বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১৬

🟢

মাঝরাতে হঠাৎ করেই কিছুর শব্দে নিধির ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ খুলতেই দেখল গহন সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে।

নিধি উঠে বসে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ঘুমোননি কেন আপনি?”

নিধির কণ্ঠস্বরটা কানে যেতেই গহন ওর দিকে তাকিয়ে অপরাধী গলায় বলল,

“দুঃখিত তোমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেওয়ার জন্য।”

“কিন্তু ঘুমোননি কেন আপনি? কাজ করছিলেন?”

“না। ঘুমিয়ে ছিলাম তো।”

“তাহলে উঠে বসে আছেন কেন? কিছু হয়েছে নাকি?”

“না কিছু হয়নি। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।”

নিধির ব্যাপারটা ঠিক লাগলো না। গহনের কথাটা বিশ্বাসও হলো না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে আগে লাইটটা জ্বালালো। তারপরে গহনের দিকে এগিয়ে গেল। গহন কে দেখেই মনে হচ্ছে বোধহয় শরীরটা ঠিক লাগছে না। অসুস্থ হয়তো। নিধি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“ঝামেলা না করে সত্যি করে বলুন তো কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”

“বললাম তো তেমন কিছু হয়নি। পেটে ব্যথা করছে। সেই সাথে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে। আসলে বেশি ঝাল খেলে আমার সমস্যা হয়। আজ তরকারিতে প্রচুর ঝাল হয়েছিল তো সেজন্য এই সমস্যাটা হলো আর কি।”

“আপনি যখন জানেন ঝাল খেলে আপনার সমস্যা হয় তাহলে খাচ্ছিলেন কেন? আমার কিসে সুবিধা অসুবিধা সেদিকে নাহয় খেয়াল নাই রাখলেন। তাই বলে নিজের কিসে সুবিধা অসুবিধা সেদিকেও খেয়াল রাখবেন না! তখন যদি আমি প্লেটটা কেড়ে না নিতাম তাহলে তো সবই খেয়ে নিতেন।”

“চিন্তা করো না ঠিক আছি আমি। সমস্যা হবে না। যাও ঘুমিয়ে পড়ো।”

“তা আপনি কি এখানে বসে থেকে ধ্যান করবেন? ওষুধ খেয়েছেন?”

গহন উপর নিচ মাথা নাড়লো। যাক এই ব্যাপারে গহন বেঁচে গেল অন্তত ওষুধটা খাওয়ার জন্য। কেননা নিধি মনে মনে ঠিক করেই রেখেছিল যদি গহন বলে ও ওষুধ খায়নি তাহলে লোকটাকে আচ্ছা মত কথা শোনাবে।

গহন এখন শুতে চাইলো না। তবে নিধি জোর করলো। বলল ঘুমোলে নাকি একটু আরাম পাবে। এদিকে গহন মেয়েটাকে বোঝাতেই পারল না যে এখন গহনের ঘুম আসবে না। জোরাজুরি করতেই লাগল তো করতেই লাগল। এক পর্যায়ে গিয়ে গহন নিজেই হার মেনে নিল। ভাবলো অযথা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। এর থেকে বরং শুয়ে পড়লে অন্তত এই মেয়েটার বকবক থেমে যাবে।

________

শ্বশুরবাড়িতে আসার পর আজকে প্রথম নিধির এত সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো। আরো অবাক করার বিষয় হলো চোখ মেলে পাশে তাকাতেই দেখল গহন এখনো ঘুমিয়ে আছে। ভাবা যায় সকাল সাতটা বাজতে চলেছে অথচ গহন এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।

নিধি ভাবলো গহনের শরীরটা বোধহয় একটু বেশিই খারাপ। আর তাছাড়া গতকাল রাতেও তো অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছিলো। এখন মানুষটাকে একটু ঘুমোতে দেওয়া উচিত। বিরক্ত করা ঠিক হবে না।

