বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১৪

🟢

ঘুম থেকে উঠে আজ চটপট সব কাজ শেষ করার চেষ্টা করলো নিধি। কেননা গহন আসবে নিতে। তার আগেই সব কাজ শেষ করতে হবে। না হলে বলা যায় না এরা আবার যেতে নাও দিতে পারে। আবার নিধির শাশুড়ি একবার যেতে নিষেধ করলে গহনও পল্টি খেয়ে যেতে পারে। যতই হোক মাকে তো ভীষণ ভালোবাসে। হয়তো মায়ের মুখের উপরে আর উচিত কথাটা বলতে পারবে না।

এদিকে সকাল থেকে সালমা বেগম খেয়াল করছেন নিধির কাজের গতি আজ অন্যান্য দিনের থেকে একটু বেশি। ব্যাপারটা ওনার মনে একটু সন্দেহ তৈরি করলো। নিধি তখন ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। যখন সালমা বেগমের ঘরে গেল তখন উনি নিধি কে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমার কি কোথাও যাওয়ার আছে নাকি নিধি? দেখে মনে হচ্ছে খুব তাড়াহুড়ো করে কাজ করছো।”

নিধির ইচ্ছে ছিল না যে ও বাইরে যাওয়ার কথাটা ওর শাশুড়িকে বলবে। ভেবেছিল গহন এলে ওকে দিয়ে বলাবে। কেননা নিধি বললে অনেক ধরনের অসুবিধা তৈরি হতেই পারে। কিন্তু গহন বললে অসুবিধা নাও তৈরি হতে পারে।

আবার হয়তো দেখা গেল শাশুড়ি অনুমতি দেবেন না। সে ক্ষেত্রে যদি কথাটা নিধিকে বলে নিধির ভীষণ মাথা গরম হয়ে যাবে। হয়তো উল্টোপাল্টা কিছু বলেও দেবে। আর যদি গহনকে অনুমতি না দেওয়ার কথাটাও বলে সেটা নিধির কানে সরাসরি আসবে না। সুতরাং আজেবাজে কথা শোনানোর সুযোগটাও থাকবে না। যা কথা শোনানোর গহনকেই শোনাবে।

কিন্তু এখন যেহেতু সালমা বেগম জিজ্ঞেস করেই ফেলেছেন তাহলে তো আর মিথ্যে বলা যায় না। কেননা এখন যদি মিথ্যে বলে পরবর্তীতে সত্য জানলে আবার আরো কথা শোনা লাগতে পারে।

জোরপূর্বক একটু হাসার চেষ্টা করেন বলল,

“হ্যাঁ মা। আমার ভাইয়ের স্কুলে যাব ওর সাথে দেখা করতে।”

“কিন্তু কেন? কিছু হয়েছে নাকি তোমার ভাইয়ের? অসুস্থ?”

“না তেমন কিছু হয়নি। আমার ওকে দেখতে ইচ্ছে করছিল সেই জন্য যাব।”

“ও আচ্ছা। আমি ভেবেছিলাম বোধহয় কোন সমস্যা হয়েছে বা অসুস্থ সেজন্য দেখা করতে যাবে। এমনি এমনি যে যাচ্ছো সেটা বুঝিনি।”

সালমা বেগম কথাটা হেসে হেসেই বললেন তবে তাও কেন যেন নিধির পছন্দ হলো না। মনে হলো খোঁচা দিলেন। হয়ত নিধিকে বোঝাতে চাইলেন যে কেবলমাত্র কোন জরুরি প্রয়োজনেই যাওয়া উচিত। এমনি দেখা করতে যাওয়াটা উচিত না। নিধি নিজেও পাল্টা হেসে হেসে বলল,

“আসলে মা আমি এমনই। হঠাৎ হঠাৎ করেই যার তার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে। যখন ইচ্ছে করে আমি তখনই দেখা করে আসি। নাহলে আমার মনের অস্থিরতা ঠিক কমতে চায় না।”

প্রত্যুত্তরে সালমা বেগম শুধু ছোট করে ‘ওহ’ বললেন। আর কোন কথা হলো না ওনাদের দুজনের মাঝে।

