বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১৯

🟢

বিকেল চারটা নাগাদ গহনরা সবাই বাড়ি থেকে বের হলো। গহনই গিয়ে ওর মাকে বলেছিলো ওদের ঘুরতে যাওয়ার কথাটা। সালমা বেগম বাঁধা দেননি। তবে ওদের সাথে সিনথিয়াসহ গহনের কয়েকজন খালাতো ভাইবোনও আসতে চেয়েছিল। তবে জারা মুখের ওপরে নিষেধ করে দিয়েছে।

জারা যেন আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো এই কথাটা যে অনেকে ওদের সাথে যেতে চাইতে পারে। সেজন্য ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই গহনকে সাবধান করে দিয়েছিল যেন কাউকে সঙ্গে না নেয়। গহনও সায় জানিয়েছিল জারার কথায়। নিধি শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল তখন ওদের দুজন কে। কি সুন্দর গহন জারার এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। কিন্তু এখানে যদি জারার জায়গা নিধি হতো তাহলে কক্ষনো মানতো না। হাজারো প্রশ্ন করত, হাজারো জ্ঞান দিত। পার্থক্য তো আছেই।

গহন নিজের গাড়ি নিল না। আবিদের গাড়িতেই উঠলো। তবে গহন আবিদকে ড্রাইভ করতে দিতে নারাজ। নিজেই গাড়ির চাবিটা নিলো। নিধি বুঝতে পারছে না কোথায় বসবে। শেষে ভাবলো যেখানে ওকে বসতে দেবে সেখানেই বসবে। সেজন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।

আবিদ সামনের সিটে গিয়ে বসতে ধরলে জারা ওর হাত টেনে ধরে কটমটিয়ে বলল,

“কোন সেন্স নেই আপনার? আপনি কি গহনের ওয়াইফ যে ওর পাশে বসতে যাচ্ছেন? না আছে কোন সেন্স, না আছে কোন ম্যানারস। পিছনে বসুন।”

জারা কথাটা বলে আবিদ কে ঠেলেই পিছনের সিটে বসালো। তারপরে নিজেও পিছনের সিটে বসার জন্য উদ্দ্যত হয়ে নিধি কে উদ্দেশ্য করে সামনে বসতে বলল। গহন তখনও গিয়ে নিজের সিটে বসেনি। গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে দিয়ে নিধিকে উঠতে বলল। নিধি চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতন গিয়ে বসে পড়লো।

আজ প্রথমবারের মতন নিধি চার চাকার গাড়িতে উঠেছে। না হলে বরাবর বাস, রিক্সা, সিএনজি এসবেই যাতায়াত করেছে। সিট বেল্ট কিভাবে লাগাতে হয় এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ নিধি। চুপচাপ বসে থাকলো। গহনকে কথাটা বলতেও অস্বস্তি হলো। ভাবলো এখানে সবাই সবকিছু জানে। শুধু ওই একমাত্র মূর্খ। হয়তো এই কথাটা বললে সবাই হাসাহাসি করবে ওকে নিয়ে। এর থেকে ভালো সিট বেল্ট বাঁধবেই না। কি হবে? হুমড়ি খেয়ে পড়লে পড়বে তাও ঠিক আছে।

তবে নিধিকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে হলো না। গহন নিজেই বুঝতে পারল। কোন কথা না বলে নিধির দিকে ঝুঁকে এসে নিধির সিট বেল্টটা লাগিয়ে দিল। হঠাৎ করে গহন ঝুঁকে আসায় নিধি একটু চমকে মাথাটা পিছিয়ে নিয়ে গেল। গহন শুধু একবার তাকালো ওর দিকে। কোন কিছু বলল না। সিট বেল্ট লাগিয়ে দেওয়া শেষে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে নিজেরটাও লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।

