বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১১

🟢

গহন হাত মুখ ধুঁয়ে জামা কাপড় বদলে ডাইনিং রুমে এসে দেখলো নিধি চেয়ারে বসে আছে। ঘড়িতে সময় দেখলো রাত এগারোটা বাজছে। গহনকে আসতে দেখে নিধি একটু নড়েচড়ে বসলো। গহন এসে চেয়ার টেনে নিজেও বসে পড়লো। টেবিলে প্লেট রাখাই ছিল। খাবারও সব বাটিতে রাখা। নিধি কে আর কষ্ট করাতে চাইলো না। নিজেই প্লেটটা নিয়ে তাতে ভাত বেড়ে নিতে নিতে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বসে থাকতে হবে না। অনেক রাত হয়েছে। তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারো। আমার বেড়ে নিয়ে খাওয়ার অভ্যাস আছে। আর আমার জন্য তোমাকে কষ্ট করে টেবিলে খাবারগুলো সাজিয়ে রাখতে হবে না। আমার তো প্রায় রোজই ফিরতে দেরি হয়। আমি এসে খাবার গরম করে খেয়ে নেব।”

নিধি বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানে নিধি দুপুর থেকে না খেয়ে গহনের অপেক্ষায় বসে আছে সেখানে মানুষটা একবার জিজ্ঞেসও করল না নিধি কে যে ও খেয়েছে কিনা। কি সুন্দর নিজের প্লেটে ভাত বেড়ে নিলো। আরে মানুষ তো ভদ্রতার খাতিরেও একবার জিজ্ঞেস করে যে খেয়েছে কিনা। কিন্তু এই লোকের তো সেই সামান্য ভদ্রতাটুকুও নেই। তারমানে সালমা বেগম ভুল কিছু বলেননি। এই ছেলের আগাগোড়া পুরোটাই সমস্যায় জর্জরিত।

নিজে একবার ভাবলো না খেয়েই ঘুমিয়ে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবলো যে না, এই মানুষটাকে নিজের ভুলটা বোঝানো দরকার। বোঝানোর দরকার যে উনি ঠিক কতটা অভদ্র। আসলেই যে ওনার শিক্ষার মাঝে ত্রুটি আছে সেগুলো ওনাকে বোঝানো দরকার।

গহন তখন সবে মাত্র ভাত মেখে প্রথম লোকমা মুখে দিয়েছে। গহনেরও প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। সেই সকালে খেয়েছিল। কাজের চাপে তারপরে তো আর খাওয়ার সময়ই পায়নি। যেই না ভাতটা মুখে দিল অমনি নিধি বলে উঠলো,

“আমি দুপুর থেকে না খেয়ে বসে আছি আপনি এলে একসাথে খাব বলে।”

নিধির বলা কথাটা গহনের কানে যেতেই খাবার গলায় আটকে গিয়ে কাশি উঠে গেল গহনের। গ্লাসে পানি ঢালা নেই। নিধির ইচ্ছেও হলো না পানি ঢেলে গ্লাসটা এগিয়ে দেওয়ার। চুপচাপ বসে রইল।

গহন নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে সেটা খেলো। কাশিটা থামতেই নিধির দিকে তাকিয়ে অপরাধী গলার ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,

“আমি খুবই দুঃখিত। আমি তো আসলে জানতাম না যে তুমি না খেয়ে আছো। আসলে আমি ভাবতেই পারিনি যে তুমি না খেয়ে থাকবে। বরাবরই রাতে বাড়ি ফেরার পর আমি একাই খাই। কেউই কখনো অপেক্ষা করে থাকে না। আমি আসলে ভাবতে পারিনি যে তুমি অপেক্ষা করছো। আমি খুবই দুঃখিত। আমার আচরণের জন্য লজ্জিতও।”

নিধি চুপচাপ শুধু গহনের কথাগুলো শুনলো আর ওর আচরণ পর্যবেক্ষণ করলো। দেখলো গহন উঠে গিয়ে হাত ধুঁয়ে এসে নিজেই তড়িঘড়ি করে আরেকটা প্লেটে ভাত তরকারি বেড়ে নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে ফের অপরাধী গলায় বলল,

“আমি খুবই দুঃখিত। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটা করিনি। সত্যি বলছি। আমার কোন ধারণাই ছিল না যে তুমি আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকবে।”

“কেউ কখনোই আপনার জন্য বসে থাকেনি? কারো খাবার গরম করে দেওয়ার সময়ও কখনো হয়নি? সত্যি আপনি এসব একা একা করেন?”

