দুপুরের দিকে ঋতুর অসুস্থতা বাড়লো। একপর্যায়ে গিয়ে সালমা বেগমের কথায় বাধ্য হয়ে সাবিত ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল।
বরাবরের মতনই নিধি তখন বাড়ির কাজ করছে। কলিং বেল এর আওয়াজ পেতে হাতের কাজ ফেলে রেখে গেল দরজা খুলতে। কেননা নিধি খুব ভালো করেই জানে ও না গেলে কেউ দরজা খুলবে না। এটা তো শুধুমাত্র নিধির শ্বশুরবাড়ি। আর তো কারো শ্বশুর বাড়ি না। তাই সব কাজ নিধিকেই করতে হবে।
তবে অবাক করার বিষয় হলো আজ নিধি গিয়ে দরজা খোলার আগেই দেখলো অন্য কেউ দরজা খুলে ফেলেছে। পাশে তাকাতেই দেখল সিনথিয়া। বাপরে বাপ ভাবা যায় যে মেয়েটাকে বিছানা থেকে তোলা যায় না সেই কিনা এত তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। আরো কি কি যে নিধি কে দেখতে হবে কে জানে।
আবিদ এসেছে। বসার ঘরে তখন বাকি সবাই বসে গল্প গুজব করছে। এত মানুষের মাঝে আবিদের চোখ দুটো খুঁজলো শুধুমাত্র নিধি কে। সামনে যে সিনথিয়া দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই। ওর সাথে কথা বলার কোন ইচ্ছেও নেই। তবে সিনথিয়ার মাঝে একটু ইচ্ছে দেখা গেল আবিদের সাথে কথা বলার। চেষ্টাও করলো। তবে আবিদ ওকে পাত্তা দিল না। কেননা তার আগেই আবিদের চোখ নিধি কে খুঁজে পেয়েছে।
আশেপাশের কারো সাথে কোন ধরনের কোন কথা না বলে সরাসরি নিধির দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“ভাবি, আপনি কি বলুন তো। আমি আপনাকে হানিমুন প্যাকেজের কথা বললাম গহন কে না বলে তার কারণ গহনের হয়ত মনে থাকবে না। এত ব্যস্ততার মাঝে হয়তো ভুলে যাবে। সেই তো দেখছি আপনিও ভুলে গেছেন। আপনার মনে আছে আজ রাতেই রওয়ানা দিতে হবে আপনাদের?”
আবিদের কথাটা শুনতেই নিধি জিভে কামড় বসালো। সত্যিই তো ভুলে গিয়েছে। এমনকি এই নিয়ে গহনের সাথে কোন আলোচনাই করা হয়নি। অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,
“আই এম রিয়েলি সরি ভাইয়া। সত্যি আমার একটুও মনে ছিল না। আসলে আপনি তো জানেনই ভাইয়া আমি কতটা চাপের মাঝে থাকি সারাদিন। একটুও মনে ছিল না। আমি গহন কে শুধু জানিয়েছিলাম ব্যাপারটা। কিন্তু এই নিয়ে ওর সাথে কিছুই আলোচনা করা হয়নি।”
আবিদ কপাল চাপড়ে বলল,
“আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। আপনাদের দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে আমার এই কথাটা বলা উচিত ছিল। তাহলে কারো না কারো ঠিক মনে থাকতো। যাই হোক তাড়াতাড়ি গোছগাছ করে রাখবেন। আজ রাতে কিন্তু আপনাদের বাস। আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো বাসস্ট্যান্ড অব্দি। সময় কিন্তু বেশি নেই হাতে।”
নিধি চুপচাপ আবিদের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো আর অমনি দেখলো আবিদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ওর শাশুড়ি। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। যেন তীব্র রাগ আর ক্ষোভ জমা হয়ে আছে ওই চোখ দুটোতে নিধির জন্য।
নিধি কিছু বলে ওঠার আগেই ওর কানে ভেসে এলো সালমা বেগমের গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
“কোথায় যাচ্ছো তোমরা?”