নিধি হাতমুখ ধুঁয়ে আস্তে করে দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে বেরোলো। উদ্দেশ্য রান্না ঘরে যাওয়ার। ভাবল এই কয়দিন তো উঠতে দেরি হয়েছে। আজকে না হয় নিধিই সবার জন্য সকালের নাস্তাটা বানাবে। এই কয়দিন অন্তত সকালের নাস্তার ব্যাপারে তো বেশ ভালোই আরাম করলো। শাশুড়ি মা রান্নাবান্না করে রাখে আর নিধি শুধু খায়। যদিও ব্যাপারটা বেশ অবিশ্বাস্য কিন্তু তারপরেও তো ঘটেছে।

নিধি রান্নাঘরে ঢুকতে ধরে কারো একটা সাথে ধাক্কা খেলো। ভয়ে চমকে উঠলো নিধি। সামনে তাকাতেই দেখল মিতা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটারও একই অবস্থা। নিধিকে দেখে সেও ভয় পেয়েছে।

“আরে বড় ভাবি আপনে! আমারে তো ডরাইয়া দিছিলেন।”

“আরে আপনিও তো আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন। যাক তাও আপনি এলেন ছুটি কাটিয়ে। এবার যদি আমি একটু শান্তি পাই।”

নিধির মুখ থেকে ছুটির কথাটা শুনতেই মিতা চোখমুখে কিঞ্চিত বিস্ময় ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“কি কইলেন? ছুটি? আমি আবার কবে ছুটিত গেলাম? কি কন এইসব?”

নিধি কপাল কুঁচকে বলল,

“আপনি তো কয়েকদিন ধরে আসছেন না। আপনি নাকি ছুটি নিয়েছেন কাজ থেকে।”

“ধুরো। কি যে কন না। গত কয়েকদিন কাম একটু কম ছিল এই বাড়িতে। আপনের শাশুড়ি আম্মাই তো আমারে কইছিল যে খালি সকালে আইসা নাস্তা বানাইয়া দিয়া চইলা গেলেই হইবো। আর কোন কাম করা লাগবো না। হের লাইগা আমি সকালে আইসা রুটি সবজি বানাইয়া দিয়ে চইলা যাই। ভোরে আসা লাগে।”

নিধি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মিতার দিকে। নিধি বুঝে উঠতে পারল না যে মিতা ওকে ভুলভাল তথ্য দিলো নাকি ওর শাশুড়ি ওকে মিথ্যে বলেছিল। অনুষ্ঠানের পরের দিন থেকেই তো উনি নিধিকে বলে যাচ্ছেন যে মিতা নাকি ছুটিতে ছিল সেজন্য আসতে পারছে না। কিন্তু এখন মিতার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে বাড়ির মানুষজন ঘুম থেকে ওঠার আগেই মিতা এসে রান্না বান্না করে চলে যেত।

বাহ্ দারুন ব্যাপার। তারমানে সবকিছুই করা হয়েছে নিধিকে দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানোর জন্য। খুব ভালো। এটাই তাহলে নিধির শাশুড়ির অন্যের মেয়ের কষ্ট বোঝার নমুনা।

আপাতত মিতার সাথে আর কোন কথা বাড়াতে চাইলো না নিধি। শুধু জিজ্ঞেস করল যে এখন চলে যাচ্ছে কিনা। মিতাও স্বাভাবিকভাবে বলল যে যেহেতু ওকে যতটুকু কাজ বলা ছিল ততটুকু কাজ শেষ তাহলে তো চলেই যাবে। নিধিও আর কথা বাড়ালো না। মিতা কে যেতে দিল।

রান্নাঘরে গিয়ে দেখল আজকেও বাকি দিনের মতন মিতা রুটি বানিয়েছে। তবে আজ আর সঙ্গে সবজি নেই। ঝাল ঝাল করে মুরগির মাংস রান্না করা হয়েছে। নিধি বুঝে উঠতে পারেনা রুটির প্রতি এই বাড়ির মানুষের কিসের এত ভালোবাসা। এত বড়লোক মানুষজন তাও একটু ভাত খায় না। একটু তেলে ভাজা বা ঘিয়ে ভাজা পরোটা অব্দি খায় না। কি হবে এতো টাকা পয়সা দিয়ে যেখানে রোজ সকালে রুটি আর সবজি খেতে হয়। তাও আজকে মাংস রান্না করা হয়েছে।

