বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ২৭

🟢

বাড়ি পরিবেশটা আজ ভীষণ ঠান্ডা। নিধির এই বাড়িতে আসার পর থেকে আজকের পরিবেশটাই বোধহয় সবথেকে বেশি ঠান্ডা। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে শম্পা বাড়িতে নেই। কে জানে কোন সকালে চলে গেছে। কিংবা এমনও হতে পারে হয়তো গতকাল রাতেই পিয়াল এসে নিয়ে গেছে। কিন্তু নিধি কিচ্ছু জানে না। রাতে তো আর ঘর থেকে বেরই হয়নি। জানবেই বা কি করে।

সকালে রান্না বান্না কিচ্ছু হয়নি। এদিকে গহন একটু পরে অফিসে বেরিয়ে যাবে। নিধি তাড়াহুড়ো করে রান্না ঘরে গিয়ে রান্না চাপালো। একটু পর দেখলো সেখানে ঋতু এলো। নিধির এত ব্যস্ততা দেখে ঋতু বলল,

“আমি কিছু সাহায্য করবো?”

“না ভাবি। প্রয়োজন নেই। আমার ব্যাপার আমায় বুঝে নিতে দিন।”

নিধির কথার মাঝে যেন কিঞ্চিৎ রাগ প্রকাশ পেল। ঋতু এগিয়ে এসে নিধির পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি কি আমার উপরে রেগে আছো নিধি কোন কারণে? এভাবে কথা বলছো কেন?”

“আমিতো স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছি।আসলে আমার কন্ঠটাই এমন।”

ঋতু বোধহয় এবার একটু আন্দাজ করতে পারল নিধির রেগে থাকার কারণ সম্পর্কে । রাগ করাটাও স্বাভাবিক। গতকাল তো সত্যিই ভালো ব্যবহার করেনি ঋতু নিধির সাথে। মেয়েটা এগিয়ে গিয়েছিল ওর খোঁজ নিতে। আর ঋতু কিনা ওকে অপমান করে বের করে দিল। কোন তো উপায়ও ছিল না ঋতুর কাছে। ভাবলো নিধির সাথে ঝামেলাটা মিটিয়ে নেওয়া দরকার।

নিধিকে উদ্দেশ্য করে অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,

“আমাকে ক্ষমা করে দাও নিধি। আমি ইচ্ছে করে তোমার সাথে ওই ব্যবহার করিনি।আসলে তুমি তো সাবিতের কথার ভঙ্গি কিংবা মানে বুঝবে না। আমি বুঝি। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তাই।”

নিধি একটু হেসে উঠে বলল,

“আমি তো সেসব কথা ভুলে গিয়েছি। অপ্রয়োজনীয় কথা আমি মনে রাখি না। এত জায়গা আমার মন কিংবা মস্তিষ্ক কোথাও নেই।”

ঋতু ফের অপরাধী গলায় বলল,

“ক্ষমা করে দাও নিধি। আমি বুঝতে পারছি তুমি আমার ওপর রেগে আছো। একটু তো আমায় বোঝো। আমি তোমায় কিছু না বলতেই সন্দেহের বশে সাবিত কাল খুব বাজে ব্যবহার করেছে আমার সাথে। চোয়াল চেপে ধরেছিল। আমি চুপ ছিলাম জন্য গায়ে আর হাত তোলেনি। আর আমি সাবিতের আবভাব খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছিলাম। সেজন্য তুমি যাতে তাড়াতাড়ি আমার ঘর থেকো চলে যাও সেজন্য ওই ব্যবহারটা করেছিলাম।”

“আবভাব মানে? কেমন আবভাব?”

“আসলে ওই তোমার….”