সালমা বেগমের কন্ঠটা পেতেই আবিদ ওনার দিকে তাকালো। নিধি কিছু বলে ওঠার আগে আবিদ বলে উঠলো,
“হানিমুনে যাচ্ছে আন্টি। আসলে ওদের বিয়ের পর থেকে যে অবস্থা দেখছি বেচারারা কোন আনন্দই তো করতে পারে না। তাই আমি বিয়েতে এই উপহারটা ওদেরকে দিয়েছি। আজ রাতে ওরা রওনা হবে।”
সালমা বেগম শুধু শুনলেন আবিদের বলা কথাগুলো। তবে ওকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলেন না। আবারও নিধির উপরে দৃষ্টিপাত করে গম্ভীর গলায় বললেন,
“কার থেকে অনুমতি নিয়ে তুমি যাওয়ার জন্য রাজি হয়েছো? আমাকে জানিয়েছিলে এই ব্যাপারে একবারও? বাড়ির এই অবস্থা, শম্পা অসুস্থ, শাফি অসুস্থ, ঋতু অসুস্থ, এতগুলো মেহমান এসেছে। আর তুমি বাড়ির বউ হয়ে কোন আক্কেলে এই মুহূর্তে ঘুরতে যেতে চাও? জ্ঞান, বুদ্ধি, শিক্ষা কোন কিছুই কি নেই তোমার? নিজে তো চূড়ান্ত রকমের বেয়াদব। আমার ছেলেটাকেও বেয়াদবি শেখাচ্ছো। দুদিনও হয়নি তুমি এসেছো আর এর মাঝেই এমন কু বুদ্ধি দিয়েছো আমার ছেলে কে যে ও একবারও এই ব্যাপারে আমার থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না।”
নিধি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সালমা বেগমের এমন রাগারাগি দেখে। তবে ঘাবড়ালে তো চলবে না। যদি এখন নিধি ভয় পেয়ে চুপসে যায় তাহলে উনি আরো চেপে ধরবেন। সুতরাং ওনার সামনে যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকতে হবে। এমন ভাবে কথা বলতে হবে যেন উনি অপমানিতও না হন, আবার উপযুক্ত জবাবও পেয়ে যান।
ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আমাকে দোষ দিচ্ছেন কেন মা? আপনার ছেলে তো আমার থেকে বেশি আপনার কথা শোনে। উনি আমার আগে আপনাকে প্রাধান্য দেয়। উনি কেন এই বিষয়টা আপনাকে জানালেন না সেটা তো আমি বলতে পারবোনা। আপনি বরং ওনাকে জিজ্ঞেস করে নেবেন।”
নিধি কথাটা বলার সাথে সাথেই সালমা বেগম গর্জে উঠে বললেন,
“চুপ করো। মুখে মুখে তর্ক করলে একটা চ’ড় মে'রে তোমার সব বেয়াদবি বের করে দেব।”
ওনার এবারের কথাটা নিধির একদমই পছন্দ হলো না। নিধি তো ভদ্রভাবে কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু এসব কোন ধরনের অভদ্রতা? ওনার সাহসই বা হয় কি করে নিধির গায়ে হাত তোলার কথা বলার? এবারে নিধি পাল্টা গম্ভীর গলায় বলল,
“ভদ্র ভাবে কথা বলুন মা। আমি হেসে হেসে কথা বলছি বলে এটা আমার দুর্বলতা ভাববেন না। তার থেকেও বড় কথা গহনের কান অব্দি এই কথাগুলো পৌঁছে দিতে আমায় বাধ্য করবেন না।”
সালমা বেগম তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
“আমাকে আমার ছেলের ভয় দেখাচ্ছো! কি করবে করে নাও। আমার ছেলে তোমার একটা কথাও বিশ্বাস করবে না। যদি তোমার সত্যি সাহস থেকে থাকে তবে আমার ছেলেকে গিয়ে আমার নামে কিছু বলে দেখো। তুমি তোমার উপযুক্ত জবাব পেয়ে যাবে। আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো কোথাও যাওয়া হবে না তোমাদের। এইজন্য না যে বাড়ির খারাপ পরিস্থিতি। বরং এই জন্য যেতে পারবেনা কারণ আমার অনুমতি না নিয়ে তুমি একা একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছো। মনে রেখো তোমায় জীবন চলবে আমার কথায়।”
