ঘরে এসে গহন নিধি কে কোথাও দেখতে পেল না। কোথায় গেল মেয়েটা আবার! একবার বারান্দায় গিয়ে দেখলো। সেখানেও পেল না নিধি কে। বাথরুমেও নেই। গেল কোথায় মেয়েটা! নিধির নাম ধরে কয়েকবার চেঁচিয়ে ডাকলো গহন। সঙ্গে সঙ্গে নিধি বাইরে থেকে দৌড়ে ঘরে এলো। হাঁপানো গলায় বলল,
“ম'রি'নি তো আমি। বেঁচে আছি এখনো। কি হয়েছে?"
“ব্যাগ পত্র গোছাতে বলেছিলাম। গুছিয়েছো?”
নিধি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানাতেই গহনে রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“একটা কথা বললে কানে যায় না? নাকি বুঝতে পারো না? বাংলা ভাষাতেই তো বলেছিলাম। উর্দু কিংবা ফারসি ভাষায় তো বলিনি যে বুঝতে পারবেনা। তোমার কাছেও কি আমার কথার কোন মূল্য নেই? না থাকলে প্লিজ বলে দাও। আমি আশা রাখবো না তোমার থেকেও।”
নিধি তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আরে না না। আপনি ভুল বুঝছেন। আমি আসলে একটু দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে ছিলাম যে কি করব। আপনি কার ওপর রেগে ছিলেন সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। আর এতো রেগে যাচ্ছেন কেন? ঠান্ডা হন।”
“তোমায় যেটা করতে বলেছি সেটা করো। আর দেড় ঘন্টা সময় আছে। এক মিনিটও যেন দেরি না হয়।”
নিধি ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আপনি আগে শান্ত হন। এখন রেগে আছেন। তাড়াহুড়ো করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের ওপর জোর চালিয়েও কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি আপনি কষ্ট পাচ্ছেন, খারাপ লাগছে আপনার।”
“কোন প্রয়োজন নেই আমাকে বোঝার। আসলে তোমারও আমার কথা শোনার কোন ইচ্ছে নেই। ঠিক আছে শুনতেও হবে না।”
কথাটা বলে গহন আলমারির উপর থেকে স্যুটকেসটা নামিয়ে আলমারি খুলে নিজেই কাপড়চোপড় ব্যাগে তুলতে লাগলো। সামনে যেটা পেল সেটাই তুললো। গুছিয়েও তুলছে না। শুধু ব্যাগের ভেতরে ছুঁড়ে মা'র'ছে।
নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গহনের দিকে এগিয়ে এসে পিছন থেকে ওর কাঁধে হাত রাখলো। গহন মৃদু রাগী গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
“আমি কষ্ট পাইনি। আমার খারাপও লাগেনি। আমি ওদের থেকে ভালো কিছু আশা করিই না। সেজন্য খারাপ কম লেগেছে। তবে খারাপ লাগছে আপনার জন্য। আমি জানি আপনি আপনার পরিবারকে কতটা ভালোবাসেন। বিশেষ করে আপনার মা কে। আপনি খুব বেশি কষ্ট পেয়েছেন, তাই না?”