গহন বেশ স্বাভাবিকভাবে বলল,

“হ্যাঁ। আমার জন্য বসে থাকার কি আছে। এমনটা তো না যে দু একদিন আমি দেরি করে ফিরি। প্রতিদিন আমার জন্য কষ্ট করে কেউ রাত জেগে বসে থাকবে এই ব্যাপারটা আমারই ভালো লাগেনা।”

“কিন্তু আপনার মা যে বলল আপনার মা নাকি আপনার জন্য বসে থাকে রোজ।”

ভ্রুঁ কুঁচকে সন্দেহি গলায় কথাটা বলল নিধি। গহন কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের সুরে বলল,

“মা বলেছে?”

“হ্যাঁ।”

গহন তৎক্ষণাত আর কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ ভেবে আলতো হেসে বলল,

“হ্যাঁ, মা ঠিকই বলেছে। মা বসে থাকতো। তবে আমি নিষেধ করেছিলাম। তাও অপেক্ষা করতো মা আমার জন্য। যাইহোক খেয়ে নাও। আর আবারও দুঃখিত।”

নিধি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খাবার থালায় হাত দিল। গহনও নিজের চেয়ারে বসে পড়লো। খেতে খেতে হঠাৎ করে নিধির মনে একটা প্রশ্ন এলো। আজকে লোকটা এতবার দুঃখিত দুঃখিত বলল কেন? এর থেকেও বড় কান্ড ঘটিয়েও তো বলে না। তাহলে আজ কি হলো?

মনের মাঝে প্রশ্নটা চেপে রাখতে না পেরে করেই ফেলল নিধি।

“আজ এতবার নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন কেন? অন্যান্য দিনতো করেন না।”

ব্যাপারটা গহনেরও মাথায় এলো না। অন্যান্য সময় তো নিধির কাছে ক্ষমা চাইতে একটু হলেও অসুবিধা হয়েছে। তবে আজ কেন যে অসুবিধা হলো না কে জানে। কোন উত্তর দিলো না নিধির প্রশ্নের। নিধিও আর উত্তরের অপেক্ষায় রইলো না। ভাবলো বোধহয় ভুলে বলে ফেলেছে। পেটে খিদে আছে তো সেজন্য বোধহয় মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। পেটে খাবার পরলে আবার ত্যাড়ামি শুরু করবে।

গহনের খাওয়া আগে শেষ হলো। নিধি দেখলো খাওয়া-দাওয়া শেষে গহন নিজেই রান্না ঘরে গিয়ে নিজের প্লেটটা ধুঁয়ে রাখলো। নিধির তখনও খাওয়া হয়নি। প্লেটটা ধুঁয়ে রেখে এসে নিজেই আবার অবশিষ্ট খাবারের বাটিগুলো ফ্রিজে তুলে রাখলো। টেবিলটাও নিজেই সুন্দর করে গোছালো। ততক্ষণে দেখলো নিধির খাওয়াটাও শেষ। নিধির সামনে থেকে ওর প্লেটটা নিয়ে বলল,

“আমি ধুঁয়ে রাখছি।”

নিধি মৃদু ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“আবার আপনার পুরুষত্বে আঘাত লাগবে না তো বউয়ের প্লেট ধুঁতে গিয়ে!”

গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ প্লেটটা নিয়ে রান্না ঘরে গিয়ে ধুঁয়ে রাখলো। নিধির সাথে কথা বাড়ানো মানেই ঝামেলা করা। যেটা এখন গহন করতে চাইছে না।

ঘরে গিয়ে নিধি ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিলো। আর গহন গিয়ে ল্যাপটপটা নিয়ে সোফায় বসলো। নিজেই আবার লাইটটা বন্ধ করে দিল। নিধি সোফার দিকে তাকিয়ে দেখলো গহন ওখানে বসে কাজ করছে। একটু গলা উচিয়ে বলল,

“ঘুমোনোর ইচ্ছে নেই?”

