনিট কথা বলবে সে। বারবার বলছিল, “চাচ্চু, আমি আপনার পায়ে পড়ি, দয়া করে ফোনটা সাইয়ের কাছে দিন, আমি একটা মিনিট কথা বলবো শুধু।”

সরোয়ার শিকদার সাইয়ারার কাছে ফোন দেননি, নিজেও কিছু বলেননি। শেষে জাওয়াদ জানতে চায় সাইয়ারা কী সত্যি সত্যিই অন্য ছেলেকে ভালোবাসে? তখন গিয়ে রেসপন্স করেন সরোয়ার শিকদার। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আজ হঠাৎ এতগুলো দিন পর জাওয়াদ এমন পাগলামি করছে কেন। নিশ্চই তার পরিবারের কেউ তাকে মিথ্যা বলেছে। তিনিও সেই মিথ্যায় তাল মিলিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, সাইয়ারা অন্য ছেলেকে ভালোবাসে, আর তার সঙ্গেই বাকি জীবন কা’টাবে। আমিও ওই ছেলেকেই মেনে নিয়েছি।”

জাওয়াদ মানতে চায়নি এই কথা, সে সাইয়ারার মুখ থেকে শুনতে চায়।

দুই পরিবার থেকে দুজনকেই মিথ্যা বলে ভুল বোঝানো হয়। সাইয়ারা প্রথমে কোনোভাবেই বিশ্বাস করছিল না যে জাওয়াদ তাকে ভুলে অন্য কাউকে ভালোবাসে। জাওয়াদের পরিবারকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করলেও জাওয়াদকে তখনো সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসে। ততদিনে জাওয়াদের জন্য তার মনে অনুভূতির তৈরি হয়ে গেছে। স্বামী হিসেবে ভালোবাসতো জাওয়াদকে। জাওয়াদের নাম্বার নেওয়ার জন্য সে জাওয়াদের বাড়িতে গিয়েছিল। তখন তাকে জাওয়াদের কিছু এডিট করা ছবি দেওয়ানো হয় যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল জাওয়াদ অপরিচিত এক সুন্দরীর সঙ্গে ঘুরতে গেছে, রেস্টুরেন্টে গেছে, সেলফি তুলছে, এমনকি একে অপরকে চুমুও খাচ্ছে।

বোকা সাইয়ারা বুঝতেও পারেনি ওই ছবিগুলো এডিট করা ছিল। সে পাথর হয়ে গিয়েছিল সেদিন। আর জাওয়াদের বাবা-কাকারা এমনভাবে তাকে বলেছিল যে সে আর অবিশ্বাস করতে পারেনি। জাওয়াদ নাকি নিজে থেকেই তাকে চায় না। যেই মেয়ের বাবা তার বাবা-কাকা আর দাদাকে জেলে ঢুকিয়েছিল সেই মেয়েকে সে বউ হিসেবে মানে না আর। তাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করে না। তাদের জেলে ঢোকানোর পরই জাওয়াদ ভুলে গেছে তাকে। দেশে ফিরেই তাকে তালাক দিয়ে তার প্রেমিকাকে বিয়ে করবে। সাইয়ারা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন। যার বাবা, কাকা, দাদা সবাই ঠকবাজ জোচ্চোর সে আর কত ভালো হবে? শুধু শুধু সে এতগুলো বছর ধরে তাকে ভালোবেসে আসছে।

বাড়িতে ফিরে হাউমাউ করে কেঁদেছিল সে। মেয়ের কান্না দেখে রোকেয়া বেগমও কেঁদে ফেলেছিলেন সেদিন। সরোয়ার শিকদারের চোখেও পানি জমেছিল মেয়ের এমন আর্তনাদ শুনে। তিনি জানতেন ওই পরিবারে গিয়ে সাইয়ারা কখনোই ভালো থাকতে পারবে না। ওই বাড়ির সবাই তখন অমানুষ হয়ে গেছে, মনুষ্যত্ব কারো মধ্যেই বেঁচে ছিল না। ওই অমানুষদের মধ্যে তিনি নিজের মেয়েকে দিবেন না।