মাংসের রং দেখেই নিধি বুঝতে পারছে তুমুল ঝাল দিয়ে রান্না করা হয়েছে। এদিকে মনে পড়ে গেল গহনের কথা। রাতে ঝাল খেয়ে লোকটার যে অবস্থা হয়েছিল সকালে উঠেও যদি এই তরকারি খায় তাহলে ওনাকে বোধহয় আর বাঁচানো যাবে না।

একটু ভাবনা চিন্তা করে নিধি সিদ্ধান্ত নিল গহনের জন্য আলাদা করে কিছু রান্না করার। অন্তত এই বাড়িতে নিধির টিকে থাকার জন্য হলেও গহনকে দরকার। সে গহন ভালো হোক বা খারাপ হোক তবুও তো নিধির স্বামী।

গহনের জন্য কম তেল মসলা দিয়ে পাতলা করে একটু খিচুড়ি রান্না করলো নিধি। আর সেই সাথে একটা ডিম সিদ্ধ করলো। নিধির কাজ করার মাঝেই হঠাৎ করে ওর কানে শম্পার কন্ঠ ভেসে এলো

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিধি। ভাবলো আবার শুরু হয়ে গেল এদের ভালোবাসা দেখানো। নিধি যে কি করে এদেরকে বোঝাবে যে ওদের এত ভালোবাসার নিধির সহ্য হচ্ছে না। পেট খারাপ হয়ে যাবে তো এত ভালোবাসায়।

তবে এতকিছু আর শম্পাকে বলতে পারল না নিধি। নিজের রাগ কিংবা বিরক্তি ভাবও দেখাতে পারল না। পিছন ঘুরে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে শম্পাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জি আপু বলুন।”

এত মিষ্টি কন্ঠের প্রেক্ষিতে ভেসে এলো শম্পার কর্কশ কণ্ঠস্বর।

“ফ্রিজে একটা দুধের বোতল কম দেখতে পাচ্ছি। কোথায় গেল?”

“উড়ে তো যাওয়ার কথা না আপু। দেখুন হয়তো কোন কোণায় পড়ে আছে।”

“আমাকে কি তোমার কানা মনে হয়। বলছি তো নেই। কোথায় গেল সেটাই তো বুঝতে পারছি না। এর আগে তো কখনো এমন হয়নি।”

নিধি মস্তিষ্কে জোর প্রয়োগ করলো মনে করার জন্য যে ও আবার ভুলে কিছু করেছে কিনা। তখনই মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের কফির কথাটা। তড়িৎ গতিতে বলল,

“মনে পড়েছে আপু। গতকাল রাতে কফি বানানো হয়েছিলো।”

নিধির কল্পনাতেও এ বিষয়টা ছিল না যে ওর কফি খাওয়ার কথাটা শুনতেই শম্পা এভাবে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেবে। শম্পার চেঁচামেচি দেখে মনে হলো নিধি দুধ না, বোধহয় সোনা খেয়ে নিয়েছে। শম্পা হা হুতাশ করে চেঁচাতে চেঁচাতে বলল,

“পিয়াল এনেছিল দুধ আমার মেয়ের জন্য। সকালে আর রাতে দুবেলা করে ওকে দুধ না দিলে হয় না। বাড়ির লোকেদের খাওয়ার জন্য দুধটা আনিনি। আর তাছাড়া তুমি এত বড় একটা মেয়ে এখনো তোমায় দুধ খেতে হবে নিয়ম করে? কোন আক্কেল নেই তোমার বাচ্চাদের জিনিস চুরি করে খাও।”

লজ্জায় অপমানে মুখটা চুপসে গেল নিধির। সেই সাথে রাগও হলো। এমন নোংরা কথাবার্তা তো ওর চাচিরাও ওকে বলত না। ওরা কফি লুকিয়ে রাখত কিন্তু তাই বলে এভাবে চুরির অপবাদ দিত না। আর এখানে চুরি করে খাওয়ারই বা কি আছে। এক বাড়িতে এত মানুষ থাকে। একটাই তো ফ্রিজ সেখানে কে কার জন্য কি নির্দিষ্ট করে রেখেছে সেটা কি আর এভাবে বোঝা যায়। মৃদু রাগী গলায় বলল,

“আজেবাজে কথা কেন বলছেন আপু? দুধ শেষ হয়ে গেলে কি আবার আনা যাবে না?”