গহন নিধি কে বলেছিল দশটায় আসবে। ঠিক ঠিক দশটায় গহন বাড়ি এলো। এদিকে নিধি কাজের মাঝে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে খেয়ালই করেনি দশটা বেজে গেছে। আজ ঘুম থেকেও তাড়াতাড়ি উঠেছিল কিন্তু তারপরও যে এত তাড়াতাড়ি কি করে দশটা বেজে গেল কে জানে। এদিকে গহন এখনও নিধিকে তৈরি না হতে দেখে মৃদু বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল,

“তোমাকে বলেছিলাম তো তৈরি হয়ে থাকতে। এখনো তৈরি হওনি কেন? বারোটায় মিটিং আছে আমার। দু'ঘণ্টার মধ্যে দেখা করিয়ে নিয়ে আবার আসতে হবে।”

একেই তো সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই কাজের চাপ। নাস্তা অব্দি করার সময় পায়নি। তার মাঝে এখন এসে আবার গহনের এই গরম দেখানোটা মোটেই সহ্য হলো না নিধির। মৃদু রাগী গলায় বলে উঠলো,

“আমি তো গরুর জন্য ঘাস কাটছিলাম। তৈরি হওয়ার সময় পাবো কোথা থেকে। আমাকে দেখে আপনার কি মনে হচ্ছে আমি শখ করে বসে ছিলাম? আপনার কোন আন্দাজ আছে এই পুরো বাড়ির সব কাজ আমার করতে কত সময় লাগে? কি প্যারার মাঝে আমি থাকি জানেন আপনি? এত কাজ রেখে তৈরি হওয়ার সময় পাইনি।”

দমে গেল গহন। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি একা কেন সব করবে? মিতা আসেনি?”

“উনি ছুটিতে আছেন। ওনার অবর্তমানে কাজের লোকের ভূমিকা আমি পালন করছি। এখন সামনে থেকে সরুন। রান্নাঘরটা পরিষ্কার করে রেখে এসে তৈরি হব। যত্তসব!”

নিধি ঘর থেকে বেরই হচ্ছিল। দরজার কাছে যেতেই দেখলো সালমা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। এই মুহূর্তে ওনাকে এখানে দেখে নিধির মোটেও ব্যাপারটা সুবিধার মনে হলো না। ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কিছু বলবেন মা?”

সালমা বেগম নিধির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। নিধিকে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে এসে গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“শুনলাম তোমরা নাকি নিধির বাবার বাড়ি যাচ্ছো? কই আমায় তো কিছু জানাওনি? কয়দিনের জন্য যাচ্ছো?”

গহন কিছু বলে উঠতে ধরলো তবে তার আগেই দরজার কাছে দাঁড়ানো নিধি বলে উঠলো,

“আমরা তো আমার বাবার বাড়ি যাচ্ছি না মা। আপনি তো আমার থেকে শুনলেন আমার ভাইয়ের স্কুলে যাচ্ছি ওকে দেখতে। স্কুলে তো আর থাকার জায়গা নেই।”

নিধি কথাটা বলতেই গহন ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“তুমি নিজের কাছে যাও। আমি কথা বলছি মায়ের সাথে।”

গহন যেতে বললেও নিধি ঠাঁয় সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। গহন বুঝলো যে নিধি যাবে না। ওর উপরে জোরজবরদস্তি চালানোরও কোন ইচ্ছে হলো না। সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিধির ভাইয়ের স্কুলে যাবো মা। ওখানেই দেখা করবো। বাড়িতে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা নেই।”

“আজ না গেলে কি হয় না? আসলে তোমার খালারা আসছে। জানোই তো তোমার বড় খালার শরীর ভালো না। ওরা কেউ বিয়েতেও আসতে পারেনি। সেজন্য নিধি কে দেখতে আসছেন। এখন নিধি কে দেখতে আসছেন নিধিই যদি না থাকে ব্যাপারটা কেমন হয় না? ওরা দুদিন আগেই আমায় বলে রেখেছিলো যে আজ আসবে। আমি তো নিধিকে সেজন্য রান্নাও করতে বলেছি। তোমরা বরং আজ না গিয়ে কাল যেও।”