কথাটা বলতে নিয়েও থেমে গেল ঋতু। আবার একটা ভুল করে ফেলছিল। কোন আক্কেলে সাবিতের কথা আবার নিধির কাছে বলছিল। তাও এমন একটা স্পর্শকাতর ব্যাপার নিয়ে।যদি এই কথাটা সাবিত কিংবা বাড়ির অন্য কারোর কানে যায় তাহলে কি কেউ ছেড়ে কথা বলবে ঋতু কে? জিভে একটা কামড় বসিয়ে নিজের কথাটা সংশোধন করে নিয়ে বলল,

“মানে আমি বুঝতে পারছিলাম ও রেগে যাবে। আমি চাইনি ও তোমার সামনে কোন রাগারাগি করুক।”

বিশ্বাস করে নিল নিধি ঋতুর কথাটা। ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“ওহ্। ঠিক আছে।”

“তাহলে ক্ষমা করেছো তো আমায়?”

নিধি কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিল না। আসলে ক্ষমা করেনি। ক্ষমা করা এত সহজ নাকি। তাও আবার নিধির মতন মানুষের পক্ষে। এজন্য ভুল করার সময় মনে রাখতে হয়। নয়তো পরে গিয়ে এমন ক্ষমা পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতে হয়। তবে নিধি আগেই ক্ষমা করল না। পূর্বের কিছু হিসেব ঋতুর সাথে মেটানো এখনো বাকি আছে। ভাবলো এই সুযোগে সেই কথাগুলো সেরে নেওয়া যাক। গম্ভীর গলায় বলল,

“ক্ষমা না হয় পরে করব। তার আগে বলো গহন আর জারা আপুকে নিয়ে মিথ্যে বললে কেন আমায়? তোমরা সবাই মিলে কেন আমার সংসারে অশান্তি তৈরি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো বলতে পারো?”

ঋতু অবাক হলো নিধির কথাগুলো শুনে। ও কেন মিথ্যে বলতে যাবে? ও তো কোন মিথ্যে বলেনি। নিধি ঋতুর দিকে তাকালো ওর অভিব্যক্তি বোঝার জন্য। চোখ মুখ দেখে তো মনে হলো না যে ঋতু মিথ্যে বলেছে। তাহলে তো ধরা পরে যাওয়া চোরের মতন হত। দেখে মনে হচ্ছে নিধির কথাগুলো শুনে খুবই অবাক হয়েছে। ঋতু বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“আমি মিথ্যে বলতে যাব কেন তোমায় নিধি? আমি যা জানি সেটাই বলেছি। আর তোমার সংসারে আমি অশান্তি তৈরি করতে চাইবোই বা কেন? তুমি কি আমার শত্রু নাকি!”

নিধি চোখ ছোট ছোট করে ঋতুর দিকে তাকিয়ে সন্দেহী গলায় বলল,

“তাই নাকি? তুমি আমায় বলোনি যে গহন জারা আপু কে ভালোবাসত, ওদের মাঝে সম্পর্ক ছিল? অথচ এমন কিছুই ছিল না। সবটাই জারা আপুর পক্ষ থেকে ছিল। গহনের পক্ষ থেকে কখনো কিছুই ছিল না।”

ঋতু অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“সত্যিই? ভাইয়া ভালোবাসতো না জারা আপু কে?”

“না, বাসতো না।”

ঋতুর যেন বিশ্বাসই হতে চাইলো না কথাটা। কিছুক্ষণ আনমনে কি সব যেন ভেবে ফের অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এই কথাটা নিধি। আমি নিজেই তারমানে ভুল জানি।”

“তাই হবে। গহন এমন না। উনি খুব ভালো। কাউকে ঠকানোর মতন মানুষ উনি না। অন্তত এই বাড়ির জন্তুগুলোর মতন না।”

ঋতুর চোখে মুখে আবারো অপরাধী ভাব ফুটে উঠলো। নিজের কাজের জন্য আবারো ক্ষমা চেয়ে বলল,

“আমি তোমাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করার জন্য কথাটা বলিনি নিধি। আমি যা জানতাম তোমায় তাই বলেছি। বড় বোন হিসেবে তোমাকে শুধু সাবধান করতে চেয়েছিলাম। এর থেকে বেশি আর কিচ্ছু না। আমি চাই তোমার সংসারে শান্তি থাকুক।”