“এখম নেই। একটু কাজ বাকি আছে।”

“সারাদিন অফিসে তাহলে করেন কি? সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসে থেকেও যদি বাড়িতে এসে রাত বারোটার পর কাজ করতে হয় তাহলে তো অফিসে যাওয়ার কোন প্রয়োজন দেখছি না আমি। কোন নিয়ম নেই আপনার জীবনের? শরীরের কোন যত্ন নেই? আরাম বোঝেন না? এখন যদি অসুস্থ হয় বিছানায় লুটিয়ে পড়েন তখন কাজ কে করবে?”

গহন বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“এক লাইনেও কথাটা শেষ করা যেত। যাইহোক চিন্তা করার জন্য ধন্যবাদ। তবে আমি বিছানায় লুটিয়ে পড়ি না সচরাচর। অভ্যাস আছে আমার রাত জেগে কাজ করার।”

নিধি বিড়বিড় করে বলল,

“থাকবেই তো। দানবের মতন শরীর নিয়ে আর লুটিয়ে পড়বেনই বা কি করে!”

কথাটা বলে কাঁথা মুড়ি দিয়ে নিধি শুয়ে পড়ল। কাজ করতে করতে গহন খেয়াল করল নিধি শুধু এপাশ ওপাশ ফিরছে। তারমানে মেয়েটা এখনো ঘুমোয়নি। মাথার মাঝে হঠাৎ করে গহনের একটা প্রশ্ন এসেছিলো একটু আগে। ভেবেছিল সেটা সকালে করবে। তবে যেহেতু নিধি এখন জেগে আছে তাই এখনই কথাটা শেষ করা দরকার। বলা যায় না সকাল হতে হতে এই মেয়ের আবার ঝগড়া করার মন মানসিকতা তৈরি হয়ে যেতে পারে।

“নিধি!”

গহন খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে ডাকলো। তবে নিধি খ্যাঁক করে উঠে বলল,

“কি হয়েছে?”

“আমি তো স্বাভাবিক ভাবে ডাকলাম। স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিতে পারো না?”

নিধি লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে বললো,

“আমার ইচ্ছে ছিল ঘুমোনোর। কিন্তু ঘরে সামান্য আলোর উপস্থিতিতেও আমার ঘুম হয় না। আর আপনার এই ল্যাপটপের আলোর জন্য আমি ঘুমোতে পারছি না। তাহলে কি মাথাটা গরম হবে না? সকাল হতে না হতেই আমাকে আবার সারা বাড়ি ধোঁয়া মোছায় লেগে যেতে হবে। এরপরও আপনি বলবেন আমি স্বাভাবিকভাবে কথা বলবো।”

নিধি ভেবেছিল নিশ্চয়ই এখন আবার এই মাঝরাতে দুজনের মাঝে একটা তুলল ঝগড়া লেগে যাবে। তবে তেমনটা হলো না। গহন বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,

“অত সকালে ওঠার প্রয়োজন নেই। আমি মাকে বলবো যেন কেউ বিরক্ত না করে তোমায়। যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুমোতে পারো। আর বাড়ির কাজ তোমায় করতে হবে কেন? এসব কাজ করার জন্য তো মিতা কে রাখা হয়েছে।”

“আমাকে আসতে দেখে তো আপনার মিতাও পালিয়েছে। সে নাকি ছুটিতে গেছে। আচ্ছা যাই হোক। আমার দুঃখ সে আমাকেই দেখে নিতে হবে। আপনি তো আর আমার তেমন ভালো স্বামী না যে আমার দুঃখ বুঝবেন। কেন ডাকলেন সেটা বলুন?”

গহন ল্যাপটপটা পাশে রেখে একটু গুরুতর ভঙ্গিতে নিধি কে বলল,

“তোমার পড়াশোনা কতদূর যেন?”

