এর আগের দিন পিয়ালের বাড়ি থেকে কেউ আসেনি। তবে আজ এসেছেন তারা। ওনাদের আসা উপলক্ষে গহন আজকেও অফিস যায়নি। এসেছেন শুধু পিয়ালের বাবা আর মা। এসেই আগে ওনারা নাতি-নাতনি আর ছেলের বউয়ের খোঁজ করলেন।
পিয়াল গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে ছেলে মেয়েকে নিয়ে এলো ঠিকই তবে শম্পাকে তৎক্ষণাৎ বের হতে দেখা গেল না। প্রায় আধা ঘন্টারও বেশি সময় পর শম্পা ঘর থেকে বের হলো। তাও যখন সালমা বেগম গিয়ে ডাকলো তখন বের হলো। বসার ঘরে তখন পিয়ালের বাবা মা বসে আছেন। নিজের শ্বশুর-শাশুড়িকে সালাম অব্দি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না শম্পা ।
পিয়ালের মা রোকেয়া নিজেই ছেলের বউকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ভালো আছো মা?”
কন্ঠে একরাশ অনিহা সমেত শম্পা জবাব দিল যে ভালো আছে। পাল্টা শাশুড়িকে জিজ্ঞেসও করলো না যে তিনি কেমন আছেন।
নিধিও তখন বসার ঘরে উপস্থিত ছিল। শুধু দেখে গেল শম্পার আচরণ। সেই সাথে নিজের শাশুড়ির প্রশ্রয় দেওয়াও দেখে গেল। এখনই যদি এই আচরণটা নিধি করতো তাহলে একেবারে ঝড় উঠে যেত। অথচ নিজের মেয়ের বেলায় চুপচাপ মুখ বন্ধ বসে আছেন। যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। সত্যি কথা বলতে নিধি এই মানুষটাকে একেবারে ভুল জেনেছিল। একেবারে একটা বজ্জাত বুড়ি।
নিধি আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করলো। পিয়ালের বাবা মাকে কেউ যেন গুরুত্বই দিচ্ছে না। শম্পার খালা মামিরা তো একবার ঘর থেকে বেরিয়ে দেখা অব্দি করলো না ওনাদের সাথে। আর শম্পার কথা নাহয় বাদই দেওয়া যাক। অন্যান্য দিন তো ওকে বিছানা থেকেই তোলা যায় না। অথচ আজকে এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন কাজ করে উল্টে ফেলছে। তিনি খুব ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের কাজে। এতটাই ব্যস্ত যে শ্বশুর শাশুড়িকে সময় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
বাকি রইল সালমা বেগম। এই মহিলার আসলে সমস্যা কি সেটাই নিধি ধরতে পারছে না। মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজন বলে কথা। অন্তত মেয়ের ভালো থাকার জন্য, মেয়ের সম্মান বাড়ানোর জন্য হলেও তো তাদের একটু খাতির যত্ন করতে হয়। কিন্তু এই মহিলা তো আজও নিজের বোন ভাবিদের যত্ন করতেই ব্যস্ত।
অবশ্য মেয়ে তো ওনার সারা বছর এখানেই থাকে। মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে আর কেনইবা, কি ভয়েই বা খাতির যত্ন করবেন।
তবে গহন খুব খাতির যত্ন করলেন ওনাদের। যতটা সময় ওনারা থাকলেন গহন নিজেই ওনাদের সাথে গল্প করলো। ওনাদের আপ্যায়নের দিকটা যেন নিধি দেখে সে কথাও নিধি কে বলেছে। নিধি মেনেছে গহনের কথা। যতটা সম্ভব ওর দ্বারা ততটাই ভালো ব্যবহার করেছে ওনাদের সাথে। ওনারা দুজন খুব খুশিও হয়েছেন নিধির প্রতি। আদরও করেছেন। সেই সাথে সংসারের জন্য দোয়াও দিয়েছেন।
সময় হলো এবার ওনাদের চলে যাওয়ার। শুরুতে যেমন একবার শম্পার দেখা পাওয়া গিয়েছিল এখন দ্বিতীয় বারের মতন ওর দেখা পাওয়া গেল। এক কোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। রোকেয়া নিজে উঠে গিয়ে শম্পার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“মা, ওটা তো তোমার বাড়ি, তোমার সংসার। আমি আর কদিন থাকবো বলো। যেতে হবে তোমায়। তোমার সংসার বুঝে নিতে হবে তো।”
শম্পা তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“যে সংসারে দুদিন পরপর আপনার মেয়ে মাতব্বরি করতে চলে আসে সেই সংসার আমার সংসার? আপনার আর আপনার মেয়ের মাতব্বরই তো শেষ হয় না। আপনার এত বয়স হয়ে গিয়েছে তাও এখনো আপনার নিজের সংসার করার শখ শেষ হয়নি। আমি আমার সংসার পাবো কোত্থেকে?”