নিধি কোন উত্তর দিল না। ঋতুকে বোঝাতে চাইল যে ওর অপরাধটা খুব বড়। সহজে নিধি ক্ষমা করবে না। তবে ঋতু ক্ষমা চাইতেই থাকলো, তো চাইতেই থাকলো। তাও বেশ অনেকক্ষণ যাবত অনেকবার অনেক ভাবে ক্ষমা চাইলো। একপর্যায়ে গিয়ে নিধিরই খারাপ লাগলো। মনে হলো এবারে বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। মানুষকে ক্ষমা করতে শিখতে হয়। শেষে বাধ্য হয়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে ভাবি ভুলে যাও এসব কথা। আর কখনো এসব কথা তুলো না। আমার ভালো লাগেনা। গহন ভালো আমি এটাই বিশ্বাস করতে চাই।”

_________

সকালে আর গহনের খেয়ে যাওয়ার সময় হলো না। নিধির রান্না তখন মাঝপথে। এর মাঝেই ছেলেটা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। প্রত্যেক দিনের মতন আজ যাওয়ার আগে নিজের মায়ের ঘরে গেল না। অস্বস্তি হবে গেলে। সেই সাথে আবার কষ্টও হবে। আজ বোধহয় প্রথম গহনের পুরনো সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হলো।

নিধি রান্না-বান্না শেষ করে গোসল করতে করতেই দুপুর দুটো বেজে গেল। অথচ এখনো গহনের আসার কোন নাম নেই। চুল আঁচড়ানো শেষে ফোন নিয়ে বিছানার উপরে গিয়ে বসলো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো নিধির মৃ'ত ফোনটা আবার নিজে নিজেই বেঁচে উঠেছে। তবে তাও কল করার আগে কয়েকটা চড় থাপ্পড় লাগাতে হলো ফোনটাকে। অনেক চেষ্টার পর অবশেষে গহন কে কল করতে পারলো।

রিং হয়ে গেল। তবে গহন রিসিভ করলো না। আরেকবার কল দিল। এবারও শুধু রিং হয়ে গেল কিন্তু কলটা রিসিভ করল না গহন। তৃতীয়বার কল দেওয়ার ধৈর্য হলো না নিধির। কেননা এখন রাগ উঠেছে। গহনের করা এই অবহেলা একদমই পছন্দ হলো না নিধির। এটা কি নিধি কে অপমান করা হলো না? অবশ্যই অপমান করা হলো। কি এমন কাজ করছেন তিনি যে ফোনটা রিসিভ করা যাবে না। তাও যেখানে দুই দুইবার কল দিল। এতই ব্যস্ততা! অন্তত ফোনটা রিসিভ করে তো একবার বলতে পারত যে পরে কথা বলবে। সেই কথাটা বলার সময়ও নেই! সব কাজ কি উনি একাই করেন নাকি অফিসে?

নিধি বিরবির করে আরো কি সব যেন একা একাই বলে গেল। মিনিট দুয়েক বাদে ওর ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো। হাতে নিতেই দেখলো গহনের নাম্বার থেকে কল এসেছে। নিধিও ভাবলো একবারে ফোনটা রিসিভ করবে না। তবে কেন যেন রিসিভ না করে থাকতেও পারল না। হাতটা শুধু নিসপিস করছে। অবশেষে ফোনটা রিসিভ করেই ফেলল। তবে খুব বেশি উচ্ছ্বাস ভাব দেখাল না। গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি দুবার কল করেছিলাম।”

ফোনের অপর পাশে থাকা গহন ব্যস্ত ভঙ্গিতে অপরাধী গলায় বলল,

“আই এম সরি। আমি আসলে মিটিংয়ে ছিলাম। এই মাত্র বের হলাম। দরকার ছিল কি তোমার?”