__________

জান্নাত কে নেওয়ার জন্য আগে ওদের বাড়িতেই এসেছিল গহনরা। তবে দুঃখের বিষয় হলো এখানে আসার পর আর ঘুরতে যাওয়াই হয়নি। জুবাইদা বেগম আর কাউকে বেরই হতে দিলেন না। আজ প্রথমবার নিধি ওনার বাড়িতে এসেছে। এত তাড়াতাড়ি উনি যেতে দেবেন নাকি। গহন কেও কতদিন পর কাছে পেলেন। আদর যত্ন না করে তো ছাড়া যাবে না। ওনার ছেলের কি কি পছন্দ সেই সব রান্না করে খাওয়াতে হবে তো।

এখানে এসে সবার সাথে আড্ডা দিয়ে নিধির মনটা আবার ফুরফুরে হয়ে উঠলো। কি সুন্দর ব্যবহার করছে জারা ওর সাথে। এই মেয়েটা খারাপ হতেই পারে না। এত ভালো একটা মেয়ে কখনো কারো সংসার ভাঙতেই পারে না। নিধির মনে হয় ঋতু ওকে মিথ্যে বলেছে। নয়তো ঋতু নিজেই কিছু জানে না। অযথা মনটা খারাপ করে দিয়েছিল।

গল্পগুজব করতে করতেই রাত হয়ে গেল। ওদের গল্পের মাঝে জুবাইদা একবার এসে নিধি কে নিজের সাথে নিয়ে গেলেন তার ঘরে। ঘরে নিয়ে গিয়ে নিধিকে বিছানায় বসালেন। হঠাৎ করে নিধির সামনে নিজের ফোনটা ধরলেন। নিধি চমকে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে একজন মহিলা কে দেখা যাচ্ছে। ভিডিও কলে তাকে দেখাচ্ছে নিধি কে। জুবাইদা নিধির সাথে ভদ্রমহিলার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,

“এই হলো নিধি। গহনের স্ত্রী।”

নিধি জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে ফোনের অপর পাশে থাকা ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিল। ভদ্রমহিলা খুব প্রশংসা করলেন নিধির। টুকটাক কথাও হলো ওনাদের মাঝে। তারপরে ফোনটা রেখে দিলেন। খুব বেশি কথা হলো না। ফোনটা রাখার পর নিধি জুবাইদা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“উনি কে ছিলেন ফুপি?”

তৎক্ষণাৎ কোন জবাব দিতে পারলেন না জুবাইদা। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন,

“আমার এক আত্মীয়।”

“মানে উনি গহনের কে হন?”

জুবাইদা নিরুত্তর রইলেন। নিধির এই প্রশ্নের উত্তরে কি বলবেন সত্যি বুঝতে পারলেন না। মিথ্যে বলার স্বভাব তার নেই। ভালোও লাগে না মিথ্যে বলতে। আবার এমন একটা বিষয় নিয়ে মিথ্যে বলার আরো ইচ্ছে হলো না।

জুবাইদার এসব ভাবনার মাঝেই গহনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জারা ডাকছে তোমায় নিধি। যাও।”

নিধি কোন কথা না বলে উঠে চলে গেল। জুবাইদা নিজেও যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন। তবে দেখলেন গহন ঘরের ভিতরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

কপাল কোঁচকালেন জুবাইদা। সেই সাথে একটু ভয়ও হলো এটা ভেবে যে গহন আবার কিছু ধরে ফেলল কিনা।

“কিছু বলবি গহন?”

“তুমি যোগাযোগ রেখেছো ওনার সাথে ফুপি? কবে থেকে?”

চমকে উঠলেন জুবাইদা। আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তোতলানো গলায় বললেন,

“কার কথা বলছিস?”

“তোমার ভাবির কথা বলছি। কবে থেকে যোগাযোগ আছে ওনার সাথে তোমার?”