নিধি মনে করার চেষ্টা করলো যে ওর শাশুড়ি কখন ওকে বলেছে যে ওর খালা শাশুড়িরা আসছে জন্য ওকে রান্না করতে হবে। এমন কোন কথা মনে পড়ল না। আজ সকাল থেকে ওনার সাথে রান্নাবান্না নিয়ে কোন কথাই হয়নি নিধির।

আর তাছাড়া উনি বলছেন দুইদিন আগে থেকে জানিয়ে রেখেছেন তাহলে সকালে নিধি যখন বলল যাবে তখন কেন এই কথাটা বললেন না? আদৌ কি ব্যাপারটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ছিল নাকি নিধি কে যেতে দেবেন না জন্য এই কাজটা করলেন উনি?

নিধি নিজের মনের সন্দেহ গুলো মনের মাঝেই চাপিয়ে রাখলো। অপেক্ষা করলো শুধু গহনের উত্তরের। গহন কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“কখন আসছে খালারা?”

“এইতো আর আধাঘন্টার মতন লাগবে। সকালে রওনা দিয়েছে। তুমিও আজ অফিসে যেও না, বাড়িতেই থাকো।”

গহন আবার ভাবনার মাঝে ডুবে গেল। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে যেই না কিছু বলে উঠতে ধরল ওমনি সালমা বেগম আগে আগে বলে উঠলেন,

“আজকে ঋতুরও বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। ওর কোন বোনের যেন বিয়ে ছিল। কিন্তু আমি নিষেধ করলাম সেজন্য থেকে গেছে। এখন নিধি যদি চলে যায় তো যেতে পারে। কিন্তু বাড়ির দুই বউ একসঙ্গে থাকলে ভালো হতো। মেহমানদের আপ্যায়নেও সুবিধা হতো।”

কথাগুলো বলে সালমা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিধি এখনো তাকিয়ে আছে গহনের দিকে। অপেক্ষা করছে গহনের উত্তরের। কেননা গহন এখনো নিজের চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত জানায়নি। গহন বেশ ভালোই বুঝতে পারছে যে নিধি ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

এদিকে গহন পড়েছে বেশ ভালোই দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে। গহন চাইলে এখন নিধিকে নিয়ে যেতেই পারে। কিন্তু তারপরের পরিবেশটা নিধির জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করে অবশেষে গহন নিজেকে প্রস্তুত করলো নিধি কে নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা জানানোর জন্য। যেই না নিধির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবে ওমনি নিধি নিজেই বলে উঠলো,

“মায়ের আদেশ পালন করবেন তাইতো? এটাই তো বলবেন যে আজ যাওয়ার দরকার নেই?”

“কালকে যাই আমরা! দেখো খালারা অনেক দূর থেকে তোমার সাথে দেখা করার জন্যই আসছে। তুমি যদি না থাকো ব্যাপারটা খারাপ দেখায়। আমি কথা দিচ্ছি আগামীকাল নিশ্চয়ই নিয়ে যাব। সে কালকে যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, যেই আসুক না কেন। আজকের দিনটা একটু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো।”

“আরে অদ্ভুত তো। কেন মানিয়ে নেব যেখানে পুরো ব্যাপারটাই সাজানো। আপনি জানেন সকালে আপনার মায়ের সাথে আমার এই নিয়ে কথা হয়েছে। উনি শুনেছেন আমার থেকে যে আমি আমার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাব। তখন তো উনি বললেন না যে ওনার বোনেরা আসছেন। হঠাৎ করে রওনা দিয়ে দিল! আর যদি অনেক দূরে থেকে আসে তাহলে নিশ্চয় অনেক সকাল সকালই রওনা দিয়েছিলেন। আমাকে সকালে কেন জানালেন না? তারপরে আরও প্রায় দু ঘন্টা কেটে গেছে মাঝে। আমাকে তো একটা কথাও বললেন না উনি। আমার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল। আমার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, আপনার না।”