“খেতে আসবেন না?”

“না, সময় হবে না।”

“তাহলে অফিসে কিছু খেয়ে নিন। সকাল থেকে তো কিছু খাননি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। সময় হলে আমি খেয়ে নেব। তুমি খেয়ে নিও। রাখছি।”

গহন ফোনটা রাখতে ধরলে নিধি চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“দাঁড়ান।”

গহন আবার ফোনটা কানে ধরে ব্যস্ত গলায় বলল,

“হ্যাঁ বলো।”

“শুনেছিলাম আপনার নাকি গাড়ি আছে। সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন?”

“হ্যাঁ। আমি তো গাড়িতেই যাতায়াত করি। কেন তোমার কোথাও যাওয়ার আছে?”

“হ্যাঁ যাওয়ার আছে। পাঠাতে পারবেন গাড়িটা?”

গহন একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“কিভাবে পাঠাবো? আমি তো কোন ড্রাইভার রাখিনা। আমি নিজেই ড্রাইভ করি।”

নিধি ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“সামান্য একটা ড্রাইভার জোগাড় করতে পারবেন না! অফিসে কেউ নেই? খুঁজে বের করুন কাউকে। নয়তো নিজেই আসুন।”

কথাটা বলে নিধি কলটা কেটে দিল। কল কেটে দিয়ে নিধি ভাবল গহন কে যে রাগটা দেখালো কাজ নিশ্চয়ই হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

________

নিধির ভাবনা একেবারে ভুল হলো না। গহন পাঠিয়েছে ওর গাড়িটা। সাথে ড্রাইভার হিসেবে পাঠিয়েছে নিজের সেক্রেটারি বাদলকে। বাদল বাড়ির নিচে এসে গহন কে কল করেছে। আর গহন কল করে নিধি কে বলেছে কথাটা। আগেই অবশ্য জানিয়েছিল যে গাড়ি পাঠাচ্ছে।

গাড়ি এসে গেছে খবরটা পেতেই নিধি তাড়াহুড়ো করে টিফিন বক্স, ব্যাগ আর ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে। সালমা বেগম আজ সকাল থেকেই নিজের ঘর থেকে বেরোয়নি। না ওনার আত্মীয়-স্বজনরা বেরিয়েছে। নিধি রান্না করে দিয়েছিল ঋতু গিয়ে সবাইকে নিজেদের ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। নিধি একবার সালমা বেগমের ঘরে খাবার নিয়ে যেতে ধরেছিল। কিন্তু সফল হতে পারেনি।

নিধি কাউকে বলেও গেল না। ইচ্ছে হলো না বলার। কেননা জানে এখন বলতে গেলে একেকজন হাজার একটা কথা শোনাবে। তারা বেকার, কথা শোনাবে এটাই স্বাভাবিক। নিধি উত্তর দিলেও তো সমস্যা। আবার উত্তর না দিয়ে থাকতেও পারবেনা। তাই কাউকে কিছু জানালোই না।

নিধি বাদলকে বলল সোজা গহনের অফিসে নিয়ে যেতে। নিধিকে অফিসের সামনে নামিয়ে দিয়ে ওকে ভেতরে যেতে বলে বাদল গেল গাড়িটা পার্ক করতে।

নিধি গাড়ি থেকে নেমে আগে বাইরে থেকেই গহনের অফিসটা দেখলো। গহনের অফিসটা অনেক বড়। ভাবা যায় নিধির স্বামী এত বড় একটা অফিসের মালিক! সাধারণ কর্মচারী নয়, সোজা মালিক। আজ নিধির মনে হলো গহনের এত ব্যস্ততা আসলে যৌক্তিক। অফিসই যেহেতু এত বড় তার মানে নিশ্চয়ই কাজও অনেক বেশি। সেজন্যই মানুষটা ঘুমোনোর সময়ও পায় না।

আর ভাবনা চিন্তা না করে নিধি ভিতরে এলো। কিন্তু কোন দিকে যাবে, গহনের কেবিন কোন দিকে কিছুই জানেনা। কোন উপায় না পেয়ে রিসিপশনে থাকা মেয়েটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“গহনের কেবিন কোন দিকে বলতে পারবেন?”