হঠাৎ করে গহনের রাগটা কেমন যেন কমে গেল। শান্ত হয়ে গেল গহন। থমথমে মুখটায় এক অদ্ভুত ক্লান্তি ভাব ফুটে উঠলো। ধপ করে বসে পড়লো বিছানার উপরে। দুহাতে নিজেই নিজের মাথার চুল খামচে ধরে বলল,
“আমি ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত। সবার এত অবহেলায় আমি ক্লান্ত। আর পারিনা নিধি। নিজেকে আর সামলানো যায় না। নিজেকে আর বোঝানো যায় না।”
নিধির খুব খারাপ লাগলো গহনের কথাগুলো শুনে। মানুষটার মুখ দেখেই মায়া লাগছে। সারাদিন মানুষটা শুধু খাটাখাটনিই করে যায়। একটুও শান্তি পায় না। অফিস থেকে বাড়ি ফিরেও সেই খাটাখাটনিই করে। তার ওপর আবার এই বাড়ির জীবজন্তু গুলোর অশান্তি। একটা মানুষের মনে মায়া দয়া নেই। কারো মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ নেই।
নিধি এগিয়ে গিয়ে গহনের পাশে বসে গহনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“যা হয়েছে ভুলে যান। আমি জানি আপনার মায়ের ব্যবহারে আপনি কষ্ট পেয়েছেন।”
“মায়ের থেকে এই ব্যবহারটা আমি আশা করিনি। যাইহোক, তুমি তৈরি হয়ে নাও।”
“প্রয়োজন নেই। কোথাও যাচ্ছি না আমরা।”
গহন ঘাড় কাত করে নিধির দিকে তাকিয়ে কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বলল,
“যাচ্ছি আমরা।”
“বললাম তো যাব না।”
“আমিও তো বললাম যাব।”
নিধি তেজ দেখালো না। বরং শান্ত গলায় গহনকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“আপনি যে আমার হয়ে আপনার মাকে এতগুলো কথা বলেছেন এটাই আমার কাছে যথেষ্ট গহন। ঘুরতে যাওয়ার মাঝে কি আছে। যখন চাইবো তখনই যাওয়া যাবে। এমনটাও না যে শহরের বাইরেই কোথাও যেতে হবে। মানুষটা গুরুত্বপূর্ণ গহন। আপনার সাথে তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু কাপ কফি খেতে খেতে গল্প করলেও সেই সময়টা আমার ভালো কাটবে। আলাদা করে যে বাইরেই কোথাও ঘুরতে যেতে হবে তার কোন মানে নেই।”
“তোমায় যে কথাগুলো বলেছে আমি ভুলতে পারছি না ওগুলো।”
“আমি তো আপনাকে ভুলতে বলছি না। মনে রাখুন। আর আজ আপনি ওদের নিজের যে রূপটা দেখিয়েছেন আগামী দশ বছরেও ওদের আর কিছু বলার সাহস হবে না। আর আমাকে তো চেনেনই। কিছু বললে ছেড়ে দেবো নাকি? তবে গহন এবারে আমরা না যাই। আপনিইতো বলেছিলেন সংসারের প্যাঁচ বুঝতে। এখন এই অবস্থায় যদি আমরা চলে যাই হয়তো কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু সবার মনে আমার প্রতি একটা চাপা ক্ষোভ ঠিকই থাকবে। ঘুরেফিরে তো আবার এই বাড়িতেই আসতে হবে তাই না? এই মানুষগুলোর সাথেই থাকতে হবে। আজ না হয় আমরা তাদের কথা মেনে নিয়ে কাল তাদের আমাদের কথা মানতে বাধ্য করি। আপনিই তো আমায় এই নিয়ম শিখিয়েছিলেন।”
গহন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল নিধির দিকে। তারপরে হঠাৎ করে বিছানার ওপরে এক পা তুলে নিধির দিকে ঘুরে বসে নিধির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,
“আমায় ভুল বুঝোনা নিধি। এসব ঝগড়া ঝামেলা অশান্তি দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। ছোটবেলা থেকে প্রতিটা দিন এসবের মাঝে আমার কেটেছে। আমার আর এখন এসব ভালো লাগে না। সব সময় ঝগড়া এড়িয়ে যেতে চাই আমি। সেজন্য যেমন আমি নিজেও মানিয়ে নিই তোমাকেও মানিয়ে নিতে বলি। কিন্তু তার মানে এই না যে সব সময় মানিয়ে নেওয়াটা আমাদের পক্ষ থেকেই হবে। তুমি ভেবোনা তোমায় সাথে কেউ অন্যায় করলে আমি চুপ থাকবো। সবচেয়ে বড় কথা আমার পরিবারের আজকের ব্যবহারের জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার মুখও আমার নেই।”
নিধি আলতো হেসে বলল,
“চাইতে হবে না। ভুল তো আপনি করেননি। বরং আপনি আজ যা করেছেন সেগুলো ভেবে তো আমার সারারাত ঘুমই হবে না। আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে?”
গহন প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি?”