এত মানুষের সামনে ভদ্রমহিলা ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন ছেলের বউয়ের এমন ব্যবহারে। গহন তখন সেখানে উপস্থিত নেই। তবে নিধি খেয়াল করল ব্যাপারগুলো। এবং সব টুকে টুকে রাখল যে প্রত্যেকটা কথা পরে গহন কে জানাবে যে ওর বোন ঠিক কতটা বেয়াদব।
সালমা বেগমও চুপচাপ বসে আছেন। কিচ্ছু বললেন না মেয়েকে। তবে নিজের মায়ের এমন অসম্মান পিয়াল সহ্য করতে পারল না। রাগান্বিত গলায় বউকে দু-এক কথা শোনাতে না শোনাতেই রোকেয়া ছেলেকে থামিয়ে দিলেন। তিনি ছেলেকেই শাসন করলেন। তারপরে আবারো ছেলের বউকে উদ্দেশ্য করে আদুরে গলায় বললেন,
“আমার মেয়ে আর আসবে না। তুমি চিন্তা করো না। আর আমার শরীরের যা অবস্থা আমি আর সংসার করার শক্তি পাই না মা। তুমি আজই আমাদের সঙ্গে চলো। এই বয়সে এসে নাতি নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছে তো সবারই থাকে। আর আমরা ওদের মুখটাও দেখতে পাই না। তোমার শ্বশুর অসুস্থ, আমি অসুস্থ। সংসার ঠিকভাবে চলে না মা। তুমি চলো আমাদের সঙ্গে আজ।”
“ওও এবার বুঝতে পেরেছি কেন আজ আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এত তাড়া দিচ্ছেন। আপনারা দুজনেই অসুস্থ। এখন আমায় গিয়ে আপনাদের সেবা যত্ন করতে হবে, তিনবেলা আপনাদেরকে রেঁধে খাওয়াতে হবে তাই তো? শুনুন, আমি কাজের লোক হয়ে ওই বাড়িতে যেতে পারবো না। আমি এই বাড়িতে যথেষ্ট ভালো আছি। আসতে পারেন এখন আপনারা।”
পিয়ালের মনে হলো যথেষ্ট অপমানিত হয়ে গেছে। আর সহ্য করা সম্ভব না। শম্পাকে কোন কিছু বলেও যে লাভ হবে না সেই ব্যাপারে পিয়াল নিশ্চিত। সেজন্য ভাবলো এবার ওকে একটু কঠিন সিদ্ধান্তই নিতে হবে। উঠে গিয়ে নিজের মা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা চলো। এখানে আর থাকতে হবে না। আর না ওকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।”
পিয়ালরা চলে যেতে ধরলে তখনই গহন এলো। ফোনে কারো সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আলোচনা করছিলো। ওনাদের এত তাড়াতাড়ি যেতে দেখে পিয়াল কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“পিয়াল এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছো কেন? ওনারা আজ থাকুক এখানে।”
“না গহন। এখানে আর থাকা সম্ভব না। তোমার বোনের সাথে এক ছাদের নিচে বাস করাই অসম্ভব। ও এতটা বিষাক্ত। শুধুমাত্র তোমার কথায় আমার মা বাবাকে এখানে এনেছিলাম। কিন্তু ওনারা যতটা অপমানিত হলেন তোমার বোনের দ্বারা। এখন ওনাদেরকে এখানে আনার জন্য নিজেকে গালাগাল করতে ইচ্ছে করছে।”
গহন ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কেন কি হয়েছে? শম্পা কি করেছো তুমি?”