“সেটাও জানেন না? হায় আল্লাহ তুমি এর বিচার করো। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি।”

বিজ্ঞাপন

গহন বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“এত ছোট তুমি! মনে হচ্ছে শুনেছিলাম তুমি অনার্সে পড়তে। এত ছোট মেয়েকে বিয়ে করলাম! সেজন্যই তো মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি কিচ্ছু নেই। যাই হোক আমার কিন্তু মাস্টার্স শেষ আরো তিন বছর আগেই।”

নিধি বিস্ফোরিত নয়নে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত বছর আগে মাস্টার্স শেষ তাহলে আপনার জন্ম তো প্রাচীন আমলে হয়েছিল। আপনি তো তাহলে বুড়ো। তাইতো বলি সারাক্ষণ এমন খ্যাঁক খ্যাঁক করেন কেন।”

একটু অপমানিত বোধ করলো গহন। আজ প্রথম যেন কেউ গহনের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে ওর বয়সটা আসলেই বেড়েছে। না হলে এতদিন তো গহন মনে করতো তিরিশ বছর খুব একটা বেশি না। এখন বয়স নিয়ে আর কথা না বাড়ানােই ভালো। নয়তো আরও সম্মানহানি হতে পারে। পুনরায় নিধিকে বলল,

“তোমার তো পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল। কোনো ভার্সিটিতে পরীক্ষা দাওনি?”

পড়াশোনার কথাটা শুনতেই হঠাৎ করে নিধি কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল। উদাস ভঙ্গিতে বলল,

“ইচ্ছে তো অনেক কিছুই ছিল একসময়। তবে এখন আর কিছুই নেই। সংসার করতে এসেছি শুধু সংসারই করবো। আর কিচ্ছু করবোনা।”

“আমি তো তোমাকে কখনো বলিনি যে সংসার করতে এসেছো জন্য আর কিছু করতে পারবে না। আর তাছাড়া তোমার পড়াশোনা নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই। বরং আমি চাই তুমি পড়াশোনা শেষ করো।”

নিধি কিছুক্ষণ নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো গহনের দিকে। অনেক কিছুই ভাবলো। অনেক কিছুই মনে পড়ে গেল। এই পড়াশোনা নিয়েই তো যত ঝামেলা। মুহূর্তের মাঝে চোখে মুখে আবার কেমন যেন রাগ ফুটে উঠলো নিধির। কঠিন গলায় বলল,

“পড়বো না। যতটুকু পড়েছি অতটুকুই যথেষ্ট। আমি গরিব ঘরের মেয়ে। আমার বাবার আর আমাকে পড়ানোর সামর্থ্য ছিল না। যতটুকু পড়িয়েছে ততটুকুই আমার জন্য অধিক। আর পড়াশোনা করা আমায় মানায় না। তাহলে তো আবার ডানা গজিয়ে যাবে। আর মেয়েদের তো উড়তে নেই। আর মেয়েরা যেন উড়তে না পারে সে জন্যই তো আপনাদের মতন ছেলেদের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। আর আপনি যে কঠোর মানুষ, আমি যদি ভুল করেও কখনো উড়তে চাই চট করে আমার ডানাটা কেটে দেবেন।”

গহনের মাথা যে ঠিক কতটা গরম হলো সেটা বলে বোঝানোর মতন না। তবে এখন এই রাগটা গহন নিধির উপরে দেখাতে চাইল না। কেননা নিধির কথাবার্তা শুনে মনে হলো পড়াশোনা নিয়ে বেশ ভালোই ক্ষোভ জমে আছে ওর মনে। আর এর কারণটা গহন জানতে চায়। গহন নিধিকে বুঝতে চায়। নিধির সব সমস্যা গুলো জানতে চায়। কিন্তু এই মেয়েটা তো ঠিকঠাকভাবে একটা কথাও বলে না।

গহন পুনরায় শান্ত ভঙ্গিতে নিধিকে জিজ্ঞেস করল,

“এক বাক্যে বলো পড়াশোনা কেন করতে চাও না?”

নিধি চট করে কিছু একটা বলে উঠতে ধরলে গহন ওকে থামিয়ে দিয়ে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো।

“এক বাক্যে বলবে কেন পড়াশোনা করতে চাও না।”

নিধি বুঝলো গহন এবার ওকে সাবধান করে দিল যে এক বাক্যের বেশি বলা যাবে না। নিধি চেষ্টা করলো একটা বাক্যের মাঝে সব শব্দ গোছানোর। তবে পারছে না গোছাতে। মনের মাঝে অনেক কথা জমে আছে। সেই কথা কি এক বাক্যে শেষ করা যায় নাকি! কি এক জ্বালায় পড়লো নিধি। এই বিয়ে করে তো এখন কথা বলার মাঝেও এত নিষেধাক্কা চলে আসছে।

এদিকে বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন নিধির থেকে কোন উত্তর পেল না তখন গহনই হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,