জুবাইদা কথাটা অস্বীকার করার চেষ্টা করে বললেন,

“কি আজেবাজে কথা বলছিস? আর কোন ভাবির কথা বলছিস সেটাও তো বুঝতে পারছি না।”

গহন আলতো হেসে বলল,

“যদিও আমি জানি তোমার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। কিন্তু তবুও বলছি। আমি কষ্ট পেলাম ফুপি। যে আমাকে এতটা কষ্ট দিয়েছে তার সাথে তুমি এখনো যোগাযোগ রেখেছো। এটা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে।”

জুবাইদা বুঝলেন আর মিথ্যে বলে কোন লাভ হবে না। কেননা গহন ধরে ফেলেছে সবটা। গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর গালে হাত রেখে অপরাধী গলায় বললেন,

“আমায় ভুল বুঝিস না বাবা। তোকে আমি কষ্ট দিতে চাইনি জন্য এই কথাটা তোর থেকে লুকিয়েছি। আর তুই তো জানিস সম্পূর্ণ দোষটা ভাবির দেওয়া যায় না। ওনার জীবনেও যথেষ্ট কষ্ট ছিল। আর ভাবি যে ভুলটা করেছিলেন এখন খুব ভালোভাবে সেটা উপলব্ধি করতে পারছেন। দু-তিন মাস হলো আমি ওনার সাথে কথা বলি। অনেকদিন থেকে উনি আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, অনেক ক্ষমা চেয়েছেন, অনেক কান্নাকাটি করেছেন। সেজন্য শেষে বাধ্য হয়ে ওনার সাথে কথা বলি আমি। নিধিকে দেখতে চেয়েছিলেন। ছেলের বউকে দেখার শখ তো সব মায়েরই থাকে তাই না?”

গহন এবারও আলতো হেসে বলল,

“দেখেছে তো আমার মা তার ছেলের বউকে। আমার মা পছন্দ করেই তো আমার বিয়ে দিয়েছে।”

“এভাবে বলিস না। জন্ম দিয়েছে উনি তোকে। ভুল সবারই হয় গহন। উনিও করে ফেলেছিলেন। তুই ছেলে হয়ে ক্ষমা করবি না? একবার কথা বল তোর মায়ের সাথে। দেখবি সব রাগ ভুলে যাবি।”

গহন এবারও পূর্বের মতো আলতো হেসে বলল,

“আমার মায়ের প্রতি তো আমার কোন রাগ নেই ফুপি। আর আমার মায়ের সাথে আমি রোজ কথা বলি। আমার মা আমার বাড়িতেই আছে। সালমা। আমার মায়ের নাম সালমা। উনিই আমার মা। আমি ওনারই ছেলে।”

কথাটা বলে গহন চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে জুবাইদা বলে উঠলেন,

“নিজের মা আর সৎ মায়ের মাঝে পার্থক্য আছে গহন। তুই ধরতে না পারলেও পার্থক্য কিন্তু উনি নিজেই তৈরি করেছেন। নিজের মা নিজেরই হয় কথাটা মাথায় রাখিস। অতীতের দিনগুলো ভুলে যাস না বাবা।”

গহন ঘাড় ঘুরিয়ে জুবাইদার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি কিচ্ছু ভুলিনি ফুপি। সব মনে আমার। অতীতের কোন কথাই আমি ভুলিনি। না আমার নিজের মায়ের আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা ভুলেছি আর না আমার সৎ মায়ের আমায় আগলে নেওয়ার কথা।”

বিজ্ঞাপন

“তার অবহেলা, দূর্ব্যবহারও মনে রাখা উচিত ছিল তোর। আমি আবারও বলছি গহন সৎ মা কখনো নিজের মা হতে পারেনা।”

“উনি যেমনই হোক ফুপি, উনি আমার সৎ মাই হোক না কেন তবুও আমায় মাঝ রাস্তায় একা ফেলে রেখে চলে যায়নি। নিজের স্বার্থের জন্য কখনো আমাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যাননি। উনি যেমনই হোক না কেন তবুও আমাকে স্নেহ করেছেন, ভালোবেসেছেন, আমি অসুস্থ হলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। উনি যেমনই হোক না কেন তবুও আমি ওনাকে মা ডাকতে পেরেছি। উনি কখনো কাউকে পরিচয় দেননা যে আমি ওনার সৎ ছেলে। উনি সব সময় সবাইকে পরিচয় দেন যে আমি ওনার বড় ছেলে। এতোটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। আমার মা যে কখনো আমায় ছেড়ে যাবে না এই নিশ্চয়তটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।”