শম্পা কোন উত্তর দেওয়ার আগেই পিয়াল বলল,
“কি করার বাকি রেখেছে সেটা বলো। যা নয় তাই বলে আমার মা-বাবাকে অপমান করছে। আমার মা-বাবা ওকে নিজেদের সাথে নিয়ে যেতে চেয়ে কি ভুল করেছে? ওর যদি শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে নাই থেকে থাকে তাহলে বিয়ে করেছিল কেন? তুমি আজ আমায় একটা কথা পরিষ্কার করে বলে দাও ও কি আমার সাথে সংসার করবে নাকি করবে না। যদি করতে না চায় সেই ব্যবস্থা আমি করব। ওর ভালোবাসায় এখনো এতটা অন্ধ হয়ে যাইনি যে ওর পা ধোঁয়া জল খাব বসে বসে। আটকে আছি শুধুমাত্র ছেলেমেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে। নয়তো সারাজীবনের জন্য ওকে এই বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা আমি করে দিতাম।”
শম্পা খেঁকিয়ে উঠে পিয়ালের দিকে তেড়ে এসে যেই না কিছু বলতে চাইলো অমনি গহন বেশ কড়া গলায় একটা ধমক দিল ওকে। কেঁপে উঠলো শম্পা। এর আগে এত জোরে গহন কখনো ওকে ধমক দেয়নি। গহন শম্পাকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,
“বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে শম্পা। তোমাকে কি আমরা এই শিক্ষা দিয়েছি? আমি শুরু থেকে খেয়াল করেছি ওনারা এসেছেন অথচ তুমি ওনাদের সাথে ভালোভাবে কথা অব্দি বলছো না। কিসের এত ঘৃণা তোমার ওনাদের প্রতি? কি করেছেন ওনারা? বেয়াদবির একটা সীমা থাকে। তুমি সব সময় নিজের সীমা অতিক্রম করে যাও। প্রতিটা বিষয় নিজের জেদ খাটাতে চাও। সমস্যা কি তোমার?
শম্পার মেজাজ তুমুল গরম হয়েছিল আজ। এর মাঝে গহনের এই খারাপ ব্যবহারটা মোটেই সহ্য হলো না। ও কেন গহনের গরম সহ্য করতে যাবে। গহন কে ওর জীবনে নাক গলানোর। ওকে শাসন করার অধিকারই বা গহনকে কে দিয়েছে। এবারে শম্পার পিয়ালের ওপর জমা সম্পূর্ণ রাগটা গিয়ে পড়লো গহনের উপরে। অগ্নিদৃষ্টিতে শম্পা গহনের দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
“তুমি কে আমাকে শাসন করার? কে অধিকার দিয়েছে তোমায় আমার জীবনে নাক গলানোর? তোমার সাহস হয় কি করে আমার সাথে এভাবে কথা বলার? কিসের এত গরম দেখাও আমায়? আমি তোমার টাকায় খাই নাকি তোমার বাড়িতে থাকি? ভুলে যেওনা এই বাড়িতে আমারও অংশ আছে। শুধু বাবাকে ভুলভাল বুঝিয়ে নিজের নামে সবটা করে নিয়েছিলে জন্য এখন এই গরমটা দেখাতে পারো। নয়তো যে টাকার তুমি এত গরম দেখাও সেই টাকায় আমারও অংশ আছে। এসেছে আবার আমায় সভ্যতা শেখাতে।”
শম্পা কথাটা বলতেই ওর গালে ঠাস করে একটা চড় পড়ল। উপস্থিত প্রত্যেকে চমকে উঠলো। থমথমে হয়ে গেল হঠাৎ করে পরিবেশটা। কে শম্পাকে চড়টা মা'রলো সেটা দেখার জন্য সবাই পাশে তাকাতেই দেখল সালমা বেগম দাঁড়িয়ে আছে। সালমা বেগমই শম্পা কে মে'রে'ছে। ভীষণ জোরেই মে'রে'ছে। শম্পা গালে হাত দিয়ে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমায় মা'র'লে মা!”
সালমা বেগম রাগে কাঁপছেন। প্রচন্ড রেগে গেছেন তিনি। মেয়ের দিকে আঙ্গুল তাক করে মেয়েকে শাসিয়ে বললেন,
“আর একটা শব্দ যদি তোমার মুখ থেকে বেরিয়েছে তাহলে আমি নিজে তোমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেব। গহন তোমার বড় ভাই, এই বাড়ির বড় ছেলে, ও আমার বড় ছেলে। তোমার সাহস হলো কিভাবে ওর সাথে এভাবে কথা বলার? কিসের অংশের কথা বলছো তুমি? তোমাদের বাবা কত টাকা রেখে গেছে তোমাদের জন্য? কটা সম্পত্তি রেখে গেছে তোমাদের জন্য? গহনের টাকায় বিলাসিতা করো তোমরা। গহন চালায় সংসার। ওর মুখে মুখে এভাবে তর্ক করা আর ওকে এভাবে খারাপ খারাপ কথা বলার সাহস তোমায় কে দিল?”