গহন বুঝলো নিধির রেগে যাওয়াটা অযৌক্তিক কিছু না। আবার নিধি যে কথাটা বলেছে সে কথাটাও মিথ্যাে না সেসব গহন জানে। কিন্তু তারপরও সেটা নিধিকে বুঝতে দিতে চাইল না। বরং নিধির ধারণাটা ভুল সেটা বোঝানোর ভঙ্গিতে বললাম,

“ভুল ভাবছো তুমি। মা হয়তো ভুলে গিয়েছিল। ভেবেছিল সরাসরি কথাটা আমাকে বলবে সেজন্য আর তোমায় জানানো হয়নি। প্লিজ এই নিয়ে আর রাগারাগি করো না। আজকের জন্য তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বলে নাও ফোনে।”

বিজ্ঞাপন

রাগে দুঃখে নিধির এখন কান্না পাচ্ছে। খুব বেশি কিছু আবদার করে ফেলেছিল কি! শুধু একটু ভাইয়ের সাথে গিয়ে দেখাই করতে চেয়েছিল। বাপের বাড়িতে গিয়ে তো দু চার দিন থাকতেও চায়নি। গহন তো কথাও দিয়েছিল রাতে। কিন্তু রাখল না কথা। কেঁদেই ফেলল নিধি। দু হাতে চোখের জল মুছতে মুছতে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কিচ্ছু লাগবে না। আমি মানিয়ে নিচ্ছি। আর সারা জীবন আমিই মানিয়ে চলবো। আর আপনি শুধু মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে এই নাটকগুলো দেখতে থাকুন। এর বেশি আপনার থেকে কিছু আশা করাও যায় না।”

গহনের চোখে মুখে এবারে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো। নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর দুই বাহু ধরে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“আমায় ভুল বুঝোনা নিধি। তুমি আজ মায়ের কথা মেনে নিলে কাল মা তোমার কথা মানবে। আর না মানলেও তখন আমার বলার মতন অনেক কথা থাকবে। সবসময় জোর করে সবাই কে নিজের কথা মানানোর চেষ্টা করতে নেই। বরং এমন কাজ করো যেন এমনিতেই তারা তোমার কথা মানতে বাধ্য হয়।”

নিধি বোধহয় গহনের কথাটা একটু বুঝলো। তবে মন মানতে চাইছে না। ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“আমার মন মানছে না। আপনি জানেন না আমার বাড়ির অবস্থা। আমার চিন্তা হচ্ছে আমার ভাই কে নিয়ে। ও অনেক ছোট। আমি এর আগে কখনো আমার ভাই কে না দেখে এতদিন থাকিনি।”

গহন সযত্নে নিধির চোখের জল মুছে দিয়ে ওকে ভরসা দিয়ে বলল,

“কাল আর আমার কথার খেলাপ হবে না। আজ তুমি আমার কথা শুনেছো। কাল আমি তোমার কথা শুনবো। কাল যাই হয়ে যাক না কেন যদি আমি বেঁচে থাকি তোমাকে নিয়ে যাবোই।”

__________

আজ রাতে গহন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কারণ খালাদের সঙ্গে দেখা করা। তবে বাড়ি এসে কোন অতিথিদের দেখতে পেল না।

দরজা নিধি খুলে দিয়েছে। ঘরের ভেতরে এসে যখন পরিবেশ এত শান্ত দেখলো তখন গহন নিধিকে জিজ্ঞেস করল,

“খালারা আসেননি?”

“না। কি যেন দরকারি কাজে মাঝ রাস্তা থেকে ওনারা আবার বাড়ি ফিরে গেছেন।”

“এত দূর থেকে আসছিলেন আর আবার মাঝ রাস্তা থেকে বাড়ি ফিরে গেলেন! কি হয়েছিল?”