__________

সালমা বেগমের বাড়ি থেকে অনেক মানুষ এসেছে আজ। ওনার দুই বোন, তাদের ছেলেমেয়ে, তাদেরও আবার ছেলেমেয়ে, ওনার ভাইয়ের বউ, তার ছেলে মেয়ে। এত মানুষে বাড়ি ভরে গেছে। গহন কিংবা নিধি কেউই বাড়িতে নেই। তাই ওনাদের গল্প করতে খুব সুবিধা হচ্ছে। কেননা ওনাদের আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে নিধি।

সালমা বেগমের থেকে সবকিছু শোনার পর আলোচনার এক পর্যায়ে গিয়ে ওনার বড় বোন শাহানা বলেন উঠলেন,

“পুরো ব্যবসা গহন একাই দেখাশোনা করছে? সাবিত যায় না? ওর কোন অংশ নেই?”

“এই ব্যবসাটা গহনের। ও নিজে দাঁড় করিয়েছে ব্যবসাটা। এখানে সাবিতের কোন অংশ নেই।”

“তুইও যে কি করিস না সালমা। ও কি নিজের টাকা দিয়ে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিল? সাবিতের বাবার টাকাই তো। ছেলেটাকে একটু ঢুকিয়ে দিবি না ব্যবসার মাঝে। আর এতদিনেও সম্পত্তি ওই ছেলের নামে রেখেছিস কেন? শেষ বয়সে কি পথে পথে ঘোরার ইচ্ছে হয়েছে তোর? ভুলে যাস না সৎ ছেলে কখনো আপন হয় না।”

শাহনা কে আর এগোতে দিলেন না সালমা বেগম। তার আগেই ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,

“আমার ছেলে গহন। আমার বড় ছেলে। সৎ ছেলে এই শব্দটা আর উচ্চারণ করবে না আপা। আমি পছন্দ করি না।”

সালমা বেগমের কথাটা শুনে পাশ থেকে ওনার ভাবি মুখ ভেংচিয়ে বললেন,

“এত ঢং এর কথা বলো না তো সালমা। আজ নাহয় ছেলে ভালো আছে। দুদিন পর ঠিকই নিজের রং বদলাবে। এখন তো আবার বউও এসেছে। এত আদর ভালোবাসা দিয়ে সৎ ছেলে কে বড় করেছো। দেখো দুদিন পর সব ভুলে যাবে। এখনই একবার নিজের মা ডাকুক। ওমনি তোমাকে ভুলে নিজের মায়ের কাছে ছুটে যাবে।”

সালমা বেগম আত্মবিশ্বাসের সাথে জোর গলায় বললেন,

“আমার গহন এমন না। আমি জানি আমি যদি ওকে ছুঁড়েও ফেলতে চাই তারপরও ঘুরে ও আমার কাছেই আসবে। ওর মা আমি। আর ও আমার বড় ছেলে এই সম্পর্কটা চিরসত্য। হয়তো ওকে আমি পেটে ধরিনি। কিন্তু ওর সাথে আমার যে সম্পর্ক সেটা নাড়ির টানের থেকে অনেক বেশি। আমি চিনি আমার ছেলেকে। পৃথিবী উল্টে যাবে কিন্তু আমার ছেলে কখনো আমাকে ভুলে যাবে না।”

________

গহন আর নিধি আসা উপলক্ষে জুবাইদা আজ অনেক কিছু রান্না করেছেন এবং প্রত্যেকটা পদই গহনের পছন্দের। গহনের সুবিধা-অসুবিধার কথা খেয়াল রেখে তিনি সব তরকারিতেই খুব সামান্য পরিমাণে ঝাল দিয়েছেন। যেন ওনার ছেলের খেতে কোন অসুবিধা না হয়। কিন্তু এত কিছু করা সত্ত্বেও গহন খুব অল্পই খেল। ওই দু একবার কোনমতে খাবার মুখে দিল।

আসলে খাওয়ার ইচ্ছেটাই আর নেই। উঠে যাওয়ার সময় স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দুপুরে অতিরিক্ত খেয়ে নেওয়ার কারণে পেটটা এখনো ভরা আছে। সেজন্য খেতে পারলাম না বেশি। ফুপি, রান্না সুন্দর হয়েছে।”