“নিশ্চয়ই ম্যাম। কিন্তু আপনি কে? আর স্যারের সাথে যে দেখা করবেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে তো?”

“অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর প্রয়োজন নেই। ওনাকে বলুন নিধি এসেছে।”

মেয়েটা হাসি হাসি মুখ করেই আপত্তি জানিয়ে বলল,

“সরি ম্যাম। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কারো সাথে দেখা করেন না স্যার। আর এই মুহূর্তে স্যার একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ আছে। এখন ডিস্টার্ব করা যাবে না। আপনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তারপরে দেখা করতে আসবেন স্যারের সাথে। এগেইন সরি ম্যাম।”

গহন তখন সবে মাত্র মিটিং থেকে বেরিয়েছে। কোথায় একটা যাবে সেই জন্য নিচে নামলো। লিফট থেকে বেরোতেই হঠাৎ করে রিসিপশনের দিকে চোখ গেল। দেখলো শাড়ি পরা ছোটখাটো একটা মেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে নিয়েও গহন আবার সেদিকে তাকালো। মুখ দেখা যাচ্ছে না মেয়েটার। পিছন থেকে দেখে গহনের মনে হলো ওটা নিধি।

রিসিপশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিধির কাছাকাছি যেতেই পিছন থেকে একবার সন্দেহী গলাতেই ডাকলো গহন,

“নিধি!”

রিসিপশনের মেয়েটা তখন নিধিকে বোঝাচ্ছিলো যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া দেখা করা যাবে না। নিধি বলতেই ধরেছিলো যে ও গহনের স্ত্রী। এর মাঝেই গহনের কণ্ঠস্বর পেয়ে দুজনে একযোগে সেদিকে তাকালো। গহন কে দেখতেই নিধির ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। রিসিপশনের মেয়েটা তড়িঘড়ি করে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“স্যার, আসলে ওনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। আপনি তো আপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কারো সাথে দেখা করেননা। সেটাই আমি ওনাকে বোঝাচ্ছিলাম।”

নিধির ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গহন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“সি ইজ মাই ওয়াইফ। ওনার কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর প্রয়োজন নেই। নেক্সট টাইম থেকে উনি যখনই আসবেন আমার কেবিনে নিয়ে যাবেন।”

গহন কথাটা বলতেই মেয়েটা চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে নিধির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলল,

“আই এম রিয়েলি সরি ম্যাম। আমি আসলে আপনাকে চিনতাম না। কিছু মনে করবেন না ম্যাম।”

নিধি তড়িঘড়ি করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে। সমস্যা নেই। দোষটা আমারও। আমিও তো পরিচয় দেইনি। আপনি তো আপনার কাজই করছিলেন। ইটস ওকে।”

কথাটা বলে নিধি এবারে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তো আপনাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এসেছিলাম। আপনি চমকাননি আমায় দেখে?”

গহন আলতো হেসে নিধির হাতটা ধরে লিফটের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,

“খুশি হয়েছি।”

_________

নিধি কে নিয়ে গহন সোজা ওর কেবিনে গেল। কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সেসব ভুলে গেল গহন।

গহনের কেবিনটা দেখে নিধি আরো তাজ্জব বনে গেল। কি সুন্দর কেবিনটা! এখানে বসে থেকে কাজ করতে তো দারুণ লাগবে। কোন অসুবিধাই হবে না। গহনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে নিধি নিজেই পুরো কেবিনটা একবার ঘুরে দেখে বলল,

“কত বড় কেবিন আপনার! আমার বাড়ির সবগুলো রুম মিলিয়ে আপনার এই একটা কেবিন।”

“পছন্দ হয়েছে তোমার?”