শম্পা খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“টাকা কি তোমার বাপের বাড়ি থেকে আনবে?”

“মোটেও না। আমার দায়িত্ব যেহেতু এখন আমার স্বামীর তাই উনিই দেবেন। গহন কে উঠতে দিন। ওনাকে বলবো যে আপনার যা দরকার সেগুলো যেন এনে দেয়।”

নিধি ভাবলো ঝামেলার সমাপ্তি বোধহয় এখানেই হবে। আর কথাও বাড়াতে ইচ্ছে করছে না। কেননা শম্পার ব্যবহারে নিধি নিজেই লজ্জিত।

তবে শম্পা থামলো না। ফের বলে উঠলো,

“আমার ভাইয়ের টাকার গরম আমায় দেখাচ্ছো? একেই তো চুরি করে খাও তার ওপর আবার দেমাগ দেখানো হচ্ছে। কার থেকে অনুমতি নিয়ে তুমি আমার বাচ্চার খাবারে হাত দিয়েছ? সেদিন তো আমার বোনকে খুব চোর বানানোর চেষ্টা করলে। অথচ আসল চোর তো তুমি নিজে। হবেই তো। ছোটলোক পরিবার থেকে এসেছো। ওখানে তো তোমাদের ছোটবেলা থেকে এসব চুরির অভ্যাসই শেখানো হয়। ছোটলোক কোথাকার।”

আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। নিধি যত কথা কম বাড়ানোর চেষ্টা করছে এরা ততই নিধি কে কথা বাড়াতে বাধ্য করছে। নিধি কে ভদ্রতা বজায় রাখতে দিচ্ছেই না।

বিজ্ঞাপন

শম্পার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,

“ভদ্র ভাবে কথা বলুন আপু। কথা হচ্ছে আমার আর আপনার মাঝে এর মধ্যে আমার পরিবার কে টানবেন না। চাইলে কিন্তু আমিও আপনার শিক্ষার ওপর প্রশ্ন তুলতেই পারি। কিন্তু তুলছিনা তার কারণ এটা আমার শিক্ষা। আমায় অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না।”

শম্পা মুখ ভেঙচিয়ে তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“ছোটলোকদের মুখে এত কথা মানায় না। চোর কোথাকার।”

কথাটা বলে নিধিকে আর কোনো সুযোগ দিতে চাইলো না শম্পা। যতটুকু অপমান করার দরকার ছিল করেও নিয়েছে। গতকাল রাতের গহনের ওপরে জমে থাকা রাগটা বেশ ভালোভাবেই নিধির ওপরে দেখানো গেছে। এখন গিয়ে একটু শান্তি লাগছে শম্পার।

নিধি কিছু বলে ওঠার আগেই শম্পা চলে যেতে ধরলো। পিছন ঘুরতেই দেখল গহন দাঁড়িয়ে আছে। নিধিও দেখলো গহন কে। থেমে গেল আপাতত। শম্পাও চমকে উঠলো। একটু অপ্রস্তুতও হয়ে পড়ল। এদিকে ততক্ষণে শম্পার চেঁচামেচিতে সেখানে সালমা বেগম সহ বাড়ির বাকিরাও চলে এসেছে কেবলমাত্র সাবিত আর সিনথিয়া বাদে।

গহনকে দেখে শম্পার মনে হলো যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে পারবে ততই ভালো। কেননা গহন কথাগুলো শুনে ফেলেছে কিনা সেটা তো জানে না। তবে শম্পা চলে যাওয়ার আগেই গহন বেশ শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“যে কথাগুলো তুমি এতক্ষণ নিধি কে বললে সেগুলো আবার বলো। আমি আসলে সব শুনতে পাইনি। আমি তোমার সম্পূর্ণ কথা শুনতে চাই।”

কিঞ্চিত ভয় পেল শম্পা। সালমা বেগম বোধহয় বুঝতে পারলেন সেটা। এগিয়ে এসে কিছু একটা বলতে চাইলেন। তবে বলে উঠতে পারলেন না। তার আগেই গহন ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“মা আমি কথা বলছি শম্পার সাথে। একটু আলাদাভাবে আমাদের দুজনকে কথা বলতে দাও।”