অনেকক্ষণ যাবত আবিদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছিল সালমা বেগমের কথা। ভেবেছিল যেহেতু উনি নিধির সাথে কথা বলছেন তাই ওর হয়তো এর মাঝে ঢোকা উচিত হবে না। এমনিতেই তো বাইরের মানুষ। আর সালমা বেগম খুব একটা পছন্দও করেনা ওকে। তবে এবার আবিদের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হলো ব্যাপারটা। সেজন্য আর নিজের মুখটা বন্ধ রাখতে পারল না।
“আন্টি, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত হয়ে গেল না। একেই তো অযৌক্তিক দাবি করছেন তার উপরে আবার এত মানুষের সামনে ভাবিকে এভাবে অপমান করছেন। ভাবি গহন কে বিয়ে করেছে, আপনাকে না যে আপনার কথায় চলবে। আর ভাবির গায়ে যে হাত তুলতে চাইলেন জানের এর জন্য নারী নির্যাতনের মামলাও হয়ে যেতে পারে। বুঝতে পারছেন তো শাস্তি কি হবে? বুঝেশুনে কথা বলতে হয় এজন্য।”
সালমা বেগম এবারে আবিদের দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
“বাইরের মানুষ আমাদের পারিবারিক বিষয়ে কথা বলুক সেটা আমি পছন্দ করি না। আমার সংসারে অশান্তি তৈরি করে দিয়ে এখন আবার আমাকে ভয় দেখাচ্ছো। এতদিন হলো তো আমার ছেলের পেছনে পড়ে থেকে ওকে আমার বিরুদ্ধে অনেক উস্কানোর চেষ্টা করেছো। যখন পারোনি তখন এবার আবার লেগেছো ছেলের বউয়ের সাথে। আর গহন যখন বাড়িতে নেই তোমার নিধির সাথে এত কিসের কথা? কেন এসেছো গহনের অনুপস্থিতিতে?”
সালমা বেগমের ইঙ্গিত আবিদ আর নিধির দুজনের কাছেই ভীষণ নোংরা মনে হলো। নিধি খুব কষ্টে নিজেকে সংযত করে রেখেছে। কেননা এখন ওকে একটু হলেও নিজেকে সংযত করতেই হবে যেন এরা হাজার চেষ্টা করেও গহনের কানে ওর নামে আজেবাজে কোন কথা দিতে না পারে। বাদবাকি যা করার সেটা তো গহন কে করতে হবে। তবে আবিদের এত বাধ্যবাধকতা নেই। এতদিক বিবেচনা করার সময়ও নেই। সব সময় নিজের ভদ্রতা বজায় রাখার দায়বদ্ধতাও নেই।
ভদ্রতার খোলস থেকে বেরিয়ে এসে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এমনভাবে গহনের মাথাটা গিলে খেয়েছেন যে এত বছর ধরে ওকে উস্কেও কিছু করতে পারছি না। বিশ্বাস করুন আন্টি যদি ও আমার কথা একটু শুনতো, তাহলে এতদিনে অনেক শান্তি পেত। আর আপনি বুঝতেন যন্ত্রণার আসল মানে কি। যাইহোক, কাজটা আপনি একদম ঠিক করলেন না। আমাকে তো অপমান করলেন করলেনই। সেই সাথে নোংরা একটা অপবাদ দেওয়ার চেষ্টাও করলেন।”
ঝামেলাটা আরো বাড়ানোর জন্য এবারে শম্পা প্রস্তুতি নিল। প্রচুর রাগ জমে আছে মনের মাঝে নিধি আর গহনের প্রতি। সোফা থেকে উঠে এগিয়ে এসে ব্যঙ্গাত্মক গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখে তো মনে হয় ভাইয়াকে দুচোখে সহ্য করতে পারো না। আবার হানিমুনে যাওয়ার জন্য এত তাড়াহুড়ো লাগিয়েছো। বাড়িতে কি ঠিকঠাক কাজ হচ্ছে না যে এখন হানিমুনে যেতে হচ্ছে।”
নিধি লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে গেল। এতগুলো মানুষের সামনে কি একটা নোংরা কথা বলে দিল এই মেয়েটা। না আছে কোন ভদ্রতা না আছে কোন সভ্যতা। অথচ সালমা বেগম নিধিকে ভদ্রতা শেখাতে এসেছেন। তবে নিধি শম্পার সাথে মোটেও ভদ্রতা দেখাতে চায় না। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“বিশ্বাস করুন, যদি আপনি আমার থেকে বয়সে ছোট হতেন তাহলে আপনার বেয়াদবির জন্য কষিয়ে একটা চ'ড় লাগিয়ে এমন অবস্থা করতাম আপনার যে নিধির নাম শুনেও আপনি কেঁপে উঠতেন। আর মা আপনাকে বলছি, অন্যের মেয়েকে শিক্ষা দেওয়ার আগে নিজের মেয়েকে কি শিক্ষা দিয়েছেন সেদিকে নজর দিন। ওনার যদি বিন্দুমাত্র কোন জ্ঞান বুদ্ধি থেকে থাকতো, ওনার মাঝে যদি কিঞ্চিত পরিমাণ শিক্ষা থেকে থাকতো এতক্ষণে লজ্জায় উনি ম'রে যেতেন। অবশ্য এই গুণগুলো থাকলে এই কথাটাই বের হতো না ওনার মুখ দিয়ে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি কোন বাড়ি না চিড়িয়াখানায় এসেছি বিয়ে করে। এখানে একেক জন মানুষ চিড়িয়াখানার এক একটা জন্তুর থেকেও ভয়ংকর।”
শম্পাকে কথাগুলো বলা শেষে নিধি আবিদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া, আমার মনে হয় আপনার এখানে থাকাটা ঠিক হবে না। আর সত্যিই আপনি গহনের অনুপস্থিতিতে এই বাড়িতে আসবেন না। অপমানিত হতে হবে আপনাকে তাহলে।”
আবিদ একবার রাগী দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকালো। দেখলো শম্পা তখন রাগে হিঁসহিঁস করছে। কে জানে থামলো কেন। হয়ত এর মাঝে কোন এক সময় সবার অগোচরে সালমা বেগম ইশারা দিয়েছেন মেয়েকে থামার জন্য।
নিজের দৃষ্টি দিয়েই যেন আবিদ সবাইকে একটা ঠান্ডা হুমকি দিল। তারপরে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না ভাবি। এতদিন গহন কে উস্কানোর পর কিছু করতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে আজ যেন এই বাড়িতে একটা ঝড় ওঠে সে ব্যবস্থা আমি করেই ছাড়বো।”
___________
বরাবরের মতন আজও বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার জন্য গহন কলিং বেল বাজালো না। নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে এলো। সরাসরি আগে নিজের ঘরে গেল। দেখল নিধি বিছানার উপর চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে আছে মন ম'রা হয়ে। গহনকে আসতে দেখে একটু নড়েচড়ে উঠলো। গহনের মুখ ভঙ্গি বেশ গম্ভীর। মনে হচ্ছে খুব বেশি রেগে আছে। কিন্তু রাগটা আসলে কার ওপর উঠেছে সেটা নিধি জানে না।
গহন হাতে থাকা ব্যাগটা সোফার উপরে ছুঁড়ে মা'র'লো। পরনে থাকা ব্লেজারটাও খুলে বিছানার উপরে ছুঁড়ে মা'র'লো। তারপরে গলায় থাকা টাইটা খুলতে খুলতে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দুই ঘণ্টা সময় আছে তোমার হাতে। যা যা গোছানোর গুছিয়ে নাও। আর যদি সময় না হয় তাহলে কিচ্ছু নিতে হবে না। ওখানে গিয়ে কিনে নেব।”
গহন কথাটা বলে এবারে টাইটা ছুঁড়ে মা'র'লো বিছানার ওপর। তারপর বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে নিধি তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো,
“কিন্তু কোথায় যাবো?”
“হানিমুনে যাবো। তৈরি হয় নাও।”
কথাটা বলে গহন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। নিধি একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেই পড়লো। কি করবে কি করবে না বুঝে উঠতে পারছেনা। গহন কেনই বা যাবে বলল? কার ওপরেই বা রেগে আছে? নিধির ওপর রেগে গিয়ে কি কথাটা বলল? কেননা গহন ওর মায়ের ওপর রেগে যাবে এটা তো অসম্ভব। এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে নিধি আর কোন কাজই করতে পারলো না।