নিধির একটু সন্দেহ হলো গহনের কথাটায়। কেননা দুপুরে দেখেছিল গহন কতটুকু খেয়েছিল। অতটুকু খাওয়াতে এখনো অব্দি পেট ভরা থাকার কথা না। কিন্তু পরমুহূর্তে আবার ভাবলো মিথ্যে বলবেই বা কেন। এই জায়গাটা তো গহনের ভীষণ প্রিয় হওয়ার কথা। গহনের ফুপির বাড়ি। এখানে তো গহনের আদর যত্নের কোন অভাব নেই। তাহলে হয়তো সত্যিই বলছে।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই দেখলো জারাও উঠে গেল নিজের চেয়ার থেকে। নিধির খাওয়ার হাতটা থেমে গেল। মনে পড়ে গেল ঋতুর বলা কথাগুলো। গহনের পিছন পিছন জারা এভাবে উঠে গেল কেন? কি কারণ হতে পারে? ওরা কি কথা বলবে এখন একা একা? এতক্ষণ তো সবার সাথে গল্প করছিল। তাহলে আবার এখন একা একা কথা বলার কি আছে?

___________

গহনদের বিশ্রাম করার জন্য জুবাইদা একটা ঘর পরিষ্কার করিয়ে দিয়েছেন সার্ভেন্টদের দিয়ে। গহন সেই ঘরেই গেল। সোজা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদিন আজ মনটা ভালোই ছিল। তবে একটু আগে হঠাৎ করে কেন যেন খারাপ হয়ে গেল। পুরোনো কিছু কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল গহনের জীবনের সেই কঠিন দিন গুলোর কথা। মনে পড়ে গেল গহনের সেই নিষ্ঠুর, ভয়াবহ শৈশবের কথা।

গহনের জীবনটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। সবার ভালোবাসায় ভরপুর থাকার কথা ছিল। কিন্তু তেমনটা হয়নি। এমনটা না যে গহন ভালোবাসা পায়নি। পেয়েছে ভালোবাসা। অনেকের ভালোবাসা পেয়েছে। কিন্তু যার ভালোবাসা পাওয়াটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার ভালোবাসাটাই গহন পায়নি।

এমন একটা মুহূর্তে এসে সেই মানুষটা গহন কে নিজের স্বার্থের জন্য একা রেখে চলে গিয়েছিল যখন গহনের তাকে সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিল।

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল জারা দাঁড়িয়ে আছে। গহন নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“এত তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ?”

“কি হয়েছে তোমার?”

গহন নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,

“কি হবে আমার? কিছুই তো হয়নি।”

“আমি তোমাকে খুব ভালো করে বুঝি গহন। তুমি কখন কি আচরণ করতে পারো, তোমার কোন আচরণের মানে কি হতে পারে সেসব আমার জানা আছে। আমার কাছে প্লিজ মিথ্যে বলার চেষ্টা করো না। কি হয়েছে আমায় বলো?”

নিজের হতাশাগুলো একান্তই ব্যক্তিগত রাখতে পছন্দ করে গহন। কারো সাথে নিজের দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নিয়ে সেই দুঃখের বোঝা কমানোর অভ্যাস গহনের নেই। সেজন্য এখনো কিছু বলতে পারলো না। বরং জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল,

“কিছু হয়নি আমার জারা। তুমি ভুল বুঝছো। আমি একদম ঠিক আছি।”

যারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো এই ছেলের মুখ দিয়ে আজও একটা কথাও বের হবে না। তাই বাধ্য হয় নিজেই আন্দাজে একটা ঢিল ছুঁড়লো।

“নিধির সাথে কোন ঝামেলা হয়েছে? তোমাদের সম্পর্ক ঠিক চলছে তো গহন?”