পূর্ণ সম্মানের সাথে শান্ত গলায় সালমা বেগমকে কথাটা বলল গহন। সালমা বেগম একটা শব্দও আর উচ্চারণ করতে পারলেন না। গহনের অভিব্যক্তি দেখে তার মনে হচ্ছে গহন এমন কিছু বলবে কিংবা এমন কোন কাজ করবে যেটা তার ভীষণ অপছন্দ হবে। কিন্তু তারপরও তিনি চুপ করে রইলেন। তিনি দেখতে চান এই কয়দিনে তার ছেলের ঠিক কতটা অধঃপতন হয়েছে।

সালমা বেগমকে কথাটা বলা শেষে গহন আবারও শম্পার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,

“কি হলো বলো? কি বলছিলে তুমি নিধি কে?”

শম্পা শুধু আমতা আমতা করলো, কিছু বলতে পারল না। ওকে আমতা আমতা করতে দেখে গহনই বলে উঠলো,

“বুঝতে পেরেছি। বলতে পারবে না। তুমি তাহলে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও। ছোটলোক শব্দটার অর্থ জানো তুমি?”

এবারেও আমতা আমতা করলো শম্পা। কোনো উত্তর দিতে পারলো না। গহন আবারো বলে উঠলো,

“এই নিকৃষ্ট শব্দটা তুমি কিভাবে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলতে পারো? তুমি এমন একজনের প্রতি এই শব্দটা ব্যবহার করলে যে কিনা তোমার পরিবারের একজন সদস্য, তোমার ভাইয়ের স্ত্রী। তোমার কি মনে হয় না এর জন্য তোমার ক্ষমা চাওয়া দরকার?”

“কেন ক্ষমা চাইবো? ভুল আমি করিনি। যে ভুল করেছে সে ক্ষমা চাইবে।”

গহন তাকালো একবার নিধির দিকে। মেয়েটার চোখে মুখে যেমন রাগ ফুটে উঠেছে ঠিক তেমনি আবার চোখদুটো জলে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে। নিধির ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গহন শম্পা কে বলল,

“সত্যিই কি অন্যায় করেছে নিধি? সামান্য কফিতে দুধ ব্যবহারের জন্য তুমি ওকে চোর বলে দিলে! তাও এই সম্বন্ধে ও কিছু জানতোই না। আমি বানিয়ে দিয়েছিলাম ওকে কফিটা।”

গহনের কথাটা শুনে দুটো মানুষ চমকালো। সালমা বেগম আর ঋতু। সালমা বেগম চমকালেন বউয়ের প্রতি ছেলের ভালোবাসা দেখে। ঋতু অবশ্য চমকানোর থেকে বেশি আফসোস করলো। ভাবলো ওর স্বামীও যদি এমন হতো।

এদিকে বলার মতন কিছু খুঁজে না পেয়ে শম্পা আমতা আমতা করে বলল,

“পিয়াল আমার মেয়ের জন্য এনেছিল। দুধ না খেলে ও দুর্বল হয়ে যায়।”

“তো ফ্রিজে কি আর ছিল না? কিংবা আমাকে বললে কি আমি আর এনে দিতাম না? এই দুটো প্রশ্নের জবাব দাও।”

শম্পা কিছুক্ষণ আমতা আমতা করলো। বুঝতে পারলো বেকায়দার মাঝে পড়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে বেকায়দায় পড়ে গেছে জন্যই যে গহনের কথা সহ্য করবে এমন মনোভাব শম্পার নেই। শম্পা এ বাড়ির মেয়ে। এই বাড়িতে গহনের যতটা অধিকার আছে শম্পারও ততটাই অধিকার আছে। তাহলে গহনের সাহস হয় কি করে ওকে কথা শোনানোর। শম্পা মৃদু রাগী ভঙ্গিতে বলল,

“দেখো ভাইয়া, তোমার মতন এত টাকা আমার স্বামীর নেই। আমাকে হিসেব করে চলতে হয়। তুমি ভেবো না এই বাড়িতে থাকছি বলে তোমায় দেখে ভয় পেয়ে চলবো। এটা আমারও বাড়ি আর আমি তোমাকে এত কৈফিয়ত দিতে পারবো না। আমি বাধ্য নই।”