“আরে এত সুন্দর জিনিস পছন্দ হবে না কেন! আমি কি গাধা নাকি।”

“ঠিক আছে তোমাকেও এমনই একটা কেবিন বানিয়ে দেব।”

নিধি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিন্তু কেন? আমি কি করবো? ঘুমোবো নাকি?”

“আমায় সাহায্য করবে। এত বড় একটা ব্যবসা একা সামলাতে ভীষণ কষ্ট হয়। তেমন ভরসাযোগ্য কাউকে পাইও না যে দায়িত্ব দেব। তুমি তো আমার বউ, অবশ্যই বিশ্বস্ত। সাহায্য করবে আমায়। দুজনে একসঙ্গে ব্যবসা সামলাবো।”

নিধি দারুন আগ্রহ খুঁজে পেল গহনের বলা কথাটায়।

“সত্যিই আমাকে নেবেন? কিন্তু আমি পারবো না। দেখবেন দুদিনে আপনার ব্যবসা ডুবিয়ে দেব।”

গহন একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আমি শেখাবো তো তোমায়। আগে পড়াশোনা করাবো, তারপর আমি নিজে সবটা শেখাবো তোমায়।”

পড়াশোনার নামটা শুনতেই নিধির মুখটা চুপসে গেল। সব আগ্রহ নিমিষের মাঝে উধাও হয়ে গেল। চেয়ার টেনে বসে বিষন্ন গলায় বলল,

“তাহলে আর হলো না। পড়াশোনা করব না আমি।”

গহন নিধির পাশের চেয়ারে বসে নিধির চেয়ারটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে টেনে এনে বলল,

“সব বিষয়ে জেদ ভালো না। যারা তোমার স্বপ্নগুলো শেষ করে দিতে চেয়েছিল তাদেরকে জিতিয়ে দেবে? তুমি তো সুযোগ পেয়েছ তোমার স্বপ্ন পূরণ করার। তাহলে হাতছাড়া করবে কেন? আমি তোমার পাশে আছি আর কি চাই?”

গহনের বলা কথাটা অন্যরকম লাগলো নিধির কাছে। খুব ভালো লাগলো। প্রথমবারের জন্য নিধি কে কেউ সাহস দিল। কেউ বলল যে ওর পাশে আছে। আগে কেউ কখনো বলেনি নিধি কে এই কথাটা। এমন করে কখনো বলেনি, কেউ কখনো এই সাহসটুকু যোগায়নি যে নিধি যেন জীবনে এগিয়ে যায়। ওর পাশে তারা আছে।

নিধি আলতো হেসে বলল,

“ঠিক বলেছেন। আর কিচ্ছু চাই না।”

গহন তড়িঘড়ি করে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“আরে না সেটা বলিনি। মানে বোঝাতে চাইছিলাম আমি যখন তোমায় সাপোর্ট করছি তাহলে তুমি কেন জীবনে এগোতে চাইছো না। পড়াশোনাটা খুব দরকার নিধি। নিজের জন্য দরকার। আমি তোমাকে বলছি না তোমায় ব্যবসাটা সামলাতেই হবে এজন্য পড়াশোনা করো। তোমার নিজের প্রয়োজনে পড়াশোনা করো।”

পড়াশোনার প্রসঙ্গটা উঠলেই আজকাল নিধি ভীষণ বিরক্ত হয়। একেবারে মাথায় আগুন ধরে যায় যেন। এখনো তার ব্যতিক্রম হলো না। বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

“রাখুন তো এখন এসব পড়াশোনা। খাবার এনেছি আপনার জন্য, খেয়ে নিন।”

কথাটা বলে নিধি নিজেই টিফিন বক্স থেকে খাবার গুলো বের করে গহনের সামনে সাজিয়ে রাখলো। নিধি জানেনা গহন কি খেতে পছন্দ করে। তাই নিজের মন মতো যা পেরেছে বানিয়ে এনেছে। শুধু ঝাল কম দিয়েছে বরাবরের মতন। গহন খাবার আর কি খাবে নিধির এত যত্ন দেখেই মন প্রাণ সব ভরে গেল যেন।