উপস্থিত প্রত্যেকে বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো সালমা বেগমের দিকে। বিশেষ করে নিধি। নিধি এখন সত্যি দ্বিধাদ্বন্দের মাঝে আছে। সালমা বেগম এই কথাগুলো মন থেকে বললেন নাকি আবার গহনের কাছে ভালো সাজার জন্য বললেন? কিন্তু ওনার অভিব্যক্তি দেখে তো মনে হচ্ছে না যে নাটক করছেন। কিন্তু কথা হলো শম্পার এত কিসের ঘৃণা আর রাগ গহনের প্রতি যে গহনের কথা সহ্যই করতে পারে না? ওরই তো ভাই। সাবিতকে যেখানে এত ভালোবাসে তাহলে গহন কে কেন ভালোবাসতে পারে না? অদ্ভুত মেয়ে!
শম্পা মায়ের মুখের উপর আর কিছু বলতে পারলেন না। সালমা বেগম এবারে গহনের দিকে এগিয়ে এলেন। ছেলের মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন যে গহনের এখন ঠিক কতটা অস্বস্তি হচ্ছে এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকতে। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
“তোমার অধিকার আছে বাবা নিজের বোনের বিষয়ে নাক গলানোর। তুমি বলো শম্পাকে কি পাঠিয়ে দেবো ওনাদের সাথে? তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে আমি সেটাই করব।”
গহন নিজের মায়ের হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো হেসে বলল,
“আমি আর এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না মা। আমার অস্বস্তি হবে। শম্পার ব্যাপারে আর কথা বলতে আমি আগ্রহী নই। তুমি যা ভালো মনে করো সেই সিদ্ধান্তই নাও।”
কথাটা বলে গহন চলে গেল সেখান থেকে। সালমা বেগম কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে নিজের বেয়াই বেয়াইন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আপনার আজ মেয়েকে ছাড়াই যান। আমি ওকে কাল সকালে জামাই এর সাথে পাঠিয়ে দেব।”
রোকেয়া এতে ভীষণ খুশি হলেন। এদিকে সালমা বেগমের সিদ্ধান্ত একটুও পছন্দ হলো না শম্পার। কিছু আর বলতেও পারলো না সাহস করে। তিরিং বিরিং করতে করতে ঘরে চলে গিয়ে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
__________
“তুই ওই ছেলের সামনে শম্পার সাথে এই ব্যবহার করলি কেন? ভুলে গেছিস কে তোর আপন? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর?”
কথাগুলো শাহানা সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল। শম্পা তখন খালার পাশে বসে কাঁদছে। সালমা বেগম একবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিজের বোনের উপর রেখে গম্ভীর গলায় বললেন,
“ও শ্বশুর বাড়িতে যাবে নাকি এখানে থাকবে সেই নিয়ে তো আমি কোন কথা বলিনি। এই নিয়ে গহন কথা তুললে আমি গহন কে কখনোই সমর্থন করতাম না। কিন্তু ও গহনের সাথে বাজে ব্যবহার করে নিজের সীমা ছাড়িয়েছে। ওর এতটা সাহস হওয়া উচিত হয়নি যে ইঙ্গিতে গহন কে পর বানিয়ে দেয়।”
“ভুল তো কিছু বলেনি। সতীনের ছেলে কখনো আপন হয় না এই কথাটা তুই কবে বুঝবি। দুদিন পর যখন লাথি দেবে তখন ঠিকই বুঝবি।”
সালমা বেগম তুমুল আত্মত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন,
“লাথি দিলে আমার নিজের ছেলে মেয়েরাই দেবে। সতীনের ছেলে দেবে না। গহন কে এমন ভাবে মানুষই করিনি আমি।”
সালমা বেগমের কথা শুনে শম্পা ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“দেখেছো খালা দেখেছো কিভাবে সৎ ছেলের জন্য নিজের ছেলেমেয়েদেরকে অপমান করে। মা বদলে গেছে খালা। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে পিয়ালকে বলে দিল যে কাল সকালে নাকি আমি যাব। তুমি বলোতো খালা আমি কি কাজের লোক? আমার বাবার কি কম সম্পত্তি আছে যে আমি গিয়ে অন্যের ফাইফরমাশ খাটবো? আমি কেন ওদেরকে রান্না করে খাওয়াতে যাব? আমি কেন ওদের সেবা যত্ন করতে যাব? আমার কি খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই।”
শম্পার কথায় তাল মিলির শাহানাও সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ঠিকই তো বলেছে শম্পা। আর তুই মেয়ের ইচ্ছের দাম না দিয়ে আগেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলি কেন? গহনেরই এত সাহস হয় কি করে যে তোর মেয়েকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে?”