“আজ তুমি বাধ্য। নিধিকে তুমি এভাবে অপমান করলে কেন? এটা যেমন তোমার বাড়ি ঠিক তেমনি এটা নিধিরও বাড়ি। তোমার এই বাড়িতে সসম্মানে থাকার যেমন অধিকার আছে তেমন নিধিরও আছে। ধরে নাও তোমার মেয়ের খাবারটা নিধি না খেয়ে আমি খেয়েছি। তাহলেও কি তুমি একই ভাবে চেঁচামেচি করতে?”

শম্পার চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করলো হ্যাঁ এভাবেই চেঁচাতাম। কিন্তু বলতে পারল না। কেননা আড়চোখে নিজের মায়ের দিকে তাকাতেই দেখল সালমা বেগম ওকে ইশারায় শান্ত হতে বলছে। তবে শম্পা ঠিক করেছে শান্ত হবে না। শুধু গহনকে কিছু বলবে না। যা বলার নিধির উপর দিয়েই বলবে।

“না, তোমাকে কেন কিছু বলতাম। তুমি চাইলে খেতেই পারো। তুমি আমার ভাইয়া। কিন্তু ওই মেয়েটা.....”

শম্পাকে নিজের কথার মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে গহন পূর্বের মতনই শান্ত কন্ঠে বলল,

“ভাবি। ওই মেয়েটা তোমার ভাবি হয়। বয়সে ছোট হতে পারে কিন্তু সম্পর্কে তোমার বড়। ভাবি বলে ডাকতে ইচ্ছে না করলে নিধি বলে ডাকবে। এই মেয়েটা বলে সম্বোধন করবে না। আর যদি আমি খেলে সমস্যা না হয় তাহলে আমার স্ত্রী খেলে কেন সমস্যা হবে? নিধি নিজেকে এই পরিবারে আমাদের মাঝে মানিয়ে নেবে কি করে যদি তোমরা সহযোগিতা না করো? যদি তোমরা প্রতিটা মুহূর্ত ওকে অনুভব করাও যে ও পরের বাড়ির মেয়ে তাহলে ও তোমাদের কে আপন ভাববে কি করে? যদি তোমরা প্রতিটা কথায় কথায় অকারণে ওকে অপমান করো, ছোট করো, তাহলে পরবর্তীতে যদি ও তোমাদেরকে অকারণে ছোট করে আমি তো কিছু বলতে পারব না ওকে। কেননা শুরুটা তোমরা করেছিলে।”

সালমা বেগম বিস্ফোরিত নয়নে তাকালেন ছেলের দিকে। ওনার মাথাটা ঘুরে উঠলো। দুনিয়াটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। নিজের কানকে তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না যে ওনার বড় ছেলে এই কথাগুলো বলল।

পিয়াল অনেকক্ষণ আগেই সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। শুধু ঘটনাটা বোঝার জন্য এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। যখন পুরো ঘটনাটা বুঝলো নিজেরই ভীষণ লজ্জা হলো। শম্পার দিকে এগিয়ে এসে ওর বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,

“আর কত লজ্জায় ফেলবে আমায়। তুমি যে এমন সেটা বিয়ের আগে কেন আমি বুঝলাম না? যাও গিয়ে ক্ষমা চাও নিধির কাছে।”

শম্পা তেজ দেখিয়ে পিয়ালকে বলল,

“আমি কোন ভুল করিনি। ও না বলে আমার জিনিসে হাত দিয়েছে কেন? ওর অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল।”

“আমি তোমায় ক্ষমা চাইতে বলেছি শম্পা। আমার ধৈর্যের কিন্তু একটা সীমা আছে।”

“এসব ভয় আমাকে দেখাতে এসো না।

কি বোঝাতে চাইছো আমাকে? কি করবে তুমি? যা ইচ্ছে করে নাও তবে আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইবো না। ওই ছোটলোক বাড়ির মেয়ের কাছে শম্পা ক্ষমা চাইবে এটা অসম্ভব।”