সরোয়ার শিকদার বুদ্ধি করে জাওয়াদের নাম্বার আনব্লক করেন। সাইয়ারার মেজাজ যখন ভীষণ ক্ষিপ্ত আর উতপ্ত, জাওয়াদের নাম শুনতেই পারে না—তখন তিনি জানালেন তিনি জাওয়াদের নাম্বার পেয়েছেন। সাইয়ারা প্রথমে জাওয়াদের সঙ্গে কথা বলতে চাইল না। সরোয়ার শিকদার বারবার বোঝানোর পর রাজি হয়। সরোয়ার শিকদার মেয়ের ব্রেইন পুরোপুরি ওয়াশ করে ফেলেছিলেন।

কল দেওয়ার পর জাওয়াদকে সে কিছু বলার সুযোগই দেয়নি, নিজেই চিৎকার চেঁচামেচি করে তাকে তালাক দিতে বলে তখনই। জাওয়াদ বারবার বলছিল “সাই, তুই একটু শান্ত হ, আমার কথা শোন। কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন, জান?” মানসিক ভাঙন, আর নিজে চিৎকার চেঁচামেচি করার কারণে জাওয়াদের কোনো কথা শুনতেই পায়নি সাইয়ারা, তার ওপর ফোনের সাউন্ড কমিয়ে দিয়েছিলেন সরোয়ার শিকদার। রাগের মাথায় সাইয়ারা জাওয়াদকে কী কী বলেছে সে নিজেও বুঝতে পারেনি। যা মুখ দিয়ে এসেছে তা-ই বলেছিল।

তারপর মাঝখানে আরও দুবছর পেরিয়ে যায়। সাইয়ারা নিজের পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়। জাওয়াদকে নিজের মন থেকে সরাতে চেয়েও সে সরাতে পারেনি, তবে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। সে নিজের মনকে বুঝ দিয়েছিল তার স্বামী ম’রে গেছে।

তিন বছর আগে দেশে ফিরে আসে জাওয়াদ। জাওয়াদ দেশে ফেরার আগের দিনই সাইয়ারাকে তার বড়ো ফুপুর বাড়ি সিলেটে পাঠিয়ে দেন সরোয়ার শিকদার।

বাড়িতে ফেরার প্রথম দিন জাওয়াদ চুপচাপই ছিল, কোনো ঝামেলা করেনি। বাড়ি থেকে বের হওয়া সেই কিশোর ছেলে টগবগে যুবক হয়ে ফিরেছিল বাড়িতে। চেহারা কঠিন গাম্ভীর্যে ঢাকা, গলার আওয়াজ ভারী, লম্বা চওড়া দেহ। ভালোমন্দের খোঁজ খবর নেওয়া ছাড়া বাড়ির কারোর সঙ্গে আর কোনো কথা বলেনি সেদিন।

জাওয়াদ ঝামেলা বাঁধালো পরদিন সকালে। বিশাল ঝামেলা। সে নাশতা সেরেই নিজের রুমে ফিরে গিয়েছিল। রুম থেকে বের হয়েছিল প্রায় ঘণ্টা খানেক পর। তাকে দরজার দিকে এগোতে দেখেই জামশেদ শিকদার পিছু ডেকে বলেছিলেন,

“জাওয়াদ, কোথায় যাস?”

জাওয়াদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল। শক্ত কন্ঠে বলেছিল,

“আমার বউকে আনতে।”

জাওয়াদের কথা শুনে বাড়ির সকলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। জামশেদ শিকদার আবার বলেছিলেন,

“ওকে আনতে যাবি কেন?”

“আমার বউকে আমি আনবো না?”

“না, আনবি না। ওকে মানবো না আমরা। ওকে তালাক দিবি তুমি, তোর জন্য অন্য মেয়ে ঠিক করে রেখেছি আমরা।”

“আমি আমার বউকে এই জীবনে তালাক দিচ্ছি না, আর না তো অন্য কাউকে বিয়ে করছি। আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই এখন। সাইকে আনার জন্য যদি বলো বিষ খাবে গলায় দড়ি দিবে তবে তাই করো, আমি যাচ্ছি আমার বউকে আনতে।”

“সাইয়ারা তোকে ভালোবাসে না, ও অন্য ছেলেকে ভালোবাসে।”

“বাসুক, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসি, ও আমার বউ। তোমরা যে যা করতে চাও শুরু করে দাও, আমি সাইকে আনার জন্য যাচ্ছি।”

বিজ্ঞাপন
দুজনে গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও পারিবারিক গল্প