“বেরিয়ে যেতে বলেনি গহন। শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেছে ওকে।”
“দুটোর মানে একই হলো। আজ তোর মেয়েকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলছে। দুদিন পর উঠে পড়ে লাগবে সিনথিয়ার বিয়ে দিয়ে ওকে দূর করার জন্য। তারপরে ধীরে ধীরে দেখবি সাবিতকেও আলাদা করে দিয়ে তোকে সাবিতের ভাগে ফেলবে। আর নিজে বউ নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করবে। তোর বুদ্ধি আর কবে হবে বলতো? তুই বলনা এর আগে কখনো গহন শম্পাকে ওর শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছে?”
সালমা বেগম একটু মনে করার চেষ্টা করে বললেন,
“না।”
“যেই না বউ এসেছে ওমনি আর বোনকে পছন্দ হচ্ছে না। শোন সালমা, আমি তোর বোন, তোর ভালোর জন্য বলছি। বোঝার চেষ্টা কর তোর ছেলে পর হয়ে যাচ্ছে। এটাই নিয়ম। বিয়ের পর ছেলেরা পর হয়েই যায়। আর তোর ছেলের বউকে তো দেখলাম। একেবারে মাথা ভরতি কুবুদ্ধি। দুদিনেই তোর ছেলের মাথা খেয়ে নিয়েছে। এখনো সময় থাকতে ছেলেকে টাইট দে। আর তুই না পারলে দাঁড়া আমি দেখছি।”
কথাটা বলে শাহানা উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সালমা বেগম ডাকলেন ওনাকে পেছন থেকে। আটকানোরও চেষ্টা করলেন। তবে উনি থামলেন না। উঠে যেতে ধরলে ওনার ভাবি ওনাকে আটকিয়ে রাখলেন। খালার পেছন পেছন শম্পাও উঠে গেলো দেখার জন্য যে ওর খালা কি তান্ডব চালায়।
বসার ঘরে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে শাহানা গহনের নাম ধরে চেঁচালেন। গহন তখন সবে মাত্র একটু নিধির সাথে গল্প করা শুরু করেছে। কত কষ্টে একটু কথা উঠেছিল দুজনের মাঝে। এর মাঝে এত চেঁচামেচি গহনের একদম পছন্দ হলো না। কে জানে আবার ফিরে এলে নিধি গল্প শুরু করবে কিনা।
গহনের পিছন পিছন নিধিও এলো। কেননা ডাকের ভঙ্গি দেখেই নিধির মনে হলো কোন একটা ঘটনা এরা ঘটিয়েই ছাড়বে।
গহন বসার ঘরে গিয়ে দেখলো সালমা বেগমের দুই বোন বসে আছেন। আর একপাশে শম্পা বসে আছে। ব্যাপারটা আরো বেশি গোলমেলে লাগল নিধির কাছে। এবারে তো নিশ্চিত হয়ে গেল যে গহন কে কথা শোনানোর জন্যই ওরা ডেকেছে। তবে গহন এত কিছু ভাবলো না। ডাকার কারণটা আন্দাজ করতে পারলেও কিছু বুঝতে দিলো না।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শাহানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ডাকছিলেন খালা?”
শাহানা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
“শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সামনে শম্পাকে এভাবে অপমান করার কি খুব বেশি দরকার ছিল? শম্পার স্বামী ওকে কত বড় হুমকি দিল আর তুই ভাই হয়ে কিচ্ছু বললি না কেন?”
“এই নিয়ে আলোচনা তো শেষ হয়ে গেছে খালা। শম্পা আমাকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে যেন আমি ওর ব্যাপারে কথা না বলি। ব্যাস শেষ। আমি কথা বলবো না।”
“ঝামেলাতো তুই বাঁধালি। এখন কথা বলবি না বললে তো হবে না। তোর আস্কারাতেই তো পিয়াল এতগুলো কথা শোনাতে পারলো শম্পাকে। তুই শম্পাকে তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস কেন? তোর বউয়ের কি বাড়িতে জায়গা কম হচ্ছে, না খাবার কম হচ্ছে শম্পার জন্য?”