নিধি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“বলেছিলাম না যে আমার স্বামী মনে হয় ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যাচ্ছে। আজ সত্যিই তার প্রমাণ পেলাম। আপনি অনেক ভালো গহন।যদিও শুরুতে এতটা ভালো ছিলেন না। তবে ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যাচ্ছেন। আসলে আমার সহচর্যে আছেন তো। ভালো যে হবেন এটাই তো স্বাভাবিক। এতদিন ছিলেন জীবজন্তুর মাঝে। ভালো হবেনই বা কি করে! এমনটা আশাও রাখা যায় না।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিধির কথাটা শুনে গহন হেসে ফেলল। আজ বোধহয় প্রথম নিধি গহন কে এভাবে শব্দ করে হেসে উঠতে দেখল। নয়তো হাজার চেষ্টা করেও এই মানুষটার মুখ দিয়ে হাসি বের করা যায় না। ভালো লাগলো গহন কে হাসতে দেখে। মানুষটাকে অন্তত স্বাভাবিক করা গেল।
“আচ্ছা অনেক হয়েছে এসব ঝগড়া ঝামেলা। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। খাবার দিচ্ছি আমি।”
কথাটা বলে নিধি উঠে দাঁড়ালো চলে যাওয়ার জন্য। পিছন থেকে গহন ওর হাত টেনে ধরল। নিধি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল,
“কি হলো? আবার হানিমুনে যাওয়ার ভূত চাপলো নাকি?”
গহন আলতো হেসে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিধির দিকে এগিয়ে গেল। নিধি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গহন কি বলবে সেটা শোনার জন্য। তবে গহন কিছু না বলে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতন দুই হাতে শক্ত করে নিধিকে জড়িয়ে ধরলো। যাকে বলে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরা। এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে যে নিধি নিজের বুকে যেন একটু চাপ অনুভূব করলো। একটু কষ্টও হলো। ভাবলো লোকটার পিঠে কয়েকটা কি'ল ঘু'ষি লাগাবো। এভাবে কেউ জড়িয়ে ধরে নাকি! আদৌও ভালোবাসা দেখাচ্ছে নাকি মে'রে ফেলার উদ্দেশ্য!
তবে নিধি নিজের ভাবনা অনুযায়ী কাজগুলো করার আগেই গহন কৃতজ্ঞতা ভরা কন্ঠে বলল,
“আমার আজকাল মনে হয় তুমি আমাকে যতটা বুঝছো ততটা কেউ কখনো বুঝতে পারেনি। আমার মনে হয় তুমি যতটা আমার খেয়াল রাখার চেষ্টা করছো ততটা কেউ কখনো করেনি। তুমি আমার অসহায়ত্ব, দুর্বলতা, কষ্ট সব খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারো নিধি। কি করে পারো বলোতো?”
অন্যান্য সময় হলে নিধি এক হাতে মাথাটা চুলকে উত্তর দিত। তবে এখন সেই উপায় নেই। গহন এমন ভাবে চেপে ধরেছে যে হাতটাও নাড়াতে পারছে না। ফলস্বরূপ অবুঝের মতন বলল,
“কি জানি! এত ভাবনা চিন্তা করিনি কখনো। তবে আপনার মুখটা দেখলে আজকাল অনেক কিছু ধরে ফেলতে পারি।”
“এভাবেই সারা জীবন বুঝো আমায়। আমায় বোঝার মতন মানুষের খুব অভাব।”
নিধি কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন আপনার মা আপনাকে বোঝেনা? ফুপিও তো আছে।”
“ওরা আলাদা। ওরা হয়ত আমায় বোঝে। কিন্তু আমি যেমন ভাবে চাই তেমন ভাবে বোঝে না। তেমন ভাবে শুধু তুমিই যেন আমায় বুঝছো। তুমি আলাদা নিধি। সবার থেকে আলাদা। তবে জানো তো আমার ভয় হয়।”
“কেন?”
উত্তরটা দেওয়ার আগে গহন নিধি কে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“প্রিয় মানুষ গুলো কে আমি খুব তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলি নিধি। আমার প্রিয় মানুষগুলো সব সময় আমায় ছেড়ে চলে যায়। তুমি কখনো আমায় ছেড়ে যেওনা। অনেক বছর পর কাউকে পেলাম যাকে খুব নিজের মনে হচ্ছে। অনেকগুলো বছর পর কারো ওপর নির্ভরশীল হতে মন চাইছে। কখনো যেন আবার আমায় ফাঁকি দিয়ে চলে যেও না।”
এবারে নিধি পাল্টা গহন কে জড়িয়ে ধরে আলতো হেসে ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
“যাব না। আপনি যত্ন করে রেখে দিলে সারাজীবন থেকে যাবো। আমার শেষ নিশ্বাস অব্দি থাকবো আপনার সাথে, কথা দিলাম।”