এতক্ষণ ধরে বজায় রাখা গহনের শান্ত গলাটা এবারে চড়া হলো। ওর কন্ঠের মাঝেই তুমুল রাগ প্রকাশ পেল।

“ক্ষমা চাও শম্পা। আর দ্বিতীয়বার যেন তোমার মুখে এই ছোটলোক শব্দটা আমি না শুনি।”

শম্পা একটুও দমলো না। পূর্বের মতনই তেজ দেখিয়ে বলল,

“চাইবো না ক্ষমা। ও ছোটলোক এটা আমি হাজারবার বলবো।”

কথাটা বলে শম্পা হন হন করে হেঁটে সেখান থেকে চলে গেল। গহন নিজেই লজ্জায় মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। আশা করেছিল হয়তো এতবার করে বলার পর শম্পা নিধির কাছে ক্ষমা চাইবে। তবে চাইল না। এখন গহনই বা কি মুখ নিয়ে নিধির কাছে ক্ষমা চাইবে বুঝতে পারছে না।

লজ্জায় পরেছে পিয়াল নিজেও। শেষে বাধ্য হয়ে নিজেই নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে অপরাধী গলায় বলল,

“নিধি, ওর হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে। আসলে এটা এমন কোনো ব্যাপারই না যেটা নিয়ে কোন কথা তোলা যায়। তবে আমার স্ত্রী আবার একটু বিপরীত স্বভাবের। ওর আচরণে আমি ভীষণ লজ্জিত। সম্ভব হলে ঘটনাটা ভুলে যেও।”

নিধি কোন উত্তর দিল না। ওর থেকে কোন উত্তরের আশাতেও রইল না পিয়াল। চলে যেতে ধরলে গহন ওকে থামিয়ে বলল,

“এই বাড়িতে যারা থাকে তারা কেউই আমার পর না পিয়াল। আর আল্লাহর রহমতে আমার সামর্থ্য আছে সবার চাহিদা পূরণ করার। তাই আমার তোমার কাছে একটা অনুরোধ রইল এরপর থেকে এই বাড়িতে তুমি আর কোন কিছু বাজার করবে না। আমার ভাগ্নির পছন্দমত সবকিছু খাওয়ানোর দায়িত্বও আমি আগেই নিয়েছিলাম যদিও তাও আজ আবারও নিলাম।”

পিয়াল কে কথাটা বলা শেষে গহন এবারে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আর মা, তুমি একটু দয়া করে খেয়াল রেখো যেন এই বাড়িতে আমার টাকা ছাড়া আর কারো টাকা দিয়ে কেনা কোন কিছু না আসে। আসলে বাড়িও একটা, ফ্রিজও একটা। তাই ওভাবে ঠিক করা সম্ভব না যে কে কার টাকা দিয়ে কি কিনে এনে ফ্রিজে রাখল। যা লাগবে আমায় বলো আমি টাকা দিয়ে দেব।”

কথাটা বলে গহন সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে সালমা বেগম বলে উঠলেন,

“আজ যা হলো সেটা ঠিক হলো না গহন। চিন্তা করোনা আমি শম্পা কে বোঝাবো।”

গহন থেমে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“বোঝানো উচিত তোমার। ও আজ আমায় অনেক নিচু করলো। আর ওকে বুঝিয়ো যেন পিয়ালের সাথে ভালো ব্যবহার করে। পিয়াল ওর স্বামী। পিয়ালের কথা শুনে চলা ওর কর্তব্য।”

কথাগুলো বলে গহন চলে গেল সেখান থেকে। সালমা বেগম কিছুক্ষণ ছেলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলেন। আর ভাবলেন তার ছেলে আজ একটু বেশিই কথা শোনালো। কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।

সালমা বেগম এবারে তাকালেন নিধির দিকে। নিধি কে দেখতে এখন বেশ স্বাভাবিক লাগছে। কাজ করছে। মেয়েটার দারুণ বুদ্ধি। গহনের সামনে শম্পার সাথে একবারও তর্ক করলো না। সালমা বেগম আজ আরও দৃঢ় সংকল্প করলেন যে খুব বেশিদিন তিনি নিধি কে এই বাড়িতে টিকতে দেবেন না। নয়ত তার প্রাধান্য কমে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প