নিধি কিছু বলে উঠতে ধরেও থেমে গেল। কেননা নিধি ঠিক করেছে এদের সাথে যাই করার হোক না কেন গহনের সামনে কিছু করবে না। কেননা নিধি জানে ও কিছু বলা শুরু করলেই গহন থামিয়ে দেবে। ঘরে ওকে নিয়ে গিয়ে বলবে যেন এভাবে কথা না বলে। তার থেকে বরং গহনের সামনে কিছু বলবে না। ভালো সেজে থাকবে।
নিধিকে কিছু বলতেও হলো না। গহন নিজেই বলে উঠলো,
“এর মাঝে নিধি কে কেন টানছেন? ও তো কিছু বলেনি। যা বলার আমি বলেছি। আমার সাথে কথা বলুন। আর তাছাড়া বিয়ে যখন হয়েছে শম্পাকে তো নিজের সংসারে যেতেই হবে। এই কথাটা কি আমি খুব বেশি অন্যায় বলে ফেলেছি খালা?”
শাহানা ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
“সে ওর যখন ইচ্ছে হবে তখন ও সংসারে যাবে। তুই ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কে? বাড়ির মুরব্বি সেজেছিস? ঘরবাড়ি সম্পত্তি সব তোর নামে আছে জন্য যা ইচ্ছে তাই করবি। আগে তো তুই এমন ছিলিস না। বউয়ের কথায় চলছিস আজকাল। অবশ্য তোর বউকে প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম এই মেয়ে সুবিধার হবে না। শাশুড়ি, ননদ, দেবর কে নিয়ে সংসার এ করবেনা সেসব আমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম।”
“খালা নিধি কে টানার প্রয়োজন নেই এসবে। ওকে নিয়ে আজেবাজে কথা বন্ধ করুন।”
“কেন রে? বউকে নিয়ে কথা বললে ছ্যাঁকা লাগে? আর বোন কে বললে কিছু হয় না?”
গহন আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলো তবে শাহানা ফের খেঁকিয়ে উঠলেন। এসব ব্যবহারে অভ্যস্ত না গহন। বড়দের মুখে মুখে তর্ক করতেও অভ্যস্ত না। কখনো যেন কারো সাথে দুটো কথা না হয়, তর্ক করতে না হয় সে জন্য গহন সব সময় বুঝে শুনে কথা বলে। এই যেমন ওকে সামনে দাঁড় করিয়ে ওর দুই খালা আচ্ছা মত কথা শোনাচ্ছে। গহন যে কিছু বলবে সেই সুযোগটা পর্যন্ত ওনারা দিচ্ছেন না। কথা কেড়ে নিচ্ছে গহনের মুখ থেকে।
গহনের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিধি বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে সালমা বেগমের দুই বোনকে। এরা কি আদৌ মানুষ না মেশিন। থামাথামির কোন প্রয়োজন হয় না? দম নেওয়ারও কোন প্রয়োজন হয় না? কথা শুনিয়েই যাচ্ছে তো শুনিয়েই যাচ্ছে। তার থেকেও বড় কথা গহনের সমস্যা কি? এভাবে কথা শুনে যাচ্ছে কেন? ওরা তো অযথা কথা শোনাচ্ছে।
নিজের এসব ভাবনার মাঝে ওর কানে শাহানার বলে একটা বাক্য এলো,
“শোন গহন, বেশি ওড়ার চেষ্টা করিস না। অকৃতজ্ঞ হোস না। আমার বোন না থাকলে তোর কি অবস্থা হতো সেটা জানিস তো? তোর লজ্জা হওয়া উচিত ছিল এত কিছু জানার পরেও তারই মেয়ের সাথে এই ব্যবহারটা করার আগে। লজ্জা শরমের তো মাথা খেয়েছিস।”
অনেক সহ্য করেছে নিধি। আর সহ্য করা গেল না। যথেষ্ট কথা শুনিয়েছে এই ছেলেটাকে। ছেলেটাও গাধার মতন ওদের কথা শুনেই যাচ্ছে। তবে নিধি নিজেকে কোনমতেই চুপ রাখতে পারলো না। রাগে মনে হচ্ছে মাথায় আগুন ধরে গেছে। চিৎকার করে উঠে বলল,