“ঠিক আছে। যত বড় করে ইচ্ছে হয় বলো। তবুও বলো।”

সুযোগটা পেয়ে নিধি ভীষণ খুশি হলো। তবে মুহূর্তের মাঝে আবার হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে নির্জীব গলায় বলল,

“আমার জীবন নষ্টের মূল এই পড়াশোনা। পড়াশোনাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি জানেন! নিজের জীবনটা বদলাতে চেয়েছি পড়াশোনা দিয়ে। এই পড়াশোনা দিয়ে আমার বাবা-মার সব ইচ্ছে পূরণ করতে চেয়েছি। এই পড়াশোনা দিয়েই আমার ভাইয়ের একটা উন্নত ভবিষ্যতের চিন্তা করেছি। এই পড়াশোনা দিয়ে নিজেদের সম্মান ফেরানোর কথা ভেবেছি। কিন্তু দেখুন কিচ্ছু হলো না। এখন এই পড়াশোনা শব্দটা শুনলে মাথায় আমার আ’গুন ধরে যায়। তাই আমি ঠিক করেছি পড়াশোনা আমি করব না। যতই চেষ্টা করুন না কেন আমাকে দিয়ে পড়াশোনা করাতে পারবেন না।”

“আমার মনে হয় তুমি আমাকে যতটা খারাপ ভাবো আমি ততটাও খারাপ না। পড়াশোনা করতে পারো তুমি। আমি ব্যবস্থা করে দেব। দরকার হলে বেসরকারিতে পড়াবো। খরচ নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। তুমি বলো কোন ভার্সিটিতে পড়তে চাও।”

“ঢাকায় গিয়ে পড়তে চাই। যেতে দেবেন?”

নিধি জানে গহন এক বাক্যে নিষেধ করে দেবে। তবে নিধির সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে গহন বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“দেব না কেন?”

নিধি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“সত্যিই?”

“হ্যাঁ। সাবিত তো ঢাকা থেকেই পড়াশোনা করেছে। সিনথিয়াও বলেছে ওর ঢাকারই কোন যেন একটা ভার্সিটি থেকে পড়ার ইচ্ছে। তাহলে তুমি পড়তে চাইলে পড়াবো না কেন?”

নিধি কিছুক্ষণ বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল গহনের দিকে। তারপরে হুট করে হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“জানি জানি আমাকে ঢাকায় পড়তে পাঠিয়ে কিছুদিন পর যখন মনে হবে যে শিক্ষিত বউ নিয়ে ঘর করা যায় না তখন হুট করে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবেন। নাহলে আমায় ঢাকায় রেখে এখানে অন্য বউকে নিয়ে সংসার করবেন। যাই হোক এত ঝামেলায় আমি যাব না। পড়াশোনাটা আমি সত্যি করবো না। সংসার করতে এসেছি সংসারই করব। আপনারা যত অত্যাচারই করুন না কেন এই বাড়ি আমি ছাড়বো না।”

কথাটা বলেই নিধি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। একটু পর গহন আবারো নিধির নাম ধরে ডাকলো। নিধির চোখে ততক্ষণে একটু ঘুমের রেশ চলে এসেছে। বালিশ থেকে মাথাটা একটু তুলে ঘুমুঘুমু কন্ঠে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হলো আবার?”

গহন নিধির দিকে তাকিয়েই কথা গুলিয়ে ফেলল। ফ্যানের বাতাসে মেয়েটার খোলা চুল গুলো উড়ে এসে মুখের উপর আছড়ে পড়ছে। মেয়েটা এতটাই অলস যে সেগুলো হাত দিয়ে সরাচ্ছেও না। চোখেমুখে কি এক অদ্ভুত ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে রেখেছে। নাক মুখ কোঁচকানো। চোখ দুটো অর্ধেক বন্ধ, অর্ধেক খোলা। দেখে মনে হচ্ছে যেন ওভাবেই ঘুমোচ্ছে।

গহন খুব তাড়াতাড়ি নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। এই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা বেশিক্ষণ ঠিক হবে না। ভয়ানক ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। এমনও হতে পারে গহন যা বলার জন্য নিধিকে ডেকেছিল সেসব ভুলে গেল।