নিধি এগিয়ে এলো গহনের দিকে। আশপাশটা একবার ভালোভাবে দেখে নিল কেউ আছে কিনা। গহনে কানের কাছে গিয়ে কথা বলার সামর্থ নিধির নেই। কেননা ছেলেটা উচ্চতায় অনেক লম্বা। নিধি ইশারায় গহনকে একটু নিচু হতে বলল। নিধির ইশারা বুঝতে পেরে গহন একটু ঝুঁকে গেল নিধির দিকে। গহন ঝুঁকে আসতেই নিধি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“বলেছিলাম না সব ষড়যন্ত্র। আমি নিশ্চিত ওদের আজকে আসার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। আপনাকে আর এই ভেবে চিন্তাও করতে হবে না যে কি এমন ঘটে গেছে জন্য ওরা আসতে পারেনি।”

নিধির কথাটা শুনে গহন হাসবে কি হাসবে না ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তবে মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গিতে সব সময় একটা রসিকতার ভাব থাকে। যার কারণে একটু হাসতে মন চাইলো। তবে তাও হাসলো না গহন কি মনে করে যেন।

বাড়ির সবার সাথেই আজ রাতে খেতে বসতে পারল গহন। খাবার টেবিলে গহন কিছু বলে ওঠার আগেই সালমা বেগম নিজ থেকেই গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার খালারা আসছিলেনই। পরে তোমার মামি কল করে বলেছিল যে উনিও নাকি আসবে। সেজন্য ওরা আবার ফিরে গেছে। তোমার মামি তো এতদূরে একা আসতে পারবে না। সেজন্য আজ আর ওনাদের আসা হলো না।”

গহন ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“ওহ্।”

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সালমা বেগম আবারও গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“নিধিকে নিয়ে বোধহয় তোমার কাল যাওয়ার কথা ছিল তাই না? কিন্তু কাল তো তোমার খালারা আসবে। তোমরা বরং পরশু যেও।”

“না মা। কালই যেতে হবে। কাল নিধি কে নিয়ে যাব জন্য আমি মিটিংও ক্যান্সেল করেছি। পরশু যাওয়া সম্ভব হবে না।”

গহনের থেকে এমন কাঠখোট্টা উত্তর মোটেও আশা করেননি সালমা বেগম। কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্ট হলেন ছেলের প্রতি। তবে সেটুকু বুঝতে না দিয়ে ফের হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠেই বলে উঠলেন,

“মিটিং ক্যানসেল করে যাওয়ার কি আছে। আগে তোমার কাজ বাবা। আর তাছাড়া নিধির ভাই তো অসুস্থ না। কোন জরুরী কাজও নেই। নিধি নিশ্চয় তোমার ব্যস্ততা বুঝবে।”

নিধি তীব্র কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে গহনের মুখের দিকে। গহনের উত্তরটা শোনার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছে না। মনের মাঝে একটু ভয়ও হচ্ছে। ভাবছে এই ছেলে না আবার পল্টি খেয়ে যায়। এখনো তো নিধি পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি এই ছেলেকে। তবে তেমন কিছুই হলো না। নিধির বিশ্বাস রাখল গহন। খাওয়া থামিয়ে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“আমি নিধিকে কথা দিয়েছি মা। ও আজ আমার কথা রেখেছে। কাল ওকে দেওয়া কথা রাখা আমার দায়িত্ব। আর মা কাল সারাদিন আমরা বাড়িতে থাকবো না। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যেতে পারে।”

সালমা বেগম আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না এই নিয়ে। কেননা তিনি বুঝতে পারছেন এই নিয়ে ছেলের থেকে সমর্থন পাবেন না।

এদিকে গহনের পাশের চেয়ারে বসা নিধির খুশিতে এখন লাফাতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে গহনের গালে গিয়ে কয়েকটা চুমু খেতে। এই ছেলে যে এতটা ভালো সেটা তো নিধি কল্পনাও করেনি। নিজের মায়ের সাথে নিধির হয়ে এতগুলো কথা বলল ভাবা যায়! নিধির মনে হলো গহনের কথা শুনে উপকারই হয়েছে। গহন ঠিকই বলেছিল মাঝে মাঝে মানিয়ে নিতে হয়।

এদিকে অনেকক্ষণ থেকে কিছু একটা বলার জন্য উশখুশ করছিল পিয়াল। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল নিজের শাশুড়ির সাথে। ভাবলো এই সুযোগ বলে নেওয়া দরকার। যেহেতু গহনও উপস্থিত আছে। একটু কেশে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে নিজের শাশুড়িকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা আগামীকাল শম্পাকে নিয়ে আমি আমার বাড়ি যাবো। আপনাকে তাই আগে থেকে জানিয়ে রাখলাম।”