“থামবেন আপনারা। কি শুরু করেছেন তখন থেকে এই মানুষটার সাথে। আরে উনিও একটা মানুষ ভুলে গেছেন কি? বিবেক বোধ আছে নাকি সেটা গিলে খেয়েছেন? লজ্জা শরমের মাথা উনি খেয়েছেন না আপনারা খেয়েছেন যে অন্যের সংসারের নাক গলাচ্ছেন? দুদিনের জন্য ঘুরতে এসেছেন, অতিথির মতন থাকুন। এত কিসের গলাবাজি করছেন? কিসের অধিকারে ওনাকে এত কথা শোনাচ্ছেন? পাগল নাকি আপনারা? মাথার সমস্যা আছে সবকটার?”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো নিধি। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। তুমুল রাগ উঠে গেছে। নিধির চেঁচানোতে পরিবেশটা হঠাৎ করে কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। প্রত্যেকে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গহন চমকে উঠে নিধির দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“চুপ করো নিধি। আমি কথা বলছি তো।”
“আপনি একদম চুপ করুন। আপনি কথা বলছেন না, আপনি কথা হজম করছেন। আসলে সমস্যাটা আপনার। ওনারা কে যে এত কথা শুনতে হবে? আরে খালার গুষ্টি কিলাই। খালা জন্য যা ইচ্ছে তাই বলবে নাকি? আপনাদেরকেও বলছি, আমি যদি আপনার বোনের সাথে খারাপ ব্যবহার করি তাহলে তো মেনে নিতে পারবেন না। তাহলে আপনাদের আদরের মেয়ে যখন তার শাশুড়ির সাথে বাজে ব্যবহার করলো তাকে শাসন কেন করলেন না? তখন আপনাদের এত জ্ঞানের কথা কোথায় ছিল? পেয়েছেন একটা রোবট, কথা শুনিয়েই যাচ্ছেন তো শুনিয়েই যাচ্ছেন।”
নিধি কথাগুলো বলে থামতে গহন ওর হাত টেনে ধরে বলল,
“নিধি আমি থামতে বলেছি। ঘরে চলো।”
নিধি এক ঝটকায় গহনের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আমি যাব না ঘরে। আপনি না হয় আমার হয়ে কথা নাই বলতে পারলেন আমাকে অন্তত বলতে দিন। পারলে শিখুন আমার থেকে কি করে জীবন সঙ্গীর পাশে দাঁড়াতে হয়। আরে যা নয় তাই বলে যাচ্ছে আপনাকে। কি অপরাধ করেছেন আপনি? ওনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি এই বাড়িতে আশ্রিতা। সালমা আপনার মায়ের নাম না? শম্পা আপনার নিজের বোন না? তাহলে ওদের ব্যাপারে কথা বলার অধিকার রাখবেনিই না কেন আপনি? আপনি একজন মানুষ গহন। আত্মসম্মানবোধ আছে আপনার। মান সম্মান আপনারও হারায়। পাগলের মতন কেন এদেরকে অপমান করার সুযোগ দিচ্ছেন। দুপুর থেকে আপনার বোন আচ্ছা মত কথা শোনালো। এখন আবার এনারা এসে দরবার বসিয়েছে। মজা হচ্ছে এখানে? নাটক হচ্ছে? সারাদিন রাত খাটাখাটনি করে সংসার চালাবেন, সবার ইচ্ছে পূরণ করবেন। আর দিন শেষে আপনাকেই কথা শোনাবে? কারোর তো কৃতজ্ঞতাবোধ বলতে কিচ্ছু নেই। বেইমানে ভরে গেছে পৃথিবীটা।”
শম্পা আর শম্পার দুই খালা কারো মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিধির দিকে। গহন নিজেও থমকে গেছে। এদিকে অনেকগুলো কথা বলা শেষে নিধির রাগটা যেন একটু ঠান্ডা হলো। যখন দেখলো কেউ আর কোন কথা বলছে না তখন নিজেই গহনের হাত ধরে বলল,
“চলুন তো এখান থেকে। আর কথা শুনতে হবে না। পেট ভরে গেছে। নিজেরা লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এসেছে অন্যের সংসারে নাক গলাতে। আবার কথা শোনায় ওনাকে। মগের মুল্লুক পেয়েছে যেন।”