________
সাবিত আর ঋতু বাদে বাড়ি প্রত্যেকটা সদস্য তখন সালমা বেগমের ঘরে উপস্থিত। খুব হাসি ঠাট্টা চলছে ঘরের ভেতরে। অন্যদিকে নিধি নিজের ঘরে সম্পূর্ণ একা মন ম'রা হয়ে বসেছিল। কারো যেন মনেই ছিল না নিধির কথা। নিধিকে ওদের মাঝে সামিল করারও কোনো ইচ্ছে ছিল না। কেননা ওরা তো নিধিকে নিজেদের বলে মনেই করে না।
হাসি-ঠাট্টার মাঝে সেখানে গহনের প্রবেশ ঘটলো। আজ প্রথমবারের জন্য গহন সালমা বেগমের ঘরে প্রবেশ করার আগে তার থেকে কোন অনুমতি নিলেন না। গহনের গম্ভীর অভিব্যক্তি সমেত প্রবেশ করা দেখে সবার হাসি ঠাট্টা মুহূর্তের মাঝে থেমে গেল।
গহনের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে না যে রেগে আছে। তবে চোখমুখের আবভাব একদম থমথমে।
বরাবরের মতনই গহন কে দেখে সালমা বেগমের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। যেই না তিনি কিছু বলতে ধরলেন অমনি গহন গম্ভীর গলায় ওনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা, দুই ঘণ্টা পর আমি আর নিধি বের হব। এক সপ্তাহের ট্যুর আমাদের। আমার অনুপস্থিতিতে যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয় বাদলকে কল করো। ও ব্যবস্থা করে দেবে।”
কথাটা বলে আর একটুও সেখানে দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না গহনের। চলে যেতে ধরলো অমনি পিছন থেকে সালমা বেগমের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।
“আমি তো নিধিকে নিষেধ করেছিলাম। বলেছিলাম তোমাদের যাওয়া হবে না।”
থেমে গেল গহন। আবারো সালমা বেগমের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পূর্বের মতনই গম্ভীর গলায় বলল,
“নিষেধ করোনি, অপমান করেছো। আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা সবাই এমন কিছু কথা শুনিয়েছো নিধি কে যা তোমাদের মোটেও উচিত হয়নি মা। তোমরা প্রত্যেকে নিজেদের সীমা অতিক্রম করেছো। বাকি সবার কথা বাদ দিলাম আমি। কিন্তু তোমার থেকে এই আচরণটা আমি আশা করিনি মা। আমি তোমার ছেলে, তুমি আমাকে যা ইচ্ছে বলতে পারো। প্রয়োজনে আমার গায়ে হাতও তুলতে পারো। আমি হাসিমুখে সেটা মেনে নেব। তোমার থেকে কারণও জানতে চাইবো না। কিন্তু নিধির গায়ে হাত তোলার কোন অধিকার তোমার নেই। অন্যায় করেছো তুমি।”
বিস্ময়ে হা হয়ে গেল সালমা বেগমের মুখ। চোয়াল তার ঝুলে এলো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি অন্যায় করেছি? আর তোমার স্ত্রী যে আমার থেকে অনুমতি না নিয়েই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে একা এতে ও অন্যায় করেনি?”
“না মা। নিধি অন্যায় করেনি। মাত্র একদিন এই নিয়ে আমাদের মাঝে কথা হয়েছিল। ও শুধু ব্যাপারটা আমায় জানিয়েছিল। তারপরে আমিই ওকে বলেছিলাম যে তোমার সাথে আমি কথা বলবো। এই নিয়ে আর কোনো আলোচনা হয়নি আমাদের মাঝে। আমরা দুজনে ভুলেই গেছিলাম এই ব্যাপারটা। তুমি যদি একটু ভালোভাবে নিধি কে বলতে যে আমরা যেন এখন না যাই। আমি তোমায় গ্যারান্টি দিয়ে বলছি ও যেত না। তুমি আমার সাথেও কোনো কিছু নিয়ে আলোচনা না করে সরাসরি নিধির পারিবারিক শিক্ষা, ভদ্রতা, সভ্যতার দিকে আঙুল তুললে। এমনকি তুমি ওর গায়ে হাত অব্দি তুলতে চাইলে। তোমার কি মনে হয় না এটা অন্যায় করেছো তুমি?”
সালমা বেগম ফের অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“তুমি আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলছো গহন!”