পিয়াল কথাটা বলতেই শম্পা খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“আমি কি একবারও তোমায় বলেছি যে আমি তোমার বাড়ি যাবো? তোমার যাওয়ার ইচ্ছে হলে তুমি যাও। আর আমি তখনই তোমার বাড়ি যাব যখন তোমার বোন তোমার বাড়ি থেকে যাবে।”

এত মানুষের মাঝে স্ত্রীর এমন ব্যবহারে পিয়াল নিজেই লজ্জা পেল। তবে লজ্জা নেই শম্পার চোখে মুখে। অবাক করার বিষয় হলো শম্পার মাও একটুও শাসন করলেন না মেয়েকে। পিয়াল অবশ্য অবাক হলোও না। এটা নিত্যদিনের ব্যাপার। তবে এত মানুষের মাঝে স্ত্রীর সাথে হৈচৈ করার স্বভাব পিয়ালের নেই। তাই যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বলল,

“তুমি এ বাড়িতে আসার পরের দিনই আমার বোন চলে গিয়েছে। যে ব্যবহার করেছ আর জীবনেও আসবে বলে আমার মনে হয় না। নিশ্চিন্তে তুমি যেতে পারো। এই এক অজুহাতে আর কতদিন এখানে থাকবে? বাড়িতে আমার মা বাবা একা। আমি তাদের বড় ছেলে। দায়িত্ব আছে তো আমার।”

শম্পা ফের খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“তোমার মা-বাবার দাসী হয়ে থাকার জন্য তো আমি ঐ বাড়িতে যাইনি। আমার তো কাজ নেই তিন বেলা তোমার মা-বাবাকে রান্না করে খাওয়ানো ছাড়া তাইতো? পারবো না আমি। যদি তুমি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে পারো তাহলেই আমি এ বাড়ি থেকে যাব।”

উপস্থিত কেউই শম্পার কথার কোনো প্রতিবাদ না করলেও গহনের ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ হলো না। খাওয়া থামিয়ে বিরক্তিকর দৃষ্টিতে শম্পার দিকে তাকিয়ে বলল,

“পিয়ালের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলো শম্পা। ও তো ভালোভাবে কথা বলছে তোমার সাথে। আর শ্বশুর শাশুড়িকে খাওয়াতে পারবে না মানেটা কি? ওনাদের অধিকার আছে। ভদ্রতা শেখো।”

শম্পার গহন কে বেশ কড়া কিছু কথা শোনানোর ইচ্ছে ছিল। মেয়ের সে ইচ্ছে বুঝতে পারলেন সালমা বেগম। ওনার পাশেই বসা শম্পা। মেয়ে কিছু বলে উঠতে ধরলেন তবে তার আগেই উনি টেবিলের নিচ দিয়ে মেয়ের হাত চেপে ধরলেন। মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যেন গহন কে কিছু না বলে। থেমে গেল শম্পা। সালমা বেগম এবারে পিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“দেখো বাবা, আমি আমার মেয়েকে অনেক আদর ভালোবাসায় বড় করে তুলেছি। ওকে দিয়ে তো এত খাটাখাটনি নাও করালে পারো। কাজের লোক রাখার সামর্থ্য তোমাদের আছে তাই না? তোমার মা-বাবার দেখাশোনার জন্যও লোক রেখে দিতে পারো। ওনাদের যাবতীয় দেখাশোনার দায়িত্ব কেন আমার মেয়ে পালন করবে? ও তো কাজের লোক না তোমার বাড়ির।”

“মা, আপনি শুধু আপনার মেয়ের কথাগুলো শুনে বিচার করছেন। কখনো সময় সুযোগ হলে আমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখে আসবেন যে আমার মা-বাবা আপনার মেয়ের সাথে ঠিক কেমন ব্যবহার করে। আপনার মেয়ে ঘরে বসে পায়ের উপর পা তুলে হুকুম করে আমার মাকে। আমার মা রান্না করে খাওয়ায় আপনার মেয়েকে। কোন কাজ করে না ও বাড়ির। আরো কি সুবিধা চাইছেন? এখন নিজের সংসার, স্বামী, সন্তানের কাজও যদি ও না করে তাহলে আমার সত্যি কিছু বলার নেই। তাহলে আমি বলব ও বরং এখানেই থাক। আমি চলে যাই।”