এদিকে এতটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও যখন গহন কিছু বলল না তখন নিধি মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কিছু বলার হলে বলুন নাহলে আমি ঘুমোবো। নয়তো আপনি এতটাও সুন্দর না যে না ঘুমিয়ে সারারাত তাকিয়ে থাকবো আপনার দিকে।”

একটু নড়েচড়ে উঠলো গগন। মনে মনে সেই ভয়ানক কথাটা বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলো। কেন যে এত অস্বস্তি হচ্ছে গহন বুঝে উঠতে পারছে না। আসলে অস্বস্তি হওয়ার সবথেকে বড় কারণ নিধি। কেননা গহন জানে ও এখন যে কথাটা বলবে তার প্রেক্ষিতে নিধি অবশ্যই ওকে খোঁচাবে। দেখা গেল হয়তো খোঁচাতে খোঁচাতেই রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেল। তবে এত কিছু ভেবে গহনের কাজ নেই। যেহেতু ভুলটা করেছে তাহলে তো ক্ষমা চাইতেই হবে।

“স্যরি।”

চমকে উঠল নিধি। মুহূর্তের মাঝে দুচোখ থেকে ঘুম ছুটে পালালো। তড়িঘড়ি করে উঠে বসে গুরুতর ভঙ্গিতে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি বললেন? আবার বলুন তো।”

“আমার সেদিনের আচরণের জন্য আমি দুঃখিত। আসলে আমার তোমার সাথে ওভাবে কথা বলা উচিত হয়নি। আসলে আমি তোমায় সন্দেহ করতে চাইনি, আমি তোমায় সন্দেহ করিওনি। কিন্তু তোমার আচরণের জন্য রাগ হয়েছিল। তোমার চুপ থাকাটা আমার পছন্দ হয়নি।”

নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আরে এত কিছু না বলে মূল কথায় আসুন। কি বললেন যেন? ক্ষমা চাইলেন? আবার চান তো। শুনতে পাইনি।”

গহনের ভীষণ অস্বস্তি হলো। এখন তো আর কোনমতেই নিধির দিকে তাকানো সম্ভব না। অস্বস্তি জড়ানো গলায় আবারো বলল,

“আমার আচরণের জন্য আমি দুঃখিত।”

“অসুস্থ হয়ে পড়লেন কি? শরীর খারাপ লাগছে? আচ্ছা দেখুন তো কোন কিছুর পরিবর্তন হলো কিনা? আচ্ছা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে না তো? আচ্ছা আপনি তো এখনো দিব্যি সুস্থ সবল ভাবেই বেঁচে আছেন।”

হঠাৎ করে নিধির কথা গুলোর মানে ঠিক বোধগম্য হলো না গহনের। ভেবেছিলো মেয়েটার দিকে তাকাবে না তবে না তাকিয়ে পারলোও না। নিধির দিকে দৃষ্টিপাত করে প্রশ্ন সূচক গলায় বলল,

“কি বলছো বুঝলাম না।”

নিধির চোখেমুখপ এবার একটু গম্ভীর ভাব ফুটে উঠলো। গলায় কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আমি বোঝাতে চাইলাম যে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলে কিছুই হয় না। আপনি অসুস্থও হয়ে যাবেন না, কোন কিছু বদলাবেও না, এই পৃথিবী ধ্বংসও হয়ে যাবে না আপনি ক্ষমা চাইলে। বরং যার কাছে ক্ষমা চাইবেন তার দৃষ্টিতে আপনার মর্যাদা অনেক বেড়ে যাবে। মাথায় রাখবেন এই কথাটা ক্ষমা চাইলে কোনো ক্ষতি হয় না, তাও আবার নিজের স্ত্রীর কাছে।”

কথাটা বলে নিধি শুয়ে পড়লো। গহন আসলে অপমানিত বোধ করলো কি না ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। নিধি হয়তো বা অপমানই করতে চাইলো। কিন্তু যে কথাটা নিধি বলল সেটাও ভুল না। কিছুই বদলায় না ক্ষমা চাইলে। বরং মনটা হালকা হয়। গহন আরো উপলব্ধি করলো যে ওর এই ক্ষমাটা অনেক আগেই চেয়ে নেওয়া উচিত ছিল। যদি সঠিক সময় ক্ষমা চাইতো তাহলে নিধিরও এত রাগ থাকতো না ওর উপরে আর এখন অপমানিতও হতে হতো না।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প