গহনের মনে পড়ে না শেষ কবে কেউ ওর খাবারের খোঁজ নিয়েছে। শেষ কবে কেউ ওর জন্য রান্না করেছে, ওকে পাশে বসে খাইয়েছে। সারাদিন অফিসে না খেয়ে থাকলেও কেউ কখনো খোঁজ করেনি। খাবার নিয়ে আসা তো দূরের কথা।

নিধি তখন গহনের প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলো গহন কে। আড়চোখে একবার গহনের দিকে তাকাতেই দেখলো গহন খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে। নিধির মনে হলো বোধহয় খুব বেশি খিদে পেয়েছে গহনের। সেজন্য খাবার গুলো দেখতেও ভালো লাগছে।

“খুব বেশি খিদে পেয়েছে? আহারে মুখটা আপনার সত্যি শুকিয়ে গেছে। আমি তো জানতাম না দুপুরে আপনি বাড়ি আসবেন না। জানলে আরো আগে আসতাম। এজন্য বলি বউয়ের কথা একটু শুনুন। সকালে গিলে এলে কি হতো?”

গহন হাসলো নিধির কথাটা শুনে। আসলে হাসিটা মিথ্যে। নিধির থেকে নিজের কষ্ট গুলো আড়াল করার একটা প্রচেষ্টা মাত্র। আসলে তো গহনের দুচোখ ঘোলা হয়ে এসেছে। গহন বুঝতে পারছে যেকোন সময় গাল বেয়ে জল গড়িয়েও পড়তে পারে। তবে নিধির সামনে তো কাঁদা যাবে না। নিধির আড়ালে নিজের চোখের জল মুছে নিলো গহন। তবে ধরা পড়ে গেল নিধির কাছে। ভেবেছিলে নিধি দেখবে না, তবে দেখে ফেলল। ব্যতিব্যস্ত গলায় বলে উঠলো,

“এই আপনি কাঁদছেন কেন? একদম বলবেন না আবার চোখে পোকা পড়েছে।”

এবারে গহন সত্যি সত্যি হাসলো। গহন চেয়েছিল নিধির থেকে নিজের সব কষ্ট লুকোতে। কিন্তু কেন যেন হঠাৎ করে লুকোতে ইচ্ছে করল না। সত্যি বলতে ইচ্ছে করলো। এবং সত্যিটা বলেও ফেলল।

“অযত্নে অভ্যস্ত হয়ে পড়া মানুষটা যদি হঠাৎ করে যত্ন পেয়ে যায় তাহলে খুব অবাক হয়। আর যদি সে একেবারে আমার মতন হতভাগ্য হয় তাহলে দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে।”

কথাটা বলে গহন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো। নিধি চেয়ার টেনে নিয়ে গহনের পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“কাঁদছেন কেন? অনেক অবহেলা করেছে সবাই আপনাকে? আপনার মা নাকি ভালোবাসে আপনাকে?”

“হ্যাঁ ভালোবাসে তো। ভীষণ ভালবাসে আমার মা। খুব ভালোবাসে। আমি বুঝি আমার মা আমাকে ভালোবাসে। আমি অনুভব করতে পারি আমার মা আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু জানো তো নিধি যখন তুমি কারো জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু মুহূর্ত গুলো নষ্টের জন্য দায়ী, যখন তুমি একজন মানুষের জীবনের অশান্তির মূল কারণ। তখন সেই মানুষটা চেয়েও সম্পূর্ণভাবে তোমায় ভালোবাসতে পারে না। তার জন্য তাকে দোষারোপ করাটাও ঠিক না। বরং আমি কৃতজ্ঞ আমার মায়ের প্রতি। আমার মা আমাকে যতটা ভালোবাসে ততটাই যথেষ্ট।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প