গহন উঁচু গলায় কথা বলতে চায়নি। তবুও কিভাবে যেন হয়ে গেছে। বেয়াদবি করতে চায় না গহন। সেজন্য নিজের রাগটা একটু কমানোর চেষ্টা করলো। তবে কমছেই না। শান্ত গলায় বলার চেষ্টা করলো তবে সেটাও পারলো না। গম্ভীর গলাতেই বলল,
“আজ নিধির সাথে যা হয়েছে সেটা ঠিক হয়নি মা। নিধি আমায় কোন অভিযোগ করে না বলে, আমি তোমাদের কাউকে কিছু বলি না বলে তোমরা যা ইচ্ছে তাই ব্যবহার করতে পারো না ওর সাথে। ও এই বাড়ির কাজের লোক না মা। নিধি এই বাড়ির বড় বৌ, আমার স্ত্রী। বিশ্বাস করো মা আমার মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে যে আমার মা আমার স্ত্রীর সাথে এতটা বাজে ব্যবহার করেছে।”
কোন উত্তর দিলেন না সালমা বেগম। বোনের এমন বেহাল দশা দেখে শাহানা কিছু বলে উঠতে ধরলো। তবে তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। তার আগেই গহন হাত উঠিয়ে ওনাকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“খালা, পারিবারিক বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তার থেকেও বড় কথা আমার স্ত্রীর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমার বিষয়ে আলোচনা হলে আপনাকে কথা বলতে দিতাম। কিন্তু আমার স্ত্রীর বিষয়ে কোন কথা বলবেন না।”
সালমা বেগমের মতন একইভাবে মুখটা ফাটা বেলুনের মতন চুপসে গেল শাহানার। এ কোন গহন কে দেখছেন তিনি? যেই গহনকে হাজার একটা কথা শোনালেও তার মুখ দিয়ে একটা টু শব্দ বের হতো না সে কিনা আজ নিজের বউয়ের জন্য এভাবে মুখে মুখে তর্ক করছে! খালা কে পর বানিয়ে দিচ্ছে! ব্যাপারটা তো শাহানারই সহ্য হচ্ছে না। তাহলে কে জানে সালমা বেগম কি করে সহ্য করছেন।
ওনাদের কে কথাগুলো বলা শেষে গহন যেতেই ধরেছিল। তবে আরেকটা জরুরী কথা মনে পড়ল। বিছানার এক কোণে শম্পা বসে আছে। কোলে ওর ছোট ছেলে। আর পাশে ঘুমিয়ে আছে ওর মেয়ে। গহনের দৃষ্টি এবারে শম্পার উপরে পড়লো। গহনকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে শম্পা চটপট নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। গহন একবার ডাকলো শম্পার নাম ধরে।
“শম্পা!”
খুব স্বাভাবিক গলায় ডেকেছিল গহন। কিন্তু তবুও শম্পা মৃদু কেঁপে উঠে গহনের দিকে তাকিয়ে তোতলানো গলায় বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ ভাইয়া।”
“তোমার মুখ, তুমি যা ইচ্ছে তাই বলতে পারো। তোমাকে আটকানোর ক্ষমতা আমার নেই। তাই বলে এমন কিছু বলোনা যাতে তোমার পারিবারিক শিক্ষার ওপর প্রশ্ন তোলা যায়। আর দ্বিতীয় দিন যদি তোমার মুখে আমি নিধি কে নিয়ে কোনো বেয়াদবি কথা শুনি তাহলে মনে রেখো নিধি আজ তোমার থেকে বয়সে ছোট হওয়ার জন্য যে কাজটা করতে পারেনি, বড় ভাই হিসেবে সেই কাজটা আমি করবো। বুঝতে পেরেছো?”
গহনের শেষোক্ত বাক্যে অদ্ভুত কিছু ছিল। শম্পা বুঝতে পারলো ওকে মানতেই হবে গহনের কথা। তাই চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি ভাইয়া।”
“আরেকটা কথা। আমি পিয়াল কে কল করে আসতে বলেছি। ও সকালে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।”
শম্পা চমকে উঠে বলল,
“কোথায় নিয়ে যাবে?”
“যেখানে তোমার যাওয়ার কথা, যেখানে তোমার থাকা উচিত। তোমার আসল বাড়িতে নিয়ে যাবে। দয়া করে সেখানে অন্তত ভদ্র ভাবে থাকার চেষ্টা করো। আসলেও যে মানুষ অতি আদরে বিগড়ে যায় তার উৎকৃষ্ট নমুনা আমার কাছে তুমি।”
কথাটা বলে গহন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। না আর কাউকে কিছু বলল, না এবার ওকে কেউ আটকালো। নিজের অজান্তেই সালমা বেগমের দু গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। মনের মাঝে থাকা রাগ আর জেদ আরো তীব্র হলো। সেই সাথে তিনি বুঝতে পারলেন নিজের ভুলগুলো।
রাগের মাথায় তিনি ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছিলেন। নিধির সঙ্গে তো এভাবে সম্মুখ যুদ্ধে নামার কোন প্রয়োজন নেই। উনি তো আড়ালে থেকেই খুব ভালোভাবে নিজের কাজগুলো করতে পারবেন। তাহলে কেন বোকার মতন গহনের কাছে খারাপ হতে গেলেন?