পিয়াল ভেবেছিল ওর এই কথা শুনে অন্তত সালমা বেগম একটু দমে যাবেন। হয়তো এবার মেয়েকে তিনি বলবেন পিয়ালের সাথে চলে যেতে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং মেয়েকে প্রশ্রয় দিয়ে পিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“সে তুমি চাইলে যেতেই পারো। তোমাকে তো আটকানোর সাধ্য আমাদের নেই। তবে আমার মেয়ে আমার কাছে বেশি হবে না কোনদিন। ওর বাড়ি এটা। ওদের বাবা যথেষ্ট ব্যবস্থা করে রেখে গেছেন ওদের জন্য। দেখো তুমি যা ভালো বোঝো তাই করো।”

নিধি শুধু বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে এদের একেকজনের কথাবার্তা আর তাজ্জব বনে যাচ্ছে। যেখানে শম্পা নিজে ওর ভাইয়ের বাড়িতে বসে থেকে ওর ভাইয়ের বউয়ের মাথা খারাপ করে দিচ্ছে সেখানে নিজের ননদকে সহ্য করতে পারে না! আবার এই মহিলা ঠিক কতটা ধান্দাবাজ যে নিজের মেয়ে খাটাখাটনি করবে সেটা ওনার সহ্য হবে না। অথচ অন্যের মেয়েকে দিয়ে সারাদিনরাত কাজ করিয়ে নিচ্ছেন তো করিয়েই নিচ্ছেন।

এদিকে গহন বুঝলো বিষয়টা জটিল আকার ধারণ করছে। সবারই একটা ধৈর্যের সীমা আছে। পিয়াল যথেষ্ট ধৈর্য ধরেছে। তবে ব্যাপারটা যদি সত্যি এবার জটিল আকার ধারণ করে এমনও হতে পারে পিয়ালের ধৈর্যের বাধ হয়ত ভেঙে গেল। তাই গহনের মনে হলো এবারে পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়া উচিত। নিজের মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এইসব আলোচনার সমাপ্তি এখানেই হোক মা। পিয়াল, তুমি বরং এক কাজ করো কাল তোমার মা-বাবাকে এখানে আসতে বলো। মা, তুমি কথা বলে নিও। আর তারপরে দরকার পড়লে আমি নিজে ওনাদের দাওয়াত দেব। আর শম্পা দরকার পড়লে আরো কয়েকটা দিন থাক, তারপরে তুমি নিয়ে যেও। আর শম্পা তোমাকেও বলছি, কিছুদিন পর শ্বশুর বাড়ি চলে যাও। এমনটা তো না যে একবার গেলে আর এখানে আসতে পারবে না। ওই বাড়ির প্রতিও তো তোমার কিছু দায়িত্ব আছে। বুঝতে হবে তোমায়।”

পুরো বাড়িতে এই একটা মানুষকেই পছন্দ পিয়ালের। গহনই একমাত্র মানুষ যার কথাবার্তায় প্রমাণ পায় যে এই মানুষটার বিবেচনা বোধ আছে, মনুষ্যত্ববোধ আছে। তাছাড়া বাড়ির বাকি মানুষগুলো কে তো মানুষ বলে গণ্য করতেও পিয়ালের বিবেকে বাঁধে।

এদিকে টেবিলের নিচে সালমা বেগম এখনো মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে আছেন। শম্পা শুধু রাগে কটমট করছে। পারছে না শুধু নিজের কথার দ্বারা গহন কে ক্ষতবিক্ষত করতে। আর খাবারই খেলো না শম্পা। ছেলেকে নিয়ে উঠে চলে গেল ঘরে। মনে মনে যে কত রকম ভাবে গহন কে গালাগালি করলো তার হিসেব নেই।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প