এবারে আর জোরপূর্বক হাসতে হলো না গহন কে। ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল

“ঝামেলা হয়নি। সম্পর্কটা খুব ভালোও চলছে না, খারাপও চলছে না। স্বাভাবিক।”

“নিধি কিন্তু খুব ভালো মেয়ে গহন। ওর মনটা ভীষণ পরিষ্কার। ওর প্রতিবাদ করার গুণটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। তোমার জীবনে নিধির মতন কাউকে কিন্তু ভীষণ দরকার ছিল। মেয়েটার সাথে যেন কখনো খারাপ ব্যবহার করো না। এমন কোন ভুল করো না যেন আবার ওকে হারিয়ে ফেলতে হয়।”

“আমি জানি নিধি খুব ভালো। শুধু একটু বেশি কথা বলে। আর ওর সব থেকে ভালো গুণ কি জানো? কদিন হলো এসে আমার খেয়াল রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমার বাড়ির পরিবেশটা ওর জন্য ঠিক না। ওকে বিয়ে করে আমি ঠিক করিনি। ও আরো ভালো কিছু ডিজার্ভ করতো, আরো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করতো। নিধি খুব ভালো। ওকে পেয়ে আমি নিজের ভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞ। ও খুবই যত্নশীল মেয়ে। সংসার করতে চায়। সবকিছুর আগে ও সব সময় সংসারকে প্রাধান্য দেয়।”

“আমিও তো যত্নশীল ছিলাম তাই না গহন? আমিও তোমার খেয়াল রাখতাম। আমি এমন মেয়ে না যে বিয়ের পরও নিজের ক্যারিয়ার, জবের জন্য সংসার কে প্রাধান্য দিতাম না৷ আমি সব ছেড়ে দিতাম গহন।”

হঠাৎ করে ঝোঁকের মাথায় কথাগুলো বলে ফেলল জারা। নয়তো নিধির সাথে নিজের তুলনা দেওয়ার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে ছিলো না মনে। গহনকে কথাগুলো বলা শেষে যখন নিজের ভুল উপলব্ধি করতে পারলো নিজেই ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে অস্বস্তি জড়ানো গলায় নিজের ভুলটা স্বীকার করে গহনকে বলল,

“আই এম রিয়েলি সরি গহন। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না। আমি আসলে এভাবে কথাগুলো বলতে চাইনি। আমি বলতেই চাইনি এই নিয়ে কোন কথা। আমার খারাপ কোন ইনটেনশন ছিল না। তুমি তো আমায় চেনো বলো?”

“রিল্যাক্স জারা। আমি কিছু মনে করিনি। কিন্তু আমি এটা ভেবে অবাক হচ্ছি তুমি এখনো সেই কথাগুলো ধরে বসে আছো। তোমার থেকে এগুলো এক্সপেক্টেড না। আমি ভেবেছিলাম তুমি জীবনে এগিয়েছো। তুমি তো জানো বলো আমার মনে এমন কোনো অনুভূতি ছিল না। প্লিজ জারা আমায় অপরাধী বানিয়ো না। আমি যথেষ্ট ডিপ্রেসড আমার জীবনে। চারিদিকের এত চাপ, একেক জনের একেক রকম কথা, হাজারো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি ক্লান্ত। অন্তত তোমার থেকে, আমার সবথেকে ভালো বন্ধুর থেকে তো আমি আশা রাখতে পারি যে সে আমার ক্লান্তিভাবটা বুঝবে।”

জারা শুধু তাকিয়ে রইল গহনের দিকে। বলতে ইচ্ছে করলো ও সামনে এগোতে চায় কিন্তু পারেনা। গহন নামক মানুষটার অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব, গম্ভীর চাহনি, শান্ত-সাবলীল কণ্ঠস্বর, দায়িত্ববোধ কোন কিছুই ভুলতে পারে না জারা। তবে সেই কথাগুলো আর গহনকে বলা হলো না। এবারে জারা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“আমি মুভ অন করেছি গহন। কোন রিলেশনশিপে জড়াইনি ঠিকই কিন্তু আমি মুভ অন করেছি। আমায় নিয়ে চিন্তা করো না। আমি ঠিক আছি। আর তোমার বন্ধু তোমায় বুঝবে গহন। প্রমিস করছি, আমার জন্য আর কখনো তোমায় অস্বস্তি তে পড়তে হবে না। এন্ড এগেইন সরি ফর মাই বিহেভিয়ার।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প